Thursday, July 25, 2019

মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংসে পুঁজিবাদ

"পুঁজিবাদীরা উৎপাদনের প্রযুক্তিকে বিকাশ করে আর নানা ধরনের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ সমাজে মিশিয়ে দেয় | এইসব তারা করে সম্পত্তির মূল স্রোত, মাটি আর শ্রমিকদের সম্পূর্ণ শোষন করে” – কার্ল মাক্স

গোটা বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদী শাসন চলছে। এই পুঁজিবাদের অভ্যুদয় ঘটেছিল সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে, সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে, তখন শিল্প বিপ্লবের ঝান্ডা বহন করে ব্যাপক শিল্পায়ন, বিজ্ঞানের অগ্রগতি, সাহিত্য-সংস্কৃতির অগ্রগতি, মানবতাবাদ-গণতন্ত্রের স্লোগান, সাম্য-মৈত্রীর আহ্বান, স্বাধীনতার আহ্বান এইসব ঘোষণা নিয়ে পুঁিজবাদ মানবজাতির সামনে উপস্থিত হয়েছিল। সেই সময় যারা ফরাসি বিপ্লব, ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব, জার্মানির পেজেন্টস মুভমেন্ট, যার মধ্য দিয়ে সভ্যতার জয়যাত্রা শুরু, যারা প্রাণ দিয়ে লড়াই করেছিলেন, তারা কেউই দুঃস্বপ্নে ভাবেন নাই এই পুঁজিবাদ আজকে মানবসভ্যতাকে কী ভয়ঙ্কর বিপদের সম্মুখীন করবে।
সে সময় যদিও মহান মার্কস পুঁজিবাদের সংকট দেখে যান নাই। কিন্তু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে হাতিয়ার করে তিনি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন, এই পুঁজিবাদও ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি করবে। কারণ পুঁজিবাদের নিয়ম, পুঁজির ইনভেস্টমেন্ট (বিনিয়োগ) মুনাফার জন্য, আর মুনাফা অর্জন করতে হলে শ্রমিককে ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করেই মুনাফা অর্জন করতে হবে। অংকশাস্ত্র দিয়ে সেই সময় মার্কস এটা দেখিয়েছিলেন। সারপ্লাস লেবার দ্বারাই সারপ্লাস ভ্যালু (উদ্বৃত্ত শ্রম থেকেই উদ্বৃত্ত মূল্য), যেখান থেকে পুঁজিপতিরা মুনাফা অর্জন করে, আর এখান থেকে পুঁজিবাদের বাজার সংকট আসবে — একথা তিনি বলেছিলেন এবং বলেছিলেন, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রেই সর্বাত্মক সংকট সৃষ্টি করবে।
পুঁজিবাদ হচ্ছে মুনাফা-কেন্দ্রিক অর্থনীতি, সেখানে সামরিক খাত - অন্যতম মুনাফা অর্জনকারী একটা বিষয়। এছাড়াও পুঁজিবাদী দেশসমূহের মধ্যেকার প্রতিযোগিতার কারণে এবং শক্তি দিয়ে গণপ্রতিরোধ দমন ও নতুন বাজার দখলের প্রয়োজনে, সামরিক খাতকে বিকশিত ও আধুনিকীকরণ করতে হয়। উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর শাসকশ্রেণী অনুন্নত দেশগুলোতে আত্মনির্ভর শিল্পায়নের ক্ষেত্রে আগ্রহ না দেখালেও অসামরিক আমলাতন্ত্র ও সশস্ত্র বাহিনীর টেঁকসই উন্নয়নে বিপুল আগ্রহ, উদ্যোগ, সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করে। এর ফলে, ‘তৃতীয় বিশ্ব’তে শিল্প-বুর্জোয়া বা উদ্যোক্তার ভিত্তি দুর্বল হলেও, গড়ে উঠেছে ”অতি বিকশিত” সামরিক-অসামরিক আমলাতন্ত্র; যা রাজনৈতিক ক্ষমতা, নীতি নির্ধারণ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকায় থাকে। রাজনৈতিক উত্থান-পতনে, দ্বন্দ্ব-সংঘাতে, ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় সামনে থাকে রাজনৈতিক দল, যারা ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে; কিন্তু ক্ষমতাশালী সামরিক-অসামরিক আমলাতন্ত্র কখনোই ক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়না। একারণেই এসব দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি বিকশিত হতে পারেনি; বিকশিত হয়েছে, শক্তিশালী হয়েছে অসামরিক আমলাতন্ত্র।
সামরিকীকরণ চলে দু’টো সমান্তরাল প্রক্রিয়ায়; একদিকে সামরিক শক্তির বিপুল বৃদ্ধি ঘটে, অন্যদিকে জনগণকে শক্তিহীন করে তোলার জন্য নির্দিষ্ট ভূয়ো আদর্শের প্রচার চালানো হয়, যাতে বিরুদ্ধ শক্তিকে দমন করার তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ সহজ হয়। সমাজ ও রাষ্ট্রে সামরিকীকরণের প্রমাণ হচ্ছে পুলিশ, জেলখানা, গুপ্তচর, অস্ত্র এবং সৈন্যবাহিনীর ক্রমবর্দ্ধমানতা। রাষ্ট্রের সম্পদ সামাজিক খাতগুলো থেকে ‘নিরাপত্তা’ নামধারী খাতে ক্রমবর্ধমান হারে স্থানান্তরিত হয়। সামরিকীকরণ কেবলমাত্র মারাত্মক বিধ্বংসী অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী নয়; গোটা সমাজের চিন্তা-চেতনার সামরিকীকরণ, একে