"স্বাধীনতা হারাইয়া আমরা যখন আত্মশক্তিতে অবিশ্বাসী হইয়া পড়িলাম এবং আকাশমুখো হইয়া কোন অজানা পাষাণ দেবতাকে লক্ষ্য করিয়া কেবলি কান্না জুড়িয়া দিলাম; তখন কবির কণ্ঠে আকাশবাণী দৈববাণীর মতোই দিকে দিকে বিঘোষিত হইল, ‘গেছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ।’ বাস্তুবিক আজ আমরা অধীন হইয়ছি বলিয়া চিরকালই যে অধীন হইয়া থাকিব, এরূপ কোন কথা নাই। কাহাকেও কেহ কখনও চিরদিন অধীন করিয়া রাখিতে পারে নাই ইহা প্রকৃতির নিয়ম বিরুদ্ধ” (যুগবাণী : নজরুল)।
নজরুল ইসলামকে নিয়ে পড়াশোনা শুরু হয় দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে সেই 'প্রভাতী' দিয়ে। তারপর দিন যায় আমি ও তার সাথে পরিচিত হই ধীরে ধীরে। ক্লাস এইটে 'রবীন্দ্র-নজরুল' জয়ন্তীতে 'বল বীর' কবিতা আবৃত্তি করি। সেবার প্রথম হয়েছিলাম। যাইহোক, আমার জানা নেই কী ভূমিকাই দেবো বিদ্রোহী কবি নজরুলের? কী বৈশিষ্ট্য বা তাকে মানায়? যদি বলি কোন্ কবি একাধারে সৈনিক,কণ্ঠশিল্পী, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, গীতিকার, নাট্যকার, অভিনেতা, এবং চলচ্চিত্রকার ছিলেন? ব্যক্তিগত সামাজিক এবং কর্মজীবনে বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী বাঙালি কবির নাম কী? এরকম অনেক প্রশ্নের উত্তরে একটাই আসে নাম, কাজী নজরুল ইসলামের। তাঁর স্বভাবে ছিল বিদ্রোহী; প্রথাবিরোধী, অনেকটা বিপ্লবী। নজরুল তার গান-কবিতা-গল্পে-প্রবন্ধে এমন সব শব্দরাজি ব্যবহার করেছেন যা এক 'কাণ্ডারী'র প্রযোজ্য।অধীনতা মেনে নেয়া নজরুল জীবনে ছিল অকল্পনীয়। বাল্য থেকেই স্বাধীনচেতা মনোভাব তাঁকে সাহসী, ব্রতী, সংগ্রামী, লড়াকু, দৃঢ় মনোবলের অধিকারী করেছে। জন্মেছিলেন পরাধীন দেশে। উপনিবেশ শাসনের ভেতর দেখেছেন শোষিত, বঞ্চিত পরাধীন এক জাতিকে। কাজী নজরুল ইসলামের মানস গঠনের কালে বঙ্গসমাজ ছিল অন্ধ চিন্তায় আচ্ছন্ন। সময় ছিল বিজ্ঞানমনস্কতার বিপরীত। প্রতিকূল ছিল রাজনৈতিক পরিমণ্ডল। সামাজিক-ধর্মীয় মূল্যবোধ ছিল আলোক বর্জিত। ঠিকমতো তখনো যুক্তিবাদের গোড়াপত্তনই হয়নি। তার ওপর ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ, ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা, ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ, ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডসহ অনেক ঘটনাই নজরুল ইসলাম মানস গঠনের কালে ঘটেছে।
কাজী নজরুল ইসলামকে বলা হয় রেনেসাঁসের কবি। লিখেছেন— ‘গাহি সাম্যের গান—/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,/ যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম ক্রিশ্চান। ’ তিনি প্রচলিত প্রথার বিরোধিতা করে লিখেছেন—‘কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুথু ও—গায়ে?/ হয়তো তোমার স্তন্য দিয়েছে সীতা-সম সতী মায়ে। ’ প্রচলিত সমাজে যৌনকর্মীদের সম্মানের যে অবনমন তার থেকে তিনি বেরিয়ে এসেছেন। এমনকি যৌনকর্মীকে তিনি অবলীলায় ‘মা’ সম্বোধন করেছেন। মনুষ্যসৃষ্ট নানা বিভেদরেখায় বিভক্ত এই সমাজকে দেখে যারপরনাই বিচলিত ছিলেন কবি নজরুল। এসব থেকে কায়মনোবাক্যে মুক্তি চান তিনি। সেই কারণেই তার রচিত সাহিত্যের প্রধান উপাদান হয়েছে মানবতাবাদ, সাম্যবাদ আর অসাম্প্রদায়িক চেতনা।
