১।
"সে মন্দিরে দেব নাই' কহে সাধু।
রাজা কহে রোষে,
"দেব নাই! হে সন্ন্যাসী, নাস্তিকের মতো কথা কহ।
রত্নসিংহাসন-'পরে দীপিতেছে রতনবিগ্রহ--
শূন্য তাহা?'
"শূন্য নয়, রাজদম্ভে পূর্ণ' সাধু কহে,
"আপনায় স্থাপিয়াছ, জগতের দেবতারে নহে।'
ধর্ম বহু শতাব্দী ধরে প্রগতিশীল সমাজ তথা বিজ্ঞানের পথে হিমালয় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্মের পুরোহিতরাই খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ সালের শেষ দিকে সক্রেটিসকে বিষ পান করতে বাধ্য করেছিল। ১৬ ফেব্রুয়ারী, ১৬০০, বিখ্যাত দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী জিওর্দানো ব্রুনোকে রোমে ধর্মীয় পুরোহিতরা জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছিল। গ্যালিলিও এবং কোপার্নিকাসকে পাদ্রীরা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। আচ্ছা আমরা কি জানি, কেন? তারা বলেছিল পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। কিন্তু বাইবেল বলেছিল যে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীরা যুগে যুগে ধর্মের অন্ধ সমর্থকদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছে। কারণ, একমাত্র বিজ্ঞানই পারে ধর্মের পুরোহিতদের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারকে উন্মোচন করে তাদের হাজার বছরের মিথ্যাচারের মুখোশ উন্মোচন করতে।
কয়েক হাজার বছর ধরে আমাদের দেশ ভারতবর্ষ তার জাতি, ধর্ম ও ভাষার বৈচিত্র্য অন্যান্য দেশের চেয়ে নিজস্ব স্বকিয়তায় আলাদা করেছে। দেশভাগের সময় ভারত বেছে নিয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিকতা। এই আদর্শে শরিক হয়ে দেশের সংবিধান গড়ে ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে। আমাদের স্বাধীন ভারতের সংবিধানে ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রকে কোনও দিন যুক্ত করা হয়নি। যদিও প্রত্যেক নাগরিকের নিজ ধর্ম পালনের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত ছিল। আচ্ছা, আসলে কি ধর্মের আফিম খেয়ে শিক্ষা, চাকরি, কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতি, আদানি আম্বানির হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি তুলে দেওয়া, গঙ্গা দূষণ, সোনার মেয়েদের হেনস্থা, জল সঙ্কট, সব ভুলে গেছি!
আসলে ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। খুবই অনাড়ম্বর ভাবে কোন রাখঢাকের অবর্তমানে সূচনা হয় ঐতিহাসিক নতুন সংসদ ভবন। মুঘল থেকে ডারউইনের বিবর্তনবাদ বাদ দিয়ে সাম্প্রতিক এক সঞ্চারের পথে এগিয়ে চলছে নতুন ভারত। তার একটি বৃত্তীয় দিশা পাওয়া গেল বিকশিত ভারতের সাক্ষ্য হিসেবে। উত্তরভারতের আখড়ার লালচে গেরুয়া বাহিনির হাড়হিম উপস্থিতিতে, নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধন হয়। আসলে কি বলা যায় সেই ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয় বিনায়ক দামোদর সাভারকরের পুস্তিকাঃ হিন্দুত্ব / হু ইজ এ হিন্দু। ‘হিন্দু’ কে? এর উত্তর আমরা পাই — সিন্ধু থেকে সাগর অবধি বিস্তৃত ভারতবর্ষকে যে একযোগে ‘পিতৃভূমি’ জ্ঞান করে সে-ই ‘হিন্দু’। 