ভারতের আকাশে ছিল বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ। এই ট্যাগলাইনটা আজকের বা আমার কথা নয়। গত শতকের সত্তরের দশকে এক বিপ্লবী অভূত্থান। যা ঠিক আর দশটা দশকের মতো ছিল না। যার নামকরণ করেছিল চীনের পিকিং রেডিও। সেই সময় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েছিল। রাইফেল, রেডবুক দিকে দিকে মুক্তি আনছে— এই ছিল আহ্বান। তবে পশ্চিম বাংলার নকশালবাড়ি গ্রামে যা শুরু হয়েছিল, তার তুলনা মেলা ভার! ১৯৬৭ সালের ২৫ মে নকশালবাড়ি জেলায় কৃষকরা সংগঠিত হয়ে ভূস্বামী আর তাদের ভাড়াটে গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বারুদ যেন দিয়াশলাইয়ের আগুন পেল, দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়ে এ কমিউনিস্ট আন্দোলন। কমিউনিস্ট আন্দোলনের এমন চেহারা এ উপমহাদেশে আগে কখনো দেখা যায়নি। আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) আর নায়কের নাম চারু মজুমদার। আজ ভারতে ঐতিহাসিক নকশালবাড়ি আন্দোলনের অর্ধশত বছর (২৫মে ) পেরিয়ে ৫২তে পা দিয়েছে। আন্দোলনের মতাদর্শ ছিল মাও সে তুংয়ের চিন্তাধারা। আর নকশালদের আহ্বান ছিল ‘সত্তরের দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করুন’।
.....না দিলে জোতদারের গলাকাটা যাবে' দেয়ালে এই লেখাও মুছে গেছে বহু আগেই কিন্তু নকশাল আন্দোলনের স্মৃতি, চেতনা,রাজনীতি কিংবা ইতিহাস কোনোটাই এতটুকু বিস্মৃত হয়নি। সশস্ত্র কৃষক আন্দোলনের সূচনা, তাতে অচিরেই যোগ দেন হাজার হাজার তরুণ - নকশালবাড়ির গন্ডী ছাড়িয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে ভারতের নানা প্রান্তে। নকশালবাড়ি আন্দোলন বছরকয়েকের মধ্যে স্তিমিত হয়ে এলেও অনেকেই মনে করেন আজ পঞ্চাশ বছর পরেও সেই আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা কিন্তু হারিয়ে যায়নি।
সেদিনের নকশালবাড়ি আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল যে সিপিআই-এমএল দলটি, তার আজকের প্রধান নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যর কথায়, "নকশালবাড়ি স্বাধীন ভারতের একটা টার্নিং পয়েন্ট। প্রধানত এটা ছিল কৃষক আন্দোলন, আর আজকের ভারতেও কৃষকরা কিন্তু সঙ্কটে। কিন্তু নিজেদের জীবন-জীবিকা বাঁচাতে, জমি বাঁচাতে সারা দেশ জুড়ে আজও যে কৃষকরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন আমার মতে সেটা নকশালবাড়িরই ঐতিহ্য।"
"দ্বিতীয়ত সে সময় যে ধরনের ছাত্র-যুব আন্দোলন দেখা গিয়েছিল, তা প্রায় স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে তুলনীয়। হাজারে হাজারে ছাত্র গ্রামে চলে যাচ্ছেন, কৃষকের আন্দোলনে পাশে দাঁড়াচ্ছেন - এ জিনিস তো অভাবনীয় ছিল। আজকের ছাত্রদের মধ্যেও আমি সে প্রবণতা দেখি - ক্যাম্পাসে যেমন, ক্যাম্পাসের বাইরেও তেমন।"
চারু মজুমদার-কানু সান্যাল-জঙ্গল সাঁওতালদের নেতৃত্বে সেদিনের নকশালবাড়ি আন্দোলন মোটেই ব্যর্থ হয়নি বলেই তার দাবি, কিন্তু নেতৃত্বের দুর্বলতাই যে আসলে সেই আন্দোলনকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারেনি - তা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই।
