দুনিয়ায় শুধু মানুষই যে উদ্বাস্তু হয়ে যাচ্ছে তা কিন্তু নয়। গাছপালা কেটে, নদীনালা বুজিয়ে তথাকথিত সভ্যতার উন্নয়নের ধ্বজা ওড়ানো চলছে বীরবিক্রমে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ অনেকাংশেই একটি বাৎসরিক অনুষ্ঠান মাত্রে পরিণত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী মদদপুষ্টরা ফাইব ষ্টার হোটেলের এসি রুমে বসে কিছু সেমিনারের আয়োজন করে কুমির কান্নায় সাসটেইনেবল ডেভলাপমেন্টের পরিকল্পনা, ব্যাস!! ১৯৭২ সালে স্টকহোম বিশ্ব সম্মেলনে পরিবেশ রক্ষার যে সংকল্প নেওয়া হয়েছিল, তাকে এখনো সর্বত্রগামী করা যায়নি। রিও ডি জানেইরোর অতি সাম্প্রতিক বসুন্ধরা সম্মেলন এবং জি-৭ বৈঠকে দূষণ রোধে মতানৈক্য সেকথাই প্রমাণ করে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, সব দেশেই পরিবেশরক্ষার জন্য বহু আইন তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো প্রয়োগ নিয়ে কোনো আলোচনাই শোনা যায় না। অন্যান্য আইনে দণ্ডিত আসামিদের সমাজ যে চোখে দেখে, পরিবেশ আইন ভঙ্গকারীদের সে চোখে এখনো দেখতে শেখেনি। কারণ আমরা প্রত্যেকেই কমবেশি পরিবেশ আইন ভেঙে চলেছি রোজ।
গত শতাব্দীর শেষ দিকে বিজ্ঞানীরা দেখলেন যে পৃথিবীর বৈশ্বিক উষ্ণতা বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি বিভিন্নভাবে পৃথিবীর জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্যের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণকারী সংস্থা ইন্টার গভার্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি মানবসৃষ্ট বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ কবলে পড়েছে ভারত। ভারত ও তার প্রতিবেশী দেশগুলির জলবায়ু এমন জায়গায় পৌঁছতে শুরু করেছে যখন তা মানুষের স্বাস্থ্যকে বিপন্ন করছে। ২০১৮সালের একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের কাছে থাকার পরিস্থিতি প্রায় নেই। অথচ পাঁচ বছর পরেই এই গ্রীষ্মের শুরুতেই ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল সেই তাপমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। পারস্য উপসাগর থেকে পাকিস্তান হয়ে ভারতের উত্তর প্রান্তে তাপপ্রবাহ নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশ্বের জলবায়ু এখন লা নিনা চক্রের মধ্যে রয়েছে। অপেক্ষাকৃত শীতলতর গ্রীষ্ম হয় এই চক্রে। কিন্তু এর পরের পর্যায়েই এল নিনো চক্র শুরু হবে যা পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
সাম্রাজ্যবাদের যুগে ক্রমবর্ধমান দূষণ ও শোষণের কবলে পড়ে পরিবেশ সংকট যতই বাড়ছে, ততই ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কিছু ভ্রান্ত ধারণাগুলো। এরমধ্যে সরাসরি সম্প্রচার করা হয় তাহলো — পরিবেশের এই দুরাবস্থার জন্য সাধারণ জনগণকে দায়ী করা। পুঁজিবাদী উৎপাদনের নিয়ম হলো বর্ধিত হারে পুনরুৎপাদন। যারফলস্বরূপ একদিকে যেমন উৎপাদন এগিয়ে চলে আর অতিউৎপাদনের সংকটে, অন্য দিকে দেখা যায় প্রাকৃতিক সম্পদের অবাধ শোষণ। বর্ধিত হারে পুনরুৎপাদন ছাড়া পুঁজিবাদী ব্যবস্থা টিকতে পারে না। তাই এই ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক সম্পদের শোষনের কোনো সীমা নেই। একটি প্রবন্ধে পড়েছিলাম ‘Scientists linking fossil fuels with climate change and The climate change began in 1960।’ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব জিওগ্রাফির একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, প্রবল গরম ও খরার মুখোমুখি হতে চলেছে বিশ্বের ৯০ শতাংশ মানুষ। নেচার সাসটেইনেবিলিটি পত্রিকায় প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রবল উষ্ণায়ন ও স্থলভাগে জলের সংকট- এ দুই কারণে পৃথিবীজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দশ গুণ বাড়বে। কার্বন নিঃসরণও সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে। এসব কারণে অর্থনীতিও প্রবাভিত হবে। ধনীরা আরো ধনী হবেন এবং গরিব আরো গরিব হবেন। খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে এ পরিস্থিতি।