'মুসলমানরা যেহেতু আরবকে তাদের ‘পুণ্যভূমি’ জ্ঞান করে, ‘ওদের’ এবং অন্য বিধর্মীদের দেশাত্মবোধ সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ‘দেশদ্রোহী’দের তালিকায় পরে আরও কিছু নাম যুক্ত হয়, কম্যুনিস্ট, স্বাধীনচেতা নারী, সমকামী ইত্যাদি। এই পুস্তিকা প্রকাশের দু’বছরের মধ্যেই জন্ম হয় সঙ্ঘের। ইস্তেহারেরও। মেয়েদের জন্য তাঁদের পরিষ্কার বার্তাঃ একমাত্র রাষ্ট্রের বিপদেই শক্তিস্বরূপিনী-বেশে মেয়েরা ঘরের ঘেরাটোপ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারে, নচেৎ তাঁদের থাকতে হবে ঘরের নিভৃতে, নিশ্চিন্তে এবং নিরাপদে। পুরুষের সর্বার্থসাধিকা হলেই চরিতার্থ হয় নারীর জীবন, পূর্ণ হয় তার সকল আকাঙ্ক্ষা।
নতুন হিন্দুরাষ্ট্রের ট্রেনে মুসলমানসহ অন্য বিধর্মী, কম্যুনিস্ট, স্বাধীনচেতা নারী, LGBTQIA+, বস্তুত আনুগত্যহীন যেকোনোও প্রশ্নকারী, প্রত্যেকেই হবে দ্বিতীয় শ্রেণির যাত্রী।'
২।
টেমস নদীর তীরে ৯০০ বছরের পুরনো ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। এই ভবনটি বেশ কয়েকবার পুনর্নির্মিত হয়েছিল। বর্তমান আকারে এটি প্রায় ৫০০ বছর ধরে রয়েছে। এমনকি সম্প্রতি, গথিক আর্কিটেকচারের পরিচিত নিদর্শনটির পুনরুদ্ধার এই পার্লামেন্ট। এখানে আছে হাউস অফ লর্ডস, হাউস অফ কমন্স, চার্চ, সিমেট্রি। মাদার অব ওল পার্লামেন্ট হিসেবে পরিচিত এই ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। ওয়েস্টমিনস্টার ব্যবস্থা বিশ্বের শাসন ব্যবস্থার একটি সফল মডেল। ভারত সহ বহু দেশে এই মডেলের গণতন্ত্র চলছে।
একসময় এই ভবনটি বিশ্বের এক চতুর্থাংশ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করত। বিশ্বের প্রতিটি বিখ্যাত ব্যক্তি তার মেঝেতে পা রেখেছেন। এখানে ক্রমওয়েলের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়েছিল, এখানে চার্চিলের বক্তৃতা করা হয়েছিল, এখানে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন চিৎকার করেছিলেন "প্রতিনিধিত্ব ব্যতিরেকে কোন ট্যাক্সেশন নয়"। এই ভবনে এসে একজন এমপি যুক্ত হন ব্রিটেনের ইতিহাসের সঙ্গে। এখানে থাকা একটি গুরুতর অনুভূতি। তারা এটি সংরক্ষণ এবং এটি আলিঙ্গনে গর্বিত। এই ইতিহাসে তারা বিশ্বাস করে। কোন চকচকে কাচ-সজ্জিত বিল্ডিং, এর সমস্ত জাঁকজমক এবং এলইডি স্ক্রিন সহ, এই গৌরবের সাথে মেলে না। সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে থাকবেন.. তবে অন্য কোথাও যাবেন না। হ্যাঁ, একবার নতুন ভবনের প্রস্তাবও এলে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।
ক্ষুধা সূচকে ১০১তম স্থানে থাকা দেশ বিশ হাজার কোটি টাকা খরচ করে নতুন সংসদ ও নতুন রাজধানী তৈরি করছে। ভারতের বুকে এই নতুন শাসনের নিজস্ব স্মৃতিচিহ্ন দরকার। তাই সেই পুরনো ভবন, যেখানে ভারত স্বাধীনতা পেয়েছিল, পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। যিনি বসেছিলেন ভারতের সেরা বক্তা, কাউন্সিলর, বক্তা, প্রধানমন্ত্রী, সেরা রাষ্ট্রনায়ক... যেখানে সর্দার, আম্বেদকর, শাস্ত্রী, অটলের কণ্ঠ বেজে উঠেছে, যেখানে ভগৎ সিংয়ের বধিরদের জন্য করা বিস্ফোরণের চিহ্ন নিয়ে একটি স্তম্ভ এখনও দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে "Tryst with Destiny" নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যেখানে আমরা পক্ষ ও বিরোধীদের ঐক্য দেখেছি, জনসাধারণ হৃদয়স্পর্শী বক্তৃতা শুনেছে, সেখানে আমরা ভারতের মানুষ... আমাদের সংবিধান লিখেছেন, আমরা আত্মসমর্পণ করেছি... সেই সংসদ..!!!
