Tuesday, April 9, 2019

গোমাতার অসৎ সন্তান

গোমাতার সন্তানের হাতে খুনের ঘটনাকে আমরা আজকাল অভ‍্যস্থ হয়ে গেছি স্বাভাবিক ভাবে নিতে। নির্বাচনের আগ মূহুর্তে এই ধরণের লিঞ্ছিং। কী দাংগা ফাংগার প্লেনিং চলছে? ভারতে গত চার-পাঁচ বছরে যে সব গণধোলাইয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে, তার বেশির ভাগের কারণই গরু রক্ষার ইস্যু। শুধু তাই নয়, এই সব যারা মারা গেছেন তাদের বেশির ভাগই মুসলিম। গণধোলাই বা গণপিটুনি ভারতে যে আগে ঘটত না এমন নয় । কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই মারধরের প্যাটার্নে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ নামের মানবাধিকার সংগঠনটি জানাচ্ছে, গরু রক্ষার বাহানায় দেশের নানা প্রান্তে মুসলিম বা দলিতরা এখন হামলার শিকার হচ্ছেন। এ নিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো রকম আইনি সহয়তাও পাচ্ছে না সংখ্যালঘুরা।

বছর কয়েক আগেও ভারতে যে সব গণধোলাইয়ের ঘটনা ঘটত তার বেশির ভাগই ছিল ডাইনি সন্দেহে কাউকে পিটিয়ে মারার ঘটনা, কিংবা দলিতদের ওপর উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সংগঠিত হামলা। কিন্তু বিগত কয়েক বছর থেকে দেখা যাচ্ছে, ওই ধরনের গণহামলার বেশিরভাগই হচ্ছে গরু বাঁচানোর নামে। আর এতে আক্রান্ত হচ্ছেন এক বিশেষ ধর্মের লোকজন।ভারতে ডেটা জার্নালিজমের ক্ষেত্রে একটি শীর্ষস্থানীয় সংস্থা ইন্ডিয়াস্পেন্ডস। তাদের সমীক্ষা বলছে ২০১২ ও ২০১৩ সালে সারা দেশে এই ধরনের মাত্র দুটো ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত এরকম ঘটনা ঘটেছে কমপক্ষে ৯২টি।

যাইহোক, সাধারণ মানুষ মরলে আমরা এখন নির্বিকার থাকি, যা একটু-আধটু হেলদোল দেখাই সেটাও যদি অভিজাত বা উচ্চপদে চাকরিরত কেউ বেঘোরে মরেন, তখন। এইসব হত্যাগুলির কোনও বিচার তো হয়ই না, উল্টে “মুসলমান” মারার জন্য আঞ্চলিকভাবে বা সোশ্যাল মিডিয়াতে খুনিরা ইদানিং বীরের মর্যাদা পাচ্ছেন। আখলাক, জুনেইদ থেকে বুলন্দশহর, মণিপুর, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড হয়ে জম্মু ,দিল্লির আশেপাশের হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রেদশ সহ নতুন ভাবে আবার তৈরি হচ্ছে আসামেও। ক'দিন আগে করিমগঞ্জে।  একটা পরিকল্পিত চক্রান্তের মাধ্যমে দাঙ্গা বা দাঙ্গার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে লোকসভা নির্বাচনের প্রাক মূহুর্তে।

আজ আমরা নির্বাক হয়ে হাতে হাত রেখে পেঁচার মতো ডালে বসে কীর্তি দেখাই কাম‍্য। গতকাল আসামের  বিশ্বনাথ জিলায় রাজপথে সৌকত আলিকে যেভাবে উচ্ছৃঙ্খল জনগণ হেনাস্থা ও অপদস্থ করে । তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় সে বাংলাদেশি না ভারতীয়। NRC তে নাম আছে কিনা নাই। জোর করে শুকরের মাংস খাইয়ে দেওয়া। এইধরনের নোংরা মানসিকতার কাজ কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

এখন প্রশ্ন হলো---
NRC  তে নাম আছে কিনা নাই এটা কি ওদের কাজ?
বাংলাদেশি না ভারতীয় ওদের কে কি পরিচয় দেওয়ার ঠিকা ওরা নিয়েছে?
না, মাংস বিক্রির লাইসেন্স ওরা দেখবে?

এই ধরণের ঘটনায় দীর্ঘকালীন প্রভাব সীমিত, কিন্তু গরু, ধর্ম, ভাষা, জাতিকেন্দ্রিক হত্যা পরিবার ছাড়িয়ে এক বা একাধিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে আতঙ্ক ছড়ায়, তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ধর্ম, ভাষা বা জাতিগতভাবে আতঙ্কিত করে তোলাকেই সমাজের ফ্যাসিস্ট কার্যকলাপ বলা হয়। গরু-কেন্দ্রিক হত‍্যা, হেনাস্থা,একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘকালীন সাইকিক প্রভাব সৃষ্টি করে ও সমাজের সার্বিক বিকাশে ভয়ংকর ক্ষতিসাধন করে। যার ফলে ভোগান্তির শিকার নিরীহ জনগণ।

ধ‍র্মের নামে জাতির নামে রাজনীতি করে নিরপরাধ জনসাধারণের উপর অমানবিক নির্যাতন, ভারতীয় ঐতিহ‍্যের পরিপন্থী। আমরা নিশ্চয়ই এই ধরণের ভারত চাইনা যেখানে রাম আর ইমামের ঝগড়া চলে। যেখানে গো-রক্ষার নামে মব লিঞ্ছিং হয়, কৃষক রা পা ফাঁটায় ন‍্যায‍্য পাওনা আদায়ে।

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...