১৪ই অগাস্ট ১৯৪৭; সারা ভারতের মানুষ এক অসম্ভব আবেগ বুকে নিয়ে জেগে আছে, আর তো মাত্র কয়েক ঘন্টা! ঠিক রাত ১১ টায় সংবিধান সভা-র ৫ম অধিবেশন শুরু হলো। সভাপতির আসনে ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ। এই অধিবেশনকে মানুষ মনে রেখেছে জওহরলাল নেহরু-র সেই বিখ্যাত ‘tryst with destiny’ বক্তৃতার জন্য, কিন্তু তার আগেও কিছু কথা থেকে গেছে, যা আজ মনে করাটা জরুরী। ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদ হিন্দীতে তার প্রারম্ভিক ভাষণ দিলেন, যেখানে শেষের আগে তিনি উল্লেখ করলেন সেই শপথবাক্য, To all the minorities in India we give the assurance that they will receive fair and just treatment and there will be no discrimination in any form against them. Their religion, their culture and their language are safe and they will enjoy all the rights and privileges of citizenship, and will be expected in their turn to render loyalty to the country in which they live and to its constitution. To all we give the assurance that it will be our endeavour to end poverty and squalor and its companions, hunger and disease; to abolish distinction and exploitation and to ensure decent conditions of living.
আজকের সময়ে এই শপথের বিন্দুমাত্র ধার ধারতে কেউই রাজি নয়, তারা ৭২ বছর আগে করা সেই শপথকে বেমালুম ভুলিয়ে দিয়ে এই বহুজাতিক দেশটাকে একমাত্রিক হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের মোড়কে প্রাণহীন, বৈচিত্রহীন ভূমিখণ্ডমাত্র করে তুলতে চাইছে; যেখানে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা ভাষিক সংখ্যালঘুদের সাথে অধিকার শব্দটির কোনও যোগ থাকবেনা। রাজেন্দ্রপ্রসাদজী তাঁর বক্তব্য শেষ করার পরে, সমবেত সমস্ত ব্যক্তিবর্গকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের উদ্দেশ্যে ২ মিনিট নীরবতা পালন করার আহ্বান জানালে, সভা উঠে দাঁড়িয়ে অমর শহীদদের শ্রদ্ধা জানায়। আমরা ভুলি কি করে, ঐ শহীদদের সিংহভাগই যে বাংলার সুসন্তান, কীভাবে ভুলতে পারি আমাদের গর্বিত করা সেই পূর্বপুরুষদের! সেদিন যারা স্বাধীনতার শত্রু ছিলো, ভারতীয় জনতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে সেদিন যারা বৃটিশের দালালি করাটাই কর্তব্য মনে করেছিলো; তারা নাকি আজ এনআরসি করে আমাদের নাগরিকত্ব ঠিক করবে!
“According to the MHA, Security Agencies are equipped with mechanism to identify between a migrant and an infiltrator on the basis of documents, source information etc. Illegal migrants are adequately dealt with under the Foreigners Act, 1946, Passport (Entry into India) Act, 1920, Registration of Foreigners Act, 1939 and Citizenship Act, 1955 and the Rules and Guidelines made thereunder. Such illegal migrants are put on trial, prosecuted and then deported to the country to where they belong. In this context, the Committee find that the Foreigners Tribunals have identified over 90,000 illegal migrants since 1986 out of which only 2400 could be deported and the deportation of others could not materialise for various reasons.” – ৭ই জানুয়ারি ২০১৯-এ লোকসভা এবং রাজ্যসভাতে নাগরিক (সংশোধনী) বিল, ২০১৬-র জেপিসি রিপোর্ট পেশ করা হয়, সেখানেই ৮০-র পাতায় ৫.৫১ নং অনুচ্ছেদে ওপরে এই কথাগুলো উল্লেখিত আছে। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে যে, আজ এনআরসি নিয়ে সারা অসম ও বাংলায় যে আলোড়ন তৈরী হয়েছে, তার আইনি দিকগুলোই আসলে প্রশ্নের মুখে। তবে এই প্রশ্নগুলো তোলা সম্ভব, যদি আইনকে মানবকল্যাণের দিক থেকে বিচার করা হয়। বৃটিশ শাসনকালের আইন, যা আমাদের এই তথাকথিত স্বাধীন দেশের কর্তাব্যক্তিরা ৭২ বছর পরেও শুধরে নেওয়া, বদলে ফেলার হিম্মত দেখাতে পারেনি বা নিজেদের দালাল মানসিকতার কারণে আদৌ বদলে ফেলতে চায়নি, তার দ্বারাই কিন্তু নিরুপিত হয় অসহায় মানুষের ভবিষ্যৎ।
