প্ৰথমত সৎকারের প্ৰসংগ নিয়ে কিছু কথা বলি। দুই যুগ আগে একজন শৰ্মা একজন কোচ রাজবংশীকে বিয়ে করেন। প্ৰকৃতির নিয়ম মতে মানুষ মরবেই। এই শৰ্মাই মরেছিলেন। তাঁর সৎকার করার জন্য (সহজ ভাষায় পুড়ানোর জন্য) কেহই অগ্রসর হয়ে আসেন নি। কেনো আসবেন? ঈশ্বরের মুখপত্র বেদ চারটি বর্ণের কথা বলে। গীতাতেও আছে। আমি এত কিছু জানি না।তবে এটা নিশ্চিত যে বেদে আছে। ঈশ্বরের বাণী এমন একটি ধর্মগ্রন্থকে উল্টে দেওয়ার ক্ষমতা কি মানুষের আছে? আপনিও বেদে বিশ্বাস করবেন এবং চার বর্ণের বিরোধিতা করবেন। হয় ধর্মগ্রন্থ পড়ে এই জঘন্য মানসিকতাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে বা স্বীকার করতে হবে যে গ্রামের লোকেরা যা করছে তা ধর্মের নির্দেশ অনুযায়ীই করেছে।
এই বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক। কেউ কেউ বলেন, ধর্মের ভিত্তিতে নয়, কাজের ভিত্তিতে জাত বিচার করা উচিত। তার মানে কি পরিশ্রমী কৃষক, নাপিত, লন্ড্রিম্যান এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিকৃষ্ট বর্ণের? আর যারা মানুষের টাকা মেরে সম্পদের পাহাড় গড়ে তারা উচ্চ বর্ণের! কি ভয়ানক মানসিকতা আমাদের! মানুষের আবার জাতিগত বিচার কি? আমি একবার পড়েছিলাম যে জাপানের একটি কারখানার মালিক নিজে টয়লেট পরিষ্কার করেছিলেন। টয়লেট ক্লিনার কেন নিম্ন বর্ণের হবে? আমি একবার অফিসে গিয়ে দেখি, থুতু ফেলে বেসিন নোংরা করে ফেলেছেন কোন এক বড়বাবু , আর ঝাড়ুদার পরিষ্কার করছেন। নিজের থুতু নিজে পরিষ্কার করতে আপত্তি কেন? বন্ধুরা, জাতপাতের এই কুৎসিত মানসিকতা পরিহার করুন। ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলুন কোনো বই বা মানুষ (তা কাজ বা ধর্মের ভিত্তিতেই হোক) যারা জাত নিয়ে কথা বলে ।
কিছু নিচু মনের মুসলমানও এই জাতপাতের খেলা থেকে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে। সেই অংশের সাথে সতর্ক থাকুন। নূপুর যা বললেন তার আড়ালে সারা বিশ্বে যে নৃশংস খেলা চলছে তা নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। তবে নূপুর যা বলেছেন তা ইসলামের প্রাসঙ্গিক পবিত্র গ্রন্থ হাদিস থেকে উদ্ধৃত। তারাই চার্লি হেবডোরের উপর হামলা চালিয়েছে এবং ফরাসি শিক্ষককে হত্যা করেছে। তারা উপন্যাস লিখার জন্য সালমান রুশদিকে নিষিদ্ধ করেছে। তার প্রাণ কেড়ে নিতে তারা হামলা চালায়। তাদের মানসিকতাও শাস্ত্র দ্বারা পরিচালিত। তাদের ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে, কিন্তু তারা যে ধর্মগ্রন্থ দ্বারা প্রভাবিত তাতে কি কোনো ভুল আছে?
'একজন লেখকের কাজ শুধু পাঠকের রুচি অনুসারে লেখা পরিবেষণ করা নয়। একজন লেখকের কাজ পাঠককে শুধু আনন্দ জোগানো নয়। একজন লেখকের কাজ পাঠককে বিরক্ত করা এবং অপশক্তিকে উত্যক্ত করা। লিও টলস্টয় নিজেকে বলতেন 'প্রফেশনাল ট্রাবলমেকার'। একজন লেখক তো তাই, তিনি বিঘ্ন সৃষ্টি করবেন পাঠকের সরল জীবনপথে, কাঁকড় বিছিয়ে দেবেন। পাঠক হোঁচট খাবে, এবং চোখ তুলে তাকাবে। সে তবেই বুঝবে তার চারপাশে কী ঘটছে। প্রুস্তু বলেছিলেন স্মৃতির মধ্যেই আছে বাস্তবিকতা। অতএব পাঠককে সেই বাস্তবিকতা উপলব্ধি করাতে হলে একজন লেখককে তাঁর লেখাকে স্মরণীয় করতে হবে, আজকের তথাকথিত জনপ্রিয় লেখকদের মতো ইউজ অ্যান্ড থ্রো সাহিত্য রচনা করলে চলবে না।' সলমান রুশদী একাধিক কারণে আমার খুব প্রিয় সাহিত্যিক নন। কিন্তু তাঁর মেরুদণ্ডটা খুব শক্ত, তাই আমার পছন্দ । এই ছুরিকাঘাত বিশ্বসাহিত্যের উপরেই হয়েছে। এ সাহিত্যের পরাজয় নয়। এটা জয়।তবে বুঝা গেল সাহিত্যের শক্তির মোকাবিলা কেবলমাত্র পশুশক্তি দিয়েই করতে পারে কিছু গোষ্ঠী।