নকশাল আন্দোলন কারো কাছে ছিল বিপ্লবের যাত্রা, কারো কাছে সন্ত্রাস। যে যেভাবেই মূল্যায়ন করুন না কেন, সে সময়কে মুছে দেয়া অসম্ভব। হাজার হাজার তরুণ নিজের সার্টিফিকেট পুড়িয়ে দিয়ে, নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে সশস্ত্র লড়াইয়ে নেমে পড়েছিল। গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাওয়ের তত্ত্ব বাস্তবায়ন করতে শহরের নিরাপদ গৃহ ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা তখন গ্রামে কৃষকের পর্ণকুটিরে হাজির। বাদ যায়নি বিভাগের সেরা ফল করা ছাত্রটিও। নকশাল আন্দোলন একদিকে যেমন ভারতের রাজনৈতিক জীবনকে আলোড়িত করেছিল, তেমনি নাড়া দিয়েছিল সংস্কৃতি, সাহিত্যের জগতকেও। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল অনেক কালজয়ী উপন্যাস, গল্প, নাটক, কবিতা, গান। এক্ষেত্রে ভারতের আরো অনেক ভাষার চেয়ে বাংলা ভাষার সৃষ্টিই মনে হয় অধিকতর সমৃদ্ধ। আর হবেইবা না কেন? নকশালবাড়ির জন্ম তো বাংলাতেই। মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা তো কালজয়ী সাহিত্য, যা অন্য অনেক ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে।
জেলের দেয়ালে লিখেছেন নকশালবাড়িরই বিপ্লবী কবি –
“ভাঙছি বলেই সাহস রাখি গড়ার
ভাঙছি বলেই সাজিয়ে নিতে পারি
স্বপ্নের পর স্বপ্ন সাজিয়ে তাই
আমরা এখন স্বপ্নের কারবারি।”
শুরুর দিন থেকেই নকশালবাড়ির সঙ্গে হাত ধরাধরি করে এগোলো বাংলা কবিতা।নকশালবাড়ির প্রভাবে বাংলা কবিতায় বস্তুত ঘটে গেছে অনেক ভাঙচুর, রূপান্তর। নকশালবাড়ির মতাদর্শে সুসজ্জিত কবিরা প্রথম থেকেই ঘোষণা করেছেন তাঁদের শ্রেণী অবস্থান। দিলীপ বাগচি,দূর্গা মজুমদার, সরোজ দত্ত, মুরারি মুখোপাধ্যায়, সৃজন সেনের মতো কবিরা একদিকে যেমন শব্দে আগুন জ্বালিয়েছেন, তেমনি মাঠের লড়াইয়েও শামিল হয়েছিলেন। কবিরা খুন হয়েছেন, কারাগারে গিয়েছেন, নির্যাতন সয়েছেন। নকশাল আন্দোলনের কবিতায় স্থান পেয়েছে সরাসরি রাজনৈতিক আহ্বান, মতবাদ, সশস্ত্র সংগ্রাম, কৃষক সংগ্রামের গাথা। প্রতিটা কবিতা যেন লড়াইয়ে নামার সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক! সারা জীবন ধূম উদ্গীরণের চেয়ে অন্তত একবারের জন্য হলেও জ্বলে ওঠবার আহ্বান। এর পর কয়েক বছর নকশাল আন্দোলন ধনী, ভূস্বামীদের, পুলিশের দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠল। সাধারণ ঘরের তরুণরা ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে পড়লেন পার্টির সশস্ত্র আন্দোলনে। নকশাল আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাধারণ মানুষের বিপ্লবী রূপান্তর। মানুষের ক্ষুধার যন্ত্রণা যে বিপ্লবের জননী, সে গল্প এবার সত্য হয়ে দেখা দিল। দান-খয়রাত নয়, রাষ্ট্রে নিজের অধিকার নিয়ে মানুষের বাঁচতে চাওয়ার দাবি উঠেছিল।
ওরা ছিল স্বপ্নের কারিগর। নকশালবাড়ির মতাদর্শে সুসজ্জিত কবিরা প্রথম থেকেই ঘোষণা করেছেন তাঁদের শ্রেণী অবস্থান। প্রতিটা কবিতা ছিল এক একটা অস্ত্র। নকশালবাড়ির আগমনী বার্তায় কবি দিলীপ বাগচি জানিয়ে দিলেন তার প্রেক্ষাপট, তার প্রতিজ্ঞা—
“ও নকশাল নকশাল নকশালবাড়ির মা
ও মা তোর বুগত্ অকেতা ঝরে
তোর খুনত্ আঙ্গা নিশান লঘ্যা
বাংলার চাষী জয়ধ্বনি করে।।
... ও মা তোর বুগত্ অকেতা ঝরে
সেই অকেতা হইতে জন্ম নিবে
জঙ্গাল সাঁওতাল বাংলার ঘরে ঘরে...”
