এক দশক আগে পর্যন্ত সাবিত্রীবাই ফুলে ছিলেন উত্তর ভারতের মধ্যে কিছু মানুষের কাছে পরিচিত একটি নাম.
প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় বিখ্যাত মহিলাদের নাম বলতে সরোজিনী নাইডু ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ, মহাপুরুষদের নাম বলতে গান্ধিজি নেতাজী বিবেকানন্দ রাজা রামমোহন- ব্যাস এদের মধ্যে আটকে থাকে মহাপুরুষদের পরিচিতি.
দলিত বহুজন কিছু রাজনৈতিক দল সাবিত্রীবাই ফুলে জ্যোতিবা ফুলে এনাদের নাম ব্যবহার করে থাকে ফলে তাদের পরিচিতি সারাদেশে ততটা নেই.
কিন্তু দেখতে দেখতে বিগত কয়েক বছরের মধ্যেই সারা দেশ ছেয়ে গেছে সাবিত্রীবাই ফুলে জ্যোতিবা ফুলে বাবাসাহেব আম্বেদকরের নাম.
কিভাবে ঘটলেই মিরাকেল??
3 জানুয়ারি 2018 গুগোল সাবিত্রীবাইয়ের ছবি দিয়ে ডুডুল তৈরি করে.
এবং সেখানে লেখে সাবিত্রীবাই ফুলে ভারতবর্ষের সমাজ সংস্কারের মহানায়িকা.
দু'বছর আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী উপেন্দ্র কুশবাহ্ প্রস্তাব দেন যে সাবিত্রীবাই ফুলের জন্মদিনকে শিক্ষিকা দিবস হিসাবে সারাদেশে উদযাপন হোক.
দেশের পুরানো বড় ইউনিভারসিটি গুলির মধ্যে পুনে হলো একটি পুরানো ইউনিভার্সিটি.
মহারাষ্ট্র সরকার পুনে ইউনিভার্সিটি কে সাবিত্রীবাই ফুলে পুনে ইউনিভার্সিটি নামাঙ্কিত করে.
মহারাষ্ট্র সরকার কেন্দ্রের কাছে প্রস্তাব পাঠান সাবিত্রীবাই ফুলে ও জ্যোতিবা ফুলেকে ভারতরত্ন দেওয়া হোক.
আজ থেকে 187 বছর আগে মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার একটা ছোট্ট গ্রামে পিছড়েবর্গের মালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সাবিত্রীবাই ফুলে.
মাত্র নয় বছর বয়সে নিজের থেকে চার বছরের বড় জ্যোতিবা ফুলের সঙ্গে বিবাহ হয় সাবিত্রীবাই ফুলের .
জ্যোতিবা শিক্ষিত ছিলেন তাই তিনি নিজের ঘরেই সাবিত্রীবাই ফুলেকে পড়াশোনা শেখাতে লাগলেন.
সেই সময় মেয়েদের পড়াশোনা তো সম্ভবই ছিল না, তার উপরে শূদ্র মালির ঘরের মেয়ে যা ছিল একেবারেই অসম্ভব -কিন্তু জ্যোতিবা ফুলে নিজের জেদ এবং মনের জোরের কারণেই সাবিত্রীবাই ফুলে কে শিক্ষিতাকরে তোলেন.
সাবিত্রীবাই ফুলের সঙ্গে আর এক মহিলা ছিলেন ফতেমা শেখ.
তাঁরা একসঙ্গেই পড়াশোনা শেখেন এবং পরবর্তীকালে একসঙ্গেই সমাজ সংস্কারের কাজে, কাজ করে যান.
*#সাবিত্রীবাই_ফুলের_জীবনের_কিছু_উপলব্ধি--*
1) সাবিত্রীবাই ফুলে নিজের স্বামীর সঙ্গে 1848 সালে প্রথম মহিলাদের জন্য স্কুল খোলেন, আধুনিক ভারতে মহিলাদের জন্য এটি প্রথম স্কুল হিসেবে মনে করা হয়.
সেই সময় মহিলাদের জন্য আলাদা কোন শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না, এমনকি মিশনারি স্কুল গুলোতেও মেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা ছিল না.
আসলেই মেয়েদের কোন শিক্ষার অধিকার ছিল না, সাবিত্রীবাই ফুলে প্রথম মহিলাদের শিক্ষার দরজা খুলে দিলেন 1848 সালে.
2) নিজেদের জীবনকালে ফুলে দম্পতি প্রায় 18 খানা স্কুল খোলেন.
ব্রিটিশ সরকার তাঁদের এই মহান উদ্যোগ এর জন্য- কাজের জন্য পুরস্কৃত করেন.
3) এই স্কুলে সাবিত্রীবাই ফুলে ছিলেন প্রধান অধ্যাপিকা, সঙ্গে ফতেমা শেখও এই স্কুলে পড়াতেন. এই স্কুল ছিল সমস্ত সমাজের মহিলাদের জন্য. এই স্কুল ভারতবর্ষে প্রথম দলিত মহিলাদের পড়ার সুযোগ তৈরি করে দেয় .
4) যখন সাবিত্রীবাই ফুলে ঘর থেকে স্কুলে পড়ানোর উদ্দেশ্যে বের হতেন তখন পাড়ার মেয়েরা সাবিত্রীবাই ফুলের গায়ের উপর গোবর- পাথর-মল ছুড়ে মারতেন, পরিহাস করতেন, গালিগালাজ করতেন, এমনকি মারতে আসতেও উদ্যত হতেন.
সাবিত্রীবাই ফুলে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় একাধিক শাড়ি নিয়ে বের হতেন. স্কুলে গিয়ে আবার শাড়ি পাল্টে নিতেন.
