Sunday, July 16, 2023

আধুনিক দাসত্ব : 'স্বাধীনতাহীনতায়' সভ্য সমাজ


স্বাধীনতা এবং দাসত্ব জীবনের দু’টি অঙ্গ। কবি এক জায়গায় লিখেছেন, ‘দাসত্ব শৃঙ্খল বলো কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়?’ কবি রঙ্গলাল তাঁর কবিতায় মানব জীবনের একটি গভীর আকাঙ্ক্ষার কথা ব্যক্ত করেন। সম্ভবত স্বাধীনতার এ আকাঙ্ক্ষা মানুষের সহজাত। প্রভাবশালী দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট তাঁর বিখ্যাত 'থিওরি অব হিউম্যান নেইচার'-এ বলেন, কর্ম সম্পাদনের জন্য দরকার বাইরের সবকিছু থেকে মুক্ত হওয়া। গত কয়েক বছরে গোটা বিশ্বে 'আধুনিক দাসত্ব' ব্যবস্থা বেড়ে গিয়েছে। প্রায় প্রতিদিন বিশ্বের বহু শিশু, নারী, পুরুষ, প্রবীণ এই সভ্যযুগীয় দাসপ্রথার বলি হচ্ছেন। কখনও গোচরে, কখনও অগোচরে। গ্লোবাল স্লেভারি ইনডেক্স ২০২৩-এ আধুনিক দাসদের বসবাসকারী দেশগুলির একটি তালিকা তৈরি করা হয়। এরা এমন মানুষ, যাদের কাজের কোনও কর্মঘণ্টা নেই, নেই কোনও নির্দিষ্ট বেতনও। সূচকে বলা হয়েছে, বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ দাসের মতো জীবনযাপন করছে। আধুনিক দাসত্বের ব্যাখ্যা হলো — জোরপূর্বক শ্রম, ঋণ, জোরপূর্বক বিয়ে-দাসত্ব, মানব পাচারের মতো কয়েকটি প্রথা। দাসত্বের সংজ্ঞা এবং প্রকৃত চিত্রের সাথে এর সামঞ্জস্য নেই। কারণ, দাসত্বের শৃঙ্খল এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লুক্কায়িত। যে মানুষ নিজেকে ‘স্বাধীন’ বলে দাবি করছে, সে দিনের শেষে দেখতে পাচ্ছে এক অদৃশ্য শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রিত করছে তাকে।

বিশ্বজুড়ে আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকা পড়া মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী ও শিশুরা। সভ্যসমাজের আধুনিক দাসত্বের নেপথ্যে রয়েছে, দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে শ্রমিক হতে বাধ্য করা, ঋণখেলাপিকে ক্রীতদাসে পরিণত করা, জোর করে বিয়ে, সাধারণ দাসত্ব এবং দাসত্বের অনুরূপ কাজকারবার। রিপোর্টে বলা হয়েছে, আধুনিক দাসত্বের মধ্যে ২ কোটি ৭৬ লক্ষ মানুষ বাধ্যতামূলক শ্রমে যুক্ত। আর, জোরপূর্বক বিবাহের শিকার হয়েছেন ২ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ। আধুনিক যুগীয় দাসত্ব চোখে দেখা যায় না। খালি চোখে বোঝাও যায় না। এই ব্যবস্থা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও সমাজের গভীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু খণ্ডাংশে নয়, গোটা পৃথিবীতেই সূক্ষ্মভাবে গোপনে আমাদের দাসত্বে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রতিদিন মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে, বাধ্য করা হচ্ছে অথবা জোর করে শোষিত হওয়ার পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে মানুষকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, যেখান থেকে তার নিষ্কৃতি বা পরিত্রাণের কোনও উপায় নেই।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, 'আধুনিক দাসত্ব সরল দৃষ্টিতে লুকিয়ে আছে। এটি বিশ্বের প্রতিটি কোণে জীবনের সাথে গভীরভাবে জড়িত। প্রতিদিন, মানুষ প্রতারিত, জোরপূর্বক বা শোষণমূলক পরিস্থিতিতে পড়তে বাধ্য হচ্ছে।' ‘গ্লোবাল স্লেভারি ইনডেক্স’ (Global Slavery Index) প্রকাশ করে ওয়াক ফ্রি জানিয়েছে - ‘২০২১ সালে ‘আধুনিক দাসত্বের’ শিকার হয়েছেন প্রায় প্রায় ৫ কোটি মানুষ। অর্থাৎ, সারা বিশ্বে প্রতি ১৫০ জন পিছু ‘আধুনিক দাসত্বের’ শিকার হয়েছেন ১ জন মানুষ।' যার মধ্যে ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষই বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের নাগরিক। সমীক্ষা বলছে, প্রতিদিন আমরা যেসব সামগ্রী কিনি কিংবা যেসব পরিষেবা ব্যবহার করি সেগুলি আমাদের ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয় অথবা আমাদের ব্যবহারের বুদ্ধি অর্থাৎ প্রস্তাব দেওয়া হয়। আমরা টেরই পাই না, এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে গোপন মানব শ্রমের মূল্য। সমীক্ষা বলছে, সভ্যযুগীয় দাসত্বে ২ কোটি ৭৬ লক্ষ মানুষকে জোর করে শ্রমিকের কাজ করানো হয়। ২ কোটি ২০ লক্ষ বিয়ে দেওয়া হয় পাত্র বা পাত্রীর অমতে। অন্যভাবে বলা যায়, প্রতি দেড়শো জনের মধ্যে একজনের বিয়ে দেওয়া হয় জোর করে।