নকশালবাড়ির সংগ্রামে প্রভাবিত কবিরা একদিকে যেমন দ্বিধাহীনভাবে তাদের শ্রেণী অবস্থান স্পষ্ট করছিলেন পাশাপাশি তাঁরা সংশোধনবাদ সহ যে কোন সুবিধাবাদী অবস্থানের বিরুদ্ধেও তাদের লেখনিকে ব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি। একদিকে যখন শান্তির তত্ত্ব আওড়ে জনগণকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা চালাচ্ছে নয়া সংশোধনবাদ, আর সর্বহারার মহান শিক্ষক কমরেড মাওয়ের নেতৃত্বে চলছে এর বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রাম, তখন নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাবে আলোড়িত কবির কবিতায় উঠে আসছে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি দৃঢ় সমর্থন। কবি তাঁর কবিতায় ন্যায় যুদ্ধ ও অন্যায় যুদ্ধের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা টানছেন। ‘শ্রমিকের রাজনীতি ’ কবিতায় সৃজন সেন লিখলেন –
যার হাতে বন্দুক
তার হাতে ক্ষমতা
এটাই তো পৃথিবীর ইতিহাস
শোষকেরা সেটা জানে
জানে সেটা শোষিতেরা
বিপরীতমুখী দুই বিশ্বাস…
সৃজন সেন আরও লিখলেন ওই একই কবিতায় –
শোষকের রাষ্ট্রের
পক্ষের বন্দুক
শ্রমিকরা চায় হোক স্তব্ধ
সে মহান লক্ষ্যে
শ্রমিকের বন্দুক
সৃষ্টির ডঙ্কার শব্দ।
শহীদ কবি সরোজ দত্ত তাঁর ‘কোনো এক বিপ্লবী কবির মর্মকথা ’ কবিতায় স্পষ্ট করে ঘোষণা করেন তাঁর শ্রেণী অবস্থান –
গণগগনের পথে অগ্নিরথ জনমানবের
যাহারা টানিয়া আনে তাহাদের সহকর্মী আমি ’
কিংবা শহীদ কবি দ্রোণাচার্য ঘোষ লিখছেন
‘আমার মুক্তির ডাক’ কবিতায় –
‘আমার মুক্তির ডাক আকাশে বাতাসে
শ্রমিকের কৃষকের মাঝে শুধু ভাসে,
আমার স্বপ্নের রঙ লাল –
বয়সের শব্দে শুধু শোষণ ছেঁড়ার দিনকাল।
শহীদ কবি মুরারি মুখোপাধ্যায়ের ‘তুমি কৃষক’ কবিতায় সরাসরি কৃষক বিদ্রোহের ডাক –
হে কৃষক বিদ্রোহ কর
ঘোরতর বিদ্রোহ
তা’ না হলে ঘুচিবে না
তোমাদের এই দুর্গ্রহ।
সত্তরের আরেকজন কবি পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে দেন ‘আমাকে নির্দেশ দাও ’ কবিতায় –
আমি কোন বসন্তদিনের ফেলে রাখা রাখি ফেরত চাই না আজ
জানতে চাই না ভবিষ্যতের নিশ্চিন্ত নির্ভরতা
শৃঙ্খলিত মানুষের চলার ছন্দের মধ্যে
জেগে উঠেছে যে ঘুম ভাঙার গান
হে সময়, আমাকে তুমি তার প্রতি অনুগত থাকতে সাহায্য করো
হাতুড়ির ঘা মেরে
প্রতিদিন রক্তের ভিতর তোমার অবিরাম নির্দেশ পাঠাও।
কবি দুর্গা মজুমদার তাঁর 'গাণ্ডীবে টঙ্কারে দিল’ কবিতায়--
“নতজানু হয়ে তিলে তিলে ক্ষয়ে বাঁচবার নাম
আমি রাখলাম
মরণের স্তব—
খুনের বদলে খুন না ঝরিয়ে মরবার নাম
আমি রাখলাম
শ্মশানের শব!
মারার তাগিদে আড়ালে গা-ঢেকে বাঁচবার নাম
আমি রাখলাম
সংগ্রামী গৌরব—
মরণের মুখে থুথু ছুড়ে দিয়ে মরবার নাম
আমি রাখলাম
সশস্ত্র বিপ্লব!!
