Sunday, July 30, 2023

উনিশে মে'র ভাবনা ও আমাদের দায়ভার


‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় উনিশ’ - ১৯ শে মে। ১৯৬১ সাল। আজ প্রায় ৬২ বছর অতিক্রান্ত। আসামের বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা রক্ষার্থে এক অস্তিত্বের লড়াই। আচ্ছা সত্যিই কি আমরা ‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় উনিশ’ নিয়ে ঘুরছি। এখন চারদিকে যে আগ্রাসনের পালা – কীর্তন চলছে এতে মুটেই আশ্চার্যান্বিত হওয়ার কথা নেই। দেশজুড়ে আজব কার্নিভাল – জোর করে বিহু উৎসব গিলানো হচ্ছে, আর সঙ্গে তো আছেই চরম মিথ্যাচার, প্রতারণা আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকা। বড় দুঃখ হয় আর ক্রোধে গা জ্বলে ওঠে যখন দেখি, আমরা কোন অনুষ্ঠানে অসমিয়া আধিপত্যবাদের প্রতীক গামছা গলায় ঝুলিয়ে খুব লম্ফঝম্ফ করতে। তাইতো আমাদের অতি প্রিয় কবি দিলীপকান্তি লস্কর তাঁর কবিতায় অতি সুনিপুণভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন – 
আমি কোত্থেকে এসেছি,/তার জবাবে যখন বললামঃ/করিমগঞ্জ, আসাম। / তিনি খুশিতে ডগমগ হয়ে বললেনঃ / বাঃ। বেশ সুন্দর বাংলা বলেছেন তো !/একজন শিক্ষিত তথা সাহিত্যিকের যখন/এই ধারণা,/তখন/আমি আর কি বলতে পারিঃ / ওকে ঠিক জায়গাটা ধরিয়ে দিতে গিয়ে বললাম- / বাংলাভাষার তের শহিদের/ভূমিতে আমার বাস; / তখন তিনি এক্কেবারে আক্ষরিক অর্থে-ই / আমাকে ভির্মি খাইয়ে দিয়ে বললেনঃ /ও ! বাংলাদেশ? তাই বলুন।

আজকাল প্রায় হাতেগোনা কয়েকটি ভাষা ছাড়া বাকি সব ভাষাই বিপন্নের দিকে। জার্মান ল্যাঙ্গুয়েজ সোসাইটি বিশ্ব সমীক্ষা করে যে তথ্য উল্লেখ করেছে তাতে পৃথিবীতে বর্তমানে ছয় থেকে সাত হাজার ভাষার অস্তিত্ব সংকটে। একদিকে আগ্রাসন আর অন্যদিকে বিলুপ্তির শঙ্কা। এই বিলুপ্তি আর আগ্রাসনের পেছনে নানাবিধ আর্থসামাজিক কারণ রয়েছে। (কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস বলেছেন, "Language, like consciousness, only arises from the need, the necessity of intercourse with other man." (Marx, 1964, The German Ideology Moscow, quoted by Berezin, op.cit, Footnote 1, Page-161) তাঁরা এ-ও বলেছেন যে, ভাষা হল “... the immediate reality of thought... Practical...actual consciousness.” (তদেব) মার্ক্স আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, "Ideas do not exist divorced from language." (Sondel Ben, 1958, The Humanity of Words, New York, The world Publishing Company, Page 180)" ভাষাবিজ্ঞানের এই সূত্রগুলোকে ভিত্তি করে এ-কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ভাষা-আগ্রাসন মানে মানুষের চিন্তা-চেতনা-অনুভবকে আগ্রাসন, ভাষা-বিলুপ্তি মানে এগুলোর বিলুপ্তি।

'ভাষা-সংগ্রামের বহুমুখী মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়ন করে বুঝি, বৃহত্তর গণসংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গ হল ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বরকত-সালাম-জব্বারেরা শহিদ হয়েছিলেন বলেই ধাপে ধাপে তৈরি হয়েছিল ১৯৭১ সালে বাংলা নামে দেশের জন্ম-লগ্ন। ইতিহাস ও ভূগোলের যৌথ আক্রমণে বরাক উপত্যকা (আসামের দক্ষিণ অংশে সাবেক কাছাড় জেলা) যেহেতু প্রান্তিকায়িত হয়ে পড়েছিল, তার গভীর সর্বাত্মক সংকট কখনো তেমন মনোযোগের বিষয় হয়ে ওঠেনি। বহুদিন আগে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। ঐতিহ্যগত ভাবে শ্রীহট্ট বা সিলেট বৃহত্তর বঙ্গভূমির অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া সত্ত্বেও ধূর্ত ব্রিটিশ ১৮৭৪ সালে তাকে আসামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল। এতে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা-নির্ভর রাষ্ট্রযন্ত্র রাজস্বখাতে অনেকটা লাভবান হল যদিও, ‘বাঙালির আধিপত্য’ নামক জুজুর ভয় দেখতে শুরু করল কেউ কেউ। ক্রমান্বয়ে বিদ্বেষ-বুদ্ধির বিষবৃক্ষে শুধু জল সেচনই করা হল। দেশ বিভাজনের সময় গণভোটে সিলেট আসাম থেকে সরে গিয়ে যুক্ত হল পূর্ব পাকিস্তানে। শুধু সাবেক সিলেটের পূর্ব প্রান্তের কিছু অংশ যুক্ত হল দেশভাগ পরবর্তী কাছাড় জেলার সঙ্গে। এই নতুন কাছাড় ভৌগোলিক-সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিকভাবে কিন্তু বৃহত্তর বঙ্গভূমিরই অংশ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এই ভূমিও মমতা-বিহীন কালস্রোতে বাংলার রাষ্ট্রসীমা হতে নির্বাসিত। বহু শতাব্দী থেকে বাঙালিদের নিরন্তর প্রব্রজন চলেছে এখানে, বাংলাই এখানকার ভাষা—কী সাহিত্যে কী গণসংযোগের মাধ্যম হিসেবে। ইতিহাসের বিচিত্র জটিলতায় তা আসামের অঙ্গ হলেও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সঙ্গে এর কোনো আত্মিক সংযোগ কখনও ছিল না।' (তপোধীর ভট্টাচার্য, সময় অসময় নিঃসময় ২০১০ (পৃ. ৫০–৫৯) https://bn.m.wikisource.org)

জাতীয় স্তরে হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থানের ধ্বজাধারীরা হিন্দি ভাষাকে যেভাবে শুশ্রূষা করছে তাতে পরিষ্কারভাবে এটা বলাই যায়, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুকান্ত-জীবনানন্দ-সুভাষচন্দ্রের মাতৃভাষাকে “নানা ভাবে শেষ করে দেবার ফেসিষ্ট সুলভ আগ্রাসন” চালানো হচ্ছে। (বাঙালির দাবিপত্র, নীতিশ বিশ্বাস, ২৯ মার্চ ২০১৯) “তার প্রমাণ কেন্দ্রীয় বাজেটে ভারতের ২য় প্রধান ভাষিক জনসংখ্যার ভাষা হওয়া সত্ত্বেও গত ৭০ বছরে তার জন্য একটি টাকাও বরাদ্দ করা হয়নি।” (তদেব) বরং 'বাংলাভাষী মানে বাংলাদেশি’ এরকম প্রচার চালানো হচ্ছে আসাম সহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। আশ্চর্যের বিষয়, “NCERT-র বইয়ে রাজ ভাষার ছদ্মবেশে
ছাত্র-ছাত্রীদের শেখানো হচ্ছে হিন্দি রাষ্ট্র ভাষা"। (তদেব) গুজরাট হাইকোর্ট ১৩ অক্টোবর ২০১০ তারিখের রায়ে জানিয়েছে," There is nothing on the record to suggest that any provision has been made or order issued declaring Hindi as a national language of the country." ( সংবিধান ও বাংলা ভাষা, তৃতীয় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৯, – তদেব)

আমাদের বাসস্থান আসামে হলেও অসমিয়া আগ্রাসনের শিকার বহু আগে থেকেই। ১৯৬১ সালের ১৯শে মে ১১ টি তরতাজা প্রাণ শহীদ হন শিলচরে। ১৯৭২ এর ১৭ই আগস্ট করিমগঞ্জে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু চক্রবর্তী)। ১৯৮৬র ২১ জুলাই করিমগঞ্জে শহীদ হন জগন্ময় ও যীশু। ১৯৯৬ এ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার রক্ষায় করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে শহীদ হন সুদেষ্ণা সিনহা। আসামে ভাষিক সংখ্যালঘুরা এভাবে বারবার ক্লান্ত হচ্ছে অসমিয়া আগ্রাসন দ্বারা। নিপীড়িত হচ্ছেন ডি–ভোটারের তকমায় ডিটেনশন ক্যাম্পে আবার কখনো বা  উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির সুকৌশল ভাষিক আগ্রাসন নীতির মাধ্যমে। জাতীয়তাবোধ জাগরনের পেছনে যে উপাদানটি সার্বিক প্রয়োজন সেটি হলো এক সম্মিলিত ঐতিহ্যবোধ। বর্তমান সময়ে নব প্রজন্ম উনিশে মে শহীদের ধর্মের মাধ্যমে বিচার করে এরা হিন্দু না মুসলমান। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে এতটাই গুলিয়ে ফেলেছি, ভুলে গেছি কোন উৎসব কার। এনআরসি তে কার জয় হলো – মুসলিম খেদা না হিন্দু সুরক্ষিত। কিন্তু আমরা এসব কি করছি? মাতৃভাষা, জাতিসত্তা, সংস্কৃতি, প্রজন্ম‌ অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে যাচ্ছি না তো! 'উইপোকা', 'ঘুসপেটিয়া' তির্যক বিশেষণে যারা ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যু শিবিরে এদের কাছে নতজানু হচ্ছি না তো! এসব বিভাজনের রাজনীতি করে যারা হিন্দু – মুসলমান বাঙালীরা একবারও কি মনে প্রশ্ন জাগে আগামীদিনে ১৯শে মে কোন অনুষ্ঠানও কি করতে পারবো?

ভাষিক গোষ্ঠীর সংখ্যার বিচারে বাংলায় কথা বলতে পারেন পৃথিবীতে এর স্থান চতুর্থ। খুবই দুঃখজনক যে বাংলা সাহিত্য চর্চায় ভবিষ্যতে কতজন পাঠক পাওয়া যাবে কি না তা সন্দেহ। বরাক উপত্যকায় বাংলা মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীরা সরকার পরিচালিত বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে থাকে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন 'মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ সম'। মাতৃভাষা ছাড়া একজন মানুষের আত্মপরিচয় হয় না। সেইজন্য বাংলা ভাষা বিষয়ে পড়াশোনার প্রয়োজন। কিন্তু বাংলা ভাষাটা পড়াবার জন্য বরাকে সরকার পরিচালিত বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদগুলো প্রায় ৮০শতাংশ শূন্য। আধিপত্যের ষড়যন্ত্রে অগ্রগতির পথে অস্তিত্ব সংকটে।

যেকোনো ভাষা আয়ত্ব করা খুবই ভালো। তবে সেটা কোন ভাবেই নিজের মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে নয়। আজ ভাষার অস্তিত্ব যে আগ্রাসিত হচ্ছে এর পেছনে কিন্তু আমরাই দায়ী। আমরা যখন নিজেদের উনিশের উত্তরাধিকার বলে দাবি করি কিন্তু আমাদের সন্তানেরাই বাংলা জানে না। সুস্থ পরিকাঠামোর মাধ্যমে মাতৃভাষা চর্চার জন্য প্রয়োজন নতুন কর্মপদ্ধতি। তাই জরুরি ফ্যাসিবাদী ভাইরাসকে উপড়ে ফেলা। নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে ১৯৬১,৭২,৮৬,৯৬র রক্তাক্ত ইতিহাস। পরিচয় করাতে হবে এনআরসি,ডিটেনশন ক্যাম্প, ডি-ভোটার দিয়ে কিভাবে আমাদের টুকরো টুকরো করার কথা। ১৯শে মে মানে প্রতিরোধ এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম। বাঙালি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়তে হবে আধিপত্যবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে। নইলে সমবেত আত্মহনন ছাড়া উপায় নেই। ভাষা আন্দোলনের চলমান সংগ্রামী চেতনায় আমাদের বিবেক জাগ্রত হোক – কাঙ্ক্ষিত আশা এখন। যেভাবে প্রখ্যাত কবি শ্রী সুরেশ চন্দ্র চক্রবর্তী তাঁর 'শহীদ তর্পন' কবিতায় বলেছেন —
আমরা নওজোয়ান আমরা নওজোয়ান/আজি গাহিব শহীদ তর্পন গান/আমরা নওজোয়ান।/ ভাষা বেদি মূলে দিল যাঁরা প্রাণ/অপূর্ব আত্ম-বলি-দান/গাহিব তাঁদের তর্পন-গান/আমরা নওজোয়ান।/ ওই দেখো কমলা, শচীন্দ্র, কানাই,/হিতেশ, সুকোমল আর চন্ডী ভাই/কুমুদ, সুনীল, বীরেন, সত্যেন,/শহীদ তরণী – করে আনচান।/দুঃখ আজি নয় নয় রে শোক/ পাষাণেতে বাঁধ বাঁধেরে বুক/ শহীদ - তর্পণ- শপথ আজি—/ 'ভাষার লাগি দিব রে জান।'/ আমরা নওজোয়ান। (ভাষা আন্দোলনের শহীদ সত্যাগ্রহী)