আসলে আমাদের দেশের পোড় খাওয়া শাসকেরা নিজেদের ‘স্বাধীনতা’র চরিত্রকে ভালোই বোঝে, সেকারণেই তাদের সমস্ত ভাবনাগুলোই সেই ঔপনিবেশিক সময়ে আটকে থেকে ভারতের বুকে এক আভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদী শাসন কায়েমের দিকেই ধাবিত হয়। ‘বিদেশী’ চিহ্নিতকরণে যে ফরেনার্স ট্রাইবুন্যাল গঠিত হয়, তা এখনো বৃটিশ আমলের সেই ‘বিদেশী আইন, ১৯৪৬ মোতাবেকই হয়ে থাকে, যা আপামর ভারতবাসীর স্বার্থের পরিপন্থী। এই রিপোর্ট পেশ করার সময়ে স্বরাষ্ট্র দফতর থেকে বলা হচ্ছে, ১৯৮৬ থেকে ৯০,০০০ মানুষকে ‘বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’ বলে চিহ্নিত করা গেছে এবং তার মধ্যে মাত্র ২৩০০ জনকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা সম্ভব, বাকিদের নাকি ‘বিভিন্ন’ কারণে বিতাড়ণ সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে আজকে অসমে এনআরসি-র দৌলতে বেনাগরিক হয়ে যাওয়া সংখ্যাটা যখন ১৯,০৬,৬৫৭; তখন ব্যাপারটা কি দাঁড়াতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। আজ অবধি কতজনকে এই ‘বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’ হিসাবে দেশ থেকে বিতারণ করা হয়েছে, সেই ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র দফতরের মুখে কুলুপ, যেমন অনুপ্রবেশকারী সংখ্যা নিয়েও তাদের মুখে রা সরেনা। একটা কথা ওরা খুব ভালো করে জানে; যাদেরকেই ‘বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’ হিসাবে চিহ্নিত করা হোক না কেন, তাদের প্রায় কাউকেই প্রতিবেশী বা অন্যদেশে ‘পুশব্যাক’ করা সম্ভব হবেনা। তাদের বন্দী করে রাখার মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যক ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’র ব্যবস্থা করাও সম্ভব নয়। রাজনীতিটা এখানেই। মানুষ যদি তাদের এই মেরুকরণের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির স্বরূপ বুঝতে না পারে, তাহলে তাদের সর্বনাশ কেউ রুখতে সক্ষম হবেনা।
হয় শিকড়ের প্রমাণ দাও, নাহলে ঠাঁই মিলবে ডিটেনশন ক্যাম্পে! অসম্ভব অমানবিক একটি শব্দ ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’। 'অবৈধ অভিবাসী' নাম দেওয়া মানুষদের যাদের আমরা "উইপোকা" বলে চিনি তাদের আটকে রাখার জন্য ডিটেনশন ক্যাম্প কে কনসেন্ট্রেসন ক্যাম্প বলা যায়। একটা ছোট্ট আপডেট হলো বর্তমানে শিলচর ডিটেনশন ক্যাম্পে মোট ৭৪ জন আছেন। তাঁদের ১৩ জন মহিলা। আছে ১০ বছরের শাহানারা বেগমও। ৭ মাস বয়স থেকে সে মায়ের সঙ্গে জেলে। কখনও শিলচরে, কখনও কোকরাঝাড়ে। আসামের গোয়ালপাড়ায় নির্মিত হচ্ছে ২.৫ হেক্টর জমির ওপর এনআরসি তালিকাছুট মানুষদের মধ্যে ৩০০০ জনকে এখানে বন্দী রাখার ব্যবস্থা। কর্তৃপক্ষের মতে ক্যাম্পে থাকবে “একটি হাসপাতাল, একটি অডিটরিয়াম, একটি যৌথ রান্নাঘর, ১৮০টি শৌচালয় ও চানঘর, একটি প্রাইমারি স্কুল, ছোট ছোট কক্ষ এবং শিশু সহ মহিলা ও সন্তান লালন পালন করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা”।
ইতিহাস যেন বার বার ফিরে আসে। বৃটিশ-বিরোধী আন্দোলনে বিপ্লবীর সংখ্যা এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছিলো যে, বৃটিশ সরকার তাদের সাধারণ জেলে স্থান দিতে অসমর্থ হয়। আরও একটা কারণ ছিলো, সাধারণ বন্দীদের সাথে একই জেলে বিপ্লবীরা থাকলে, অন্যান্য কয়েদীদের মধ্যে তাদের প্রভাব দ্রুত বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। একারণেই বিপ্লবীদের জন্য প্রথম ডিটেনশন ক্যাম্পটি তৈরী করা হয়, উত্তরবঙ্গের বক্সা-তে এবং ১৯৩০ সালে তৈরী হয় দ্বিতীয়টি, হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্প। এটা ছিলো ভারতবর্ষের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এক অন্ধকারময় অধ্যায়। যেকোন দেশের এমন ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিৎ, সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। কিন্তু ভারতবর্ষের মসনদে বসে যে সাম্প্রদায়িক উস্কানিতে দেশ পরিচালনা করা হচ্ছে, তারা ইতিহাসের নেতিবাচক অধ্যায়গুলিকেই বার বার ফিরিয়ে আনতে তৎপর হচ্ছে।
