লেখক --- রবীন্দ্র গুহ
প্রচ্ছদ --- প্রশান্ত সরকার
প্রকাশক --- সুমিত পাল ধর
প্রকাশনা --- স্রোত
__________________________
" কিছু কিছু বন্ধু, আর আরও কিছু বন্ধুও আসে
আমাকে তেমন নয়,আসলে আড্ডাকে ভালোবাসে।"
(অল্প পরিসরে অনেক কিছুই বলতে পারতেন কবি শক্তিপদ)
যাইহোক অবশেষে দক্ষযজ্ঞ শেষ হলো। এতদিন মুসলিম মহিলাদের সুরক্ষার ব্যাপারে যে লুকোচুরি চলছিল তার ইতিটানা হলো। মুখে আর বুকে আত্মহংকারের খুশি সবদিকে গদগদ করে বাড়ছে। যেন মোদীই সব পারে অর্থাৎ মোদী ম্যাজিক। বাকিরা সব টাইটাই ফিস। এই বিল নিয়ে যত জল্পনা কল্পনা। তো কী দেশোদ্ধার হলো এই বিল নিয়ে? যে বিলটা পাশ করানো হলো তা "তাৎক্ষণিক তালাক বিল"। কিন্তু প্রচার করা হচ্ছে তিন তালাক বিল। যেন "আজব দেশকি গজব কাহানি"।
তালাক, তালাক,তালাক অর্থাৎ এককথায় ইন্সটেন্ট তালাক। তিনবার বললেই এখন আইনত অপরাধ। এরজন্য সত্যিই মোদীজির অক্লান্ত পরিশ্রম, সফল হয়েছে। যদিও শাহবানু বা এর কয়েক দশক পর সায়রাবানুরা সুপ্রিম কোর্টের কড়া না নাড়লে হয়তো এই সুযোগটুকু আসতো না। আজ দেশের পক্ষে এক ঐতিহাসিক দিন। দীর্ঘ পাঁচঘন্টার আলোচনা ও ভোটাভুটি পর্ব শেষে ৩০ জুলাই,২০১৯ ইং রাজ্যসভায় পাশ হয়ে গিয়েছে "Muslim Women (Protection of Right on Marriage) Bill,2019" তথা তিন তালাক বিল। বিরোধীদের প্রবল আপত্তির মাঝেই ৯৯-৮৪ ভোটে পাশ হয়ে গিয়েছে এই বিল। যার জেরে তাৎক্ষণিক তালাক ভারতীয় আইনে একটি ফৌজদারী অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। যদিও ২৫ জুলাই লোকসভায় ৩০৩-৮২ ভোটে পাশ হয়েছিল বিলটি।
এই বিলের সুবিধাগুলো এবার জেনে নেই--
_____________________________________
এই বিলের ক্লস '৩' অনুযায়ী, লিখিত বা বৈদ্যতিন মাধ্যমে তাৎক্ষণিক তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ (তালাক-ই-বিদাত) অবৈধ। তাৎক্ষণিক তিন তালাক একটি ফৌজদারী অপরাধ যার ফলে তিন বছরের জেল ও জরিমানা হতে পারে। মুসলিম স্বামী কর্তৃক তাঁর স্ত্রীর উপর মৌখিক, লিখিত, ও বৈদ্যুতিন তাৎক্ষণিক তালাক জ থেকে অবৈধ।
যে মুসলিম মহিলাকে তাঁর স্বামী এই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় তালাক দিয়েছেন তিনি তাঁর বিচ্ছিন্না স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য ম্যাজিষ্ট্রেটের নির্ধারিত খোরপোষ দিতে বাধ্য থাকবেন। এছাড়া নাবালক সন্তানদের হেফাজতে রাখার অধিকারও পাবেন স্ত্রী। Code of Criminal Procedure,1973 এর আইনের পাশাপাশি ধার্য হবে এই আইনও। একমাত্র ম্যাজিষ্ট্রেটের সম্মতিতে ধার্য হবে বিবাহ বিচ্ছেদ। তাৎক্ষণিক তিন তালাকের অভিযোগ নিতে বাধ্য কর্তব্যরত পুলিশও। যতক্ষণনা ম্যাজিষ্ট্রেট ও অভিযোগকারীণির বয়ান শোনা হচ্ছে, তাৎক্ষণিক তিন তালাকে অভিযুক্ত জামিন পাবেনা। বয়ান শোনার পর সন্তোষজনক ভিত্তিতে জামিন পেতে পারেন অভিযুক্ত।
ইসলামের দৃষ্টিতে তালাক ও তালাক-ই-বিদাত---
-------------------------------------------------------------
বিবাহ যতদিন পর্যন্ত থাকবে ততদিন বিবাহ বিচ্ছেদও থাকবে। কারণ যোগ থাকলে তো বিয়োগের ও স্থান আছে। এটাই তো ধরণ। কারোর কী কোন ক্ষমতা আছে স্বামী স্ত্রীকে জোরকরে সংসার করানোর। মোদীজি কেন ট্রাম্প বাবাজি আসলেও কাজ হবেনা। দাম্পত্য কলহ চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছনো মানে বিবাহ বিচ্ছেদ।
জীবনের চুড়ান্ত বিপর্যয় থেকে স্বামী স্ত্রী উভয়কে রক্ষার জন্য ইসলামে তালাকের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যখন চরমভাবে বিরোধ দেখা দেয়,পরস্পর মিলেমিশে স্বামী স্ত্রী হিসেবে শান্তিপূর্ণ ও মাধুর্য মণ্ডিত জীবন যাপন যখন একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, পারস্পরিক সম্পর্ক যখন হয়ে পড়ে তিক্ত, বিষাক্ত, একজনের মন যখন অপরজন থেকে এমন ভাবে বিমুখ হয়ে যায় যে,তাদের শুভ মিলনের আর কোন সম্ভাবনাই থাকছে না, ঠিক তখনই এই চুড়ান্ত পন্থা(তালাক) অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ইসলামে।তালাক হচ্ছে নিরুপায়ের উপায়। স্বামী স্ত্রী পরস্পরকে বেঁধে রাখার শেষ চেষ্টাও যখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় তখনই তালাক একমাত্র সঠিক রাস্তা।
তালাকের প্রকার--
১) আহসান বা সর্বোত্তম তালাক, ২) হাসান বা উত্তম তালাক, ৩) বিদাত বা শরিয়া বিরুদ্ধ তালাক।
চলুন তাহলে তিন তালাক বিলের 'ক্লস-৩' অনুযায়ী তালাক-ই-বিদাত সম্পর্কে দু-চারটা কথা বলা যাক। তালাক-ই-বিদাত হলো একসাথে তিন তালাক দেওয়া বা যাকে আমরা ইন্সটেন্ট তালাক বলি। লিখিত, বৈদ্যুতিন, বা দুই-তিনজন সাক্ষী দাতার সামনে স্বাক্ষর করলেই তালাক হয়ে যায়। এমন ধরণের প্রকাশ্য তালাককে বিদায়ীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং যারা এধরণের তালাক অনুষ্টিত করে থাকেন তারা সবাই গুনাহগার হবেন। এভাবেই তৈরী ইসলামী শরীয়াহ আইন।
আজকের ভারতে এই বিল সংশোধন খুবই জরুরী এবং অত্যাবশ্যক। কারণ এরজন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল শায়রা বানুকে। তিনি প্রথম নারী যিনি তাঁর মৌলিক অধিকারের দাবিতে ব্যক্তিগত আইনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ছিলেন। তাঁর ১৫ বছরের বিবাহিত জীবনে তাকে বারবার গর্ভপাত ঘটাতে বাধ্য করা হয়েছে। সাধারণ সাক্ষীতে তাকে তালাক দেওয়া হয়। এই সেই শায়রা বানু যে অত্যন্ত সাহসীকতার সাথে এই ইন্সটেন্ট তালাকের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেন।