বার্তালিপি ১৬-০৫-২০২৩ ইং 

Sunday, July 16, 2023

আধুনিক দাসত্ব : 'স্বাধীনতাহীনতায়' সভ্য সমাজ


স্বাধীনতা এবং দাসত্ব জীবনের দু’টি অঙ্গ। কবি এক জায়গায় লিখেছেন, ‘দাসত্ব শৃঙ্খল বলো কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়?’ কবি রঙ্গলাল তাঁর কবিতায় মানব জীবনের একটি গভীর আকাঙ্ক্ষার কথা ব্যক্ত করেন। সম্ভবত স্বাধীনতার এ আকাঙ্ক্ষা মানুষের সহজাত। প্রভাবশালী দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট তাঁর বিখ্যাত 'থিওরি অব হিউম্যান নেইচার'-এ বলেন, কর্ম সম্পাদনের জন্য দরকার বাইরের সবকিছু থেকে মুক্ত হওয়া। গত কয়েক বছরে গোটা বিশ্বে 'আধুনিক দাসত্ব' ব্যবস্থা বেড়ে গিয়েছে। প্রায় প্রতিদিন বিশ্বের বহু শিশু, নারী, পুরুষ, প্রবীণ এই সভ্যযুগীয় দাসপ্রথার বলি হচ্ছেন। কখনও গোচরে, কখনও অগোচরে। গ্লোবাল স্লেভারি ইনডেক্স ২০২৩-এ আধুনিক দাসদের বসবাসকারী দেশগুলির একটি তালিকা তৈরি করা হয়। এরা এমন মানুষ, যাদের কাজের কোনও কর্মঘণ্টা নেই, নেই কোনও নির্দিষ্ট বেতনও। সূচকে বলা হয়েছে, বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ দাসের মতো জীবনযাপন করছে। আধুনিক দাসত্বের ব্যাখ্যা হলো — জোরপূর্বক শ্রম, ঋণ, জোরপূর্বক বিয়ে-দাসত্ব, মানব পাচারের মতো কয়েকটি প্রথা। দাসত্বের সংজ্ঞা এবং প্রকৃত চিত্রের সাথে এর সামঞ্জস্য নেই। কারণ, দাসত্বের শৃঙ্খল এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লুক্কায়িত। যে মানুষ নিজেকে ‘স্বাধীন’ বলে দাবি করছে, সে দিনের শেষে দেখতে পাচ্ছে এক অদৃশ্য শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রিত করছে তাকে।

বিশ্বজুড়ে আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকা পড়া মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী ও শিশুরা। সভ্যসমাজের আধুনিক দাসত্বের নেপথ্যে রয়েছে, দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে শ্রমিক হতে বাধ্য করা, ঋণখেলাপিকে ক্রীতদাসে পরিণত করা, জোর করে বিয়ে, সাধারণ দাসত্ব এবং দাসত্বের অনুরূপ কাজকারবার। রিপোর্টে বলা হয়েছে, আধুনিক দাসত্বের মধ্যে ২ কোটি ৭৬ লক্ষ মানুষ বাধ্যতামূলক শ্রমে যুক্ত। আর, জোরপূর্বক বিবাহের শিকার হয়েছেন ২ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ। আধুনিক যুগীয় দাসত্ব চোখে দেখা যায় না। খালি চোখে বোঝাও যায় না। এই ব্যবস্থা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও সমাজের গভীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু খণ্ডাংশে নয়, গোটা পৃথিবীতেই সূক্ষ্মভাবে গোপনে আমাদের দাসত্বে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রতিদিন মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে, বাধ্য করা হচ্ছে অথবা জোর করে শোষিত হওয়ার পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে মানুষকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, যেখান থেকে তার নিষ্কৃতি বা পরিত্রাণের কোনও উপায় নেই।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, 'আধুনিক দাসত্ব সরল দৃষ্টিতে লুকিয়ে আছে। এটি বিশ্বের প্রতিটি কোণে জীবনের সাথে গভীরভাবে জড়িত। প্রতিদিন, মানুষ প্রতারিত, জোরপূর্বক বা শোষণমূলক পরিস্থিতিতে পড়তে বাধ্য হচ্ছে।' ‘গ্লোবাল স্লেভারি ইনডেক্স’ (Global Slavery Index) প্রকাশ করে ওয়াক ফ্রি জানিয়েছে - ‘২০২১ সালে ‘আধুনিক দাসত্বের’ শিকার হয়েছেন প্রায় প্রায় ৫ কোটি মানুষ। অর্থাৎ, সারা বিশ্বে প্রতি ১৫০ জন পিছু ‘আধুনিক দাসত্বের’ শিকার হয়েছেন ১ জন মানুষ।' যার মধ্যে ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষই বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের নাগরিক। সমীক্ষা বলছে, প্রতিদিন আমরা যেসব সামগ্রী কিনি কিংবা যেসব পরিষেবা ব্যবহার করি সেগুলি আমাদের ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয় অথবা আমাদের ব্যবহারের বুদ্ধি অর্থাৎ প্রস্তাব দেওয়া হয়। আমরা টেরই পাই না, এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে গোপন মানব শ্রমের মূল্য। সমীক্ষা বলছে, সভ্যযুগীয় দাসত্বে ২ কোটি ৭৬ লক্ষ মানুষকে জোর করে শ্রমিকের কাজ করানো হয়। ২ কোটি ২০ লক্ষ বিয়ে দেওয়া হয় পাত্র বা পাত্রীর অমতে। অন্যভাবে বলা যায়, প্রতি দেড়শো জনের মধ্যে একজনের বিয়ে দেওয়া হয় জোর করে।

স্বাধীনতার ৭৫ বছরে অমৃতকাল উপস্থিত হয়েছে বলে হাঁক শোনা যায় প্রায়শই। কিন্তু আধুনিকতার যাবতীয় উপকরণ কোলে সাজিয়ে বসে থাকলেও, দাসত্বের শিকল থেকে আজও মুক্ত হতে পারল না ১৪০ কোটির দেশ (Modern Slavery)। বিশ্ব দাসত্ব সূচক অন্তত তেমনই জানান দিচ্ছে। ভারতে আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়েছে বলে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে তাতে (Global Slavery Index 2023)। প্রতিবেদন বলছে, ২০ টি ধনী দেশের মধ্যে ছটি দেশের আধুনিক দাসত্বের হার সব থেকে বেশি। এক কোটি দশ লক্ষ নিয়ে এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভারত। তারপরেই রয়েছে চিন। সেখানে আধুনিক দাসত্বের মধ্যে থাকা মানুষের সংখ্যা ৫৮ লক্ষ। রাশিয়ায় ১৯ লক্ষ, ইন্দোনেশিয়ায় ১৮ লক্ষ, তুরস্কে ১৩ লক্ষ এবং আমেরিকায় সংখ্যাটা ১১ লক্ষের মতো। এইসব দেশগুলিতে হয় জোর করে শ্রমে নিয়োগ করা হচ্ছে কিংবা জোর করে বিবাহে বাধ্য করা হচ্ছে।

আধুনিক দাসত্বের নিরিখে কোন দেশ, কোন জায়গায় রয়েছে, তার তিনটি পর্যায় তৈরি করা হয়। এর একেবারে উপরের দিকে রয়েছে উত্তর কোরিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, তাজিকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, রাশিয়া, আফগানিস্তান, কুয়েত, মৌরিতানিয়া, ইরিত্রিয়া। দাসত্ব যেখানে নেই বললেই চলে, সেই দেশগুলি হল, সুইৎজারল্যান্ড, নরওয়ে, জার্মানি, হল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, আয়ারল্যান্ড, জাপান এবং ফিনল্যান্ড। যে সমস্ত দেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ আধুনিক ক্রীতদাস হয়ে রয়েছেন, তাদের নিয়ে তৃতীয় পর্যায় তৈরি করা হয়েছে। সেই দেশগুলি হল, ভারত, চিন, উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নাইজিরিয়া, তুরস্ক, বাংলাদেশ এবং আমেরিকা। রিপোর্টে বলা হয়েছে, সামগ্রিক ভাবে ধরলে, এই সমস্ত দেশে প্রতি তিন জন নাগরিকের মধ্যে দু'জন আধুনিক ক্রীতদাস, সামগ্রিক হিসেবে যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।

১৯৭৬ সালে ভারতে অঙ্গীকারবদ্ধ শ্রম বিলোপ আইন পাস হয়। তার আওতায় জোরপূর্বক শ্রমদান এবং অঙ্গীকারবদ্ধ শ্রম নিষিদ্ধ হয়। এ নিয়ে প্রত্যেক রাজ্যের সরকারের উপর ভিজিল্য়ান্স কমিটি গড়ার দায়িত্বও বর্তায়। ১৯৮৫ সালে সংশোধন ঘটিয়ে ঠিকাশ্রমিক এবং পরিযায়ী শ্রমিকদেরও সেই আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সুপ্রিম কোর্টও জানিয়ে দেয়, ন্যূনতম মজুরি না মেটানোও জোরপূর্বক শ্রমের মধ্যে পড়ে। কিন্তু দাসত্ব বিলোপের পক্ষে এই আইন আদৌ কার্যকর করা সম্ভব কিনা, প্রশ্ন উঠতে শুরু করে গোড়া থেকেই।  আইনি ফাঁকফোকর, সরকারি উদাসীনতা, দুর্নীতি, রাজনীতিকদের মধ্যে সদিচ্ছার অভাবে এই আইন সার্বিক ভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি বলে মত সমাজকর্মীদের। অপরাধ বলে গন্য করা হলেও, জোরপূর্ব শ্রমে কোপ বসাতে গেলে দরিদ্র-নিম্নবিত্ত তথা মধ্যবিত্ত ঘরের পেটে টান পড়বে। তার সমাধান না খুঁজে, এই আইন কখনও কার্যকর করা সম্ভব নয় বলে ২০১৭ সালে কেন্দ্রের কাছে চিঠিও পাঠান সমাজ সচেতন মানুষেরা। শুধু তাই নয়, কেন্দ্র যে নয়া শ্রম আইন চালু করার দিকে এগোচ্ছে, তাতে সংগঠিত এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রে মালিক পক্ষের হাত আরও শক্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সমাজকর্মীরা। ভারতে একাধিক শ্রম আইন প্রণয়ন করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু 'আধুনিক দাসত্ব'-র বলয় ভাঙা এখনও সম্ভব হচ্ছে না।

দাসত্ব নিরোধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘোষণা এবং আইনের কোনো অভাব নেই। শুধু অভাব এর বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়ন করার ইচ্ছা। এর পেছনে সব সময় কাজ করছে সংঘাত, সংঘর্ষ, দুর্নীতি, দারিদ্র্য এবং নানা সামাজিক পার্থক্য। ক্ষমতা, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশ স্থাপন এবং স্বার্থ উদ্ধারও এর সাথে সম্পৃক্ত। এর ফলে দাসত্ব প্রথা নানা ঢঙে চালু রয়েছে এবং সারা বিশ্বে বিস্তার লাভ করেছে।
এর অবস্থান এখন এমন দৃঢ় যে, শিকার ও শিকারি উভয়েই এর আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে; কিন্তু বেরিয়ে আসতে পারছে না। অথচ দাসত্ব নির্মূল হওয়া প্রয়োজন। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে দু’টি বিষয়ের দিকে প্রথমেই মনোযোগ দিতে হবে, তা হলো পক্ষপাত ও অসমান। সামাজিক জীবনে অর্থনৈতিক শোষণকে বন্ধ করে সমতা রক্ষা করা হলে দাসপ্রথা চালু রাখা সম্ভব হবে না। সমাজ এবং সরকার যদি দুর্নীতি দমনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে এবং সেই মোতাবেক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে, তবে দাসত্ব তার সব অবয়ব নিয়ে হারিয়ে যেতে বাধ্য হবে। নতুবা এই অভিশাপ সমাজে প্রবলভাবে বৃদ্ধি বা স্থান নিয়ে থাকবে এবং পরিশেষে চলমান সামাজিক অশান্তির কারণ হবে।

