" মানুষের নৈতিকতার জন্য তো ধর্মের কোন দরকার নেই। দরকার মানবিকতা, সহমর্মিতা, শিক্ষা আর সামাজিকতার। মানুষ যদি পরকালের শাস্তির কথা ভেবে নৈতিক হয়, সেই নৈতিকতার মধ্যে মহত্ত্ব কোথায় থাকে? "
-আলবার্ট আইনস্টাইন-
এই সাদা চামড়ার হাফ প্যান্ট পরিহিত নারীটিও, আল নূর মসজিদে নিহতদের শোক জানাতে ফুল নিয়ে হাজির হয়েছেন, কাঁদছেন! না - ঘৃণা নিয়ে হাজির হননি কিংবা ক্রোধ নিয়েও না। এসছেন সমবেদনা জানাতে, ভালোবাসা জানাতে। জানতে ইচ্ছে হয় খুব, এখন কোথায় গেলো? ওয়াজে ওয়াজে ঘৃণা ছড়ানো, কাফের হত্যার উস্কানি দেয়া, নারী বিদ্বেষী হুজুরেরা?? ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাককে দায়ী করা তেঁতুলরা।জানি, এসব প্রশ্ন অমূলক।
ক্রিশ্চিয়ান জঙ্গিরা হামলা চালালো মুসলিমদের ওপর। তীব্র নিন্দনীয় এক ঘটনা। হামলাকারীদের প্রতি রইল শুধুই ঘৃণা। মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা আজকের শুধু নতুন বিষয় নয়। এর আগেও বহুবার এই ধরণের হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তার সাথে মুসলিম দেশগুলোতেও। মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। আর মসজিদে যে শুধু অমুসলিমরা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তা নয়, এর সাথে নিজ ধর্মের টিকা পরে হামলা চালিয়েছে বহুবার। ২০১৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানে সুফি দরবেশ লাল শাহবাজ কালান্দার মাজারে আত্মঘাতি বোমা হামলায় ৭০ জন মারা গিয়েছিলো মুহূর্তের মধ্যে। হামলা চালিয়েছিলো ইসলামিক জঙ্গি গ্রুপ আইএস। মাজারেও সেদিন মুসলমানরা তাদের তরিকার বিশ্বাস অনুযায়ী ইবাদাত করছিলো। ৭০ জন মানুষের রক্ত লাল ছিলো না? ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একটি সুন্নি মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায়(সেদিনও শুক্রবার ছিলো এবং জুম্মার নামাজ চলাকালে) দাররা আদম খেল এলাকার মসজিদে ৫০ জন নিহত হয়েছিলো৷ ঘটনার দায় স্বীকার করে বার্তা পাঠায় পাকিস্তান তালেবান ইসলামিক গ্রুপ। যদি ইতিহাসের আরো পেছনে যাই তাহলে একদিনে দেড় হাজার কাদিয়ানী মুসলিমকে হত্যা করেছিলো সুন্নী মুসলমানরা ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের লাহরে। সৌদি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইয়েমেনের উপর। আর এই ধরণের ঘটনা মুসলিম বিদ্বেষীদের আরও সুযোগ করে দিয়েছে যে মুসলিমরা সন্ত্রাসী। সামান্য কিছু সংখ্যকের জন্য শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে নিরপরাধ মুসলিমকে।
সত্যিই তো মানবতার পদস্খলন হয়েছে। কিন্তু কেন মুসলিমরা একজোট হয়ে প্রতিবাদ করে না পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় যখন সন্ত্রাসী হামলা হয় আর অমুসলিমরা মারা যায়। আজকে ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলার পর ইহুদী খ্রিস্টান হিন্দু শিখদের আর্থিক সহায়তা চাপে নিউজিল্যান্ডের একটি সহায়তা সংস্থার সাইট ডাউন হয়ে গেছে। ফুলে ফুলে ভরিয়ে ফেলেছে অমুসলিমরা ক্রাইস্টচার্চ মসজিদকে। কিন্তু যখন প্যারিসে হামলা