সাটানিক ভার্সে কি আছে? আমি ঠিক জানি না, আমি তা পড়িও নি। কিন্তু বিভিন্ন আলোচনা পড়ে ও শুনে যা বুঝলাম তা হলো তিনি তার উপন্যাসে ইসলামের নবী মুহাম্মদের জীবনের একটি ঘটনাকে খুব কৌশলগত ভাবে তুলে ধরেছেন। একজন লেখকের অবশ্যই সেই অধিকার আছে। হিন্দু ধর্মের দেবদেবীদের নিয়ে অনেক রসিকতা ও সাহিত্য রয়েছে। সেখানে তো, কেউ আপত্তি করে না, তবে একজন সাহিত্যিক হিসাবে তিনি এটি উপভোগ করেন। যদিও বর্তমানে কিছু হিন্দুও উপরোক্ত বর্ণের মুসলমানদের মত আচরণ করছে এবং তারা ক্রমশ সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছে। এটা আমাদের দেশের জন্য এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।
সালমান রুশদিকে কোপানো জিহাদি হাদি মাটারের বয়স ২৪ বছর। রুশদি দেশছাড়া হয়েছেন ৩৩ বছর আগে। দ্য স্যাটানিক ভার্সেস বইয়ের বয়স ৩৪ বছর। অর্থাৎ রুশদি যখন এই বইটা লিখেছিলেন তখন তাকে আক্রমণ করা এই জিহাদি ছেলেটার জন্মও হয়নি। অথচ সে এমন এক ঘৃণার পরিবেশে বড় হয়েছে যেখানে তাকে শেখানো হয়েছে সালমান রুশদিকে হত্যা করতে হবে তার বইয়ের জন্য। রুশদী কি লিখেছেন সে আদৌ পড়ে দেখেছে কিনা সন্দেহ আছে।
একইভাবে বাংলাদেশে মৌলবাদীরা তসলিমা নাসরিনকে ঘৃণার শিক্ষা নিয়ে বড় হয়েছে। কেউকেউ তাকে হত্যা করার জন্য তৎপর । অনেকেই তো আবার তার মাথার দাম নির্ধারণ করেছে। পূর্বসূরি হুমায়ুন আজাদ, তসলিমা নাসরিন থেকে উত্তরসূরী অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, আসিফ মহিউদ্দিন, সবাই কমবেশি ভুক্তভোগী। ভারতেও দাভল কার, গৌরী লঙ্কেস সহ বহু বুদ্ধিজবী কে হত্যা করা হয়েছে। এত হত্যা, খুন, ধর্ষণ, বোমাবাজি করার পরেও দেখবেন তারা বলবে সারা দুনিয়া তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। পশ্চিমারাতো ইসলামোফোবিয়ার চাষ করছে। যারা বইয়ের জবাব দেয় চাপাতি দিয়ে, যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ এইসব হত্যা দেখা উল্লাসে ফেটে পড়ে, একজন সুস্থ-স্বাভাবিক, জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ মাত্রই এদের দেখে ফোবিয়ায় ভুগবে।
আচ্ছা যাইহোক রুশদির কথায় আবার আসা যাক। আমার ভুল হলে আমাকে সংশোধন করাবেন। নবী মুহাম্মদ একবার মক্কায় জনসমক্ষে প্রার্থনা করার সময় মূর্তি পূজারীদের দেব-দেবীর প্রশংসা করে একটি আয়াত পাঠ করেছিলেন। যাতে মুশরিকরা মুহাম্মাদের সাথে একত্রে সিজদা করে। এই মিল দেখে ইতিমধ্যে হিজরত করা মুসলমানরা মক্কায় ফিরে যেতে শুরু করে। পরে তিনি আয়াতটিকে ভুল বুঝেছিলেন এবং শয়তানের প্ররোচনা বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাফসীর কিতাবে বা বিভিন্ন ইসলামী গ্রন্থে এ ঘটনার বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। আগ্রহীরা নিজেদের জন্য এটি পড়া উচিত। রুশদি খুব কৌশলগত ভাবে এই ঘটনাটিকে তার উপন্যাসে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এটি ইসলামে বিশ্বাসী বেশিরভাগ লোককে তার মৃত্যুদণ্ডের জন্য আকাঙ্ক্ষায় আছে এবং তারা তা বাস্তবায়নেরও চেষ্টা করে।
বিরোধিতা করলে কলম দিয়ে করো, তলোয়ার দিয়ে কেন? নাকি আপনি কলম ব্যবহার করতে জানেন না? আজকের যুগে কলম ছাড়া অস্ত্র বানানো যায় না। যারা কল্লা নামানোর কথা বলেন শুধু কথা বলার অধিকার স্তব্ধ করতে তারা; ফ্যাসিস্ট দের বিরোধিতা করে কোন মুখে? সলমন রুশদির কি কথা বলার অধিকার নেই । যদিও লোকটা সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির সমর্থক। তাই কলম ধর, অস্ত্র নয়, বল নয়, হিংসা নয়। যা খুশি লিখুন, যা খুশি শপথ করুন, অভদ্র ভাষায় শপথ করুন, শুধু বর্ণবাদী আচরণ করবেন না, হিংসা ছড়াবেন না।
No comments:
Post a Comment