Tuesday, June 27, 2023

বিজ্ঞানমনস্কতা : সমাজ গঠনে সুস্থ দৃষ্টিভঙ্গি

প্ৰত্যেক মানুষের এক সুস্থ দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্ৰয়োজন। যাতে করে সমাজ তথা জগতকে সঠিকভাবে পৰ্যবেক্ষণ করার সহায় করে এবং ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, সমাজ এবং প্ৰকৃতির সঙ্গে সম্পৰ্ককে সুস্থিরতা প্ৰদান করতে পারে। আর এর জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চয়ই হতে হবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বৈজ্ঞানিক মানসিকতার নিৰ্যাস। মানুষের বিজ্ঞানচেতনা মানুষকে এনে দিয়েছে মুক্তির আনন্দ। সত্যের স্বরূপ উদ্ঘাটিত করার জন্য, রহস্যের মায়াজাল উন্মোচিত করার জন্য যুক্তির শাণিত অস্ত্রে মানুষ ব্যাখ্যা করতে শিখেছে। কোনো “আপ্তবাক্য”, কোনো অন্ধবিশ্বাসকে গ্রহণ করতে চায় না। বিজ্ঞানমনস্কতা বিজ্ঞানের যুগে বাস করার ছাড়পত্র বা Passpot। বিজ্ঞানমনস্কতা ঐশ্বরিক নির্ভর সংস্কারাচ্ছন্ন মনকে মুক্তি দিয়ে যুক্তির চূড়ান্তে যাচাই করে গড়ে তোলে। যুক্তি-বুদ্ধি দ্বারা প্ৰশ্ন করা, কোনো পরিঘটনার বিশ্লেষণের প্ৰতি উৎসুকতা, তথ্য তথা জ্ঞান আহরণে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার, বিতৰ্ক তথা সমালোচনাত্মক উপায়ে আসন্ন সত্যের উপর দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকা একজন ব্যক্তিকে বৈজ্ঞানিক মানসিকতার অধিকারী করে এবং প্ৰদান করে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই ব্যক্তিই সচেতন এবং সক্ৰিয় মনের পরিচায়ক। এই চিন্তাধারা একজন ব্যক্তির মননে হঠাৎ ক্রিয়াশীল হয় না। দীৰ্ঘদিন অনুশীলনে একজন ব্যক্তির মনে ইহার প্ৰভাব স্থায়ী করে।

কেবল অন্ধবিশ্বাস এবং কুসংস্কার থেকে মুক্তির জন্যই নয় একটি মুক্ত, উদার, ধৰ্ম-নিরপেক্ষ গণতান্ত্ৰিক সমাজ গঠনের জন্য বৈজ্ঞানিক মানসিকতার খুব প্ৰয়োজন। বিজ্ঞান সম্পর্কে যখন মানুষের ধারণা একেবারেই ছিল না বা কম ছিল তখন মানুষ আগুনকে তার সৃষ্টিকর্তা মানতো, বজ্র বা তুফানকে তার সৃষ্টিকর্তা মানতো, সমুদ্রকে তার সৃষ্টিকর্তা মনে করে প্রার্থনা করতো। এটা ঠিক সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথেই মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রাধান্যতা বাড়ে, শুরু হয় বিজ্ঞানমনস্ক যাত্রার।

বিজ্ঞানমনস্ক হতে গেলে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতেই হবে বা বিজ্ঞানকে পেশা হিসেবে নিতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। বৃহত্তর অর্থে বিজ্ঞান জানলে মানুষ প্রশ্ন করতে শিখবে, উত্তর খুঁজতে শিখবে বিজ্ঞানের যুক্তির বা পর্যবেক্ষণের আলোকে। অন্ধকার যুগ পেরিয়ে পৃথিবীর পথ ধরে ধীরে ধীরে জন্ম নিল ইওরোপীয় বিজ্ঞান——'লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, নিকোলাস কোপার্নিকাস, টাইকো ব্রাহে, জোহান কেপলার, ব্রুনো, গ্যলিলিও গ্যালিলি, এন্ড্রিয়া ভেসালিয়াস, উইলিয়াম গিলবার্ট, মাইকেল সেভেটার্স, হিরোনিমাস ফ্যাব্রিসিয়াস, উইলিয়াম হার্ভি, প্যারাসেলসাস, ভ্যান হেলমন্ট, জর্জিয়াস এগ্রিকোলা, বেকন, দেকার্ত... প্রমূখ বিদ্বজনের হাতে তত্ত্ব ও পর্যবেক্ষণ নির্ভর আধুনিক বিজ্ঞান গড়ে উঠল, জন্ম নিল নিউটনের মত প্রতিভা যার মেধায় ও মননে পরিপূর্ণতা পেল বিশ্লেষণ ধৰ্মী তত্ত্বগত এবং পরীক্ষণ বিজ্ঞান এবং সত্য আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির হল বিকাশ জেনেটিক তত্ত্বের পথপ্রদর্শক মেন্ডল ও বিবর্তনবাদের প্রবর্তক ডারউইন আবির্ভূত হয়েছেন জীব বিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণায় দিক-নির্দেশক রূপে।' যেভাবে আইনস্টাইন বলেছিলেন - আদর্শ বৈজ্ঞানিক অনুশীলনের প্রধান শর্তই হচ্ছে যে সব কিছু নিয়েই প্রশ্ন করা যাবে। তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করার সময় যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়, সে সব পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা যাবে। যে কোন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেই কিছু না কিছু পূর্ব ধারণা বর্তমান থাকে। কিন্তু এই ধারণাগুলো সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। যখন আরো শক্তিশালী ও সঠিক ধারণা পাওয়া যায় তখন পূর্ব ধারণাগুলো বদলে যায়। কিন্তু সংরক্ষণবাদীরা, তাদের বিশ্বাসে অনড় থেকে আদর্শ বিজ্ঞান চর্চার মূল বিষয়কে এড়িয়ে গিয়ে যখন বৈজ্ঞানিক তথ্য ও উপাত্তকে ডিজাইনার ইউনিভার্স বা পরিকল্পিত মহাবিশ্বের ধারণার মধ্যেই চেপে রাখতে চাইছেন, তারা আসলে বিজ্ঞানের নামে অপবিজ্ঞানের চর্চা করছেন।

বিজ্ঞানের উন্মেষ ঘটে কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রীক বৈপ্লবিক ত্বত্তে। 'On The Revolution of the Heavenly Bodies'(1543) - এ প্রথম শোনা যায় সূর্য বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র এবং পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে। 'কিন্তু ধর্মের অনুপস্থিতিতে, ডকিন্সের স্বভাবজাত ভাষায়, মানুষের মগজে ঈশ্বর-সাইজের যে গর্তটির (গ্যাপ) সৃষ্টি হবে তাকে ভরাট করা হবে কি দিয়ে ? ডকিন্স এর উত্তর দিয়েছেন—বলেছেন বিজ্ঞান দিয়ে, প্রতিনিয়ত সত্যানুসন্ধান যার কাজ। ডকিন্সের আশা এর মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে নতুন এক পৃথিবী—মিথ্যা নয়, সত্যের ভিত্তিতে।' অভিজিৎ রায়ের 'আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী' বইটি পড়ে দেখতে পারেন। এ বইয়ের শেষ অধ্যায়ে অভিজিৎ কোয়ান্টাম দোদুল্যমানতা (quantum fluctuation) প্রক্রিয়ার কীভাবে জড় কণিকা তৈরি হয়, তার বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তাঁর ‘ব্রীফ হিস্ট্রি অব টাইম’ গ্রন্থে স্ফীতিতত্ত্বের জনক এরেন গুথের উদ্ধৃতি দিয়ে মহাবিশ্বকে 'আল্টিমেট ফ্রি লাঞ্চ' বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ প্রাকৃতিক ভাবেই শূন্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি। ঠিক যেমন 'ডারউইনের বিবর্তনবাদী তত্ত্বই ১৮৫৯ সালে প্রথমবারের মতো খুব পরিস্কার ভাবেই দেখিয়ে দিল যে, মানুষসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিবর্তন এবং উদ্ভবের পেছনে কোন স্বর্গীয় কারণ খোঁজার দরকার নেই। অন্যান্য পশুপাখি, গাছপালা যে পদ্ধতিতে পৃথিবীতে এসেছে, মানুষ নামে ‘দ্বিপদী প্রাণী’টিও ঠিক একই বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এ পৃথিবীতে এসেছে।'

বিজ্ঞানমনস্কতা হলো অন্ধ গোঁড়ামির বিরুদ্ধে একটা দৃষ্টিভঙ্গি, যা জীবন ও জগৎ সম্পর্কে খোলা মনে যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে সবকিছু বিচার করতে সাহায্য করে ।'যে সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ যত বেশী অদৃষ্টবাদী, সেই সমাজে শাসকের দাপাদাপি তত বেশী। আবার, প্রশ্নহীন আনুগত্যের সামনে শাসক নিরাপদ বোধ করেন চিরকাল । তবে একদল মানুষ মাথা উঁচু করে প্রশ্ন করতে পেরেছে বলেই, অজ্ঞানতার আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দুঃসাহসী লড়াই করতে পেরেছে বলে্‌ই, সমাজ ও সভ্যতায় অগ্রগতি হয়েছে । তবে, সমাজ বিকাশের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ সমাজে বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসার হওয়া খুবই কঠিন কাজ।'
 
কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক মানসিকতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজে থেকে গড়ে ওঠার বস্তু নয়। ইহাকে নিজের মধ্যে অনুশীলন করাতে হয়। এই বিজ্ঞান মানসিকতা নিজের মধ্যে আনার জন্য পরিবার, বিদ্যালয়, তথা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক মাধ্যম, সমাজ তথা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ইহার ভিতরে বিদ্যালয় পর্যায়ের বিজ্ঞান শিক্ষা অতি গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা আয়োগ এর দ্বারা প্রণীত সিলেবাস ইহার উপর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রদান করে। মানুষের মনের অন্তর্জানের আলোকে প্রজ্জ্বলিত করে যেদিন কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে পারবে সেদিন হবে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা। বিজ্ঞানচেতনার দ্বারা মানুষের মনের অন্ধকার দূর করা সম্ভব। বিজ্ঞানের আলোয় অন্ধমনের গুহান্ধকার দূর হয়। বিজ্ঞানহীন, যুক্তিদ্রোহী জীবন, আলোকশূন্য অন্ধকারময় জীবন। একমাত্র বিজ্ঞানই পারে মানুষের কূপমণ্ডুকতা দূর করতে। একমাত্র বিজ্ঞানমনস্কতাই পারে মানুষকে সত্যালোকের দিকে নিয়ে যেতে।