যদিও মোদী সরকার এই বিলে ইন্সটেন্ট তালাক প্রথা বন্ধ করেছে। এরজন্য গত উনিশ মাসে মোট তিনবার তারা লোকসভা থেকে এই বিলের ছাড়পত্র আদায় করে নেয়। কিন্তু রাজ্যসভায় বিজেপি বা তার সহযোগী সংখ্যাগরিষ্টতা না থাকায় বারবার আটকে যায় বিলটি। তবে এবার তারা এই বিল অর্থাৎ 'মুসলিম মহিলা (বিবাহ অধিকার সংরক্ষণ) বিল ২০১৯, পাস করিয়ে নিলো।
বেশতো এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে মোদী সরকার। কিন্তু এখানেই আম জনতার কাছে ভুল ম্যাসেজ পাঠানো হচ্ছে মিডিয়া থেকে শুরু করে সরকার পক্ষ থেকেও। যে তিন তালাক বিল এবার অবৈধ। দৈনিক পত্রিকাগুলোর হেডলাইনে বড় বড় হরফে লিখা হচ্ছে। যেহেতু ইসলামী শরীয়াহ আইনে বিবাহ একটি চুক্তি, তো ভারতীয় আইনেও ইসলামী শরীয়াহ আইন অনুযায়ী যে তালাকের কথা উল্লেখ আছে সেটা অবৈধ হয় নাই। বলে রাখা ভালো, শুধু মৌখিক, লিখিত, এস এম এস, হোয়াটসআপ, অন্যকোনো বৈদ্যতিন মাধ্যম বা ইন্সটেন্ট তিনবার তালাক বলা এইসব এখন থেকে অবৈধ।
তিন তালাক বৈধ। এই বিলে মুসলমানদের তালাকের বৈধতায় কোন ধাক্কা খায়নি। আর তাৎক্ষণিক তালাক, ওটাতো এমনিতেই ইসলামে বিদাত বা অবৈধ। তো সরকার এটাকে কী অবৈধ আর নিষেধ করবে। কিন্তু মজার ব্যপার হলো এই তালাক নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষ তাস খেলে ফেললো। আর তার সাথে সরকার এই ক'জন মহিলাদের প্রতি মুহ্যমান হয়ে পড়লো। আইনত বিবাহ বিচ্ছেদ হয়নি অথচ স্বামী স্বীকার করছে না এমন মহিলার সংখ্যা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও কম নয়। আর যদি বিবাহ বিচ্ছেদের কথা বলি তবে মুসলিম সমাজ থেকে হিন্দু সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদ অনেক গুণ বেশি, ২০১১ সালের জনগণনা রিপোর্টমতে।
প্রশ্ন হলো,তাৎক্ষণিক তালাক বিল যে পাশ হলো তাতে মুসলমানদের কি আর এলো গেলো। এই তালাক তো ইসলামে আগে থেকেই নিষিদ্ধ। শুধু শুধু ঠোঁটে ওঠা ছাড়া আর কিছু নয়। এইতো যদি মুসলিম সমাজ ও মুসলিম নারীদের উন্নয়নের কথা সরকার পক্ষ থেকে শুনা যায় তবে একটা কাজ তো নিঃশ্চয়ই করা যায়- স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সমানাধিকার, কর্মসংস্থান, এইসব সেক্টরে রাজেন্দ্র সাচার কমিটি ০৫, যে সুপারিশগুলো দিয়েছিল সংখ্যালঘু উন্নয়নের জন্য এই কাজগুলো করা যাক। কী বলেন!
ভারতীয় সংবিধান যে বাক-স্বাধীনতা আমাদের দিয়েছে স্বাধীনতার ৭৩ বছর পরও আমাদের দেশে সেই বাক-স্বাধীনতা শাসকের ইচ্ছাধীনই রয়ে গেছে। স্বাধীনতার এতো বছর পরও, এ দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে দেশপ্রেমের পরীক্ষা দিতে হয়। শিক্ষা থেকে শুরু করে সামাজিক ক্ষেত্রে; সরকারী জনকল্যাণকর নীতি নয়, দলীয় আদর্শকে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। শিক্ষা এখন জ্ঞানের বিষয় আর নেই, তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন দলের দলীয় আদর্শের শিক্ষা। পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা জীবনকে তুচ্ছ করে আত্মবলিদান করেছিলেন শুধুমাত্র প্রতিটি নাগরিকের প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলি যাতে পূরণ হয় সেই লক্ষ্যে, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্য ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা যাতে পূরণ হয় সেই লক্ষ্যে। তাঁরা চেয়েছিলেন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সেসব চাহিদা আর আত্মবলিদান যে সার্বিকভাবে সাফল্যলাভ করেনি তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
হিটলার-র সুযোগ্য উত্তরসূরী কট্টর ফ্যাসিবাদী দ্বারা পরিচালিত রা ‘আচ্ছে দিন’-র স্বপ্ন দেখিয়েছিল। আজ এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতির মুখোশগুলো একে একে খুলতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের উপর নানা বিপর্যয় চাপিয়ে দেওয়ার পর উন্নয়নের কথা ফলাও করে প্রচার করছে। দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা, সম্প্রীতিকে বিপন্ন করে সংখ্যালঘু ও দলিত সমাজকে আতঙ্কের গহ্বরে তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সংখ্যালঘুদের মধ্যে উপযুক্ত মেধা থাকা সত্বেও, তারা তা বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্রমশঃ অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে। অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অপশিক্ষিত শাসককূল ক্ষমতার শীর্ষে বসার সুযোগের চূড়ান্ত অপব্যবহার করে সাধারণ নাগরিকদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। এই অজাচারী শাসকদের কিছু অপোগন্ড মাথামোটা ভক্ত তাতে ইন্ধন যুগিয়ে নিজেদেরই যে সর্বনাশকে ডেকে আনছে, তা এই মূর্খের দল বুঝতেও পারছে না। মৌলবাদী শক্তির সবচেয়ে বড় শত্রু শিক্ষিত, মেধাবী, বুদ্ধিমান, যুক্তিবাদী, প্রতিবাদী মানুষের ব্রেন বা মগজ; যারা এই গণশত্রু সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ জানায়, রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে প্রশ্নবাণ ছুঁড়ে মারে, তাদেরই নির্মমভাবে হত্যা করে চলে এরা।