স্বাধীনতার ৭৫ বছরে অমৃতকাল উপস্থিত হয়েছে বলে হাঁক শোনা যায় প্রায়শই। কিন্তু আধুনিকতার যাবতীয় উপকরণ কোলে সাজিয়ে বসে থাকলেও, দাসত্বের শিকল থেকে আজও মুক্ত হতে পারল না ১৪০ কোটির দেশ (Modern Slavery)। বিশ্ব দাসত্ব সূচক অন্তত তেমনই জানান দিচ্ছে। ভারতে আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়েছে বলে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে তাতে (Global Slavery Index 2023)। প্রতিবেদন বলছে, ২০ টি ধনী দেশের মধ্যে ছটি দেশের আধুনিক দাসত্বের হার সব থেকে বেশি। এক কোটি দশ লক্ষ নিয়ে এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভারত। তারপরেই রয়েছে চিন। সেখানে আধুনিক দাসত্বের মধ্যে থাকা মানুষের সংখ্যা ৫৮ লক্ষ। রাশিয়ায় ১৯ লক্ষ, ইন্দোনেশিয়ায় ১৮ লক্ষ, তুরস্কে ১৩ লক্ষ এবং আমেরিকায় সংখ্যাটা ১১ লক্ষের মতো। এইসব দেশগুলিতে হয় জোর করে শ্রমে নিয়োগ করা হচ্ছে কিংবা জোর করে বিবাহে বাধ্য করা হচ্ছে।

আধুনিক দাসত্বের নিরিখে কোন দেশ, কোন জায়গায় রয়েছে, তার তিনটি পর্যায় তৈরি করা হয়। এর একেবারে উপরের দিকে রয়েছে উত্তর কোরিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, তাজিকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, রাশিয়া, আফগানিস্তান, কুয়েত, মৌরিতানিয়া, ইরিত্রিয়া। দাসত্ব যেখানে নেই বললেই চলে, সেই দেশগুলি হল, সুইৎজারল্যান্ড, নরওয়ে, জার্মানি, হল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, আয়ারল্যান্ড, জাপান এবং ফিনল্যান্ড। যে সমস্ত দেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ আধুনিক ক্রীতদাস হয়ে রয়েছেন, তাদের নিয়ে তৃতীয় পর্যায় তৈরি করা হয়েছে। সেই দেশগুলি হল, ভারত, চিন, উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নাইজিরিয়া, তুরস্ক, বাংলাদেশ এবং আমেরিকা। রিপোর্টে বলা হয়েছে, সামগ্রিক ভাবে ধরলে, এই সমস্ত দেশে প্রতি তিন জন নাগরিকের মধ্যে দু'জন আধুনিক ক্রীতদাস, সামগ্রিক হিসেবে যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।

