Friday, August 5, 2022

যখন পরবে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে : রবীন্দ্র স্মরণে ২২ শে শ্রাবণ


"মরণ রে, তুঁহুঁ মম শ্যামসমান", ভানুসিংহের পদাবলীতে মৃত্যুকে একপ্রকার আহ্বান করেই লিখেছিলেন কবি৷ নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থের ‘মৃত্যু’ কবিতায় তিনিই বলেন- “মৃত্যু অজ্ঞাত মোর, আজি তার তরে… মৃত্যুকে আমি ভালো বাসিব নিশ্চয়।”
আজ ২২শে শ্রাবণ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮২তম প্রয়াণ দিবস। মহাকালের চেনাপথ ধরে প্রতিবছর বাইশে শ্রাবণ আসে। এই বাইশে শ্রাবণ বিশ্বব্যাপী রবী ভক্তদের কাছে একটি শূন্য দিন। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে যার অফুরন্ত অবদান সেই কবিগুরু ভক্তদের যেদিন না-ফেরার দেশে যাত্রা করেন সেদিন শোকার্ত বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে লিখেছিলেন- 'দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্তপারে কোলে/বাংলার কবি শ্যাম বাংলার হৃদয়ের ছবি তুমি চলে যাবে বলে/শ্রাবণের মেঘ ছুটে এলো দলে দলে।

রবীন্দ্রনাথ বর্ষা নিয়ে, আষাঢ়-শ্রাবণ নিয়ে লিখেছেন। তাতে ধরা পড়ে শ্রাবণ-বর্ষণের বহুমাত্রিক রূপ। তবে শ্রাবণের দিকেই কবির নজর ছিল বেশি।
'আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে/দুয়ার কাঁপে ক্ষণে ক্ষণে'
শ্রাবণ-বর্ষণে তিনি যেন পেয়েছিলেন মুক্তির ডাক।

পৃথিবী ছেড়ে না-ফেরার দেশে চলে গেলেও অসামান্য রচনা ও সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে আজো বেঁচে আছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি এখনো দুই বাংলার মানুষের প্রেরণার এক অন্তহীন উৎস। কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করা রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে। ১৯১৩ সালে প্রথম বাঙালি এবং এশীয় হিসেবে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।

কবিতা দিয়ে সাহিত্যচর্চার শুরু এবং শেষ হলেও তার হাতেই বাংলা ভাষায় প্রথম সার্থক ছোট গল্পের সৃষ্টি হয়েছে। তিনিই আবার বাংলা উপন্যাসকে আধুনিক রূপ দেন। শুধু সৃজনশীল সাহিত্য রচনা নয়, অর্থনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র নিয়ে তার ভাবনাও তাকে সম্মানের আসনে পৌছে দিয়েছে। মানুষের মুক্তির দর্শন ছিল তার চেতনা জুড়ে। রবীন্দ্রনাথই একমাত্র কবি যিনি দুটি দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা।

বাংলা সাহিত্যের এমন কোন শাখা নেই যেখানে রবীন্দ্রনাথের অবাধ বিচরণ নেই। রবীন্দ্রনাথের দর্শন তত্ত্ব ছিল সীমার মধ্যে অসীম। তাঁর কাব্যের বহুস্থলেই দর্শনের কিছু কিছু তত্ত্বকথা ছড়িয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের ‘ধর্ম’, ‘মানুষের ধর্ম’,—এই দুই গ্রন্থে, ‘শান্তিনিকেতন’ নামক গ্রন্থের বক্তৃতাবলীতে, আত্মপরিচয়ে এবং “দি রিলিজিয়ান অফ ম্যান’ নামক গ্রন্থে মূলত দার্শনিক আলােচনাই চোখে পড়ে। তাঁর কাব্যগ্রন্থ,নাটক এগুলোতেও যে কবিগুরুর দর্শন তত্ত্ব ফুটে উঠেছে তা দেখা যায়। তাইতো কবিতায় লিখেছিলেন ‘এ চির জীবন তাই, আর কোন কাজ নাই রচি শুধু, অসীমের সীমা / আশা দিয়ে ভাষা দিয়ে, তাহে ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুলি মানসী প্রতিমা’! আবার বলছেন ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর’!

জীবনের শেষ নববর্ষে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তার সাধের শান্তিনিকেতনে। সেদিন রচনা করেছেন ‘সভ্যতার সংকট’ নামের অমূল্য লেখাটি। আর তারও ক’দিন পর ১৯৪১ সালেরই ১৩ মে লিখে রাখলেন, রোগশয্যায় শুয়েই ‘আমারই জন্মদিন মাঝে আমি হারা’। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের শেষ দিনগুলোতে কখনও তিনি শয্যাশায়ী, কখনও মন্দের ভাল। শেষের দিকে ১৯৪১ সালের ২৫ জুলাই, শান্তিনিকেতনের আশ্রমে ছেলেমেয়েদের ভোরের সঙ্গীত অর্ঘ তিনি গ্রহণ করেন তার উদয়ন গৃহের পূর্ব দিকের জানলার কাছে বসে। উদয়নের প্রবেশদ্বার হতে ছেলেমেয়েরা গেয়ে উঠেন কবিরই লেখা ‘এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার, আজি প্রাতে সূর্য ওঠা সফল হল কার।

তারপর একদিন এই শ্রাবণেই তিনি চলে গেছেন সবাইকে কাঁদিয়ে। অবশ্য কবিগুরু তাঁর কর্মে আমাদের মাঝে বর্তমান আছেন, থাকবেন চিরদিনই। মানবজীবনে জন্ম যেমন সত্য--মৃত্যুও অনিবার্য সত্য। তাঁর সৃষ্টি মৃত্যুহীন হলেও তিনি শারীরিক দিক থেকে আমাদের মাঝে নেই এটা মানিয়ে নেয়া খুব কষ্ট--এটাই প্রকৃতিগত অমোঘ সত্য। মৃত্যু রয়েছে বলেই আমাদের বেঁচে থাকাটা এত সুন্দর, এত প্রিয়, এত সার্থক। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে রইল শ্রদ্ধার্ঘ্য...

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...