Friday, May 17, 2019

প্রসঙ্গ বিদ‍্যাসাগরের মূর্তি ভাঙ্গা নিয়ে

টুইটে সেদিন দেখি "ইয়ে ভোঁসরিকে বিদ্যাসাগর কাঁহাসে পয়দা হো গয়া"। এই লাইনটা সত্যিই এক অশনিসংকেত। ভারতের আকাশে বাতাসে এখন হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থান চেতনার ধ্বজা। গত ১৪ মে অমিত শাহের রোড শো দেখে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেছি! উচ্ছ্বাস-উল্লাসে মানুষ বেলুন,ফুল, দুপাশের উঁচু বাড়ির বারান্দা থেকে মিছিলে শ্লোগান উঠছে ‘জয় শ্রীরাম’। আর এর ঠিক পরেই উত্তর কলকাতায় বিদ‍্যাসাগর কলেজে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগরের মূর্তি ভাঙ্গা হয়। গত পাঁচটা বছরে যেভাবে বি জে পি'র উগ্রজাতিয়তাবাদী আগ্রাসনে ভারতের বিভিন্ন স্থানে মূর্তি ভাঙার রেওয়াজ শুরু হয়েছে তা এর আগে ভারত এতটা দেখে নাই।

আমরা এর আগেও দেখেছি ত্রিপুরার মূর্তি ভাঙার ঘটনা। যেখানে বর্তমান শাসকদল লেনিন,রবীন্দ্রনাথ,সুকান্ত, নজরুল এদের মূর্তি ভাঙতে এতটুকুও হিমসিম খায় নাই। একটি কথা এখানে স্পষ্ট যে বি জে পি হলো আর এস এস এর বাহিরের খোলস। এই ফ‍্যাসীবাদী শক্তি বি জে পি যেভাবে ত্রিপুরাতে নিজের ভয়ংকর রূপে ঠিক তদ্রূপ দেখা গেলো সেদিন মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গে। এরা অসমে এএন আর সি , ডি ভোটারদের নিয়ে খেলছে ছেলে খেলা আর অন‍্যদিকে বাঙালি যুবকদের মধ‍্যে ঢুকাচ্ছে আগ্রাসনের বিষবাষ্প।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন বাঙালিরা। বাঙালির প্রায় সব গিয়েও যা পড়ে আছে তা হল বাঙালিয়ানা। যে বাঙালিয়ানায় পয়লা বৈশাখের আমেজ, রোববার দুপুরে গোল করে কাটা আলুর সঙ্গে পাঁঠার মাংসের ঝোল, পঁচিশে বৈশাখে রবীন্দ্রগানের আসর, চব্বিশ মে নজরুল বন্দনা,তেইশ জানুয়ারিতে প্রভাতফেরি, ছাব্বিশ জানুয়ারিতে স্কুল-ক্লাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন। চৈতন্য থেকে লালন আমাদের। নজরুল থেকে রবীন্দ্রনাথ আমাদের। বিবেকানন্দ থেকে বিদ্যাসাগর আমাদের। বীরবিক্রম নেতাজি আমাদের, হারিয়ে-যাওয়া নেতাজিও আমাদের। তাঁদের পুজো করলেও আমরাই করি, সমালোচনা করলেও আমরা। তাঁরা বাংলা ও বাঙালির নিজস্ব সম্পদ। আমাদের প্রাণের আরাম মনের আনন্দ আত্মার শান্তি।

খুব পরিষ্কারভাবে এবং স্পষ্ট করে বলার সময় এসেছে যে আপনারা যাঁরা বলছেন ‘আগে রাম পরে বাম’ কিংবা ‘একুশে ওরা ছাব্বিশে আমরা’, পাপ করছেন। ভুল নয়, অন্যায় নয়, সরাসরি পাপ করছেন। অপরাধ করছেনও বলা যায় একে। এবং হ্যাঁ, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হল একটা সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট শক্তিকে সরকার থেকে হটানো। যে যেভাবে সেই কাজে পদক্ষেপ করবেন, সেটাই প্রকৃত মানবতা, প্রকৃত দেশপ্রেম। যে কোনো স্তরে বিজেপি বিরোধিতাই এখন পবিত্র কাজ। মহাশয় আপনি ও আপনারা টেররিস্ট, সাদা বাংলায় সন্ত্রাসবাদী। নাথুরাম গডসের মতো সন্ত্রাসবাদী। প্রজ্ঞা সিং ঠাকুরের মতো সন্ত্রাসবাদী। মাসুদ আজহারের মতো সন্ত্রাসবাদী। সন্ত্রাস ছাড়া, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সন্ত্রাস ছাড়া আপনাদের আর কোনও ধর্ম নেই। কেবল ভেক ধরে হিন্দুত্বকে ব্যবহার করছেন। যেভাবে মাসুদ আজহাররা ভেক ধরে ইসলামকে ব্যবহার করে, সেইরকম। মহাশয় আপনি ও আপনার ভক্তরা সবাই সন্ত্রাসবাদী।

