Tuesday, April 2, 2019

মুমিনরা আজও মানুষ হলো না

একজন প্রকৃত মুমিন ব্যক্তি সদা সর্বদাই আল্লাহ পাকের ওপরই ভরসা রাখে। যিনি আল্লাহর সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত এবং আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে আস্থাশীল, তিনি সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপরই ভরসা রাখবেন। কোন মানুষ কিংবা মানুষের রচিত আইন, বিচার, বা ক্ষমতাবান মানুষের কাছে তিনি কখনো মাথা নত করবে না। কারণ একজন মুমিনের একমাত্র জবাবদিহিতা এবং দাবীদাওয়া জানাতে হবে আল্লাহর কাছে। আর কারো কাছে নয়। আল্লাহই ভাল মন্দ করার সর্বোচ্চ অথরিটি। এইটুকু যারা বিশ্বাস করে, তারাই প্রকৃত মুমিন। বাদবাকিরা মুমিন নামের কলঙ্ক।

অন্যদিকে একজন নাস্তিক সর্বদাই আস্থা রাখেন যুক্তি প্রমাণ এবং মানুষের তৈরি নিয়ম কানুনের ওপর। যা ক্রমশ সংশোধন করা সম্ভব। মানুষের মানবিক বোধ এবং বিবেকের ওপর। মানুষের শুভ চিন্তার ওপর। জ্ঞান প্রজ্ঞা যুক্তি এবং মানুষের মননশীলতা ভাল মন্দ বিচারের একমাত্র অথরিটি।

গত কিছুদিন ধরে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পারলাম, মুমিনগণ ইদানিং বিভিন্ন জায়গায় নাস্তিকদের বিরুদ্ধে কান্নাকাটি করে বেড়াচ্ছে। কখনো তারা নালিশ দিচ্ছে, কখনো  দু-চারজন ঘরে বা রাস্তায় হুমকি দিচ্ছে। কখনো বিচার দিচ্ছে কান্নাকাটি করে সাধারণত আমরা যাদের ক্ষমতাবান বলি ওদের কাছে গিয়ে। নাস্তিকরা নাকি ইসলামের লুঙ্গি খুলে দিচ্ছে, এই দুঃখে তাদের নাকের জল আর চোখের জল সব একত্র করে তারা হাত পা ছড়িয়ে কান্না করছে। আল্লামা শফীদের কাছে ফোন করে হাউমাউ করে কাঁদছে। সেই সাথে, নাস্তিকদের প্রোফাইল খুঁজে খুঁজে রিপোর্ট করছে। ফেইসবুকের ইহুদী নাসারা নাস্তিক অথরিটির কাছে অনুরোধ করছে, যেন নাস্তিকদের প্রোফাইল বন্ধ করে দেয়া হয়। 

এসব থেকে বোঝা যায়, মুমিনরা আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখতে পারছে না। তারা বুঝতে পেরেছে, আল্লাহ কোন ফেরেশতা বা আবাবিল পাখি পাঠিয়ে নাস্তিকদের দমন করবেন না। আল্লাহ নাস্তিকদের মাথায় ঠাডা ফেলবেন না। মুমিনরা যে এভাবে আল্লাহর সার্বভৌমত্বে অবিশ্বাসী হয়ে  উঠছে, এটা আমাদের জন্য সুসংবাদ। আমাদের জন্য আনন্দের।

প্রিয় মুমিন ভাইয়েরা, আপনারাও আসলে নাস্তিকতার পথে অনেকদূর চলে এসেছেন। নইলে আপনারা আল্লাহর ওপরই ভরসা রাখতেন। আল্লাহর কাছে বিচারের দাবী জানাতেন। তা না জানিয়ে জনে জনে বিভিন্ন মানুষের কাছে বিচার দেয়ার প্রবণতাই আমাদের জন্য এক বিজয়। আপনাদের অবিশ্বাসের পথে স্বাগতম।

আল্লাহ আপনাদের জন্য কোন সাহায্য যেহেতু পাঠাচ্ছেনই না, কোন ফেরেশতা জ্বীন দৈত্য দানব কিছুই না, তাই নিজেদের যুক্তিকেই শক্তিশালী করুন। নইলে নাস্তিকদের সাথে কুলিয়ে ওঠা কঠিন। এই ব্যাপারটা যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন, আপনাদের জন্য ততই ভাল।

Monday, April 1, 2019

তুমি ওয়াশিকুরই

দেখতে দেখতে ৪ বছর পেরিয়ে গেল।

"একসময় সবাই মানুষ ছিল।
তারপর ঈশ্বরের আবির্ভাব হল ;
মানুষ হয়ে গেল
হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ইহুদি, শিখ ....."
-- ওয়াশিকুর রহমান বাবু

মুক্তচিন্তার প্রতীক, শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম কমরেড ওয়াশিকুর রহমানের জন্ম বাংলাদেশের একটি মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে ১লা জুন ১৯৮৮ সালে। সামাজিক ও পারিবারিক ধর্মীয় বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসা বাবুর জন্য খুব সহজ ছিল না। আর্থিক অসচ্ছলতার কারনে নাম করা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়ালেও পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিকূল অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার অবিরাম সংগ্রাম করেছে সে। যে দেশে এই বয়সের বেশিরভাগ তরুণেরা আড্ডা মেরে সময় কাটায়, সেখানে সে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে নিজেকে প্রস্তুত করছিলো ভবিষ্যতের জন্য। এই অল্প বয়সী রুগ্ন ছেলেটি তার লেখনীর মাধ্যমে যেভাবে ধর্মের ভীত ধরে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছিল, তা দেশের শক্তিশালী আর প্রতিষ্ঠিত অনেক লেখক আর বুদ্ধিজীবিরাও পারেননি।