একটা সময় মনে করা হয়েছিল, সেটা উনিশ শতকের শেষ দিক; যে পৃথিবী থেকে দাসপ্রথা বিদায় নিয়েছে। কিন্তু সেই ধারণা সত্য নয়। এই আধুনিক যুগও সেই অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়নি। পুঁজিবাদী ও নয়া উদারবাদ বিশ্বব্যবস্থার কালেও দাসত্বের শেকলে বন্দি বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষ। প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে রাষ্ট্রসংঘ সম্মেলনে বিশ্বের মহান নেতারা আগামীকালের জন্য যে লক্ষ্যগুলি রেখেছিলেন, তার মধ্যে ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে আধুনিক দাসপ্রথা, ফোর্সড লেবার এবং মানব পাচারের মতো কলঙ্কজনক ঘটনাগুলিকে মুছে দেওয়া, কিন্তু দুঃখের বিষয় তারপরেও আধুনিক দাসদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলছে। আধুনিক দাসত্ব এখনো খুব সহজ ভাবেই মানুষের সভ্যতার মধ্যে লুকিয়ে আছে। এবং সেটা মানুষের জীবনের সঙ্গে বিশ্বের প্রতিটি কোণে গভীরভাবেই রয়েছে। সেই কারণেই প্রতিদিন, মানুষ প্রতারিত হচ্ছে, জোর করে মানুষকে দাসত্ব করতে বাধ্য করা হচ্ছে।বেঁচে থাকার জন্য কাজ করে মজুর, কিন্তু কাজই জীবনীশক্তি কেড়ে নিচ্ছে। এমনকি জীবনও। আর আমাদের প্রয়োজনে সুতা থেকে বাড়ি তৈরিতে এক একটা বালু কণা সহ সব পণ্যে লেগে থাকছে সেই পীড়নের দাগ।

Friday, July 7, 2023

সমকামিতা 'বিকৃত যৌনাচার' নয়


সমকামিতা কোথাও থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেনি, বরং সমকামিতা সভ্যতার সব সময়ই ছিল। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই সমকামীদের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাণী জগতের সহস্রাধিক প্রজাতির মধ্যে যে সমকামিতার অস্তিত্ব পাওয়া যায় তা আজ প্রমাণিত। মানব সভ্যতাও কিন্তু এই ধারার ব্যতিক্রম নয়। এই সমকামিতা একুশ শতকের কোন বিষয় বা কলি যুগের কোনও পাপ নয়। মানব সভ্যতার প্রাচীন ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় সমকামিতার অস্তিত্ব অনেক পুরনো। বিভিন্ন কালে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে কেমন ছিল সমকাম ও সমকামী সম্পর্কের বিন্যাস। গ্রীক সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে রোমান সাম্রাজ্য, 'সাইবেরিয়ান সামানদের (Shaman) মধ্যে সমকামিতা ছিল, নেটিভ আমেরিকানদের মধ্যে, আফ্রিকান ট্রাইবে, সমকামিতা ছিল চৈনিক রাজবংশে, সমকামিতা ছিল আরব কিংবা ভারতীয় সভ্যতায়। এমন কোনো সভ্যতার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, যেখানে সমকামিতা নেই, কিংবা ছিল না। সেই প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর তাবৎ সাহিত্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, শিল্পকলা, দর্শন, পুরাণ কিংবা প্রত্নতত্ত্ব বিশ্লেষণ করেই গবেষকেরা জেনেছেন, সমকামী মনোবৃত্তিসম্পন্ন মানুষেরা ইতিহাসের প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি মুহূর্তে এবং প্রতিটি স্থানেই ছিলেন।'

‘সমকাম’- শব্দটি বিশ্লেষণ করলে দুটি পদ পাওয়া যায়, সম এবং কাম। সম মানে হচ্ছে একই এবং কামী মানে হল বাসনাকারী। অতএব সমকামী কথাটির মানে একই রকম বাসনাকারী। সমকামী শব্দটির উৎস সংস্কৃত ‘সমকামীন্’ থেকে। যার অর্থ সম লিঙ্গের ব্যক্তির প্রতি আকর্ষণবোধকারী ব্যক্তি। প্রাচীনকালে সমকামীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হত ‘ঔপরিষ্টক’ -শব্দটি। বাৎস্যায়ন তাঁর কামসূত্র- এর ষষ্ঠ অধিকরণের নবম অধ্যায়ে ঔপরিষ্টক শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সমকামিতার ইংরেজি প্রতিশব্দ Homosexuality; ১৮৬৯ সালে Karl Maria Cutberry তাঁর লেখা একটি আইনের পুস্তিকায় এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। গ্রিক 'হোমো' এবং ল্যাটিন 'সেক্সাস'- এই দুই শব্দের সমন্বয়ে Homosexual শব্দটি গঠিত হয়।

প্রকৃতিতে মানুষ সহ নূন্যতম প্রায় ১৫০০ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে সমকামী আচরণ দেখা যায়। কারণ প্রতিটা সিস্টেম নিজেকে টিকায়ে রাখার স্বার্থেই ‘সিস্টেম ব্যাগ’ ব্যবহার করে, যে কারণে পৃথিবীর জনসংখ্যা স্বাভাবিক রাখতে বা ন্যাচারাল ব্যালেন্স ধরে রাখতে বন্যা, ভূমিকম্প, বনে আগুন লাগা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা যায় এবং শিশু উৎপাদনকারী প্রজাতির পাশাপাশি প্রকৃতিতে শিশু জন্মদানে ‘অক্ষম’ প্রজাতির অস্তিত্ব থাকে। তবে এইক্ষেত্রে আপনি বলতে পারেন, ধর্ষণও প্রাকৃতিক বিষয়। শিশুকাম বা অযাচারও প্রাকৃতিক বিষয়। প্রকৃতিতে আছে বলেই সমকামিতার মত ‘বিকৃত যৌনাচার’ মেনে নিতে হলে ধর্ষণও মেনে নেওয়া উচিত, শিশুকামও মেনে নেওয়া উচিত। মজার বিষয় হচ্ছে এইসব কুযুক্তিদাতারা খেয়াল করেন না, সমকামিতার সাথে ধর্ষণ বা শিশুকামের অন্যতম প্রধান পার্থক্যের জায়গা হচ্ছে, ধর্ষণ এক ধরণের নির্যাতন; এক পক্ষকে নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করার নাম ধর্ষণ। শিশুকামও ধর্ষণের মতই নির্যাতন, কারণ আধুনিক পৃথিবীর বেশিরভাগ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী ১৬ বা ১৮ বছরের নিচে কোনো মানুষকে আমরা মতামত দেয়ার যোগ্য বা সমর্থ মানুষ বলে বিবেচনা করি না। যে কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১৮ বছরের নিচের মানুষদের রাষ্ট্রীয় আইনে ভোট দেওয়ার বা গাড়ি চালানোর বা বিয়ে করার অনুমতি নাই। অপরপক্ষে নিজ ইচ্ছায় দ্বিপাক্ষিকভাবে দুইজন সমকামি মানুষ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা কোনোভাবেই নির্যাতনের সংজ্ঞায় পড়ে না। ৭০ এর শেষ দিকে দার্শনিক মিশেল ফুকো উনার বিখ্যাত ‘দ্যা হিস্ট্রি অভ সেক্সুয়ালিটি’ (১৯৭৮) বইতে যখন বললেন, মানুষের যৌনতা অনেকাংশেই সমাজের নির্মাণ, একমাত্র তখনই সমকামিতাকে সমাজের ‘তৈরি করা’ অপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে চালানোর চল শুরু হয়।

সমকামকে অপ্রাকৃতিক বলে এর বিরুদ্ধে ‘কু’যুক্তি দেয়া মানুষরা আরও বলে থাকেন, মানুষের পায়ুপথ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের উপযুক্ত না। যদি সমকাম প্রাকৃতিক বিষয় হত, তাহলে নারীদেহের যোনির মতই পায়ুপথ সঙ্গমের জন্য তৈরি হত, পায়ুপথে যোনির মত লুব্রিকেন্ট থাকতো, পুরুষের লিঙ্গ ধারণ করার আকার থাকতো ইত্যাদি ইত্যাদি। যারা সমকামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেছেন, তারা ধরেই নিয়েছেন, পৃথিবীর সকল সমকামী মানুষ শুধুমাত্র পায়ুপথেই যৌন সঙ্গম করতেই জন্মগ্রহণ করেছেন।প্রথমতঃ, পায়ুপথে যৌন সঙ্গমের উপর শুধুমাত্র সমকামী পুরুষদের একচ্ছত্র দাবী নাই, পায়ুপথে বিষমকামী নারী-পুরুষও যৌন সঙ্গম করেন। দ্বিতীয়তঃ, পৃথিবীতে শুধু সমকামী পুরুষ না, সমকামী নারীও আছেন, একই শরীরে নারী ও পুরুষ উভয় লিঙ্গ ধারণ করা মানুষ আছেন, নারী শরীরে পুরুষের মন এবং পুরুষ শরীরে নারীর মন নিয়ে বাস করা মানুষ আছেন- যাদের বেশিরভাগই পায়ুপথে সঙ্গম করেন না।

জার্নাল অভ সেক্সুয়াল মেডিসিনে প্রকাশিত ইন্ডিয়ানা এবং জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ১৮ থেকে ৮৭ বছরের প্রায় ২৫ হাজার সমকামি পুরুষ নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখান, উনাদের মধ্যে মাত্র ৩৬ শতাংশ পুরুষ পায়ুকামের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। বাকি সবার যৌন আচরণের মধ্যে শুধুমাত্র নিজেদের সঙ্গীদের চুমু খাওয়া বা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরা বা একে অন্যকে মাস্টারবেশান করিয়ে দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। একইসাথে ২০১৭ সালে সেইজ জার্নালসে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে ওহায়ো স্টেট ইউনিভার্সিটি, ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অভ উইনচেস্টারের গবেষকরা দেখান, পায়ুকাম শুধুমাত্র সমকামী পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। গবেষণায় অংশ নেওয়া বিষমকামী পুরুষদের মধ্যে ২৪ শতাংশই তাদের নারী সঙ্গীদের সাথে বিভিন্ন সময় পায়ুপথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন।  

পায়ুকামের সাথে যৌনবাহিত রোগ, বিশেষতঃ এইচ-আই-ভি এইডসের প্রথম সম্পর্ক পাওয়া যায় ৮০র দশকে। কিন্তু আগেই বলেছি, পায়ুকাম শুধুমাত্রই সমকামীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি না। আজ থেকে ১৭০০ বছর আগের পেরুভিয়ান মৃৎশিল্প থেকে শুরু করে, ১৩শতকের ভারতীয় খাজুরাহো মন্দিরের ভাস্কর্য ও স্থাপত্য, ১৬ শতকের চীনা এবং জাপানিজ কারুশিল্পে বা ৫০০ বি-সির গ্রীক ভাস্কর্যে বিষমকামী নারী-পুরুষের পায়ুপথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের প্রমাণ পাওয়া যায়। সুতরাং পায়ুকামের জন্য সমকামীদের একপাক্ষিকভাবে দায়ী করা হাস্যকর। পরবর্তীতে, অর্থাৎ ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের শুরুর দিকে বিভিন্ন গবেষণায় এইচ-আই-ভি এইডসের সাথে পায়ুকামের সম্পর্ক থাকার ‘মিথ’ও ভেঙ্গে যায়। পাবমেড এবং আমেরিকান সাইকোলজিকাল এ্যাসোসিয়েশানের জার্নালে প্রকাশিত ২০০০ সালের গবেষণায় দেখা যায় এইচ-আই-ভি নেগেটিভ ১২৬৮ জন বিষমকামী নারীর ৩২ শতাংশই তাদের পুরুষ সঙ্গীর (বা সঙ্গীদের) সাথে নিয়মিতভাবে পায়ুপথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন।

