'মা তোর মুখের বাণী আমার কাছে লাগে সুধার মতন'-এ কেবল নোবেল জয়ী রবীঠাকুরের ব্যক্তিগত অনূভুতি নয়,এ হচ্ছে সর্বকালের মানুষের চিরন্তন অনূভুতি। মাতৃদুগ্ধ যেমন শিশুর জন্য সর্বোত্তম পুষ্টি, তেমনি মাতৃভাষার মাধ্যমে ঘটতে পারে একটি জাতির শ্রেষ্ঠ বিকাশ। তাই একটি জাতির উন্নয়নের শীর্ষস্থান দখল করার প্রথম ধাপ হলো- মাতৃভাষার মর্যাদা দেওয়া। মাতৃভাষা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের এক মৌলিক সম্পদ। মা ও মাটির মতোই প্রতিটি মানুষ জন্মসূত্রে এই সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়।
সাধারণ অর্থে মাতৃভাষা বলতে মায়ের ভাষাই বোঝায়। একটি বৃহত্তর অঞ্চলে একই সাথে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত থাকে। এর মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ যে ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করে সেটাই হচ্ছে সে অঞ্চলের মানুষের মাতৃভাষা। মাতৃভাষা বহতা নদীর মতো শত ধারায় প্রবাহমান। বাঙালির মাতৃভাষা হচ্ছে 'বাংলা'। বাংলা আমাদের প্রাণের স্পন্দন, বাংলা আমাদের অহংকার। কবি অতুলপ্রসাদ সেনের কথায়-- " মোদের গরব মোদের আশা/আ মরি বাংলা ভাষা"। প্রখ্যাত ভাষা বিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন-- 'মা,মাতৃভূমি, এবং মাতৃভাষা' এই তিনটি জিনিস সবার কাছে পরম শ্রদ্ধার বিষয়'।
মাতৃভাষাই মানবজীবনের সকল ক্ষেত্রে তৃপ্তি ও পরিপূর্ণতা দান করে। জাতীয় জীবনে মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। জাতীয় জীবনের সার্বিক ক্ষেত্রে উন্নতি লাভ করতে হলে মাতৃভাষার কোনো বিকল্প হতে পারে না। শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্যের বিকাশে মাতৃভাষা হচ্ছে প্রধান মাধ্যম। বাংলা ভাষা রক্ষার্থে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রফিক, জব্বার, বরকতরা যেভাবে তরুণ তাজা রক্ত দিয়ে রাঙিয়ে ছিল এই দিনটিকে, তার সাথে গড়ে ছিল 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'। কিন্তু এর সাথে ১৯৬১ সালের ১৯ শে মে'র কথা আমরা কি ভুলতে পারি? কিভাবে ভুলতে পারি কমলা ভট্টাচার্যের কথা। যে ভাষার প্রথম মহিলা হিসেবে শহীদ হয়েছিলেন। কিভাবে ভুলতে পারি শচীন্দ্র,রবীন্দ্রের কথা?
