অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের দিকে যাত্রা শুরু করেছে সৌদি আরব। বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্থাপনা তৈরি করতে যাচ্ছে তাঁরা। এই স্থাপনাটি মূলত 'দ্য মিরর লাইন' LINE বা নিওম NEOM শহর নামেও পরিচিত। যার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি ডলার বা প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার এর উপর। এছাড়া এই প্রকল্পে আইন প্রণয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার। এটি প্রায় ১২০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এবং উপকূলীয়, পর্বত ও মরুভূমি অঞ্চল জুড়ে ৭৫ মাইল সমান্তরালে মিশরের মরুর বুকে অবস্থিত।এর উত্তরদিকে লোহিত সাগর এবং পূর্বদিকে আকবা উসাগরে অবস্থিত।এর ক্ষেত্রফল প্রায় ৩৪ বর্গকিলোমিটার।এর আকৃতি হবে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের কাছাকাছি।এটি দুটি কাচের প্রতিফলিত ভবনের সমন্বয়ে গঠিত। এখানে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ ৫ মিনিটে হেটে একে অপরের সঙ্গে দেখা করতে পারবে।ধারণা করা হচ্ছে,এটি তৈরি করতে সময় লাগবে প্রায় অর্ধ-শতক বা ৫০ বছর এবং এতে ৫০ লক্ষ বা ১ মিলিয়ন মানুষ বসবাস করতে পারবে।
এতে থাকবে ১৬০০ ফুট পর্যন্ত দুটি বিল্ডিং যা পিরামিডের মতো উচ্চাভিলাষী হবে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের এম্পায়ারের চেয়েও বেশি লম্বা হবে।এটির নিচ দিয়ে উচচগতিসম্পন্ন ট্রেন চলাচল করবে যা প্রায় ২০ মিনিটে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছিয়ে দিতে পারবে।মাটি থেকে ১০০০ ফুট উপরে থাকবে খেলার মাঠ।এছাড়া নিয়ম সিটির ট্রান্সপারেন্ট লাইন হতে পারে পৃথিবীর সপ্তাচার্য।এখানে কার্বন-ডাই অক্সাইডের মাত্রা শূণ্য এবং অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক বা নিয়ন্ত্রিত থাকবে।এই পরিকল্পনার মধ্যে আরো একটি যমজ ভবন যা ওয়াকওয়ের মাধ্যমে যুক্ত থাকবে। আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স দ্বারা পরিচালিত ওয়াটার সাপ্লাই ও এনার্জি সম্পূর্ণ নবায়নযোগ্য।এছাড়া এর ভিতরে থাকবে চাষাবাদের ব্যবস্থা।
সৌদি সিংহাসনের উত্তরসূরি মোহাম্মদ বিন সালমান এ পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। এই পরিকল্পনাটি কার্যক্রম ২০২১ সালেই শুরু হয় এবং এটি ২০৩০ ভিশন নামেও পরিচিত।এই পরিকল্পনাটি আল-জাজিরার ওয়াল্ড স্টিফেন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মরফোসিস আর্কিটেক্টর এর প্রতিষ্ঠাতা প্রিটজোকার আর্কিটেক্টর বিজয়ী থম মেইন।ধারণা করা হচ্ছে যে,এই পরিকল্পনা বা প্রকল্পটি সম্পন্ন করতে সফল হলে এটিই হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও আধুনিক স্মার্ট সিটি।
সৌদি কর্মকর্তারা একে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ফ্লাইং কার সুবিধাসহ শহরটিকে বিশ্বের প্রথম প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। রেস্তোরাঁয় রোবোটিক সেবক থাকবে এবং হলোগ্রাফিক শিক্ষকরা স্কুল/কলেজে পড়াবেন। কৃত্রিম বৃষ্টি হবে এমনকি রাতের আলোর জন্য চাঁদও তার নিজস্ব হবে। এছাড়া রোবোটিক ডাইনোসর দিয়ে জুরাসিক পার্কও তৈরি করা হবে।
