Thursday, March 7, 2019

নারী ও জীবন

"আমাদের মাকে আমরা বলতাম তুমি, বাবাকে আপনি।

আমাদের মা গরিব প্রজার মত দাঁড়াতো বাবার সামনে,

কথা বলতে গিয়ে কখনোই কথা শেষ ক’রে উঠতে পারতোনা।

আমাদের মাকে বাবার সামনে এমন তুচ্ছ দেখাতো যে

মাকে আপনি বলার কথা আমাদের কোনোদিন মনেই হয়নি।

আমাদের মা আমাদের থেকে বড় ছিলো, কিন্তু ছিলো আমাদের সমান।"

… হুমায়ুন আজাদের লেখা “ আমাদের মা " ভীষণ প্রিয় একটা কবিতা আমার। মা তো শুধু মা নন, একজন নারীও। প্রাসঙ্গিক কারণেই এতো বড় কবিতাটা এখানে দেয়া সম্ভব হলো না কিন্তু কতটা গভীর এবং সূক্ষ্ম মানবিক বোধ থাকলে একজন মা’কে নিয়ে, একজন নারীকে নিয়ে এমন ভাবে ভাবা যায়, এমন ভাবে লেখা যায়! ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ বিষয় নিয়ে সরাসরি না লিখে বরং কবিতা দিয়ে শুরু করলাম। শুরু করলাম ঘরে বাইরে একজন নারীর অবস্থান নিয়ে। কতটা পরিবর্তন হয়েছে তার অবস্থানের; সেই আদি থেকে বর্তমান অবধি? জানি সেটা লিখে বা বলে ফুরোবার নয়।

নারীদিবস সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ধারণা কিছুটা অস্পষ্ট। আন্তর্জাতিক নারী দিবস, ৮ই মার্চ, এ কোন কোন পুরুষ নারীদিবসের শুভেচ্ছা জানান নারীদেরকে। কেউ কেউ ভালোবাসাও জানান। কেউ হাসাহাসি করেন। কেউ বলেন, আমাদের পুরুষদিবস কই? অনেকে বলেন, নারীদেরকে তারা শ্রদ্ধা করেন পরিপূর্ণভাবে, বছরের প্রতিটা দিন। নারীর জন্য আলাদা দিবসের কোন দরকার নেই। আমি বলি সেই পুরুষদের, তুমি কূয়োর ব‍্যাঙ কূয়োতেই থাকো।           

আজকাল প্রায়ই লক্ষ্য করা যায় যে, অনেকেই নারী অধিকার নিয়ে, নারী পুরুষের পারস্পারিক সহাবস্থান নিয়ে লিখতে আগ্রহী হন, চান কথা বলতে। যারা লিখতে চান, তারা লিখে বোঝাতে চান তারা সহনশীল এবং সমস্যা সমাধানে আগ্রহী। কিন্তু আমি মনে করি আজকে নারীর অধিকার, দাবী, নারী নির্যাতন রোধ যা কিছু নিয়েই আমি লিখতে চাই বা বলতে চাই না কেন, হোক সে নারী গৃহিণী বা কর্মজীবি, সবার আগে দরকার উন্নত চেতনার। নারীর কাজ করা বা না করার সাথে এই চেতনা সম্পর্কযুক্ত নয়। কুসংস্কার, পুরাতন রীতিনীতি ও আচরণের পরিবর্তন দরকার, আরো দরকার মানবিক আবেগ ও মানবিকতার জয়। মানবতা হলো নিজের কথা চিন্তা করে অন্যের প্রতি উদার হবার ক্ষমতা। যে মানুষ অন্যের প্রতি উদার হতে পারে না, সে তার নিজের প্রতিও উদার না। অনেক নারীবাদী পুরুষ আছেন যারা তাদের লেখনীর মাধ্যমে, আলোচনা তথা কথাবার্তায় নিজেকে 'রেডিকেল ফেমিনিষ্ট' বলে ভাবে। কিন্তু দিন শেষে যে সব একই ,কোন না কোন ভাবে শোষিত হচ্ছে নারী ওদের হাতে।

