জোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মত একটি কৃষ্ণ গহ্বরের চিত্র ধারণ করেছেন যা দূরবর্তী এক ছায়াপথে অবস্থিত।
এটি ৪০ বিলিয়ন কিমি ব্যাপী বিস্তৃত এবং পৃথিবী থেকে তিন মিলিয়ন গুন বড় - এবং বিজ্ঞানীরা এটিকে "একটি দৈত্য" হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
কৃষ্ণ গহ্বরটি ৫০০ মিলিয়ন ট্রিলিয়ন কিমি দূরে অবস্থিত এবং বিশ্বব্যাপী সমন্বিত আটটি শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দ্বারা এটির চিত্র ধারণ করা হয়েছে।
যার বিশদ আজ প্রকাশিত হয়েছে এস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্সে।
ঘটনা দিগন্ত দূরবীক্ষণযন্ত্র বা ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ (ইএইচটি) দ্বারা এই চিত্র ধারণ করা হয়েছে, যা আটটি সংযুক্ত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের একটি সমন্বয়।
নেদারল্যান্ডসের রাডবউড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিনো ফ্যালক, যিনি এই গবেষণা প্রকল্পের প্রস্তাব দেন, তিনি বিবিসি নিউজকে জানান যে, কৃষ্ণ গহ্বরটি এমএইটিসেভেন নামক একটি ছায়াপথে পাওয়া গেছে।
তিনি আরো বলেন, "আমরা যেমনটি প্রত্যক্ষ করেছি, তা হল কৃষ্ণ গহ্বরটি আমাদের সমগ্র সৌরজগতের আকারের চেয়েও বড়"।
"এটি সূর্যের ৬.৫ বিলিয়ন গুন ভরবিশিষ্ট এবং যা আমরা মনে করি, এটি একটি অতিকায় দৈত্যাকৃতি অতিভরের কৃষ্ণ গহ্বরগুলির মধ্যে অন্যতম, মহাবিশ্বের অতিকায় দানবাকৃতি কৃষ্ণ গহ্বরগুলির মধ্যে অতিভরের দিক থেকেও শীর্ষে।"
প্রফেসর হিনো ফ্যালক বলেন, "আমাদের এখনও বুঝতে হবে কিভাবে সেখান থেকে আলোক নির্গত হয়"।
প্রফেসর ফ্যালক বর্ণনা করেন যে, "চিত্রটিতে দেখা যায় পুরোপুরি বৃত্তাকার গাঢ় অন্ধকার গর্তের চারপাশে একটি তীব্র উজ্জ্বল "আগুনের আংটি"র মত, যে ঔজ্জ্বল্য ফাকা গহ্বরের মধ্যে অধ:পতিত অতি উত্তপ্ত গ্যাস দ্বারা সৃষ্ট হয়। ছায়াপথের অন্যান্য নক্ষত্রগুলোর মিলিত ঔজ্জ্বল্যের তুলনায়ও আলোটি অত্যুজ্জ্বল - তাই পৃথিবী থেকে এতটা দূরত্ব হতেও এটিকে দেখা যেতে পারে।
গাঢ় অন্ধকার কেন্দ্রবিশিষ্ট বৃত্তের প্রান্তটি সেই বিন্দু যেখান হতে গ্যাসীয় বলয়টি কৃষ্ণ গহ্বরে প্রবেশ করে, যা এরূপ একটি বস্তু যার মধ্যে তীব্র মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বল বিদ্যমান রয়েছে, যেখান থেকে এমন কি কোন আলোও অবমুক্ত হতে পারে না।
ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডনের ড. জিরী ইউনিসি, যিনি এই দলবদ্ধ কর্মপ্রকল্প 'ইএইচটির' অংশ -তার মতে, "প্রকৃতপক্ষে ছবিটি তাত্বিক পদার্থবিদ এবং হলিউডের চিত্র পরিচালকদের কল্পিত কৃষ্ণ গহ্বরগুলোর মতই দেখতে"।
"যদিও এটি তুলনামূলকভাবে সাধারণ বস্তু, তবে কৃষ্ণ গহ্বরগুলো স্থান-কালের প্রকৃতি এবং এমনকি আমাদের অস্তিত্ব সম্পর্কেও কিছু অতি জটিল প্রশ্ন উত্থাপন করে।"
"এটা অসাধারণ যে আমরা যে চিত্রটি পর্যবেক্ষণ করেছি সেটা আমাদের তাত্ত্বিক গণনার সাথেও তুলনামূলকভাবে মিলে যায়। এ পর্যন্ত যা মনে হচ্ছে, আইনস্টাইন আবারও সঠিক"।
কিন্তু এই প্রথম চিত্রটি থাকার ফলে গবেষকরা রহস্যময় এই বস্তুর সম্পর্কে আরো জানতে সক্ষম হবেন। পদার্থবিজ্ঞানে যেমনটি আশা করা হচ্ছে, কৃষ্ণ গহ্বর হতে বেরিয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজতে তারা আগ্রহী হবে। যদিও গহ্বরের চারপাশে উজ্জ্বল রিং কিভাবে তৈরি হয় তা কেউ জানে না। এমনকি কোনও বস্তু কৃষ্ণ গহ্বরে পতিত হলে কী ঘটবে তা নিয়ে প্রশ্ন করা আরও বেশি উদ্দীপক।
একটি কৃষ্ণ গহ্বর কি?