এবার একটু অন্যদিকে গিয়ে বলি সবকিছু তো ঠিকঠাক চলছে! না মানে, যারা বলছিলেন, এবার কাশ্মীরে উন্নয়ন হবে, চিদম্বরমকে বাশ দেওয়া হয়েছে, বা তালাক বিল সংশোধনে সংখ্যালঘু উন্নয়ন হবে, উইপোকা-ঘুসপেটিয়াদের ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে খুঁজে বের করা হবে । তাঁদের অবগতির জন্য একটা খবর হলো আজ টাকার দাম ডলারের প্ররিপ্রেক্ষিতে ৭২ টাকা। খবরটা শোনে চোখ কপালে উঠে গেলো না তো, ধৈর্য ধরুণ। আভি তো পার্টি শুরু হুই হে। কি ভয়ানক অবস্থায় আমাদের অর্থনীতি। গুগলে কারেন্সি রেট চেক করার সময় বর্তমান অবস্থা দেখে একটা ঘটনা মনে পড়ে যায়। সেটা হলো, বাবার মুখে শোনা ইডওর্য়াড বোলওয়ারের 'The Last Days of Pompeii'র ঘটনা।
কি সুন্দর ইতালির পোম্পেই শহর, রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। তার পাশেই ছিল ভিসুবিয়াস আগ্নেয়গিরি। The Last Days of Pompeii বইটিতে পোম্পেইবাসীর যে বিলাসবহুল জীবন যাত্রা, খুশি, স্ফূর্তি,আনন্দের ছবি দেখা যায়। বইটি পড়ে বোঝা যায় যে এই পোম্পেইবাসী জীবনকে এতোই উপভোগ করছিল যে কখনই এই আগ্নেয়গিরির বিভিষিকা নিয়ে মাথা ঘামায় নি। আর যার ফলস্বরূপ এই অবহেলা তাদের কিছু সময়ের মধ্যে পুরো শহরটাকে লাভার সমুদ্রে পরিণত করে দেয়। অসাবধানতা তাদের ঠেলে দেয়ে জীবাশ্মের আকারে।
বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সম্প্রতি সরব হলেই বিপদ, সে ৩৭০ ধারা বিলোপ কিংবা দেশের বেহাল অর্থনীতি, প্রসঙ্গ যাই হোক না কেন। এমনিতেই UAPA বিল পাশ হয়েছে লোকসভায়। TADA, POTA-র পর এসেছিলো UNLAWFUL ACTIVITIES PREVENTION ACT বা সংক্ষেপে UAPA - যা মানবতা-বিরোধী আইন বলেই পরিচিত। তাকেই সংশোধন করে আরও ভয়ংকরভাবে তার ক্ষমতা বাড়িয়ে হাজির করা হলো। আর একদিকে বেহাল অর্থনৈতিক অবস্থা। তাৎক্ষণিক তিন তালাক নিষিদ্ধকরণ, ৩৭০ ধারা বিলোপ, পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা, পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের বিধিভঙ্গের হুমকি, গরু-রক্ষা, মুসলমান-ত্রাস, এনআরসি, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল... এই সব ঢেউ একদিন থেমে যাবে, রাজনীতি হবে নিস্তরঙ্গ। তখন উঠে আসবে জগতের আদি ও অনন্ত চাহিদা – খিদে। আর তখন কি অবস্থা হবে....
আজ কেন্দ্র অর্থাৎ, মোদী-শাহ-নির্মলা সীতারামন তিনজনেই জানেন, সরকারের হাতে টাকা নেই। স্টেট ব্যাংক বলেছে, এটিএম কার্ড বন্ধ করে দেবে। নতুন অ্যাপ নিয়ে আসবে। কেন? আসল কারণ, লোকজনের ব্যাংক থেকে টাকা তোলা বন্ধ করতে। অবস্থা কতটা খারাপ একটা উদাহরণ দিই। আপনার প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা সরকারের কাছে থাকে। প্রতি বছর ১ এপ্রিল সুদের টাকা জমা হয়। এ বছর হয়নি। গত বছরের মতো সার্ভার খারাপ। ডিজিটাল ইন্ডিয়ায় ছয় মাসে সার্ভার ঠিক হলো না? পিএফের টাকা সরকার ধার নেয়। বিভিন্ন খাতে খাটায়। তারপর সুদ সমেত ফেরত দেয়। এটাই নিয়ম। এই বছর আজও গত বছরের টাকা ফেরত দেয়নি। দিলে খাতা কলমে এক লাখ কোটি টাকা শুধু সুদ দিতে হবে। সরকারের কাছে সেই টাকা নেই। জিএসটি থেকে আয় হলে দেবে।
পাঁচগ্রাম পেপার মিলের কথা বাদই দিলাম।আমরা সবাই জানি বিএসএনএল এর অবস্থা খারাপ। জানেন কি, শুধু কলকাতায় যাঁরা লাইন-ম্যান হিসেবে কাজ করেন, সেই ৪৮০০ কর্মচারী গত জানুয়ারির পর কোনো বেতন বা টাকা পায়নি। সাত মাস ধরে কী করে তাঁদের পরিবার চলছে তাঁরাই জানেন। অনাহারে অসুস্থ হয়ে ইতিমধ্যে ৭জন মারা গেছেন। ভাবছেন জিও তো ব্রড ব্যান্ড নিয়ে আসছে। চিন্তা কী! আমার এক বন্ধু বলছে বিএসএনএল টায়টায় ফিস এবার জিও জি ভরকে। এই মুহূর্তে বিএসএনএল এর জন্য সরকারকে দিতে হবে মাত্র ১৪ হাজার কোটি টাকা। তাহলেই ১ লাখ ৭৫ হাজার কর্মী সেইসঙ্গে ঠিকাদার ও শ্রমিক মিলে ৫ লাখ পরিবার বাঁচবে। মাত্র ১৪ হাজার কোটি কেন বললাম? রিলায়েন্স এর ব্যাংকের কাছে ধার প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা! সিংহভাগ জি ওর জন্য। এয়ারটেল এর ধার এক লাখ কোটির ওপর। লোকের হাতে টাকা নেই। ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে না। এই মুহূর্তে দেশের ৩০ টি বড় শহরে ১২ লাখ ৮০ হাজার তৈরি ফ্ল্যাট পড়ে আছে। কেনার লোক নেই। রিয়েল এস্টেট গবেষণা সংস্থা এলএফ এর মতে, ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতের শীর্ষ ৩০ টি শহরে ১২.৮ লক্ষ বাড়ি বিক্রি হয়নি। এই সংখ্যাটি মার্চ ২০১৮ এর তুলনায় সাত শতাংশ বেশি, যখন সেখানে ১.২ মিলিয়ন অবিক্রিত বাড়ি ছিল। এর অর্থ, বিল্ডাররা যে গতিতে বাড়িগুলি তৈরি করছে সেই গতিতে লোকেরা কিনছে না। রিয়েল এস্টেট খাতের সাথে যুক্ত প্রায় ২৫০ টি ছোট-ছোট শিল্প রয়েছে। ঘর বিক্রয় শিল্পকে বৃহত আকারে লাভবান করে, তবে এখন তা হচ্ছে না।
গাড়ি বিক্রি এতই কমে গেছে নয়ডার মারুতি গাড়ির কারখানা থেকে শুরু করে জামসেদপুরের টাটা মোটরের উৎপাদন ক'দিনের জন্য বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কর্মী ছাঁটাই শুরু হচ্ছে। একই অবস্থা বাজাজ এবং হিরো কোম্পানির। কয়েকশো গাড়ির শোরুম ঝাঁপ ফেলে ব্যাংকে জানিয়ে দিয়েছে, আমরা আর এখন টাকা শোধ করতে পারব না। এপ্রিল থেকে জুন ২০১৯ এবং এপ্রিল থেকে জুন ২০১৮ এর তুলনা করে, গাড়ি বিক্রয় ২৩.৩ শতাংশ কমেছে। এটি ২০০৪ সালের পরে সবচেয়ে বড় হ্রাস। গাড়ির বিক্রয় হ্রাস পেলে টায়ার প্রস্তুতকারক থেকে ইস্পাত এবং স্টিয়ারিং উৎপাদনকারী ইত্যাদিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে । বাহ্যিকভাবে, অনেক অটো ডিলারশিপ বন্ধ বা সঙ্কুচিত হচ্ছে। যানবাহনের লোণের প্রবৃদ্ধিও পাঁচ বছরের নীচে নেমে এসেছে ৫.১ শতাংশে। তার সাথে দ্বি-চাকার বিক্রিও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে দ্বি-চাকার গাড়ি বিক্রি ১১.৭ শতাংশ কমেছে। ২০০৮ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বরের পর এটিই সবচেয়ে বড় হ্রাস। মোপেডও বিক্রি হচ্ছে না। তাদের বিক্রয় ১৯.৯ শতাংশ কমেছে। তার সাথে ট্রাক্টর বিক্রয় গ্রামীণ চাহিদার একটি ভাল সূচক। কিন্তু ট্র্যাক্টর বিক্রয় এপ্রিল থেকে জুন ২০১৯ এর মধ্যে ১৪.১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গত চার বছরে এই হ্রাস সর্বোচ্চ।
