Tuesday, June 27, 2023

বিজ্ঞানমনস্কতা : সমাজ গঠনে সুস্থ দৃষ্টিভঙ্গি

প্ৰত্যেক মানুষের এক সুস্থ দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্ৰয়োজন। যাতে করে সমাজ তথা জগতকে সঠিকভাবে পৰ্যবেক্ষণ করার সহায় করে এবং ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, সমাজ এবং প্ৰকৃতির সঙ্গে সম্পৰ্ককে সুস্থিরতা প্ৰদান করতে পারে। আর এর জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চয়ই হতে হবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বৈজ্ঞানিক মানসিকতার নিৰ্যাস। মানুষের বিজ্ঞানচেতনা মানুষকে এনে দিয়েছে মুক্তির আনন্দ। সত্যের স্বরূপ উদ্ঘাটিত করার জন্য, রহস্যের মায়াজাল উন্মোচিত করার জন্য যুক্তির শাণিত অস্ত্রে মানুষ ব্যাখ্যা করতে শিখেছে। কোনো “আপ্তবাক্য”, কোনো অন্ধবিশ্বাসকে গ্রহণ করতে চায় না। বিজ্ঞানমনস্কতা বিজ্ঞানের যুগে বাস করার ছাড়পত্র বা Passpot। বিজ্ঞানমনস্কতা ঐশ্বরিক নির্ভর সংস্কারাচ্ছন্ন মনকে মুক্তি দিয়ে যুক্তির চূড়ান্তে যাচাই করে গড়ে তোলে। যুক্তি-বুদ্ধি দ্বারা প্ৰশ্ন করা, কোনো পরিঘটনার বিশ্লেষণের প্ৰতি উৎসুকতা, তথ্য তথা জ্ঞান আহরণে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার, বিতৰ্ক তথা সমালোচনাত্মক উপায়ে আসন্ন সত্যের উপর দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকা একজন ব্যক্তিকে বৈজ্ঞানিক মানসিকতার অধিকারী করে এবং প্ৰদান করে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই ব্যক্তিই সচেতন এবং সক্ৰিয় মনের পরিচায়ক। এই চিন্তাধারা একজন ব্যক্তির মননে হঠাৎ ক্রিয়াশীল হয় না। দীৰ্ঘদিন অনুশীলনে একজন ব্যক্তির মনে ইহার প্ৰভাব স্থায়ী করে।

কেবল অন্ধবিশ্বাস এবং কুসংস্কার থেকে মুক্তির জন্যই নয় একটি মুক্ত, উদার, ধৰ্ম-নিরপেক্ষ গণতান্ত্ৰিক সমাজ গঠনের জন্য বৈজ্ঞানিক মানসিকতার খুব প্ৰয়োজন। বিজ্ঞান সম্পর্কে যখন মানুষের ধারণা একেবারেই ছিল না বা কম ছিল তখন মানুষ আগুনকে তার সৃষ্টিকর্তা মানতো, বজ্র বা তুফানকে তার সৃষ্টিকর্তা মানতো, সমুদ্রকে তার সৃষ্টিকর্তা মনে করে প্রার্থনা করতো। এটা ঠিক সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথেই মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রাধান্যতা বাড়ে, শুরু হয় বিজ্ঞানমনস্ক যাত্রার।

বিজ্ঞানমনস্ক হতে গেলে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতেই হবে বা বিজ্ঞানকে পেশা হিসেবে নিতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। বৃহত্তর অর্থে বিজ্ঞান জানলে মানুষ প্রশ্ন করতে শিখবে, উত্তর খুঁজতে শিখবে বিজ্ঞানের যুক্তির বা পর্যবেক্ষণের আলোকে। অন্ধকার যুগ পেরিয়ে পৃথিবীর পথ ধরে ধীরে ধীরে জন্ম নিল ইওরোপীয় বিজ্ঞান——'লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, নিকোলাস কোপার্নিকাস, টাইকো ব্রাহে, জোহান কেপলার, ব্রুনো, গ্যলিলিও গ্যালিলি, এন্ড্রিয়া ভেসালিয়াস, উইলিয়াম গিলবার্ট, মাইকেল সেভেটার্স, হিরোনিমাস ফ্যাব্রিসিয়াস, উইলিয়াম হার্ভি, প্যারাসেলসাস, ভ্যান হেলমন্ট, জর্জিয়াস এগ্রিকোলা, বেকন, দেকার্ত... প্রমূখ বিদ্বজনের হাতে তত্ত্ব ও পর্যবেক্ষণ নির্ভর আধুনিক বিজ্ঞান গড়ে উঠল, জন্ম নিল নিউটনের মত প্রতিভা যার মেধায় ও মননে পরিপূর্ণতা পেল বিশ্লেষণ ধৰ্মী তত্ত্বগত এবং পরীক্ষণ বিজ্ঞান এবং সত্য আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির হল বিকাশ জেনেটিক তত্ত্বের পথপ্রদর্শক মেন্ডল ও বিবর্তনবাদের প্রবর্তক ডারউইন আবির্ভূত হয়েছেন জীব বিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণায় দিক-নির্দেশক রূপে।' যেভাবে আইনস্টাইন বলেছিলেন - আদর্শ বৈজ্ঞানিক অনুশীলনের প্রধান শর্তই হচ্ছে যে সব কিছু নিয়েই প্রশ্ন করা যাবে। তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করার সময় যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়, সে সব পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা যাবে। যে কোন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেই কিছু না কিছু পূর্ব ধারণা বর্তমান থাকে। কিন্তু এই ধারণাগুলো সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। যখন আরো শক্তিশালী ও সঠিক ধারণা পাওয়া যায় তখন পূর্ব ধারণাগুলো বদলে যায়। কিন্তু সংরক্ষণবাদীরা, তাদের বিশ্বাসে অনড় থেকে আদর্শ বিজ্ঞান চর্চার মূল বিষয়কে এড়িয়ে গিয়ে যখন বৈজ্ঞানিক তথ্য ও উপাত্তকে ডিজাইনার ইউনিভার্স বা পরিকল্পিত মহাবিশ্বের ধারণার মধ্যেই চেপে রাখতে চাইছেন, তারা আসলে বিজ্ঞানের নামে অপবিজ্ঞানের চর্চা করছেন।