এছাড়াও আরেকটা বিষয় উল্লেখযোগ্য, পায়ুকামই যৌন রোগ ছড়ানোর একমাত্র মাধ্যম না। বেশ্যালয়ের মারফত বিষমকামী বহুগামী নারী ও পুরুষের মাধ্যমেই সমাজে সর্বোচ্চ হারে যৌন রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে। ‘সমকামীরা যৌন রোগ ছড়ান’ এমন মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে নাহয় সমকামিতাকে রাষ্ট্রীয় আইন আর ধর্মীয় চোখ রাঙানি দিয়ে বন্ধ করতে পারলেন, সকল সমকামীকে আগুনে পুড়িয়ে, শূলে চড়িয়ে, বরাকের জলে ডুবিয়ে মেরে ফেলতেও সমর্থ হলেন, কিন্তু আমাদের অতি স্বাস্থ্যসচেতন পবিত্রতার ধ্বজাধারী কুলীন বংশীয় সমাজপতিরা কি বেশ্যালয় বন্ধ করার সাহস রাখেন? বিষমকামী পুরুষের বহুগামিতা আর পায়ুকাম কি পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র আজকের দিন পর্যন্ত আইন করে বন্ধ করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে? দেখায় নাই। কারণ পৃথিবী এবং পৃথিবীর রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় আইন শুধুমাত্র পুঁজিবাদী অর্থনীতি কেন্দ্রিক, শুধুমাত্রই সংখ্যাগুরু বিষমকামী শ্রমিক পুরুষের পক্ষে, সংখ্যালঘু এবং সন্তান উৎপাদনে অক্ষম নারী ও সমকামী সম্প্রদায়ের প্রতি এই অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার কোনো মমতা, কোনো ন্যায় বিচার কাজ করে না।

যদিও আগেই বলেছি, সমকামিতা প্রাকৃতিক বিষয়। কিন্তু সমকামিতা শুধুমাত্রই বা একচ্ছত্রভাবে প্রাকৃতিক বিষয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমকামিতা সামাজিকও বটে। মিশেল ফুকোর কথা আগেই উল্লেখ করেছি। ফুকো ছাড়াও ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ হোমোসেক্সুয়ালিটি’ (১৯৯০) বইয়ে ডেভিড হ্যালপেরিন দাবী করেন সমকামিতা মূলতঃ সমাজের তৈরি করা মানসিক বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও সোশাল কনস্ট্রাকশনালিজম স্কুল অভ থটের অধীনে থাকা জন উইংকলার ‘কনস্ট্রেইন্ট অভ ডিজায়ার’ (১৯৯০) বইতে দেখান সমকামিতা কোনো প্রাকৃতিক বিষয় না, বরং সমকামিতা মানুষের সামাজিক চরিত্র। ফুকো বা হ্যালপেরিন বা উইংকলারের এই দাবীর পিছনে এ্যারিস্টোটোলের বক্তব্য ‘প্রকৃতি উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো কিছু সৃষ্টি করে না’- এই যুক্তির ভূমিকা আছে অবশ্যই। এই স্কুল অভ থটের দার্শণিকরা বিশ্বাস করেন সমকামী বা বিষমকামী হওয়া মানুষের নিজের সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ চাইলেই একজন সমকামী মানুষকে বিষমকামী এবং বিষমকামী মানুষকে সমকামী বানানো যায়।  

খাজুরাহো থেকে গ্রিসের লেসবস- পূর্ব থেকে পশ্চিম- কোথায়, পৃথিবীর কোন্‌ অঞ্চলে, কোন্‌ ধর্মে, কোন্‌ রঙের মানুষের মধ্যে সমকামিতা নাই? কোথায় উভলিঙ্গের মানুষ নাই? কোথায় কোন্‌ সংস্কৃতিতে রক্ষণশীল পুঁজিপতিদের চোখ রাঙানো অতিক্রম করে সমাজে নারী পুরুষের বাইনারি লিঙ্গ পরিচয়ের বাইরেও কোনো সংজ্ঞার অধীনে না থাকা মানুষদের গল্প শোনা যায় নাই? ব্যক্তিগতভাবে আমি একই সাথে এই বাক্য বিশ্বাস এবং অবিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি, সমকামিতা একই সাথে প্রাকৃতিক এবং সামাজিক। অর্থাৎ সমকামিতা যেভাবে প্রকৃতির মাধ্যমে জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়, ঠিক একইভাবে সমকামিতা সমাজের মাধ্যমেও তৈরি হতে পারে।

সমকামিতা সম্পর্কে আমাদের সমাজ হাজারো কুসংস্কারে আবদ্ধ। এমনকি যার কিছু বইপত্র পড়ে রাতারাতি প্রগতিশীল বনে গেছেন, তারাও সমকামিদের সম্পর্কে ঘৃণাত্মক মনোভাব পোষন করেন। সমকামিরা সামাজিক অবদমনের কারণে বিভিন্ন প্রকার অপরাধপ্রবনতা এবং একই সাথে আত্মহত্যাপ্রবনতা এবং বিভিন্ন মনোবৈকল্যের শিকার হতে পারেন। এর ভেতরে থাকতে পারে ড্রাগসে আসক্তি, অবদমনের কারনে যৌনতা বিকৃতির দিকে মোড় নেয়া ইত্যাদি। এর পেছনে সমকামিতাকে দায়ী করা যাবে না, সামাজিক অবদমন এবং ধর্মীয় দৃষ্টিতে পাপবোধের সৃষ্টিই এর কারণ। আমাদের সমাজে এলজিবিটি সম্প্রদায়কে মেনে নেয়ার প্রবণতা একেবারে নেই বলেই তাদের মানসিক ক্ষরণের মাত্রা বেশি। হোমোফোবিয়ার যে নেতিবাচক প্রভাব এলজিবিটি সম্প্রদায়ের উপর পড়ে, তা থেকে তাদের বাঁচাতে সবচেয়ে কার্যকর হলো তাদের বন্ধু ও পরিবারের সহায়তা। একজন সমকামি ব্যক্তির পরিবার যদি তাকে মানসিক সাপোর্ট দেয়, তার পাশে থাকে তাহলে হোমোফোবিয়ার প্রভাব অনেকটাই দূর হতে পারে।

এক্ষেত্রে সমকামী ব্যক্তির বাবা-মায়ের ভূমিকা অপরিসীম। বাবা-মা একজন সন্তানের জীবনে প্রথম শিক্ষক। সন্তানের সাথে সমকাম বিষয়ে খোলাখুলি আলাপ এখন সময়ের দাবি। আপনি যদি জানেন আপনার সন্তান সমকামী তবে তাকে সেই মানসিক সাপোর্ট দেয়াটা আপনার দায়িত্ব। আপনার সন্তান কোনোভাবে বুলিয়িং-এর শিকার হচ্ছে কি না, কোনোরকম মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে কি না, তার কাউন্সেলিং প্রয়োজন কি না এসব বিষয়ই খেয়াল রাখতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে সমকামিতা প্রাণী চরিত্রের স্বাভাবিক একটি বৈশিষ্ট্য। আমাদের সকলের মনে রাখতে হবে একটা স্বাধীন সভ্য দেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা প্রত্যেক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সমকামিদের সামাজিক ভাবে স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন এটা যেকোন সভ্য সমাজের দায়িত্ব। সমকামিতা সমকামিরা নিজে নির্ধারন করে না। প্রকৃতি তথা সমাজ তাদের ভেতরে সমকামিতার বীজ বপন করে। একজন সমকামি পুরুষের নারীর প্রতি প্রাকৃতিকভাবে আকর্ষন নাই, যৌন আকাংখা নাই। এই দোষে নিশ্চয়ই একজন মানুষকে এক ঘরে করে রাখা বা বয়কট করা কোন মতেই মানবিক আচরন হতে পারে না। সমকামীদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে আত্মহননের পথে। আর এগুলোতে পুরোমাত্রায় ইন্ধন যুগিয়ে চলেছে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় সংগঠন ও রক্ষণশীল সমাজ। দুইজন সমকামী মানুষ এক হতে চাইলে আমাদের এতো গাজ্বালা কেন ? মানুষ সামাজিক জীব। এই সামাজিক জীব হিসেবে সমাজ ও প্রকৃতিগত বিষয়কে 'নাক সিটকানো' কোন সুস্থ মগজসম্পন্নের কাজ হতে পারে না।
দৈনিক বার্তালিপি ০৭/০৭/২০২৩

Wednesday, June 28, 2023

ডিলেমিটেশন : যোগ বিয়োগে নতুন সমীকরণ

যদি সত্যি বলতে হয়, বোড়োরা যা করে দেখালো বরাকের প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ মানুষের ঝুলিতে মিলল একরাশ দুর্ভোগ। না না ভুল বুঝবেন না। হিংসা ও নয়। আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের শিকার আরেকবার, তা প্রমাণিত। প্রতিটা ভাষাভাষী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও তাদের অধিকার অটুট থাকা এটা সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু কপাল পুড়ার ক্ষেত্রে বারবার বরাকই বা কেন? বর্তমান আসামে দ্বিতীয় সরকারি বোড়ো ভাষা। জনসংখ্যার দিক থেকে বরাক পিছিয়ে না পড়লেও আসন সংখ্যায় কমে এখন তেরো। আসলে এই ছক আগে থেকেই আঁকা ! আসন সংখ্যা কমানোর পেছনে কোন যুক্তিসংগত কারণ এখনও মেলেনি। আমরা আজ ইতিহাসের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া সময়ে। আমাদের উচিত ছিল সেদিনই যেদিন বদরপুরকে কাছাড়ের আওতায় আনা হয়। দেশভাগের পূর্ববর্তী সময় থেকেই বদরপুর ছিল করিমগঞ্জের সঙ্গে। তবে এটা কি বলা যায় - 'বদরপুরের দুর্গ কে কাছাড়ি রাজার দুর্গ' বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা ?

আমাদের বাসস্থান আসামে হলেও অসমিয়া আগ্রাসনের শিকার বহু আগে থেকেই। ১৯৬১ সালের ১৯শে মে ১১ টি তরতাজা প্রাণ শহীদ হন শিলচরে। ১৯৭২ এর ১৭ই আগস্ট করিমগঞ্জে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু চক্রবর্তী)। ১৯৮৬র ২১ জুলাই করিমগঞ্জে শহীদ হন জগন্ময় ও যীশু। ১৯৯৬ এ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার রক্ষায় করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে শহীদ হন সুদেষ্ণা সিনহা। ভাষার অধিকার রক্ষায় ১৫ জন শহিদ হয়েছেন ঠিকই কিন্তু আসামে ভাষিক সংখ্যালঘুরা এভাবে বারবার ক্লান্ত হচ্ছেন অসমিয়া আগ্রাসন দ্বারা। নিপীড়িত হচ্ছেন ডি–ভোটারের তকমায় ডিটেনশন ক্যাম্পে আবার কখনো বা  উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির সুকৌশল ভাষিক আগ্রাসন নীতির মাধ্যমে অথবা নতুন প্রকৌশল ডিলিমিটেশনে । 

জাতীয়তাবোধ জাগরনের পেছনে যে উপাদানটি সার্বিক প্রয়োজন সেটি হলো এক সম্মিলিত ঐতিহ্যবোধ। 'শহীদ তীর্থ বরাক' এ এতোজন ভাষা শহীদ হয়েও আমরা এখনও উত্তরাধিকার হতে পারলাম না। আমরা ক্রমশঃ পরিচয়ে বিভক্ত হচ্ছি হিন্দু-মুসলমানে। আর সুযোগসন্ধানীরা সেই সুযোগে আঁতে ঘা দিচ্ছে একের পর এক কাঁটা বিদ্ধ করে। আমাদের দুটি আসন কমিয়ে গলা টিপার আরেক দফা এগোলো আর কি! বিধানসভা আসন সংখ্যাভিত্তিক কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের যে বরাদ্দ থাকে, তা কমবে। সুতরাং খুবই পরিতাপের বিষয় যাঁরা বলছেন, এই ডিলিমিটেশন প্রস্তাবে বরাকের কোনো ক্ষতি হবে না, তাঁরা কোন ভিত্তিতে বলছেন, তাঁরাই জানেন! জার্সি বদলিয়ে কথা ছিল পরিবর্তনের জোয়ারে ভাসিয়ে দেয়ার কিন্তু আগ্রাসন অক্ষরে অক্ষরে পালিত তার পদচিহ্ন প্রতিয়মান।