কাপড় কলের মালিকরা কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়েছেন, বস্ত্র শিল্পের অবস্থা খুব খারাপ। বাজার নেই। কাপড় কলের মধ্যে তিনভাগের একভাগ এই বছরই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। লোকসান করায় মিল মালিকরা ব্যাংকের টাকা শোধ করতে পারছে না। ওদের হিসেবেই তুলো চাষিদের নিয়ে কয়েক কোটি মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে খেয়ে পরে বাঁচে। তাঁদের ভবিষ্যৎ কী কেউ জানে না। বিদেশে রফতানিও কমেছে দ্রুত। তার থেকেও বড় কথা ক মাস বাদেই নতুন তুলো উঠবে। তার বাজার মূল্য ৮০ হাজার কোটি টাকা। বিক্রির বাজার না থাকলে মিল মালিকরা তা কিনবে কেন? কিংবা আরও সস্তায় কিনবে। ফলে তুলো চাষিদের আত্মহত্যা আরও বাড়বে।
কম্পিউটার এর জন্য অনুসঙ্গ বানানো কোম্পানি mosarbaer এর মালিক আজই দেনার দায়ে গ্রেফতার হয়েছে। ভিডিওকন আগে থেকেই বন্ধ। মালিক বেনুগোপাল জানিয়ে দিয়েছেন, হাজার কোটি টাকা ব্যাংকের দেনা তার পক্ষে শোধ করা সম্ভব নয়। বেশ কিছু সিমেন্ট কারখানাও বন্ধ। ঝাড়খণ্ডের জয় বালাজি স্টিল কোম্পানি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ ইস্পাত এর বাজার নেই। টাটা স্টিল ও ওই পথ নিতে পারে, তা বিচিত্র নয়। গত দুই মাসে শুধু ঝাড়খণ্ড এ বেকার হয়েছে ৩ লাখ শ্রমিক। লোকের হাতে টাকা না থাকায় বা থাকলেও খরচ করতে ভয় পাওয়ার ফলে হোটেলে খাওয়া কমেছে। সাবান থেকে বিস্কুট সব কিছুর বিক্রি কমছে। এফএমসিজি (ফাস্ট মুভিং কনজিউমার গুডস) এর মতে প্রতিদিনের গ্রাহক আইটেমগুলির বিক্রয় হ্রাস পাচ্ছে। আমরা যদি হিন্দুস্তান ইউনিলিভার লিমিটেড পণ্যগুলির বিক্রয়কে লক্ষ্য করি, তবে এপ্রিল থেকে জুন ২০১৯ এর মধ্যে বিক্রয় বৃদ্ধি আগের বছরের ১২ শতাংশের তুলনায় এখন পাঁচ শতাংশ। আমরা যদি ডাবর ভারতের প্রবৃদ্ধির হারকে লক্ষ্য করি তবে তা গত বছরের ২১ শতাংশ থেকে ছয় শতাংশে নেমে এসেছে। এটি উদ্বেগের বিষয় যে লোকেরা প্রতিদিনের কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছে। তেল, সোনা, রৌপ্যগুলির চাহিদাও একটি ভাল সূচক যে লোকে আমদানিকৃত পণ্য কিনছে। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই আমদানি ৫.৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, গত বছরের একই সময়ে এটি ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেয়েছিল।
পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে একটাই পথ সরকারি সম্পত্তি বিক্রি। লাভের মুখ দেখা বেঙ্গল কেমিক্যাল থেকে অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি সব বিক্রি করে দাও। রেলের টিকেট বিক্রি থেকে IRCTC সব বেসরকারি হাতে তুলে দাও। আরে কিনবে কে? পরিষেবা দেবে কে ? তা জানি না। তিনবার দরপত্র হাঁকার পর আজ অব্দি কেউ air India কিনলো না! সেখানে কাশ্মীরি জনগণের মৌলিক অধিকার বন্দুকের বেয়নেট এর জোরে কেড়ে নিতে প্রায় ৬ লাখ সেনা নিয়োগ করতে হয়েছে। তার বিপুল খরচ। কোনো যুদ্ধের থেকে খুব কম নয়। তা কিন্তু জোগাতে হবে। কারণ কাশ্মীর আগ্নেয়গিরির মত ফুটছে। ক্ষমতাসীনদের পরিয়ে দেওয়া কাজলে আমরা এতটাই অন্ধ, তা দেখতে পাচ্ছি না। আর মিডিয়া দেখাচ্ছে, সব স্বাভাবিক।
এর ফলে কি কি হয় বা হতে চলেছে ? পেট্রোল , ডিজেল বেশী দামে কিনতে হবে এবং বেশী দামে বেচতে হবে সরকারকে। যার ফলে জিনিষের দাম বাড়বে। তাতে অবশ্য মধ্যবিত্তের অবশ্য কিছু আসবে যাবে না রেস্টুরেন্টে খাবেন আর আচ্ছে দিনে আরো ভালো আছেন তার সেলফি দেবেন। কিন্তু অনেক মানুষের অনেক কিছুই আসবে যাবে। যারা জোমাট্যো বা স্যুইগি তে কাজ করেন তাঁদের কাজ যাবে সুতরাং বাড়িতে ডেলিভারি পেতে একটু দেরী হবে। তাই একটু ছবি আপলোড দিতে দেরী হবে এই যা । তবে জিও সব লাইন ফ্রি বলে এতে অসুবিধা কম হবে। এটিএম না থাকলেও সমস্যা নেই, টাকা না পারলেও ডাটা আছে তো , তাহলেই হবে। এরপর বাড়ির পরিচারিকাদের ও টাকা না দিয়ে ডাটা দিন। সব ভারচুয়াল ! এর মাঝে বেশ কিছু লোকের চাকরি যাবে তবে সেগুলো আচ্ছে দিনের কোল্যাটারাল ড্যামেজ, ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না।
১৯৮৪ সালে নাইজেরিয়াতে ডিমনিটাইসেশন হয়েছিল তার ফল এখনো সেই দেশ দিচ্ছে। তবে কথা হলো, কাশ্মীরে ৩৭০ তুলে দেওয়ার ফলে মুসলমানদের তো টাইট দেওয়া গেছে। আমি খেতে পাই না পাই ওই মোল্লা গুলো তো বাঁশ খেলো। এরপর জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিল আনলেই হিন্দুরা সংখ্যায় বাড়বে তাহলেই তো হিন্দু রাষ্ট্র। আর ফেবুতে পোস্ট দেওয়া হচ্ছে " বামপন্থীদের জন্য এক দু:স্বপ্ন...চিদম্বরম সাহেব ধরা পড়লেন!, বিজেপি বিরোধী লিখলেই বিজ্ঞ"। কি মজা না। এটি পরিষ্কার, প্রায় সমস্ত সূচক দেখায় যে আমাদের অর্থনীতিতে সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছে না, পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। সরকারের কথা বলছি, আপনি যখন এই সমস্যাটিকেও মেনে নিচ্ছেন না, তখন কীভাবে সমাধান পাব আমরা?