নারীদিবসের যেদিন দরকার পড়বে না, সেদিন সবচেয়ে খুশি হবে কে জানেন? নারীরা। নারীদিবস একটি মাইলস্টোন।এ দিনটি একজন নারীর দৈনন্দিন হাজারো ব্যস্ততার ভিড়ে একটু নিজের দিকে ফেরার, খানিকটা সচেতনতার ক্ষণ। এ দিনটি নারীকে মনে করিয়ে দেয়, পুরুষের সমান অধিকার আজও তোমার নেই। তুমি অর্ধাঙ্গিনী।  পুরুষের প্রয়োজনে তার পাঁজরের হাড় থেকে তুমি উদ্ভূত। তুমি মিসেস রায়হান। পৈতৃক সম্পত্তিতে তোমার অধিকার অর্ধেক। তোমার শারীরিক শক্তি কম,  পুরুষের থেকে কম মজুরি সেজন্য তোমার প্রাপ্য। শারীরিক  শক্তি কম বলে তোমাকে রাস্তাঘাটে যেমন ইচ্ছে যন্ত্রণা আর অপমান করা যাবে। দুর্বল  বলে প্রত্যুত্তর দেয়ার সাহস হবে না তোমার। মানুষ হিসেবে প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে তোমাকে এখনও অনেক পথ পেরুতে হবে।        
            
উপরের কথাগুলো কিছু সুবিধাপ্রাপ্ত নারীর জন্য না হলেও পৃথিবীজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীর জন্য প্রযোজ্য। যে পুরুষরা নারীকে শ্রদ্ধা করেন, নারীর অবদানকে স্বীকার করেন, নারীর চোখে পৃথিবীটা কেমন দেখায়, তা বোঝার চেষ্টা করেন-- তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা রইল। আমি পুন গুরুত্বপূর্ণ ভাবি। তবে বুঝতে পারি, মেয়েদেরকে স্বাভাবিক পৃথিবী উপহার দেওয়া হয়নি এখনো।         
 
প্রতিটি দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থান ভিন্ন। আমি স্বীকার করি, ভারতবর্ষের মানুষ মা’কে নিয়ে বেশ আবেগিক। নিজ ঘরের অন্যান্য নারীদেরকেও নিজের চিন্তা আর ভাবনা অনুযায়ী যার যার মত করে নিরাপত্তা দিতে চান পুরুষরা। এখানে আবারও বলি 'পুরুষ' কে তুমি স্বাধীনতা দেয়ার। প্রতিটা নারী ডিসাইড করবে তার প্রয়োজনটা নিয়ে।আপনি/ আমি কেন করবো! সম্পত্তির জন‍্য!?কিন্তু সামগ্রিকভাবে ভারতের নারীর অবস্থান কেমন?  ভারতের প্রেক্ষিতে দেখা যাক। নারী রাস্তাঘাটে একজন পুরুষের মত সহজে চলাফেরা করতে পারে না। বারোহাতি শাড়ী, বা বিশাল ওড়নায় নিজেকে ঢেকেও শরীর নিয়ে তাকে কখনো কখনো  অপমানসূচক কথা শুনতে হয়। কাজের জায়গায় সঠিক ও নিরাপদ পোশাক পরার প্রয়োজনীয়তা নারীর চেয়ে ভালভাবে কে বুঝবে? কর্মজীবী একজন নারী নাইট শিফটে কাজ করতে পারেন। কিন্তু স্বাভাবিক কর্মযজ্ঞ সেরে অনেক রাতে তার ঘরে ফেরার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আট বছরের আসিফার কথাই ভাবুন, ঘরে ফিরতে চেয়েছিল, ফিরতে পারেনি। মেয়েরা ভীত থাকে, অস্বস্তিতে থাকে তার নারীত্বের কারণে। মাতৃত্ব নারীর অহংকার। অবিসংবাদিতভাবে ঘরের কাজ, সন্তানের কাজের সাথে শুধুমাত্র নারীকে সম্পর্কযুক্ত দেখতেই আমরা অভ্যস্ত।তাই কর্মক্ষেত্রে কখনো যোগ্যতর হয়েও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে মেধাবী নারী। যদিও ভারতের সংবিধানে
১) সাম্যের অধিকার (১৪ নং থেকে ১৮ নং অনুচ্ছেদ)
২)স্বাধীনতার অধিকার (১৯ নং থেকে ২২ নং অনুচ্ছেদ)
৩)শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার  (২৩ নং ও ২৪ নং অনুচ্ছেদ) রয়েছে তথাপিও সবসময় প্রতিটা ক্ষেত্রেই নারী শোষিত, নিষ্পেষিত।

