Tuesday, October 22, 2019

ডিটেনশন ক‍্যাম্প : এটাই আমার রাষ্ট্র ?

(১)
মাত্র দেড়’শ বছরের কিছু আগে-পরে জানা গেছিলো, সমস্ত ইতিহাসই আসলে শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস। যুগে যুগে সভ্যতার অগ্রগমনের সাথে সাথে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়ে তৈরী হয়ে এসেছে ইতিহাস, কিন্তু যা সত্যিই শাসকের শ্যেন দৃষ্টি থেকে মুক্তি পায়নি, ফলে আজকেও যখন মুষ্টিমেয় শাসকের হাতেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, তখন ইতিহাস যে তাদের মর্জিমাফিকই হতে হবে, তাতে চমকে যাওয়ার কিছু নেই। এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজকের ভারতবর্ষ। আরও স্পষ্ট করে বললে, একটা জাতি আজ চরম আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে তার নিজস্বতা, পরিচিতি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। জাতিটার নাম বাঙালি! প্রায় সাত দশক আগে, সংবিধান সভায় নাগরিকত্বের প্রশ্নে ব্যাপক আলোচনার পরে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা ঐতিহাসিক বলেই চিহ্নিত হওয়া উচিৎ।  গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল ধারাকে স্বীকৃতি দিয়েই স্বাধীন ভারত গড়ে উঠেছিলো তার নিজ সভ্যতায়, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের প্রতিক্রিয়াশীল ধারাকে উপেক্ষা করে, ভোটাররাই নাগরিক সেটাই ছিল মূল দীক্ষা। সংবিধান সভায় নাগরিকত্ব চিহ্নিতকরণের ব্যাপারে ‘jus soli’ প্রক্রিয়াকেই গ্রহণযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত নেন, যা নির্দেশ করে, “রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের মধ্যে জন্মের অধিকারে নাগরিকত্ব’ এবং সেই সময়ে সংবিধান সভা’র সদস্যরা এটিকেই নাগরিকত্বের সবচেয়ে আধুনিক প্রক্রিয়া হিসাবে গ্রহণ করেন। একইসাথে, নাগরিকত্বের প্রাচীন ধারণা, ‘jus sanguin’, যা নির্দেশ করে, “জাতি, গোত্র, ধর্ম বা সম্প্রদায় ভিত্তিতে নাগরিকত্ব”-তাকে অচল বলে বর্জন করা হয়। এই নাগরিকত্বের গৃহীত ধারণা প্রসঙ্গে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল বলেছিলেন, ‘আলোকিত, আধুনিক, সভ্য’; যাকে আজকের শাসক ভুলিয়ে দিয়ে আবার সেই প্রাচীন বংশতালিকা ও সম্প্রদায়গত অমূলক, অবৈজ্ঞানিক ধারণাটিকেই ফিরিয়ে আনতে চাইছে, শুধুমাত্র নিজেদের নির্বাচনী মুনাফার আশায়।

আজ যেভাবে ‘নাগরিক সংশোধনী বিল’ (ক্যাব) এনে শুধু নাগরিকত্বের গৃহীত সিদ্ধান্তকেই পালটে দিতে চাইছে নাগপুর-দিল্লির গেরুয়ারা এমনটা নয়, তারা এমনকি সংবিধানে বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতার মূল ধারাণাটিকেও বদলে দিতে চাইছে। এই পালটে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই শিবিরের  সামনে কোন যুক্তি নেই, যা আছে তা হলো, বাঙালির মধ্যে ধর্মীয় ফাটল ধরিয়ে পুরো বাঙালির সমূলে নিপাত। এখন নাগরিকদেরই শাসকের এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোটা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, কারণ সেটা তার অধিকার রক্ষার একমাত্র পথ। প্রখ্যাত আমেরিকান সমর-সাংবাদিক ডেভিড হ্যাকওয়ার্থ-র করা একটি উদ্ধৃতি এক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, “If a policy is wrongheaded feckless and corrupt I take it personally and consider it a moral obligation to sound off and not shut up until it's fixed.” গলা তুলে চিৎকার করাই শুধু নয়, যতক্ষণ না এই এনআরসি, ক্যাব ইত্যাদি নিয়ে সরকারের ধ্যাষ্টামো খতম হচ্ছে, ততক্ষণ প্রতিবাদ, প্রতিরোধ জারী রাখাটাই একমাত্র কর্তব্য।