ওয়েস্টার্ন স্পোর্টস সিটি এটি হবে বিশ্বের প্রথম ক্রীড়া শহর যা নিওম প্রকল্পের অধীনে ৩৭ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হবে, যেখানে ইসলামিক আইন প্রযোজ্য হবে না। স্পোর্টস সিটিতে আগত পর্যটকদের জন্য পশ্চিমা দেশ অনুযায়ী প্রণীত নিয়ম-কানুন প্রযোজ্য হবে। ক্রীড়া অনুরাগী, মহিলা এবং শ্রমিকদের প্রতি থাকবে না কোন শরিয়া বিধিনিষেধ এবং পশ্চিমা দেশগুলির আদলে অবাধে চলাফেরা করতে পারবে। স্পোর্টস সিটি সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন ২০৩০ এর অংশ। এর আওতায় সৌদি আরবকে ক্রীড়া ইভেন্টের বিশ্ব কেন্দ্রে পরিণত করা হবে।
প্রকল্পের প্রথম ধাপ, যা ২০১৮ সালে শুরু হয়েছিল, ২০২৫ সালে শেষ হবে। সৌদি আরব বলেছে যে তারা কোনো মূল্যে গেমস থেকে রয়্যালটির হার কমিয়ে দেবে না, এমনকি তাদের বৈশ্বিক মঞ্চে বিরোধিতা করলেও। এর লক্ষ্য খুব স্পষ্ট - পর্যটন শিল্পকে অবশ্যই তার রাজস্বের ১০ শতাংশ উৎপন্ন করতে হবে। খেলাধুলা সংক্রান্ত অনেক বড় ইভেন্ট আয়োজনের এখন পর্যন্ত ব্যবস্থা তৈরি করেছে সৌদি আরব। গত শনিবার, রিয়াদে অ্যান্টোইন জোশুয়া এবং অ্যান্ডি রুজ জুনিয়রের মধ্যে ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট বক্সিং প্রতিযোগিতা হয়েছিল। এই ম্যাচের প্রাইজমানি ৪৭২০ কোটি টাকা। আগামী বছর বক্সিং, ফুটবল, ফর্মুলা ওয়ান, সাইক্লিং, ঘোড়দৌড়সহ অনেক খেলার চ্যাম্পিয়নশিপ হবে বড় পরিসরে, যাতে থাকবে কোটি কোটি টাকার পুরস্কার।
এদিকে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা খেলার মাঠে ফিরে সৌদি আরবের নতুন ভূমিকার জন্য সমালোচনা করেছে। যতদূর স্প্যানিশ রাষ্ট্র সম্প্রচারক RTVE. আগামী মাসে জেদ্দায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া স্প্যানিশ সুপার কাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে অস্বীকার করেছে।
তহবিল কোথা থেকে আসবে?
নিওম সিটির প্রথম ধাপের কাজ ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এ জন্য সময়মতো তহবিল ব্যবস্থা বড় লক্ষ্য। প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের তার দেশকে প্রযুক্তি হাব এবং ক্রীড়া নগরীতে গড়ে তোলার লক্ষ্যের অংশ হিসেবে তেল কোম্পানি শেয়ার বিক্রি করে তহবিলের ব্যবস্থা করা হবে। শেয়ার বিক্রিতে বিলম্ব হলে কাজ আটকে যেতে পারে। এ ছাড়া সময়ে সময়ে সৌদি আরবে ক্রীড়া অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রি, প্রতিবছর হজযাত্রী তথা পর্যটনের প্রচারের মাধ্যমে তহবিলের ব্যবস্থা করা হবে।
সৌদি আরব হলো দ্বিতীয় ইসলামি দেশ যারা তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন করেছে। এর আগে, তেলের উপর নির্ভরতা কমিয়ে কয়েক দশক আগে দুবাই পর্যটন শিল্পকে বাড়িয়েছিল। এক সময় এটি শুধুমাত্র তেল শিল্পের কারণে স্বীকৃত ছিল, কিন্তু এখন তা নেই। তেল বাণিজ্য কেবল তাদের অর্থনীতির প্রধান উৎস ছিল না, তবে পর্যটন, রিয়েল এস্টেট এবং আর্থিক পরিষেবাগুলিও আয়ের প্রধান উৎস হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। শরিয়া আইনের আওতায় থাকা দেশে এইধরণের অভিনবত্ব কম বড় কথা নয়।
তবে যাইহোক সৌদি তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পথে অগ্রসর হতে চলেছে। শহরটির নাম যেহেতু NIOM বা ‘নিয়ম’। সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন হতে চলছেন এই শহরের বোর্ড অব ডাইরেক্টর্স-এর প্রধান। জলবায়ু বদল ও বর্তমান নগরজীবনের সমস্যা মোকাবিলাতে এই শহর যুগান্তকারী হতে চলেছে বলেও দাবি করেন সলমন। এমনই একটি শহর তাঁরা নির্মাণ করতে চলেছেন বলে দাবি সৌদি আরবের। তাদের দাবি, এই শহরটি ‘পৃথিবীর প্রথম মাধ্যাকর্ষণহীন শহর’ হবে, ‘থাকবে না কোনও দূষণ, চলবে না কোনও গাড়িও’।
No comments:
Post a Comment