প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,
চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য
কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।--- সুভাষ মুখোপাধ্যায়
আসলে কোন কোন আপ্তবাক্য খুব স্বল্প সময়ে তার জনপ্রিয়তা অর্জন করে ফেলে। যেমন এখন একটা কথা মানুষের মুখে মুখে, 'মোদী হ্যা তো মুমকিন হ্যা'! যদি এর মূল্যায়ন করা হয় তাহলে অক্ষরে অক্ষরে সঠিক। যেমন নোটবন্দী,জিএসটি বিল, তাৎক্ষণিক তালাক, আর ঐতিহাসিক কাশ্মীরে ধারা ৩৭০ ও ৩৫-ক ধারা বিলোপ। তাহলে কাশ্মীর কি স্বাধীন হয়ে গেল?
“WE, THE PEOPLE OF INDIA, having solemnly resolved to constitute India into a 1 [SOVEREIGN SOCIALIST SECULAR DEMOCRATIC REPUBLIC] and to secure to all its citizens: JUSTICE, social, economic and political; LIBERTY of thought, expression, belief, faith and worship; EQUALITY of status and of opportunity; and to promote among them all FRATERNITY assuring the dignity of the individual and the 2 [unity and integrity of the Nation];”
ভারতের তথাকথিত ‘মহান’ সংবিধানের প্রস্তাবনাতে এই কথাগুলো বেশ ধাপের সাথে উল্লেখ করা আছে। যার সবটুকু যৌক্তিকতা গতকালের সংসদে মনে হয় চিরকালের মতো হারিয়ে গেলো। এই রাষ্ট্রে আজ ‘ন্যায়’, ‘স্বাধীনতা’, ‘সমতা’ ও ‘সমধর্মিতা’ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো হারিয়ে গিয়ে কেমন এক উপহাসের দলিল তৈরী হয়ে গেলো, যেখানে রাষ্ট্র শুধুই বাহুবলের ঘৃণ্য ইতিহাস তৈরী করে। সামরিক শক্তির বুটের তলায় একটা গোটা রাজ্য ও তার জনগণের আশা-আকাঙ্খাকে পিষে ফেলার আজন্মলালিত পরিকল্পনার যে বাস্তবায়ন আজ বিজেপি ও তার সহযোগীরা করলো, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে চলেছে, শুধু কাশ্মীরেই নয়, সারা দেশে এবং অবশ্যই এই উপমহাদেশে।
৩৭০ ধারা বা ৩৫-এ বাতিল মানে শুধুমাত্র কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ছিনিয়ে নেওয়া নয়, সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপরেই কুঠারাঘাত। অদ্ভুৎ সব পরস্পরবিরোধী যুক্তি হাজির করা হচ্ছে; ৩৭০ ধারা যদি ‘অগণতান্ত্রিক’ হয়, তাহলে কোন যুক্তিতে ৩৭১-এ বলে নাগাল্যাণ্ড, ৩৭১-বি বলে আসাম, ৩৭১-সি বলে মণিপুর প্রভৃতি রাজ্যগুলির বিশেষ মর্যাদা বহাল রাখা হয়? সাধারণ যুক্তি অনুসারে প্রতিভাত হয়, কাশ্মীরে বিজেপি-র এই আক্রমণের কারণ হলো, রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। ভারতের ইতিহাস দেখেছে, বিভিন্ন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর একটা পর্যায়ের পরে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা পাওয়া; যেমন হয়েছে পণ্ডিচেরি বা গোয়ার ক্ষেত্রে। এই প্রথম একটা ‘রাজ্য’কে ভেঙ্গে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে দেওয়া হলো! একদিকে লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত ঘোষণা করার বেলায়, সেখানকার মানুষের ‘দীর্ঘদিনের দাবী’ ও ‘আকাঙ্খা’র কথা গদগদ কণ্ঠে উল্লেখ করা হলো, আর অন্যদিকে, কাশ্মীরিদের দীর্ঘদিনের দাবী ও আকাঙ্খাকে অস্বীকার করাই শুধু নয়, বুটের তলায় পিষে ফেলাটাই নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
কি অদ্ভুৎ বৈপরীত্য! একই রাষ্ট্রের, একই সরকারের এমন দ্বিচারিতা পৃথিবীর ইতিহাসেই বিরল। বিজেপি নেতা-কর্মী তাদের মন্ত্রী-সান্ত্রীরাও একসাথে হুক্কারবে বলে চলেছে, ৩৭০ ধারা আসলে এক ‘অস্থায়ী’ বা ‘সাময়িক’ ধারা, যাকে বাদ দেওয়াটা নাকি সময়ের দাবী! এই মর্কট-তনয়রা জানেনা; সুপ্রীম কোর্টে পাঁচজন বিচারকের বেঞ্চ ১০ই অক্টবর ১৯৬৮ সালে, ‘সম্পত প্রকাশ বনাম জম্মু ও কাশ্মীর সরকার’ কেসে এক ঐতিহাসিক রায়ে ৩৭০ ধারা বহাল থাকার পক্ষে রায় দেন, ২০১৭ সালে সুপ্রীম কোর্ট ‘এসবিআই বনাম সন্তোষ গুপ্তা’ কেসেও ঐ ‘অস্থায়ী’ বা ‘সাময়িক’ নয়, ৩৭০ ধারাকে ‘স্থায়ী’ বলে অভিহিত করে। এমনকি, ২০১৮ সালেও জনৈকা বিজয়লক্ষ্মী ঝা-র আবেদনের ভিত্তিতে, বিচারক আর. এফ. নরিম্যান ও এ. কে. গোয়েল-র বেঞ্চ ৩৭০ ধারাকে ‘স্থায়ী’ চরিত্রের বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু ‘চোর না শোনে ধর্মের কাহিনী’, বিজেপিই বা কবে আর গণতন্ত্র বা মানবিকতার তোয়াক্কা করেছে?!