বার্তালিপি ২০/০৪/২০২৩

এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়


১।
"সে মন্দিরে দেব নাই' কহে সাধু।
রাজা কহে রোষে,
"দেব নাই! হে সন্ন্যাসী, নাস্তিকের মতো কথা কহ।
রত্নসিংহাসন-'পরে দীপিতেছে রতনবিগ্রহ--
শূন্য তাহা?'
"শূন্য নয়, রাজদম্ভে পূর্ণ' সাধু কহে,
"আপনায় স্থাপিয়াছ, জগতের দেবতারে নহে।'

ধর্ম বহু শতাব্দী ধরে প্রগতিশীল সমাজ তথা বিজ্ঞানের পথে হিমালয় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।  ধর্মের পুরোহিতরাই খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ সালের শেষ দিকে সক্রেটিসকে বিষ পান করতে বাধ্য করেছিল। ১৬ ফেব্রুয়ারী, ১৬০০, বিখ্যাত দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী জিওর্দানো ব্রুনোকে রোমে ধর্মীয় পুরোহিতরা জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছিল।  গ্যালিলিও এবং কোপার্নিকাসকে পাদ্রীরা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। আচ্ছা আমরা কি জানি, কেন?  তারা বলেছিল পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে।  কিন্তু বাইবেল বলেছিল যে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে।  বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীরা যুগে যুগে ধর্মের অন্ধ সমর্থকদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছে। কারণ, একমাত্র বিজ্ঞানই পারে ধর্মের পুরোহিতদের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারকে উন্মোচন করে তাদের হাজার বছরের মিথ্যাচারের মুখোশ উন্মোচন করতে।

কয়েক হাজার বছর ধরে আমাদের দেশ ভারতবর্ষ তার জাতি, ধর্ম ও ভাষার বৈচিত্র‍্য অন্যান্য দেশের চেয়ে নিজস্ব স্বকিয়তায় আলাদা করেছে। দেশভাগের সময় ভারত বেছে নিয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিকতা। এই আদর্শে শরিক হয়ে দেশের সংবিধান গড়ে ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে। আমাদের স্বাধীন ভারতের সংবিধানে ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রকে কোনও দিন যুক্ত করা হয়নি। যদিও প্রত্যেক নাগরিকের নিজ ধর্ম পালনের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত ছিল। আচ্ছা, আসলে কি ধর্মের আফিম খেয়ে শিক্ষা, চাকরি, কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতি, আদানি আম্বানির হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি তুলে দেওয়া, গঙ্গা দূষণ, সোনার মেয়েদের হেনস্থা, জল সঙ্কট, সব ভুলে গেছি!

আসলে ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। খুবই অনাড়ম্বর ভাবে কোন রাখঢাকের অবর্তমানে সূচনা হয় ঐতিহাসিক নতুন সংসদ ভবন। মুঘল থেকে ডারউইনের বিবর্তনবাদ বাদ দিয়ে সাম্প্রতিক এক সঞ্চারের পথে এগিয়ে চলছে নতুন ভারত। তার একটি বৃত্তীয় দিশা পাওয়া গেল বিকশিত ভারতের সাক্ষ্য হিসেবে। উত্তরভারতের আখড়ার লালচে গেরুয়া বাহিনির হাড়হিম উপস্থিতিতে, নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধন হয়। আসলে কি বলা যায় সেই ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয় বিনায়ক দামোদর সাভারকরের পুস্তিকাঃ হিন্দুত্ব / হু ইজ এ হিন্দু। ‘হিন্দু’ কে? এর উত্তর আমরা পাই — সিন্ধু থেকে সাগর অবধি বিস্তৃত ভারতবর্ষকে যে একযোগে ‘পিতৃভূমি’ জ্ঞান করে সে-ই ‘হিন্দু’। 'মুসলমানরা যেহেতু আরবকে তাদের ‘পুণ্যভূমি’ জ্ঞান করে, ‘ওদের’ এবং অন্য বিধর্মীদের দেশাত্মবোধ সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ‘দেশদ্রোহী’দের তালিকায় পরে আরও কিছু নাম যুক্ত হয়, কম্যুনিস্ট, স্বাধীনচেতা নারী, সমকামী ইত্যাদি। এই পুস্তিকা প্রকাশের দু’বছরের মধ্যেই জন্ম হয় সঙ্ঘের। ইস্তেহারেরও। মেয়েদের জন্য তাঁদের পরিষ্কার বার্তাঃ একমাত্র রাষ্ট্রের বিপদেই শক্তিস্বরূপিনী-বেশে মেয়েরা ঘরের ঘেরাটোপ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারে, নচেৎ তাঁদের থাকতে হবে ঘরের নিভৃতে, নিশ্চিন্তে এবং নিরাপদে। পুরুষের সর্বার্থসাধিকা হলেই চরিতার্থ হয় নারীর জীবন, পূর্ণ হয় তার সকল আকাঙ্ক্ষা।  
নতুন হিন্দুরাষ্ট্রের ট্রেনে মুসলমানসহ অন্য বিধর্মী, কম্যুনিস্ট, স্বাধীনচেতা নারী, LGBTQIA+, বস্তুত আনুগত্যহীন যেকোনোও প্রশ্নকারী, প্রত্যেকেই হবে দ্বিতীয় শ্রেণির যাত্রী।'

২।
টেমস নদীর তীরে ৯০০ বছরের পুরনো ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। এই ভবনটি বেশ কয়েকবার পুনর্নির্মিত হয়েছিল। বর্তমান আকারে এটি প্রায় ৫০০ বছর ধরে রয়েছে।  এমনকি সম্প্রতি, গথিক আর্কিটেকচারের পরিচিত নিদর্শনটির পুনরুদ্ধার এই পার্লামেন্ট। এখানে আছে হাউস অফ লর্ডস, হাউস অফ কমন্স, চার্চ, সিমেট্রি। মাদার অব ওল পার্লামেন্ট হিসেবে পরিচিত এই ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। ওয়েস্টমিনস্টার ব্যবস্থা বিশ্বের শাসন ব্যবস্থার একটি সফল মডেল। ভারত সহ বহু দেশে এই মডেলের গণতন্ত্র চলছে। 

একসময় এই ভবনটি বিশ্বের এক চতুর্থাংশ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করত।  বিশ্বের প্রতিটি বিখ্যাত ব্যক্তি তার মেঝেতে পা রেখেছেন।  এখানে ক্রমওয়েলের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়েছিল, এখানে চার্চিলের বক্তৃতা করা হয়েছিল, এখানে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন চিৎকার করেছিলেন  "প্রতিনিধিত্ব ব্যতিরেকে কোন ট্যাক্সেশন নয়"। এই ভবনে এসে একজন এমপি যুক্ত হন ব্রিটেনের ইতিহাসের সঙ্গে।  এখানে থাকা একটি গুরুতর অনুভূতি।  তারা এটি সংরক্ষণ এবং এটি আলিঙ্গনে গর্বিত। এই ইতিহাসে তারা বিশ্বাস করে। কোন চকচকে কাচ-সজ্জিত বিল্ডিং, এর সমস্ত জাঁকজমক এবং এলইডি স্ক্রিন সহ, এই গৌরবের সাথে মেলে না। সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে থাকবেন.. তবে অন্য কোথাও যাবেন না।  হ্যাঁ, একবার নতুন ভবনের প্রস্তাবও এলে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।

ক্ষুধা সূচকে ১০১তম স্থানে থাকা দেশ বিশ হাজার কোটি টাকা খরচ করে নতুন সংসদ ও নতুন রাজধানী তৈরি করছে। ভারতের বুকে এই নতুন শাসনের নিজস্ব স্মৃতিচিহ্ন দরকার। তাই সেই পুরনো ভবন, যেখানে ভারত স্বাধীনতা পেয়েছিল, পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।  যিনি বসেছিলেন ভারতের সেরা বক্তা, কাউন্সিলর, বক্তা, প্রধানমন্ত্রী, সেরা রাষ্ট্রনায়ক... যেখানে সর্দার, আম্বেদকর, শাস্ত্রী, অটলের কণ্ঠ বেজে উঠেছে, যেখানে ভগৎ সিংয়ের বধিরদের জন্য করা বিস্ফোরণের চিহ্ন নিয়ে একটি স্তম্ভ এখনও দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে "Tryst with Destiny" নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যেখানে আমরা পক্ষ ও বিরোধীদের ঐক্য দেখেছি, জনসাধারণ হৃদয়স্পর্শী বক্তৃতা শুনেছে, সেখানে আমরা ভারতের মানুষ... আমাদের সংবিধান লিখেছেন, আমরা আত্মসমর্পণ করেছি... সেই সংসদ..!!!