মাত্র সাতাশ বছরের রুগ্নদেহী এই তরুণ সারা বিশ্বের মানুষকে নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেছে কিভাবে মেধা, যুক্তি আর সাহস দিয়ে কুসংস্কার, ভন্ডামী, ধর্মান্ধতা আর ধর্ম-ব্যবসার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়।
তিনি 'এথিস্ট বাংলাদেশ' এবং 'বাংলার শার্লি' সহ বেশ কয়েকটি ফেসবুক গ্রপের সদস্য ছিলেন।

২০১৫ সালের ৩০শে মার্চ ঢাকার তেজগাঁওয়ে ওয়াশিকুর বাবুকে বাসা থেকে পাঁচশ গজ দূরে অফিসে যাবার পথে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে খুন করে কিছু ধর্মের ভাইরাস। ফেসবুকে ওয়াশিকুরের সবশেষ প্রোফাইল ছবিটিই ছিল 'আই এ্যাম অভিজিৎ' লেখা একটি পোস্টার। তাতে ইংরেজিতে আরো লেখা আছে 'শব্দের মৃত্যু নেই'।

ছেলেটি বলেছিল - “কেউ আমাকে ধর্মবিদ্বেষী বলে অভিযুক্ত করলে আমি সেটা প্রত্যাখান করি না। কারণ ধর্মবিদ্বেষ অপরাধ নয়। মানববিদ্বেষ অপরাধ। পৃথিবীর সব ধর্মই মানববিদ্বেষে পূর্ণ। মানববিদ্বেষী ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা পবিত্র দায়িত্ব মনে করি।”

Saturday, March 23, 2019

ডঃ তপন বাগচী : বহুমুখী প্রতিভার স্বরূপ

ডঃ তপন বাগচী উত্তরাধুনিক যুগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।  তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আত্ম-আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হয়ে বহুরৈখিক শিল্পীসত্তার স্বরূপ জানতে আগ্রহী হয়ে উঠি। পড়াশোনার ব্যাপৃত পরিসরে গিয়ে মনে হলো, তাকে জানতে দীর্ঘ সময় দরকার। কেননা তপন বাগচীর সাহিত্যকর্মের বিশদ আলোচনার জন্য আরও সময় প্রয়োজন। তিনি সাহিত্যের পথে নিরন্তর এক শব্দচাষী। সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যার অপরিসীম অবদান। লিখে চলেছেন মহামূল্যবান গল্প-প্রবন্ধ-কবিতা-গান। আমৃত্যু লিখে যাবেন এ প্রত্যাশা আমার এবং আপনাদের। শিল্পীকে প্রকৃষ্ট সম্মান করতে দেখলে নিজের কাছেই ভালো লাগে। আর কিছু না হলেও অন্তত শিল্পীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি সুযোগ তৈরি হয়। এমনকি শিল্পী সম্পর্কে অজ্ঞাতদের জানানোরও একটি প্রয়াস লক্ষ করা যায়।তার দীর্ঘায়ু এবং সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনায় কিছু কথা বলার চেষ্টা করছি।

প্রাবন্ধিক, লোকসংস্কৃতিবিদ। জন্ম ২৩ অক্টোবর ১৯৬৮ সালে; কদমবাড়ি (মাতুলালয়) মাদারীপুর; পিতা তুষ্টচরণ বাগচী; মাতা জ্যোতির্ময়ী বাগচী। শিক্ষা: গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় এমএ ও পিএইচডি। উল্লেখযোগ্য কবিতাগ্রন্থ: শ্মশানেই শুনি শঙ্খধ্বনি, কেতকীর প্রতি পক্ষপাত, অন্তহীন ক্ষতের গভীরে, সকল নদীর নাম গঙ্গা ছিল। প্রবন্ধগ্রন্থ: সাহিত্যের এদিক-সেদিক, সাহিত্যের কাছে-দূরে, চলচ্চিত্রের গানে ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, লোকসংস্কৃতির কতিপয় পাঠ, বাংলাদেশের যাত্রাগান : জনমাধ্যম ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত, মুক্তিযুদ্ধে গোপালগঞ্জ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ : চন্দ্রাহত অভিমান, নির্বাচন সাংবাদিকতা, নজরুলের কবিতায় শব্দালঙ্কার, তৃণমূল সাংবাদিকতার উন্মেষ ও বিকাশ। পুরস্কার ও স্বীকৃতি: সাংস্কৃতিক খবর পদক (কলকাতা, ২০১৩), মাইকেল মধুসূদন পদক (২০১২), লিটল ম্যাগাজিন মঞ্চ সংবর্ধনা (নদীয়া ২০১০), সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার (২০০৯), কবি বাবু ফরিদী সাহিত্য পুরস্কার (২০০৯), মাদারীপুর সুহৃদ পর্ষদ সম্মাননা (২০০৯), ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ সম্মাননা (২০০৯), মহাদিগন্ত সাহিত্য পুরস্কার (কলকাতা ২০০৮), এম নূরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০০৮), জেমকন সাহিত্য পুরস্কার (২০০৮), অমলেন্দু বিশ্বাস স্মৃতি পদক (২০০৮), জসীমউদ্দীন গবেষণা পুরস্কার (১৯৯৬), মুনীর চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১)।

