Friday, March 22, 2019

“ওরে গৃহবাসী, খোল্‌ দ্বার খোল্‌,লাগল যে দোল”


রবীঠাকুর তাঁর এই গানের মাধ্যমে সবার এক হওয়ার,মিলনের দ্বার  খুলে গেছিলেন। আগমনী বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। অসাধারণ মিলন সেঁতু গড়ে ছিলেন এই গানের মধ‍্যে। এই বসন্ত উৎসবকে দেখা হয় নতুন জীবনের বার্তাবাহক হিসেবে। জাতিতে জাতিতে বিভিন্ন ধরণের আয়োজন করা হয় এই উৎসবের। মধুময় বসন্তে ফুলের সৌরভে মেতে উঠবে চারিপাশ। কোকিলের কুহুতান, মৌমাছিদের গুঞ্জরণ, মাতাল হাওয়া প্রাণে প্রাণে দেবে দোলা। শীতের আবরণে লুকিয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া জেগে উঠবে সোনালি রোদের স্পর্শ। বাতাসে ভেসে আসা ফুলের গন্ধে জানিয়ে দিল বসন্ত কড়া নাড়ছে দুয়ারে।


গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঋতুভিত্তিক উৎসবের মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানুষ এবং বিশ্বজগতের বন্ধন শান্তিপূর্ণ করতে চেয়েছেন। মানবের জীবন যাপনে প্রকৃতির সম্পর্ক যত বেশি উপেক্ষিত হবে, ততই নেতিবাচক হবে পরিবেশ। প্রকৃতির উপর মানব আধিপত্য স্থাপন করতে গিয়ে বৈচিত্র্যের পৃথিবীতে স্বাভাবিক সৌন্দর্য দিন দিন লোপ পেতে বসেছে।  দেশের সাথে অন্য দেশের অসম প্রতিযোগিতা, অসম বাণিজ্য, শিল্প কারখানা নগর আলয়ের অপরিকল্পিত বিস্তার, অবাধ তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার, ক্ষমতা আধিপত্য স্থাপনে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার,  যা মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করছে। প্রতিনিয়ত মানুষের সাথে অন্যের প্রীতিবন্ধন, আত্মীয়তা হিংস্র হয়ে উঠছে। স্বপ্নের মতো সুন্দর বিশ্ব প্রতিনিয়ত সকল জীবজন্তুর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। মানবের উদ্ভাবন, নিরীক্ষা আনন্দদায়ক,  তবে তার প্রয়োগ আধিপত্যকে নিশ্চিত করে। এই আধিপত্যের নির্মমতায় বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ, জীবজন্তু,  গাছপালা অসহায় হয়ে পড়েছে। নদ নদী সমুদ্র মহাসাগর, পাহাড় পর্বত সমতল ভূখণ্ড, গভীর বন জঙ্গল পর্যায়ক্রমে চিরায়ত সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলছে। বিশেষ করে বিলীন হতে চলেছে বহুযুগের ভারসাম্য।  গ্রহ নক্ষত্র সৌরজগতের উপর অবাধ নিরীক্ষায় মানবের শান্তির আবাসস্থল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চরম সংকটে পড়তে শুরু করেছে। প্রতিকূল বিপন্ন বিশ্বে মানব সমাজ দোল, হোলি নামক উৎসবের মাধ্যমে সর্বমানবের ঐক্য সূচনা করতে পারে।


কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বোধকরি সেই উপলব্ধিতে বলেন, ' বিশ্বের সহিত স্বতন্ত্র বলিয়াই যে মানুষের গৌরব তাহা নহে। মানুষের মধ্যে বিশ্বের সকল বেচিত্র্যই আছে বলিয়া মানুষ বড়ো। মানুষ জড়ের সহিত জড়, তরুলতার সঙ্গে তরুলতা, মৃগপক্ষীর সঙ্গে মৃগপক্ষী। প্রকৃতি-রাজবাড়ির নানা মহলের নানা দরজা তাহার জন্য খোলা।... পুরা মানুষ হইতে হইলে তাহাকে সবই হইতে হইবে, এ কথা না মনে করিয়া মানুষ মনুষ্যত্বকে বিশ্ববিদ্রোহের একটি সংকীর্ণ ধ্বজাস্বরূপ খাড়া করিয়া তুলিয়া রাখিয়াছে কেন? কেন সে দম্ভ করিয়া বার বার এ কথা বলিতেছে-- আমি জড় নহি, আমি উদ্ভিদ নহি, পশু নহি, আমি মানুষ; আমি কেবল কাজ করি ও সমালোচনা করি, শাসন করি ও বিদ্রোহ করি। কেন সে এ কথা বলে না-- আমি সমস্তই, সকলের সঙ্গেই আমার অবারিত যোগ আছে, স্বাতন্ত্র্যের ধ্বজা আমার নহে (বসন্তযাপন)।