৩।
ভারতের ইতিহাসে প্রথম কালো দিন ছিল ৩০ জানুয়ারি, ১৯৪৮। ঐদিন নাথুরাম গডসের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী। দ্বিতীয় কালো দিন ছিল ২৫ জুন, ১৯৭৫। ঐ দিন মাঝ রাতে ইন্দিরা গান্ধী দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে সংবিধান স্বীকৃত একাধিক মৌলিক অধিকার কার্যত কেড়ে নিয়েছিলেন। তৃতীয় কলো দিন ছিল ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২। ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছিল। সিনিয়র জার্নালিস্ট ( দ্যা টেলিগ্রাফ ) প্রসূন আচার্য বলেন — 'আজ স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এক কালো দিন। 'কালো দিন'অর্থাৎ ২৮ মে ২০২৩ ইং এই দেশে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার সাংবিধানিক চরিত্র কার্যত সমাপ্তি হল। নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধনে পুরোহিত মন্ডিত পরিবেশ দেখানো হয় রীতিমত লাইভ টেলিকাস্ট করে। ঔপনিবেশিক মানসিকতার অবসান ঘটিয়ে এটাই 'আত্মনির্ভর' ভারত।'

একদিকে দেশের প্রথম নাগরিক অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে বক্তৃতায় গণতন্ত্রের পক্ষে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে বড় বড় ভাষণ আর বাইরে যন্তর মন্তরে ৩৪ দিন ধরে চলা মহিলা কুস্তিগীরদের শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন কে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে রাষ্ট্রের পেশি শক্তির আস্ফালন হল। প্রতিবাদী কুস্তিগীরদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নারকীয় নৃশংসতা আজ দেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে, যা ভারতের উদার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে মারাত্মক আঘাত করেছে।  প্রতিবাদী কুস্তিগীরদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতায় দেশের গর্বের প্রতীক জাতীয় পতাকাকেও চরমভাবে অপমান করা হয়েছিল।  আজ এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক কিছু আর ঘটতে পারে না। বিশিষ্ট জনদের মতে দেশের জনগণ এই ফ্যাসিবাদী রাজনীতিবিদদের জবাব দেবে, যারা প্রতিবাদের কণ্ঠকে ক্ষুণ্ণ করতে চায়।  তারা দেশের অহংকার  আর আজ দেশের এই অহংকারদের রাজপথে নির্মম নির্যাতন করা হয়, এমনকি নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনের দিনেও! সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ফোগট ও বজরং পুনিয়ারা আজ যৌন হয়রানি শিকার। তাদের অভিযোগ নাকচ করে পুলিশ গ্রেপ্তার করে ও ধর্ণাস্থল থেকে তাদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলে। আমরা যেন ভুলে না যাই দেশের এই বেটিরা মাতঙ্গিনী হাজরা, রানী লক্ষ্মী বাই, সরোজিনী নাইডু, প্রীতিলতা ওয়েদ্দাদার প্রভৃতি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উত্তরাধিকারী। দেশের গণতন্ত্র রক্ষার্থে এবং মহিলাদের যথোপযুক্ত সম্মানের দাবিতে এই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও আন্দোলনের পিছনে কিন্তু রয়েছে তা এবিষয়ে ওয়াকিবহাল সমস্ত গণতন্ত্র প্রেমী নাগরিকেরা। 

আসলে কি এটাই আমাদের দেশের উর্বর মস্তিষ্ক সম্পন্ন মানুষের সৌভাগ্য। এটাই কি 'ভারতের মহামানবের সাগর তীর '–  মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের জন্য খুবই হতাশাজনক। মানুষ যোগ্যতা ও পদমর্যাদা অনুযায়ী সম্মানিত হয় না কারণ মানুষ তাদের বোধগম্যতা ও বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমিতে আমরা পঙ্গু হয়ে গেছি এটা ইঙ্গিত দেয়।  এমন অনেক লোক আছে যারা কোলাহলের অর্থ সম্পর্কে অবগত নয় যে লোকেদের পিছনে ছুটছে।

গণতন্ত্রের পীঠস্থানে রাজতন্ত্রের প্রতীক 'সেঙ্গোল ' স্থাপন এবং আনুষ্ঠানিক রাজদণ্ড গ্রহণ পুনরায় গণতন্ত্র থেকে রাজতন্ত্রের দিকে পুনর্যাত্রার সূচনার মহড়া হয়ে গেল!! এই নতুন যাত্রাপথে একজনও সাহিত্যিক নেই, কবি নেই, শিল্পী নেই, বিজ্ঞানী নেই, দার্শনিক নেই। আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং শাসন বিভাগের সর্বোচ্চ পদাধিকারী মাননীয় রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি কে সংসদ ভবন উদ্বোধনে ব্রাত্য রাখা হয়েছে। সতী দাহ ,বর্ণভেদ, অপবিজ্ঞান, নারীকে ভোগ্য পন্যে পরিণত করা, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলিত, নিম্নবর্ণের হিন্দু ও সংখ্যালঘুকে পিষে মারা — ভয় হয় অদূরে কি রয়েছে। ধর্মপ্রবণতা রাষ্ট্র ও তার নাগরিকদের মৌলিক কর্তব্যকে গ্রাস করেছে এবং দূরের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।  এটা খুবই দুঃখজনক যে মানুষ নেতিবাচক পরিণতি বুঝতে পারেনি আর যারা ব্যাখ্যা করছেন তাঁরাও ব্যর্থ হয়েছেন।  তাহলে সত্যিই কি আজ অন্ধ, কালা, আর বধির !! না, না, 'এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না'!

প্রসঙ্গকথা : শতবর্ষে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’


১।

সেদিন নাকি খুব বৃষ্টি পড়েছিল। ডিসেম্বরের কনকনে ঠান্ডা। ১৯২১ সাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রেশ কাটেনি। নজরুলের ঘরের একদিকে মুজফ্ফরের নানারকম বই। বিভিন্ন সভায় যাচ্ছেন, বক্তৃতা দিচ্ছেন তিনি। আর নজরুল সেসব পর্যবেক্ষণ করছেন। রাশিয়ার বিপ্লবে তখন ফুটছে লক্ষ লক্ষ বাঙালি রক্ত৷ নজরুলও বুঝি তাঁদেরই একজন! সেই ডিসেম্বরের রাতেই নজরুল লিখে ফেললেন একটি কবিতা, নাম দিলেন ‘বিদ্রোহী’। লিখলেন—

আমি ঝঞ্ঝা,আমি ঘূর্ণি,
আমি পথ-সমুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’।

আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই,
আমি মুক্ত জীবনানন্দ।

আমি হাম্বার,আমি ছায়ানট,আমি হিন্দোল
আমি চল-চঞ্চল,ঠমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
ফিং দিয়া দিই তিন দোল ;
আমি চপলা-চপল হিন্দোল।
আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা
করি শত্রুর সাথে গলাগলি,
ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা
আমি উন্মাদ,আমি ঝঞ্ঝা!

আমি মহামারী আমি ভীতি এ ধরিত্রীর;
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার
আমি উষ্ণ চির-অধীর।

বল বীর-
আমি চির-উন্নত শির!”

ঔপনিবেশিক শোষণ, সামন্ত মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহী রূপে ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় আবির্ভূত হয়েছেন নজরুল। রোমান্টিক অনুভববেদ্যতায় মানবতার সপক্ষে তিনি উচ্চারণ করেছেন বিদ্রোহের বাণী, সত্য-সুন্দর-মঙ্গল ও শান্তির বাসনায় তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন যাবতীয় অপশক্তির বিরুদ্ধে, ধর্মীয় শোষণের বিরুদ্ধে এবং জীর্ণ-সনাতন মূল্যবোধের বিরুদ্ধে। পরাধীনতার গ্লানিতে নজরুলচিত্ত দীর্ণ হয়েছে এবং এই গ্লানি থেকে মুক্তির অভিলাষে তিনি হয়েছেন বিদ্রোহী। তবে কেবল দেশের স্বাধীনতা কামনাতেই তাঁর বিদ্রোহীচিত্তের তৃপ্তি ছিল না—তাঁর বিদ্রোহ ছিল একাধারে ভাববাদী ও বস্তুবাদী। তাঁর বিদ্রোহ ছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার, সকল আইন-কানুনের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ, 'ইতিহাসনিন্দিত চেঙ্গিসের মতো নিষ্ঠুরের জয়গানে মুখর, ভৃগুর মতো ঈশ্বরের বুকে পদাঘাত-উদ্যত, মানবধর্ম প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়সংকল্প, ধ্বংসের আবাহনে উচ্ছ্বসিত, সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় উদ্বেলিত'।

‘বিদ্রোহী’ কবিতার রচনাকাল ছিল সারা পৃথিবীর জন্য অস্থির সময়। বিদ্রোহী কবিতায় নজরুলের বিদ্রোহী চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। নজরুল বিদ্রোহ করেছেন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে, শৃঙ্খলপরা আমিত্বের বিরুদ্ধে। এই কবিতা রচনার জন্য নজরুল ‘বিদ্রোহী কবির আখ্যা পেয়েছেন। খেটেছেন জেলও। কবি লর্ড বায়রন বলেছেন, ‘এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আমি বিখ্যাত হয়ে গেছি।’ ১৮১২ সালে ‘চাইল্ড হ্যারল্ডস পিলগ্রিমেজ’ কবিতাটি প্রকাশের পর কবি হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়ে এ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন বিস্মিত বায়রন। বাংলা সাহিত্যে ঠিক এ রকমই ঘটনা ঘটেছিল কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের পর। ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় কবিতাটি মুদ্রিত হলে দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় ১৩২৮ সংখ্যায় এটি ছাপা হয়েছিল। প্রায় কাছাকাছি সময়ে ‘প্রবাসী’, ‘সাধনা’, ‘ধূমকেতু’ ও দৈনিক ‘বসুমতী’সহ বেশ কিছু পত্রপত্রিকায় কবিতাটির পুনর্মুদ্রণ হয় যা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে জানা যায়। একই কবিতা এত বেশিসংখ্যক পত্রপত্রিকায় প্রকাশের ঘটনাও সম্ভবত এটিই প্রথম। লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে অসম্মান ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো মানুষের সাহসের উচ্চারণ হয়ে উঠেছে বিদ্রোহী কবি নজরুল।