সারা পৃথিবীজুড়ে কমবেশি একই ধরনের চিত্র। মৌখিকভাবে নারীকে সমঅধিকারের স্বীকৃতি জানালেও কাজের কাজ তেমন কিছু হয়নি। বাস্তবতায় নারীর সেরকম অবস্থান নেই। একটি মেয়ে জন্মের পর থেকে স্বস্তিতে বেড়ে উঠবে, পড়াশুনা করবে, চাকুরী করবে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেবে, আরও দশটা মানুষের মতো সেও তার জীবন উপভোগ করবে। নারীত্বকে সে  বোঝা মনে করবে না, মানুষ হিসেবে তার আইডেন্টিটি ভাববে,নারী হিসেবে নয়-- এরকম দিন এখনও আসেনি। পৃথিবীতে নারীর এই অবস্থান যতদিন না আসবে, আমি চাই বা না চাই, নারীদিবসের প্রয়োজনীয়তা ততদিন থাকবে। 

নারী নির্যাতন এবং নারী সমস্যার সঙ্গে ধর্মীয় মৌলবাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে এ বিষয়টি বিশেষ আলোচনায় আসেনি। মৌলিক আলোচনায় গেলে বলতে হয়, নারীর অধস্তন অবস্থার জন্য দায়ী শ্রেণীসমাজ।ইতিহাসে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের উদ্ভবের ঠিক আগে আগে ব্যক্তিগত সম্পত্তির জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই নারী জাতি হারিয়েছে স্বাধীনতা- যাকে এঙ্গেলস বলেছেন,  'নারীর বিশ্ব-ঐতিহাসিক পরাজয়'। 'পুরুষ ঘরের মধ্যেও কর্তৃত্বের লাগামটি ধরল, নারী পদানত হলো, দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হলো। 'ধর্মীয় মৌলবাদ হলো ধর্মের সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ব্যাখ্যা, যা যুগের সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় বিধিবিধানের সংস্কারকে মানতে চায় না। মৌলবাদী সংগঠনগুলো মনে করে তারা যেভাবে ধর্মের ব্যাখ্যা দেবে সেটাই সবাইকে মানতে হবে এবং সে জন্য তারা সন্ত্রাস ও বল প্রয়োগের আশ্রয় নেয়।

ধর্ম কীভাবে নারী নির্যাতনের হাতিয়ার হয়েছিল তার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত হিন্দু সমাজে সতীদাহের মতো বর্বর প্রথা চালু ছিল। মধ্যযুগে ইউরোপে ডাইনি বলে কত নারীকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল ধর্মের নামেই, চার্চের নির্দেশে। হিন্দু ধর্মের ভগবান শঙ্করাচার্য স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, নরকের দ্বার হচ্ছে নারী। বাইবেলে বলা আছে, নারী হচ্ছে 'রুট অফ অল ইভিল'। ইসলাম ধর্ম তুলনামূলক প্রগতিশীল হলেও এখানেও নারীকে পুরুষের অধীনস্থ রাখা হয়েছে, বন্দি করা হয়েছে তাকে পুরুষতান্ত্রিক বিধিমালার কাছে। তাছাড়া আরও অনেক উদাহরণ আছে প্রতিটা ধর্মীয় বিধানে যা আপনার আমার সবার জানা।মুসলমান সমাজে নারী শিক্ষার প্রবর্তক মহীয়সী বিপ্লবী নারী বেগম রোকেয়া তাই বলেছেন, "আমাদের যথাসম্ভব অধঃপতন হওয়ার পর দাসত্বের বিরুদ্ধে কখনো মাথা তুলিতে পারি নাই; তাহার প্রধান কারণ এই বোধ হয় যে, যখনই কোনো ভগ্নী মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন, অমনই ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচন-রূপ অস্ত্রাঘাতে তাহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। ... আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ওই ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন। ... এই ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষ-রচিত বিধি ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে। "একবিংশ শতাব্দীতেও কলকাতার কলেজের অধ্যাপিকা মীরাতুন নাহার বলছেন, "...মুসলমান সমাজের পুরুষের স্বার্থপরতা মেয়েদের বন্দী হতে বাধ্য করেছে। ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে মেয়েরা ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে। যত বিধিনিষেধ তাদের ওপর। পুরুষ স্বাধীন। মেয়েরা বন্দী। নারী-পুরুষের জৈবিক সম্পর্ককে মুসলমান পুরুষ সমধিক গুরুত্ব দেয়। উভয়ের সম্পর্ক যেন ভোক্তা ও ভোগ্যের। সে কারণে কঠোর পর্দাপ্রথা। " মৌলবাদীরা কোন ধরনের সংস্কারের বিরুদ্ধে। কিন্তু মৌলবাদীদের মতাদর্শগতভাবে পরাস্ত করেই তো আমাদের প্রগতির পথে অগ্রসর হতে হবে।ধর্মীয় ফতোয়ার কবলে পড়ে কত নারী অপমানিত, নির্যাতিত, এমনকি মৃত্যুবরণ করছে অশ্লীল তেঁতুলতত্ত্বের প্রমাণ বহন করে।