ভারত পরিবেশগত দিক থেকে বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম দেশগুলোর মধ্যে ভারত একটি। 'গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-২০২৩' অনুযায়ী চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সবচেয়ে বিপন্ন বা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতের অবস্থান অষ্টম। বর্তমানে বৈশ্বিক তাপমাত্রা যে অবস্থানে রয়েছে সেটা বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বের শিল্পায়নের ফলাফল হওয়ায় চীন, ভারত ও আরো কিছু উন্নয়নশীল দেশ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সব ধরণের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে পশ্চিমা বিশ্বকে এবং তাদেরকে কার্বন নিঃসরণও কমাতে হবে।
উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর এই রেষারেষির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সূচক অনুসারে প্রথম দশটি ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রের ৮টিই স্বল্পোন্নত এবং ১টি মধ্যম আয়ের দেশ। রাষ্ট্রের মত বায়ুমন্ডল দূষণের কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই। এক দেশের উৎপন্ন কার্বন পুরো বায়ুমন্ডলকেই উত্তপ্ত করতে পারে, যার প্রভাব পুরো বিশ্বেই পড়বে। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর সেই প্রভাব মোকাবেলার সক্ষমতা থাকলেও দরিদ্র দেশগুলোর তা নেই। ফলে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা।
পরিবেশবান্ধব কৌশলগত অংশীদারিত্ব হ'ল রাজনৈতিক সহযোগিতাকে এগিয়ে নেওয়া, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং পরিবেশ বান্ধব ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ এবং নানান সুযোগ মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদার করার জন্য পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্যারিস চুক্তি এবং রাষ্ট্রসংঘের স্থিতিশীল উন্নয়নের লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নের উপর গুরত্ব দেওয়া। প্লাস্টিক দূষণরোধসহ পরিবেশ রক্ষায় জলবায়ু পরিবর্তন, আমাদের দেশের ভূপ্রকৃতি ও এর অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যসহ নানা বিষয়ে প্রয়োজন সচেতনতা। পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণে তাই বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন ও সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অবিকল্প। জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change 2022) জেরে ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে কৃষি ও খাদ্য সংকট দেখা দিচ্ছে! Intergovernmental Panel on Climate Change (IPCC)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চরম জলবায়ু পরিস্থিতিতে সংকটের মুখে দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা (food Security)। জাতিসংঘের (UN) সংস্থার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change 2022) কারণে বাড়তে থাকা বন্যা ও খরায় সবচেয়ে জেরবার ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো।
জলবায়ু পরিবর্তন মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুটো কারণেই ঘটে। প্রাকৃতিক কারণগুলো হলো সমুদ্রতটের তাপমাত্রা ও হাওয়ার প্রবাহ। মানবসৃষ্ট কারণগুলো হলো অসততা, পরিবেশ বদল এবং জল ব্যবহারের প্রভাব। ভোগবাদ প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে প্রকৃতির দখল নিতে চায়, মানুষ বা জীবজন্তুর প্রাণের তোয়াক্কা করে না।এভাবেই আজ প্রকৃতি বিপর্যস্ত। এই লালসা এক প্রজন্মে শেষ হওয়ার নয়। বরং পৃথিবীর আয়ুক্ষয় ঘটানো লোভকেই স্বাভাবিক নীতি বানাতে চাইছে। ফলে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন চরম আকার ধারণ করেছে। এটি বিশেষভাবে পরিলক্ষিত যে ১৯৫১ সাল থেকে ৫০ ভাগেরও বেশি উষ্ণতা বৃদ্ধির পেছনে একত্রভাবে দায়ী মানবসৃষ্ট কারণ। রাষ্ট্রসংঘ জানিয়েছে ২০২৩ – ২০২৭ এই পাঁচটি বছর উষ্ণতার পাঁচটি বছর রেকর্ড করবে। তাইতো চিকো মেন্ডিসের মন্তব্য ছিল — “Environmentalism without class struggle is gardening”। ভোগবাদীদের বিরুদ্ধে কি কিছু করণীয় আছে না বিশ্ব সম্প্রদায়ের একটি সাধারণ বৈশ্বিক দায় — তা ভাববার বিষয় ?
No comments:
Post a Comment