যেভাবে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তার কবিতায় বলেছিলেন--

"ফুল ফুটুক না ফুটুক

আজ বসন্ত।” 

জিজ্ঞেস করা হয় যদি বসন্তের রং তবে নিশ্চিত 'বাসন্তী'।  আর গাঁদা ফুলের রঙেই আজ সাজবে তরুণ-তরুণীরা। পরবে বাসন্তী রঙের শাড়ি। খোঁপায় গুজবে ফুল আর হাতে পরবে কাচের চুড়ি। তরুণরাও বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবি পরে নামবে বাংলার পথে ঘাটে। সত্যিই বাঙালি জীবনের সাথে একাকার হয়ে আছে এই ঋতুরাজ বসন্ত। বাংলার এই ছয় ঋতুর মধ্যে বসন্ত রঙিন ডালি নিয়ে সকলের মনে দোলা দিয়ে যায়। তাইতো বসন্ত সকল ঋতুর মধ্যে চির রঙিন।


বাঙালির জীবনের সঙ্গে একাকার হয়ে আছে বসন্ত। বসন্তের বন্দনা আছে কবিতা, গান, নৃত্য আর চিত্রকলায়। বসন্তের প্রথম দিনকে বাঙালি পালন করে ‘পহেলা ফাল্গুন-বসন্ত উৎসব’ হিসেবে। এ উৎসব এখন সব বাঙালির উৎসব। এই উৎসবটির একটি ঐতিহ্যময় ইতিহাস আছে। মোগল সম্রাট আকবর প্রথম শুরু করেন ১৫৮৫ সালে। এই ঋতুভিত্তিক উৎসব একেক দেশে আয়োজন করা হয় একেক সময় একেক নামে। কখনো কখনো আবার একই উৎসব দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যায় প্রতিবেশী দেশগুলোতেও।


প্রায় তিন হাজার বছর ধরে উদযাপিত এই উৎসবের উৎপত্তি ইরানে। নাম ‘নওরোজ’ ।  বাদশাহ জমশেদ এই উৎসবের প্রচলন শুরু করেছিলেন। আজ ছড়িয়ে পড়েছে মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, চীনের উত্তর-পশ্চিম ও ইউরোপের বলকান অঞ্চলে। জাপানের চেরি ফোটার উৎসব,চীনা নতুন বছর, হোলি উৎসব এইভাবে বিভিন্ন নামে প্রচলিত এই ঋতু উৎসব। ২০১০ সালে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ এই দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক নওরোজ দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।


বসন্ত উৎসবকে দোলযাত্রাও বলা হয়। দোলযাত্রা মূলত একটি হিন্দু বৈষ্ণব উৎসব বলেই বিবেচিত। ইংরেজরা প্রথম দিকে এই উৎসবকে রোমান উৎসব ‘ল্যুপেরক্যালিয়া’ হিসেবেই মনে করেছিলো। অনেকে আবার একে গ্রীকদের উৎসব ‘ব্যাকানালিয়া’-এর সঙ্গেও তুলনা করতো। দোল বা হোলি ধর্মীয় অনুষঙ্গের আড়ালে থাকা এক সামাজিক অনুষ্ঠানও বটে, যার সার্বজনীন আবেদন আছে। দোলযাত্রা উৎসবের একটি ধর্মনিরপেক্ষ দিকও রয়েছে। এখন আর শুধুমাত্র সনাতন ধর্মালম্বীদের মধ্যে হোলি খেলা নয়, বরং সব ধর্মের নারী পুরুষের মধ্যেই রঙ খেলার প্রবণতা দেখা যায়। মধ্যযুগে সম্রাট আকবর বাংলা বর্ষপঞ্জী হিসেবে আকবরি সন বা ফসলী সনের প্রবর্তন করেন। সেসময় ১৪টি উৎসব পালনেরও রীতি প্রবর্তিত হয়। এর অন্যতম ছিলো বসন্ত উৎসব। সেসময় বাংলার সকল সম্প্রদায়ের মানুষই বসন্ত বরণে বিভিন্ন লোকজ উৎসব ও মেলায় অংশ নিতেন। পহেলা ফাল্গুনে বসন্ত উদযাপনের রীতিও ঐতিহ্যবাহী।