যে প্রবণতাটি ভারতের বিবিধতা বা বৈচিত্র বা ডাইভার্সিটিকে আক্রমন করে, ধ্বংস করছে। আর তাই এটি প্রবল বিষাক্ত। এক দেশ, এক ভাবনা, এক আদর্শ, এক ধর্ম, এক বিশ্বাস, এক সংস্কৃতির ছাঁচে বা ফর্মূলায় ফেলার এক সুনিপুণ চক্রান্ত। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় 'সীতার বনবাস' গল্পে রামের সাথে বেশ ভালো করে পরিচয় হয়। যে কি না স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে বারবার সংশয় প্রকাশ করতেন। উনার স্ত্রীর সতীত্ব পরীক্ষা করেন প্রজাদের সংশয়ের জবাবে। কিন্তু এর আগে টিভিতে রামায়ণ দেখেছি। সেখানে রামের চরিত্র দেখে অনেক সময় নিজেও যাতে রামের মতো হই এই ভাব ছিল। তখন বেশ ছোট ছিলাম।তো সেই থেকে অ্যাভারেজ বাঙালির কাছে রাম রামায়ণের একটি চরিত্র, যে কি না নিজেরই বউকেই ঠিকঠাক মর্যাদা দেয় না, যার কাছে ভালোবাসার চেয়ে রাজদণ্ড বড়। তো সে যাই হোক, সেই রাম যে কী করে বাঙালির ভগবান হয়ে যায়, শ্রীরাম হয়ে যায়, আমি কেন, আমার উত্তর-পূর্ব চোদ্দগুষ্টিও জানে না। আর বাঙালির ভগবান হল, তাও জানি না। যখন কলেজে উঠি তখন থেকে এই 'জয় শ্রীরাম', ‘জয় বজরঙ্গবলী’ এসব শুনি।  ইন ফ্যাক, হনুমানের বুকচেরা ফোটো যেখানে উঁকি দিচ্ছে রাম-সীতা। এসবের সাথে পরিচিত হই।

তো সেকথা থাক, কয়েকদিন আগে যে লোকটা ‘কাঙাল বাঙ্গাল’ বলে গেলেন, তাঁর মিছিলেই এত মানুষ! এই কয়েক বছর আগেও যাঁর গায়ে ছিল গুজরাট গণহত্যার রক্ত, সোহরাবউদ্দিন হত্যার দাগ (এখন অভিযোগমুক্ত), তাঁর মিছিলেই এত মানুষ! যাঁরা রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতার বোধকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়, বিবেকানন্দের দর্শনকে অবজ্ঞা করে যারা , জ্ঞান-প্রতর্ককে ঘৃণা করে, যাদের ভাববিশ্বে শুধুই হিন্দুচেতনা, যারা দেশ বলতে বলে মানুষ নয় বোঝে কাঁটাতার, যারা মানুষের পাশে মানুষ হয়ে দাঁড়াতে শেখেনি... সেই তাদের মিছিলেই এত মানুষ! তাও আবার কলকাতার বুকে!

একটি কথা কী জানেন, বিষয়টা অন্য জায়গায়... একটা মূর্তি ভাঙলে বিদ্যাসাগরের একবিন্দু খাটো হয় না... এটা মূর্তি ভাঙা নয়... এটা এক ব্যাপক আগ্রাসনের অশনি সংকেত। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, ভাবনা আদর্শকে আগ্রাসন.. এই হিন্দুত্ব র প্রসার ও প্রচার এর নামে যা চলছে তা এক প্যান ইন্ডিয়ান জাতীয়তাবাদী মডেলে সবাইকে ফেলার চক্রান্ত। এক জেনারালাইজেশান। একটা  উত্তর ভারতীয় মডেলের প্ল্যান।
আর এটি মূর্তি ভাঙা নয়, এক বেলাগাম ঔদ্ধত্য। আমরা দিন দিন সহ্য করতে করতে, সর্বংসহা হতে হতে, এমন ক্লীব পোকামাকড়ের স্তরে পৌঁছেছি যে এরা যা নয় তাই করার ঔদ্ধত্য নিয়ে ঘুরছে। এখনো সহ্য করে যাবো তো এর পরে একদিন আপনার ছেলে হিন্দি বলছেনা বলে তার হাত ভেঙে দেবে। আপনার মা কড়োয়া চৌথ রাখেনা বলে তাকে রাস্তায় থাপ্পড় মেরে যাবে। আপনার বৃদ্ধ বাবা হনুমান মন্দিরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মাথায় হাত ঠেকাননি বলে তাকে দুটো লাথি মারবে। আপনি ভারত পাকিস্তান ম্যাচে কোনো পাকিস্তানি বোলারের সুইং দেখে মুগ্ধ হয়ে বললে আপনার মুখ ফাটিয়ে দেবে ঘুঁষি মেরে। আপনার ছেলে বাধ্যতামূলক ভাবে পড়বে এস এস টি তে মহান দামোদরদাস মোদীর জীবনী, মুখস্ত করবে "বীর" সাভারকারের গাথা। ভুলিয়ে দেওয়া হবে তাকে সূর্য সেন, এম এন রয়, বাঘা যতীন, প্রীতিলতা ওয়েদ্দেদার। এবং এর পরবর্তী স্তরে আপনি পুজোর চাঁদার মতো বাধ্যতামূলক ভাবে নানান "দেশপ্রেমী" চাঁদা দেবেন। মানে দিতে বাধ্য থাকবেন। আপনার টাকায় হনুমান মন্দির হবে, গণেশ পুজো হবে।