আসামের দক্ষিণাঞ্চল বরাক উপত্যকায় যথাক্রমে তিনটি জেলা কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি। আয়তনের দিক থেকে প্রায় ৬৯২২ বর্গ কিলোমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বরাক উপত্যকার জনসংখ্যা ছিল ৩৬,২৫,৩৯৯, তা বর্তমানে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষের অধিক। এই বিশাল জনসংখ্যবহুল উপত্যকায় এখন পর্যন্ত প্রতিনিধিত্ব করছেন ১৫ জন বিধায়ক। অন্যদিকে বিটিআর অটোনোমাস রিজিওন (Bodoland Territorial Region ) যথাক্রমে চারটি জেলা বাকসা, চিরাং, কোকরাঝাড় এবং উদালগুড়ি। আয়তনের দিক থেকে বিটিআর ৮৯৭০ বর্গ কিলোমিটার। ২০১১ মতে জনসংখ্যা প্রায় ৩১,৫৫,৩৫৯। বিধানসভায় প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন ১২জন বিধায়ক। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো এই ডিলিমিটেশনে আরও দুইটি আসন বাড়লো কিভাবে? ডিলিমিটেশন হয় সাম্প্রতিক লোক গণনা মতে জনসংখ্যার ঘনত্বের উপর (Delimitation reflect demographic fluctuations. Means the most current census serves as the basis for redrawing boundaries namely population density.) অর্থাৎ আয়তনের ভিত্তিতে আসন যোগ বা বিয়োগ হয় না। বিটিআর এ যেখানে চারটি জেলা আর বরাক উপত্যকায় তিনটি, এটাও যেন মাথায় রাখি। যেখানে বরাক উপত্যকায় ২০১১ অনুযায়ী হিসেব করা হয় তবুও বিটিআর থেকে প্রায় পাঁচ লক্ষের অধিক জনসংখ্যা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় শুধু বিটিআর কেন আসামের অন্যান্য জেলায়ও বেড়েছে বিধানসভার আসন। যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব কম।

বরাক, কুশিয়ারা, ধলেশ্বরীর মিলনায়তন এই উপত্যকা বহু আগে থেকেই পিছিয়ে পড়া। জনসংখ্যার দিক থেকে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষের বেশি হলেও সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থতৈনিক দিক দিয়ে জীবনধারণের মানদন্ডে ভারতের বিশেষ করে আসামের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক দূরে। নির্বাচনী ইশতেহার অনেক ঘোষণা থাকলেও রাজনৈতিক নেতা দুই একজন ব্যাতিক্রমী ছাড়া কন্ঠস্বর খুবই ক্ষীণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এতে নিশ্চয় দূরদর্শিতার অভাব। দেখতে গেলে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কাগজ কল পাঁচগ্রাম কাগজ কল এখন বন্ধ, অপমৃত্যু ঘটে আনিপুর চিনি কল, বন্যার প্রকোপ, দুর্বল কর্মসংস্থান, অবিকশিত কৃষি ক্ষেত্র। তাছাড়া কি আর বলার আমাদের ছেলেমেয়েরা পেটের তাগিদে বর্হিরাজ্যে গিয়ে কর্মসংস্থানে জুড়ছে। এখানকার জনজীবনের উন্নতিকল্পে যেখানে আসন বর্ধিত করার কথা সেখানে হলো কমানো। তিমির অবগুণ্ঠনে আরও তলানিতে বরাকের জনজীবন।

প্রায় দুই দশকের পর আসামে নির্বাচনী এলাকা পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে (Constituency rescheduling process in Assam)।  আসাম সরকার এই প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে একটি অফিসিয়াল চিঠি পাঠিয়েছে  হয়তো ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে আসামের লোকসভা, বিধানসভা কেন্দ্রের সীমানা পরিবর্তিত হবে (Redrawing constituency boundaries)। সঙ্গে আরও 'খেলা হবে', বদলে যাবে ভোটাররা !! ১১ মে ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সভায় একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল (All Party Meeting decision on Re determination)।  কিন্তু এনআরসি এখনও অসম্পূর্ণ।এনআরসি সম্পূর্ণ না করে কেন নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা একটি শুধু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন নয়, ভাববার বিষয়। আসু এবং অসম সাহিত্য সভা প্রমুখের সাংগঠনিক ভূমিকা এখন কি হবে তাও চিন্তার বিষয় ৷ এনআরসি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এতদিন সমষ্টির সীমা পুনর নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বাধা দিয়েছিল আসু ৷ করেছিল বলিষ্ঠ বিরোধীতা। এখন এন আর সি অসম্পূর্ণ হয়ে থাকা অবস্থায় সমষ্টির পুনর নির্ধারণ নিয়ে আসুর ভূমিকা ও হয়ে পড়েছে উদ্বেগজনক।

অবশ্য সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত ন্যায়াধীশ বিপ্লব শর্মার অধ্যক্ষে গঠিত অসম চুক্তির ৬ নং দফার রূপায়ণ কমিটির পরামর্শের ভিত্তিতে আসামে সমষ্টির পুনর্নির্ধারণ করার জন্য দাবি জানিয়েছিল সদৌ অসম ছাত্র সংস্থা। তবে এখন যে মৌনতা অবলম্বন করে আছে এটাতে বুঝা যায় সম্মতির নিশ্চয়ই লক্ষণ এখানে। এনআরসির বিপরীতে এখন হবে সমষ্টির পুনর নির্ধারণ। সর্বদলীয় মৌনতা ও অসম্পূর্ণ এন আর সি দিয়ে সমষ্টির পুনর নির্ধারণের সম্মতি বিবেচিত হচ্ছে। এখন কথা হলো প্রপোজড ডিলেমিটেশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা যাবে ১১ জুলাই ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ তারিখ পর্যন্ত। চিঠি বা মেইল মারফত অভিযোগ দায়ের করা যাবে সেক্রেটারি, ইলেকশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া-এর কাছে। প্রপোজড ডিলেমিটেশনে বরাকের কোন ক্ষতি হবে না তো! এই ডিলেমিটেশনে আমরা কি পেলাম। আমরা বঞ্চনার শিকার বহু আগে থেকেই। এটা নতুন করে বলার কিছু নয়। তাই বলাই বাহুল্য গালাগা হয়ে যাওয়া। ডিলেমিটেশনে বরাকের দুই সমষ্টি কাটলিছড়া ও পাথারকান্দি বিলুপ্ত। বরাকের ক্ষেত্রে এহেন আচরণ কোন রাজনৈতিক চক্রান্ত নয়তো, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে ফেলার ফন্দি নয়তো, আসাম বিধানসভায় বরাক থেকে প্রতিনিধিত্ব কমিয়ে বরাকের আওয়াজকে দাবিয়ে রাখার জন্য উদ্দেশ্য প্রণোদিত কলকাঠি নয়তো! 

আসলে আমরা হীনমন্যতায় ভুগছি। ভাত-ঘুমের ব্যাঘাত ঘটুক কে চাই! তবে এটা যেন মনে রাখি বার বার অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমাদেরই। মিথ্যে নয় - কি আর করতে পারলাম, না পারলাম 'ভাষা শহীদ ষ্টেশন' বানাতে না পারলাম ঐক্যবদ্ধ হতে। জনপ্রতিনিধি কমানোর যে ছক তা কি আসলে উপত্যকার গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার ছক ! এখনই সময় সম্মিলিতভাবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ঐক্যবদ্ধ জনমত গঠন করার। একটা কথা বলি, বরাক থেকে প্রতিনিধিত্ব কমানোর অর্থ হলো আমাদের আওয়াজ কমিয়ে দেওয়া। সুতরাং এই প্রপোজড ডিলেমিটেশন কতটা যুক্তিসঙ্গত এবং বরাকের ক্ষেত্রে কতটা বিকাশ আনতে পারে — তা দেখবার বিষয়!! জবাবদিহিতার অভাবে শেষে এটাই বলব শ্রদ্ধেয় কবি ব্রজেন্দ্র কুমার সিংহের ভাষায় — 'ধানের খেতের মতো শ্যামল কোমল/ দিঘির জলের মতো স্নেহ মাখা/ তাকে মেরে ফেলা এতই সহজ!'


দৈনিক নববার্তা প্রসঙ্গ — ২৮/০৬/২০২৩ ইং 

Tuesday, June 27, 2023

বিজ্ঞানমনস্কতা : সমাজ গঠনে সুস্থ দৃষ্টিভঙ্গি

প্ৰত্যেক মানুষের এক সুস্থ দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্ৰয়োজন। যাতে করে সমাজ তথা জগতকে সঠিকভাবে পৰ্যবেক্ষণ করার সহায় করে এবং ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, সমাজ এবং প্ৰকৃতির সঙ্গে সম্পৰ্ককে সুস্থিরতা প্ৰদান করতে পারে। আর এর জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চয়ই হতে হবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বৈজ্ঞানিক মানসিকতার নিৰ্যাস। মানুষের বিজ্ঞানচেতনা মানুষকে এনে দিয়েছে মুক্তির আনন্দ। সত্যের স্বরূপ উদ্ঘাটিত করার জন্য, রহস্যের মায়াজাল উন্মোচিত করার জন্য যুক্তির শাণিত অস্ত্রে মানুষ ব্যাখ্যা করতে শিখেছে। কোনো “আপ্তবাক্য”, কোনো অন্ধবিশ্বাসকে গ্রহণ করতে চায় না। বিজ্ঞানমনস্কতা বিজ্ঞানের যুগে বাস করার ছাড়পত্র বা Passpot। বিজ্ঞানমনস্কতা ঐশ্বরিক নির্ভর সংস্কারাচ্ছন্ন মনকে মুক্তি দিয়ে যুক্তির চূড়ান্তে যাচাই করে গড়ে তোলে। যুক্তি-বুদ্ধি দ্বারা প্ৰশ্ন করা, কোনো পরিঘটনার বিশ্লেষণের প্ৰতি উৎসুকতা, তথ্য তথা জ্ঞান আহরণে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার, বিতৰ্ক তথা সমালোচনাত্মক উপায়ে আসন্ন সত্যের উপর দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকা একজন ব্যক্তিকে বৈজ্ঞানিক মানসিকতার অধিকারী করে এবং প্ৰদান করে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই ব্যক্তিই সচেতন এবং সক্ৰিয় মনের পরিচায়ক। এই চিন্তাধারা একজন ব্যক্তির মননে হঠাৎ ক্রিয়াশীল হয় না। দীৰ্ঘদিন অনুশীলনে একজন ব্যক্তির মনে ইহার প্ৰভাব স্থায়ী করে।

কেবল অন্ধবিশ্বাস এবং কুসংস্কার থেকে মুক্তির জন্যই নয় একটি মুক্ত, উদার, ধৰ্ম-নিরপেক্ষ গণতান্ত্ৰিক সমাজ গঠনের জন্য বৈজ্ঞানিক মানসিকতার খুব প্ৰয়োজন। বিজ্ঞান সম্পর্কে যখন মানুষের ধারণা একেবারেই ছিল না বা কম ছিল তখন মানুষ আগুনকে তার সৃষ্টিকর্তা মানতো, বজ্র বা তুফানকে তার সৃষ্টিকর্তা মানতো, সমুদ্রকে তার সৃষ্টিকর্তা মনে করে প্রার্থনা করতো। এটা ঠিক সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথেই মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রাধান্যতা বাড়ে, শুরু হয় বিজ্ঞানমনস্ক যাত্রার।

বিজ্ঞানমনস্ক হতে গেলে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতেই হবে বা বিজ্ঞানকে পেশা হিসেবে নিতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। বৃহত্তর অর্থে বিজ্ঞান জানলে মানুষ প্রশ্ন করতে শিখবে, উত্তর খুঁজতে শিখবে বিজ্ঞানের যুক্তির বা পর্যবেক্ষণের আলোকে। অন্ধকার যুগ পেরিয়ে পৃথিবীর পথ ধরে ধীরে ধীরে জন্ম নিল ইওরোপীয় বিজ্ঞান——'লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, নিকোলাস কোপার্নিকাস, টাইকো ব্রাহে, জোহান কেপলার, ব্রুনো, গ্যলিলিও গ্যালিলি, এন্ড্রিয়া ভেসালিয়াস, উইলিয়াম গিলবার্ট, মাইকেল সেভেটার্স, হিরোনিমাস ফ্যাব্রিসিয়াস, উইলিয়াম হার্ভি, প্যারাসেলসাস, ভ্যান হেলমন্ট, জর্জিয়াস এগ্রিকোলা, বেকন, দেকার্ত... প্রমূখ বিদ্বজনের হাতে তত্ত্ব ও পর্যবেক্ষণ নির্ভর আধুনিক বিজ্ঞান গড়ে উঠল, জন্ম নিল নিউটনের মত প্রতিভা যার মেধায় ও মননে পরিপূর্ণতা পেল বিশ্লেষণ ধৰ্মী তত্ত্বগত এবং পরীক্ষণ বিজ্ঞান এবং সত্য আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির হল বিকাশ জেনেটিক তত্ত্বের পথপ্রদর্শক মেন্ডল ও বিবর্তনবাদের প্রবর্তক ডারউইন আবির্ভূত হয়েছেন জীব বিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণায় দিক-নির্দেশক রূপে।' যেভাবে আইনস্টাইন বলেছিলেন - আদর্শ বৈজ্ঞানিক অনুশীলনের প্রধান শর্তই হচ্ছে যে সব কিছু নিয়েই প্রশ্ন করা যাবে। তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করার সময় যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়, সে সব পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা যাবে। যে কোন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেই কিছু না কিছু পূর্ব ধারণা বর্তমান থাকে। কিন্তু এই ধারণাগুলো সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। যখন আরো শক্তিশালী ও সঠিক ধারণা পাওয়া যায় তখন পূর্ব ধারণাগুলো বদলে যায়। কিন্তু সংরক্ষণবাদীরা, তাদের বিশ্বাসে অনড় থেকে আদর্শ বিজ্ঞান চর্চার মূল বিষয়কে এড়িয়ে গিয়ে যখন বৈজ্ঞানিক তথ্য ও উপাত্তকে ডিজাইনার ইউনিভার্স বা পরিকল্পিত মহাবিশ্বের ধারণার মধ্যেই চেপে রাখতে চাইছেন, তারা আসলে বিজ্ঞানের নামে অপবিজ্ঞানের চর্চা করছেন।