বিশ্বায়ন (গ্লোবালাইজেশন) আর তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে কার্যক্ষেত্র পরিবর্তন হচ্ছে খুব দ্রুত। যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে সক্ষম, তাদের জন্য নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস, ২০১৭ এর প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল, “Women in the Changing World of Work: Planet 50-50 by 2030”. সোজা বাংলায়, পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্রে নারীর ভুমিকাঃ ২০৩০ সাল নাগাদ, প্ল্যানেট ৫০-৫০। দেখা যাচ্ছে কাজ করতে সক্ষম, এমন নারীদের ভেতর মাত্র ৫০ শতাংশ কাজে আছেন। কাজ করতে সক্ষম পুরুষদের ভেতর ৭৬% কাজ করছেন। শ্রম বাজার বলুন, আয়ের ক্ষেত্রেও বলুন, ঘরোয়া কাজে বলুন—সব জায়গাতে নারী আর পুরুষের ভেতর বৈষম্য প্রকট। 

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৯ এর মূল ভাবনা আগের বছরের ধারাবাহিকতারই  ফলাফল, এ বছরের থিম # PressforProgress- বিগত বছরের বিশ্বজুড়ে #Me Too, #Time’s Up  সহ বিভিন্ন  আন্দোলনের সাথে একাত্ম হয়ে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করাই এর মূল লক্ষ্য।    
 
আন্তর্জাতিক নারী দিবসটি কোন দেশ, গোষ্ঠী বা সংস্থা-নির্দিষ্ট নয়। অনুন্নত দেশ থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল তথা উন্নত দেশগুলোতেও এর প্রয়োজনীয়তা আছে। জেন্ডারভিত্তিক অসমতা রাতারাতি বদলাবার নয়। তবে পৃথিবীজুড়ে নারীরা সচেতন হচ্ছেন।নিজের জন্য, সহকর্মীর জন্য, বন্ধুর জন্য, সর্বোপরি নারীসম্প্রদায়ের জন্য তারা কথা বলছেন, নিজেদের অধিকার নিশ্চিত করতে আগ্রহী হচ্ছেন-- আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সার্থকতা এখানেই।  

শুধু নারী দিবস বলেই একটি নির্দিষ্ট দিনে আমরা নারীদের নিয়ে ভাববো, তাকে সম্মান দেব তা নয়। আসুন আমরা নারীকে তার যথাযথ সম্মান দেই, তাকে দেই তার সদিচ্ছা পূরণের অধিকার, তাকে ভাবতে শিখি স্বতন্ত্র একজন মানুষ হিসেবে ।

