Thursday, January 31, 2019

গৌরী লঙ্কেশ: এক প্রতিবাদী কণ্ঠ


"In your eyes, In your eyes
In your eyes
I can see....
Your unfinished story.

I realize, realize, realize
I realize
That somebody
Didn't want your Voice free

..."--------- Arati Rao

গৌরীকে নিয়ে আমার অধ‍্যয়ন শুরু সেই জয়পুরে সলমন রুশদি ইনসিডেন্টের পর থেকে। গর্জে উঠেছিল তাঁর কন্ঠ অন‍্যায় ও অপশক্তির বিরুদ্ধে। সাংবাদিক হিসেবে ছিলেন প্রবল যুক্তিবাদী। তাঁর মধ্যে ছিল প‍্যশন ইন জার্নালিজম। গৌরী লঙ্কেশ এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদী ব‍্যক্তিত্বের নাম। বাবার রেখে যাওয়া "লঙ্কেশ" পত্রিকায় বিরুদ্ধাচারী শক্তির বিরুদ্ধে আবার গর্জে উঠে তার সম্পাদিত কলম। গৌরী শুধু নাম নয় প্রতিবাদী ভাষা। যে আগুন ধরিয়েছো তুমি আমরাই নিয়ে যাবো সেই পদাঙ্ক অনুসরণে। আজও তোমার প্রতি একই ভাব গৌরী। এখানে সত‍্যের বিপরীতে অভিনয়।

আমরা জানি, প্রত‍্যেকটা দিন বাঁচাতে হয় এমন উদ‍্যমে যে আজ অন্তিম দিন। কিন্তু কি হবে যদি আপনার জীবন প্রকৃতিগত নিয়ম ছেড়ে দুষ্কৃতীদের মর্জি মতো  হয় যে আপনার আওয়াজ বন্ধ করার চেষ্টা করতে থাকে, আর আপনাকে দূরে ঠেলে দেয়। যেকোনো মামলায়, যেকোনো বিষয়ে গৌরী নিজ দরজার সামনে মৃত্যু কে রেখে জীবনের উচিৎ মূল্যায়ন করতেন। ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং বিকেলে ৫৫ বর্ষীয়া বলিষ্ঠ সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ কে উনার ঘরে গুলি করে হত্যা করা হয়। গোটা ভারত আহত হয়েছিল, কিন্তু একটা কথা স্পষ্ট ছিল। হত্যার এক দৃঢ় সাক্ষ্য ইহা ছিল যে গৌরীর আওয়াজ এমন কিছু গোষ্ঠীর কানে পৌঁছে গেছিল, যা তাদের জন্য স্বাস্থ্য সম্মত ছিল না।

১৯৬২'র ২৯ শে জানুয়ারি সকালে মেয়েটির জন্ম হয়। গৌরী যখন বেশ ছোট তখন দুরারোগ্য রোগ মস্তিষ্ক-জ্বরে হয়ে ছিলেন। উৎকন্ঠিত বাবা-মা'র মনে ভয় ছিল, মেয়েটি বোধহয় চেতনা হারাবে নাহয় অন্ধ হয়ে যাবে। সুস্থ হয়ে ওঠে তার শরীর। যেভাষা কখনই পড়তে পড়তেন না, বুঝতেন না। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর কন্নড় ডুকে যায় রক্তে। জেদী মেয়ে দীর্ঘ পনেরো বছর বিজ্ঞাপন ছাড়াই "লঙ্কেশ" পত্রিকা সম্পাদনা করে যান বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে।পল‍্য লঙ্কেশ আর ইন্দিরা লঙ্কেশের মেয়ে কেরিয়ারে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতার কাজ, ডাক্তার হওয়ার বদলে। তিন ভাই-বোনের সবচেয়ে বড় গৌরী ১৯৮০'র দশকে "টাইমস অফ ইন্ডিয়া" পত্রিকার মাধ্যমে কেরিয়ার শুরু করেন। এমনকি ২০০০ সন পর্যন্ত পিতার মৃত্যুর পর ১৬'র চেয়ে অধিক বর্ষ পর্যন্ত সাংবাদিক রূপে কাজ করেন।

২০০০ সালে পি. লঙ্কেশের মৃত্যুর পর "লঙ্কেশ" পত্রিকার দায়িত্ব গৌরী ও তার ভাই ইন্দ্রজিৎ এর কাঁধে ন‍্যাস্ত ছিল। প্রথম দিকে গৌরী পত্রিকাটির সঞ্চালনা বন্ধ করার পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু প্রকাশক মণি'র জোরজবরদস্তি তে আবার চালিয়ে নেওয়ার নির্ণয় নেন। ছোটভাই ইন্দ্রজিৎ ব‍্যবসায়ীক দিক দেখাশুনা করতেন আর গৌরী সাপ্তাহিক সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন।

