Saturday, March 23, 2019

ডঃ তপন বাগচী : বহুমুখী প্রতিভার স্বরূপ

ডঃ তপন বাগচী উত্তরাধুনিক যুগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।  তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আত্ম-আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হয়ে বহুরৈখিক শিল্পীসত্তার স্বরূপ জানতে আগ্রহী হয়ে উঠি। পড়াশোনার ব্যাপৃত পরিসরে গিয়ে মনে হলো, তাকে জানতে দীর্ঘ সময় দরকার। কেননা তপন বাগচীর সাহিত্যকর্মের বিশদ আলোচনার জন্য আরও সময় প্রয়োজন। তিনি সাহিত্যের পথে নিরন্তর এক শব্দচাষী। সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যার অপরিসীম অবদান। লিখে চলেছেন মহামূল্যবান গল্প-প্রবন্ধ-কবিতা-গান। আমৃত্যু লিখে যাবেন এ প্রত্যাশা আমার এবং আপনাদের। শিল্পীকে প্রকৃষ্ট সম্মান করতে দেখলে নিজের কাছেই ভালো লাগে। আর কিছু না হলেও অন্তত শিল্পীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি সুযোগ তৈরি হয়। এমনকি শিল্পী সম্পর্কে অজ্ঞাতদের জানানোরও একটি প্রয়াস লক্ষ করা যায়।তার দীর্ঘায়ু এবং সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনায় কিছু কথা বলার চেষ্টা করছি।

প্রাবন্ধিক, লোকসংস্কৃতিবিদ। জন্ম ২৩ অক্টোবর ১৯৬৮ সালে; কদমবাড়ি (মাতুলালয়) মাদারীপুর; পিতা তুষ্টচরণ বাগচী; মাতা জ্যোতির্ময়ী বাগচী। শিক্ষা: গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় এমএ ও পিএইচডি। উল্লেখযোগ্য কবিতাগ্রন্থ: শ্মশানেই শুনি শঙ্খধ্বনি, কেতকীর প্রতি পক্ষপাত, অন্তহীন ক্ষতের গভীরে, সকল নদীর নাম গঙ্গা ছিল। প্রবন্ধগ্রন্থ: সাহিত্যের এদিক-সেদিক, সাহিত্যের কাছে-দূরে, চলচ্চিত্রের গানে ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, লোকসংস্কৃতির কতিপয় পাঠ, বাংলাদেশের যাত্রাগান : জনমাধ্যম ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত, মুক্তিযুদ্ধে গোপালগঞ্জ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ : চন্দ্রাহত অভিমান, নির্বাচন সাংবাদিকতা, নজরুলের কবিতায় শব্দালঙ্কার, তৃণমূল সাংবাদিকতার উন্মেষ ও বিকাশ। পুরস্কার ও স্বীকৃতি: সাংস্কৃতিক খবর পদক (কলকাতা, ২০১৩), মাইকেল মধুসূদন পদক (২০১২), লিটল ম্যাগাজিন মঞ্চ সংবর্ধনা (নদীয়া ২০১০), সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার (২০০৯), কবি বাবু ফরিদী সাহিত্য পুরস্কার (২০০৯), মাদারীপুর সুহৃদ পর্ষদ সম্মাননা (২০০৯), ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ সম্মাননা (২০০৯), মহাদিগন্ত সাহিত্য পুরস্কার (কলকাতা ২০০৮), এম নূরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০০৮), জেমকন সাহিত্য পুরস্কার (২০০৮), অমলেন্দু বিশ্বাস স্মৃতি পদক (২০০৮), জসীমউদ্দীন গবেষণা পুরস্কার (১৯৯৬), মুনীর চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১)।