কারণ রাস্তায় তার পরনের শাড়ির উপর গোবর মল পাথর ছুড়ে নোংরা করে দিতেন পাড়ার মেয়েরা.
5) সাবিত্রীবাই ফুলে সেই সময় নিজের ঘরের জলের কুয়া দলিতদের জন্য খুলে দিয়েছিলেন এ ছিল এক ঐতিহাসিক এবং বৈপ্লবিক পদক্ষেপ কারণ দলিতদের সাধারণ কুয়া থেকে জল পান করা নিষিদ্ধ ছিল.
6) সাবিত্রীবাই ফুলে সেই সময় গর্ভবতী বিধবা মহিলাদের জন্য আশ্রম তৈরি করেন.
সেই সময় উঁচু জাতির গর্ভবতী বিধবা মহিলাদের সমাজে বেশি কলঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো.
সাবিত্রীবাই ফুলে তাদেরকে নিয়ে তাঁর আশ্রমে সন্তান প্রসব করতে বলতেন, কারণ তিনি মনে করতেন যে সন্তান পৃথিবীতে জন্ম নিচ্ছে সে নিষ্পাপ তাকে মেরে ফেলা ঘোর অপরাধ.
এমনই এক বিধবা মায়ের সন্তান যশোবন্ত ফুলে, সাবিত্রীবাই ফুলে তাকে নিজের সন্তান হিসেবে মানুষ করেন এবং পরবর্তীকালে যশোবন্ত ফুলে ডাক্তার হয়ে তার মায়ের সমাজ সংস্কার আন্দোলনে সহযোগিতা করেন.
ভাবতে অবাক লাগে আজ থেকে 187 বছর আগে এক মহিলা তাও আবার শূদ্র ঘরের মহিলা, কত উদার কত মহান চিন্তা ভাবনা নিয়ে সমাজ শোধরাতে এগিয়ে এসেছিলেন.
7) সেই সময় বিধবা মহিলাদের মাথার চুল কেটে ন্যাড়া করে দেয়া হতো তাদের মাথার চুল কেটে সমাজে বেঁচে থাকতে হত.
কি জঘন্য অমানবিক এই প্রথা.
সাবিত্রীবাই ফুলে এই প্রথার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন এবং মানুষকে সংগঠিত করেন এবং সেই সময়ে তিনি হরতালও করেছিলেন.
জ্যোতিবা ফুলে যিনি সাবিত্রীবাই ফুলের স্বামী, তিনিও ছিলেন বিখ্যাত সমাজসেবক.
বাবাসাহেব আম্বেদকর যাকে নিজের গুরু বলে মানতেন.
জ্যোতিবা ফুলে মারা যাওয়ার পর সাবিত্রীবাই ফুলে তাঁর সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যান সারা জীবনধরে.
9) সাবিত্রীবাই ফুলে কবিতা লিখতেন, সামাজিক সচেতনতামূলক কবিতা- অমানবিক জঘন্য জাতি-প্রথা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেছিলেন, তাঁর সমস্ত লেখাগুলি সংকলন করে চারটি বই আকারে তৈরি করা হয়েছে.
10) 1897 সালে পুনেতে প্লেগ মহামারী দেখা দেয়. সাবিত্রীবাই ফুলে প্লেগ রোগীদের সেবা করতে লেগে পড়েন, সেই সেই মারণ ছোঁয়াচে রোগের কবলে পড়ে সাবিত্রীবাই ফুলের মৃত্যু হয়.
সাবিত্রীবাই ফুলে ছিলেন ভারতবর্ষের ইতিহাসে মহামানবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ.
ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজব্যবস্থা তাদেরকে শূদ্র বানিয়েছে, সেই সমাজ থেকেই এক মহিলা যে কিনা সমগ্র ভারতবর্ষের মহিলাদের জন্য শিক্ষার দরজা খুলে দিয়েছিলেন.
শুধু তাই নয় এত বছর আগেও একজন মহিলা এত মহান -এত উদার -মানবিক হতে পারেন তা ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিরল.
কিন্তু দুঃখের বিষয় ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতিবাদী সমাজব্যবস্থা এই মহানায়িকাকে সর্বদা জনসমাজের আড়ালে রেখে দিয়েছে, প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় সাবিত্রীবাই ফুলের নাম নেই সাবিত্রীবাই ফুলের কর্মকাণ্ড আলোচনা হয় না.
কারণ ব্রাহ্মণ্যবাদী শিক্ষা ব্যবস্থায় যারা সিলেবাস তৈরি করে যারা সিস্টেম চালায় তারা সর্বদা এই দলিত- শূদ্র সমাজের মানুষদের হেয় চোখে- ছোট চোখে দেখে এবং সেই ভাবেই বিচার করে.
এটাই বাস্তব যেমনটা বাবাসাহেব আম্বেদকরের সঙ্গে হয়েছে.
কিন্তু বিগত কয়েক বছরের মধ্যেই সাবিত্রীবাই ফুলে আজ ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে আলোচিত এক মহানায়িকার নাম তার কারণ বর্তমান ইন্টারনেট সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মানুষের কাছে এইসব সত্যগুলো পৌঁছে যাচ্ছে খুব সহজে.
সাবিত্রীবাই ফুলের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ কারণ ভারতবর্ষের মহিলাদের শিক্ষার দরজা তিনিই খুলে দিয়েছিলেন সর্বপ্রথম.
https://hindi.thequint.com/voices/opinion/know-about-savitribai-phule-her-life-achievements
----------------------------------------
(গীতা যাদব এর লেখা থেকে বঙ্গানুবাদ.)
------------------------------------------------------------------
No comments:
Post a Comment