সাক্ষাৎকারের সময় অনেকবারই ওর মুখে শুনা যেতো, "লঙ্কেশ" পত্রিকার কামান সামলানোর উদ্দেশ্য ওরজন‍্য কোনো কঠিন কাজ পুরো করা এবং গৌরী এর সঞ্চালনার জন্য সব ধরণের প্রয়াসও চালিয়ে যেতেন। ২০০৫ এর শেষের দিকে যখন ভাই-বোনদের মধ্যে ঝগড়া বাধে তখন গৌরী সম্পাদনা ছেড়ে আলাদা ভাবে পত্রিকা চালিয়ে যান। এরপর নিজের সাপ্তাহিক "গৌরী লঙ্কেশ" পত্রিকা চালু করেন, যেখানে গৌরী ২০১৭ সাল অর্থাৎ মৃত্যু আগমূহুর্ত পর্যন্ত সম্পাদক হিসেবে নিয়জিত ছিলেন।

দেড় দশকের জমকালো কেরিয়ার ছেড়ে ইংরেজী সাংবাদিকতার পেশা পিছনে ফেলে নিজের রাজ‍্যের,নিজের ভাষায় কেটেছে তার ব‍্যস্ত জীবন। কেবল কর্ণাটক নয় সারা ভারতের ঘটনা, সংখ্যালঘু-দলিত বিরোধী আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, তার কাগজে সম্পাদকীয় পাতায় উঠে আসতো তীব্র প্রতিক্রিয়া। গৌরীর কাছে ছিল মানুষের ভাষা বুঝার, মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার উচ্চ মানসিকতা। বয়স কোনো বাধাই ছিল না তার বন্ধুত্বে। বিশিষ্ট নাট‍্যকার, বুদ্ধিজীবী ইউ আর অনন্তমূর্তী,বি ভি করনু,কে পি পূর্ণচন্দ্র,তেজস্বীর মতো ব‍্যক্তিবর্গ ছিলেন তার ফ্রেন্ড লিষ্টে। আবার রূপান্তরকামী রেবতীর জীবন কাহিনী তামিল থেকে অনুবাদ করিয়ে ছাপতেও তার ছিল সমান আগ্রহ।

মৃত্যুর আগ মূহুর্ত পর্যন্ত, গৌরী লঙ্কেশের উদারবাদী বামপন্থী হিসেবে নাম ছিল। তিনি 'হিন্দুত্ব' রাজনীতির সাথে সাথে জাতী ব‍্যবস্থার ও খুব সমালোচনা করতেন। তিনি হিন্দু ধর্ম কে 'পদানুক্রমিক প্রণালী' বলে মানতেন। কারণ এই ধর্মে মহিলাদের"দ্বিতীয় শ্রেণির প্রাণী" বলে মানে। নিকস্থ ব‍্যক্তিগনের বক্তব্য মতে, গৌরী আলোচনা করার সময় এমন গভীরে প্রবেশ করতেন যে সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু এসবের পরও গৌরীর মধ্যে পিছপা দেয়া বা নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার কোনো অবকাশ ছিল না। ২০০৬ সালে কর্ণাটকের শিমোগা শহরে এক সাহিত্য অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল কিন্তু আর এস এস এই অনুষ্ঠানে গৌরীর অংশগ্রহণের বিরোধিতা করে। জীবনে অনেক কিছুর সাথে গৌরীর লড়াই হয়। এমনকি তাঁকে নকশালী সমর্থক বলা হতো। ফেব্রুয়ারি২০০৫ এ ভাই ইন্দ্রজিৎ ও তার উপরে নকশাল আন্দোলনের গোর আরোপ করে। কিন্তু পরে তৎকালীন কর্ণাটক সরকার (কংগ্রেস) দ্বারা গঠিত একটি কমিটিতে গৌরীকে সদস‍্যপদ দেওয়া হয়, যেখানে নকশালবাদীদের আবার ফিরিয়ে আনার,আত্মসমর্পণ তথা হিংসার বিরুদ্ধে একটি প্রয়াস চালায়।

