Friday, August 5, 2022

লাতু মালেগড় : ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহের সাক্ষী


"কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা,
বন্দীশালার ওই শিকল ভাঙ্গা
তাঁরা কি ফিরিবে আজ
তাঁরা কি ফিরিবে আজ সু-প্রভাতে,
যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে।। "
দেশের খাতিরে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন বীর শহীদেরা। মোহিনী চৌধুরী তাঁর লেখায় যে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন এবং আমরাও বোঝতে পারি শহীদেরা তরুণ অরুণ। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা বলা হয়ে থাকে। আর ঐ বিদ্রোহে আমাদের বরাক উপত্যকা কিভাবে অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত তা বোধহয় আজও অনেকের অজানা।

লঙ্গাই নদীর তীরে ছোট্ট একটি টিলা। আসামের করিমগঞ্জ জেলার লাতু একটা ঐতিহাসিক রণভূমি। একটা উপেক্ষিত অঞ্চল। যার নাম মালেগড়। রক্তাক্ত এই ইতিহাস লিখার কথা ছিল স্বর্ণাক্ষরে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজও এখানে যথাযোগ্য মর্যাদার আলো পড়ে নি। অপশক্তির বিরুদ্ধে দেশ মাতৃকার জন্য সিপাহী বিদ্রোহে যারা লড়েছিল আজ শুধু নাম মাত্র সমাধিতে পড়ে আছে তাঁরা। এপারে লঙ্গাই ওপারে সোনাই নদীর তীরে ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তে নিরবে নিভৃতে শায়িত আছেন ২৬ জন বীর সেনানী।

আজ আমরা স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষ পালন করছি। সিপাহী বিদ্রোহের ১৬৫ তম বর্ষ। তা কিন্তু কম বড় কথা নয়। আমাদের জন্য নিশ্চয়ই গর্বের বিষয়। রক্তাক্ত এই ইতিহাস পাটকাই ট্রেকার্সের দৌলতে জনসমক্ষে প্রকাশ পায়। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সাক্ষী এই শহিদভূমি, পাটকাই ট্রেকার্সের কর্মকর্তারা আজও নিরলসভাবে এই পুণ্যভূমির সেবায় নিয়োজিত আছেন। তারা আশাবাদী অচীরেই আবার জেগে উঠবে এই শহিদ ভূমি।
১৮৫৭ সাল সিপাহী বিদ্রোহ। যার সূচনা হয় ১৮৫৭ সনের ২৯ মার্চ ব্যারাকপুরে। এই আগুন জ্বলতে জ্বলতে পূর্ব ভারতের মাটিও স্পর্শ করেছিল। চট্টগ্রামে নিয়োজিত ৩৪ নেটিভ ইনফেন্ট্রির তিন’শ জন সিপাহী বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। নেতৃত্বে ছিলেন হাবিলদার রিজবুল্লা খান। সেদিন ১৮ই নভেম্বর ১৮৫৭। সুবেদার অযোধ্যা সিং চট্টগ্রাম কোষাগার লুট করেন। নগদ প্রায় দুই লক্ষ পঁচাত্তর হাজার টাকা। সিলেট ডিভিশনের কমান্ডার মেজর ব্যারিং সূত্র মারফত খবর পেয়ে যান বিদ্রোহী বাহিনী অবিভক্ত বাংলার শ্রীহট্ট জেলার লাতুতে অবস্থান করছে। ১৮ই ডিসেম্বর শীতের কনকনে বাতাসে লঙ্গাই- সোনাই নদীর তীরে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই মেজর ব্যারিং ও ৩৪ নেটিভ ইনফ্রেনটি  রিজবুল্লা খান বাহিনীর মুখোমুখি সংর্ঘষ হয়। ছাব্বিশজন বিদ্রোহী সেনা ও মেজর ব্যারিং সহ পাঁচজন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন।

আজ এই হৃদয় বিদারক ঘটনা ইতিহাসের পাতায় লুক্কায়িত।  ব্রিটিশ সরকারের কাছে এই সংঘর্ষের বিবরণ পাওয়া গেলেও আসাম সরকারের কাছে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় নি। এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ আব্দুল মুকিত চৌধুরীর কাছ থেকে জানা যায় মাটি খনন করার পর উঠে আসে দুটি বিশাল তলোয়ার, একটি পিস্তল, আগুন জ্বালাবর পাথর। আর তৎসঙ্গে ২৬  জন শহীদের সমাধি এই টিলায় দেয়া হয় তাঁর থেকে জানা যায়। কথিত আছে টিলার ওপরে লুঠ হওয়া বাক্স খোলা হয়। সেই থেকে নাম পড়েছে মালেগড় টিলা। লঙ্গাই নদীর তীরে ভয়ানক গুলিবর্ষণের শব্দ আর আহত সৈন্যদের আর্তনাদ সেদিন মালেগড়ের আকাশ বাতাস স্বাক্ষী হয়ে ছিল। আজও ১৮ই ডিসেম্বর মালেগড় দিবস লাতুর মানুষের কাছে।

বলা বাহুল্য, সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনী (BSF) প্রশংসার যোগ্য। মালেগড়কে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসার জন্য তাঁদের অবদান অসীম । সঙ্গে প্রশংসা করতে হবে স্বেচ্ছাসেবী সংঘটন পাটকাই ট্রেকার্সের। ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসের পুন্য লগ্নে আমরা সরকারের কাছে এটাই দাবি রাখি, খুব শীঘ্রই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা পর্যটনমন্ত্রীর হাত ধরে মালেগড়ে গড়ে উঠুক পর্যটন কেন্দ্র। যদি মালেগড়ের পাশে সীমান্ত চুক্তি মতে আন্তর্জাতিক হাট গড়ে উঠে তাহলে দিন দিন এতে বাড়বে পর্যটকের সংখ্যা। তাতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে আর অর্থনৈতিক দিক দিয়ে উন্নত হবে সীমান্ত এলাকা । সেইসঙ্গে এই গৌরবময় অধ্যায়ের কথা জানবে গোটা দেশ ও বিশ্ব। গৌরবান্বিত হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও।

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...