Saturday, April 6, 2019

‘এপ্রিল ফুল’ ও মুসলিমদের বানোয়াট গল্প

এপ্রিলের এক তারিখ' প্রতিটা বছরেই আসে। আর এই দিন যদি আপনি কাউকে ফোনে, ফেবুতে, কিংবা মজা করে একটু বোকা বানিয়ে নেন তাহলে আর রেহাই নেই। আপনি নির্ঘাত ভৎসনার শিকার হবেন। শুনতে হবে গম্ভীর রচনাধর্মী ভীত্তিহীন কিছু তেঁতুলতত্ত্ব। এপ্রিল ফুল পালনকরা ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে খুবই খারাপ এবং লজ্জাজনক। এইদিন বুঝি মুসলমানদের ধোঁকা দিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো… ইত্যাদি। এই ব‍্যাপারটি কম বেশি আমাদের সবার জানা। এই মুসলিম সমাজ আরও বহু কিছু হারামে এরা জর্জরিত। আজকের দিনে যেখানে মানুষ বিচারের মাধ্যমে সত‍্য আর মিথ্যার ফারাক বুঝে। সেখানে অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক কিছু তথ্যের ভিত্তিতে গুটিয়ে রেখেছে ওরা নিজেদেরকে। মুসলমানদের কাছে একের অধিক নারী, জান্নাত সুখ, ৭২হুর, সহবত এসব ছাড়া মুসলমানের জীবনে কোন উৎসব নেই বাকিগুলো যেমন-- ভ্যালেন্টটাইন ডে , পহেলা বৈশাখ, চৈত্র সংক্রান্তি, শহীদ মিনার, জাতীয় সংগীত, ক্রিসমাসের কেক, দুর্গাপূজার লাড্ডু হারাম… । সহজ বাংলায় দ্বিনের স্বার্থে মিথ্যা বলা। যেমন খ্রিস্টানদের প্রতি ঘৃণা জাগ্রত করে মুসলিম জাতীয়তাবোধের আবেগ সৃষ্টির জন্য পহেলা এপ্রিল মুসলমানদের পুড়িয়ে মারার গল্প তৈরি করা হয়েছে। অন্যান্য জাতি,ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রতি তাদের যদিও মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি বিলায় অন্তরে কাফের ফতুয়া দিতে ক্ষণিক সময় বিলম্ব হয় না। আর ভিন্ন ভাষাভাষী,সংস্কৃতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ জানতে কিছু মিথ্যা গল্প সাজিয়ে সহীহ ইসলামী তরিকার প্রোপাগান্ডা।

মুসলিমরা দাবী করে যে স্পেনে মুসলিমদের পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিলো এপ্রিলের এক তারিখে। মুসলমানদের বলা হয়েছিলো তারা যদি আত্মসমর্পন করে মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নেয় তাহলে তাদের কোন ক্ষতি করা হবে না। এই শুনে সরল বিশ্বাসে মুসলমানরা মসজিদে গিয়ে প্রবেশ করলে খ্রিস্টানরা মসজিদের দরজা বাইরে থেকে আটকে দিয়ে মুসলমানদের জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে। যেহেতু মুসলমানদের ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে মারা হয়েছিলো তাই খ্রীস্টানরা এই দিনটাকে ‘এপ্রিল ফুল’ বা এপ্রিলের বোকা হিসেবে আনন্দ করে কাটায়…।

এই গল্পের মধ্যে মানুষকে পুড়িয়ে মারার যে নাটকীয় বর্ণনার মিথ্যা রূপ দেওয়া হয়েছিল তা একটি সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়ার সবটাই রাখা হয়েছে। আবাল,বৃদ্ধ, বণীতা,মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে আপনার পাড়ার ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার,বা  বড় কাউকে বলতে শুনবেন এই এপ্রিলের এক তারিখে স্পেনের রানী ইসাবেলা মুসলমানদের বোকা বানিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিলো! আর তোমরা মুসলমানরা সেই দিনটাকে পালন করো এপ্রিল ফুল হিসেবে ছি:… লজ্জা করে না।