----- সন্তানেরা খেতে পাবে তো ?
(১)
আজ আমার স্বপ্নের ভারত স্বাধীনতার ৭৩বছরে পা দিল। একদিকে যেমন লালকেল্লায় ত্রিবর্ণ পতাকার লহরে চলছে আত্মাভিমানের ভাষণ। আর অন্যদিকে তিমিরবিনাশী আলোকচ্ছটায় সমাজকে প্রগতির পথ দেখাতে বিভাজনের একটা প্রক্রিয়া প্রায় সম্পূর্ণ। সাধারণ মানুষের কাছে আজ এক বিরাট প্রশ্ন; দুর্নীতি না ধর্মীয় ফ্যাসিজম? কোনটা বেশী ক্ষতিকর? কার বিরুদ্ধে আজ আন্দোলনের করাটা জরুরী? আমাদের মতে, এক্ষেত্রে একটাই লক্ষ্য বা সিদ্ধান্ত হওয়া উচিৎ; প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সমস্ত শক্তিই কর্পোরেটের সাথে গাঁটছড়া বাঁধা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেই আজ নিয়োজিত হওয়া প্রয়োজন। এই শক্তি শুধু দাঙ্গাবাজ বা মধ্যযুগীয় মানসিকতার বেড়াজালে আটকে নেই, দুর্নীতিরও শিখরে বিরাজ করছে।
এবারের ১৫ই আগষ্ট ভারত তার ৭২ তম স্বাধীনতা দিবস পালন করবে। লক্ষ কোটি ভারতবাসী উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে সেই সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেছিল যা গর্ব করে বলত ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনও অস্ত যায়না’! অধীনতা, বৈষম্য ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর অদম্য সংগ্রামের প্রতীক ১৯৪৭-এর ১৫ আগষ্ট। আমরা যখন ৭২ তম স্বাধীনতা দিবস পালন করতে চলেছি তখন অতীতের দিকে তাকিয়ে ঔপনিবেশিক যুগের হাল হকিকত একবার দেখে নেওয়া যাক। একবার দেখে নেওয়া যাক কিসের বিরুদ্ধে আমরা সেদিন সংগ্রাম করছিলাম, আমাদের জাতীয়তাবাদ কিসের দ্বারা নির্ণীত হয়, ইতিহাসের কোন উত্তরাধিকার নিয়ে আমরা গর্ববোধ করতে পারি।
বিভাজন করে শাসন করার নীতি ঔপনিবেশিক প্রভুদের শেষরক্ষা করতে পারেনি। আজকের কোম্পানিরাজকেও তা আড়াল করতে পারবেনা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রক্তচোষা মুনাফাবাজীর পথ বেয়ে ভারতে উপনিবেশবাদ এসেছিল। ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছে ভারত ছিল সস্তা শ্রমের এক বিরাট ভান্ডার এবং বিশাল বাজার ও বিপুল সম্পদের উৎস। উত্তর পূর্বাঞ্চল ও অন্যান্য উপনিবেশে ব্রিটিশ রাজের বাগিচা শিল্প ফুলে ফেঁপে উঠেছিল ভারতীয় শ্রমিকদের রক্ত ও ঘামে। এইসব শ্রমিকদের ক্রীতদাস বানিয়ে রাখা হয়েছিল বাগিচা শিল্পে। আমাদের কৃষি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ রাজের স্বার্থে। গায়ের জোরে ব্যবসায়িকরণের মাধ্যমে ভারতীয় কৃষকদের অর্থনৈতিক সুস্থিরতা ও কৃষিতে অর্থলগ্নির স্বাধীন বিস্তারকে চুরমার করে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের প্রথাগত শিল্প ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল যাতে ভারত কেবল ইংল্যান্ডের শিল্পজাত পণ্যের বাজারে পর্যবসিত হয়। ভারতের অর্থনৈতিক অধীনতা স্থায়ীভাবে বজায় রাখা হয়েছিল ব্রিটিশ রাজের কাছে ভারতীয় জনতার রাজনৈতিক অধীনতার মধ্যে দিয়ে। ব্রিটিশ রাজের এই জাতবিদ্বেষী শাসন বজায় রাখা হয়েছিল অসংখ্য কালা কানুনের মধ্যে দিয়ে। রাওলাট অ্যাক্ট, পাব্লিক সেফটি বিল ইত্যাদি কত কি।
(২)
একদিকে মঙ্গল অভিযান শেষে, চাঁদে পা রাখার তোড়জোড়, অন্যদিকে মেয়েদের হেনস্থা, নিগ্রহ মায় মৃত্যু – এই হলো আজকের ভারতের বাস্তব চিত্র। উন্নয়নের এক অলীক ফানুস ফুলিয়ে, আদতে দেশকে মধ্যযুগে নিয়ে যাওয়ার যে পরিকল্পনা, সেখানে মেয়েদের স্থানও তো হেলাফেলারই হওয়ার কথা এবং তেমনটিই হয়ে চলেছে সারা দেশজুড়ে। দ্বিতীয়বার কন্যাসন্তান হওয়ায় দেড় মাসের শিশুকে শ্বাসরোধ করে খুনের অভিযোগ উঠলো বাবা-সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিরুদ্ধে! এ কোন অন্ধকার সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা, যে মাটিতে তেভাগার মা শহীদ অহল্যা জন্মেছেন, সেখানেই দেড় মাসের প্রাণ শুধু মেয়ে হওয়ার অপরাধে ঝড়ে যায়! এক সামাজিক অনৈতিকতার বীজ বহন করে চলেছে গোটা দেশটাই; যেখানে উত্তর ভারতে তিনটি জেলায় তিন মাসে কোন মেয়ে জন্মগ্রহণ করেনা, যেখানে নির্ভয়া-কামদুনি-উন্নাও-কাঠুয়া খবরের কাগজের বিক্রি বাড়িয়ে হারিয়ে যায়, ধর্ষকের সমর্থনে জাতীয় পতাকা হাতে শাসকদলের নেতা-মন্ত্রী-কর্মীরা মিছিল করার অসভ্যতায় শামিল হয়, জন্মের আগেই গর্ভে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়, সেখানে এই দেড় মাসের শিশু মরে বেঁচেছে। তার তো তিল তিল যন্ত্রণা সয়ে মরাটাই ভবিষ্যৎ ছিলো।
‘Really, I live in dark times! Innocent words are foolish....' ১৯৩০-র জার্মানির মাটিতে দাঁড়িয়ে, ব্রেখট-র এই আর্তি, আজ ভারতবর্ষের বর্তমান পারিপার্শ্বের নিরিখে বড়ো প্রাসঙ্গিক। সংশোধনী শুধু নাগরিকপঞ্জী বা এনআরসি-র ক্ষেত্রেই নয়, সরকারের বিরুদ্ধে কোনও বিষয়েই যাতে একটা কথাও না বলা যায়, তার ব্যবস্থাও করে ফেললো মোদী সরকার। এবার সংশোধন করেই UAPA বিল পাশ হয়ে গেলো লোকসভায়। এরপর যেকোনো মুহূর্তে আপনার দরজায় কড়া নাড়তে পারে পুলিশ এবং তা কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ ব্যতিরেকেই, কারণ তারা মনে করে আপনি জঙ্গী! এই বিল পাশ হওয়ার ফলে যা হোলো তা আরও ভয়ংকর! সংগঠনগতভাবে নয়, ব্যক্তি মানুষকেই যখন খুশী কারণ ছাড়াই সন্ত্রাসবাদী আখ্যা দেওয়ার সমস্ত অধিকার করায়ত্ত করল রাষ্ট্র। অর্থাৎ ভারতবর্ষ এখন কার্যত পুলিশ ও সামরিক শক্তিই শাসন করবে। TADA, POTA-র পর এসেছিলো UNLAWFUL ACTIVITIES PREVENTION ACT বা সংক্ষেপে UAPA - যা মানবতা-বিরোধী আইন বলেই পরিচিত। তাকেই সংশোধন করে আরও ভয়ংকরভাবে তার ক্ষমতা বাড়িয়ে হাজির করলো বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার। এই আইনে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে দেশের যেকোনো মানুষের বাড়িতে তল্লাশি চালানোর ক্ষমতা থাকবে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা(NIA)-র হাতে। তার জন্য রাজ্য পুলিশের কোনো অনুমতিরও প্রয়োজন হবে না। সরকারের সামান্যতম বিরোধিতা করলেও সহজেই দেশদ্রোহী বলে জেলে পুরে দেওয়া যাবে। অর্থাৎ সরকারের সুরে সুর না মেলালেই তুমি জঙ্গী।