এখানে আমি তার কবিতা নিয়ে সামান্য আলোচনার প্রয়াস চালিয়েছি। শিল্পসাহিত্যে নতুনত্বের সাধনা একটি চলমান প্রক্রিয়া, কিন্তু মূল থেকে বিচ্যূত হয়ে লাফ দিয়ে নতুনত্বকে আলিঙ্গন করা যায় না। বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, ‘শিল্পসাহিত্যে নতুনত্ব একটি জীবিত বৃক্ষের ডালপালা বিস্তারের মতো: মূলকে অবলম্বন করেই যার বিস্তৃতি ও বিকাশ। রবীন্দ্রোত্তর আধুনিকতার জনকেরা নতুনত্বে প্রয়াসী হয়েও এই বোধে জারিত ছিলেন যে, আবহমান বাঙলা কবিতার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো আধুনিকতার চর্চাই ফলবতী হবে না। তাই, তাঁরা কবিতার ভাষা বদলে দিলেও প্রাকরণিক বিশুদ্ধতার সঙ্গে কোনো আপস করেননি। রবীন্দ্রযুগে, এমনকি মধ্যযুগে সূচিত প্রকরণের বাইরে যাননি বা শত চেষ্টা করেও যেতে পারেননি তাঁরা। বিশ-শতকীয় আধুনিকতার আদি জনক বোদলেয়র নিজেও ছিলেন সপ্তদশ শতকে প্রবর্তিত প্রকরণের প্রতি একান্ত বিশ্বস্ত। এক কবি-বন্ধুর একটি কবিতার একটি পঙক্তিতে সামান্য ছন্দ-পতন দেখে শেষ বয়সেও তিনি তাঁকে সাবধান করে দিয়েছিলেন।

সদ্যসমাপ্ত বিশশতকের নব্বইয়ের দশকে এসে আমাদের কবিতা যখন অন্তহীন নৈরাজ্যে নিপতিত, তখন তপন বাগচী’র মতো কবির আবির্ভাব আমাদের আশান্বিত করে, যখন দেখি বুদ্ধদেব বসুর অমোঘ কথাটিই প্রকাশ করেছেন তিনি তাঁর একটি কবিতার শেষাংশে এভাবে:
সহজে যায় না মানা শিল্পপ্রতারণা
পথকেই পথ দেয় পথের ঠিকানা
(পথের হিসেব)

পথই ভিন্ন পথের ঠিকানা বাতলে দেয়—এই বোধে যিনি জারিত তাঁর পথ হারাবার ভয় নেই। তাই তপন বাগচী তাঁর প্রজন্মের পথহারাদের দলে ভিড়ে যাননি। প্রাকরণিক বিশুদ্ধতাকে মান্য করেই তাঁর কবিতা নতুন পথের সন্ধানে যাত্রা শুরু করেছে। একটি বইয়ের শিরোনামে এবং এই শব্দগুচ্ছে ধৃত বিশ্বাসের সাথে লগ্ন কবিতা লিখে মৃত্যুর অব্যবহিত আগে হুমায়ুন আজাদও পুনর্ব্যক্ত করে গেছেন একই গুরুবাক্য ‘পেরোবার কিছু নেই’। দশকের গণ্ডি পেরিয়ে আবহমান বাংলা কবিতার সঙ্গে যুক্ত হবে তপন বাগচী’র কবিতা, এই আশা অমূলক নয়।তাঁর কবিতায় ছন্দ-প্রকরণের বিষয়টিকে আমি অত্যন্ত গুরুত্বের চোখে দেখেছি। তাঁর প্রজন্মের অধিকাংশ কবিই অক্ষম গদ্যকেই কবিতার প্রধান (কেউ কেউ একমাত্র) বাহন হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এ-কারণে পাঠক সম্প্রদায় তাদের কবিতাকে অপাঠ্য বলে প্রায় বর্জন করেছেন বলা যায়। এই পটভূমিতে তপন বাগচী’র কবিতা আমাদের আশান্বিত করে। আধুনিক কবি হয়েও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত একটিও গদ্যকবিতা লেখেননি; জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব বসু নগণ্যসংখ্যক গদ্যকবিতা লিখেছেন; নবাগতদের হাতে আঙ্গিকের নৈরাজ্য দেখে শামসুর রাহমান শেষ বয়সেও বলে গেলেন ‘সনেটে প্রত্যাবর্তন আমার একধরনের প্রতিবাদ’ (জনকণ্ঠ সাময়িকী, ২৩ অক্টোবর ১৯৯৬); আল মাহমুদ বলেছেন, ‘যে কবি ছন্দ জানে না, সে কিছুই জানে না’ (ইনকিলাব সাহিত্য, ৩ অক্টোবর ১৯৯৭)।