আমরা এক নতুন শব্দবন্ধে তৈরী হচ্ছি, ‘বিদেশী', জবরদস্তী বিদেশী হিসাবে চিহ্নিতকরণের যে প্রক্রিয়া এখানে চলেছে, তার থেকেই এমন অসহায় শব্দবন্ধ সৃষ্টি হয়, যা এখানে আমাদের অসহায়ত্বকেই প্রমাণ করে। ভাললাগলো পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী নেতাদের হুংকার শুনে। বাহ্,  কথাগুলো বললেই যেন তেলে জল ছেটা দিলে যা হয় তেমন লাগে "বাংলায় ডিটেনশন ক‍্যাম্প হলে গুড়িয়ে দেব, বাংলায় এন আর সি করতে হলে আমাদের লাশের ওপর দিয়ে করতে হবে"। কিন্তু কথা হলো কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার অসম শাখায় এতো চুপচাপ কেন? ঠিক বুঝে ওঠতে পারলাম না। সবার মত তো এক হওয়ার কথা ছিল, তবে দ্বিমত কেন কমরেডগন। অসম কি ভারতের বাইরে? না কি,ভারতীয় কমিউনিস্ট চিন্তা ও অসমের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে? ঠিক বুঝতে পারছি না।

            (২)

ডিটেনশন ক্যাম্প! সভ্য মানুষের মাথা বিগড়ে দেওয়া দুটি শব্দ! যেখানে নরক যন্ত্রণা পেয়ে মৃত্যুকে আপন করে নেয় সাধারণ নিরপরাধী মানুষেরা!  নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মতো ভারতের সর্বত্র গড়ে উঠছে ডিটেনশন ক্যাম্প। ভাবছেন কারা থাকবে? ঐ তো দুলাল চন্দ্র পাল, প্রভা রায়, হুশেন আলী, সুন্দর  মোহন রায়, নগেন দাস,বাসুদেব বিশ্বাস,জব্বার আলি,সুরজ আলি,সন্তোষ বিশ্বাস, নজরুল ইসলাম,ইসমাইল তালুকদার,প্রভা রায়, সু্ব্রত দে,পুনা মুণ্ডার মতো যে শ্রমজীবী মানুষরা যারা ডিটেনশন ক্যাম্পে প্রাণ হারালেন, তাদের মতো শ্রমজীবী মানুষরা। তারা কী করবেন? তারা আমেরিকার জেল ব্যবসার কয়েদী কালো আদমির মতো বহুজাতিক নাইক কোম্পানীর জোতা বানানোর কাজে বেগার খাটবেন ও বেঘোরে তিলে তিলে প্রাণ হারাবেন।

অসমিয়া গণতান্ত্রিক সমাজ ডিটেনশন ক্যাম্পের বিরোধী, তাঁরা অসমকে মানবতার বধ্যভূমি বানাতে চান না। ১৯ লাখ এনআরসি-ছুটদের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের মতো একটা বিপদজনক জায়গায় পাঠানোর তাঁরা বিরোধী কিনা এখনও জানা যায়নি। এফটি একটি ন্যায়িক ব্যবস্থা নয়, সেখানে এই গরিব মেহনতি মানুষের কী পরিণতি হবে তা অনিশ্চিত। কিন্তু দুলাল পরিবারের লড়াইয়ের মোক্ষম সময় তারা ডিটেনশন ক্যাম্পের বিরুদ্ধে সময়ের দাবির চাইতে কম সোচ্চার হওয়াটা সত্যিই পীড়াদায়ক।

তেজপুর ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি অবস্থায়  বছর ৬৫'র দুলাল পালের বিনা চিকিৎসায় অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তাতে আমাদের কি? উনি কি আমার পরিবারের কেউ? তবে আমি কেন দুঃখিত হব। ঠিক আছে, মর্মাহত হয়েছি। আজ অফিস থেকে ফেরার পথে বন্ধু বলল "আমার পরিবারের নাম এন আর সি তালিকায় এসেছে পুরো শুদ্ধ বানানে। আমি উইপোকা নই, ঘুসপেটিয়া নই । কাজেই আমার চিন্তার কারণ নেই, নো টেনশন । আমার আবার কিসের চিন্তা। ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি যারা রয়েছে এ নিয়ে তাদের পরিবার ভাবুক না।" তো এতেই আমরা আনন্দিত!  শোণিতপুরের ঢেকিয়াজুলির আলিশিঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা ৬২ বছরের বৃদ্ধ দুলাল চন্দ্র পালকে তেজপুরের ডিটেনশন  ক্যাম্পে বন্ধি করা হয়। দুইটা বছর এই হিটলারী কনসেনট্রেশ ক্যাম্পে তাকে ঠেলে দেয়া হয়েছে মৃত্যু পথে।
       
            (৩)

