মানবাধিকার প্রত্যেকটা মানুষের জন্মগত অধিকার। মানবাধিকার কথার অর্থ হলো মানুষের অধিকার।প্রত্যেকটা মানুষই চায় নির্ভেজাল অক্সিজেন। মানব সমাজের ভিত্তি হচ্ছে ন্যায় বিচার, সুষ্ঠ জীবন যাপন,সহজাত মর্যাদার স্বীকৃতি। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে গুরুত্বের সাথে আলোচিত ও অবহেলিত প্রসঙ্গটির নাম মানবাধিকার। ১৯৪৮ সাল থেকে জাতিসংঘের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর যথাযোগ্য মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা এবং মানবতাবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে ঘোষিত হয় সার্বজনীন মানবাধিকার দিবস।
মানবাধিকার ব্যক্তিকে স্বাধীনতা, ন্যায়,সমতা,মর্যাদা রক্ষক জীব রূপে ক্ষমতা দিয়ে থাকে। Robert L. Barker বলেন, Human Rights are the opportunity to be accorded the some progressive and obligations as to race, sex, language, or religion. [Robert L. Barker (edit): The Social work Dictionary, NAS, New York, 1995, p.- 173] অর্থাৎ মানবাধিকার হলো কিছু সুযোগ-সুবিধা, যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে সকলের জন্য সমান। সুতরাং মানবাধিকারকে একটা Mechanism or Instrument অথবা মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা যায় যা সকল মানুষের জন্য সহজাত ও সার্বজনীন এবং যা ব্যক্তির আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতির জন্য সহায়ক।
মানবাধিকারের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বা মূলনীতি :
সার্বজনীনতা : মানবাধিকার সারা পৃথিবীতে সকল মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে সকল মানুষ এই অধিকারগুলো সমানভাবে ভোগ করতে পারবে।
অবিচ্ছেদ্য নিরবচ্ছিন্নতা : যথাযথ বা ন্যায়সঙ্গত কোন কারণ ব্যতিরেকে কোন দেশ বা রাষ্ট্র মানবাধিকারসমূহ বা কোন একটি মানবাধিকারও কখনও কেড়ে নিতে পারবে না।
পারস্পরিক নির্ভরশীলতা : মানবাধিকার সমূহ একটি অপরটির সাথে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত ও নির্ভরশীল। একটিকে অপরটি থেকে পৃথক করা যায় না। যেমন : সার্বজনীন চিকিৎসা বা শিক্ষার অধিকারটি কোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির ওপর নির্ভর করে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা মুক্তি এবং সচেতনতা ছাড়া চিকিৎসার অধিকার পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
সমতা ও বৈষম্যহীনতা : মানবাধিকারগুলো জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, রাজা, প্রজা ভেদে কোন পার্থক্য করা যাবে না। সকল মানুষ সমানভাবে এই অধিকারগুলো ভোগ করবে।
আইনের শাষণ ও কর্তব্যপরায়ণতা : ব্যক্তির ক্ষেত্রে মানবাধিকারগুলো ভোগ করতে হলে অবশ্যয়ই কর্তব্য পালন করতে হবে। নিজের অধিকার পেতে হলে অবশ্যয়ই অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আবার রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে অবশ্যই জনগণের এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করার পজিটিভ Policy গ্রহণ করতে হবে এবং কোন কারণে এই অধিকার লঙ্ঘন করলে জবাবদিহি করতে হবে।
মানবাধিকারগুলোকে ৫ ভাগে ভাগ করা যায়:
১. রাজনৈতিক অধিকার : ভোটাধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার।
২. নাগরিক অধিকার : জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার। মতামত এবং অভিব্যক্তি প্রকাশের অধিকার।
৩. অর্থনৈতিক অধিকার : ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কাজের পরিবেশের অধিকার।
৪. সামাজিক অধিকার : বাসস্থান, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার অধিকার।
৫. সাংস্কৃতিক অধিকার: প্রত্যেকের নিজ নিজ প্রথা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকার।
মৌলিক মানবাধিকারসমূহ:
জাতিসংঘ ঘোষিত সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী প্রধান প্রধান মানবাধিকার সমূহ নিম্নরূপ :
সমতা এবং বৈষম্যহীনতার অধিকার
জীবন ধারণ এবং স্বাধীনতা লাভের অধিকার
খাদ্যের অধিকার
চিকিৎসার অধিকার
শিক্ষার অধিকার
রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের অধিকার
মতপ্রকাশ ও বাকস্বাধীনতার অধিকার
সমিতি বা সংগঠন করার অধিকার
শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার অধিকার
ভোটাধিকার
ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার
নিজ সংস্কৃতি চর্চার অধিকার
তথ্য পাওয়ার অধিকার
সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ গ্রহণ করার অধিকার
নির্যাতন ও বন্দিদশা থেকে মুক্তির অধিকার
আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার
স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার
গোপনীয়তার অধিকার
জাতীয়তার অধিকার
বিয়ে ও পরিবার গঠনের অধিকার
কর্মসংস্থান লাভের অধিকার
সামাজিক নিরাপত্তা লাভের অধিকার
মানবাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা : সমতা ও বৈষম্যহীনতার ভিত্তিতে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকারগুলোকে শ্রদ্ধা করা, রক্ষা করা এবং পরিপূর্ণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের।
১. শ্রদ্ধা করার বাধ্যবাধকতা (Obligation to Respect): বলতে বুঝায় ব্যক্তির প্রাপ্য অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এমন কিছু করবে না যাতে কোন নাগরিকের অধিকার ক্ষুন্ন হয়।
২. অধিকার রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা (Obligation to protect): যদি তৃতীয় কোন পক্ষ কোন নাগরিকের অধিকার ভোগে বাধা প্রদান করে, রাষ্ট্র সেই বাধা থেকে নাগরিকের অধিকারকে সুরক্ষা করবে।
৩. পরিপূর্ণ করার বাধ্যবাধকতা (Obligation to fulfill) : রাষ্ট্র প্রত্যেক নাগরিকের অধিকারগুলোকে তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এগুলোকে সহজলভ্য ও উন্নতর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে। এ ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি বা সামাজিক উদ্যোগকে সহযোগিতা প্রদান করতে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে।
৪. পদক্ষেপ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা (Obligation to take step) : নাগরিকের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রতি সম্মান রেখে যথাযথ পন্থায় ধারাবাহিকভাবে অর্জনের জন্য সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে রাষ্ট্রের। [ Universal Human Rights act, 217 A, 10th December,1948 Paris]
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় ভারতেও ১৯৯৩ সনে মানবাধিকার আইন লাগু হয়। যদিও ভারতের বহু রাজ্যে আজও মানবাধিকার কমিশন গঠন হয় নি। বিশ্ব মানবাধিকার কমিসনের লিখিত ধারাগুলির মধ্যে বেশীর ভাগই ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে থাকা মৌলিক অধিকারের মধ্যে স্তান পেয়েছে। ভারত সামাজিক, সাংস্কৃতিক অধিকারের সনদে স্বাক্ষর করে নি কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে আর্থ সামাজিক বিভিন্ন দাবীকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।
যদিও মানবাধিকার নিয়ে জাতিসংঘ এক অভিনব প্রয়াস হাতে নিয়েছে। তাস্বত্বেয় অন্য দেশের কথা বাদ দিয়ে যদি ভারতবর্ষের মানবাধিকার লংঘনের কথা বলি তবে এনিয়ে পুরো একটা গ্রন্থ রচনা করা যাবে। এমনেষ্টি ইন্টারনেশনেল সংস্থার শুধু ২০১৮ এর রিপোর্ট অনুযায়ী ---- ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন(মুসলিম), কিছু কট্টরপন্থি হিন্দু সংস্থার দানবীয় রূপ, শিল্পজাত প্রকল্পের জন্য আদিবাসী উৎপাটন,ব্যপক ভাবে দলিতদের নিয়ে নোংরা রাজনীতি। তীব্র ভাবে দাঙ্গাবাজদের হিংস্রতা বিশেষ করে গো-রক্ষক দল, কলেজ ইউনিভার্সিটি তে ফ্রী স্পিচে আক্রমণ। এখানেই শেষ নয় আরও তীব্র ভাবে মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে নারী ও শিশুদের প্রতি। চলতি বছরে ধর্ষণ কাণ্ডে এক রেকর্ডও গড়লো। সামগ্রিক ভাবে কাঠুয়া, বুলন্দ শহর, তথা ঐ বাইশটা গ্রাম নিষ্পেষিত হয়েছে Statue of Unity স্থাপন, কৃষকরা আজও ধর্ণা দিচ্ছে অধিকার নিয়ে। আমাদের রাজ্যগুলোর মধ্যে অসম ও পিছিয়ে নেই। NRC তে বাঙালি হেনাস্থা,ডিটেনশনে হিটলারি কায়দায় চলছে নির্যাতন, শেষ রক্ষা হয়নি একশো বছরের বৃদ্ধও।
সারা বিশ্বে এখন মানবাধিকারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যেকটি দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মানবাধিকার সংস্থা। নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে হবে আমাদেরই। মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি, ঘোষণাসমূহ এবং দেশীয় আইন গভীরভাবে অধ্যয়ন করা। অঞ্চলে অঞ্চলে জনগণকে জাগ্রত করতে হবে মানবাধিকার কর্মীদের দ্বারা। মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে র্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনার এর আয়োজনের মাধ্যমে জনগণকে মানবাধিকার সচেতন করে তোলা। সর্বোপরি, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে হাতে হাত রেখে সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হওয়া ।
পরিশেষে বলা যায়, ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসকে সামনে রেখে সবাই নিজের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হওয়া এবং অন্যের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করা উচিত নতুনভাবে।
No comments:
Post a Comment