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে বলছেন, এই ৩৭০ ধারা বাতিল নাকি সেখানে শান্তি ও স্বাভাবিক অবস্থা ফেরানোর লক্ষ্যে! তাই যদি হবে তাহলে ৭ লক্ষ সামরিক বা আধা-সামরিক বাহিনী দিয়ে সারা কাশ্মীর উপত্যকাকে এক মৃত্যু উপত্যকা বানানোর পরিকল্পনা কেন? মেহবুবা মুফতি, ওমর আবদুল্লারা কী অপরাধ করেছিলেন যে তাঁদের প্রথমে গৃহবন্দি তারপর গ্রেফতার করা হল? ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা বিলোপ করতে জম্মু কাশ্মীর বিধানসভার অনুমোদনের সংস্থান ছিল সংবিধানে। এই মুহূর্তে সেখানে রাষ্ট্রপতি শাসন। তো বিধানসভা নির্বাচনের পর কেন ওই দুটি ধারা বিলোপের কথা ভাবল না সরকার? মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে গলা টিপে মারার কিসের এতো তোড়জোড়?
এতদিন অন্য কোনো রাজ্যের বাসিন্দা জম্মু কাশ্মীরে ইচ্ছেমতো জমি কিনতে পারত না। কিনতে হলে ওখানে টানা ১০ বছর থাকতে হত। সরকারের বক্তব্য, এই নিয়মের ফলে সেখানে বেসরকারি শিল্পপতিরা ব্যাবসা করতে পারেননি। জম্মু কাশ্মীরের উন্নয়ন তাই থমকে গেছে। সরকারের যুক্তি অকাট্য। কিন্তু কথা হল, উত্তর-পূর্বের সব রাজ্যেই কোনো-না-কোনো অংশ আছে, যেখানে ওই সম্প্রদায়ের বাইরের কেউ জমি কিনতে পারে না। মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশে বিশেষ পাস ছাড়া প্রবেশই করা যায় না। সত্যি কথা বলতে কী, শুধু জম্মু কাশ্মীর নয়, ভারতের ১১টি রাজ্যে ওই নিয়ম চালু আছে যে অন্য রাজ্যের বাসিন্দারা জমি কিনতে পারবেন না। তো কথা হল, কেন্দ্রীয় সরকার সেসব রাজ্য নিয়ে কী ভাবছে? জম্মু কাশ্মীরের ছিল নিজস্ব পতাকা। আজ নিষিদ্ধ হল। অসমের রয়েছে নিজস্ব ‘জাতীয় সংগীত’। হ্যাঁ, ‘ও মোর আপোনার দেশ’ গানটিকে অসমে ‘জাতীয় সংগীত’ বলেই উল্লেখ করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকার এব্যাপারে কী ভাবছে? এভাবে যদি কোনো রাজ্যকে একদিনে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা যায় তাহলে তো কোথাও সরকার-বিরোধী আন্দোলনই হবে না। ইন্দিরা গান্ধী একসময় বেশ কয়েকটি রাজ্য সরকারকে বরখাস্ত করে রাষ্ট্রপতি শাসন লাগু করেছিলেন। একলপ্তে প্রায় দুবছর জরুরি অবস্থারও সাক্ষী আমরা। কিন্তু সেই চরম ফ্যাসিস্ট ইন্দিরাও কোনো রাজ্যের মর্যাদা ছেঁটে ফেলেননি। এবার যদি পশ্চিমবঙ্গ থেকে দার্জিলিং, অসম থেকে বরাক উপত্যকা কিংবা বড়োল্যান্ড, মহারাষ্ট্রের বিদর্ভকে কেন্দ্রীয় সরকার কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করে, নিঃশ্চয় আমরা খুব বেশি আনন্দিত হবো!