আজ পৃথিবী জুড়ে পুঁজির একচেটিয়াবাদ। বিশ্ববাজারে একচেটিয়া অবস্থানের শরিক হতে ভারত এখন মরিয়া বেসরকারীকরণে। রাষ্ট্রীয় অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি, সহযোগী সংস্থা সব চলে যাচ্ছে বেসরকারি হাতে। কিছুদিন আগে আসামের দুটি লাভজনক পেপার-মিল বন্ধ করে দেওয়া হলো। ভারতবর্ষের ১৪টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মধ্যে ৫টি বিমানবন্দর বেসরকারি করণ হয়েছে তার সাথে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ভারতের প্রথম ওষুধ কারখানা বেঙ্গল কেমিক্যালস ২৫ কোটি টাকা লাভ করা সত্বেও বেসরকারীকরণ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দুটি ভয়ানক বিপজ্জনক শ্রমিক বিরোধী আইন পাশ হয়েছে - মজুরি বিধি ২০১৯ ও কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও কর্মপরিবেশ বিধি ২০১৯। এই দুটি আইন কর্পোরেট কোম্পানীগুলিকে ছাড়পত্র দিচ্ছে শ্রমিকদের অধিকার ইচ্ছেমত খর্ব করার। সরকার এইসব কোম্পানীগুলিকে ন্যূনতম মজুরি ইত্যাদি শ্রম-অধিকার অগ্রাহ্য করার ছাড়পত্র দিচ্ছে। এই বিলগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয় কীভাবে ইউনাইটেড কিংডমের সুপার প্রফিটের স্বার্থে ভারতীয় শ্রমিকদের শোষণ করা হত ব্রিটিশ জমানায়।
ঔপনিবেশিক শাসকদের বড়ো প্রিয় 'বিভাজন করে শাসন করো' নীতি, যা বর্তমানে চলছে।২০১৯-এর জাতীয় শিক্ষানীতির খসড়াতে সরকারী স্কুল ও কলেজগুলি বন্ধ করে দেওয়ার ছক কষা হয়েছে। এই খসড়া বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে এদেশে এসে ব্যবসা করার লক্ষ্যে উপযোগী আইন বানানোর প্রস্তাব রেখেছে। বেসরকারী স্কুল ও কলেজগুলিকে 'শিক্ষা বিক্রী' করার লক্ষ্যে যথেচ্ছ ফি বৃদ্ধির ছাড় দিচ্ছে। বিদেশী শিক্ষা মাফিয়ারা এদেশের বাজারে এসে কীভাবে মুনাফা করতে পারবে সেটাই বর্তমান শাসকদের চিন্তা, কীভাবে লক্ষ কোটি ভারতবাসীর জন্য গুণমানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ তৈরী হবে সে বিষয়ে তাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যাথা নাই।
(৩)
বিশ্বের হতদরিদ্র জনসমষ্টির অর্ধেকই বসবাস করে পাঁচটি দেশে। ভারত, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, কঙ্গো ও ইথিওপিয়ায়। ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুযায়ী (পিপিপি), যাঁদের দৈনিক আয় ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম, তাঁদের হতদরিদ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বব্যাঙ্কের প্রতিবেদন অনুসারে, সারা বিশ্বে, দৈনিক ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম আয় করেন এমন দরিদ্র লোকের সংখ্যা ৭৩ কোটি ৬০ লাখ। তাঁরা হতদরিদ্র হিসেবে বিবেচিত। এর মধ্যে উল্লেখিত পাঁচটি দেশেই বাস করে ৩৬ কোটি ৮০ লাখ গরীব লোক। এই হিসাব ২০১৫ সালের ভিত্তিতে তৈরি করা। তখনকার হিসাবে ভারতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গরীব মানুষের বাস।
টেঁকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে সারা পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য নির্মূল বা জিরো পভার্টির ঘোষণা করা হয়েছে। এর অর্থ সারা বিশ্বের দারিদ্র্য হার ৩ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা।একটা দেশ কতটা দরিদ্র আর কতটা ধনী, তা নির্ভর করে সেই দেশের মাথাপিছু আয়, সম্পদের পরিমাণ ও বৈদেশিক মুদ্রার নিজস্ব ভান্ডারের নিরিখে। শুধু তা-ই নয়, স্থানীয় জনগণের নাগরিক সুবিধার মান, মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিতকরণ, আভ্যন্তরীণ অবস্থাও বলে দেয় দেশটার অর্থনৈতিক অবস্থা। মানুষের জীবনের মতো বিশ্বজুড়ে একেকটি রাষ্ট্রও নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্ত শ্রেণীতে বিভক্ত। আমাদের দেশের অবস্থা এমনই যে, দারিদ্র্যের কারণে ভারত ছেড়ে মানুষ পাড়ি দিচ্ছে বিদেশে। রাষ্ট্রসংঘের সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, দারিদ্র্যের কারণেই ২০০৬ – ২০১৬; এই এক দশকে ভারত ছেড়ে দেশান্তরী হয়েছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ।