২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের আগে অসমের বুকে দাঁড়িয়ে সমস্ত ডিটেনশন ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভারতের মসনদ দখল করেছিলো যে নরেন্দ্র মোদী। ক্ষমতা পাওয়ার পর সেই অসমের বুকে দেশের প্রায় কুড়ি লাখ মানুষকে বেনাগরিক ঘোষণা করে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরী করছে! অসমের গোয়ালপাড়ায় বনাঞ্চল কেটে দশ একর জমির ওপর ৪৬ কোটি টাকা খরচ করে তৈরী হচ্ছে সর্ববৃহৎ ডিটেনশন ক্যাম্প। চারিদিকে কুড়ি ফুট উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা, অর্থাৎ এক ভিন্ন জগতে এই রাষ্ট্রহীন মানুষগুলোকে পাঠিয়ে দিতে উঠেপড়ে লেগেছে সরকার। এক বিশাল ষড়যন্ত্র। গোয়ালপাড়ার এই ডিটেনশন ক্যাম্পে ৩০০০ মানুষকে রাখা যাবে; সেক্ষেত্রে ১৯ লক্ষের বেশী মানুষকে রাখতে প্রায় ৬৩৫ টা এমন ক্যাম্প বানাতে হবে এবং যার জন্য খরচ হতে পারে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা! একটা রাজ্যে বা দেশজুড়ে এতোগুলো কয়েদখানা - এই ব্যাপারটি কি আদৌ সম্ভব, না সরকার সারা দেশের মানুষকে বোকা বানাচ্ছে। শাসকের এই এনআরসি লাগু করার আসল উদ্দেশ্য সেই এক ক্ষমতা ও ভোট রাজনীতি; আজ তার উপুড়-করা বিষের নাম নাগরিকত্ব। দেশহীন, নাগরিকত্বহীন - এই শব্দগুলোই এখন ভারতবর্ষের প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মহারাষ্ট্রেও ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরীর প্রস্তুতি চলছে। এবার পাখির চোখ বাংলা। এনআরসি লাগু করে মূলত বাঙালির ওপর যে আগ্ৰাসন নামিয়ে এনেছে মোদী সরকার, তার মূল্য তাকে সুদাসলে দিতে হবে। রাষ্ট্র তার ইচ্ছেতেই মানুষকে রাষ্ট্রহীন করছে। চিন্তার বিষয় হলো দেশটাকে একটা ডিটেনশন ক্যাম্প বানিয়ে না দেওয়া হয়।
এখানে একটা আঁচড়ও কাটতে দেওয়া যাবেনা; আমাদের সমাজ বহু রঙের, সেখানে শুধুমাত্র এক গেরুয়া রঙের ‘রংবাজি’ কিছুতেই মেনে নেওয়া যায়না। এই দেশ সাধারণ মানুষ ভাগ করেনি, কিন্তু তারাই এই দেশভাগের জন্য সবচেয়ে বেশী মূল্য দিয়েছে, আজও দিয়ে চলেছে। সেদিনের করা শপথ তাদের নিজেদেরই ভুলে যাওয়ার অর্থ দেশবাসীর সাথে এক চরম প্রতারণা। আজ তারা বাঙালিকে ‘উইপোকা’ বলে অপমান করার সাহস দেখাতে পারছে, কারণ আমরা বড্ড বেশী সহনশীল হয়ে পড়েছি। ভারতে আজ ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাই শুধু সংঘ পরিবারের আক্রমণের লক্ষ্য নয়, সমগ্র বাঙালি জাতিসত্তাকে ভাষিক সংখ্যালঘুতে পরিণত করে প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়াটাই মূল উদ্দেশ্য।
এনআরসি-র নামে বাঙালির মাজা ভেঙ্গে দেওয়ার এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে রুখে দাঁড়ান, নিজেদের পূর্বসুরী শহীদদের ঋণ শোধ করুন, উত্তরসূরীদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। এবার ভীষণ যুদ্ধ হবে! না অমানিশায় ছেয়ে যাওয়াটা নিশ্চিত বলে ধরা যাক। এনআরসি এখন এক নতুন বিভাজন হয়ে উঠেছে। বাদ পড়া মানুষদের যাতে সহজেই বৈষম্য ও শোষণের শিকার করা যায় সেইদিকে আসামের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানী দল মানুষকে ডিটেনশন ক্যাম্পের ভয় দেখিয়ে সস্তা ও আত্মহীন করে তুলবে। ওদের আরেকটা উদ্দেশ্য হলো ডিটেনশন ক্যাম্পগুলিকে ফোর্সড লেবার ক্যাম্প হিসেবে কাজ করানো।ফ্যাসিবাদীদের এনআরসির মাধ্যমে বিভাজন আর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প মানছিনা মানব না।

No comments:
Post a Comment