নজরুলের উত্তরসূরী মার্কিন কবি ল্যাঙ্গস্টোন ইউজের ' Let America be America Again ' কবিতায় নজরুলের বিদ্রোহী ও সাম্যবাদী কবিতার প্রতিধ্বনি। নজরুল সমসাময়িক ইংরেজি দৈনিক 'অমৃতবাজার পত্রিকা'র সম্পাদক স্বনামধন্য শ্রী তুষারকান্তি ঘোষ তাঁর উক্ত পত্রিকায় ১৯৬২ সালের একটি সংখ্যায় মন্তব্য করেন — 'If Nazrul Islam written only his poem 'Bidrohi' (The Rebel) he would have been famous'. সেই জায়গা থেকে হয়তো ডক্টর সুশীল কুমার তাঁর নজরুল চরিত মানস গ্রন্থে বলেছেন — 'Nazrul the gift of the century'.  'বিদ্রোহী'র প্রথম 'লিটারারি' তরজমা সম্ভবত অধ্যাপক বিনয় কুমার সরকারের করা — Say, Hero!/ Say Erect is my head !/ Seeing my head the Himalayan Peak/ Bends low in shame। তদানীন্তন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি 'বিদ্রোহী' , 'সাম্যবাদী', 'নারী', 'দারিদ্র্য', 'ভাঙ্গার গান' প্রভৃতি রচনার মধ্য দিয়ে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে নিজেও স্বতন্ত্র ভাবমূর্তি করে তোলেন। যেখানে বাংলা ভাষার ব্যাপক এবং সার্থকভাবে বিদেশি শব্দের ব্যবহার করেন নজরুল। জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিলেন কবি। এইসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নজরুলের বিশ্বচেতনা সমৃদ্ধ হয় ও তিনি ক্রমান্বয়ে আরও সোচ্চার হন খেটে খাওয়া নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের দাবিতে।

‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুল ইসলাম সৃষ্টিকে স্থাপন করেছেন আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক জীবন বাস্তবতার জটিল আবর্তে। 'কবিতা তাই হয়ে উঠেছে সামাজিক দায়িত্ব পালনের শাণিত আয়ুধ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুলের বিদ্রোহচেতনার মাঝে লক্ষ করা যায় ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্য : ক. অসত্য অকল্যাণ অশান্তি অমঙ্গল এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ; খ. স্বদেশের মুক্তির জন্য ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ; এবং গ. শৃঙ্খলপরা আমিত্বকে মুক্তি দেওয়ার জন্য বিদ্রোহ।' নজরুলের বিদ্রোহচেতনাকে নানা মাত্রায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে—কখনো তা হয়েছে সদর্থক, কখনো বা নেতিবাচক। তবে তাঁর বিদ্রোহীসত্তাকে যেভাবেই দেখা হোক না কেন, তা ছিল মূলত সৃষ্টিশীল। তাঁর বিদ্রোহ সৃষ্টিশীল বলেই ধ্বংসের মাঝে তিনি খুঁজে পেয়েছেন নতুন সৃষ্টির উৎস।

২।

'বিদ্রোহী’ কবিতায় মোট পঙক্তি সংখ্যা ১৪৭। এই কবিতায় নজরুল অনেক রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন ভাব-ভাষা ছন্দ-চিত্রকল্পের কারুকার্যে।
শব্দ-ব্যবহারে নজরুলের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য এই যে বাংলা কাব্যে তিনি একটি নিজস্ব কবিভাষার জনয়িতা। রাবীন্দ্রিক স্বাতন্ত্র্যের পর বাংলা কাব্যে তিনি প্রকৃত অর্থেই নির্মাণ করেছেন একটি নতুন কবিভাষা। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাতেই আমরা নজরুলের স্বকীয় কবিভাষার প্রাথমিক প্রকাশ বিশেষভাবে লক্ষ্য করি। তৎসম-তদ্ভব-দেশি শব্দের পাশাপাশি আরবি-ফারসি শব্দ নজরুল আলোচ্য কবিতায় সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন। শব্দ-ব্যবহারে নজরুলের কৃতিত্ব হলো—নতুন হোক পুরাতন হোক, দেশি হোক বিদেশি হোক—শব্দের সংগীতধর্ম ও ধ্বনিগুণ ব্যবহারে তিনি ছিলেন অসাধারণ কুশলী শিল্পী।

বিষয়ভাবনা এবং জীবনার্থের মতো, শব্দ-ব্যবহারেও ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কোনরূপ দাসত্ব স্বীকার না করে স্বাধীন স্ফূর্তিতে তিনি চয়ন করেছেন তাঁর প্রিয় শব্দরাজি। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ব্যবহৃত তৎসম, তদ্ভব, দেশি বা বিদেশি শব্দের মধ্যে নেই কোনো জাতবিচার। এ কবিতায় ওজোধর্মী সংস্কৃত শব্দের পাশেই ভেদিয়া, ছেদিয়া, ভীম ভাসমান মাইন, ঠমকি দমকি, হরদম ভরপুর মদ, তুড়ি দিয়া ইত্যাদি শব্দ বা শব্দবন্ধ অবলীলায় ব্যবহৃত হয়েছে। এ কবিতায় নজরুলের শব্দচেতনায় এখানেই স্বাতন্ত্র্য যে তিনি ধ্বনি-প্রবাহের অনুগামী করে শব্দের মধ্যে নিয়ে এসেছেন প্রবল জীবনাবেগ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় শব্দ-ব্যবহারের এই নতুন পরীক্ষা আধুনিক বাংলা কবিতার বিকাশকে সদর্থক মাত্রায় করেছে প্রভাবিত।

'বক্তব্যের অনুক্রম অনুযায়ী কবিতাটিকে মােট দশটি স্তবকে ভাগ করা যায়। প্রথম স্তবকে আমি’-র শক্তিমত্তার পাশাপাশি রয়েছে বিজয়ের প্রত্যয় , আর এই বিজয়ের জন্য প্রয়ােজন আঘাতকারীর। আমি’-র ধ্বংসাত্মক রূপ, যা কবিতাটির ১১ থেকে ২৭ পঙক্তি পর্যন্ত ঘূর্ণিত: ‘আমি ঝঞা, আমি ঘূর্ণি। আমি পথ সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি। শক্তির উদ্বোধন ও সংহারচিত্রের পরই হঠাৎ শুরু হলাে মিলনের নৃত্যপাগল ছন্দ। ২৮ থেকে ৩৭ পঙক্তি পর্যন্ত আমি এমন এক মুক্ত জীবনান্দ, যে শত্রুর সাথে গলাগলি করে, আবার মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে। কিন্তু মিলনের এই আকাঙ্ক্ষার পর পরবর্তী দুই পঙক্তিতে ‘আমি’ আবার মহামারী, ভীত, শাসন-ত্রাসন ও সংহার রূপে আবির্ভূত। তারপর ৪২ থেকে ৫১ সংখ্যক পঙক্তিতে আবার আছে উদ্দাম ইতিবাচকতা, হােমশিখা, উপাসনা, নিশাবসানের আকাঙ্ক্ষা। আর এই অংশের ৪৯ তম পঙক্তিতেই আছে সেই জাদুকরী সরল স্বীকারােক্তি:মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য।'

৩।

বর্তমান সময়ে নানা রকম অসাম্যের ভীড়ে আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করি ‘ বিদ্রোহী’ কবিতার প্রাসঙ্গিকতা ও তার অম্লান তাৎপর্যের কথা। উপনিবেশবাদের অবসান ঘটলেও বিশ্বায়নের শৃঙ্খল আর পুঁজিবাদের শােষণ বঞ্চনা অত্যাচার নির্যাতনসহ আর্থসামাজিক বৈষম্য সবকিছুই বলবৎ আছে। অন্যদিকে মানুষের শক্তির প্রতি, তার বীরত্বের প্রতি অনাস্থাও সমানভাবে অটুট। তাই নজরুলের ভাষায় — 'শান্ত থাকার অবকাশ মিলছে চতুষ্পর্শের প্রতিবাদহীন মেরুদণ্ডহীনতার পরিপ্রেক্ষিতে বিপুল কাম্য হয়ে উঠেছে উন্নত মম শির’- এর বজ্ৰদীপ্ত ঘােষণা। শােষণ পীড়ন আর বৈষম্য থেকে মুক্তির সংকল্প নিয়ে মানুষের আপন শক্তির উদ্বোধন ঘটিয়ে নজরুল কথিত বিদ্রোহের রণে অশ্লীন হওয়ার যেন বিকল্প নেই। 

অত্যাচারীর 'থঙ্গ কৃপাণে’র তলে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রােল’ এই বাংলার বিশেষ করে আসাম সহ গোটা উত্তরপূর্বের আকাশে -বাতাসে আজও প্রতিনিয়ত ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত। ভারতের উত্তর-পূর্বের সবচেয়ে বড় রাজ্য হল আসাম।এখানে অসমিয়াদের সঙ্গে আছে প্রচুর বাঙালি, হিন্দিভাষী, বড় জনগোষ্ঠী, মার,ডিমাসা,কার্বি, মিসিং,আহোম,মণিপুরি সহ ছোট ছোট জনসমাজ। শাসকগোষ্ঠীদের দায়িত্ব ছিল সবাইকে নিয়ে সুষ্ঠু সুন্দরভাবে জীবন পরিচালনার মানদন্ড বৃদ্ধি করার। কিন্তু দেশভাগ অর্থাৎ স্বাধীনতার পর থেকেই আধিপত্যবাদী অসমীয়া রাজনৈতিক সমাজ অসমীয়াকরণের পথে তার দাপট কায়েম করে চলছে। আধিপত্যবাদের সন্ত্রাসে আমরা আক্রান্ত। একদিকে আগ্রাসনের শিকার আর অন্যদিকে বিভাজনের রাজনীতি। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিষে যুক্তিহীনভাবে বিভাজিত হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালি। তাই বাঙালির শত্রু ঘরে বাইরে। এই সময়ে নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতা আমাদের অনন্ত প্রেরণা। বাঙালি মানসে কবিতাটি ‘চির উন্নত শির’ বিরাজমান।

পরাধীনতার জরাজীর্ণ সময়ে নজরুলের আবির্ভাব ছিল ধূমকেতুর মতো। ধূমকেতুর মতােই তিনি যুদ্ধ ঘােষণা করেছেন দাসত্বের বিরুদ্ধে, শােষণে শােষণে জর্জরিত জীর্ণ সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তাঁর এই বিদ্রোহ সমাজের সর্বস্তরে ধেয়ে চলেছে। এই একবিংশ শতাব্দীতে কোনো কবি এমন কবিতা লিখতেন হয়তো জেলবন্দি থাকতে হত তাঁকে৷ সত্যিকার অর্থে এক নজরুল জন্মেছিলেন বাংলা ও বাঙালির ভুবনে। সব মিলিয়ে পুরোপুরি সৃষ্টিশীল এক মানুষ — যখন যা পেরেছেন দিয়ে গেছেন 'সৃষ্টি সুখের উল্লাসে'। নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতা আমাদের জাগরণের স্মারক। দুঃশাসন থেকে মুক্তির জন্য 'বিদ্রোহী' কবিতা এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম। এই কবিতাটি পৃথিবীর বঞ্চিত, শোষিত নিপীড়িত-নির্যাতিত, পরাধীন সকল জাতির মুক্তিসংগ্রামের অনবদ্য শক্তির তেজোদীপ্ত উৎস।