বিভিন্ন সূচক অনুযায়ী, ভারত থেকে দারিদ্র্য দূর করতে প্রথমে যেসব বিষয়ে উন্নতিতে জোর দিতে হবে সেগুলো হচ্ছে, সম্পত্তি, রান্নার প্রয়োজনীয় জ্বালানি, নিকাশি ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি পুষ্টি। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে বিভিন্ন রিপোর্ট -- যার মধ্যে আছে গ্লোবাল মাল্টি ডাইমেনশনাল পভার্টি ইনডেক্স (MPI) থেকে ইউএন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (UNDP), দ্য অক্সফোর্ড পভার্টি এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (OPHI)। এই সমস্ত রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের ১০১টা দেশে সমীক্ষা চালিয়ে ৩১টা নিম্ন আয়-সম্পন্ন, ৬৮টা মধ্য আয়-সম্পন্ন এবং ২টো উচ্চ আয়-সম্পন্ন দেশ থেকে বহু মাত্রায় দরিদ্র ১৩ বিলিয়ন মানুষের সন্ধান পাওয়া গেছে। যাতে প্রমাণিত হয় এই দারিদ্র্য শুধু আয় দিয়ে বিচার করা হয়না। কিছু সূচকের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে; খারাপ স্বাস্থ্য, নিম্ন মানের কাজের কারণেও দারিদ্র্যতা গ্রাস করতে পারে।
এই সমস্ত রিপোর্ট বলছে, দশটা দেশের দুই বিলিয়ন মানুষ দেশ ছেড়ে চলে গেছে। এই দশটা দেশের মধ্যে আছে কলম্বিয়া, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, বাংলাদেশ, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, হাইতি, পাকিস্তান, পেরু, ভিয়েতনাম এবং ভারত। ভারতের মাল্টিডাইমেনশনাল পভার্টি ইন্ডেক্স (MPI) ভ্যালু যথেচ্ছ পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে; ২০০৫ -২০০৬ সালে যা ছিল ০.২৮৩, তা ২০১৫ – ২০১৬ সালে ০.১২৩ দাঁড়িয়েছে । পুষ্টি, নিকাশি ব্যবস্থা, শিশুবিকাশ, পানীয় জল, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, স্কুলে উপস্থিতির হার, আবাসন, রান্নার জ্বালানি এবং সম্পত্তি এই সমস্ত সূচক মিলিয়ে ইথিওপিয়া, পেরু এবং ভারত বঞ্চিত হচ্ছে। অর্থনীতির মারপ্যাঁচ আছে থাকবে, কিন্তু সাধারণ মানুষ এই অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের প্রতি কতটা আগ্রহী, পরিসংখ্যানে কতটা বিশ্বাসী- তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
(৫)
নাগরিকত্ব ও নাগরিকত্বহীনতা এই দু'য়ের পাকচক্রে অসমের সমাজ যেভাবে ঘোরপাঁক খাচ্ছে এবং অসমবাসীর প্রকৃত ইস্যু চাপা পড়ে যাচ্ছে, তার পরিণতি ভয়ঙ্কর। আমাদের দেশে সভ্যতার এক নিয়ম আছে, সেই নিয়মটি হচ্ছে ভোটাররাই নাগরিক। কেন আমরা সভ্যতার এই গৃহীত নিয়মকে পদদলিত করে আইনের জটিলতাকে আশ্রয় করে বাস্তবে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া বর্বরতা ও অন্যায়ের প্রতি সরকারি অবহেলাকে প্রশ্রয় দিচ্ছি? অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া যদি একবার সামাজিক মান্যতা পেয়ে যায়, তাহলে মারণব্যাধির ভাইরাসের মতো পুরো সমাজদেহকে ক্রমশঃ গ্রাস করে নেয়।
এনআরসি প্রক্রিয়ার দীর্ঘকালীন যাত্রা আসামের সমাজ-অর্থনীতির প্রভূত ক্ষতি সাধন করে চলেছে। সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরুর অপূরণীয় ও গভীর ক্ষতি সবার চোখের আড়ালে থেকে যাচ্ছে। প্রথমত, সমাজে যে বিষয় নিয়ে মত বিনিয়মের প্রাবল্য থাকে সেই বিষয় রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করে। সঙ্গতকারণেই অসমের সমাজ জীবনে যারা জনমত তৈরি করতে পারেন তাদের প্রায় সবাই এনআরসিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষে বিভাজিত হয়ে পড়েছেন এবং তাতেই আবদ্ধ হয়ে আছেন। সমাজ-রাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যান্য বিষয় হয়ে পড়েছে গৌণ। অর্থাৎ এনআরসি ডিসকোর্সে সমাজকে ব্যস্ত রেখে রাষ্ট্র ও সরকার অন্যান্য সমস্ত প্রশ্নে সবার চোখের আড়ালে ও গণ-বিতর্ক এড়িয়ে যা খুশী তাই করে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, একজন অর্থনীতিবিদ বলছিলেন যে এই নির্বাচন সমাজ-অর্থনীতিতে লিক্যুইডিটি ক্রাইসিস খানিকটা শিথিল করেছে, কারণ যাদের কাছে নগদ অর্থ জমা ছিল তারা এই নির্বাচনে বিতরণ করেছেন এবং তাতে সাধারণ পণ্যের কিছুটা হলেও চাহিদা বাড়বে, এনআরসি প্রক্রিয়া ঠিক তার বিপরীত – এখানে আইনী দৌড়ঝাঁপ করতে গিয়ে জনগণের নগদ অর্থ মুষ্ঠিমেয় কিছু লোকের হাতে ক্রামাগত কুক্ষিগত হচ্ছে – এনআরসি’র দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়া অসাম্য বৃদ্ধিতে মদত দিয়ে চলেছে। তৃতীয়ত, এনআরসি প্রক্রিয়ার দীর্ঘকালীন হয়রানির ফলে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এক ভাষিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। এই প্রতিক্রিয়া মূলত সংখ্যাতত্বের উপর ভিত্তি করে ক্ষমতা ও আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার বাসনা থেকে উদ্ভূত।
এ ভূমি স্বদেশ না বিদেশ, জানা হয়নি অনেক মানুষেরই। ইতিহাসের পর্যালোচনায় না গিয়ে এটুকু বলা যায়, ডি-ভোটার তারাই হচ্ছেন, ডিটেনশন ক্যাম্পেও তারাই যাচ্ছেন, মূলত যারা গরীব মুসলমান কিংবা হিন্দু সম্প্রদায়ের, যাদের ঘর ভেসে যায় প্রতিবছর বানে এবং নদীধ্বসে। নো-ম্যানস ল্যান্ডের দিকে পা বাড়িয়ে আছেন এই সব মানুষ। এই ৪২ লক্ষ মানুষকে অত্যন্ত সুচতুর বিশ্লেষন করেই এই বিলের আওতায় আনা হয়েছে। আইএমডিটি অ্যাক্টের দুর্বলতা সংশোধন করে, তাকে বিদেশী বিতাড়নের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে তৈরী করা হয়েছে। দেশভাগের অভিশপ্ত যন্ত্রণাভোগী ছিন্নমূল বাঙালির সামনে এখন প্রশ্ন, তারা কি ডিটেনশন ক্যাম্পের দুঃসহ দিন কাটাবেন? আত্মহত্যা করবেন? মৌলিক অধিকার হারাবেন? নাকি ঘুরে দাঁড়াবেন? এই ‘রাষ্ট্রহীন’ মানুষগুলোর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নাগরিক সুরক্ষার ভার কে নেবে? তাদের স্ট্যাটাস কি হবে?