হয়েছে, সুইডেনে, আমেরিকায়, বালিতে তখন মুসলমানরা এসব ঘটনার পিছনে আমেরিকার হাত, ইজরাইলের হাত, আবিস্কার করে উল্টো ভিকটিমকেই ব্লেইম দিয়েছে। যখন প্রমাণ তথ্যকে সামাল দিতে পারেনি তখন হামলাকারীদের অমুসলমান, প্রকৃত ইসলাম অনুসারী নয়, মুসলিমরা জঙ্গি নয় এরকম প্লেকার্ড টাঙ্গিয়ে নিজেদের রক্ষা করতে ব্যস্ত রেখেছে। পৃথিবীর কোন বড় আলেম মাওলানা এ ধরণের হামলার পর দু:খ প্রকাশ করে তাদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে? তারা নাকি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে? ইসলামে নাকি সন্ত্রাস নেই? পোপ কিন্তু ক্রাইস্টচার্চের ঘটনায় তৎক্ষণাত দু:খ প্রকাশ করে আক্রান্তদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন বা নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হিজাব পরে সহমর্মিতা পোষণ করেছেন। প্রত্যেকেরই একে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা, ভালোবাসা,বন্ধুত্ব সম্পর্ক গড়া একান্ত আবশ্যক।
এখানে আমার কোনও ধর্মের প্রতি হিংসা বা দ্বন্দ্ব নেই বা এই ধর্ম শ্রেষ্ঠ আর অন্যটা দুর্বল তাও কিন্তু নয়। শুধু প্রশ্ন কয়েকটি আছে। আমি মানলাম অমুসলমানরা বিভিন্ন কারণে মুসলমানদের উপর হামলা চালায়। কিন্তু একটা যায়গায় আমি এসে আটকে যাই,তা হলো, প্রত্যেক হামলাকারী মুসলমান নিজেকে তার ভাই থেকে শ্রেষ্ঠ ও যা করছে তা মৃত্যু পরবর্তী কিছু আশার জন্য। কিন্তু এর ভিত্তি কতটুকু,খুবই দুর্বল। ওরা এইসব থেকে কবে বেরুবে? কবে মুছবে নিজের মাথা থেকে কলঙ্কের টিকা? ভবিষ্যতে এরা মানুষ হিসেবে বাঁচবে বা বাঁচতে দেবেতো! এখন আর হাতে হাত রেখে বসে থাকলে হবেনা। নিজের মধ্যে দায়িত্ববোধ,কর্মস্পৃহা, নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। শিখতে হবে জানতে হবে সবার সাথে সমান তালে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।
এর মতলব ইহা নয় যে শুধু ইসলাম ধর্ম খারাপ আর বাকি সব ধোঁয়া তুলসীপাতা। প্রত্যেকটার মধ্যেই ফাঁক আছে ব্লেক হোলের মতো তা আমরা জানি। উগ্র মৌলবাদ আর ধর্মান্ধতায় নিরীহ মানুষদের নৃশংস হত্যা হচ্ছে ভারত সহ গোটা বিশ্বে। এর জন্য কারা দায়ী? কিন্তু শুধু ঘৃণা প্রকাশ করে দায় এড়ালে চলবে?
এরকম ঘটনা বার বার কেন ঘটে চলেছে, বা আরো কত রক্ত ঝরলে আমরা রক্তের দাম বুঝব, এসব বিষয়ে কি একটুও ভাববোনা?
কেন ভাববোনা?
অবশ্যই ভাববো।।
আরে এই চিন্তা ভাবনাই তো মানুষকে পশুর থেকে আলাদা করে চেনায়।
আর ভাবতে গেলেই মনে প্রশ্ন জেগে ওঠে। যারা মরল এবং যারা মারল তারা সবাই যে যার নিজেদের ঈশ্বরের প্রতি অনুগত ছিল। তবুও ওদের ঈশ্বরেরা ওদেরকে নিয়ে কেন এইসব করাচ্ছে? তবে কি ঈশ্বরেরা চান যে সব মানুষ একে অপরকে খুনোখুনি করে শেষ হয়ে যাক? তাহলে কি এই খুনোখুনি সভ্যতার শেষলগ্ন পর্যন্ত চলতে থাকবে, নাকি এই কাল্পনিক বিশ্বাস আর খুনোখুনিই মানব সভ্যতাকে শেষ করবে? কবে মানুষের মনে এই সাধারণ প্রশ্নগুলি তৈরি হবে?
কবে মানুষ বুঝবে কবি সুনীল গাঙ্গুলীর লেখা ওই বিশেষ-সাধারণ বাক্যের অর্থ?
"মানুষ আজও বুঝলোনা, যে আকাশের ওপর বসে বসে কোনো বড়বাবু পৃথিবীকে চালায় না।"
No comments:
Post a Comment