Thursday, February 28, 2019

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস প্রসঙ্গে

৷৷ মানুষের জন্য বিজ্ঞান ও মানুষ বিজ্ঞানের জন্য ৷৷

স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, "যে ঈশ্বর নিজের নিয়ম বদলাতে পারেন না, তাঁকে মানি না।" আজ জাতীয় বিজ্ঞান দিবস (National Science Day)। অধ্যাপক সি ভি রমন এর নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্তি উপলক্ষে প্রতিবছর ২৮শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে জাতীয় বিজ্ঞান দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয় সারা দেশ জুড়ে। প্রতিবছরই এই দিনটির একটি প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে। ২০১৯ এর প্রতিপাদ্য বিষয় "Science for People and People for Science" অর্থাৎ "বিজ্ঞানের জন্যে মানুষ এবং মানুষের জন্যে বিজ্ঞান"।

১৯৮৭ সাল থেকে সারা ভারতে মহাউৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে জাতীয় বিজ্ঞান দিবস পালিত হয়ে আসছে। ভারতীয় উপমহাদেশের যে কোনও বিজ্ঞান-শিক্ষার্থীই স্যার চন্দ্রশেখর ভেঙ্কটরমন বা সি ভি রমনের নাম শুনেছেন। তাঁর আবিষ্কৃত ‘রমন এফেক্ট' বা ‘রমন-প্রভাব’ পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এক আশ্চর্য মাইলফলক হয়ে আছে ১৯২৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে --- যে দিন এই আবিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়েছিল। রমন-প্রভাব আবিষ্কারের জন্য সি ভি রমন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ১৯৩০ সালে। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশ নয়, সমগ্র এশিয়ার মধ্যে তিনিই হলেন বিজ্ঞানে প্রথম নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী। তাঁর নোবেল-বিজয়ী গবেষণার সব টুকুই সম্পন্ন হয়েছিল কলকাতার ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্স’-এর ছোট্ট একটা গবেষণাগারে। রমন এফেক্ট আলোক তরঙ্গের অজানা পথ খুলে দিয়েছে। শক্তির স্তর এবং অণু ও পরমাণুর গঠন বুঝতে অনেক সহায়তা করেছে। পদার্থবিজ্ঞানের অনেক শাখায় রমন এফেক্ট কাজে লাগছে। জীববিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞানেরও অনেক শাখায় রমন এফেক্ট কাজে লাগিয়ে অনেক নতুন নতুন গবেষণা হচ্ছে।                                                                                   
এই দিনের উদ্দেশ্য বিজ্ঞানের প্রসার। কিন্তু বিজ্ঞানমনস্কতা বাদ দিয়ে বিজ্ঞানের প্রসারের অর্থ কী?
সরকারি, বেসরকারি নানা সংগঠন বিজ্ঞানের প্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ সংগঠনই ধরি মাছ না ছুঁই পানি মনোভাব নিয়ে কাজ করছে।  প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলছে বিজ্ঞানের অপব‍্যাখ‍্যা। জ‍্যোতিষ শাস্ত্র থেকে শুরু করে নানা ধরণের কুসংস্কার এবং ধর্মীয় অন্ধতা আঁকড়ে বেঁচে আছি আমরা, বৃহত্তর ভারতবাসী। আমরা বিজ্ঞানকে শুধু ফিজিক্স বা ক‍্যামিষ্ট্রির ল‍্যাবেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছি। এরবাইরে তার প্রচার প্রসার নিয়ে আমরা চরম উদাসীন।

গত জানুয়ারীর "ন্যাশনাল সাইন্স কংগ্রেসের" কথা মনে আছে নিশ্চয়? ভাইস চেন্সেলার নাগেশ্বর রাও বলেছিলেন "মহাভারতের কৌরবরা সেই যুগের টেস্ট টিউব বেবি", "রাবনের ২৪ টা এয়ারক্রাফ্ট ছিল", এমনকি ডারউইনের থিওরি অব্দি চ্যালেঞ্জ করেন তিনি তার ভাষণে। ইন্ডিয়ান সাইন্স কংগ্রেসের মতো একটি সংস্থায় যদি মাইথোলজি এবং বিজ্ঞানের মা-মাসি এইভাবে গুলিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে ভারতে বিজ্ঞানচেতনা এবং বিজ্ঞানমনস্কতা সত্যিই হুমকির মুখে। আরো অন্ধকার এক যুগ অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্যে।

ভাঙড়ের মতো ঘটনায় প্রায় সবারই মুখে কুলুপ। জল জংগল জমি বাঁচানোর জন্য যখন সবচেয়ে জোরালো গলায় কথা বলা উচিত বিজ্ঞানবিদ, কর্মীদের ;  যুক্তি, বিজ্ঞান, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা বহুত্ববাদী মানবতাকে সুরক্ষিত রাখতে যখন তীব্রভাবে আঘাত করা দরকার সবধরনের ধর্মীয় মৌলবাদকে, তখন সব বিতর্কের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে নিরাপদ দূরত্ব থেকে গায়ে প্রগতির নামাবলি চাপিয়ে যুক্তি, পরিবেশ, বিজ্ঞানের নামসঙ্কীর্তন চলছে দেশ জুড়ে। কেউ কেউ আবার বিজ্ঞান আন্দোলনের সীমা-পরিসীমার প্রসংগ তুলে বলেন, "আমরা বিজ্ঞানে আছি, রাজনীতিতে নেই"। প্রশ্ন জাগে, রাজনীতি ছাড়া কি বিজ্ঞান হয়? আদৌ কোনো আন্দোলনই কি হয়?

বিজ্ঞান তো আলোর দিশারী। অন্ধকার যুগ থেকে এই আলোর যুগে  বিজ্ঞানের হাত ধরেই তো আমরা এসেছি। প্রতিনিয়ত সংগ্রহ করেছি  জীবন ধারণ এবং গড়ার মন্ত্র। বিজ্ঞান ই তো আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে সত‍্য ও মিথ‍্যার ফারাক যুক্তি ও সঠিক প্রমাণের মাধ্যমে। তা না হলে আজও আমরা সূর্যকে পৃথিবীর চারদিকে ঘোরাতে থাকতাম। চিকিৎসা শাস্ত্র থেকে অর্থনীতি, সমাজ বিজ্ঞান থেকে রাজনীতি সবক্ষেত্র ই বিজ্ঞান ছাড়া পঙ্গু। অচল। আগুন ও চাকার মাধ্যমে বিজ্ঞানের জয়যাত্রার লালফিতা কাটা হয়, কিন্তু আজও গ্রহণযোগ্যতার দিকে আমরা পিছিয়ে। আজও আমরা জড়িয়ে আছি পুরোনো অযৌক্তিক নীতিমালার মধ্যে।

আজ ৩২তম জাতীয় বিজ্ঞান দিবস। অন্যান্য বারের মতই এবছরও নিয়ম করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পালিত হচ্ছে আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব বিজ্ঞান দিবস।   কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলো কতটা বিজ্ঞানের প্রচার প্রসারের জন্য এবং কতটা জনগনকে বিজ্ঞানমনস্ক করার জন্য হচ্ছে সেটা ভাবা ভীষন জরুরী।  কান পাতুন, এবছরের "জাতীয় বিজ্ঞান দিবস" কিন্তু একথাই ভাবিয়ে গেল  আপনাকে, আমাকে।

[তথ্যসহায়তা : উইকিপিডিয়া, নিউজ জার্নাল]

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...