তথ্যসূত্রঃ
১। "কাজী নজরুল ইসলাম: 'বিদ্রোহী' কবিতার একশো বছর, ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে যেভাবে লেখা হয়েছিল” । বিবিসি বাংলা।
২। চৌধুরী, দিলিপ (২০০৬-০৯-২২)। "Nazrul Islam: The unparalleled lyricist and composer of Bengal" (HTML) I (2
ইনফরমেশন ব্যুরো, ভারত সরকার। সংগ্রহের তারিখ ২০০৬-০৯-২২।
৩। আচার্য, সুব্রত; কলকাতা (২০১৭-০৫-২৫)। ” 'বিদ্রোহী’ কবিতার আঁতুড়ঘর” | The Daily Star Bangla (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০১-১৬।
৪। আন্তর্জাতিক নজরুল : আবু রিদা সম্পাদিত।
৫। দাস, অভিজিৎ (নভেম্বর ২০১৮)। "নজরুলের হারামণি"। শিক্ষা পাতা।
৬। কবিতার শিরোনাম হয়ে ওঠে কবির উপাধি :
 বিশ্বজিৎ ঘোষ।
৭। 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ ও সমাজ বাস্তবতা :
হাফিজ বিন রহমান।
৮। শতবর্ষে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ : তরুণ কবির স্পর্ধা সেদিন ঝড় তুলেছিল : সুমন সাধু।
৯। "চির-উন্নত মম শির :: শেষের পাতা :: কালের কণ্ঠ"।
web.archive.org। ২০১৫-০৩-১৫। Archived from the original on ২০১৫-০৩-১৫। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০১-১৬।
১০। বিদ্রোহীর বিস্তীর্ণ আকাশ জুড়ে কাজী নজরুল ইসলাম : ফারুক আহমেদ।

জলবায়ু মোকাবিলার লড়াই ও ভোগবাদী আগ্রাসন


দুনিয়ায় শুধু মানুষই যে উদ্বাস্তু হয়ে যাচ্ছে তা কিন্তু নয়। গাছপালা কেটে, নদীনালা বুজিয়ে তথাকথিত সভ্যতার উন্নয়নের ধ্বজা ওড়ানো চলছে বীরবিক্রমে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ অনেকাংশেই একটি বাৎসরিক অনুষ্ঠান মাত্রে পরিণত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী মদদপুষ্টরা ফাইব ষ্টার হোটেলের এসি রুমে বসে কিছু সেমিনারের আয়োজন করে কুমির কান্নায় সাসটেইনেবল ডেভলাপমেন্টের পরিকল্পনা, ব্যাস!! ১৯৭২ সালে স্টকহোম বিশ্ব সম্মেলনে পরিবেশ রক্ষার যে সংকল্প নেওয়া হয়েছিল, তাকে এখনো সর্বত্রগামী করা যায়নি। রিও ডি জানেইরোর অতি সাম্প্রতিক বসুন্ধরা সম্মেলন এবং জি-৭ বৈঠকে দূষণ রোধে মতানৈক্য সেকথাই প্রমাণ করে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, সব দেশেই পরিবেশরক্ষার জন্য বহু আইন তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো প্রয়োগ নিয়ে কোনো আলোচনাই শোনা যায় না। অন্যান্য আইনে দণ্ডিত আসামিদের সমাজ যে চোখে দেখে, পরিবেশ আইন ভঙ্গকারীদের সে চোখে এখনো দেখতে শেখেনি। কারণ আমরা প্রত্যেকেই কমবেশি পরিবেশ আইন ভেঙে চলেছি রোজ।

গত শতাব্দীর শেষ দিকে বিজ্ঞানীরা দেখলেন যে পৃথিবীর বৈশ্বিক উষ্ণতা বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি বিভিন্নভাবে পৃথিবীর জলবায়ু  ও জীববৈচিত্র্যের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণকারী সংস্থা ইন্টার গভার্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি মানবসৃষ্ট বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ কবলে পড়েছে ভারত। ভারত ও তার প্রতিবেশী দেশগুলির জলবায়ু এমন জায়গায় পৌঁছতে শুরু করেছে যখন তা মানুষের স্বাস্থ্যকে বিপন্ন করছে। ২০১৮সালের একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের কাছে থাকার পরিস্থিতি প্রায় নেই। অথচ পাঁচ বছর পরেই এই গ্রীষ্মের শুরুতেই ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল সেই তাপমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। পারস্য উপসাগর থেকে পাকিস্তান হয়ে ভারতের উত্তর প্রান্তে তাপপ্রবাহ নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশ্বের জলবায়ু এখন লা নিনা চক্রের মধ্যে রয়েছে। অপেক্ষাকৃত শীতলতর গ্রীষ্ম হয় এই চক্রে। কিন্তু এর পরের পর্যায়েই এল নিনো চক্র শুরু হবে যা পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

সাম্রাজ্যবাদের যুগে ক্রমবর্ধমান দূষণ ও শোষণের কবলে পড়ে পরিবেশ সংকট যতই বাড়ছে, ততই ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কিছু ভ্রান্ত ধারণাগুলো। এরমধ্যে সরাসরি সম্প্রচার করা হয় তাহলো — পরিবেশের এই দুরাবস্থার জন্য সাধারণ জনগণকে দায়ী করা। পুঁজিবাদী উৎপাদনের নিয়ম হলো বর্ধিত হারে পুনরুৎপাদন। যারফলস্বরূপ একদিকে যেমন উৎপাদন এগিয়ে চলে আর অতিউৎপাদনের সংকটে, অন্য দিকে দেখা যায় প্রাকৃতিক সম্পদের অবাধ শোষণ। বর্ধিত হারে পুনরুৎপাদন ছাড়া পুঁজিবাদী ব্যবস্থা টিকতে পারে না। তাই এই ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক সম্পদের শোষনের কোনো সীমা নেই। একটি প্রবন্ধে পড়েছিলাম ‘Scientists linking fossil fuels with climate change and The climate change began in 1960।’ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব জিওগ্রাফির একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, প্রবল গরম ও খরার মুখোমুখি হতে চলেছে বিশ্বের ৯০ শতাংশ মানুষ। নেচার সাসটেইনেবিলিটি পত্রিকায় প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রবল উষ্ণায়ন ও স্থলভাগে জলের সংকট- এ দুই কারণে পৃথিবীজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দশ গুণ বাড়বে। কার্বন নিঃসরণও সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে। এসব কারণে অর্থনীতিও প্রবাভিত হবে। ধনীরা আরো ধনী হবেন এবং গরিব আরো গরিব হবেন। খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে এ পরিস্থিতি।

ভারত পরিবেশগত দিক থেকে বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম দেশগুলোর মধ্যে ভারত একটি। 'গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-২০২৩' অনুযায়ী চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সবচেয়ে বিপন্ন বা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতের অবস্থান অষ্টম। বর্তমানে বৈশ্বিক তাপমাত্রা যে অবস্থানে রয়েছে সেটা বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বের শিল্পায়নের ফলাফল হওয়ায়  চীন, ভারত ও আরো কিছু উন্নয়নশীল দেশ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সব ধরণের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে পশ্চিমা বিশ্বকে এবং তাদেরকে কার্বন নিঃসরণও কমাতে হবে।  

উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর এই রেষারেষির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সূচক অনুসারে প্রথম দশটি ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রের ৮টিই স্বল্পোন্নত এবং ১টি মধ্যম আয়ের দেশ। রাষ্ট্রের মত বায়ুমন্ডল দূষণের কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই। এক দেশের উৎপন্ন কার্বন পুরো বায়ুমন্ডলকেই উত্তপ্ত করতে পারে, যার প্রভাব পুরো বিশ্বেই পড়বে। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর সেই প্রভাব মোকাবেলার সক্ষমতা থাকলেও দরিদ্র দেশগুলোর তা নেই। ফলে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা।

পরিবেশবান্ধব কৌশলগত অংশীদারিত্ব হ'ল রাজনৈতিক সহযোগিতাকে  এগিয়ে নেওয়া, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং পরিবেশ বান্ধব ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং  আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ এবং নানান সুযোগ মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদার করার জন্য পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে  প্যারিস চুক্তি এবং রাষ্ট্রসংঘের স্থিতিশীল উন্নয়নের  লক্ষ্যসমূহ  বাস্তবায়নের উপর গুরত্ব দেওয়া। প্লাস্টিক দূষণরোধসহ পরিবেশ রক্ষায় জলবায়ু পরিবর্তন, আমাদের দেশের ভূপ্রকৃতি ও এর অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যসহ নানা বিষয়ে প্রয়োজন সচেতনতা। পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণে তাই বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন ও সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অবিকল্প। জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change 2022) জেরে ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে কৃষি ও খাদ্য সংকট দেখা দিচ্ছে! Intergovernmental Panel on Climate Change (IPCC)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চরম জলবায়ু পরিস্থিতিতে সংকটের মুখে দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা (food Security)। জাতিসংঘের (UN) সংস্থার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change 2022) কারণে বাড়তে থাকা বন্যা ও খরায় সবচেয়ে জেরবার ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো।

জলবায়ু পরিবর্তন মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুটো কারণেই ঘটে। প্রাকৃতিক কারণগুলো হলো সমুদ্রতটের তাপমাত্রা ও হাওয়ার প্রবাহ। মানবসৃষ্ট কারণগুলো হলো অসততা, পরিবেশ বদল এবং জল ব্যবহারের প্রভাব। ভোগবাদ প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে প্রকৃতির দখল নিতে চায়, মানুষ বা জীবজন্তুর প্রাণের তোয়াক্কা করে না।এভাবেই আজ প্রকৃতি বিপর্যস্ত। এই লালসা এক প্রজন্মে শেষ হওয়ার নয়। বরং পৃথিবীর আয়ুক্ষয় ঘটানো লোভকেই স্বাভাবিক নীতি বানাতে চাইছে। ফলে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন চরম আকার ধারণ করেছে। এটি বিশেষভাবে পরিলক্ষিত যে ১৯৫১ সাল থেকে ৫০ ভাগেরও বেশি উষ্ণতা বৃদ্ধির পেছনে একত্রভাবে দায়ী মানবসৃষ্ট কারণ। রাষ্ট্রসংঘ জানিয়েছে ২০২৩ – ২০২৭ এই পাঁচটি বছর উষ্ণতার পাঁচটি বছর রেকর্ড করবে। তাইতো চিকো মেন্ডিসের মন্তব্য ছিল — “Environmentalism without class struggle is gardening”। ভোগবাদীদের বিরুদ্ধে কি কিছু করণীয় আছে না বিশ্ব সম্প্রদায়ের একটি সাধারণ বৈশ্বিক দায় — তা ভাববার বিষয় ?

