Tuesday, October 15, 2019

প্রশ্ন একটাই: প্রতিরোধ না পদলেহন

“What can you say to a man who tells you he prefers obeying God rather than men, and that as a result, he's certain he'll go to heaven if he cuts your throat?” ― Voltaire

সেই ১৭৬৪ সালে ভলতেয়ার তার প্রকাশিত গ্রন্থ, Dictionnaire philosophique -এ এই কথাগুলো উল্লেখ করেছিলেন। তারপরে ২৫৫ বছর কেটে গেছে; অবস্থার হেরফের হলো কৈ! এই আড়াই শতাব্দীতে প্রাপ্তি; বিজ্ঞানের কিছু আবিষ্কার, সিনেমা, পুঁজির বিবর্তন, চাঁদে পা দিয়ে মঙ্গল যাত্রার তোড়জোড় ইত্যাদি ইত্যাদি, কিন্তু আমাদের চারপাশের সমাজ এখনো সেই মধ্যযুগীয় ধর্মীয় ধ্যানধারণার মধ্যেই আটকে। চারিদিকে দূর্গাপূজো, ঈদ, বড়দিন নিয়ে ধুন্ধুমার দেখে কেমন ধন্দ লাগে; আসলেই সময় এগোচ্ছে কি?!

ধর্ম, ধর্মীয় আচার ইত্যাদি চিরকালই রাজনীতির সাথে সংপৃক্ত থেকে শাসকের ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে, আজও তার কোন ব্যতিক্রম নেই। এই ২০১৯-এ এসেও দেখি; এতো কিছুর না থাকা, অনিয়ম, দুর্নীতি, অনাহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, মাত্রাছাড়া রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ইত্যাদিই শুধু নয়, এমনকি বাঙালি জাতিসত্তার ওপরে এনআরসি-র আক্রমণও ‘থীম’র আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।
“আহা কি আনন্দ; আকাশে বাতাসে” - ক'দিনের ব্যস্ততা ছেড়ে এবার সব ‘ধর্মের রক্ষক’রা তাদের পাশা সাজিয়ে ফেলবে। এখন বাংলার বুকে আরও বিষ ঢালার জন্য তৈরী বাঙালির চরম শত্রু আরএসএস ও তার রাজনৈতিক মুখোশ। কিন্তু এই গুটিকয়েক অমানুষই শুধু বিপদ নয়, আরও বড় বিপদ হচ্ছে, ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সব জেনেবুঝেও মুখ বুজে থাকা।

সুতরাং ঐ অন্যের গলা কেটে স্বর্গ-বেহেস্তে যাওয়ার অমানবিক, বর্বরতাটা এইসব মনুষ্যতের সামাজিক কীটগুলো চালিয়েই যাবে। কিন্তু বিপদের এখানেই শেষ নয়; সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে দেখতে পাওয়া যায়, বহু ‘বাম’ নেতা, কর্মী, সমর্থকরা আসন্ন বিপদের দিকে না তাকিয়ে, অকাতরে বিজয়া-মহরম ইত্যাদির শুভেচ্ছা বিলি করে চলেছেন। এই বামপন্থাকে বুঝতে অসুবিধা হয়; ঐ ‘সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা’ বা “সব ধর্মকে সমান চোখে দেখা”র মতো যুক্তিগুলো সব খুব জোলো, কেমন যেন বালিতে মুখ গুঁজে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা বলে প্রতীত হয়। ধার্মিকরা তাঁদের ধর্মাচরণ করুন, আপত্তি নেই; কিন্তু তাই বলে বামপন্থীদের এই ধর্ম নিয়ে উৎসাহী প্রদর্শন?!
মতাদর্শগত অবস্থান থেকে আমরা মনে করি; সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অবসান ঘটিয়ে, শুধু মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হোক। একদিকে এই পাইকারি হারে ‘শুভেচ্ছা’র ঢল, আর অন্যদিকে আরএসএস, তাদের কর্মীদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, যা প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করতেই কাজে লাগাবে। ওরা সেই ১৯২৫ থেকেই তাদের ঘোষিত (বদ)নীতি অনুযায়ী এই কাজটা করে আসছে এবং ইতিমধ্যেই সারা ভারতব্যাপী এক খুনে বাহিনী গড়ে তুলেছে, যা আগামীদিনের অশনি সংকেত। সত্যিই যদি এই দুরাচারীদের মোকাবিলা করতেই হয় তাহলে ‘ওরা’ অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বলে নাকিকান্না কেঁদে কোন লাভ নেই, এই আপদগুলোর মোকাবিলার জন্য নিজেদের তৈরী হতে বাধা কোথায়? কে মাথার দিব্যি দিয়েছে, নিজেদের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা না করার?

প্রত্যেকটা আক্রমণ, আঘাত, দাঙ্গার চক্রান্ত - সবকিছু সুদ-সমেত ফিরিয়ে দিতে না পারলে, এদের রোখা যাবেনা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়; যেখানে যেখানে মানুষের শ্রেণী তথা গণ সংগ্রাম তীব্রতর হয়েছে, সেখানেই এক ধাক্কায় সমাজের নানান কুসংস্কার, ধর্মীয় রীতিনীতি, ভণ্ডামো, অত্যাচারকে অনেকাংশেই দূর করা গেছে। ধর্মের অলীক পর্দা সরিয়ে, আজ মানুষকে মানুষ হিসাবে না দেখলে, প্রতিবেশীর ফুটফুটে শিশুসন্তানকেও শত্রু মনে হতে বাধ্য। রাস্তা দুটো; প্রতিরোধ অথবা পদলেহন; এবার একটাই প্রশ্ন, কোনদিক, সাথী কোনদিক বল, কোনদিক বেছে নিবি তুই......

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...