আমাদের ভারতবর্ষে নারীদের অবস্থা কিরকম ছিল?নারীজাতির মুক্তিদাতা কে? নারী সমাজ জাগরণের পথিকৃৎ কে?এই কয়েকটা বিষয় আজ নারী দিবসের দিনে অবশ্যই চর্চা হওয়া উচিত। ভারতবর্ষে সামাজিকভাবে নারীরা পুরুষদের গোলাম। এমনকি ভারতের পবিত্র ধর্মগ্রন্থেও নির্দেশ আছে-- মেয়েরা বাল্যকালে পিতার অধীনে, যৌবনে স্বামীর অধীনে এবং বৃদ্ধবয়সে পুত্রের অধীনে থাকবে। এছাড়া শাস্ত্র অনুযায়ী, "নারী হল শূদ্রাণী", অর্থাৎ অধিকারহীন এবং যার কাজ হল সেবা করা। "নারী নরকের দ্বার", "নারীর অধিকার কেবল সন্তান উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ"। সত্যিই ভারতে নারীসমাজের অবস্থা ছিল চূড়ান্ত শোচনীয়, ঈশ্বরের নামে ধর্মের দোহাই দিয়ে মেয়েদেরকে দাসী ও ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করা হয়েছিল। এরকমভাবেই চলছিল কয়েক হাজার বছর। তারপর একদিন মহারাষ্ট্রের একজন সাহসী মেয়ে, নাম- সাবিত্রীবাই ফুলে, স্বামীর কাছে পড়াশুনা শিখে মেয়েদের জন্য স্কুল তৈরি করেন। প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি মেয়েদের সামাজিক অধিকারের জন্য আওয়াজ তোলেন। নারীর অধিকারের জন্য সামাজিক আন্দোলনের অগ্রদূত হিসাবে রাষ্ট্রমাতা সাবিত্রীবাই ফুলে আজকের দিনটিতে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। এছাড়া নারীর অধিকারের জন্য আরও একজনের নাম না বললে ভারতে নারী দিবস সম্পর্কে চর্চা অসম্পূর্ণ থেকে যায়, তিনি হলেন ভারতে নারীজাতির মুক্তিদাতা বাবাসাহেব আম্বেদকর। সমাজে মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি হিন্দু কোড বিল তৈরি করেন, কিন্তু জওহরলাল নেহেরুর ষড়যন্ত্রে এই বিল পাশ করা হয়নি, তাই বাবাসাহেব মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন। হিন্দু কোড বিল পাশ না করা গেলেও, ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী এবং ভারতের সংবিধানের রূপকার হিসাবে বাবাসাহেব সাংবিধানিকভাবে মেয়েদের অধিকার ও পর্যাপ্ত ভাগিদারীর জন্য সংবিধানে কয়েকটি ধারা সংযোজন করেন, যেমন- আর্টিকেল ১৪ ঃ সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সুযোগের সমানাধিকার। আর্টিকেল ১৫ ঃ লিঙ্গ বৈষম্যের উপর নিষেধাজ্ঞা। আর্টিকেল ১৫(৩) ঃ নারীদের উপর ভেদভাবের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা। আর্টিকেল ৩৯ ঃ জীবিকা নির্বাহের সমান অধিকার ও সমান কাজের সমান বেতন। আর্টিকেল ১৪ ঃ কার্যক্ষেত্রে মানবীক পরিবেশ ও মাতৃত্বকালীন ছুটি। আর্টিকেল 24 (3 d), (3 t) এবং (3 r) ঃ পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থায় মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ। নারীদের শিক্ষার জন্য বাবাসাহেবের অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি বলতেন, কোনো সমাজে মেয়েরা কতটা এগিয়ে তার নিরিখে আমি সেই সমাজের অগ্রগতি পরিমাপ করি। তিনি নারীদের পুরুষকে স্বামী না ভেবে বন্ধু ভাবতে এবং তার সাথে সমান চারিত্রিক সক্ষমতা রাখতে উৎসাহিত করতেন। তিনি মনে করতেন যে, নারীরা এই গুণগুলি অনুসরণ করলে তারা আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হবে।বেগম রোকেয়া, সাবিত্রীবাই ফুলে, ফতিমা শেখ প্রমুখ মহীয়সী নারী, যাদের আন্দোলন ও আত্মত্যাগের জন্য আজ ভারতের মেয়েরা বাল্যবিবাহ বহুবিবাহ সতীদাহপ্রথা ইত্যাদির মতো জঘন্য যুগ থেকে মুক্ত হতে পেরেছে, শিক্ষার আলো পেয়েছে, সেই মহীয়সী নারীদের আজ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। নারীর কল্যাণ ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং তাঁদের স্বপ্ন সফল করার জন্য আসুন আমরা আজ সকলে মিলে একসাথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই।

নারীদিবসকে নিয়ে আপনার ভাবনা কি? ভারতবর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের কর্মক্ষেত্রে সহজ স্বচ্ছন্দ অংশগ্রহণ কিভাবে সম্ভব?  আপনার ছোট মেধাবী মেয়েটির মেধা আর মননশীলতার পূর্ণ বিকাশ ঘটুক,  কার্যক্ষেত্রে তার কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারুক, এ নিয়ে আপনার কোন ভাবনা আছে কী? নারীর সামাজিক আচরণগত কোন বিষয়গুলো একজন পুরুষের কাছে অসুবিধাজনক বলে মনে হয়? পুরুষের কোন আচরণগুলোর কারণে একজন নারীর সামাজিক অংশগ্রহণ বাধাপ্রাপ্ত হয়? নারী-পুরুষ-বান্ধব একটি সুন্দর, সুষ্ঠু কর্মক্ষেত্র ও পরিবেশ আমরা কীভাবে তৈরি করতে পারি? সেই আদিমকাল থেকে নারীকে যারা সম্পত্তি হিসেবে ভাবছেন,  সবার অংশগ্রহণ ও মতামতকে  স্বাগতম জানাই।

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...