কমিউনিস্ট মেনিফেস্টতে লেখা আছে " ইউরোপ ভূত দেখেছো, কমিউনিজমের ভূত''। আর আমাদের ভারত বলবে, বি জে পি ভূত দেখেছ, ফ‍্যাসীবাদের ভূত। কার্ল মাক্স যেখানে সমাজকে পালটে দেওয়ার কথা বলেছেন। আর জারতন্ত্র কে পালটে দিয়ে মহামতি লেনিন রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র কায়েম করে ছিলেন। যেমন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথায়, 'বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন'। আজ সমস্ত ভারত জুড়ে ফ‍্যাসীবাদের আগ্রাসন। যেখানে মানুষ স্বার্থের করতালিতে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারছে। সংঘ পরিবারের উদ্দেশ্যই হলো মানুষের সভ‍্যতার ইতিহাসে যে প্রগতিশীলতা ও শ্রেণী সংগ্রাম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে সেখানে মধ‍্যযুগীয় বর্বরতা প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

বিদ্যাসাগর কলেজের বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার প্রেক্ষিতে এসব বলছি না। যারা ভেঙেছে, হয়তো জানতই না, ওটা কার মূর্তি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জ্যাঠামশাই ভাবতে পারে আবার বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বাবাও ভাবতে পারে, কিংবা হয়তো জ্যোতি বসুর মূর্তি ভেবেই ভেঙেছে। কিন্তু যে আক্রোশে ওই বিখ্যাত রোড শো চলছিল, অবাঙালি মানুষে ভরপুর রোড শো, কলকাতার গর্ব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে মিছিলের লোকজন ঢুকতে চাইছিল, কলাবাগান বস্তির দিকে যেভাবে মুসলমান-বিরোধী গালিগালাজ চলছিল, একটা কলেজে ঢুকে যেভাবে মারধোর-মূর্তি-আসবাবপত্র ভাঙা হয়েছে তাতে পরিষ্কার এটা বাঙালির সংস্কৃতি নয়। বাঙালির

বাঙালিত্ব বাঁচাতেই বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাস্ত করতেই হবে।  বিজেপিকে ডেকে আনলে পরবর্তী প্রজন্মও আপনাকে সেই একই প্রশ্ন করবে যে তখন তুমি কী করছিলে। এই ফ‍্যাসীবাদী শক্তি ভয় পাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ, সুকান্ত, নজরুল কে ইংরেজদের মতো। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগর যেভাবে বিধবা বিবাহ- স্ত্রী শিক্ষার ক্ষেত্রে বাঙ্গালী সমাজ সংস্কারে বাংলা রেনেসাঁয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। 'বর্ণবোধ' প্রকাশের মাধ্যমে তথা তাঁর লেখনী বাংলা সংস্কারের এক জলন্ত উদাহরণ। কিন্তু এরা শ‍্যামাপ্রসাদ, দীনদয়ালের ভূমিকা যুব সমাজের চেতনায় জায়গা দিচ্ছে ক্ষুদিরাম, রামমোহন,রবীন্দ্রনাথ সুকান্তের চেতনাকে ধ্বংস করে।

মূর্তি ভাঙা হয়েছে এটা বড় কথা নয় আসল কথা হলো আমরা বাঙালি জাতির কতটা আবেগের ক্ষতি হয়েছে। মূর্তি ভাঙলেই ভাবাদর্শের ধ্বংস হয়না। এইধরণের ন‍্যাক্কারজনক ঘটনা নিতান্তই ভীরুতার কাজ। এখন প্রশ্ন জাগে, বাঙালি জাতি ঐতিহাসিক ভাবে বিকশিত। এখন এই জাতির ইতিহাস বিকৃত করার লক্ষ্যে বি জে পি'র এজেন্ডা কী সমূলে ধ্বংস করা?

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...