Tuesday, June 13, 2023

অস্তিত্ব সংকটে : প্রসঙ্গ উত্তরপূর্বের বাঙালি


অস্তিত্ব সংকটে : প্রসঙ্গ উত্তরপূর্বের বাঙালি

‘রাজামশাইর কাপড় কোথায়' ? অদৃশ্য পোশাকে রাজার পথযাত্রার গল্পের সেই শিশুটির বিস্ময়োক্তি ঠিক একই ছিল। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা কেন অনেক ক্ষেত্রে, ধারাবাহিকভাবে মিথ্যার আশ্রয় নেন, তার কারণ বোঝা দুষ্কর। আসামে বাঙালি বিদ্বেষের ইতিহাস নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পরপরই সেই বিদ্বেষ নানান সময়ে নানান পর্বেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। সেকথা সকলেরই জানা। আর বিতর্কেরও শেষ নেই এই বহুভাষিক আসাম তথা উত্তরপূর্বের বাঙালিদের যথার্থ অবস্থান নিয়ে। অনেকেই বলতে শুরু করেছেন, সেসব এখন ইতিহাস। আসাম এখন শান্ত। সেখানে সকলে মিলেমিশে এক হয়ে বসবাস করছেন সম্প্রীতির বাতাবরণে। কিন্তু কথায় বলে চোখ বন্ধ রাখলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না।

১৯৪৭ সালে সৃষ্ট হয় ভারত ও পাকিস্তান। লাখ লাখ মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও রক্তনদী পেরিয়ে রাজনীতিবিদেরা ভেবেছিলেন ‘সমস্যার সমাধান হলো’। কিন্তু মানুষের লোভ-লালসা ও স্বার্থ-সুবিধার সঙ্ঘাত চিরন্তন। ১৯৪৭ সালের সীমানাপ্রাচীর সঙ্ঘাতের অবসান করেনি, বরং যোগ করেছে নতুন মাত্রা। কে প্রকৃত নাগরিক আর কে প্রকৃত নাগরিক নয়, তার সঙ্ঘাত চলে আসছিল সাত দশক ধরে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩১ আগস্ট ২০১৯ প্রকাশ হয়েছে আসামের প্রকৃত তথাকথিত নাগরিক তালিকা। মোট আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল তিন কোটি ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৬৬১। চূড়ান্ত তালিকায় নাম আছে ৩ কোটি ১১ লাখ মানুষের। বাদ পড়েছে ১৯ লাখ ছয় হাজার। আসামের এই দীর্ঘায়িত সঙ্কট অসমিয়া বনাম বাঙালি। 

আসামের বাঙালি জীবনের ভূমিতল সত্যের ভিতটা গণভোট ও দেশভাগের হঠাৎ ঘায়ে যখন ছিন্নভিন্ন অবস্থা থেকে একটু থিতু হচ্ছে তখনই বলা হয় বাঙালি বিদেশি, বলা হয় বাংলায় পড়াশুনা করা যাবে না স্বাধীন দেশে, তাড়াতে হবে স্বভূমি থেকে বাঙালিকে, তাঁবু গোটাতে হবে। কিন্তু বাঙালি যাবে কোথায়, কেন যাবে বংশ পরম্পরায় আসামবাসী বাঙালি। স্থায়ী বসতি থেকে উৎখাতের রাষ্ট্রীয় চক্রান্তের বিরুদ্ধে বাঙালি প্রথম প্রতিবাদ করে ১৯৬১র উনিশে মে আর সেদিনই এগারোজন শহিদ হন, স্বাধীন দেশে প্রথম ভাষাশহিদ। এর পরেও দফায় দফায় শহিদ হয়েছেন দক্ষিণ আসামে, এমনকি উত্তর আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায়ও চোরাগাপ্তা বাঙালি হত্যা হয়েছে। গোরেশ্বর হত্যাকাণ্ড হয়েছে নেলির চরমানুষদের হত্যা হয়েছে। এমন যখন অবস্থা তখন আসামের বাঙালি সর্বাত্মক প্রতিরোধে নেমেছে যার যেমন ক্ষমতা সেই অস্ত্র হাতে। আসামের বাঙালির কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারী কবিতায় জানিয়েছেন তাঁর ক্ষোভ, ‘যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সে-ই কেড়েছে ভয়, আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়।'

Wednesday, April 12, 2023

ভগত সিং ও নতুন ভারত গড়ার লক্ষ্য


( ১ )
"কেন আমি নাস্তিক" প্রবন্ধে ভগৎ সিং লিখেছেন, "যে মানুষ প্রগতির পক্ষে তাকে পুরোনো বিশ্বাসের প্রত্যেকটি বিষয়কেই চ্যালেঞ্জ করতে হবে। যথেষ্ট যুক্তিতর্ক ও বিচার-বিবেচনার পর যদি কেউ কোনো তত্ত্ব বা দর্শনে বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে তার বিশ্বাসকে স্বাগত জানাতে হয়। তার চিন্তাভাবনা ভুল বা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। কিন্তু তা শোধরানোর সুযোগ আছে, কারণ সে পরিচালিত হয় বিচারবুদ্ধির দ্বারা, অন্ধবিশ্বাসের দ্বারা নয়। বিশ্বাস ও অন্ধবিশ্বাস বিপজ্জনক, তা মস্তিষ্ককে অকোজো করে দেয়, মানুষকে প্রতিক্রিয়াশীল বানিয়ে তোলে।" উক্ত বইতে লেখা আছে- "যে দেশের যুবসমাজ দেব-দেবী, ধর্মের পিছনে দৌড়াতে থাকে, তাদের জন্য আমি কাপুরুষ শব্দ ব্যবহার করা উচিৎ বলে মনে করি। এই রকম যুবসমাজের হাতে দেশের ভার গেলে সেখানে কিছুই ভালো হওয়া সম্ভব নয়।"

ভগৎ সিং যে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন সেখানে ছিল না কোন শোষণ। এক শ্রেণীহীন সমাজ। সেটা শুধুমাত্র ব্রিটিশদের অধীনতা থেকে মুক্তি নয়। ভগৎ সিং এর উক্তি - "আমি একজন বাস্তববাদী, শাণিত যুক্তি-বিজ্ঞানই আমার হাতিয়ার, তাই দিয়েই আমি আমার ভিতরের প্রবৃত্তিকে জয় করতে চাই। এই ব্যাপারে যে আমি সবসময়ই সফল হয়েছি তা নয়, কিন্তু আমাদের উচিত বারে বারে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, কেননা সাফল্য নির্ভর করে ঘটনাচক্র আর বাস্তব পরিস্থিতির উপরে।"

( ২ )

ইনকিলাব জিন্দাবাদ একটি অসম্পূর্ণ স্লোগান। ভগৎ সিং সম্পূর্ণভাবে যে স্লোগান ধরেছিলেন, বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক, সাম্রাজ্যবাদের পতন হোক। সাম্রাজ্যবাদ মানে সেই এলাকা দখল করে অন্যের পরিশ্রম ও সম্পদ দখল করে নিজের সাম্রাজ্য বানানো। পূর্বে এই কাজ করত এক দেশ অন্য দেশের উপর। আজ অভ্যন্তরীণ সাম্রাজ্যবাদ অবিরাম অব্যাহত রয়েছে। তাঁর বুলডজারিয় উচ্ছেদ অভিযান আগ্রাসন চালাচ্ছে জোর কদমে। আদানির কালো ব্যবসা নিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বেশ চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেছে। মরিশাস-ভিত্তিক শেল কোম্পানি ইলোরা ক্যাপিটাল আদানি প্রতিরক্ষা সংস্থার সহ-মালিক। ইলোরা একই কোম্পানি যার নাম হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ রিপোর্টে বিশিষ্টভাবে স্থান পায়। ইলোরা আদানি প্রতিরক্ষা সংস্থা আলফা ডিজাইন টেকনোলজি প্রাইভেট লিমিটেড (ADTPL) এর সহ-মালিক এবং ৯000 কোটির বিনিয়োগ রয়েছে৷

 হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ প্রকাশ করেছে যে ইলোরা নামে একটি কোম্পানি আদানি গ্রুপে 24,766 কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে যা তার মোট মূলধনের 99%। এটা স্পষ্ট যে এটি একটি জাল কোম্পানি যার মাধ্যমে আদানি গ্রুপে কালো টাকা লেনদেন করা হয়।  আদানি ডিফেন্স ISRO এবং DRDO-এর সাথে কাজ করে।  মানে ভারতের নিরাপত্তা খাত কালো টাকা মাফিয়ার হাতে চলে গেছে। গ্রামগুলো শহরের সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে; শহর কিছুই বাড়ায় না কিন্তু সবচেয়ে বেশি খায়। জল, বিদ্যুৎ, কয়লা, সোনা, রূপা, লোহা, টিন, কয়লা, শস্য, দুধ, মাছ,মাংস, ফলমূল, শাকসবজি, ডিম গ্রামে রয়েছে। সে শহরে নিজের জন্য কাগজের নোট ছাপিয়েছে, এটাই তার সম্পদ। ক্রয় করছে মানুষ থেকে শুরু করে জমি।