বিজ্ঞানের উন্মেষ ঘটে কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রীক বৈপ্লবিক ত্বত্তে। 'On The Revolution of the Heavenly Bodies'(1543) - এ প্রথম শোনা যায় সূর্য বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র এবং পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে। 'কিন্তু ধর্মের অনুপস্থিতিতে, ডকিন্সের স্বভাবজাত ভাষায়, মানুষের মগজে ঈশ্বর-সাইজের যে গর্তটির (গ্যাপ) সৃষ্টি হবে তাকে ভরাট করা হবে কি দিয়ে ? ডকিন্স এর উত্তর দিয়েছেন—বলেছেন বিজ্ঞান দিয়ে, প্রতিনিয়ত সত্যানুসন্ধান যার কাজ। ডকিন্সের আশা এর মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে নতুন এক পৃথিবী—মিথ্যা নয়, সত্যের ভিত্তিতে।' অভিজিৎ রায়ের 'আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী' বইটি পড়ে দেখতে পারেন। এ বইয়ের শেষ অধ্যায়ে অভিজিৎ কোয়ান্টাম দোদুল্যমানতা (quantum fluctuation) প্রক্রিয়ার কীভাবে জড় কণিকা তৈরি হয়, তার বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তাঁর ‘ব্রীফ হিস্ট্রি অব টাইম’ গ্রন্থে স্ফীতিতত্ত্বের জনক এরেন গুথের উদ্ধৃতি দিয়ে মহাবিশ্বকে 'আল্টিমেট ফ্রি লাঞ্চ' বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ প্রাকৃতিক ভাবেই শূন্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি। ঠিক যেমন 'ডারউইনের বিবর্তনবাদী তত্ত্বই ১৮৫৯ সালে প্রথমবারের মতো খুব পরিস্কার ভাবেই দেখিয়ে দিল যে, মানুষসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিবর্তন এবং উদ্ভবের পেছনে কোন স্বর্গীয় কারণ খোঁজার দরকার নেই। অন্যান্য পশুপাখি, গাছপালা যে পদ্ধতিতে পৃথিবীতে এসেছে, মানুষ নামে ‘দ্বিপদী প্রাণী’টিও ঠিক একই বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এ পৃথিবীতে এসেছে।'

বিজ্ঞানমনস্কতা হলো অন্ধ গোঁড়ামির বিরুদ্ধে একটা দৃষ্টিভঙ্গি, যা জীবন ও জগৎ সম্পর্কে খোলা মনে যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে সবকিছু বিচার করতে সাহায্য করে ।'যে সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ যত বেশী অদৃষ্টবাদী, সেই সমাজে শাসকের দাপাদাপি তত বেশী। আবার, প্রশ্নহীন আনুগত্যের সামনে শাসক নিরাপদ বোধ করেন চিরকাল । তবে একদল মানুষ মাথা উঁচু করে প্রশ্ন করতে পেরেছে বলেই, অজ্ঞানতার আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দুঃসাহসী লড়াই করতে পেরেছে বলে্‌ই, সমাজ ও সভ্যতায় অগ্রগতি হয়েছে । তবে, সমাজ বিকাশের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ সমাজে বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসার হওয়া খুবই কঠিন কাজ।'
 
কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক মানসিকতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজে থেকে গড়ে ওঠার বস্তু নয়। ইহাকে নিজের মধ্যে অনুশীলন করাতে হয়। এই বিজ্ঞান মানসিকতা নিজের মধ্যে আনার জন্য পরিবার, বিদ্যালয়, তথা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক মাধ্যম, সমাজ তথা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ইহার ভিতরে বিদ্যালয় পর্যায়ের বিজ্ঞান শিক্ষা অতি গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা আয়োগ এর দ্বারা প্রণীত সিলেবাস ইহার উপর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রদান করে। মানুষের মনের অন্তর্জানের আলোকে প্রজ্জ্বলিত করে যেদিন কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে পারবে সেদিন হবে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা। বিজ্ঞানচেতনার দ্বারা মানুষের মনের অন্ধকার দূর করা সম্ভব। বিজ্ঞানের আলোয় অন্ধমনের গুহান্ধকার দূর হয়। বিজ্ঞানহীন, যুক্তিদ্রোহী জীবন, আলোকশূন্য অন্ধকারময় জীবন। একমাত্র বিজ্ঞানই পারে মানুষের কূপমণ্ডুকতা দূর করতে। একমাত্র বিজ্ঞানমনস্কতাই পারে মানুষকে সত্যালোকের দিকে নিয়ে যেতে।

বার্তালিপি ২০/০৪/২০২৩

এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়


১।
"সে মন্দিরে দেব নাই' কহে সাধু।
রাজা কহে রোষে,
"দেব নাই! হে সন্ন্যাসী, নাস্তিকের মতো কথা কহ।
রত্নসিংহাসন-'পরে দীপিতেছে রতনবিগ্রহ--
শূন্য তাহা?'
"শূন্য নয়, রাজদম্ভে পূর্ণ' সাধু কহে,
"আপনায় স্থাপিয়াছ, জগতের দেবতারে নহে।'

ধর্ম বহু শতাব্দী ধরে প্রগতিশীল সমাজ তথা বিজ্ঞানের পথে হিমালয় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।  ধর্মের পুরোহিতরাই খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ সালের শেষ দিকে সক্রেটিসকে বিষ পান করতে বাধ্য করেছিল। ১৬ ফেব্রুয়ারী, ১৬০০, বিখ্যাত দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী জিওর্দানো ব্রুনোকে রোমে ধর্মীয় পুরোহিতরা জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছিল।  গ্যালিলিও এবং কোপার্নিকাসকে পাদ্রীরা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। আচ্ছা আমরা কি জানি, কেন?  তারা বলেছিল পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে।  কিন্তু বাইবেল বলেছিল যে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে।  বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীরা যুগে যুগে ধর্মের অন্ধ সমর্থকদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছে। কারণ, একমাত্র বিজ্ঞানই পারে ধর্মের পুরোহিতদের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারকে উন্মোচন করে তাদের হাজার বছরের মিথ্যাচারের মুখোশ উন্মোচন করতে।

কয়েক হাজার বছর ধরে আমাদের দেশ ভারতবর্ষ তার জাতি, ধর্ম ও ভাষার বৈচিত্র‍্য অন্যান্য দেশের চেয়ে নিজস্ব স্বকিয়তায় আলাদা করেছে। দেশভাগের সময় ভারত বেছে নিয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিকতা। এই আদর্শে শরিক হয়ে দেশের সংবিধান গড়ে ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে। আমাদের স্বাধীন ভারতের সংবিধানে ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রকে কোনও দিন যুক্ত করা হয়নি। যদিও প্রত্যেক নাগরিকের নিজ ধর্ম পালনের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত ছিল। আচ্ছা, আসলে কি ধর্মের আফিম খেয়ে শিক্ষা, চাকরি, কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতি, আদানি আম্বানির হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি তুলে দেওয়া, গঙ্গা দূষণ, সোনার মেয়েদের হেনস্থা, জল সঙ্কট, সব ভুলে গেছি!

আসলে ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। খুবই অনাড়ম্বর ভাবে কোন রাখঢাকের অবর্তমানে সূচনা হয় ঐতিহাসিক নতুন সংসদ ভবন। মুঘল থেকে ডারউইনের বিবর্তনবাদ বাদ দিয়ে সাম্প্রতিক এক সঞ্চারের পথে এগিয়ে চলছে নতুন ভারত। তার একটি বৃত্তীয় দিশা পাওয়া গেল বিকশিত ভারতের সাক্ষ্য হিসেবে। উত্তরভারতের আখড়ার লালচে গেরুয়া বাহিনির হাড়হিম উপস্থিতিতে, নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধন হয়। আসলে কি বলা যায় সেই ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয় বিনায়ক দামোদর সাভারকরের পুস্তিকাঃ হিন্দুত্ব / হু ইজ এ হিন্দু। ‘হিন্দু’ কে? এর উত্তর আমরা পাই — সিন্ধু থেকে সাগর অবধি বিস্তৃত ভারতবর্ষকে যে একযোগে ‘পিতৃভূমি’ জ্ঞান করে সে-ই ‘হিন্দু’। 'মুসলমানরা যেহেতু আরবকে তাদের ‘পুণ্যভূমি’ জ্ঞান করে, ‘ওদের’ এবং অন্য বিধর্মীদের দেশাত্মবোধ সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ‘দেশদ্রোহী’দের তালিকায় পরে আরও কিছু নাম যুক্ত হয়, কম্যুনিস্ট, স্বাধীনচেতা নারী, সমকামী ইত্যাদি। এই পুস্তিকা প্রকাশের দু’বছরের মধ্যেই জন্ম হয় সঙ্ঘের। ইস্তেহারেরও। মেয়েদের জন্য তাঁদের পরিষ্কার বার্তাঃ একমাত্র রাষ্ট্রের বিপদেই শক্তিস্বরূপিনী-বেশে মেয়েরা ঘরের ঘেরাটোপ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারে, নচেৎ তাঁদের থাকতে হবে ঘরের নিভৃতে, নিশ্চিন্তে এবং নিরাপদে। পুরুষের সর্বার্থসাধিকা হলেই চরিতার্থ হয় নারীর জীবন, পূর্ণ হয় তার সকল আকাঙ্ক্ষা।  
নতুন হিন্দুরাষ্ট্রের ট্রেনে মুসলমানসহ অন্য বিধর্মী, কম্যুনিস্ট, স্বাধীনচেতা নারী, LGBTQIA+, বস্তুত আনুগত্যহীন যেকোনোও প্রশ্নকারী, প্রত্যেকেই হবে দ্বিতীয় শ্রেণির যাত্রী।'

২।
টেমস নদীর তীরে ৯০০ বছরের পুরনো ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। এই ভবনটি বেশ কয়েকবার পুনর্নির্মিত হয়েছিল। বর্তমান আকারে এটি প্রায় ৫০০ বছর ধরে রয়েছে।  এমনকি সম্প্রতি, গথিক আর্কিটেকচারের পরিচিত নিদর্শনটির পুনরুদ্ধার এই পার্লামেন্ট। এখানে আছে হাউস অফ লর্ডস, হাউস অফ কমন্স, চার্চ, সিমেট্রি। মাদার অব ওল পার্লামেন্ট হিসেবে পরিচিত এই ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। ওয়েস্টমিনস্টার ব্যবস্থা বিশ্বের শাসন ব্যবস্থার একটি সফল মডেল। ভারত সহ বহু দেশে এই মডেলের গণতন্ত্র চলছে। 

একসময় এই ভবনটি বিশ্বের এক চতুর্থাংশ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করত।  বিশ্বের প্রতিটি বিখ্যাত ব্যক্তি তার মেঝেতে পা রেখেছেন।  এখানে ক্রমওয়েলের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়েছিল, এখানে চার্চিলের বক্তৃতা করা হয়েছিল, এখানে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন চিৎকার করেছিলেন  "প্রতিনিধিত্ব ব্যতিরেকে কোন ট্যাক্সেশন নয়"। এই ভবনে এসে একজন এমপি যুক্ত হন ব্রিটেনের ইতিহাসের সঙ্গে।  এখানে থাকা একটি গুরুতর অনুভূতি।  তারা এটি সংরক্ষণ এবং এটি আলিঙ্গনে গর্বিত। এই ইতিহাসে তারা বিশ্বাস করে। কোন চকচকে কাচ-সজ্জিত বিল্ডিং, এর সমস্ত জাঁকজমক এবং এলইডি স্ক্রিন সহ, এই গৌরবের সাথে মেলে না। সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে থাকবেন.. তবে অন্য কোথাও যাবেন না।  হ্যাঁ, একবার নতুন ভবনের প্রস্তাবও এলে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।

ক্ষুধা সূচকে ১০১তম স্থানে থাকা দেশ বিশ হাজার কোটি টাকা খরচ করে নতুন সংসদ ও নতুন রাজধানী তৈরি করছে। ভারতের বুকে এই নতুন শাসনের নিজস্ব স্মৃতিচিহ্ন দরকার। তাই সেই পুরনো ভবন, যেখানে ভারত স্বাধীনতা পেয়েছিল, পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।  যিনি বসেছিলেন ভারতের সেরা বক্তা, কাউন্সিলর, বক্তা, প্রধানমন্ত্রী, সেরা রাষ্ট্রনায়ক... যেখানে সর্দার, আম্বেদকর, শাস্ত্রী, অটলের কণ্ঠ বেজে উঠেছে, যেখানে ভগৎ সিংয়ের বধিরদের জন্য করা বিস্ফোরণের চিহ্ন নিয়ে একটি স্তম্ভ এখনও দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে "Tryst with Destiny" নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যেখানে আমরা পক্ষ ও বিরোধীদের ঐক্য দেখেছি, জনসাধারণ হৃদয়স্পর্শী বক্তৃতা শুনেছে, সেখানে আমরা ভারতের মানুষ... আমাদের সংবিধান লিখেছেন, আমরা আত্মসমর্পণ করেছি... সেই সংসদ..!!!