এখানে আমি তার কবিতা নিয়ে সামান্য আলোচনার প্রয়াস চালিয়েছি। শিল্পসাহিত্যে নতুনত্বের সাধনা একটি চলমান প্রক্রিয়া, কিন্তু মূল থেকে বিচ্যূত হয়ে লাফ দিয়ে নতুনত্বকে আলিঙ্গন করা যায় না। বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, ‘শিল্পসাহিত্যে নতুনত্ব একটি জীবিত বৃক্ষের ডালপালা বিস্তারের মতো: মূলকে অবলম্বন করেই যার বিস্তৃতি ও বিকাশ। রবীন্দ্রোত্তর আধুনিকতার জনকেরা নতুনত্বে প্রয়াসী হয়েও এই বোধে জারিত ছিলেন যে, আবহমান বাঙলা কবিতার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো আধুনিকতার চর্চাই ফলবতী হবে না। তাই, তাঁরা কবিতার ভাষা বদলে দিলেও প্রাকরণিক বিশুদ্ধতার সঙ্গে কোনো আপস করেননি। রবীন্দ্রযুগে, এমনকি মধ্যযুগে সূচিত প্রকরণের বাইরে যাননি বা শত চেষ্টা করেও যেতে পারেননি তাঁরা। বিশ-শতকীয় আধুনিকতার আদি জনক বোদলেয়র নিজেও ছিলেন সপ্তদশ শতকে প্রবর্তিত প্রকরণের প্রতি একান্ত বিশ্বস্ত। এক কবি-বন্ধুর একটি কবিতার একটি পঙক্তিতে সামান্য ছন্দ-পতন দেখে শেষ বয়সেও তিনি তাঁকে সাবধান করে দিয়েছিলেন।

সদ্যসমাপ্ত বিশশতকের নব্বইয়ের দশকে এসে আমাদের কবিতা যখন অন্তহীন নৈরাজ্যে নিপতিত, তখন তপন বাগচী’র মতো কবির আবির্ভাব আমাদের আশান্বিত করে, যখন দেখি বুদ্ধদেব বসুর অমোঘ কথাটিই প্রকাশ করেছেন তিনি তাঁর একটি কবিতার শেষাংশে এভাবে:
সহজে যায় না মানা শিল্পপ্রতারণা
পথকেই পথ দেয় পথের ঠিকানা
(পথের হিসেব)

পথই ভিন্ন পথের ঠিকানা বাতলে দেয়—এই বোধে যিনি জারিত তাঁর পথ হারাবার ভয় নেই। তাই তপন বাগচী তাঁর প্রজন্মের পথহারাদের দলে ভিড়ে যাননি। প্রাকরণিক বিশুদ্ধতাকে মান্য করেই তাঁর কবিতা নতুন পথের সন্ধানে যাত্রা শুরু করেছে। একটি বইয়ের শিরোনামে এবং এই শব্দগুচ্ছে ধৃত বিশ্বাসের সাথে লগ্ন কবিতা লিখে মৃত্যুর অব্যবহিত আগে হুমায়ুন আজাদও পুনর্ব্যক্ত করে গেছেন একই গুরুবাক্য ‘পেরোবার কিছু নেই’। দশকের গণ্ডি পেরিয়ে আবহমান বাংলা কবিতার সঙ্গে যুক্ত হবে তপন বাগচী’র কবিতা, এই আশা অমূলক নয়।তাঁর কবিতায় ছন্দ-প্রকরণের বিষয়টিকে আমি অত্যন্ত গুরুত্বের চোখে দেখেছি। তাঁর প্রজন্মের অধিকাংশ কবিই অক্ষম গদ্যকেই কবিতার প্রধান (কেউ কেউ একমাত্র) বাহন হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এ-কারণে পাঠক সম্প্রদায় তাদের কবিতাকে অপাঠ্য বলে প্রায় বর্জন করেছেন বলা যায়। এই পটভূমিতে তপন বাগচী’র কবিতা আমাদের আশান্বিত করে। আধুনিক কবি হয়েও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত একটিও গদ্যকবিতা লেখেননি; জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব বসু নগণ্যসংখ্যক গদ্যকবিতা লিখেছেন; নবাগতদের হাতে আঙ্গিকের নৈরাজ্য দেখে শামসুর রাহমান শেষ বয়সেও বলে গেলেন ‘সনেটে প্রত্যাবর্তন আমার একধরনের প্রতিবাদ’ (জনকণ্ঠ সাময়িকী, ২৩ অক্টোবর ১৯৯৬); আল মাহমুদ বলেছেন, ‘যে কবি ছন্দ জানে না, সে কিছুই জানে না’ (ইনকিলাব সাহিত্য, ৩ অক্টোবর ১৯৯৭)।