অবশ্য, কবিতায় বাক-বিভূতি কেবল ছন্দ-মাধুর্য্যের ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু কবিতাকে কবিতা হয়ে ওঠার জন্য ছন্দ একটি আবশ্যিক উপাদান—এ-কথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এ-লেখায় উল্লেখিত সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সুনিল গঙ্গোপাধ্যায়, বুদ্ধদেবে বসু,শামসুর রাহমান, ও হুমায়ুন আজাদ-এর অভিমতে। তবু, কারও কাব্যকৃতির মূল্যায়ন পূর্ণ হয় না যদি অন্তত ছয়টি প্রতিতুলনাজাত অলঙ্কার: উপমা-উৎপ্রক্ষা-রূপক-প্রতীক-সমাসোক্তি-অন্যাসক্ত এবং এর সঙ্গে চিত্রকল্প ও মিথকল্প ব্যবহারে তার শক্তিমত্তা আলোচিত না-হয়। আমি কবিতার আলোচনায় যে-ধরনের উপাত্ত-নির্ভর বিশ্লেষণের প্রয়াসী, তাতে প্রতিতুলনাজাত অলঙ্কার নির্মাণে এই কবির সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা তুলে ধরার জন্য বৃহত্তর পরিসরে অচিরেই ভিন্ন একটি লেখার কথা ভেবে রেখেছি। বলে রাখা যায়: এ-বিষয়েও তপন বাগচী দখল করে আছেন তাঁর প্রজন্মের কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম আসনটি। লক্ষ করা গেছে: প্রচলিত উপমা-উৎপ্রক্ষা ও প্রতীকের চেয়ে এই কবি শব্দ ও বাক্যস্তরের রূপক, সমাসোক্তি, অন্যাসক্ত, এমনকি অতিশয়োক্তির মতো অবহেলিত অলঙ্কার নির্মাণে বেশি উৎসাহী। এইসব অবহেলিত সোনা আহরণ করে তিনি তাঁর কবিতাকে নিজস্ব কায়দায় সমৃদ্ধ করে তুলছেন।

তাঁর সম্পর্কে কারও কোনো অতিকথন আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। ফলে অকপটেই বলে দিতে পারি, ড. তপন বাগচী যা, তা-ই বলেছেন তার অগ্রজ ও অনুজরা। সস্তা জনপ্রিয়তার ধারায় ভেসে যাওয়ার মতো অভিধা তিনি অর্জন করেননি। দুই বাংলাতেও তার সমান গ্রহণযোগ্যতা লক্ষ্য করা যায়। তার গান, গবেষণা, ছড়া, কবিতা—সমানভাবেই সমাদৃত দুই দেশের বাংলা ভাষাভাষীর মধ্যে। বহু কর্মগুণে গুণান্বিত এই মানুষটি শত বছরের কোটায় পৌঁছাবেন এমন প্রত্যাশা আমাদের সবার। লেখালেখির জগতে প্রচলিত একটি কথা হচ্ছে—কবি-সাহিত্যিকরা বেঁচে থাকতে সমাদর পান না। কিন্তু ডঃ তপন বাগচীর ক্ষেত্রে তা পুরোটাই বিপরীত।

সবশেষে 'স্রোত' পত্রিকার সম্পাদক তথা কবি গবিন্দ ধরকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই এবারের সংখ‍্যায় 'ডঃ তপন বাগচী' নিয়ে কাজ করার জন্য।। কুর্নিশ জানাই লেখকসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা নিবেদন করছি। অশেষ শুভ কামনা গুণী এই মানুষটির জন্য। তিনি বেঁচে থাকুন আমাদের মাঝে। তার সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে তিনি বেঁচে থাকুন অনন্তকাল। তপনের আলোয় আলোকিত হোক আমাদের সাহিত্য জগৎ। আগামীর পথচলা আরও মসৃণ হোক একামনায় ভুল-ত্রুটি মার্জনার দৃষ্টিতে দেখার বিনয়াবনত আবেদন রেখে এখানেই শেষ করছি।

Friday, March 22, 2019

“ওরে গৃহবাসী, খোল্‌ দ্বার খোল্‌,লাগল যে দোল”


রবীঠাকুর তাঁর এই গানের মাধ্যমে সবার এক হওয়ার,মিলনের দ্বার  খুলে গেছিলেন। আগমনী বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। অসাধারণ মিলন সেঁতু গড়ে ছিলেন এই গানের মধ‍্যে। এই বসন্ত উৎসবকে দেখা হয় নতুন জীবনের বার্তাবাহক হিসেবে। জাতিতে জাতিতে বিভিন্ন ধরণের আয়োজন করা হয় এই উৎসবের। মধুময় বসন্তে ফুলের সৌরভে মেতে উঠবে চারিপাশ। কোকিলের কুহুতান, মৌমাছিদের গুঞ্জরণ, মাতাল হাওয়া প্রাণে প্রাণে দেবে দোলা। শীতের আবরণে লুকিয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া জেগে উঠবে সোনালি রোদের স্পর্শ। বাতাসে ভেসে আসা ফুলের গন্ধে জানিয়ে দিল বসন্ত কড়া নাড়ছে দুয়ারে।


গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঋতুভিত্তিক উৎসবের মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানুষ এবং বিশ্বজগতের বন্ধন শান্তিপূর্ণ করতে চেয়েছেন। মানবের জীবন যাপনে প্রকৃতির সম্পর্ক যত বেশি উপেক্ষিত হবে, ততই নেতিবাচক হবে পরিবেশ। প্রকৃতির উপর মানব আধিপত্য স্থাপন করতে গিয়ে বৈচিত্র্যের পৃথিবীতে স্বাভাবিক সৌন্দর্য দিন দিন লোপ পেতে বসেছে।  দেশের সাথে অন্য দেশের অসম প্রতিযোগিতা, অসম বাণিজ্য, শিল্প কারখানা নগর আলয়ের অপরিকল্পিত বিস্তার, অবাধ তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার, ক্ষমতা আধিপত্য স্থাপনে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার,  যা মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করছে। প্রতিনিয়ত মানুষের সাথে অন্যের প্রীতিবন্ধন, আত্মীয়তা হিংস্র হয়ে উঠছে। স্বপ্নের মতো সুন্দর বিশ্ব প্রতিনিয়ত সকল জীবজন্তুর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। মানবের উদ্ভাবন, নিরীক্ষা আনন্দদায়ক,  তবে তার প্রয়োগ আধিপত্যকে নিশ্চিত করে। এই আধিপত্যের নির্মমতায় বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ, জীবজন্তু,  গাছপালা অসহায় হয়ে পড়েছে। নদ নদী সমুদ্র মহাসাগর, পাহাড় পর্বত সমতল ভূখণ্ড, গভীর বন জঙ্গল পর্যায়ক্রমে চিরায়ত সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলছে। বিশেষ করে বিলীন হতে চলেছে বহুযুগের ভারসাম্য।  গ্রহ নক্ষত্র সৌরজগতের উপর অবাধ নিরীক্ষায় মানবের শান্তির আবাসস্থল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চরম সংকটে পড়তে শুরু করেছে। প্রতিকূল বিপন্ন বিশ্বে মানব সমাজ দোল, হোলি নামক উৎসবের মাধ্যমে সর্বমানবের ঐক্য সূচনা করতে পারে।


কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বোধকরি সেই উপলব্ধিতে বলেন, ' বিশ্বের সহিত স্বতন্ত্র বলিয়াই যে মানুষের গৌরব তাহা নহে। মানুষের মধ্যে বিশ্বের সকল বেচিত্র্যই আছে বলিয়া মানুষ বড়ো। মানুষ জড়ের সহিত জড়, তরুলতার সঙ্গে তরুলতা, মৃগপক্ষীর সঙ্গে মৃগপক্ষী। প্রকৃতি-রাজবাড়ির নানা মহলের নানা দরজা তাহার জন্য খোলা।... পুরা মানুষ হইতে হইলে তাহাকে সবই হইতে হইবে, এ কথা না মনে করিয়া মানুষ মনুষ্যত্বকে বিশ্ববিদ্রোহের একটি সংকীর্ণ ধ্বজাস্বরূপ খাড়া করিয়া তুলিয়া রাখিয়াছে কেন? কেন সে দম্ভ করিয়া বার বার এ কথা বলিতেছে-- আমি জড় নহি, আমি উদ্ভিদ নহি, পশু নহি, আমি মানুষ; আমি কেবল কাজ করি ও সমালোচনা করি, শাসন করি ও বিদ্রোহ করি। কেন সে এ কথা বলে না-- আমি সমস্তই, সকলের সঙ্গেই আমার অবারিত যোগ আছে, স্বাতন্ত্র্যের ধ্বজা আমার নহে (বসন্তযাপন)।


যেভাবে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তার কবিতায় বলেছিলেন--

"ফুল ফুটুক না ফুটুক

আজ বসন্ত।” 

জিজ্ঞেস করা হয় যদি বসন্তের রং তবে নিশ্চিত 'বাসন্তী'।  আর গাঁদা ফুলের রঙেই আজ সাজবে তরুণ-তরুণীরা। পরবে বাসন্তী রঙের শাড়ি। খোঁপায় গুজবে ফুল আর হাতে পরবে কাচের চুড়ি। তরুণরাও বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবি পরে নামবে বাংলার পথে ঘাটে। সত্যিই বাঙালি জীবনের সাথে একাকার হয়ে আছে এই ঋতুরাজ বসন্ত। বাংলার এই ছয় ঋতুর মধ্যে বসন্ত রঙিন ডালি নিয়ে সকলের মনে দোলা দিয়ে যায়। তাইতো বসন্ত সকল ঋতুর মধ্যে চির রঙিন।


বাঙালির জীবনের সঙ্গে একাকার হয়ে আছে বসন্ত। বসন্তের বন্দনা আছে কবিতা, গান, নৃত্য আর চিত্রকলায়। বসন্তের প্রথম দিনকে বাঙালি পালন করে ‘পহেলা ফাল্গুন-বসন্ত উৎসব’ হিসেবে। এ উৎসব এখন সব বাঙালির উৎসব। এই উৎসবটির একটি ঐতিহ্যময় ইতিহাস আছে। মোগল সম্রাট আকবর প্রথম শুরু করেন ১৫৮৫ সালে। এই ঋতুভিত্তিক উৎসব একেক দেশে আয়োজন করা হয় একেক সময় একেক নামে। কখনো কখনো আবার একই উৎসব দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যায় প্রতিবেশী দেশগুলোতেও।


প্রায় তিন হাজার বছর ধরে উদযাপিত এই উৎসবের উৎপত্তি ইরানে। নাম ‘নওরোজ’ ।  বাদশাহ জমশেদ এই উৎসবের প্রচলন শুরু করেছিলেন। আজ ছড়িয়ে পড়েছে মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, চীনের উত্তর-পশ্চিম ও ইউরোপের বলকান অঞ্চলে। জাপানের চেরি ফোটার উৎসব,চীনা নতুন বছর, হোলি উৎসব এইভাবে বিভিন্ন নামে প্রচলিত এই ঋতু উৎসব। ২০১০ সালে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ এই দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক নওরোজ দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।


