Wednesday, June 28, 2023

ডিলেমিটেশন : যোগ বিয়োগে নতুন সমীকরণ

যদি সত্যি বলতে হয়, বোড়োরা যা করে দেখালো বরাকের প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ মানুষের ঝুলিতে মিলল একরাশ দুর্ভোগ। না না ভুল বুঝবেন না। হিংসা ও নয়। আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের শিকার আরেকবার, তা প্রমাণিত। প্রতিটা ভাষাভাষী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও তাদের অধিকার অটুট থাকা এটা সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু কপাল পুড়ার ক্ষেত্রে বারবার বরাকই বা কেন? বর্তমান আসামে দ্বিতীয় সরকারি বোড়ো ভাষা। জনসংখ্যার দিক থেকে বরাক পিছিয়ে না পড়লেও আসন সংখ্যায় কমে এখন তেরো। আসলে এই ছক আগে থেকেই আঁকা ! আসন সংখ্যা কমানোর পেছনে কোন যুক্তিসংগত কারণ এখনও মেলেনি। আমরা আজ ইতিহাসের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া সময়ে। আমাদের উচিত ছিল সেদিনই যেদিন বদরপুরকে কাছাড়ের আওতায় আনা হয়। দেশভাগের পূর্ববর্তী সময় থেকেই বদরপুর ছিল করিমগঞ্জের সঙ্গে। তবে এটা কি বলা যায় - 'বদরপুরের দুর্গ কে কাছাড়ি রাজার দুর্গ' বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা ?

আমাদের বাসস্থান আসামে হলেও অসমিয়া আগ্রাসনের শিকার বহু আগে থেকেই। ১৯৬১ সালের ১৯শে মে ১১ টি তরতাজা প্রাণ শহীদ হন শিলচরে। ১৯৭২ এর ১৭ই আগস্ট করিমগঞ্জে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু চক্রবর্তী)। ১৯৮৬র ২১ জুলাই করিমগঞ্জে শহীদ হন জগন্ময় ও যীশু। ১৯৯৬ এ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার রক্ষায় করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে শহীদ হন সুদেষ্ণা সিনহা। ভাষার অধিকার রক্ষায় ১৫ জন শহিদ হয়েছেন ঠিকই কিন্তু আসামে ভাষিক সংখ্যালঘুরা এভাবে বারবার ক্লান্ত হচ্ছেন অসমিয়া আগ্রাসন দ্বারা। নিপীড়িত হচ্ছেন ডি–ভোটারের তকমায় ডিটেনশন ক্যাম্পে আবার কখনো বা  উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির সুকৌশল ভাষিক আগ্রাসন নীতির মাধ্যমে অথবা নতুন প্রকৌশল ডিলিমিটেশনে । 

জাতীয়তাবোধ জাগরনের পেছনে যে উপাদানটি সার্বিক প্রয়োজন সেটি হলো এক সম্মিলিত ঐতিহ্যবোধ। 'শহীদ তীর্থ বরাক' এ এতোজন ভাষা শহীদ হয়েও আমরা এখনও উত্তরাধিকার হতে পারলাম না। আমরা ক্রমশঃ পরিচয়ে বিভক্ত হচ্ছি হিন্দু-মুসলমানে। আর সুযোগসন্ধানীরা সেই সুযোগে আঁতে ঘা দিচ্ছে একের পর এক কাঁটা বিদ্ধ করে। আমাদের দুটি আসন কমিয়ে গলা টিপার আরেক দফা এগোলো আর কি! বিধানসভা আসন সংখ্যাভিত্তিক কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের যে বরাদ্দ থাকে, তা কমবে। সুতরাং খুবই পরিতাপের বিষয় যাঁরা বলছেন, এই ডিলিমিটেশন প্রস্তাবে বরাকের কোনো ক্ষতি হবে না, তাঁরা কোন ভিত্তিতে বলছেন, তাঁরাই জানেন! জার্সি বদলিয়ে কথা ছিল পরিবর্তনের জোয়ারে ভাসিয়ে দেয়ার কিন্তু আগ্রাসন অক্ষরে অক্ষরে পালিত তার পদচিহ্ন প্রতিয়মান।