দুলাল পালকে বিদেশী ঘোষণা করে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের যে অর্ডার বেরিয়েছিল সেটা এবং পরে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের অর্ডারকে বহাল রেখে  গৌহাটি হাইকোর্টের ১৮/০১/২০১৯ তারিখের যে রায়, সেখানে লিখা ---
১৯৬৫ সনের জমির নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও মুল যে কারণে দুলাল পালকে বিদেশী ঘোষণা করা হয় তা হলো উনি যে ১৯৬৫ থেকে ১৯৯৩ অবধি ভারতে স্বাভাবিক ভাবে থাকার কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেন নি। "Considering entire materials on record and also discussion made above it is appeared that OP unable to produced any documents in this case to prove that either father of OP or OP ordinarily resided in Assam since 1965 till to 1993"। আশ্চর্যজনকভাবে ১৯৬৫  সনের জমির কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের অর্ডারে বলা হয় যে উনি ২৫/৩/১৯৭১ এর পরে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে এসে আসামে বসবাস করছেন এবং এই কারনেই উনি বিদেশি।  "Further it appears that OP ....... entered into Assam//India without authority subsequent to 25/3/1971and hence he is termed to be a foreigner/ illegal migrant of post 25/3/1971 stream. The case is decided accordingly." উল্লেখযোগ্য যে গ্রাম পঞ্চায়েত এবং গাওবুড়ার কিছু নথিপত্র অগ্রাহ্য করা হয় এই কারন দেখিয়ে যে যারা এইসব সার্টিফিকেট ইসু করেছিলেন উনারা কোর্টে এসে সাক্ষী দিয়ে এই  নথিপত্রের সত্যতা প্রমাণ করেন নি। হাইকোর্টের রায়ে একই কারণ দেখানো হয়েছে।

একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এনারসি এবং ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়াতে বেশ কিছু পার্থক্য আছে। আসামের ক্ষেত্রে এনারসি তে নাম সন্নিবিষ্ট করতে শুধু দুটো কাগজ দেখাতে হয় -১) ২৫/৩/১৯৭১ সনের আগে আসামে থাকার প্রমাণ (নিজের অথবা নিজের পূর্বপুরুষের) এবং ২) ১৯৭১ এর আগে নিজের কোনো নথিপত্র না থাকলে পূর্বপুরুষের নথিপত্র দেখাতে হবে এবং একই সাথে পূর্বপুরুষের সাথে সংযোগকারী নথিপত্র দেখাতে হবে। এর বিপরীতে, নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের  প্রক্রিয়া আরও বিশদ। এটাও প্রমাণ করতে হবে যে একজন সাধারণ ভাবে আসামে অথবা ভারতবর্ষে বসবাস করছেন কি না। আসামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাগরিকত্ব আইনের ধারা 6A (2) অনুযায়ী - " Subject to the provisions of sub-sections (6) and (7), all persons of Indian origin who came before the 1st day of January, 1966 to Assam from the specified territory (including such of those whose names were included in the electoral rolls used for the purposes of the General Election to the House of the People held in 1967) and who have been ordinarily resident in Assam since the dates of their entry into Assam shall be deemed to be citizens of India as from the 1st day of January, 1966." এখন প্রশ্ন হলো একজন সাধারণ গরীব শ্রেণীর মানুষের পক্ষে নথিপত্র দেখিয়ে কিভাবে প্রমান করা সম্ভব যে he or she has been ordinarily resident in Assam since the date of entry? যারা স্কুল বা কলেজে পড়াশোনা করেছেন অথবা যারা চাকরি করেন তাদের জন্য এই প্রমাণ যোগাড় করা হয়তো সম্ভব।  কিন্তু অশিক্ষিত, ভূমিহীন, গরীব শ্রেণীর মানুষদের পক্ষে সম্ভব কি? নথিপত্র দেখিয়ে ভারতবর্ষের কতজন গরীব শ্রেণীর মানুষ প্রমাণ করতে সক্ষম হবেন যে they have ordinarily resided in India since birth? এই অবস্থায় গ্রাম পঞ্চায়েত সার্টিফিকেটও যদি গ্রহনযোগ্যতা না পায় তার মানেই কি ওরা বিদেশি? বাস্তবকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে এইভাবে মুলত প্রান্তিক মানুষদের বিদেশি ঘোষণা করা কতটুকু  মানবিক?




----- শুধু কাগজ দেখিয়ে এনআরসি, ডি, ডিটেনশন ক‍্যাম্পের আক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়া যাবেনা, প্রয়োজন এক সঙ্ঘবদ্ধ গণ আন্দোলন, যা শাসকের রাতের ঘুম উড়িয়ে দেবে। অনেক সহ্য করা হয়েছে, আর নয়; এবার চোখের জলকে বারুদে পরিণত করার সময়, সব হিসাব এবার আমাদেরও বুঝে নিতে হবে।
তথ‍্যঋণ : লিখেছেন অরূপ বৈশ‍্য ( https://www.tarangabarta.com/assam-and-d/)
                শেষাংশ ও ছবি Debasish দা'র ওয়াল থেকে।

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...