যাইহোক অবশেষে দক্ষযজ্ঞ শেষ হলো। এতদিন মুসলিম মহিলাদের সুরক্ষার ব্যাপারে যে লুকোচুরি চলছিল তার ইতিটানা হলো। মুখে আর বুকে আত্মহংকারের খুশি সবদিকে গদগদ করে বাড়ছে। যেন মোদীই সব পারে অর্থাৎ মোদী ম্যাজিক। বাকিরা সব টাইটাই ফিস। এই বিল নিয়ে যত জল্পনা কল্পনা। তো কী দেশোদ্ধার হলো এই বিল নিয়ে? যে বিলটা পাশ করানো হলো তা "তাৎক্ষণিক তালাক বিল"। কিন্তু প্রচার করা হচ্ছে তিন তালাক বিল। যেন "আজব দেশকি গজব কাহানি"।
তালাক, তালাক,তালাক অর্থাৎ এককথায় ইন্সটেন্ট তালাক। তিনবার বললেই এখন আইনত অপরাধ। এরজন্য সত্যিই মোদীজির অক্লান্ত পরিশ্রম, সফল হয়েছে। যদিও শাহবানু বা এর কয়েক দশক পর সায়রাবানুরা সুপ্রিম কোর্টের কড়া না নাড়লে হয়তো এই সুযোগটুকু আসতো না। আজ দেশের পক্ষে এক ঐতিহাসিক দিন। দীর্ঘ পাঁচঘন্টার আলোচনা ও ভোটাভুটি পর্ব শেষে ৩০ জুলাই,২০১৯ ইং রাজ্যসভায় পাশ হয়ে গিয়েছে "Muslim Women (Protection of Right on Marriage) Bill,2019" তথা তিন তালাক বিল। বিরোধীদের প্রবল আপত্তির মাঝেই ৯৯-৮৪ ভোটে পাশ হয়ে গিয়েছে এই বিল। যার জেরে তাৎক্ষণিক তালাক ভারতীয় আইনে একটি ফৌজদারী অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। যদিও ২৫ জুলাই লোকসভায় ৩০৩-৮২ ভোটে পাশ হয়েছিল বিলটি।
এই বিলের সুবিধাগুলো এবার জেনে নেই--
_____________________________________
এই বিলের ক্লস '৩' অনুযায়ী, লিখিত বা বৈদ্যতিন মাধ্যমে তাৎক্ষণিক তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ (তালাক-ই-বিদাত) অবৈধ। তাৎক্ষণিক তিন তালাক একটি ফৌজদারী অপরাধ যার ফলে তিন বছরের জেল ও জরিমানা হতে পারে। মুসলিম স্বামী কর্তৃক তাঁর স্ত্রীর উপর মৌখিক, লিখিত, ও বৈদ্যুতিন তাৎক্ষণিক তালাক জ থেকে অবৈধ।
যে মুসলিম মহিলাকে তাঁর স্বামী এই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় তালাক দিয়েছেন তিনি তাঁর বিচ্ছিন্না স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য ম্যাজিষ্ট্রেটের নির্ধারিত খোরপোষ দিতে বাধ্য থাকবেন। এছাড়া নাবালক সন্তানদের হেফাজতে রাখার অধিকারও পাবেন স্ত্রী। Code of Criminal Procedure,1973 এর আইনের পাশাপাশি ধার্য হবে এই আইনও। একমাত্র ম্যাজিষ্ট্রেটের সম্মতিতে ধার্য হবে বিবাহ বিচ্ছেদ। তাৎক্ষণিক তিন তালাকের অভিযোগ নিতে বাধ্য কর্তব্যরত পুলিশও। যতক্ষণনা ম্যাজিষ্ট্রেট ও অভিযোগকারীণির বয়ান শোনা হচ্ছে, তাৎক্ষণিক তিন তালাকে অভিযুক্ত জামিন পাবেনা। বয়ান শোনার পর সন্তোষজনক ভিত্তিতে জামিন পেতে পারেন অভিযুক্ত।
ইসলামের দৃষ্টিতে তালাক ও তালাক-ই-বিদাত---
-------------------------------------------------------------
বিবাহ যতদিন পর্যন্ত থাকবে ততদিন বিবাহ বিচ্ছেদও থাকবে। কারণ যোগ থাকলে তো বিয়োগের ও স্থান আছে। এটাই তো ধরণ। কারোর কী কোন ক্ষমতা আছে স্বামী স্ত্রীকে জোরকরে সংসার করানোর। মোদীজি কেন ট্রাম্প বাবাজি আসলেও কাজ হবেনা। দাম্পত্য কলহ চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছনো মানে বিবাহ বিচ্ছেদ।
জীবনের চুড়ান্ত বিপর্যয় থেকে স্বামী স্ত্রী উভয়কে রক্ষার জন্য ইসলামে তালাকের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যখন চরমভাবে বিরোধ দেখা দেয়,পরস্পর মিলেমিশে স্বামী স্ত্রী হিসেবে শান্তিপূর্ণ ও মাধুর্য মণ্ডিত জীবন যাপন যখন একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, পারস্পরিক সম্পর্ক যখন হয়ে পড়ে তিক্ত, বিষাক্ত, একজনের মন যখন অপরজন থেকে এমন ভাবে বিমুখ হয়ে যায় যে,তাদের শুভ মিলনের আর কোন সম্ভাবনাই থাকছে না, ঠিক তখনই এই চুড়ান্ত পন্থা(তালাক) অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ইসলামে।তালাক হচ্ছে নিরুপায়ের উপায়। স্বামী স্ত্রী পরস্পরকে বেঁধে রাখার শেষ চেষ্টাও যখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় তখনই তালাক একমাত্র সঠিক রাস্তা।