আসামের দক্ষিণাঞ্চল বরাক উপত্যকায় যথাক্রমে তিনটি জেলা কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি। আয়তনের দিক থেকে প্রায় ৬৯২২ বর্গ কিলোমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বরাক উপত্যকার জনসংখ্যা ছিল ৩৬,২৫,৩৯৯, তা বর্তমানে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষের অধিক। এই বিশাল জনসংখ্যবহুল উপত্যকায় এখন পর্যন্ত প্রতিনিধিত্ব করছেন ১৫ জন বিধায়ক। অন্যদিকে বিটিআর অটোনোমাস রিজিওন (Bodoland Territorial Region ) যথাক্রমে চারটি জেলা বাকসা, চিরাং, কোকরাঝাড় এবং উদালগুড়ি। আয়তনের দিক থেকে বিটিআর ৮৯৭০ বর্গ কিলোমিটার। ২০১১ মতে জনসংখ্যা প্রায় ৩১,৫৫,৩৫৯। বিধানসভায় প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন ১২জন বিধায়ক। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো এই ডিলিমিটেশনে আরও দুইটি আসন বাড়লো কিভাবে? ডিলিমিটেশন হয় সাম্প্রতিক লোক গণনা মতে জনসংখ্যার ঘনত্বের উপর (Delimitation reflect demographic fluctuations. Means the most current census serves as the basis for redrawing boundaries namely population density.) অর্থাৎ আয়তনের ভিত্তিতে আসন যোগ বা বিয়োগ হয় না। বিটিআর এ যেখানে চারটি জেলা আর বরাক উপত্যকায় তিনটি, এটাও যেন মাথায় রাখি। যেখানে বরাক উপত্যকায় ২০১১ অনুযায়ী হিসেব করা হয় তবুও বিটিআর থেকে প্রায় পাঁচ লক্ষের অধিক জনসংখ্যা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় শুধু বিটিআর কেন আসামের অন্যান্য জেলায়ও বেড়েছে বিধানসভার আসন। যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব কম।

বরাক, কুশিয়ারা, ধলেশ্বরীর মিলনায়তন এই উপত্যকা বহু আগে থেকেই পিছিয়ে পড়া। জনসংখ্যার দিক থেকে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষের বেশি হলেও সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থতৈনিক দিক দিয়ে জীবনধারণের মানদন্ডে ভারতের বিশেষ করে আসামের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক দূরে। নির্বাচনী ইশতেহার অনেক ঘোষণা থাকলেও রাজনৈতিক নেতা দুই একজন ব্যাতিক্রমী ছাড়া কন্ঠস্বর খুবই ক্ষীণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এতে নিশ্চয় দূরদর্শিতার অভাব। দেখতে গেলে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কাগজ কল পাঁচগ্রাম কাগজ কল এখন বন্ধ, অপমৃত্যু ঘটে আনিপুর চিনি কল, বন্যার প্রকোপ, দুর্বল কর্মসংস্থান, অবিকশিত কৃষি ক্ষেত্র। তাছাড়া কি আর বলার আমাদের ছেলেমেয়েরা পেটের তাগিদে বর্হিরাজ্যে গিয়ে কর্মসংস্থানে জুড়ছে। এখানকার জনজীবনের উন্নতিকল্পে যেখানে আসন বর্ধিত করার কথা সেখানে হলো কমানো। তিমির অবগুণ্ঠনে আরও তলানিতে বরাকের জনজীবন।

প্রায় দুই দশকের পর আসামে নির্বাচনী এলাকা পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে (Constituency rescheduling process in Assam)।  আসাম সরকার এই প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে একটি অফিসিয়াল চিঠি পাঠিয়েছে  হয়তো ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে আসামের লোকসভা, বিধানসভা কেন্দ্রের সীমানা পরিবর্তিত হবে (Redrawing constituency boundaries)। সঙ্গে আরও 'খেলা হবে', বদলে যাবে ভোটাররা !! ১১ মে ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সভায় একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল (All Party Meeting decision on Re determination)।  কিন্তু এনআরসি এখনও অসম্পূর্ণ।এনআরসি সম্পূর্ণ না করে কেন নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা একটি শুধু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন নয়, ভাববার বিষয়। আসু এবং অসম সাহিত্য সভা প্রমুখের সাংগঠনিক ভূমিকা এখন কি হবে তাও চিন্তার বিষয় ৷ এনআরসি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এতদিন সমষ্টির সীমা পুনর নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বাধা দিয়েছিল আসু ৷ করেছিল বলিষ্ঠ বিরোধীতা। এখন এন আর সি অসম্পূর্ণ হয়ে থাকা অবস্থায় সমষ্টির পুনর নির্ধারণ নিয়ে আসুর ভূমিকা ও হয়ে পড়েছে উদ্বেগজনক।