বসন্ত উৎসবকে দোলযাত্রাও বলা হয়। দোলযাত্রা মূলত একটি হিন্দু বৈষ্ণব উৎসব বলেই বিবেচিত। ইংরেজরা প্রথম দিকে এই উৎসবকে রোমান উৎসব ‘ল্যুপেরক্যালিয়া’ হিসেবেই মনে করেছিলো। অনেকে আবার একে গ্রীকদের উৎসব ‘ব্যাকানালিয়া’-এর সঙ্গেও তুলনা করতো। দোল বা হোলি ধর্মীয় অনুষঙ্গের আড়ালে থাকা এক সামাজিক অনুষ্ঠানও বটে, যার সার্বজনীন আবেদন আছে। দোলযাত্রা উৎসবের একটি ধর্মনিরপেক্ষ দিকও রয়েছে। এখন আর শুধুমাত্র সনাতন ধর্মালম্বীদের মধ্যে হোলি খেলা নয়, বরং সব ধর্মের নারী পুরুষের মধ্যেই রঙ খেলার প্রবণতা দেখা যায়। মধ্যযুগে সম্রাট আকবর বাংলা বর্ষপঞ্জী হিসেবে আকবরি সন বা ফসলী সনের প্রবর্তন করেন। সেসময় ১৪টি উৎসব পালনেরও রীতি প্রবর্তিত হয়। এর অন্যতম ছিলো বসন্ত উৎসব। সেসময় বাংলার সকল সম্প্রদায়ের মানুষই বসন্ত বরণে বিভিন্ন লোকজ উৎসব ও মেলায় অংশ নিতেন। পহেলা ফাল্গুনে বসন্ত উদযাপনের রীতিও ঐতিহ্যবাহী।


কাজী নজরুল ইসলাম বসন্ত নিয়ে তাঁর একটি গানে লিখেছিলেন--

‘বসন্ত আজ আসলো ধরায়,

ফুল ফুটেছে বনে বনে,

শীতের হাওয়া পালিয়ে বেড়ায় ফাল্গুনী মোর মন বনে।’


শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালনের রীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই চলে আসছে। এখনো সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। আরেকটি সূত্র থেকে জানা যায়, ১৯০৭ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুরু করেছিলেন ঋতুরঙ্গ উৎসব। সেদিন শান্তিনিকেতনের প্রাণ কুঠিরের সামনে শুরু হয় এ উৎসব। এখন অবশ্য সেদিনের প্রাণকুঠি শমীন্দ্র পাঠাগার হিসেবে পরিচিত। সেই ঋতুরঙ্গ উৎসবই আজকের বসন্ত উৎসব। আগে বসন্তের যেকোনো দিন অনুষ্ঠিত হতো এ উৎসব। পরবর্তীকালে অবশ্য বসন্ত পূর্ণিমার দিনই অনুষ্ঠিত হয় এ উৎসব। এ উৎসব অবশ্য ঋতুরাজ বসন্তে স্বাগত জানানোর উৎসব। আমাদের পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশেও ষাট দশক থেকেই পহেলা ফাল্গুনে হলুদ শাড়ি পরা নতুনভাবে শুরু হয় বলে জানা যায়।


জীবনানন্দ দাশের প্রিয় ঋতু হেমন্ত হলেও তার কবিতাতেও পাওয়া যায় বসন্তকে। 'পাখিরা' কবিতায় তিনি লিখেছেন, 'আজ এই বসন্তের রাতে/ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে;/ওই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর,/স্কাইলাইট মাথার উপর,/আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর…'।


বাঙালির জীবনে সার্বজনীন উৎসব বসন্ত । কবিতা, গান, নৃত্য আর চিত্রকলায় আছে বসন্তের বন্দনা। সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শনেও বসন্ত ঠাঁই করে নিয়েছে তার আপন মহিমায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে আধুনিককালের বাউল কবির মনকেও বারবার দুলিয়েছে ঋতুরাজ বসন্ত। বসন্ত শুধু অশোক-পলাশ-শিমুলেই উচ্ছ্বাসের রং ছড়ায় না, আমাদের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্তরঙিন পুষ্পিত রক্তের স্মৃতির ওপরও রং ছড়ায়। বায়ান্ন, একষট্টির দিনের সঙ্গে তারুণ্যের সাহসী উচ্ছ্বাস আর বাঁধভাঙা আবেগের জোয়ার যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। বাংলা পঞ্জিকা বর্ষের শেষ ঋতু বসন্তের প্রথম দিনকে আমরা পালন করি ‘পহেলা ফাল্গুন-বসন্ত উৎসব’ হিসেবে। এ উৎসব এখন পরিণত হয়েছে বাঙালির নিজস্ব সার্বজনীন প্রাণের উৎসবে। বসন্তের প্রথম মুহূর্তকে ধরে রাখতে তাই তো সবাই মেতে ওঠে নানা উৎসব ও সাজে। আমের মুকুলের সৌরভে আর পিঠাপুলির মৌতাতে আর বসন্তের আমেজে আমরাও দ্বার খুলি মুক্ত আলিঙ্গনে। বসন্তকে বরণ করি আরও নিবিড়ভাবে।


"ইচ্ছেরা রঙ খেলুক

স্থলে-জলে-বনতলে

আবিরে আবির রাঙানো ডানা

তুবড়ির মতো উড়ুক সারা বাংলার আকাশে।"

Monday, March 18, 2019

*#দেখতে_দেখতে_ভারতবর্ষ_ছেয়ে_যাওয়া_একটি_নাম -* *#সাবিত্রীবাই_ফুলে.*

এক দশক আগে পর্যন্ত সাবিত্রীবাই ফুলে ছিলেন উত্তর ভারতের মধ্যে কিছু মানুষের কাছে পরিচিত একটি নাম.

প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় বিখ্যাত মহিলাদের নাম বলতে সরোজিনী নাইডু ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ, মহাপুরুষদের নাম বলতে গান্ধিজি নেতাজী বিবেকানন্দ রাজা রামমোহন- ব্যাস এদের মধ্যে আটকে থাকে মহাপুরুষদের পরিচিতি.