৩।
ভারতের ইতিহাসে প্রথম কালো দিন ছিল ৩০ জানুয়ারি, ১৯৪৮। ঐদিন নাথুরাম গডসের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী। দ্বিতীয় কালো দিন ছিল ২৫ জুন, ১৯৭৫। ঐ দিন মাঝ রাতে ইন্দিরা গান্ধী দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে সংবিধান স্বীকৃত একাধিক মৌলিক অধিকার কার্যত কেড়ে নিয়েছিলেন। তৃতীয় কলো দিন ছিল ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২। ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছিল। সিনিয়র জার্নালিস্ট ( দ্যা টেলিগ্রাফ ) প্রসূন আচার্য বলেন — 'আজ স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এক কালো দিন। 'কালো দিন'অর্থাৎ ২৮ মে ২০২৩ ইং এই দেশে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার সাংবিধানিক চরিত্র কার্যত সমাপ্তি হল। নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধনে পুরোহিত মন্ডিত পরিবেশ দেখানো হয় রীতিমত লাইভ টেলিকাস্ট করে। ঔপনিবেশিক মানসিকতার অবসান ঘটিয়ে এটাই 'আত্মনির্ভর' ভারত।'
একদিকে দেশের প্রথম নাগরিক অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে বক্তৃতায় গণতন্ত্রের পক্ষে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে বড় বড় ভাষণ আর বাইরে যন্তর মন্তরে ৩৪ দিন ধরে চলা মহিলা কুস্তিগীরদের শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন কে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে রাষ্ট্রের পেশি শক্তির আস্ফালন হল। প্রতিবাদী কুস্তিগীরদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নারকীয় নৃশংসতা আজ দেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে, যা ভারতের উদার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে মারাত্মক আঘাত করেছে। প্রতিবাদী কুস্তিগীরদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতায় দেশের গর্বের প্রতীক জাতীয় পতাকাকেও চরমভাবে অপমান করা হয়েছিল। আজ এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক কিছু আর ঘটতে পারে না। বিশিষ্ট জনদের মতে দেশের জনগণ এই ফ্যাসিবাদী রাজনীতিবিদদের জবাব দেবে, যারা প্রতিবাদের কণ্ঠকে ক্ষুণ্ণ করতে চায়। তারা দেশের অহংকার আর আজ দেশের এই অহংকারদের রাজপথে নির্মম নির্যাতন করা হয়, এমনকি নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনের দিনেও! সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ফোগট ও বজরং পুনিয়ারা আজ যৌন হয়রানি শিকার। তাদের অভিযোগ নাকচ করে পুলিশ গ্রেপ্তার করে ও ধর্ণাস্থল থেকে তাদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলে। আমরা যেন ভুলে না যাই দেশের এই বেটিরা মাতঙ্গিনী হাজরা, রানী লক্ষ্মী বাই, সরোজিনী নাইডু, প্রীতিলতা ওয়েদ্দাদার প্রভৃতি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উত্তরাধিকারী। দেশের গণতন্ত্র রক্ষার্থে এবং মহিলাদের যথোপযুক্ত সম্মানের দাবিতে এই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও আন্দোলনের পিছনে কিন্তু রয়েছে তা এবিষয়ে ওয়াকিবহাল সমস্ত গণতন্ত্র প্রেমী নাগরিকেরা।
আসলে কি এটাই আমাদের দেশের উর্বর মস্তিষ্ক সম্পন্ন মানুষের সৌভাগ্য। এটাই কি 'ভারতের মহামানবের সাগর তীর '– মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের জন্য খুবই হতাশাজনক। মানুষ যোগ্যতা ও পদমর্যাদা অনুযায়ী সম্মানিত হয় না কারণ মানুষ তাদের বোধগম্যতা ও বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমিতে আমরা পঙ্গু হয়ে গেছি এটা ইঙ্গিত দেয়। এমন অনেক লোক আছে যারা কোলাহলের অর্থ সম্পর্কে অবগত নয় যে লোকেদের পিছনে ছুটছে।
গণতন্ত্রের পীঠস্থানে রাজতন্ত্রের প্রতীক 'সেঙ্গোল ' স্থাপন এবং আনুষ্ঠানিক রাজদণ্ড গ্রহণ পুনরায় গণতন্ত্র থেকে রাজতন্ত্রের দিকে পুনর্যাত্রার সূচনার মহড়া হয়ে গেল!! এই নতুন যাত্রাপথে একজনও সাহিত্যিক নেই, কবি নেই, শিল্পী নেই, বিজ্ঞানী নেই, দার্শনিক নেই। আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং শাসন বিভাগের সর্বোচ্চ পদাধিকারী মাননীয় রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি কে সংসদ ভবন উদ্বোধনে ব্রাত্য রাখা হয়েছে। সতী দাহ ,বর্ণভেদ, অপবিজ্ঞান, নারীকে ভোগ্য পন্যে পরিণত করা, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলিত, নিম্নবর্ণের হিন্দু ও সংখ্যালঘুকে পিষে মারা — ভয় হয় অদূরে কি রয়েছে। ধর্মপ্রবণতা রাষ্ট্র ও তার নাগরিকদের মৌলিক কর্তব্যকে গ্রাস করেছে এবং দূরের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক যে মানুষ নেতিবাচক পরিণতি বুঝতে পারেনি আর যারা ব্যাখ্যা করছেন তাঁরাও ব্যর্থ হয়েছেন। তাহলে সত্যিই কি আজ অন্ধ, কালা, আর বধির !! না, না, 'এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না'!
No comments:
Post a Comment