বিজ্ঞানের উন্মেষ ঘটে কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রীক বৈপ্লবিক ত্বত্তে। 'On The Revolution of the Heavenly Bodies'(1543) - এ প্রথম শোনা যায় সূর্য বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র এবং পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে। 'কিন্তু ধর্মের অনুপস্থিতিতে, ডকিন্সের স্বভাবজাত ভাষায়, মানুষের মগজে ঈশ্বর-সাইজের যে গর্তটির (গ্যাপ) সৃষ্টি হবে তাকে ভরাট করা হবে কি দিয়ে ? ডকিন্স এর উত্তর দিয়েছেন—বলেছেন বিজ্ঞান দিয়ে, প্রতিনিয়ত সত্যানুসন্ধান যার কাজ। ডকিন্সের আশা এর মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে নতুন এক পৃথিবী—মিথ্যা নয়, সত্যের ভিত্তিতে।' অভিজিৎ রায়ের 'আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী' বইটি পড়ে দেখতে পারেন। এ বইয়ের শেষ অধ্যায়ে অভিজিৎ কোয়ান্টাম দোদুল্যমানতা (quantum fluctuation) প্রক্রিয়ার কীভাবে জড় কণিকা তৈরি হয়, তার বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তাঁর ‘ব্রীফ হিস্ট্রি অব টাইম’ গ্রন্থে স্ফীতিতত্ত্বের জনক এরেন গুথের উদ্ধৃতি দিয়ে মহাবিশ্বকে 'আল্টিমেট ফ্রি লাঞ্চ' বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ প্রাকৃতিক ভাবেই শূন্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি। ঠিক যেমন 'ডারউইনের বিবর্তনবাদী তত্ত্বই ১৮৫৯ সালে প্রথমবারের মতো খুব পরিস্কার ভাবেই দেখিয়ে দিল যে, মানুষসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিবর্তন এবং উদ্ভবের পেছনে কোন স্বর্গীয় কারণ খোঁজার দরকার নেই। অন্যান্য পশুপাখি, গাছপালা যে পদ্ধতিতে পৃথিবীতে এসেছে, মানুষ নামে ‘দ্বিপদী প্রাণী’টিও ঠিক একই বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এ পৃথিবীতে এসেছে।'

বিজ্ঞানমনস্কতা হলো অন্ধ গোঁড়ামির বিরুদ্ধে একটা দৃষ্টিভঙ্গি, যা জীবন ও জগৎ সম্পর্কে খোলা মনে যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে সবকিছু বিচার করতে সাহায্য করে ।'যে সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ যত বেশী অদৃষ্টবাদী, সেই সমাজে শাসকের দাপাদাপি তত বেশী। আবার, প্রশ্নহীন আনুগত্যের সামনে শাসক নিরাপদ বোধ করেন চিরকাল । তবে একদল মানুষ মাথা উঁচু করে প্রশ্ন করতে পেরেছে বলেই, অজ্ঞানতার আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দুঃসাহসী লড়াই করতে পেরেছে বলে্‌ই, সমাজ ও সভ্যতায় অগ্রগতি হয়েছে । তবে, সমাজ বিকাশের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ সমাজে বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসার হওয়া খুবই কঠিন কাজ।'
 
কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক মানসিকতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজে থেকে গড়ে ওঠার বস্তু নয়। ইহাকে নিজের মধ্যে অনুশীলন করাতে হয়। এই বিজ্ঞান মানসিকতা নিজের মধ্যে আনার জন্য পরিবার, বিদ্যালয়, তথা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক মাধ্যম, সমাজ তথা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ইহার ভিতরে বিদ্যালয় পর্যায়ের বিজ্ঞান শিক্ষা অতি গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা আয়োগ এর দ্বারা প্রণীত সিলেবাস ইহার উপর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রদান করে। মানুষের মনের অন্তর্জানের আলোকে প্রজ্জ্বলিত করে যেদিন কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে পারবে সেদিন হবে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা। বিজ্ঞানচেতনার দ্বারা মানুষের মনের অন্ধকার দূর করা সম্ভব। বিজ্ঞানের আলোয় অন্ধমনের গুহান্ধকার দূর হয়। বিজ্ঞানহীন, যুক্তিদ্রোহী জীবন, আলোকশূন্য অন্ধকারময় জীবন। একমাত্র বিজ্ঞানই পারে মানুষের কূপমণ্ডুকতা দূর করতে। একমাত্র বিজ্ঞানমনস্কতাই পারে মানুষকে সত্যালোকের দিকে নিয়ে যেতে।

বার্তালিপি ২০/০৪/২০২৩

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...