দলিত বহুজন কিছু রাজনৈতিক দল সাবিত্রীবাই ফুলে জ্যোতিবা ফুলে এনাদের নাম ব্যবহার করে থাকে  ফলে তাদের পরিচিতি সারাদেশে ততটা নেই.

কিন্তু দেখতে দেখতে বিগত কয়েক বছরের মধ্যেই  সারা দেশ ছেয়ে গেছে সাবিত্রীবাই ফুলে জ্যোতিবা ফুলে বাবাসাহেব আম্বেদকরের  নাম.

কিভাবে ঘটলেই মিরাকেল??

3 জানুয়ারি 2018 গুগোল সাবিত্রীবাইয়ের  ছবি দিয়ে ডুডুল  তৈরি করে.
এবং সেখানে লেখে সাবিত্রীবাই ফুলে ভারতবর্ষের সমাজ সংস্কারের মহানায়িকা.

দু'বছর আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী উপেন্দ্র কুশবাহ্  প্রস্তাব দেন যে সাবিত্রীবাই ফুলের  জন্মদিনকে শিক্ষিকা দিবস হিসাবে সারাদেশে উদযাপন হোক.

দেশের পুরানো বড় ইউনিভারসিটি গুলির মধ্যে পুনে হলো একটি পুরানো ইউনিভার্সিটি.

মহারাষ্ট্র সরকার পুনে ইউনিভার্সিটি কে সাবিত্রীবাই ফুলে পুনে ইউনিভার্সিটি নামাঙ্কিত করে.

মহারাষ্ট্র সরকার  কেন্দ্রের  কাছে প্রস্তাব পাঠান সাবিত্রীবাই ফুলে ও জ্যোতিবা ফুলেকে ভারতরত্ন দেওয়া হোক.

আজ থেকে 187 বছর আগে মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার একটা ছোট্ট গ্রামে  পিছড়েবর্গের মালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সাবিত্রীবাই ফুলে.

মাত্র নয় বছর বয়সে নিজের থেকে চার বছরের বড় জ্যোতিবা ফুলের সঙ্গে বিবাহ হয় সাবিত্রীবাই ফুলের .

জ্যোতিবা শিক্ষিত ছিলেন তাই তিনি নিজের ঘরেই সাবিত্রীবাই ফুলেকে পড়াশোনা শেখাতে লাগলেন.

সেই সময় মেয়েদের পড়াশোনা তো সম্ভবই ছিল না, তার উপরে শূদ্র মালির ঘরের মেয়ে যা ছিল একেবারেই অসম্ভব -কিন্তু জ্যোতিবা ফুলে নিজের জেদ এবং মনের জোরের কারণেই সাবিত্রীবাই ফুলে কে শিক্ষিতাকরে তোলেন.

সাবিত্রীবাই ফুলের  সঙ্গে আর এক মহিলা ছিলেন ফতেমা শেখ.
তাঁরা একসঙ্গেই পড়াশোনা শেখেন এবং পরবর্তীকালে একসঙ্গেই সমাজ সংস্কারের কাজে, কাজ করে যান.

*#সাবিত্রীবাই_ফুলের_জীবনের_কিছু_উপলব্ধি--*

1) সাবিত্রীবাই ফুলে নিজের স্বামীর সঙ্গে 1848 সালে প্রথম মহিলাদের জন্য স্কুল খোলেন, আধুনিক ভারতে মহিলাদের জন্য এটি প্রথম স্কুল হিসেবে মনে করা হয়.

সেই সময় মহিলাদের জন্য আলাদা কোন শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না, এমনকি মিশনারি স্কুল গুলোতেও  মেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা ছিল না.
আসলেই মেয়েদের কোন শিক্ষার অধিকার ছিল না, সাবিত্রীবাই ফুলে প্রথম মহিলাদের শিক্ষার দরজা খুলে দিলেন 1848 সালে.

2) নিজেদের জীবনকালে ফুলে দম্পতি প্রায় 18 খানা স্কুল খোলেন.
ব্রিটিশ সরকার তাঁদের  এই মহান উদ্যোগ এর জন্য- কাজের জন্য পুরস্কৃত করেন.

3) এই স্কুলে সাবিত্রীবাই ফুলে ছিলেন প্রধান অধ্যাপিকা, সঙ্গে ফতেমা শেখও এই  স্কুলে পড়াতেন. এই স্কুল ছিল সমস্ত সমাজের মহিলাদের জন্য. এই স্কুল ভারতবর্ষে প্রথম দলিত  মহিলাদের পড়ার সুযোগ তৈরি করে দেয় .

4) যখন সাবিত্রীবাই ফুলে ঘর থেকে স্কুলে পড়ানোর উদ্দেশ্যে বের হতেন তখন পাড়ার মেয়েরা সাবিত্রীবাই ফুলের  গায়ের উপর গোবর- পাথর-মল  ছুড়ে মারতেন, পরিহাস করতেন, গালিগালাজ করতেন, এমনকি মারতে আসতেও উদ্যত হতেন.

সাবিত্রীবাই ফুলে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় একাধিক শাড়ি নিয়ে বের হতেন. স্কুলে গিয়ে আবার শাড়ি পাল্টে নিতেন.  
কারণ রাস্তায় তার পরনের শাড়ির উপর গোবর মল পাথর ছুড়ে নোংরা করে দিতেন পাড়ার মেয়েরা.