নকশাল আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন গ্রামের গরিব, ভূমিহীন কৃষকরা। তাদের শতবছরের বঞ্চনার ক্ষোভে আগুন জ্বালিয়েছিল নকশালবাড়ি। নকশাল আন্দোলনে যুক্ত চারজন তরুণ কবি খুন হয়েছিলেন পুলিশের গুলিতে, জেলখানায় বন্দি অবস্থায়। এদের মধ্যে আছেন কবি দ্রোণাচার্য ঘোষ, তিমিরবরণ সিংহ, অমিয় চট্টোপাধ্যায় ও মুরারি মুখোপাধ্যায়। তিমিরবরণ সিংহ ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। নকশাল আন্দোলনে গ্রামে গিয়েছিলেন কৃষকদের সংগঠিত করতে। ১৯৭১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বহরমপুর জেলে নিহত হয়েছিলেন পুলিশের গুলিতে। অমিয় চট্টোপাধ্যায় বেহালা পৌরসভার কাউন্সিলর হয়েছিলেন। নকশাল আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পুরুলিয়ার গ্রামাঞ্চলে পার্টির কাজ শুরু করেন। গ্রামে কাজ করতেন ‘সাগর’ ছদ্মনামে। গ্রেফতার হয়ে ঠিকানা হয় জেলখানা এবং জেলের অভ্যন্তরেই তাকে হত্যা করা হয়।
নকশাল আন্দোলন দমাতে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের জবাবে পাল্টা জবাব দেয়ার প্রত্যয়ে তরুণ কবি মুরারি মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘কলকাতা বদলা নিতে জানে’। কবিতা কি চিঠি— সবখানেই মুরারি ছিলেন সমাজ বদলের আকাঙ্ক্ষায় অস্থির। ‘কলকাতা বদলা নিতে জানে’ যেন সে সময়ের এক জীবন্ত দলিল। যুগের ক্রোধ যেন মুরারির কলমে ভাষা পেল। মুরারি বলছেন তার বন্ধু কাজল আর সমীরের রক্ত কলকাতাকে আরো উত্তাল করেছে; ভোটের রাজনীতিকে বিদায় দিয়ে রক্তাত্ত সংগ্রাম, প্রতিশোধের কথা বলেছেন। শহরের বাবুদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। আহ্বান জানিয়েছেন বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ার। আর শেষমেশ উচ্চারণ করেছেন নকশালবাদীদের নেতা চীনা বিপ্লবের নেতা মাও সে তুংয়ের নাম—
‘পূর্ব দিগন্তে রক্ত সূর্য মাও সে তুঙ
টুটল আঁধার, কোটি সেনানীর ভাঙলো ঘুম
আজ এই দিনে যোদ্ধার বেশে তোমায় পেলাম
কৃষকের কলকাতা লাল সেলাম।’
নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতায় আবার একই সাথে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধেই তীব্র ঘৃণা আর জেহাদ –
“এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না
এই জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ আমার দেশ না
এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না
এই রক্ত স্নাত কসাইখানা আমার দেশ না
আমি আমার দেশকে ফিরে কেড়ে নেব”
(এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না)
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পোষাক ছাড়ার প্রসঙ্গ উঠলেই মনে পড়ে এক কবিতা ‘উলঙ্গ রাজার ’ কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে নিয়ে –
“হেইও হো! হেইও হো!
