চরিত্রে-
সেলিনা -- ১০/১১ বছরের মেয়ে। ক্লাস ফাইবে পড়ে।
গৈরিকা -- সে ও একই বয়সের। একই ক্লাসে।
কবির -- ১৩-১৪ বছরের ছেলে। মেট্রিকের ছাত্র।
( ইংরেজি বিদ্যালয়ের এরা ছাত্র-ছাত্রী। তিনজন একই স্কুলে পড়ে। তাই তিনজনের আগের থেকেই পরিচয়। স্কুলে টিফিনের সময় সেলিনা লাইব্রেরি থেকে হারমোনিয়াম এনে "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো" গানটি গলায় তুলবে। গান টা শুনে পাশদিয়ে যাওয়া কবির থেমে যায়। শ্রেণী কক্ষে প্রবেশ করে সেলিনার সাথে মাথা নাড়িয়ে গুনগুন করবে। পাশের টেবিলে গৈরিকা ইংরেজি বইটা পড়তে থাকবে। টিফিনের পরে মেডাম আসবেন। তাই রিভাইস দিচ্ছে। একটু জোরে পড়বে। )
সেলিনা--- হু হু হু হু হু.... " আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমিকি ভুলিতে পারি( গলা ঠিক করবে) সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজিয়ে)
কবির-- এই সেলিনা, বাহ্ দারুণ তো! গেয়ে যা। আমি তাল দিচ্ছি।
সেলিনা-- আরে কবির দা যে, এসো এসো। গানটা প্রক্টিস করছি। বিকেলে একটা অনুষ্ঠান আছে।। একটু দেখিয়ে দিও।
কবির--- হ্যাঁ রে। আমি তো ভুলেই গেছি আজ যে একুশে ফেব্রুয়ারি। ঠিক আছে ঠিক আছে। গান টা গা তো। এই গান শুনলেই নিজেকে আর সামলে রাখতে পারি না , বুঝলি।
সেলিনা-- ঠিক আছে কবির দা। তুমি একটু দেখিয়ে দিও।(আবার শুরু)
" আমার ভাইয়ের রক্তে...." (সাথে কবির ও তাল দিচ্ছে)
গৈরিকা--- আরে বাবা, তোরা একটু আস্তে করবি! কেনো ডিসটার্ব দিচ্ছো। পিসফুলি কোন একটা জায়গায় থাকতে পরিনা।
সেলিনা--- কি হয়েছে রে? কি ডিসটার্ব দিচ্ছি। এখন টিফিনের সময়। অসুবিধা হবে কেন।?
গৈরিকা--- বুঝতে পারছিস না কেনো অসুবিধা হচ্ছে। একটু পরেই মেম আসবেন তখন বুঝবি। আর কি এসব গান। কোত্থেকে পেয়েছিস?
সেলিনা--- আরে.....! বলিস কি রে। এই গান তুই জানিস না! এতো আমাদের গর্ব, আমাদের ঐতিহ্য।
গৈরিকা--- হা--হা---হা ( হাসতে হাসতে বলবে)
একথা তুই বলছিস! এই গান ঐতিহ্য, গর্ব। তোর মুখে এসব শোভা পায়! নেহা কক্কর কে তো একদম গুলিয়ে নিয়েছিস। আজ আবার কোত্থেকে বাঙালিয়ানা এসে গেছে তোর মাঝে?
সেলিনা--- কেন? আমি বাঙালি না! তুই বুঝবি না। এই গানের গভীরতা কতটুকু।
( কথোপকথন চলছে তো হঠাৎ চেয়ার থেকে কবির উঠে দুজনের সামনে দাঁড়াবে )
কবির--- এই এই এই। শুন শুন এসব কি শুরু করেছিস তোরা?
সেলিনা--- দেখেছো কবিরদা গৈরিকার কাণ্ড। কি যা তা বলছে।
গৈরিকা--- ঠিকই তো বলছি। আর কবিরদা ......। তুমিতো এনরিকের ফলোয়ার! তোমাকে তো একদিনও দেখিনি বাংলা গান গাইতে।
সেলিনা--- এই শুনো ওর কথা। কবিরদা তুমিই কিছু বলো।
কবির--- শুন্ গৈরিকা, ইংরেজি বা হিন্দি গান গেলেই যে নিজের পরিচয় ভুলে যাবো তা তখনই সম্ভব নয়। সেদিনও তো এন্যুয়েল ফেস্টিভ্যালে " আগুনের পরশমণি" গেয়েছি। শুনছিস না। আমি বাঙালি।বাংলা আমার পরিচয়।
গৈরিকা--- না বাবা, আমি এত্তো সবে নেই। বাংলাতে কি আছে বলো।
কবির--- আরে পাগলি। বাংলাই তো সব।
" বাংলায় জীবন, বাংলায় মরণ (আবৃত্তির মতো)
এই বাংলার জন্য প্রাণ দিল ২১-১৯ শে'র শহীদগণ"।
গৈরিকা--- কি এই ২১-১৯। কি বলছো এসব। আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা।
কবির--- শুন্ তাহলে। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে রফিক, বরকত ওরা আটজন তরুণ যুবক রক্তাক্ত হয়েছিল। আর ১৯৬১ সালের ১৯ শে মে আমাদের শিলচরে ঠিক একই ভাবে বাংলা ভাষার জন্য ১১ টি তাজা প্রাণ রক্তাক্ত হয়েছে পুলিশের বুলেটে। এই সংঘর্ষে কমলা ভট্টাচার্য নামে প্রথম মহিলা যিনি শহীদ হয়েছিলেন। তাই ২০১০ সালে রাষ্ট্রসংঘ ২১ শে ফেব্রুয়ারি " আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস" হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
গৈরিকা--- ও আচ্ছা আচ্ছা। তাই বুঝি সেলিনা 'আমার ভাইয়ের.....' নাকি গানটা গাইছে শুধু আজকের জন্য।!
কবির--- আরে না না। শুধু গান কেন বা আজকের জন্যই বা কেন। এতো আমাদের গর্ব আমাদের অহংকার। প্রতিটা মূহুর্তে আমাদের স্মরণ করতে হবে। এই ভাষাকে ভালোবাসতে হবে।
গৈরিকা--- বুঝলাম সব। তবে এতো ভালোবাসার কথা বলছো আর নিজে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ছো।
সেলিনা--- শুনছো কবির দা ওর কথা।
কবির--- তোরা ঝগড়া করবি না আমার কথা শুনবি।
সেলিনা--- আচ্ছা বলো।
কবির--- গৈরিকা ঠিকই বলেছে! আমি কেন ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ি বা ইংলিশ গান-টান গাই।
গৈরিকা--- হ্যাঁ, উত্তর টা দাও কবির দা।
কবির--- তবে শুন্, ইংরেজি পড়লেই যে নিজের পরিচয় ভুলে অন্যের টা গ্রহণ করতে হবে এটা কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তা হয় না। ইংরেজি জানার জন্য পড়ি। ভালোবাসা শুধুই বাংলার প্রতি। মরতে পারি বাংলার জন্যই। কারণ আমি বাঙালি।
গৈরিকা---- না বাবা আমি এসবের মধ্যে নেই। কি আছে বলো বাংলায় এক রবিঠাকুরের নোবেলটা ছাড়া। আর হাই কুয়ালিফিকেশনের জন্য ইংলিশ ছাড়া........... অসম্ভব।
No comments:
Post a Comment