এবার একটু নিজের কথা বলি। যা দুঃখজনক হলেও সত্য। যে ভাষার জন্য এত কিছু করা,যে ভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে এতোগুলো প্রাণ বিসর্জিত হলো-- আমরা কি বাংলাকে সর্বস্তরে ব্যবহার করতে পারছি? আমাদের যদি চোখ থাকতো তাহলে পড়তে পারতাম সময়ের দেয়াল লিখন। আমাদের যদি কান থাকতো তা হলে শুনতে পারতাম জন সমুদ্রের উত্তাল কলরব। আমাদের যদি স্নায়ুতে নিউরন থাকতো তা হলে বুঝতে পারতাম কেন ভাষা-সাম্রাজ্যবাদীদের বাংলাকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র। কিন্তু না, আমরা আজ হীনমন্যতার স্বীকার। আমাদের দূরদৃষ্টির অভাব।
আসামের ইতিহাস বলতে গিয়ে সরকার প্রকাশিত বইয়েও লেখা হয়," The long alluvial valley of the Brahmaputra or Assam proper with which we are concerned" ( Political History of Assam vol.1,Dispur- 1977) অর্থাৎ আসাম বলতে শুধু ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ও তার ইতিহাসের কথা বলা হয়েছে। আসামের কৃষ্টি সভ্যতা ও ইতিহাস বলতে শুধু একা অসমিয়া সংস্কৃতি কে আলাদা করা যায় না। সুরমা উপত্যকার সভ্যতা ও ইতিহাস তথা পার্বত্য অঞ্চলের লোকদের দ্বারাও একক সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে আসামের কৃষ্টি সভ্যতা। কিন্তু ধারাবাহিক মিথ্যা ও বিকৃত প্রচার অভিযানের ফলে আসামের বাইরে এবং ভিতরে আসাম,আসামবাসী ইত্যাদি বিষয়ে যে মিথ্যা ও বিকৃত কিছু মারাত্মক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে -- তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আসামের আসামের বাংলা ভাষাভাষী লোকদের উপর আগ্রাসন চলছে। যা ভারতীয় সংবিধান পরিপন্থী। যারা আসামকে খুব কাছে থেকে জানেন তাঁরা কোন সময়ই এই উগ্রজাতিয়তাবাদী আগ্রাসন কে প্রশ্রয় দেন নাই। বিভিন্ন সময়েই তাঁরা বিভিন্ন প্রতিবাদী সুরে এই উগ্রতা কে নিন্দা জানিয়েছেন ও দমন করার চেষ্টা ও করেছেন। ড. ভুবন মোহন দাস তাঁর "অসমিয়া জাতির ইতিবৃত্ত" বইটিতে আসাম সম্পর্কে যে সুস্পষ্ট ও প্রামানিক তথ্য দিয়েছেন তা সর্বজনগ্রাহ্য ।
আসাম ভারতের উত্তর পূর্বাংশে ব্রহ্মপুত্র আর বরাক নদীবিধৌত এক অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। যেখানে ২০১১ সনের লোকগণনা মতে ৪৮.৩৩% অসমিয়া আর ২৮.৯২% বাঙালিরা বসবাস করছে। কিন্তু ভাষা নিয়ে যে বিপত্তির শুরু হয়েছিল দেশভাগের পর থেকে আজও এর আগ্রাসন চলছে ষোলকলায়। ড. নীহাররঞ্জন রায় প্রমুখ মনীষীরা 'বাঙালীর ইতিহাস' ,বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে রচনা করেছেন। অসমিয়া জাতির ইতিহাস নিয়ে তেমন কোন শ্রমসাধ্য বিজ্ঞানসম্মত কাজ করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। অসম সাহিত্য সভা কর্তৃক প্রকাশিত 'অসমিয়া জাতির ইতিবৃত্ত' বিভিন্ন পণ্ডিতজনের কয়েকটি সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ মাত্র। এই সংকলনে অধ্যাপক রামচরণ দাস বলেছেন অসমিয়া সংস্কৃতি আর্য,অষ্ট্রিক এবং মঙ্গোলীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। মোটকথা অসমিয়ারা বাঙালির মতো সংকরজন। সংখ্যায় বাঙালিরা আসামে এক বিশাল জনগোষ্ঠী। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে টিকে থাকার লড়াই চলছে বাংলার এই রাজ্যে। বড়ই পরিতাপের বিষয়,বাঙালিরা অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যভাষা হিসেবে মেনে নিলেও বারবার অসমিয়া আগ্রাসনের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদেরকে। ক্রমাগত হারাচ্ছে তাদের জাতিস্বত্বা। এই মনোবৃত্তি কি একান্তই উগ্রজাতিয়তাবাদী নয়? হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ভূপেন হাজারিকা, রবীঠাকুর যে মিলনের সেতু বন্ধন করেছিলেন তা কারা কোন সাহসে ভাঙছে,একবারও কি নিয়েছি আমরা খবর! নাকি সময়ের বহমানতায় পাল তুলে পালিয়ে যাচ্ছি হারাপ্পা সভ্যতার দিকে?
অসমিয়া আমাদের রাজ্যিক ভাষা,শিখতে হবে। তবে বাংলাকে পিছিয়ে নয়। তাই মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই,অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক নিষ্পেষণের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে অবিরত সংগ্রামের প্রয়োজন।
No comments:
Post a Comment