অতএব মানুষের ফোকাস কাশ্মীরে নিয়ে চলো, ভুয়ো জাতীয়তবাদের হিড়িক তোল, হিন্দু-মুসলিম বৈরিতা উসকে দাও। মানুষ মূল সমস্যা থেকে সরে যাবে, এটাই কি বর্তমান পরিবর্তনকামী সরকারের মূল মন্ত্র তা বোধহয় কারো বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। কয়েকটি পরিবর্তনের নমুনা রইল---
১) আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় মুদ্রার দাম কমছে তো কমছেই। আজ ১ ডলার = ৭০.২০ টাকা।
২)ভারতবর্ষের ৪১টি রাষ্ট্রীয় অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি ১৬টি সহযোগী সংস্থা বেসরকারী হাতে যাচ্ছে।
৩) বিশ্ব অর্থনীতিতে সপ্তম স্থনে নেমে গেলো ভারত।
৪) মাত্র ক’দিন আগেই রেলমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, রেলে ৩ লক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই হবে। পরে সংসদে এই নিয়ে ঝড় ওঠায় তা স্থগিত হয়, কিন্তু কর্মীদের অবসরের বয়স ৬০ থেকে কমে ৫৫ করার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়। পরোক্ষে আগামী ৫ বছরে রেলে প্রায় তিন থেকে চার লক্ষ পদ শূন্য হয়ে যাবে।
৫) কিছুদিন আগে আসামের দুটি লাভজনক পেপার-মিল বন্ধ করে দেওয়া হলো।
৬)ভারতবর্ষের ১৪টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মধ্যে ৫টি বিমানবন্দর, নরেন্দ্র মোদীর স্নেহধন্য গৌতম আদানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, বাকিগুলোও সব বেসরকারী হাতে চলে যাবে।
এক সংবিধান, এক আইন বা একই সরকারের দ্বারা দেশের অন্য রাজ্য এবং কাশ্মীরের মধ্যে এমত দ্বিচারিতা কেন? কাশ্মীরের মানুষের ইচ্ছে বা দাবীকে আমল না দেওয়া, গণভোটের প্রশ্নটিকে এড়িয়ে গিয়ে শুধুই পীড়নের কামানের চাকায় ধর্ষিতা কেন কাশ্মীর? বহু রক্তস্নাত কাশ্মীর, বহু সন্তান-হারা কাশ্মীর, কুনান পোষপোড়ার আতঙ্কের কাশ্মীর; সেখানে এখন আরও মারণ-খেলায় মাতবে ভারত সরকার। উল্লসিত সংঘ পরিবার, কিছু না জেনেই বা অজ্ঞতাহেতু এক বিশাল অংশের মানুষ আজ উন্মত্ত, উল্লাসমুখর হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মোদী-শাহকে ভগবান বানাতে উদ্যত! লোকসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতে আসার পর প্রথম অধিবেশনে যেভাবে বিভিন্ন বিল পাস করানো হল, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে সরকারের নির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা, কেউ এজেন্ডা বলতে পারেন, আছে।
কিন্তু আজ শুভবোধের পরীক্ষা, গণতান্ত্রিক চেতনার সাহস দেখানোর দিন; এই উল্লাসের মাঝে ‘সত্য’কে তুলে ধরার, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর হিম্মতই পারে, এই গণহিস্টিরিয়া ও তার নির্মাণকারীদের সামনে বাধার পাঁচিল তুলতে, ভাঙ্গতে পারে শাসকের উত্তুঙ্গ দম্ভকে। বাংলায় আজ সংঘিরা লাড্ডু বিলিয়েছে, মানুষ পক্ষ নিচ্ছে। এরপরেও যদি কেউ ফ্যাসিজমের পদধ্বনি শুনতে ব্যর্থ হন, তাহলে বধিরতার চিকিৎসা করান। বিরুদ্ধ-স্বরের বিচ্ছিন্নতা বিপদকে আটকাতে অক্ষম – এ কথা হৃদয়ঙ্গম না হলে, আগামীদিনে নিজের ওপর আক্রমণ সামলানো অসম্ভব হবে। আক্রমণের সামনে প্রতিরোধ গড়তে হলে, এ কথার সপক্ষে সাক্ষী দেয় আমাদের গৌরবের ইতিহাস। আজ কাশ্মীরের জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো মানে, কাল নিজের স্বাধীনতার যুদ্ধকেই শক্তিশালী করা।সংখ্যা সরকার পক্ষের দিকে, আইনের ফাঁকফোঁকর সরকার পক্ষের দিকে, মিডিয়া সরকার পক্ষের দিকে, কিন্তু এরপরও তো একটা বিষয় থাকে – ঔচিত্য। প্রপ্রাইটি। সেটা সরকার পক্ষের দিকে আছে কি?
শতাব্দীলাঞ্ছিত আর্তের কান্না
প্রতি নিঃশ্বাসে আনে লজ্জা;
মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা, আর না –
পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা। --- সুভাষ মুখোপাধ্যায়
No comments:
Post a Comment