৩।
ভারতের ইতিহাসে প্রথম কালো দিন ছিল ৩০ জানুয়ারি, ১৯৪৮। ঐদিন নাথুরাম গডসের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী। দ্বিতীয় কালো দিন ছিল ২৫ জুন, ১৯৭৫। ঐ দিন মাঝ রাতে ইন্দিরা গান্ধী দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে সংবিধান স্বীকৃত একাধিক মৌলিক অধিকার কার্যত কেড়ে নিয়েছিলেন। তৃতীয় কলো দিন ছিল ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২। ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছিল। সিনিয়র জার্নালিস্ট ( দ্যা টেলিগ্রাফ ) প্রসূন আচার্য বলেন — 'আজ স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এক কালো দিন। 'কালো দিন'অর্থাৎ ২৮ মে ২০২৩ ইং এই দেশে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার সাংবিধানিক চরিত্র কার্যত সমাপ্তি হল। নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধনে পুরোহিত মন্ডিত পরিবেশ দেখানো হয় রীতিমত লাইভ টেলিকাস্ট করে। ঔপনিবেশিক মানসিকতার অবসান ঘটিয়ে এটাই 'আত্মনির্ভর' ভারত।'

একদিকে দেশের প্রথম নাগরিক অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে বক্তৃতায় গণতন্ত্রের পক্ষে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে বড় বড় ভাষণ আর বাইরে যন্তর মন্তরে ৩৪ দিন ধরে চলা মহিলা কুস্তিগীরদের শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন কে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে রাষ্ট্রের পেশি শক্তির আস্ফালন হল। প্রতিবাদী কুস্তিগীরদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নারকীয় নৃশংসতা আজ দেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে, যা ভারতের উদার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে মারাত্মক আঘাত করেছে।  প্রতিবাদী কুস্তিগীরদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতায় দেশের গর্বের প্রতীক জাতীয় পতাকাকেও চরমভাবে অপমান করা হয়েছিল।  আজ এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক কিছু আর ঘটতে পারে না। বিশিষ্ট জনদের মতে দেশের জনগণ এই ফ্যাসিবাদী রাজনীতিবিদদের জবাব দেবে, যারা প্রতিবাদের কণ্ঠকে ক্ষুণ্ণ করতে চায়।  তারা দেশের অহংকার  আর আজ দেশের এই অহংকারদের রাজপথে নির্মম নির্যাতন করা হয়, এমনকি নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনের দিনেও! সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ফোগট ও বজরং পুনিয়ারা আজ যৌন হয়রানি শিকার। তাদের অভিযোগ নাকচ করে পুলিশ গ্রেপ্তার করে ও ধর্ণাস্থল থেকে তাদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলে। আমরা যেন ভুলে না যাই দেশের এই বেটিরা মাতঙ্গিনী হাজরা, রানী লক্ষ্মী বাই, সরোজিনী নাইডু, প্রীতিলতা ওয়েদ্দাদার প্রভৃতি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উত্তরাধিকারী। দেশের গণতন্ত্র রক্ষার্থে এবং মহিলাদের যথোপযুক্ত সম্মানের দাবিতে এই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও আন্দোলনের পিছনে কিন্তু রয়েছে তা এবিষয়ে ওয়াকিবহাল সমস্ত গণতন্ত্র প্রেমী নাগরিকেরা। 

আসলে কি এটাই আমাদের দেশের উর্বর মস্তিষ্ক সম্পন্ন মানুষের সৌভাগ্য। এটাই কি 'ভারতের মহামানবের সাগর তীর '–  মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের জন্য খুবই হতাশাজনক। মানুষ যোগ্যতা ও পদমর্যাদা অনুযায়ী সম্মানিত হয় না কারণ মানুষ তাদের বোধগম্যতা ও বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমিতে আমরা পঙ্গু হয়ে গেছি এটা ইঙ্গিত দেয়।  এমন অনেক লোক আছে যারা কোলাহলের অর্থ সম্পর্কে অবগত নয় যে লোকেদের পিছনে ছুটছে।

গণতন্ত্রের পীঠস্থানে রাজতন্ত্রের প্রতীক 'সেঙ্গোল ' স্থাপন এবং আনুষ্ঠানিক রাজদণ্ড গ্রহণ পুনরায় গণতন্ত্র থেকে রাজতন্ত্রের দিকে পুনর্যাত্রার সূচনার মহড়া হয়ে গেল!! এই নতুন যাত্রাপথে একজনও সাহিত্যিক নেই, কবি নেই, শিল্পী নেই, বিজ্ঞানী নেই, দার্শনিক নেই। আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং শাসন বিভাগের সর্বোচ্চ পদাধিকারী মাননীয় রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি কে সংসদ ভবন উদ্বোধনে ব্রাত্য রাখা হয়েছে। সতী দাহ ,বর্ণভেদ, অপবিজ্ঞান, নারীকে ভোগ্য পন্যে পরিণত করা, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলিত, নিম্নবর্ণের হিন্দু ও সংখ্যালঘুকে পিষে মারা — ভয় হয় অদূরে কি রয়েছে। ধর্মপ্রবণতা রাষ্ট্র ও তার নাগরিকদের মৌলিক কর্তব্যকে গ্রাস করেছে এবং দূরের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।  এটা খুবই দুঃখজনক যে মানুষ নেতিবাচক পরিণতি বুঝতে পারেনি আর যারা ব্যাখ্যা করছেন তাঁরাও ব্যর্থ হয়েছেন।  তাহলে সত্যিই কি আজ অন্ধ, কালা, আর বধির !! না, না, 'এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না'!

প্রসঙ্গকথা : শতবর্ষে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’


১।

সেদিন নাকি খুব বৃষ্টি পড়েছিল। ডিসেম্বরের কনকনে ঠান্ডা। ১৯২১ সাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রেশ কাটেনি। নজরুলের ঘরের একদিকে মুজফ্ফরের নানারকম বই। বিভিন্ন সভায় যাচ্ছেন, বক্তৃতা দিচ্ছেন তিনি। আর নজরুল সেসব পর্যবেক্ষণ করছেন। রাশিয়ার বিপ্লবে তখন ফুটছে লক্ষ লক্ষ বাঙালি রক্ত৷ নজরুলও বুঝি তাঁদেরই একজন! সেই ডিসেম্বরের রাতেই নজরুল লিখে ফেললেন একটি কবিতা, নাম দিলেন ‘বিদ্রোহী’। লিখলেন—

আমি ঝঞ্ঝা,আমি ঘূর্ণি,
আমি পথ-সমুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’।

আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই,
আমি মুক্ত জীবনানন্দ।

আমি হাম্বার,আমি ছায়ানট,আমি হিন্দোল
আমি চল-চঞ্চল,ঠমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
ফিং দিয়া দিই তিন দোল ;
আমি চপলা-চপল হিন্দোল।
আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা
করি শত্রুর সাথে গলাগলি,
ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা
আমি উন্মাদ,আমি ঝঞ্ঝা!

আমি মহামারী আমি ভীতি এ ধরিত্রীর;
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার
আমি উষ্ণ চির-অধীর।

বল বীর-
আমি চির-উন্নত শির!”

ঔপনিবেশিক শোষণ, সামন্ত মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহী রূপে ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় আবির্ভূত হয়েছেন নজরুল। রোমান্টিক অনুভববেদ্যতায় মানবতার সপক্ষে তিনি উচ্চারণ করেছেন বিদ্রোহের বাণী, সত্য-সুন্দর-মঙ্গল ও শান্তির বাসনায় তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন যাবতীয় অপশক্তির বিরুদ্ধে, ধর্মীয় শোষণের বিরুদ্ধে এবং জীর্ণ-সনাতন মূল্যবোধের বিরুদ্ধে। পরাধীনতার গ্লানিতে নজরুলচিত্ত দীর্ণ হয়েছে এবং এই গ্লানি থেকে মুক্তির অভিলাষে তিনি হয়েছেন বিদ্রোহী। তবে কেবল দেশের স্বাধীনতা কামনাতেই তাঁর বিদ্রোহীচিত্তের তৃপ্তি ছিল না—তাঁর বিদ্রোহ ছিল একাধারে ভাববাদী ও বস্তুবাদী। তাঁর বিদ্রোহ ছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার, সকল আইন-কানুনের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ, 'ইতিহাসনিন্দিত চেঙ্গিসের মতো নিষ্ঠুরের জয়গানে মুখর, ভৃগুর মতো ঈশ্বরের বুকে পদাঘাত-উদ্যত, মানবধর্ম প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়সংকল্প, ধ্বংসের আবাহনে উচ্ছ্বসিত, সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় উদ্বেলিত'।

‘বিদ্রোহী’ কবিতার রচনাকাল ছিল সারা পৃথিবীর জন্য অস্থির সময়। বিদ্রোহী কবিতায় নজরুলের বিদ্রোহী চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। নজরুল বিদ্রোহ করেছেন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে, শৃঙ্খলপরা আমিত্বের বিরুদ্ধে। এই কবিতা রচনার জন্য নজরুল ‘বিদ্রোহী কবির আখ্যা পেয়েছেন। খেটেছেন জেলও। কবি লর্ড বায়রন বলেছেন, ‘এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আমি বিখ্যাত হয়ে গেছি।’ ১৮১২ সালে ‘চাইল্ড হ্যারল্ডস পিলগ্রিমেজ’ কবিতাটি প্রকাশের পর কবি হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়ে এ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন বিস্মিত বায়রন। বাংলা সাহিত্যে ঠিক এ রকমই ঘটনা ঘটেছিল কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের পর। ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় কবিতাটি মুদ্রিত হলে দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় ১৩২৮ সংখ্যায় এটি ছাপা হয়েছিল। প্রায় কাছাকাছি সময়ে ‘প্রবাসী’, ‘সাধনা’, ‘ধূমকেতু’ ও দৈনিক ‘বসুমতী’সহ বেশ কিছু পত্রপত্রিকায় কবিতাটির পুনর্মুদ্রণ হয় যা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে জানা যায়। একই কবিতা এত বেশিসংখ্যক পত্রপত্রিকায় প্রকাশের ঘটনাও সম্ভবত এটিই প্রথম। লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে অসম্মান ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো মানুষের সাহসের উচ্চারণ হয়ে উঠেছে বিদ্রোহী কবি নজরুল।