সততই তিনি ধর্মের বিভেদ দূরীকরণে সচেষ্ট ছিলেন। নজরুল দর্শনের অন্যতম দিকটি হচ্ছে ‘ধার্মিক’ পরিচয়ের চেয়ে ‘মানুষ’ পরিচয় বড়। আল্লাহ এবং নারায়ণের মধ্যে কখনোই তলোয়ারের ‘ঠোকাঠুকি হবে না’ বলে তিনি মত দিয়েছেন। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—তারা দুজনই এক। শান্তি, সাম্য, অধিকার, স্বাধিকার –নজরুলের কাব্যিক চেতনার একেকটি হীরকখণ্ড। সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার আর কুপমণ্ডুকতা ছিলো তার চেতনার প্রতিপক্ষ। তিনি ছিলেন চেতনার কবি। তিনি যেমন মেনে নেন নি নারীর প্রতি অবিচার আর বৈষম্য, তেমনি মেনে নেন নি দুর্বলের প্রতি সবলের আধিপত্য। বিভিন্ন লেখায় তিনি হিন্দু-মুসলিম বিভেদের অবসান চেয়েছেন এবং দু’টি সম্প্রদায়ের মধ্যে সামঞ্জস্যকারী বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন গানে,গল্পে,প্রবন্ধে,কবিতায়। তার ‘ধূমকেতু’ আজও আমাদের চেতনাকে নাড়া দেয়। মূল উদ্দেশ্য, স্বাধিকার আন্দোলনে সসস্ত্র বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সাম্যবাদি’, ‘মানুষ’ এবং ‘নারী’ কবিতায় নজরুল ধর্মীয় উগ্রতার বিপক্ষে মানবতার বাণী তুলে ধরেছেন।
নজরুল তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘এক স্থানে দেখিলাম, ঊনপঞ্চাশ জন ভদ্র-অভদ্র হিন্দু মিলিয়া একজন শীর্ণকায় মুসলমান মজুরকে নির্মমভাবে প্রহার করিতেছে, আর এক স্থানে দেখিলাম, প্রায় ঐ সংখ্যক মুসলমান মিলিয়া একজন দুর্বল হিন্দুকে পশুর মত মারিতেছে।’ এরপরই নজরুল মন্তব্য করেন-‘দুই পশুর হাতে মার খাইতেছে দুর্বল মানুষ। ইহারা মানুষকে মারিতেছে যেমন করিয়া বুনো জঙ্গী বর্বরেরা শুকরকে খোঁচাইয়া মারে। উহাদের মুখের দিকে তাকাইয়া দেখিলাম, উহাদের প্রত্যেকের মুখ শয়তানের চেয়েও বীভৎস, শুকরের চেয়েও কুৎসিত। হিংসায়, কদর্যতায় উহাদের গাত্রে অনন্ত নরকের দুর্গন্ধ।’
নজরুল আরো মন্তব্য করেন, ‘ দেখিলাম, আল্লার মজসিদ আল্লা আসিয়া রক্ষা করিলেন না, মা-কালীর মন্দির কালী আসিয়া আগলাইলেন না। মন্দিরের চূড়া ভাঙ্গিল মসজিদের গম্বুজ টুটিল। আল্লার এবং কালীর কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। আকাশ হইতে বজ্রপাত হইল না হিন্দুদের মাথার উপর। এই গোলমালের মধ্যে কতকগুলি হিন্দু ছেলে আসিয়া গোঁফ দাড়ি কামানো দাঙ্গায় হত খায়রু মিয়াকে হিন্দু মনে করিয়া ‘বল হরি হরিবোল’ বলিয়া শ্মশানে পুড়াইতে লইয়া গেল এবং কতকগুলি মুসলমান ছেলে গুলী খাইয়া দাড়িওয়ালা সদানন্দ বাবুকে মুসলমান ভাবিয়া, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়িতে পড়িতে কবর দিতে নিয়া গেল। মন্দির ও মসজিদ চিড় খাইয়া উঠিল, মনে হইল যেন উহারা পরস্পরের দিকে চাহিয়া হাসিতেছে।’ ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন— ‘এত মারামারির মধ্যে এইটুকু ভরসার কথা যে, আল্লা ওরফে নারায়ণ হিন্দুও নন, মুসলমানও নন। তার টিকিও নেই, দাড়িও নেই। একেবারে ‘ক্লিন’। টিকি-দাড়ির ওপর আমার এত আক্রোশ এই জন্য যে, এরা সর্বদা স্মরণ করিয়ে দেয় মানুষকে যে, তুই আলাদা আমি আলাদা। মানুষকে তার চিরন্তন রক্তের সম্পর্ক ভুলিয়ে দেয় এই বাইরের চিহ্নগুলো। ’