গৌরী লঙ্কেশের গভীর আস্থা ছিল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার, দেশের ও মানুষের প্রতি। সেই জন্য ২০০০ সালে, ‘লঙ্কেশ পত্রিকে’ সম্পাদনার দায়িত্ব নেওয়ার দু’মাসের মাথায় একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, ‘নারী হওয়াই আমার সুরক্ষা এই মুহূর্তে। এক জন রাজনীতিক যত সহজে এক জন পুরুষকে ঘৃণ্য ভাষায় আক্রমণ করতে পারেন, নারী সম্পাদকের সঙ্গে তেমন আচরণ করলে জনমানসে শ্রদ্ধা হারাবেন।’ তিনি জানান, শারীরিক আক্রমণের ভয় তিনি করেন না। তাঁর বিরুদ্ধে হুমকির ঘটনাও কমে এসেছে। অন্যত্র তিনি লিখছেন, তাঁর কাগজের দর্শন ও মূল্যবোধকে সমর্থন করেন বলেই বহু মানুষ তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে কেস দায়ের করেননি।

পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, গৌরী জানতেন। অসহিষ্ণুতা, ঘৃণা, জাত, ধর্ম এনে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার অভিযান আগ্রাসী হয়ে উঠেছে গত কয়েক বছরে, দেশের সর্বত্র। কিন্তু নিজের কাজ, সম্পাদনার সামাজিক দায়িত্ব তাঁকে এতটাই ব্যস্ত রাখত, যে নিজের সুরক্ষার কথা ভাবার মতো সময় তাঁর ছিল না। ‘ব্যাঙ্গালোর মিরর’ কাগজে লেখা একটি প্রবন্ধে তিনি লিখছেন, ‘দ্বাদশ শতাব্দীতে বাসবান্না থেকে ২০১৫-তে কালবুর্গির হত্যা পর্যন্ত একই হিংসার প্রবাহ চলেছে, অথচ শ্রেণিবিহীন লিঙ্গায়েত সমাজ গড়ার জন্য বাসবান্না নিজের জীবন দিয়েছিলেন।’ নিবন্ধের শেষে গৌরী লিখেছিলেন, ‘আইডিয়াজ, হাওএভার, নেভার ডাই।’ উমর খালিদ তাঁদের ‘মাদার কারেজ’ গৌরীর বিষয়ে লিখেছেন, যখন ওঁদের সুরক্ষা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন, নিজেকে নিয়ে কোনও চিন্তাই মনে আসত না তাঁর।

এই সংকলনে বামপন্থী আন্দোলনে যুক্ত কে ফণিরাজের ‘আক্কাজ মেটামরফোসিস’ লেখাটি বিশেষ মূল্যবান। বর্তমান সহস্রাব্দের গোড়া থেকেই হিন্দুত্ববাদী শক্তির আক্রমণের মুখে পড়ে ‘লঙ্কেশ পত্রিকে’ এবং তার নবীন সম্পাদক। বাবাবুদানগিরির মন্দির ঘিরে হিন্দুত্ববাদীদের উদ্যমের বিরুদ্ধে কেকেএসভি অর্থাৎ কর্নাটক কমু সৌহার্দ্য ভেদিকে-র মতো একটি মঞ্চ গড়ে সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে একজোট করার সাহস দেখিয়েছিলেন গৌরী। সাংবাদিক থেকে অ্যাকটিভিস্ট সাংবাদিক হয়ে ওঠেন কেবল নিজের সাহস ও বিশ্বাসযোগ্যতায়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করতেন গৌরী। তবু নকশাল আন্দোলনের মূল প্রশ্নগুলি তাঁকে ভাবাত। অতি-বামেদের মূলস্রোতে ফেরাবার উদ্যোগে ‘সিটিজেন’স ইনিশিয়েটিভ ফর পিস’ নামক যে মঞ্চটি তিনি শক্তিশালী করে তুলছিলেন, তাতে নিহিত ছিল বিপুল সাহস ও ঝুঁকি। এমনিতেই হিন্দুত্ববাদীরা যে-কোনও বিরোধীকে নকশালবাদী চিহ্নিত করে দিয়ে থাকে। ‘তাঁর জীবন অকালে নিভে যাওয়ার আগের মাসগুলিতে গৌরী হয়ে উঠেছিলেন সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিবাদী, স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের হৃদয়প্রতিমা, কর্নাটক থেকে দিল্লি পর্যন্ত’, লিখেছেন ফণিরাজ। তাই কি অস্থির হয়ে উঠেছিল এই সকল মূল্যবোধের বিপরীতে যারা, তাদের পাইক বরকন্দাজ বর্গ?

গৌরীর মৃত্যু আজ অতীত। কিন্তু সামনে আদিগন্ত বিছিয়ে আছে তাঁর স্বপ্নের দেশ ও সমাজ। গতকাল গৌরীর জন্মদিন ছিল। এই দিনটি তাঁর জীবনের অভিব্যক্তিসমূহকে আমাদের সামনে উজ্জ্বলতর করে তুলুক। অম্লান হোক তাঁর সাহসী, স্নেহমাখা মুখের ছবি। ভাবধারা অনশ্বর।

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...