কিন্তু প্রকৃত সম্পদ তো রয়েছে গ্রামেই। যখন গ্রাম শহর থেকে জাল সম্পদের জন্য আসল সম্পদ বিনিময় করতে অস্বীকার করে ঠিক তখনই শহর তার বুলডজার কে গ্রামে পাঠায়। গ্রাম গুড়িয়ে, জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, গ্রামবাসীদের মারধর করা হয়, জেলে ঢোকানো হয়। পুলিশ পোস্ট বসানো হয়, শহরের শর্তে তাদের মালামাল শহুরে প্রাণীদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়। আজ দুর্বল অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন করা হচ্ছে এবং তাদের পাঠানো হয় জনগণের সম্পদ ও শ্রম দখলের জন্য। এটা অভ্যন্তরীণ সাম্রাজ্যবাদ যেখানে ভগৎ সিং বলেছিলেন, এটা একটা যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধ ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার পরেও থামবে না। এই যুদ্ধে আমাদের নারীরা ধর্ষিত হচ্ছে, শিশুদের হাত কেটে দেয়া হয়, জীবন্ত পুড়িয়ে দেয়, পুরুষরা জোরপূর্বক ঘর থেকে টেনে হেঁচড়ে গুলিবিদ্ধ হয়। আমার মত একজন স্বার্থপর ব্যক্তি জীবিত ভগত সিং এর সমর্থক হতে পারি না, শুধুমাত্র মৃত ভগৎ সিংকে পূজা করার ভান করতে পারি। আর যেটুকু ভগৎ সিংয়ের প্রশংসা করি না কেন কিন্তু এর মধ্যে যদি আদানি মার্কা গন্ধ থাকে তবে নেহাৎ ভন্ডামী ছাড়া আর কি বলা যায়!

( ৩ )

যদি প্রার্থনা, উপবাস, আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মকর্ম থেকে কোনো উপকার পাওয়া যেতো তবে পুঁজিপতিরা তাও দখল করে নিত। এবং সাধারণ জনগণকে তা করার কোন পারমিশন ও দিতো না। কিন্তু বড়ই করুন সত্য যে উপরওয়ালার প্রার্থনা কোন সাহায্যে আসে না। সেজন্য পুঁজিপতিরা গরীব মানুষের জন্য এটা ছেড়ে দিয়েছে এবং তাঁরা এটাও জানে যে নিম্নবিত্ত এতে আটকে থাকবে। অথচ দেখুন একটা মজার বিষয় হলো পুঁজিপতিরা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করে নিচ্ছে, ব্যাংকে রাখা টাকা লুট করছে, আমরা বেরোজগার হচ্ছি। আমাদের ব্যবসা দখল করে সম্পত্তি হাতিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারে ক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখতে পুঁজিপতিরা শাসকশ্রেণীর সঙ্গে মিলে আমাদের পরস্পরের লড়াইয়ে লিপ্ত করছে। ধর্মের ভিত্তিতে একে অপরকে ঘৃণা করার ফাঁদে ফেলছে।অন্য ধর্মের বা অন্য বর্ণের ছেলেমেয়েরা একে অপরকে জীবন সঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়াতে তাদের হত্যা করা হচ্ছে। আমাদের কি চিন্তা করার সময় আছে, আমাদের অজ্ঞতা আমাদের সন্তানদের জন্য কি ধরনের জগৎ তৈরি করেছে!

রাজনীতি সাধারণত দুই ধরনের হতে পারে,প্রথম বাস্তব রাজনীতি মানে এমন রাজনীতি যা জনগণের সমস্যার সমাধান করে। যেমন কর্মসংস্থান, শিক্ষা, শোষণ থেকে শ্রমিকের মুক্তি, কৃষকের উন্নতি, নারীর সমতা, জাতপাত, সাম্প্রদায়িকতা থেকে সমাজকে মুক্ত করার রাজনীতি ইত্যাদি। আরেকটা রাজনীতি হচ্ছে বোকা বানানোর রাজনীতি, সেই রাজনীতিতে এক ধর্মের সম্মানের নামে রাজনীতি।কিছু বর্ণের আধিপত্যকে ভিত্তি করে, ভুয়া জাতীয়তাবাদের স্লোগান তোলা হয়, কাল্পনিক শত্রু উদ্ভাবন করা হয়, অহেতুক বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, সেনাবাহিনীর নামে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়, কিছু সম্প্রদায়কে শত্রু ঘোষণা করা হয়। প্রথম রাজনীতি সমাজের উন্নতির দিকে নিয়ে যায়, জীবন সুখী হয়, কিন্তু দ্বিতীয় ধরনের রাজনীতির ফলে সমাজে ভয়, বিদ্বেষ ও সহিংসতা বাড়তে থাকে। দ্বিতীয় প্রকারের রাজনীতিতে জনগণের জীবনসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ হয় না, শুধু শব্দগুচ্ছ থাকে। দ্বিতীয় প্রকারের রাজনীতির একটি লক্ষণ হলো, ধীরে ধীরে মৌলবাদ বাড়তে থাকে, নতুন গুন্ডারা পুরনো গুন্ডাদের উদারপন্থী বলে নিজেদের হাতে ক্ষমতা দখল করে এবং ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ নির্বোধ ও নিষ্ঠুর নেতা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড়,এর পর এই রাজনীতির সুনিশ্চিত অবসান।কারণ হিংসা ধ্বংসাত্মক, এই আগুন সবাইকে পুড়িয়ে দেয়,ধরুন, ভারতে যদি সংঘের স্বেচ্ছাচারিতা চলতে দেওয়া হয়, তাহলে তারা সর্বোচ্চ কী করবে? তারা কি একসাথে মুসলমান, খ্রিস্টান, কমিউনিস্ট, ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবে? সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় তারা ভারতে আট থেকে দশ কোটি মানুষকে হত্যা করবে,কিন্তু তাতে না মুসলিম, না খ্রিস্টান, না কমিউনিস্ট মতাদর্শ পৃথিবী থেকে শেষ হবে না, নতুন বুদ্ধিজীবীদের জন্মও বন্ধ হবে না। কিন্তু এর পর হিন্দুত্বের রাজনীতি নিশ্চিতভাবেই চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। তারপরে ভারত অবশ্যই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সঠিকভাবে তার কাজ চালিয়ে যাবে।

আসলে হিটলারও সেটাই করেছিলেন,তিনি নিজেকে পুরাতন ও তাঁর জাতিকে বিশ্বের সেরা জাতি হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। ইহুদিদেরকে তাঁর দেশের সমস্যা বলে ঘোষণা করেন। এক কোটি বিশ লক্ষ নারী, শিশু, যুবক ও বৃদ্ধকে তাদের বাড়িঘর থেকে বের করে বিষাক্ত গ্যাস ছেড়ে মেরেছিলেন। তিনি শুধু ইহুদিদের হত্যা করেননি, কমিউনিস্ট, বুদ্ধিজীবী, উদারপন্থী, ভিন্নমতাবলম্বী, সমকামী, মুক্তিকামী মানুষের হত্যা করেছিলেন। কিন্তু হিটলার শেষ পর্যন্ত নিজেকে গুলি করেছিলেন।জার্মানি দুই খন্ডে বিভক্ত হয়। আজও দেশের মানুষ হিটলারের নাম নিতে দ্বিধা করে।এবং যদি নাম নেওয়া হয়, তারা লজ্জা এবং ঘৃণার সাথে নিয়ে থাকে। ভারতেও যদি এভাবে সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদের ভুয়ো রাজনীতি গড়ে ওঠে, তবে এটা তার শেষের দিকে যাচ্ছে এটা নিশ্চিত, এই ধরনের রাজনীতি কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। চিতায় জ্বলে উঠবে নতুন ভারত। এটা নিশ্চিত যে রাজনৈতিকভাবে একটা জাতি থেকে যাবে নাকি টুকরো টুকরো হয়ে যাবে, এটা বলা খুব কঠিন।

ভগত সিং তার ফাঁসির আগে পাঞ্জাবের গভর্নরকে একটি চিঠি লিখেছিলেন যুদ্ধ চলছে এবং এই যুদ্ধ চলবে। এই যুদ্ধ ভারতের জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের সম্পদ ও পরিশ্রম কেড়ে নেওয়ার জন্য। ব্রিটিশ চলে গেলেও এই যুদ্ধ চলবে ,দরিদ্র ও মেহনতি জনগণ এতে নির্ধারক বিজয় না পাওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলবে। তাহলে এটা নিঃসন্দেহে বলতে পারি ভগৎ সিং-এর এই বক্তব্যটাও সত্য প্রমাণিত হচ্ছে !!

১২-০৪-২৩

Sunday, April 2, 2023

ডার্ক মুভিজ : মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিক এখন কোন পথে !


বিগত কিছুদিন থেকে মানুষের রুচিবোধের বিরাট পরিবর্তন ঘটছে। যে কোন ওটিটি প্লাটফর্মের ট্রেন্ডিং এ থাকা কোন ওয়েব সিরিজ দেখলেই তা অনুমান করা অতি সহজেই যায়। বর্তমান সময়ে সিনেমা সিরিয়ালের পাশাপাশি গ্ল্যামার ইন্ডাস্ট্রিতে এক নতুন সংযোজন হয়েছে ওয়েব সিরিজের। আসলে প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে চলতে গিয়ে এখন প্রত্যেকেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়েব সিরিজ দেখতে পছন্দ করেন। বাংলা, হিন্দি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার বেশ কিছু ওয়েব সিরিজ টেক্কা দেয় বড় বাজেটের সিনেমাকেও। আসলে করোনা পরবর্তী সময় থেকে ডিজিটাল মিডিয়া কদর বুঝে গিয়েছে সাধারণ মানুষ। আর সেই সাথে পাল্লা দিয়ে চলার জন্য জন্ম নিয়েছে একাধিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মের। এই ওয়েব সিরিজ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে - হয়ত রয়েছে রগরগে যৌনতা, নতুবা রয়েছে ডার্ক অ্যাকশন সিকুয়েন্স।

