Tuesday, June 13, 2023

অস্তিত্ব সংকটে : প্রসঙ্গ উত্তরপূর্বের বাঙালি


অস্তিত্ব সংকটে : প্রসঙ্গ উত্তরপূর্বের বাঙালি

‘রাজামশাইর কাপড় কোথায়' ? অদৃশ্য পোশাকে রাজার পথযাত্রার গল্পের সেই শিশুটির বিস্ময়োক্তি ঠিক একই ছিল। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা কেন অনেক ক্ষেত্রে, ধারাবাহিকভাবে মিথ্যার আশ্রয় নেন, তার কারণ বোঝা দুষ্কর। আসামে বাঙালি বিদ্বেষের ইতিহাস নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পরপরই সেই বিদ্বেষ নানান সময়ে নানান পর্বেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। সেকথা সকলেরই জানা। আর বিতর্কেরও শেষ নেই এই বহুভাষিক আসাম তথা উত্তরপূর্বের বাঙালিদের যথার্থ অবস্থান নিয়ে। অনেকেই বলতে শুরু করেছেন, সেসব এখন ইতিহাস। আসাম এখন শান্ত। সেখানে সকলে মিলেমিশে এক হয়ে বসবাস করছেন সম্প্রীতির বাতাবরণে। কিন্তু কথায় বলে চোখ বন্ধ রাখলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না।

১৯৪৭ সালে সৃষ্ট হয় ভারত ও পাকিস্তান। লাখ লাখ মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও রক্তনদী পেরিয়ে রাজনীতিবিদেরা ভেবেছিলেন ‘সমস্যার সমাধান হলো’। কিন্তু মানুষের লোভ-লালসা ও স্বার্থ-সুবিধার সঙ্ঘাত চিরন্তন। ১৯৪৭ সালের সীমানাপ্রাচীর সঙ্ঘাতের অবসান করেনি, বরং যোগ করেছে নতুন মাত্রা। কে প্রকৃত নাগরিক আর কে প্রকৃত নাগরিক নয়, তার সঙ্ঘাত চলে আসছিল সাত দশক ধরে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩১ আগস্ট ২০১৯ প্রকাশ হয়েছে আসামের প্রকৃত তথাকথিত নাগরিক তালিকা। মোট আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল তিন কোটি ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৬৬১। চূড়ান্ত তালিকায় নাম আছে ৩ কোটি ১১ লাখ মানুষের। বাদ পড়েছে ১৯ লাখ ছয় হাজার। আসামের এই দীর্ঘায়িত সঙ্কট অসমিয়া বনাম বাঙালি। 

আসামের বাঙালি জীবনের ভূমিতল সত্যের ভিতটা গণভোট ও দেশভাগের হঠাৎ ঘায়ে যখন ছিন্নভিন্ন অবস্থা থেকে একটু থিতু হচ্ছে তখনই বলা হয় বাঙালি বিদেশি, বলা হয় বাংলায় পড়াশুনা করা যাবে না স্বাধীন দেশে, তাড়াতে হবে স্বভূমি থেকে বাঙালিকে, তাঁবু গোটাতে হবে। কিন্তু বাঙালি যাবে কোথায়, কেন যাবে বংশ পরম্পরায় আসামবাসী বাঙালি। স্থায়ী বসতি থেকে উৎখাতের রাষ্ট্রীয় চক্রান্তের বিরুদ্ধে বাঙালি প্রথম প্রতিবাদ করে ১৯৬১র উনিশে মে আর সেদিনই এগারোজন শহিদ হন, স্বাধীন দেশে প্রথম ভাষাশহিদ। এর পরেও দফায় দফায় শহিদ হয়েছেন দক্ষিণ আসামে, এমনকি উত্তর আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায়ও চোরাগাপ্তা বাঙালি হত্যা হয়েছে। গোরেশ্বর হত্যাকাণ্ড হয়েছে নেলির চরমানুষদের হত্যা হয়েছে। এমন যখন অবস্থা তখন আসামের বাঙালি সর্বাত্মক প্রতিরোধে নেমেছে যার যেমন ক্ষমতা সেই অস্ত্র হাতে। আসামের বাঙালির কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারী কবিতায় জানিয়েছেন তাঁর ক্ষোভ, ‘যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সে-ই কেড়েছে ভয়, আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়।'

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...