আসল ঘটনা হচ্ছে স্পেন থেকে মুসলিম শাসনের অবসান মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই ঘটেছিলো। রানী ইসাবেলা (এই প্রখর বুদ্ধিমতী নারীই কলম্বাসকে আমেরিকা আবিস্কার অভিযানে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন) স্পেন থেকে মুসলিম শাসন হটাতে আস্তে আস্তে ছোট ছোট অংশ দখল করে নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন। মুসলিম শাসন স্পেনে শুরু হয় ৭১১ খ্রিস্টাব্দে। ইসাবেলা ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারী স্পেনের শেষ মুসলিম শাসনের খলিফা দ্বাদশ মোহাম্মদের হাত থেকে শান্তিপূর্ণভাবে নগরের চাবি গ্রহণ করেন। দ্বাদশ মোহাম্মদকে আটক করেও ইসাবালা তাকে ছেড়ে দেন। ইতিহাস থেকে দেখা যাচ্ছে গ্রানাডা হস্তগত হয়েছিলো জানুয়ারির ২ তারিখে। স্পেনের ইতিহাসে কোথাও মসজিদে আটক করে পুড়িয়ে মারার ঘটনার উল্লেখ নেই। মুসলমানদের এই পুড়িয়ে মারার গল্পের কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। দ্বিতীয়ত রানী ইসাবেলাকে জড়িয়ে স্পেনের পতনের দিনে (২ জানুয়ারি) মুসলমানদের পুড়িয়ে মারার কথিত এপ্রিলের ১ তারিখের সঙ্গে মেলে না। কারণ জানুয়ারির ২ তারিখ ইসবেলা দ্বাদশ মোহাম্মদের হাত থেকে ক্ষমতা নেন। ইতিহাসে স্পষ্ট করে লেখা আছে, ‘The end of Muslim rule at the heart of Spain came to an end on January 2, 1492 when Boabdil relinquished the keys to the Moorish capital to King Ferdinand and Queen Isabella.  বিস্তারিত জানতে পড়ুন এখান থেকে-
http://www.cam.ac.uk/research/news/the-last-muslim-king-in-spain
https://www.questia.com/read/96601249/a-history-of-medieval-spain

‘এপ্রিল ফুল’ আসলে বহু প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা একটা উৎসব যা বিবর্তিত হয়ে এসেছে। লন্ডনে একবার ‘এপ্রিল ফুল’ বানাতে টাওয়ার অব লন্ডনের শহরবাসীকে গুজব ছড়িয়ে একত্রে জড়া করা হয়েছিলো। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এপ্রিলের ১ তারিখকে বসন্তের প্রথম দিন ধরে আনন্দ করে কাটানোর রেওয়াজ আছে। এই দিনটি কোন মতেই মুসলিম পুড়িয়ে হত্যা করার মত কোন ঘৃণ্য ঘটনার সাক্ষি নয়। শুধুমাত্র ধর্মীয় ঘৃণা বিদ্বেষ জাগ্রত করতেই মুসলিম বিশ্বে এই গল্প চালু করা হয়েছিলো। ছোটবেলা ঘুড়ি উড়ানোর সখ ছিলো। বাসায় যে হুজুর আমাকে আরবী পড়াতে আসত তিনি বলতেন, মুসলমানদের জন্য ঘুড়ি উড়ানো হারাম। কারণ কাফেররা মুসলমানদের পরাজিত করার পর আনন্দ করে ঘুড়ি উড়িয়েছিলো…। বাসা থেকে একটু দূরে শত বছরের পুরোনো বৈশাখী মেলা হতো। এখনো হয় শুনেছি। এক মাসের সেই মেলায় ছোটবেলায় আমি রোজ যেতাম। সেখানেও হুজুরের হানা! মেলায় যাওয়া হারাম। কাফেররা কাবাঘরের সামনে মেলা বসাতো… ইত্যাদি। তা ইসলামের বিনোদনের কি আছে তাহলে? বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, একাধিক স্ত্রী ও দাসি সহবত ছাড়া ইসলামে আলাদা কোন বিনোদনের অনুমোদন নেই। এমনকি অট্টহাসি দেয়াও ইসলামের অপছন্দ। তীর-ধনুক আর ঘোড়া দৌড় ছাড়া অন্য কোন খেলাধুলা বিষয়েও ইসলাম ভীষণ রকমের রক্ষণশীল। এই দুটি খেলার অনুমোদন করা হয়েছে কারণ এগুলো জিহাদের ময়দানে দক্ষতা প্রদর্শনের উপর শত্রুদের পরাজিত করা নির্ভর করে। কিন্তু মানুষ যেহেতু সহজাতভাবে আনন্দ উৎসবের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে তাই অন্যের ধর্মীয় বা জাতিগত উৎসবে যে যোগ দিবেই। যখন এটি বন্ধ করা যায় না তখনই এই রকম গল্প তৈরি করে মুসলমানদের মন বিষিয়ে তোলা হয়। সেই ধারা অব্যাহত থাকায় আজ মুসলিম মাত্রই অমুসলিমদের প্রতি ঘৃণা অবিশ্বাস সন্দেহ ছাড়া কল্পনাই করা যায় না!

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...