কাজী নজরুল ইসলাম বসন্ত নিয়ে তাঁর একটি গানে লিখেছিলেন--

‘বসন্ত আজ আসলো ধরায়,

ফুল ফুটেছে বনে বনে,

শীতের হাওয়া পালিয়ে বেড়ায় ফাল্গুনী মোর মন বনে।’


শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালনের রীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই চলে আসছে। এখনো সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। আরেকটি সূত্র থেকে জানা যায়, ১৯০৭ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুরু করেছিলেন ঋতুরঙ্গ উৎসব। সেদিন শান্তিনিকেতনের প্রাণ কুঠিরের সামনে শুরু হয় এ উৎসব। এখন অবশ্য সেদিনের প্রাণকুঠি শমীন্দ্র পাঠাগার হিসেবে পরিচিত। সেই ঋতুরঙ্গ উৎসবই আজকের বসন্ত উৎসব। আগে বসন্তের যেকোনো দিন অনুষ্ঠিত হতো এ উৎসব। পরবর্তীকালে অবশ্য বসন্ত পূর্ণিমার দিনই অনুষ্ঠিত হয় এ উৎসব। এ উৎসব অবশ্য ঋতুরাজ বসন্তে স্বাগত জানানোর উৎসব। আমাদের পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশেও ষাট দশক থেকেই পহেলা ফাল্গুনে হলুদ শাড়ি পরা নতুনভাবে শুরু হয় বলে জানা যায়।


জীবনানন্দ দাশের প্রিয় ঋতু হেমন্ত হলেও তার কবিতাতেও পাওয়া যায় বসন্তকে। 'পাখিরা' কবিতায় তিনি লিখেছেন, 'আজ এই বসন্তের রাতে/ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে;/ওই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর,/স্কাইলাইট মাথার উপর,/আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর…'।


বাঙালির জীবনে সার্বজনীন উৎসব বসন্ত । কবিতা, গান, নৃত্য আর চিত্রকলায় আছে বসন্তের বন্দনা। সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শনেও বসন্ত ঠাঁই করে নিয়েছে তার আপন মহিমায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে আধুনিককালের বাউল কবির মনকেও বারবার দুলিয়েছে ঋতুরাজ বসন্ত। বসন্ত শুধু অশোক-পলাশ-শিমুলেই উচ্ছ্বাসের রং ছড়ায় না, আমাদের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্তরঙিন পুষ্পিত রক্তের স্মৃতির ওপরও রং ছড়ায়। বায়ান্ন, একষট্টির দিনের সঙ্গে তারুণ্যের সাহসী উচ্ছ্বাস আর বাঁধভাঙা আবেগের জোয়ার যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। বাংলা পঞ্জিকা বর্ষের শেষ ঋতু বসন্তের প্রথম দিনকে আমরা পালন করি ‘পহেলা ফাল্গুন-বসন্ত উৎসব’ হিসেবে। এ উৎসব এখন পরিণত হয়েছে বাঙালির নিজস্ব সার্বজনীন প্রাণের উৎসবে। বসন্তের প্রথম মুহূর্তকে ধরে রাখতে তাই তো সবাই মেতে ওঠে নানা উৎসব ও সাজে। আমের মুকুলের সৌরভে আর পিঠাপুলির মৌতাতে আর বসন্তের আমেজে আমরাও দ্বার খুলি মুক্ত আলিঙ্গনে। বসন্তকে বরণ করি আরও নিবিড়ভাবে।


"ইচ্ছেরা রঙ খেলুক

স্থলে-জলে-বনতলে

আবিরে আবির রাঙানো ডানা

তুবড়ির মতো উড়ুক সারা বাংলার আকাশে।"

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...