নজরুলের উত্তরসূরী মার্কিন কবি ল্যাঙ্গস্টোন ইউজের ' Let America be America Again ' কবিতায় নজরুলের বিদ্রোহী ও সাম্যবাদী কবিতার প্রতিধ্বনি। নজরুল সমসাময়িক ইংরেজি দৈনিক 'অমৃতবাজার পত্রিকা'র সম্পাদক স্বনামধন্য শ্রী তুষারকান্তি ঘোষ তাঁর উক্ত পত্রিকায় ১৯৬২ সালের একটি সংখ্যায় মন্তব্য করেন — 'If Nazrul Islam written only his poem 'Bidrohi' (The Rebel) he would have been famous'. সেই জায়গা থেকে হয়তো ডক্টর সুশীল কুমার তাঁর নজরুল চরিত মানস গ্রন্থে বলেছেন — 'Nazrul the gift of the century'.  'বিদ্রোহী'র প্রথম 'লিটারারি' তরজমা সম্ভবত অধ্যাপক বিনয় কুমার সরকারের করা — Say, Hero!/ Say Erect is my head !/ Seeing my head the Himalayan Peak/ Bends low in shame। তদানীন্তন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি 'বিদ্রোহী' , 'সাম্যবাদী', 'নারী', 'দারিদ্র্য', 'ভাঙ্গার গান' প্রভৃতি রচনার মধ্য দিয়ে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে নিজেও স্বতন্ত্র ভাবমূর্তি করে তোলেন। যেখানে বাংলা ভাষার ব্যাপক এবং সার্থকভাবে বিদেশি শব্দের ব্যবহার করেন নজরুল। জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিলেন কবি। এইসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নজরুলের বিশ্বচেতনা সমৃদ্ধ হয় ও তিনি ক্রমান্বয়ে আরও সোচ্চার হন খেটে খাওয়া নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের দাবিতে।

‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুল ইসলাম সৃষ্টিকে স্থাপন করেছেন আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক জীবন বাস্তবতার জটিল আবর্তে। 'কবিতা তাই হয়ে উঠেছে সামাজিক দায়িত্ব পালনের শাণিত আয়ুধ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুলের বিদ্রোহচেতনার মাঝে লক্ষ করা যায় ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্য : ক. অসত্য অকল্যাণ অশান্তি অমঙ্গল এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ; খ. স্বদেশের মুক্তির জন্য ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ; এবং গ. শৃঙ্খলপরা আমিত্বকে মুক্তি দেওয়ার জন্য বিদ্রোহ।' নজরুলের বিদ্রোহচেতনাকে নানা মাত্রায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে—কখনো তা হয়েছে সদর্থক, কখনো বা নেতিবাচক। তবে তাঁর বিদ্রোহীসত্তাকে যেভাবেই দেখা হোক না কেন, তা ছিল মূলত সৃষ্টিশীল। তাঁর বিদ্রোহ সৃষ্টিশীল বলেই ধ্বংসের মাঝে তিনি খুঁজে পেয়েছেন নতুন সৃষ্টির উৎস।

২।

'বিদ্রোহী’ কবিতায় মোট পঙক্তি সংখ্যা ১৪৭। এই কবিতায় নজরুল অনেক রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন ভাব-ভাষা ছন্দ-চিত্রকল্পের কারুকার্যে।
শব্দ-ব্যবহারে নজরুলের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য এই যে বাংলা কাব্যে তিনি একটি নিজস্ব কবিভাষার জনয়িতা। রাবীন্দ্রিক স্বাতন্ত্র্যের পর বাংলা কাব্যে তিনি প্রকৃত অর্থেই নির্মাণ করেছেন একটি নতুন কবিভাষা। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাতেই আমরা নজরুলের স্বকীয় কবিভাষার প্রাথমিক প্রকাশ বিশেষভাবে লক্ষ্য করি। তৎসম-তদ্ভব-দেশি শব্দের পাশাপাশি আরবি-ফারসি শব্দ নজরুল আলোচ্য কবিতায় সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন। শব্দ-ব্যবহারে নজরুলের কৃতিত্ব হলো—নতুন হোক পুরাতন হোক, দেশি হোক বিদেশি হোক—শব্দের সংগীতধর্ম ও ধ্বনিগুণ ব্যবহারে তিনি ছিলেন অসাধারণ কুশলী শিল্পী।

বিষয়ভাবনা এবং জীবনার্থের মতো, শব্দ-ব্যবহারেও ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কোনরূপ দাসত্ব স্বীকার না করে স্বাধীন স্ফূর্তিতে তিনি চয়ন করেছেন তাঁর প্রিয় শব্দরাজি। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ব্যবহৃত তৎসম, তদ্ভব, দেশি বা বিদেশি শব্দের মধ্যে নেই কোনো জাতবিচার। এ কবিতায় ওজোধর্মী সংস্কৃত শব্দের পাশেই ভেদিয়া, ছেদিয়া, ভীম ভাসমান মাইন, ঠমকি দমকি, হরদম ভরপুর মদ, তুড়ি দিয়া ইত্যাদি শব্দ বা শব্দবন্ধ অবলীলায় ব্যবহৃত হয়েছে। এ কবিতায় নজরুলের শব্দচেতনায় এখানেই স্বাতন্ত্র্য যে তিনি ধ্বনি-প্রবাহের অনুগামী করে শব্দের মধ্যে নিয়ে এসেছেন প্রবল জীবনাবেগ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় শব্দ-ব্যবহারের এই নতুন পরীক্ষা আধুনিক বাংলা কবিতার বিকাশকে সদর্থক মাত্রায় করেছে প্রভাবিত।

'বক্তব্যের অনুক্রম অনুযায়ী কবিতাটিকে মােট দশটি স্তবকে ভাগ করা যায়। প্রথম স্তবকে আমি’-র শক্তিমত্তার পাশাপাশি রয়েছে বিজয়ের প্রত্যয় , আর এই বিজয়ের জন্য প্রয়ােজন আঘাতকারীর। আমি’-র ধ্বংসাত্মক রূপ, যা কবিতাটির ১১ থেকে ২৭ পঙক্তি পর্যন্ত ঘূর্ণিত: ‘আমি ঝঞা, আমি ঘূর্ণি। আমি পথ সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি। শক্তির উদ্বোধন ও সংহারচিত্রের পরই হঠাৎ শুরু হলাে মিলনের নৃত্যপাগল ছন্দ। ২৮ থেকে ৩৭ পঙক্তি পর্যন্ত আমি এমন এক মুক্ত জীবনান্দ, যে শত্রুর সাথে গলাগলি করে, আবার মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে। কিন্তু মিলনের এই আকাঙ্ক্ষার পর পরবর্তী দুই পঙক্তিতে ‘আমি’ আবার মহামারী, ভীত, শাসন-ত্রাসন ও সংহার রূপে আবির্ভূত। তারপর ৪২ থেকে ৫১ সংখ্যক পঙক্তিতে আবার আছে উদ্দাম ইতিবাচকতা, হােমশিখা, উপাসনা, নিশাবসানের আকাঙ্ক্ষা। আর এই অংশের ৪৯ তম পঙক্তিতেই আছে সেই জাদুকরী সরল স্বীকারােক্তি:মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য।'

৩।

বর্তমান সময়ে নানা রকম অসাম্যের ভীড়ে আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করি ‘ বিদ্রোহী’ কবিতার প্রাসঙ্গিকতা ও তার অম্লান তাৎপর্যের কথা। উপনিবেশবাদের অবসান ঘটলেও বিশ্বায়নের শৃঙ্খল আর পুঁজিবাদের শােষণ বঞ্চনা অত্যাচার নির্যাতনসহ আর্থসামাজিক বৈষম্য সবকিছুই বলবৎ আছে। অন্যদিকে মানুষের শক্তির প্রতি, তার বীরত্বের প্রতি অনাস্থাও সমানভাবে অটুট। তাই নজরুলের ভাষায় — 'শান্ত থাকার অবকাশ মিলছে চতুষ্পর্শের প্রতিবাদহীন মেরুদণ্ডহীনতার পরিপ্রেক্ষিতে বিপুল কাম্য হয়ে উঠেছে উন্নত মম শির’- এর বজ্ৰদীপ্ত ঘােষণা। শােষণ পীড়ন আর বৈষম্য থেকে মুক্তির সংকল্প নিয়ে মানুষের আপন শক্তির উদ্বোধন ঘটিয়ে নজরুল কথিত বিদ্রোহের রণে অশ্লীন হওয়ার যেন বিকল্প নেই। 

অত্যাচারীর 'থঙ্গ কৃপাণে’র তলে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রােল’ এই বাংলার বিশেষ করে আসাম সহ গোটা উত্তরপূর্বের আকাশে -বাতাসে আজও প্রতিনিয়ত ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত। ভারতের উত্তর-পূর্বের সবচেয়ে বড় রাজ্য হল আসাম।এখানে অসমিয়াদের সঙ্গে আছে প্রচুর বাঙালি, হিন্দিভাষী, বড় জনগোষ্ঠী, মার,ডিমাসা,কার্বি, মিসিং,আহোম,মণিপুরি সহ ছোট ছোট জনসমাজ। শাসকগোষ্ঠীদের দায়িত্ব ছিল সবাইকে নিয়ে সুষ্ঠু সুন্দরভাবে জীবন পরিচালনার মানদন্ড বৃদ্ধি করার। কিন্তু দেশভাগ অর্থাৎ স্বাধীনতার পর থেকেই আধিপত্যবাদী অসমীয়া রাজনৈতিক সমাজ অসমীয়াকরণের পথে তার দাপট কায়েম করে চলছে। আধিপত্যবাদের সন্ত্রাসে আমরা আক্রান্ত। একদিকে আগ্রাসনের শিকার আর অন্যদিকে বিভাজনের রাজনীতি। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিষে যুক্তিহীনভাবে বিভাজিত হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালি। তাই বাঙালির শত্রু ঘরে বাইরে। এই সময়ে নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতা আমাদের অনন্ত প্রেরণা। বাঙালি মানসে কবিতাটি ‘চির উন্নত শির’ বিরাজমান।

পরাধীনতার জরাজীর্ণ সময়ে নজরুলের আবির্ভাব ছিল ধূমকেতুর মতো। ধূমকেতুর মতােই তিনি যুদ্ধ ঘােষণা করেছেন দাসত্বের বিরুদ্ধে, শােষণে শােষণে জর্জরিত জীর্ণ সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তাঁর এই বিদ্রোহ সমাজের সর্বস্তরে ধেয়ে চলেছে। এই একবিংশ শতাব্দীতে কোনো কবি এমন কবিতা লিখতেন হয়তো জেলবন্দি থাকতে হত তাঁকে৷ সত্যিকার অর্থে এক নজরুল জন্মেছিলেন বাংলা ও বাঙালির ভুবনে। সব মিলিয়ে পুরোপুরি সৃষ্টিশীল এক মানুষ — যখন যা পেরেছেন দিয়ে গেছেন 'সৃষ্টি সুখের উল্লাসে'। নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতা আমাদের জাগরণের স্মারক। দুঃশাসন থেকে মুক্তির জন্য 'বিদ্রোহী' কবিতা এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম। এই কবিতাটি পৃথিবীর বঞ্চিত, শোষিত নিপীড়িত-নির্যাতিত, পরাধীন সকল জাতির মুক্তিসংগ্রামের অনবদ্য শক্তির তেজোদীপ্ত উৎস।

তথ্যসূত্রঃ
১। "কাজী নজরুল ইসলাম: 'বিদ্রোহী' কবিতার একশো বছর, ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে যেভাবে লেখা হয়েছিল” । বিবিসি বাংলা।
২। চৌধুরী, দিলিপ (২০০৬-০৯-২২)। "Nazrul Islam: The unparalleled lyricist and composer of Bengal" (HTML) I (2
ইনফরমেশন ব্যুরো, ভারত সরকার। সংগ্রহের তারিখ ২০০৬-০৯-২২।
৩। আচার্য, সুব্রত; কলকাতা (২০১৭-০৫-২৫)। ” 'বিদ্রোহী’ কবিতার আঁতুড়ঘর” | The Daily Star Bangla (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০১-১৬।
৪। আন্তর্জাতিক নজরুল : আবু রিদা সম্পাদিত।
৫। দাস, অভিজিৎ (নভেম্বর ২০১৮)। "নজরুলের হারামণি"। শিক্ষা পাতা।
৬। কবিতার শিরোনাম হয়ে ওঠে কবির উপাধি :
 বিশ্বজিৎ ঘোষ।
৭। 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ ও সমাজ বাস্তবতা :
হাফিজ বিন রহমান।
৮। শতবর্ষে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ : তরুণ কবির স্পর্ধা সেদিন ঝড় তুলেছিল : সুমন সাধু।
৯। "চির-উন্নত মম শির :: শেষের পাতা :: কালের কণ্ঠ"।
web.archive.org। ২০১৫-০৩-১৫। Archived from the original on ২০১৫-০৩-১৫। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০১-১৬।
১০। বিদ্রোহীর বিস্তীর্ণ আকাশ জুড়ে কাজী নজরুল ইসলাম : ফারুক আহমেদ।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...