কৃষ্ণ গহ্বর হলো এমন একটি স্থানিক অঞ্চল যা থেকে কিছুই, এমনকি অতি হালকা ভরের আলোও পালাতে পারেনা।
গহ্বর নাম সত্ত্বেও, সেটি মূলত ফাকা নয় বরং এর পরিবর্তে একটি ক্ষুদ্র অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণ ভরযুক্ত বস্তুর অতিসঙ্কুচিত অবস্থা, যা অতি মহাকর্ষীয় বলের সৃষ্টি করে।
ঘটনা দিগন্ত নামে কৃষ্ণ গহ্বরের বাইরে একটি অঞ্চল রয়েছে। এটি একটি "না ফেরার বিন্দু", যে বিন্দুর নিচে হতে কৃষ্ণ গহ্বরের অতি মহাকর্ষীয় প্রভাব এড়িয়ে কোনকিছু ফিরে আসা অসম্ভব।
অধ্যাপক ফ্যালক ১৯৯৩ সালে যখন পিএইচডি ছাত্র ছিলেন তখন তিনি প্রথম এই প্রকল্পের ধারণা দেন। সেই সময়ে কেউই ভাবতে পারেনি যে এমনটি সম্ভব হবে। তবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে কৃষ্ণ গহ্বরের অতি কাছাকাছি এবং পুরোপৃষ্ঠ জুড়েই একটি নির্দিষ্ট ধরনের বেতার তরঙ্গ নির্গমন হতে পারে, যা এতটাই শক্তিশালী হবে যে পৃথিবী হতে দূরবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারা শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
তিনি ১৯৭৩ সালে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র পড়ার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে, উচ্চ মাধ্যাকর্ষণ বল ক্রিয়াশীল থাকার কারণে কৃষ্ণ গহ্বরগুলো প্রকৃত আকৃতির চেয়ে ২.৫ গুণ বড় দেখাবে।
এই দুটি সম্ভাব্যতার কারণেই আপাতদৃষ্টিতে হঠাৎ মনে হয়েছিল অসম্ভবকে সম্ভব হিসেবে। ২০ বছর যাবৎ তার প্রকল্প অবকাঠামো বিতর্কের পর, অধ্যাপক ফ্যালকে এই প্রকল্পের জন্য ইউরোপীয় রিসার্চ কাউন্সিলকে সম্মত করাতে পেরেছিলেন। পূর্ব এশিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন এন্ড এজেন্সিস তখন ৪০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অর্থায়নের এই প্রকল্পের সাথে যোগ দেয়।
এটি এমন একটি বিনিয়োগ যা চিত্রটি প্রকাশনার সাথে সাথে সম্পাদিত হয়েছে। প্রফেসর ফ্যালকে আমাকে বলেছিলেন যে " মিশনটি সম্পন্ন হয়েছে"।
তিনি বললেন, "দীর্ঘ অভিযাত্রাটি সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু আমি নিজের চোখে এটা দেখতে চেয়েছিলাম। আমি জানতে চেয়েছিলাম, এটা কি বাস্তব'?
কোন একক দূরবীক্ষণ যন্ত্র কৃষ্ণ গহ্বরের চিত্র ধারণে যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। সুতরাং, এই ধরণের সবচেয়ে বড় পরীক্ষণে, হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অস্ট্রোফিজিকসের অধ্যাপক শেপার্ড ডলেলেম্যান আটটি সংযুক্ত টেলিস্কোপ নেটওয়ার্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি পরিচালনা করেছিলেন। একসঙ্গে, তারা ঘটনা দীগন্ত দূরবীক্ষণ যন্ত্র গঠন করে যা একটি গ্রহাকৃতি বিন্যস্ত বিন্যাস হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।
যার প্রতিটি যন্ত্র হাওয়াই এবং মেক্সিকো আগ্নেয়গিরি, অ্যারিজোনা পর্বতমালা এবং স্প্যানিশ সিয়েরা নেভাদা, চিলির আতাকামা মরুভূমিতে এবং আন্টার্কটিকার আগ্নেয়গিরিসহ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন স্থানের উচ্চতায় স্থাপন করা হয়।
২০০ বিজ্ঞানীদের একটি দল এমএইটিসেভেন ছায়াপথের দিকে সংযুক্ত দূরবীক্ষণ যন্ত্রগুলোকে মুখ করে এবং ১০ দিন ব্যাপী এটির কেন্দ্রকে স্ক্যান করে।
তাদের সংগৃহীত তথ্য এতটাই বিশাল ছিল যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাঠানো সম্ভব ছিল না। এর পরিবর্তে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন, জার্মানির বোনের প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে সংগৃহীত তথ্য শত-শত হার্ড ড্রাইভে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। অধ্যাপক ডেলিম্যান এই অর্জনকে "অসাধারণ বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব" বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, "আমরা একটি প্রজন্ম আগেই অসম্ভব হতে অনুমিত এমন কিছু অর্জন করেছি"।
"এটা প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিরাট সাফল্য অর্জন, বিশ্বের সেরা রেডিও পর্যবেক্ষণকারী এবং নতুন গাণিতিক উদ্ভাবনী পরিভাষিকগণ কৃষ্ণ গহ্বরগুলো সম্পর্কে সামগ্রীকভাবে একটি নতুন বাতায়ন খুলতে একত্রিত হয়েছিল।"
দলটি আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ, মিল্কি ওয়ের কেন্দ্রে অবস্থিত অতিভারী কৃষ্ণ গহ্বরের চিত্র ধারণ করছে।
যদিও এটি শুনতে অদ্ভুত মনে হতে পারে, তবে ৫৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের ছায়াপথের একটি ছবি ধারণ করার তুলনায়ও এটি ছিল কঠিনতর। কারণ, কিছু অজ্ঞাত কারণের জন্য, আকাশগঙ্গা ছায়াপথের অভ্যন্তরে কৃষ্ণ গহ্বরের চারপাশের "আগুনের আংটিটি" যথা ক্ষুদ্র এবং ম্রিয়মাণ থাকায়।
-পল্লব ঘোষ
বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক, বিবিসি নিউজ
No comments:
Post a Comment