অবশ্য, কবিতায় বাক-বিভূতি কেবল ছন্দ-মাধুর্য্যের ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু কবিতাকে কবিতা হয়ে ওঠার জন্য ছন্দ একটি আবশ্যিক উপাদান—এ-কথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এ-লেখায় উল্লেখিত সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সুনিল গঙ্গোপাধ্যায়, বুদ্ধদেবে বসু,শামসুর রাহমান, ও হুমায়ুন আজাদ-এর অভিমতে। তবু, কারও কাব্যকৃতির মূল্যায়ন পূর্ণ হয় না যদি অন্তত ছয়টি প্রতিতুলনাজাত অলঙ্কার: উপমা-উৎপ্রক্ষা-রূপক-প্রতীক-সমাসোক্তি-অন্যাসক্ত এবং এর সঙ্গে চিত্রকল্প ও মিথকল্প ব্যবহারে তার শক্তিমত্তা আলোচিত না-হয়। আমি কবিতার আলোচনায় যে-ধরনের উপাত্ত-নির্ভর বিশ্লেষণের প্রয়াসী, তাতে প্রতিতুলনাজাত অলঙ্কার নির্মাণে এই কবির সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা তুলে ধরার জন্য বৃহত্তর পরিসরে অচিরেই ভিন্ন একটি লেখার কথা ভেবে রেখেছি। বলে রাখা যায়: এ-বিষয়েও তপন বাগচী দখল করে আছেন তাঁর প্রজন্মের কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম আসনটি। লক্ষ করা গেছে: প্রচলিত উপমা-উৎপ্রক্ষা ও প্রতীকের চেয়ে এই কবি শব্দ ও বাক্যস্তরের রূপক, সমাসোক্তি, অন্যাসক্ত, এমনকি অতিশয়োক্তির মতো অবহেলিত অলঙ্কার নির্মাণে বেশি উৎসাহী। এইসব অবহেলিত সোনা আহরণ করে তিনি তাঁর কবিতাকে নিজস্ব কায়দায় সমৃদ্ধ করে তুলছেন।

তাঁর সম্পর্কে কারও কোনো অতিকথন আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। ফলে অকপটেই বলে দিতে পারি, ড. তপন বাগচী যা, তা-ই বলেছেন তার অগ্রজ ও অনুজরা। সস্তা জনপ্রিয়তার ধারায় ভেসে যাওয়ার মতো অভিধা তিনি অর্জন করেননি। দুই বাংলাতেও তার সমান গ্রহণযোগ্যতা লক্ষ্য করা যায়। তার গান, গবেষণা, ছড়া, কবিতা—সমানভাবেই সমাদৃত দুই দেশের বাংলা ভাষাভাষীর মধ্যে। বহু কর্মগুণে গুণান্বিত এই মানুষটি শত বছরের কোটায় পৌঁছাবেন এমন প্রত্যাশা আমাদের সবার। লেখালেখির জগতে প্রচলিত একটি কথা হচ্ছে—কবি-সাহিত্যিকরা বেঁচে থাকতে সমাদর পান না। কিন্তু ডঃ তপন বাগচীর ক্ষেত্রে তা পুরোটাই বিপরীত।

সবশেষে 'স্রোত' পত্রিকার সম্পাদক তথা কবি গবিন্দ ধরকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই এবারের সংখ‍্যায় 'ডঃ তপন বাগচী' নিয়ে কাজ করার জন্য।। কুর্নিশ জানাই লেখকসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা নিবেদন করছি। অশেষ শুভ কামনা গুণী এই মানুষটির জন্য। তিনি বেঁচে থাকুন আমাদের মাঝে। তার সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে তিনি বেঁচে থাকুন অনন্তকাল। তপনের আলোয় আলোকিত হোক আমাদের সাহিত্য জগৎ। আগামীর পথচলা আরও মসৃণ হোক একামনায় ভুল-ত্রুটি মার্জনার দৃষ্টিতে দেখার বিনয়াবনত আবেদন রেখে এখানেই শেষ করছি।

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...