5) সাবিত্রীবাই ফুলে সেই সময় নিজের ঘরের জলের কুয়া দলিতদের জন্য খুলে দিয়েছিলেন এ ছিল এক ঐতিহাসিক এবং বৈপ্লবিক পদক্ষেপ কারণ দলিতদের  সাধারণ কুয়া থেকে জল পান করা নিষিদ্ধ ছিল.

6) সাবিত্রীবাই ফুলে সেই সময় গর্ভবতী বিধবা মহিলাদের জন্য আশ্রম তৈরি করেন.
সেই সময় উঁচু জাতির গর্ভবতী বিধবা মহিলাদের সমাজে বেশি কলঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো.

সাবিত্রীবাই ফুলে তাদেরকে নিয়ে তাঁর  আশ্রমে সন্তান প্রসব করতে বলতেন, কারণ তিনি মনে করতেন যে সন্তান পৃথিবীতে জন্ম নিচ্ছে সে নিষ্পাপ তাকে মেরে ফেলা ঘোর অপরাধ.

এমনই এক বিধবা মায়ের সন্তান যশোবন্ত ফুলে, সাবিত্রীবাই ফুলে তাকে নিজের সন্তান হিসেবে মানুষ করেন এবং পরবর্তীকালে যশোবন্ত ফুলে ডাক্তার হয়ে তার মায়ের সমাজ সংস্কার আন্দোলনে সহযোগিতা করেন.

ভাবতে অবাক লাগে আজ থেকে 187 বছর আগে এক মহিলা তাও আবার শূদ্র ঘরের মহিলা, কত উদার কত মহান চিন্তা ভাবনা নিয়ে সমাজ শোধরাতে এগিয়ে এসেছিলেন.

7) সেই সময় বিধবা মহিলাদের মাথার চুল কেটে ন্যাড়া করে দেয়া হতো তাদের মাথার চুল কেটে সমাজে বেঁচে থাকতে হত.
কি জঘন্য অমানবিক এই প্রথা.

সাবিত্রীবাই ফুলে এই প্রথার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন এবং মানুষকে সংগঠিত করেন এবং সেই সময়ে তিনি হরতালও  করেছিলেন.

জ্যোতিবা ফুলে যিনি  সাবিত্রীবাই ফুলের স্বামী, তিনিও ছিলেন বিখ্যাত সমাজসেবক.
বাবাসাহেব আম্বেদকর যাকে নিজের গুরু বলে মানতেন.
জ্যোতিবা ফুলে মারা যাওয়ার পর সাবিত্রীবাই ফুলে তাঁর  সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যান সারা জীবনধরে.

9) সাবিত্রীবাই ফুলে কবিতা লিখতেন, সামাজিক সচেতনতামূলক কবিতা- অমানবিক জঘন্য জাতি-প্রথা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেছিলেন, তাঁর  সমস্ত লেখাগুলি সংকলন করে চারটি বই আকারে তৈরি করা হয়েছে.

10) 1897 সালে পুনেতে প্লেগ মহামারী দেখা দেয়. সাবিত্রীবাই ফুলে প্লেগ রোগীদের সেবা করতে  লেগে পড়েন, সেই সেই মারণ ছোঁয়াচে রোগের কবলে পড়ে সাবিত্রীবাই ফুলের  মৃত্যু হয়.

সাবিত্রীবাই ফুলে ছিলেন ভারতবর্ষের ইতিহাসে মহামানবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ.

ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজব্যবস্থা তাদেরকে শূদ্র  বানিয়েছে, সেই সমাজ থেকেই এক মহিলা যে কিনা সমগ্র ভারতবর্ষের মহিলাদের জন্য শিক্ষার দরজা খুলে দিয়েছিলেন.

শুধু তাই নয় এত বছর আগেও একজন মহিলা এত মহান -এত উদার -মানবিক হতে পারেন তা ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিরল.

কিন্তু দুঃখের বিষয় ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতিবাদী সমাজব্যবস্থা এই মহানায়িকাকে সর্বদা জনসমাজের আড়ালে রেখে দিয়েছে, প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় সাবিত্রীবাই ফুলের নাম নেই সাবিত্রীবাই ফুলের কর্মকাণ্ড আলোচনা হয় না.

কারণ ব্রাহ্মণ্যবাদী শিক্ষা ব্যবস্থায় যারা সিলেবাস তৈরি করে যারা সিস্টেম চালায় তারা সর্বদা এই দলিত- শূদ্র সমাজের মানুষদের হেয় চোখে- ছোট চোখে দেখে এবং সেই ভাবেই বিচার করে.

এটাই বাস্তব যেমনটা বাবাসাহেব আম্বেদকরের  সঙ্গে হয়েছে.

কিন্তু বিগত কয়েক বছরের মধ্যেই সাবিত্রীবাই ফুলে আজ ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে আলোচিত এক মহানায়িকার নাম তার কারণ বর্তমান ইন্টারনেট সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মানুষের কাছে এইসব সত্যগুলো পৌঁছে যাচ্ছে খুব সহজে.

সাবিত্রীবাই ফুলের  কাছে আমরা কৃতজ্ঞ কারণ ভারতবর্ষের মহিলাদের শিক্ষার দরজা তিনিই  খুলে দিয়েছিলেন সর্বপ্রথম.

https://hindi.thequint.com/voices/opinion/know-about-savitribai-phule-her-life-achievements
----------------------------------------

(গীতা যাদব এর লেখা থেকে বঙ্গানুবাদ.)
------------------------------------------------------------------

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...