অবশ্য সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত ন্যায়াধীশ বিপ্লব শর্মার অধ্যক্ষে গঠিত অসম চুক্তির ৬ নং দফার রূপায়ণ কমিটির পরামর্শের ভিত্তিতে আসামে সমষ্টির পুনর্নির্ধারণ করার জন্য দাবি জানিয়েছিল সদৌ অসম ছাত্র সংস্থা। তবে এখন যে মৌনতা অবলম্বন করে আছে এটাতে বুঝা যায় সম্মতির নিশ্চয়ই লক্ষণ এখানে। এনআরসির বিপরীতে এখন হবে সমষ্টির পুনর নির্ধারণ। সর্বদলীয় মৌনতা ও অসম্পূর্ণ এন আর সি দিয়ে সমষ্টির পুনর নির্ধারণের সম্মতি বিবেচিত হচ্ছে। এখন কথা হলো প্রপোজড ডিলেমিটেশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা যাবে ১১ জুলাই ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ তারিখ পর্যন্ত। চিঠি বা মেইল মারফত অভিযোগ দায়ের করা যাবে সেক্রেটারি, ইলেকশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া-এর কাছে। প্রপোজড ডিলেমিটেশনে বরাকের কোন ক্ষতি হবে না তো! এই ডিলেমিটেশনে আমরা কি পেলাম। আমরা বঞ্চনার শিকার বহু আগে থেকেই। এটা নতুন করে বলার কিছু নয়। তাই বলাই বাহুল্য গালাগা হয়ে যাওয়া। ডিলেমিটেশনে বরাকের দুই সমষ্টি কাটলিছড়া ও পাথারকান্দি বিলুপ্ত। বরাকের ক্ষেত্রে এহেন আচরণ কোন রাজনৈতিক চক্রান্ত নয়তো, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে ফেলার ফন্দি নয়তো, আসাম বিধানসভায় বরাক থেকে প্রতিনিধিত্ব কমিয়ে বরাকের আওয়াজকে দাবিয়ে রাখার জন্য উদ্দেশ্য প্রণোদিত কলকাঠি নয়তো! 

আসলে আমরা হীনমন্যতায় ভুগছি। ভাত-ঘুমের ব্যাঘাত ঘটুক কে চাই! তবে এটা যেন মনে রাখি বার বার অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমাদেরই। মিথ্যে নয় - কি আর করতে পারলাম, না পারলাম 'ভাষা শহীদ ষ্টেশন' বানাতে না পারলাম ঐক্যবদ্ধ হতে। জনপ্রতিনিধি কমানোর যে ছক তা কি আসলে উপত্যকার গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার ছক ! এখনই সময় সম্মিলিতভাবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ঐক্যবদ্ধ জনমত গঠন করার। একটা কথা বলি, বরাক থেকে প্রতিনিধিত্ব কমানোর অর্থ হলো আমাদের আওয়াজ কমিয়ে দেওয়া। সুতরাং এই প্রপোজড ডিলেমিটেশন কতটা যুক্তিসঙ্গত এবং বরাকের ক্ষেত্রে কতটা বিকাশ আনতে পারে — তা দেখবার বিষয়!! জবাবদিহিতার অভাবে শেষে এটাই বলব শ্রদ্ধেয় কবি ব্রজেন্দ্র কুমার সিংহের ভাষায় — 'ধানের খেতের মতো শ্যামল কোমল/ দিঘির জলের মতো স্নেহ মাখা/ তাকে মেরে ফেলা এতই সহজ!'


দৈনিক নববার্তা প্রসঙ্গ — ২৮/০৬/২০২৩ ইং 

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...