তালাকের প্রকার--
১) আহসান বা সর্বোত্তম তালাক, ২) হাসান বা উত্তম তালাক, ৩) বিদাত বা শরিয়া বিরুদ্ধ তালাক।
চলুন তাহলে তিন তালাক বিলের 'ক্লস-৩' অনুযায়ী তালাক-ই-বিদাত সম্পর্কে দু-চারটা কথা বলা যাক। তালাক-ই-বিদাত হলো একসাথে তিন তালাক দেওয়া বা যাকে আমরা ইন্সটেন্ট তালাক বলি। লিখিত, বৈদ্যুতিন, বা দুই-তিনজন সাক্ষী দাতার সামনে স্বাক্ষর করলেই তালাক হয়ে যায়। এমন ধরণের প্রকাশ্য তালাককে বিদায়ীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং যারা এধরণের তালাক অনুষ্টিত করে থাকেন তারা সবাই গুনাহগার হবেন। এভাবেই তৈরী ইসলামী শরীয়াহ আইন।
আজকের ভারতে এই বিল সংশোধন খুবই জরুরী এবং অত্যাবশ্যক। কারণ এরজন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল শায়রা বানুকে। তিনি প্রথম নারী যিনি তাঁর মৌলিক অধিকারের দাবিতে ব্যক্তিগত আইনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ছিলেন। তাঁর ১৫ বছরের বিবাহিত জীবনে তাকে বারবার গর্ভপাত ঘটাতে বাধ্য করা হয়েছে। সাধারণ সাক্ষীতে তাকে তালাক দেওয়া হয়। এই সেই শায়রা বানু যে অত্যন্ত সাহসীকতার সাথে এই ইন্সটেন্ট তালাকের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেন।
যদিও মোদী সরকার এই বিলে ইন্সটেন্ট তালাক প্রথা বন্ধ করেছে। এরজন্য গত উনিশ মাসে মোট তিনবার তারা লোকসভা থেকে এই বিলের ছাড়পত্র আদায় করে নেয়। কিন্তু রাজ্যসভায় বিজেপি বা তার সহযোগী সংখ্যাগরিষ্টতা না থাকায় বারবার আটকে যায় বিলটি। তবে এবার তারা এই বিল অর্থাৎ 'মুসলিম মহিলা (বিবাহ অধিকার সংরক্ষণ) বিল ২০১৯, পাস করিয়ে নিলো।
বেশতো এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে মোদী সরকার। কিন্তু এখানেই আম জনতার কাছে ভুল ম্যাসেজ পাঠানো হচ্ছে মিডিয়া থেকে শুরু করে সরকার পক্ষ থেকেও। যে তিন তালাক বিল এবার অবৈধ। দৈনিক পত্রিকাগুলোর হেডলাইনে বড় বড় হরফে লিখা হচ্ছে। যেহেতু ইসলামী শরীয়াহ আইনে বিবাহ একটি চুক্তি, তো ভারতীয় আইনেও ইসলামী শরীয়াহ আইন অনুযায়ী যে তালাকের কথা উল্লেখ আছে সেটা অবৈধ হয় নাই। বলে রাখা ভালো, শুধু মৌখিক, লিখিত, এস এম এস, হোয়াটসআপ, অন্যকোনো বৈদ্যতিন মাধ্যম বা ইন্সটেন্ট তিনবার তালাক বলা এইসব এখন থেকে অবৈধ।
তিন তালাক বৈধ। এই বিলে মুসলমানদের তালাকের বৈধতায় কোন ধাক্কা খায়নি। আর তাৎক্ষণিক তালাক, ওটাতো এমনিতেই ইসলামে বিদাত বা অবৈধ। তো সরকার এটাকে কী অবৈধ আর নিষেধ করবে। কিন্তু মজার ব্যপার হলো এই তালাক নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষ তাস খেলে ফেললো। আর তার সাথে সরকার এই ক'জন মহিলাদের প্রতি মুহ্যমান হয়ে পড়লো। আইনত বিবাহ বিচ্ছেদ হয়নি অথচ স্বামী স্বীকার করছে না এমন মহিলার সংখ্যা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও কম নয়। আর যদি বিবাহ বিচ্ছেদের কথা বলি তবে মুসলিম সমাজ থেকে হিন্দু সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদ অনেক গুণ বেশি, ২০১১ সালের জনগণনা রিপোর্টমতে।
প্রশ্ন হলো,তাৎক্ষণিক তালাক বিল যে পাশ হলো তাতে মুসলমানদের কি আর এলো গেলো। এই তালাক তো ইসলামে আগে থেকেই নিষিদ্ধ। শুধু শুধু ঠোঁটে ওঠা ছাড়া আর কিছু নয়। এইতো যদি মুসলিম সমাজ ও মুসলিম নারীদের উন্নয়নের কথা সরকার পক্ষ থেকে শুনা যায় তবে একটা কাজ তো নিঃশ্চয়ই করা যায়- স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সমানাধিকার, কর্মসংস্থান, এইসব সেক্টরে রাজেন্দ্র সাচার কমিটি ০৫, যে সুপারিশগুলো দিয়েছিল সংখ্যালঘু উন্নয়নের জন্য এই কাজগুলো করা যাক। কী বলেন!
No comments:
Post a Comment