নজরুলের সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থে যে অসাম্প্রদায়িক চিত্র পাওয়া যায়-তা অন্যত্র দুর্লভ। গদ্যেও নজরুল তাঁর বক্তব্যকে একটা অসাম্প্রদায়িক কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছেন এবং সফল হয়েছেন। 'বাঁধনহারা’ উপন্যাসের নজরুলের ধর্ম নিরপেক্ষের উদারতার প্রতিফলন ঘটেছে। তাঁর মতে ধর্মের বাহ্যিক রূপটা একটা খোলস মাত্র। ধর্মের অন্তর্নিহিত সত্যকে ভুলে গিয়ে হিন্দু-মুসলমান বাহ্যিক আচার-আচরণকে অযথা গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তিনি দেশের যুব সমাজকে উদার মানবতায় উচ্চাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে হিন্দু মুসলমানের উর্দ্ধে ওঠার আহ্বান জানান। তিনি যেমন অসংখ্য হামদ ও নাত লিখেছেন তেমনই হিন্দুদের কীর্তন, শ্যামাগীতি লিখেছেন। কবিতা-গান, নাটক বা গল্পে মানবতার গান গেয়েছেন তিনি। সবজায়গায় অসাম্প্রদায়িকতার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।
নজরুল জানতেন মানবধর্মই আত্মস্ফুরণের অন্তরলৌকিক চেতনার উৎস। তিনি ছিলেন মানবতাবাদী মানুষরূপে উপস্থাপক। প্রবহমান জীবন সত্যের অনুসরণে নজরুল মানস ও চিন্তা- চেতনায় অসাম্প্রদায়িকতার ভাব পরিষ্কার ফুটে ওঠে। ব্যক্তিজীবনেও সাম্প্রদায়িকতার সংকীর্ণ চিন্তার উর্দ্ধে ছিল তার চিন্তাধারা। স্ত্রী থেকে শুরু করে সন্তানদের ক্ষেত্রেও দেখা মেলে তার অসাম্প্রদায়িক মননশীলতা। ধর্মব্যবসায়ীদের ব্যাপারে নজরুল নির্বিকার দ্বিধীহীন এবং দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় নিয়ে ঘোষণা করেন-
“কাটা উঠেছি ধর্ম-আফিস নেশা
ধ্বংস করেছি ধর্ম-যাজকী পেশা
ভাঙ্গি মন্দির, ভাঙ্গি মসজিদ
ভাঙ্গিয়া গির্জন গাহি সঙ্গীত
এক মানবের একই রক্তে মেশা
কে শুনিবে আর ভজনালয়ের হ্রেষা।“
নজরুল জানতেন এবং বুঝতেন শোষকশ্রেণিই সচেতনভাবে মানুষের মাঝে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছে। শোষকের ভিত যাতে সম্মিলিত জনগোষ্ঠীর আঘাতে ভেঙে না যায় তাই তারা সর্বদাই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ জিইয়ে রাখে – ধর্মকে শোষণের মৌল শক্তিতে পরিণত করে। মার্কসবাদী চিন্তাধারার মতো ছিল তার ভাষণ। এই শোষকশ্রেণির বিরুদ্ধে, এই ভণ্ড ধার্মিকদের বিরুদ্ধে, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছিল নজরুলের আমৃত্যু সংগ্রাম। নজরুল তার অসাম্প্রদায়িক গান বা কবিতার জন্য সবসময় তিনি ছিলেন ধর্মান্ধদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। মুসলমানরা বিভ্রান্ত হয়েছেন তার সৃষ্টিতে দেব-দেবীদের আরাধনা তথা 'খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর! দেখে, আবার সনাতনীরা খেপেছেন যখন তিনি বলেছেন “আমি বিদ্রোহী ভৃত্য, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন।”
সবশেষে তাঁর কথায়--
‘‘হিন্দু না ওরা মুসলিম’’-ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন!
কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।
কাজী নজরুল ইসলাম সকল মানুষের কাছে স্মরণীয়-বরণীয় এবং অনুকরণীয়। অসাম্প্রদায়িকতারঅভিশাপমুক্ত দেশ তথা স্বৈরাচারী শোষণের বিরুদ্ধে জনতম গড়তে নজরুলের চেতনার বিকাশের ঐকান্তিক প্রয়োজন। নজরুল ইসলামের কাছে সব মানুষই ছিল যেমন পবিত্র। সকল মানুষের মিলিত শক্তিই ছিল তাঁর কাম্য। তাই গানে, সংগীতে প্রকাশ পেয়েছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা।
No comments:
Post a Comment