৩৭০ ধারা বা ৩৫-এ বাতিল মানে শুধুমাত্র কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ছিনিয়ে নেওয়া নয়, সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপরেই কুঠারাঘাত। অদ্ভুৎ সব পরস্পরবিরোধী যুক্তি হাজির করা হচ্ছে; ৩৭০ ধারা যদি ‘অগণতান্ত্রিক’ হয়, তাহলে কোন যুক্তিতে ৩৭১-এ বলে নাগাল্যাণ্ড, ৩৭১-বি বলে আসাম, ৩৭১-সি বলে মণিপুর প্রভৃতি রাজ্যগুলির বিশেষ মর্যাদা বহাল রাখা হয়? সাধারণ যুক্তি অনুসারে প্রতিভাত হয়, কাশ্মীরে বিজেপি-র এই আক্রমণের কারণ হলো, রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। ভারতের ইতিহাস দেখেছে, বিভিন্ন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর একটা পর্যায়ের পরে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা পাওয়া; যেমন হয়েছে পণ্ডিচেরি বা গোয়ার ক্ষেত্রে। এই প্রথম একটা ‘রাজ্য’কে ভেঙ্গে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে দেওয়া হলো! একদিকে লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত ঘোষণা করার বেলায়, সেখানকার মানুষের ‘দীর্ঘদিনের দাবী’ ও ‘আকাঙ্খা’র কথা গদগদ কণ্ঠে উল্লেখ করা হলো, আর অন্যদিকে, কাশ্মীরিদের দীর্ঘদিনের দাবী ও আকাঙ্খাকে অস্বীকার করাই শুধু নয়, বুটের তলায় পিষে ফেলাটাই নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
যে যুক্তিতে কাশ্মীরের অবস্থান ঠিক করার মূল অধিকার কাশ্মীরবাসীর এবং সেজন্যই কাশ্মীরবাসীদের মতামত না নিয়ে ৩৭০ ধারা বাতিল শুধু অগণতান্ত্রিকই নয়, কেন্দ্রীভূত অতি-রাষ্ট্রবাদের দিকে এক বড়মাপের উল্লম্ফন, ঠিক তেমনি অসমের বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা উঠিয়ে দিয়ে অসম চুক্তির ৬ নং ধারা অনুযায়ী কতিপয় সংগঠনের মতের উপর ভিত্তি করে অসমীয়া জাতির সংজ্ঞা নিরূপণও অগণতান্ত্রিক ও কেন্দ্রীভূত শাসনের পরিপূরক। প্রব্রজনের ডেটলাইনকে ভিত্তি করে কোনো জাতির স্থায়ী সংজ্ঞা নিরূপণ নিজে থেকেই জাতিধ্বংসী। এক স্থাণু কনসেপ্টের বশবর্তী হয়ে অসম চুক্তির ৬ নং ধারা প্রয়োগের লক্ষ্যে অসমিয়া জাতির সংজ্ঞা নিরূপণ অসমিয়া জাতির এবং বহুভাষিক অসমের জন্য ক্ষতিকারক। আর এক দেশ এক আইন এক পতাকা এক জাতীয় সংগীত এইসব তোয়াক্কা না করে নিজের মতো করে ট্রেন্ড উপস্থাপিত করল নাগারা গত ১৪ই আগষ্টে। এখন প্রশ্ন আসে, সার্বভৌম ভারতে তা কেমনে হয়?
(৬)
মুসলিম পাকিস্তান আর হিন্দু ভারতের মধ্যে দেশের এই মহাবিভাজনকে মূলধন করেই টিকে আছে কিছু লোলুপ সম্প্রদায়। তারা এই বিভাজনকে তাঁর চরম সীমায় নিয়ে যেতে উদ্যত, তাঁর ফলাফল যত মারত্মকই হোক না কেন। আমার স্বপ্নের ভারতে গঙ্গা ও কাবেরী, সিন্ধু ও ব্রহ্মপুত্র মুক্তধারায় পরস্পর মিলেমিশে বয়ে চলবে। ভারতের সমস্ত মহান সুরসৃষ্টির যুগলবন্দীতে জেগে উঠবে ভোর। কোনও এক রাষ্ট্রনায়ক তখন তাঁর টুকরো লেখাগুলোকে গেঁথে লিখতে বসবেন "ভারতের পুনরাবিষ্কার"।
আমার স্বপ্নের ভারতে ভণ্ড সভ্যতার বড়াই আর অলীক শান্তির মায়াজাল ছিঁড়ে ফেলতে একটা হাতিয়ার আজ বড় দরকার।ধর্মকে সঠিকভাবে পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের অসহায়তার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই ধর্মের অবসান ঘটাতে গেলে প্রয়োজন মানবজীবনের বস্তুগত ও আত্মিক পরিস্থিতির আমুল পরিবর্তন, যাতে মানুষ তার পরিবেশের নিয়ন্তা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। ভারতে যখনই রক্ষণশীল কোনও দার্শনিক ধারা জগদ্দল পাথরের মত মানুষের ওপর চেপে বসেছে, তখনই জন্ম নিয়েছে মহান মহান সংস্কার আন্দোলন। আর তাই আমি স্বপ্ন দেখি যুক্তিবাদী চিন্তাধারার এক মহান পুনরুত্থানের, যখন মানুষের যে অন্তরাত্মা ঈশ্বররুপে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল তা মানুষের মধ্যেই নিজেকে আবার ফিরে পাবে। আর মানবমনের এই সংস্কার আসবে এক সমাজবিপ্লবের হাত ধরে, যখন সম্পদের স্রষ্টারাই হয়ে উঠবেন সম্পদের প্রকৃত অধিকারীও।
ভারতীয়রা বিপুল ক্ষমতাধর ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে লড়েছিল ধর্ম-ভাষা-আঞ্চলিকতা নির্বিশেষে সংহতি ও প্রতিরোধ গড়ে তুলে। অস্পৃশ্যদের হরিজন নাম দিয়ে মহিমান্বিত করার পরিহাস বন্ধ হবে, দলিত বলেও কোনও বিশেষ বর্গ থাকবে না। সেখানে জাতগুলো মিশে যাবে শ্রেণীতে এবং তারও প্রত্যেক সদস্যের থাকবে নিজের স্বকীয়তাকে অভিব্যক্ত করার পূর্ণ সুযোগ।
আমার স্বপ্নের ভারত দাঁড়িয়ে আছে আজকের ভারতীয় সমাজের বুনিয়াদী প্রক্রিয়াগুলির ওপর ভিত্তি করে। আর একে বাস্তবে রুপ দেওয়ার জন্য আমার মত বহু মানুষ তাঁদের শেষ রক্তবিন্দুও উৎসর্গ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই মর্মবাণী আরেকবার সোচ্চারে পরিস্ফুট করতে এসো আমরা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিষাক্ত বিদ্বেষকে পরাস্ত করি। দীর্ঘ সংগ্রামে অর্জিত স্বাধীনতা যে প্রতিশ্রুতি আমাদের এনে দিয়েছিল এসো তাকে আবার অধিকার করি।
পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...