পোশাক ছাড়া, নীরেন! তুমি,
তুমিও ন্যাংটো!
কিন্তু ঘরে তেমন একটি
আয়না রাখে কে?”
কবিতার শৈল্পিক মানের এ বিতর্কে অর্জুন গোস্বামী নকশালবাদী কবিতার পক্ষেই রায় দিয়েছেন, ‘এটা সত্তরের দশক। এই দশক প্রত্যক্ষ করেছে শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে শোষিতশ্রেণীর লড়াই। এই দশকেই প্রমাণিত হয়েছে যে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকচক্রকে উপরে উপরে যতই শক্তিশালী বলে মনে হোক না কেন আসলে তারা হলো কাগুজে বাঘ। স্বভাবতই এই দশকের মানুষের সচেতনতা অনেক বেশি। আমরা এমন কোন কবিতা পড়তে চাই না যাতে আছে হতাশা, আছে যন্ত্রণার গোঙানি। আমরা এমন কবিতা পড়তে চাই যাতে ধরা পড়বে শোষণের আসল স্বরূপ, যে কবিতা পড়ে অনুপ্রেরণা পাবেন লক্ষ লক্ষ খেটে খাওয়া মানুষ এবং যে কবিতা প্রকৃতই হবে শোষিতশ্রেণীর সংগ্রামী হাতিয়ার। আমাদের মধ্যে অনেকে বলেন কবিতা হলো এমন একটা জিনিস যা ঠিক স্লোগান নয়। আমাদের বক্তব্য হলো কবিতার বিষয় ও কবিতার আঙ্গিক এই দুটোর মধ্যে আগে বিষয়, পরে আঙ্গিক। বক্তব্যকে সাধারণের উপযোগী করে বলার জন্য কবিতা যদি কারুর কাছে স্লোগান বলে মনে হয় তবে সেই স্লোগানই হলো সত্তরের দশকের শ্রেষ্ঠ কবিতা।’
কবিতার পাশাপাশি গল্প,উপন্যাসে ধরা রয়েছে নকশাল আন্দোলন। কিছু রচিত হয়েছে আন্দোলন চলাকালে আবার কিছু পরবর্তীকালেও। গল্পগুলোয় রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও তরুণদের দুঃসাহসী রাজনীতির বিবরণ পাওয়া যায়। মহাশ্বেতা দেবীর দ্রৌপদী গল্পটি দিয়ে শুরু করা যাক। দোপিদ যখন বলল , “কাপড় কী হবে, কাপড়? লেংটা করতে পারিস, কাপড় পরাবি কেমন করে? মরদ তু? চারদিকে চেয়ে দ্রৌপদী রক্তমাখা থুথু ফেলতে সেনানায়কের সাদা বুশ শার্টটা বেছে নেয় এবং সেখানে থুথু ফেলে বলে, হেথা কেও পুরুষ নাই যে লাজ করব। কাপড় মোরে পরাতে দিব না। ...দ্রৌপদী দুই মর্দিত স্তনে সেনানায়ককে ঠেলতে থাকে এবং এই প্রথম সেনানায়ক নিরস্ত্র টার্গেটের সামনে দাঁড়াতে ভয় পান, ভীষণ ভয়।” অসম্ভব প্রতিবাদী কণ্ঠ। নকশাল আন্দোলনে আদিবাসীরা বেশ ভালোভাবেই যুক্ত হয়েছিল। আর মহাশ্বেতা দেবী আদিবাসীদের সংগ্রাম বাংলা ভাষায় যেভাবে লিখেছেন।আর কেই বা লিখতে পেরেছেন!
