Sunday, April 2, 2023

ডার্ক মুভিজ : মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিক এখন কোন পথে !


বিগত কিছুদিন থেকে মানুষের রুচিবোধের বিরাট পরিবর্তন ঘটছে। যে কোন ওটিটি প্লাটফর্মের ট্রেন্ডিং এ থাকা কোন ওয়েব সিরিজ দেখলেই তা অনুমান করা অতি সহজেই যায়। বর্তমান সময়ে সিনেমা সিরিয়ালের পাশাপাশি গ্ল্যামার ইন্ডাস্ট্রিতে এক নতুন সংযোজন হয়েছে ওয়েব সিরিজের। আসলে প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে চলতে গিয়ে এখন প্রত্যেকেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়েব সিরিজ দেখতে পছন্দ করেন। বাংলা, হিন্দি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার বেশ কিছু ওয়েব সিরিজ টেক্কা দেয় বড় বাজেটের সিনেমাকেও। আসলে করোনা পরবর্তী সময় থেকে ডিজিটাল মিডিয়া কদর বুঝে গিয়েছে সাধারণ মানুষ। আর সেই সাথে পাল্লা দিয়ে চলার জন্য জন্ম নিয়েছে একাধিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মের। এই ওয়েব সিরিজ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে - হয়ত রয়েছে রগরগে যৌনতা, নতুবা রয়েছে ডার্ক অ্যাকশন সিকুয়েন্স।

কথা হল এখন যেকোনো ওটিটি প্লেটফরমে অপরাধমূলক কাহিনীতে আধারিত সিনেমা বা ডার্ক মুভিজ এর বিরাট কদর। সেই সঙ্গে সমান তালে আছে ওয়েব সিরিজও। এটা খুবই দুশ্চিন্তার বিষয় যে ওয়েব সিরিজ সমূহে যৌনতা, জঘন্য হত্যা, ধর্ষণ, হিংসাত্মক কাহিনীর মূলে সিনেমা প্রদর্শিত হয়। এই জঘন্যতম অপরাধ প্রচলিত সমাজে বর্তমান তা থেকে দর্শকরা কি শিক্ষা পাবে, এটাই এখন প্রশ্ন ? এই ধরনের বহু সিরিজ বা সিনেমা আমরা অনলাইনের মাধ্যমে দেখতে পাই যেখানে আসলেই শিল্পের নামে বিক্রি হচ্ছে সম্ভাব্য অপরাধী বা অপরাধপ্রবণ মানুষের অপরাধ সংঘটিত করার টিপস্। আজ আমাদের চারপাশে সংঘটিত হয় এমন জঘন্য থেকে জঘন্যতম অপরাধসমূহের তথা সভ্য মানব সমাজের গৌরব ভূলুণ্ঠিত করা অপরাধজনিত ঘটনাসমূহের কাহিনী বানিয়ে হুবহু উপস্থাপন করে এবং তাকেই সিনেমা, ওয়েব সিরিজের নামে বিক্ৰী করে ইতিমধ্যেই একাংশ চলচ্চিত্র নির্মাতাই বেশ ধন অর্জনে সফলতা পেয়েছেন। এক কথায় আজকের অপরাধীরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত করার জন্য সেইসব ছবি বা ওয়েব সিরিজকেই হাতিয়ার বানিয়ে ফিরছে।