কথা হল এখন যেকোনো ওটিটি প্লেটফরমে অপরাধমূলক কাহিনীতে আধারিত সিনেমা বা ডার্ক মুভিজ এর বিরাট কদর। সেই সঙ্গে সমান তালে আছে ওয়েব সিরিজও। এটা খুবই দুশ্চিন্তার বিষয় যে ওয়েব সিরিজ সমূহে যৌনতা, জঘন্য হত্যা, ধর্ষণ, হিংসাত্মক কাহিনীর মূলে সিনেমা প্রদর্শিত হয়। এই জঘন্যতম অপরাধ প্রচলিত সমাজে বর্তমান তা থেকে দর্শকরা কি শিক্ষা পাবে, এটাই এখন প্রশ্ন ? এই ধরনের বহু সিরিজ বা সিনেমা আমরা অনলাইনের মাধ্যমে দেখতে পাই যেখানে আসলেই শিল্পের নামে বিক্রি হচ্ছে সম্ভাব্য অপরাধী বা অপরাধপ্রবণ মানুষের অপরাধ সংঘটিত করার টিপস্। আজ আমাদের চারপাশে সংঘটিত হয় এমন জঘন্য থেকে জঘন্যতম অপরাধসমূহের তথা সভ্য মানব সমাজের গৌরব ভূলুণ্ঠিত করা অপরাধজনিত ঘটনাসমূহের কাহিনী বানিয়ে হুবহু উপস্থাপন করে এবং তাকেই সিনেমা, ওয়েব সিরিজের নামে বিক্ৰী করে ইতিমধ্যেই একাংশ চলচ্চিত্র নির্মাতাই বেশ ধন অর্জনে সফলতা পেয়েছেন। এক কথায় আজকের অপরাধীরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত করার জন্য সেইসব ছবি বা ওয়েব সিরিজকেই হাতিয়ার বানিয়ে ফিরছে।

ইতিমধ্যে এই ধরনের বহু সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ ভালো ব্যবসা করছে যেখানে দেখানো হয়েছে নৃশংস হত্যায় কিভাবে একজন অপরাধী তার কার্যসম্পাদন করতে পারে। এই ধরনের অপরাধ বা অপরাধীকে মহিমান্বিত করার জন্য ব্যবসার স্বার্থে একজন অভিনেতা এই কাজটিও খুব সুনিপুণভাবে করছেন। আজ থেকেও প্রায় একটা দশক আগে মানুষের বিনোদনের উপাদান খুব সরল ছিল। ত্রিকোন প্রেম, শোষণকারী জমিদার বনাম নিপীড়িত মানুষের মাঝখান থেকে উঠে আসা অ্যাংরি ইয়াং ম্যান অথবা ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ, মধ্যবিত্তীয় পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের ঘর-সংসারের কাহিনী। এর মধ্যেই বিচরণ ছিল বলিউড সিনেমা। তারপর হঠাৎ একদিন শুরু হল এই ডাটা যুগের। হাতে হাতে ফোরজি নেটওয়ার্ক সমৃদ্ধ মোবাইল ফোন। সম্ভবতঃ ২০১৬ সনে আমরা বিশেষ করে আসামে ফোরজি সেবা চালু হয়। সেটা যে নেটওয়ার্কই হোক, ফোরজি সেবা বিস্তার হওয়ার সাথেসাথেই আমাদের সমাজ রুচিশীল সংস্কৃতি থেকে অনেকটা সরে যেতে থাকে। মানুষের সমস্ত ধ্যান ধারণা চোখের সম্মুখে মোবাইলের স্ক্রিনের উপর আবদ্ধ হয়ে আটকে থাকে। 

২০২১-২২ সালে প্রকাশিত Nielsen Report অনুসারে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক গড় হিসাবে স্ক্রিন টাইম অর্থাৎ মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করার সময় হলো প্রায় ১৫ ঘন্টা। ২০১৯ এ এর সময় ছিল ১০ ঘন্টা। নিশ্চয়ই আমাদের ক্ষেত্রে বিচার করা হয় তবে এই সময় আরও অধিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যেখানে প্রতিদিন ফেসবুকের মত যে কোন একটা অর্থহীন বিষয়ে 'ভাইরাল' হয়ে থাকে অথবা ঘরের শৌচাগারের ভিডিও আপলোড করে ইউটিউবে মিলিয়নের হিসাবে ভিউয়ার্স থাকে সেখানে তো নিশ্চয়ই অন্যান্য রাজ্য দেশ স্থানের তুলনায় স্ক্রিন টাইমিং বেশি হবে। যাইহোক ফোরজি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ডাটা যুগেই আমাদের প্রত্যাবর্তন তা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পাওয়াটা স্বাভাবিক। মানুষের হাতে হাতে প্রত্যহ দেড় জিবি ডাটা কোথায় খরচ হবে ঠিক সেই সময় ইউটিউবাররা বেশ পরিকল্পিতভাবে এর মুনাফা লাভ করছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, যদিও রুচিবোধের অবক্ষয় হচ্ছে তারপরও কিছু সংখ্যক পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থাকে পুঁজি করে  মেহনতি মানুষের টাকা ডাটায় কনভার্ট করে শোষণ করছে।

আসলে এটা একটা মাইন্ড গেম। বেশ ভালো করে বুঝতে পেরেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতারা যে কিভাবে কম পুঁজিতে মোটা অংকের টাকা নিজের কাছে চলে আসে সেই জন্য হাতিয়ার হিসেবে ওয়েব সিরিজ যে ডার্ক মুভিজ এর বিপুলতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অবশ্য তথাকথিত ডাটা যুগের পূর্বেও অপরাধ জগত, রাজনীতির রুক্ষ বাস্তব যতদূর সম্ভব মৌলিক রূপে উপস্থাপনের চেষ্টা কিছু সিনেমায় দেখা গিয়েছিল। যেগুলো দেশের বিশেষ করে হিন্দি প্রধান সমাজে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করা হয়।  এক্ষেত্র অগ্রগণ্য ছিল  'গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর' শীর্ষক চলচ্চিত্র সিরিজটি। যেখানে অপরাধ ও রাজনীতির নেক্সাসটা বেশ সাহসিকতার সাথে প্রদর্শিত করা হয়। অপরাধজনিত সিনেমা হিসেবে ভারতীয় দর্শক এক নতুন স্বাদে তা গ্রহণ করে, সমাদৃত যেভাবে হয়েছিল সমালোচিত হয়েছিল বেশ। তবে হ্যাঁ এই সিনেমার মাধ্যমে নওয়াজ উদ্দিন সিদ্দিকী, পঙ্কজ ত্রিপাঠী, রাজকুমার রাও এর মত প্রতিভাবান অভিনেতাদের মাধ্যমে বলিউডের নেপটিজমগ্রস্থ ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন ঘটে। ভারতীয় সিনেমা জগতে এক নতুনত্ব প্রদান করার যোগ্য দাবিদার হিসেবে কৃতিত্ব মেনে নিলেও সমালোচকরা বলেন যে এই সিনেমার পূর্বে ভারতীয় চলচ্চিত্রে অপরাধ জনিত দৃশ্য এত খোলাখুলি ভাবে প্রকাশিত হয়নি আর যদিও একটু আধটু হয়েও থাকে তবে দর্শকদের এত আকৃষ্ট করতে পারে নাই। তবে যাই হোক এটা ছিল ডাটা যুগের পূর্ব ধারণা। কিন্তু এর পরবর্তী দু-তিন বছরের মধ্যেই ফোরজি নেটওয়ার্কে মাধ্যমে চলে আসে আমুল পরিবর্তন। সঙ্গে সঙ্গে উন্মুক্ত হয় বলিউড, হলিউড, ওয়েব সিরিজ, আর ডার্ক মুভিজের মুক্ত মঞ্চ। এই যুগে অপরাধের নির্মোহ অথচ কলাত্মক দিক উপস্থাপন না করে, সমাজ-রাজনৈতিক দিকে প্রভাবিত না করে এই ওয়েব সিরিজ সমূহে কেবল নৃশংস-বীভৎস্য-হত্যা-হিংসা উপস্থাপন করে ক্ষান্ত হয়নি সেখানে দেখানো হয় কীভাবে একটা মৃতদেহকে কতটা ক্ষতবিক্ষত করলে ঘাতকের তৃপ্তি আসে, দেখানো হচ্ছে আইনের চোখে কিভাবে ফাঁকি দিয়ে অবাধে বিভৎস অপরাধমূলক ঘটনা সংঘটিত করা যায়। মূল কথা ডার্ক মুভিজগুলো অপরাধের কৌশল শিখাবার পাশাপাশি একথা শেখাবার বারংবার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যে অপরাধ কোন বড় কথা নয়, জাস্টিফিকেশন দিতে পারলেই অপরাধ ন্যায্য!

সংবেদনশীল মানুষ মাত্রই এটা অনুভব করতে পারবেন যে আমাদের চারপাশ কতটা বিষাক্ত হচ্ছে ধীরে ধীরে। কিভাবে মানুষের জন্য ভালো খবরের অভাব ঘটছে। পৃথিবী জটিল থেকে জটিলতার হয়ে পড়ছে। এই সময় মানুষের সুস্থ চিন্তা করতে সৃষ্টিশীল কাজের খুব প্রয়োজন। একজন শিল্পী আমাদের অনুভব করাতে পারেন চার পাশের সত্যাসত্য ঘটনার সাথে, আগ্রাসিত বিশ্বায়নের সাথে, বলতে পারেন রুটি কাপড় ও ঘরের সমস্যা কথা, তরুণ তরুণীর জীবন সংগ্রামের কথা — এগুলিই তো একজন শিল্পী ও শিল্পের অমূল্য সম্ভার। অন্যথায় সমাজ হয়ে পড়বে অসুস্থ। নিয়ন্ত্রণহীন সমাজ জীবন - ভিডিও বা মোবাইল গেমস, শর্টস, রিলস্, এমনকি এই ধরনের ওটিটি প্লেটফর্ম র ডার্ক মুভিজ ইত্যাদি মানুষকে করে তোলে অপরাধী। এই গেমস ভিডিও বা ওয়েব সিরিজ মনস্তাত্ত্বিক দিকের কূপ প্রভাব ফেলে। সেই জন্য অপরাধ এবং বিনোদন দুটিকে দুই জায়গায় রেখে সরকার তথা সেন্সর বোর্ডকে যাচাই করতে হবে সমাজের কোনটি ফলপ্রসূ।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...