‘বলো, হাতদিয়ে রোখা যায় কি সূর্যের কিরণ? হত্যা করে রোখা যায় কি বিপ্লব?' না রোখা যায় না। ওরা অপ্রতিদ্বন্দ্বী।” যেখানে নকশাল রাজনীতি চিত্রায়িত হয়েছে। সেই দীপংকর চক্রবর্তীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী গল্পটির কথা। সে সময়ের রাজনীতির তাত্ত্বিক লড়াই, ঝোঁক সবই ধরা রয়েছে এ গল্পে। মূলত গল্পের এ ঘটনা পাঠককে দেখিয়ে লেখক তার গল্পকে একটি নিরেট সরল রাজনৈতিক করে তুলেছেন। দীপংকর চক্রবর্তী এ গল্প লিখেছেন সেই উত্তাল সময়ে, ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনীক পত্রিকায় গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল। অপ্রতিদ্বন্দ্বী গল্পটি ছোটগল্পের শিল্পমান সেভাবে অর্জন করতে পারেনি। গল্পটি নেহাতই রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন হয়েছে। নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত আরো অসংখ্য ছোটগল্পের মধ্যে রয়েছে— হাসান আজিজুল হকের আমরা অপেক্ষা করছি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পলাতক ও অনুসরণকারী, বিমল করের নিগ্রহ, সমরেশ বসুর শহিদের মা, দেবেশ রায়ের কয়েদখানা, সুবিমল মিশ্রের মাংস বিনিময় হল, নবারুণ ভট্টাচার্যের খোঁচড়, জয়া মিত্রের স্বজন বিজন, বশীর আলহেলালের মোকাবিলা প্রভৃতি।
নকশাল আন্দোলন নিয়ে রচিত হয়েছে উপন্যাসও। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উপন্যাসের মধ্যে আছে— স্বর্ণ মিত্রের গ্রামে চলো (১৯৭২), মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা (১৯৭৩) ও অপারেশন? বসাই টুডু (১৯৭৮), শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের শ্যাওলা (১৯৭৭), শৈবাল মিত্রের অজ্ঞাতবাস (১৯৮০), জয়া মিত্রের হন্যমান, সমরেশ মজুমদারের কালবেলা প্রভৃতি।
স্বর্ণ মিত্রের গ্রামে চলো উপন্যাসটি নকশাল আন্দোলনে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের অংশ নেয়ার বিবরণ দেখায়। প্রেসিডেন্সির ছাত্র অনিরুদ্ধ বাগচী ওরফে রঘুর নকশাল হয়ে গ্রামে কৃষক সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার কাহিনী। নকশাল আন্দোলনে প্রেসিডেন্সির ছাত্রদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। স্বর্ণ মিত্র তার উপন্যাসে সেই ছবিটা দেখাতে চেয়েছিলেন। পুরো উপন্যাসে একজন শহুরে তরুণ গ্রামের এই কষ্টকর সংগ্রামে কীভাবে অংশ নিয়েছিলেন, তার বিবরণ পাওয়া যায়। উঠে এসেছে কৃষকদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। মাঝে মাঝেই এসেছে পরিস্থিতি অনুযায়ী মাও সে তুংয়ের উক্তি।নকশাল আন্দোলন নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস বোধহয় মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা। মহাশ্বেতা দেবী লিখছেন, ‘অপরাধের মধ্যে ব্রতী এই সমাজে, এই ব্যবস্থায় বিশ্বাস হারিয়েছিল।’ ব্রতীর ঘর সার্চ করে পুলিশ উদ্ধার করে নকশালদের স্লোগানের খসড়া। সত্তরের দশকের অতি পরিচিত সব স্লোগান। ব্রতীর প্রেমিকা নন্দিনী পুলিশি হেফাজতে প্রায় অন্ধ হয়ে যায়, দীর্ঘদিন সলিটারি সেলে থেকে সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তার সাথে সমরেশ মজুমদারের কালবেলা।বইটির ভূমিকায় লেখক বলেছেন, তিনি এতে একটি নির্দিষ্ট সময়কে শব্দে বন্দী করতে চেয়েছেন, একত্র করে প্রকাশ করতে চেয়েছেন তখনকার নির্যাস। সমাজতন্ত্রের চেহারাকে রূপ এক কথাও ফুটে উঠেছে কালবেলায়। অনিমেষদের ভুলগুলো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রয়োজন ছিল। চে গ্যেভারাও বলেছিলেন, “বিপ্লব তো আর গাছে ধরা আপেল নয় যে পাকবে আর পড়বে, বিপ্লব অর্জন করতে হয়”।কালবেলার সমগ্র নির্যাস শুধু একটি উক্তি দিয়েই প্রকাশ করা সম্ভব,“বিপ্লবের আরেক নাম মাধবীলতা”।
গল্প, কবিতা, উপন্যাসের বাইরে নকশাল আন্দোলন নাটক, গান, সিনেমাসহ আরো অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাব রেখেছিল। সেসব নিয়ে যথেষ্ট আলোচনার সুযোগ এ লেখায় হচ্ছে না। তবে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ নামের পথপ্রদর্শক বাংলা ব্যান্ডটির কথা সামান্য উল্লেখ করতে চাই। ব্যান্ডটির মূল উদ্যোক্তা বলা যায় গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে। মনিদা নামে পরিচিত গৌতম ছাত্রজীবনেই নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে গৌতম গ্রেফতার হয়েছিলেন। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন, সইতে হয়েছে নির্যাতন। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে প্রশাসনের নির্দেশে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। তারপর ১৯৭৬ সালে জন্ম নেয় কিংবদন্তি বাংলা ব্যান্ড ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’।
নকশাল আন্দোলনের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়া, বা তার সাফল্য বা বিফলতার বিচারের কতটা প্রয়োজন । প্রয়োজন হলো সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতিতে নকশাল আন্দোলনের প্রসার ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা। আসল কথা হলো স্বাধীন ভারতে বাম আন্দোলন নিয়ে বাংলা সাহিত্যে এতো আলোচনা আর কোন আন্দোলন নিয়ে এমন হয় নি।
যেভাবে মাও সেতুঙ বলেছিলেন, ” একদিকে রয়েছে ক্ষুধার জ্বালা, অবহেলা, ও অত্যাচার আর অন্যদিকে রয়েছে মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষন ও নিপীড়ন। এই বাস্তব সত্য সর্বত্র রয়েছে আর মানুষের কাছে তা প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনা ই মনে হয়। সেই প্রতিদিনের ঘটনাকে নিয়ে লেখক শিল্পীরা তার মধ্যে ফুটিয়ে তোলেন তার মধ্যেকার দ্বন্দ্ব–সংঘাত, ও সংগ্রামকে এবং এমন রচনা সৃষ্টি করেন যা জনগণকে জাগিয়ে দেয়, তাদের প্রেরণায় উদ্দীপ্ত করে তোলে, ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তাদের পরিবেশকেই পরিবর্তন করে দিতে উদ্বুদ্ধ করে তোলে।”
No comments:
Post a Comment