ইতিমধ্যে এই ধরনের বহু সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ ভালো ব্যবসা করছে যেখানে দেখানো হয়েছে নৃশংস হত্যায় কিভাবে একজন অপরাধী তার কার্যসম্পাদন করতে পারে। এই ধরনের অপরাধ বা অপরাধীকে মহিমান্বিত করার জন্য ব্যবসার স্বার্থে একজন অভিনেতা এই কাজটিও খুব সুনিপুণভাবে করছেন। আজ থেকেও প্রায় একটা দশক আগে মানুষের বিনোদনের উপাদান খুব সরল ছিল। ত্রিকোন প্রেম, শোষণকারী জমিদার বনাম নিপীড়িত মানুষের মাঝখান থেকে উঠে আসা অ্যাংরি ইয়াং ম্যান অথবা ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ, মধ্যবিত্তীয় পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের ঘর-সংসারের কাহিনী। এর মধ্যেই বিচরণ ছিল বলিউড সিনেমা। তারপর হঠাৎ একদিন শুরু হল এই ডাটা যুগের। হাতে হাতে ফোরজি নেটওয়ার্ক সমৃদ্ধ মোবাইল ফোন। সম্ভবতঃ ২০১৬ সনে আমরা বিশেষ করে আসামে ফোরজি সেবা চালু হয়। সেটা যে নেটওয়ার্কই হোক, ফোরজি সেবা বিস্তার হওয়ার সাথেসাথেই আমাদের সমাজ রুচিশীল সংস্কৃতি থেকে অনেকটা সরে যেতে থাকে। মানুষের সমস্ত ধ্যান ধারণা চোখের সম্মুখে মোবাইলের স্ক্রিনের উপর আবদ্ধ হয়ে আটকে থাকে। 

২০২১-২২ সালে প্রকাশিত Nielsen Report অনুসারে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক গড় হিসাবে স্ক্রিন টাইম অর্থাৎ মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করার সময় হলো প্রায় ১৫ ঘন্টা। ২০১৯ এ এর সময় ছিল ১০ ঘন্টা। নিশ্চয়ই আমাদের ক্ষেত্রে বিচার করা হয় তবে এই সময় আরও অধিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যেখানে প্রতিদিন ফেসবুকের মত যে কোন একটা অর্থহীন বিষয়ে 'ভাইরাল' হয়ে থাকে অথবা ঘরের শৌচাগারের ভিডিও আপলোড করে ইউটিউবে মিলিয়নের হিসাবে ভিউয়ার্স থাকে সেখানে তো নিশ্চয়ই অন্যান্য রাজ্য দেশ স্থানের তুলনায় স্ক্রিন টাইমিং বেশি হবে। যাইহোক ফোরজি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ডাটা যুগেই আমাদের প্রত্যাবর্তন তা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পাওয়াটা স্বাভাবিক। মানুষের হাতে হাতে প্রত্যহ দেড় জিবি ডাটা কোথায় খরচ হবে ঠিক সেই সময় ইউটিউবাররা বেশ পরিকল্পিতভাবে এর মুনাফা লাভ করছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, যদিও রুচিবোধের অবক্ষয় হচ্ছে তারপরও কিছু সংখ্যক পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থাকে পুঁজি করে  মেহনতি মানুষের টাকা ডাটায় কনভার্ট করে শোষণ করছে।