১৯৭৬ সালে ভারতে অঙ্গীকারবদ্ধ শ্রম বিলোপ আইন পাস হয়। তার আওতায় জোরপূর্বক শ্রমদান এবং অঙ্গীকারবদ্ধ শ্রম নিষিদ্ধ হয়। এ নিয়ে প্রত্যেক রাজ্যের সরকারের উপর ভিজিল্য়ান্স কমিটি গড়ার দায়িত্বও বর্তায়। ১৯৮৫ সালে সংশোধন ঘটিয়ে ঠিকাশ্রমিক এবং পরিযায়ী শ্রমিকদেরও সেই আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সুপ্রিম কোর্টও জানিয়ে দেয়, ন্যূনতম মজুরি না মেটানোও জোরপূর্বক শ্রমের মধ্যে পড়ে। কিন্তু দাসত্ব বিলোপের পক্ষে এই আইন আদৌ কার্যকর করা সম্ভব কিনা, প্রশ্ন উঠতে শুরু করে গোড়া থেকেই।  আইনি ফাঁকফোকর, সরকারি উদাসীনতা, দুর্নীতি, রাজনীতিকদের মধ্যে সদিচ্ছার অভাবে এই আইন সার্বিক ভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি বলে মত সমাজকর্মীদের। অপরাধ বলে গন্য করা হলেও, জোরপূর্ব শ্রমে কোপ বসাতে গেলে দরিদ্র-নিম্নবিত্ত তথা মধ্যবিত্ত ঘরের পেটে টান পড়বে। তার সমাধান না খুঁজে, এই আইন কখনও কার্যকর করা সম্ভব নয় বলে ২০১৭ সালে কেন্দ্রের কাছে চিঠিও পাঠান সমাজ সচেতন মানুষেরা। শুধু তাই নয়, কেন্দ্র যে নয়া শ্রম আইন চালু করার দিকে এগোচ্ছে, তাতে সংগঠিত এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রে মালিক পক্ষের হাত আরও শক্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সমাজকর্মীরা। ভারতে একাধিক শ্রম আইন প্রণয়ন করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু 'আধুনিক দাসত্ব'-র বলয় ভাঙা এখনও সম্ভব হচ্ছে না।

দাসত্ব নিরোধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘোষণা এবং আইনের কোনো অভাব নেই। শুধু অভাব এর বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়ন করার ইচ্ছা। এর পেছনে সব সময় কাজ করছে সংঘাত, সংঘর্ষ, দুর্নীতি, দারিদ্র্য এবং নানা সামাজিক পার্থক্য। ক্ষমতা, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশ স্থাপন এবং স্বার্থ উদ্ধারও এর সাথে সম্পৃক্ত। এর ফলে দাসত্ব প্রথা নানা ঢঙে চালু রয়েছে এবং সারা বিশ্বে বিস্তার লাভ করেছে।
এর অবস্থান এখন এমন দৃঢ় যে, শিকার ও শিকারি উভয়েই এর আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে; কিন্তু বেরিয়ে আসতে পারছে না। অথচ দাসত্ব নির্মূল হওয়া প্রয়োজন। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে দু’টি বিষয়ের দিকে প্রথমেই মনোযোগ দিতে হবে, তা হলো পক্ষপাত ও অসমান। সামাজিক জীবনে অর্থনৈতিক শোষণকে বন্ধ করে সমতা রক্ষা করা হলে দাসপ্রথা চালু রাখা সম্ভব হবে না। সমাজ এবং সরকার যদি দুর্নীতি দমনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে এবং সেই মোতাবেক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে, তবে দাসত্ব তার সব অবয়ব নিয়ে হারিয়ে যেতে বাধ্য হবে। নতুবা এই অভিশাপ সমাজে প্রবলভাবে বৃদ্ধি বা স্থান নিয়ে থাকবে এবং পরিশেষে চলমান সামাজিক অশান্তির কারণ হবে।

একটা সময় মনে করা হয়েছিল, সেটা উনিশ শতকের শেষ দিক; যে পৃথিবী থেকে দাসপ্রথা বিদায় নিয়েছে। কিন্তু সেই ধারণা সত্য নয়। এই আধুনিক যুগও সেই অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়নি। পুঁজিবাদী ও নয়া উদারবাদ বিশ্বব্যবস্থার কালেও দাসত্বের শেকলে বন্দি বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষ। প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে রাষ্ট্রসংঘ সম্মেলনে বিশ্বের মহান নেতারা আগামীকালের জন্য যে লক্ষ্যগুলি রেখেছিলেন, তার মধ্যে ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে আধুনিক দাসপ্রথা, ফোর্সড লেবার এবং মানব পাচারের মতো কলঙ্কজনক ঘটনাগুলিকে মুছে দেওয়া, কিন্তু দুঃখের বিষয় তারপরেও আধুনিক দাসদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলছে। আধুনিক দাসত্ব এখনো খুব সহজ ভাবেই মানুষের সভ্যতার মধ্যে লুকিয়ে আছে। এবং সেটা মানুষের জীবনের সঙ্গে বিশ্বের প্রতিটি কোণে গভীরভাবেই রয়েছে। সেই কারণেই প্রতিদিন, মানুষ প্রতারিত হচ্ছে, জোর করে মানুষকে দাসত্ব করতে বাধ্য করা হচ্ছে।বেঁচে থাকার জন্য কাজ করে মজুর, কিন্তু কাজই জীবনীশক্তি কেড়ে নিচ্ছে। এমনকি জীবনও। আর আমাদের প্রয়োজনে সুতা থেকে বাড়ি তৈরিতে এক একটা বালু কণা সহ সব পণ্যে লেগে থাকছে সেই পীড়নের দাগ।

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...