আসলে এটা একটা মাইন্ড গেম। বেশ ভালো করে বুঝতে পেরেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতারা যে কিভাবে কম পুঁজিতে মোটা অংকের টাকা নিজের কাছে চলে আসে সেই জন্য হাতিয়ার হিসেবে ওয়েব সিরিজ যে ডার্ক মুভিজ এর বিপুলতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অবশ্য তথাকথিত ডাটা যুগের পূর্বেও অপরাধ জগত, রাজনীতির রুক্ষ বাস্তব যতদূর সম্ভব মৌলিক রূপে উপস্থাপনের চেষ্টা কিছু সিনেমায় দেখা গিয়েছিল। যেগুলো দেশের বিশেষ করে হিন্দি প্রধান সমাজে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করা হয়।  এক্ষেত্র অগ্রগণ্য ছিল  'গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর' শীর্ষক চলচ্চিত্র সিরিজটি। যেখানে অপরাধ ও রাজনীতির নেক্সাসটা বেশ সাহসিকতার সাথে প্রদর্শিত করা হয়। অপরাধজনিত সিনেমা হিসেবে ভারতীয় দর্শক এক নতুন স্বাদে তা গ্রহণ করে, সমাদৃত যেভাবে হয়েছিল সমালোচিত হয়েছিল বেশ। তবে হ্যাঁ এই সিনেমার মাধ্যমে নওয়াজ উদ্দিন সিদ্দিকী, পঙ্কজ ত্রিপাঠী, রাজকুমার রাও এর মত প্রতিভাবান অভিনেতাদের মাধ্যমে বলিউডের নেপটিজমগ্রস্থ ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন ঘটে। ভারতীয় সিনেমা জগতে এক নতুনত্ব প্রদান করার যোগ্য দাবিদার হিসেবে কৃতিত্ব মেনে নিলেও সমালোচকরা বলেন যে এই সিনেমার পূর্বে ভারতীয় চলচ্চিত্রে অপরাধ জনিত দৃশ্য এত খোলাখুলি ভাবে প্রকাশিত হয়নি আর যদিও একটু আধটু হয়েও থাকে তবে দর্শকদের এত আকৃষ্ট করতে পারে নাই। তবে যাই হোক এটা ছিল ডাটা যুগের পূর্ব ধারণা। কিন্তু এর পরবর্তী দু-তিন বছরের মধ্যেই ফোরজি নেটওয়ার্কে মাধ্যমে চলে আসে আমুল পরিবর্তন। সঙ্গে সঙ্গে উন্মুক্ত হয় বলিউড, হলিউড, ওয়েব সিরিজ, আর ডার্ক মুভিজের মুক্ত মঞ্চ। এই যুগে অপরাধের নির্মোহ অথচ কলাত্মক দিক উপস্থাপন না করে, সমাজ-রাজনৈতিক দিকে প্রভাবিত না করে এই ওয়েব সিরিজ সমূহে কেবল নৃশংস-বীভৎস্য-হত্যা-হিংসা উপস্থাপন করে ক্ষান্ত হয়নি সেখানে দেখানো হয় কীভাবে একটা মৃতদেহকে কতটা ক্ষতবিক্ষত করলে ঘাতকের তৃপ্তি আসে, দেখানো হচ্ছে আইনের চোখে কিভাবে ফাঁকি দিয়ে অবাধে বিভৎস অপরাধমূলক ঘটনা সংঘটিত করা যায়। মূল কথা ডার্ক মুভিজগুলো অপরাধের কৌশল শিখাবার পাশাপাশি একথা শেখাবার বারংবার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যে অপরাধ কোন বড় কথা নয়, জাস্টিফিকেশন দিতে পারলেই অপরাধ ন্যায্য!

সংবেদনশীল মানুষ মাত্রই এটা অনুভব করতে পারবেন যে আমাদের চারপাশ কতটা বিষাক্ত হচ্ছে ধীরে ধীরে। কিভাবে মানুষের জন্য ভালো খবরের অভাব ঘটছে। পৃথিবী জটিল থেকে জটিলতার হয়ে পড়ছে। এই সময় মানুষের সুস্থ চিন্তা করতে সৃষ্টিশীল কাজের খুব প্রয়োজন। একজন শিল্পী আমাদের অনুভব করাতে পারেন চার পাশের সত্যাসত্য ঘটনার সাথে, আগ্রাসিত বিশ্বায়নের সাথে, বলতে পারেন রুটি কাপড় ও ঘরের সমস্যা কথা, তরুণ তরুণীর জীবন সংগ্রামের কথা — এগুলিই তো একজন শিল্পী ও শিল্পের অমূল্য সম্ভার। অন্যথায় সমাজ হয়ে পড়বে অসুস্থ। নিয়ন্ত্রণহীন সমাজ জীবন - ভিডিও বা মোবাইল গেমস, শর্টস, রিলস্, এমনকি এই ধরনের ওটিটি প্লেটফর্ম র ডার্ক মুভিজ ইত্যাদি মানুষকে করে তোলে অপরাধী। এই গেমস ভিডিও বা ওয়েব সিরিজ মনস্তাত্ত্বিক দিকের কূপ প্রভাব ফেলে। সেই জন্য অপরাধ এবং বিনোদন দুটিকে দুই জায়গায় রেখে সরকার তথা সেন্সর বোর্ডকে যাচাই করতে হবে সমাজের কোনটি ফলপ্রসূ।

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...