পূর্ণতা দান করে। গোটা সমাজে একটা অস্থিরতার জিগির তোলা, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী ধুয়ো তোলা, নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে সবকিছুকেই সামরিক কায়দায় সম্পন্ন করার চেষ্টা, সন্ত্রাসকে আইনগত বৈধতা দান ইত্যাদি হচ্ছে তার তাত্ত্বিক-ব্যবহারিক দিক। অর্থনীতিতে একচেটিয়াবাদের প্রাধান্য ঘটে; ছোট ছোট পুঁজিকে বড় ও দুর্বৃত্ত পুঁজি গিলে ফেলে, অর্থাৎ সামরিকীকরণ হচ্ছে সামরিকতাবাদের সাথে একটা কাল্পনিক আদর্শের মেলবন্ধন – যা মূলত ফ্যাসিবাদেরই নামান্তর। তাই সামরিকীকরণ হয় বিভিন্নভাবে; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভৃতি। সরাসরি সামরিক স্বৈরশাসন ঝাঁপিয়ে পড়ে তখনই, যখন দেশের পুঁজিপতি-ধনিক শাসকশ্রেণী পোশাকী গণতন্ত্রের মোড়কে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটা আর চালাতে পারে না, পুঁজিপতি-ধনিক-বণিক গোষ্ঠীর অন্তর্দ্বন্দ্ব যখন আত্মঘাতী কলহে লিপ্ত হয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সঙ্কটময় করে তোলে, শোষণ-বঞ্চনার চরমে পৌঁছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যখন শ্রমিকশ্রেণী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশ বিদ্রোহ করতে উদ্যত হয়, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ যখন অনুন্নত দেশটিতে পোশাকী গণতান্ত্রিক আবরণে শোষণ-লুন্ঠন চালাতে বাধা ও ঝামেলার সম্মুখীন হয় – তখন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচাইতে শক্তিশালী অঙ্গ, সামরিক বাহিনী সরাসরি ক্ষমতা দখল করে, পুঁজি-ব্যবস্থাকে ‘বিপদ’ থেকে ‘উদ্ধার’ করার জন্য। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার একটা ‘সুরাহা’ করে তারা সরে যায় বা সরে যেতে বাধ্য হয়। কারণ ইতিমধ্যে পুঁজিপতি-ধনিক শ্রেণীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা তাদের ‘ভুল’ শুধরে আবার ঐক্যবদ্ধ হয়, জনগণের কাছে ‘ভালো’ হয়ে যায় এবং ক্ষমতা ফিরে পায়। কিন্তু এই সমগ্র প্রক্রিয়াটিতে একমাত্র 'ভিক্টিম' হয়ে থাকে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ - তাদের আর দিন বদল হয়না, তারা শুধুই পুঁজির মুনাফা অর্জনের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকে, নিজেদের ঘাম রক্তের বিনিময়ে পুঁজির স্ফিতি ঘটিয়ে চলে।
খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, ‘মডার্নিজম’ বা ‘আধুনিকায়ন’ বলে কোনো বস্তু ছিলনা। এটা আসে ১৯৪৫ সালের পর, পৃথিবীর ক্ষমতায়নের দ্বিতীয় বারের বড় ধরনের পরিবর্তনের পর। প্রথম দফা পরিবর্তনের, ১৯১৮ -র পর ওসমানীয় সাম্রাজ্য বাটোয়ারা হয়; ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ফ্রান্স, ব্রিটেন, ইত্যাদি দেশের মধ্যে, আর এই দ্বিতীয় দফা পরিবর্তনে বিশ্ব ক্ষমতায়নের প্রশ্নে সামনের সারিতে চলে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই প্রথম একটি দেশ সরাসরি সাম্রাজ্যের পরিচয় সামনে না এনে, বিশ্বে অলিখিত নয়া সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করে। The American Empire! যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপকে ‘মার্শাল পরিকল্পনা’র (যা European Reovery Programme হিসাবেও পরিচিত) আওতায় পুনর্গঠন করে, সে তার ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রমাণ দিতে চাইলো। এর আগে জাপানের হিরোসিমা, নাগাসাকিতে মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঘৃণ্যতম মারণ হামলা করে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভ প্রকাশ করেছে। সুতরাং অতঃপর অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপকে সে নিজের ক্যাপিট্যালিস্ট বলয়ে ঢেলে সাজায়। আমেরিকার প্রযুক্তি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে যে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, তারই নাম Modernism বা আধুনিকতা। একটু ভাবলেই দেখা যাবে, আপনি যখন তথাকথিত মডার্ণ হওয়ার পক্ষে সরাসরি সওয়াল করেন, তা মূলত সহস্র বছর ধরে স্বাবলম্বী প্রাচ্যকে অস্বীকার করে মার্কিন ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়ার বয়ান।
এই যে মানুষের মননে ওরা শিল্প গড়ে তোলার চিন্তা বপন করে, তার উদ্দেশ্য কি? এর একটাই উদ্দেশ্য, তা হচ্ছে আমেরিকা ও তার ‘ন্যাটো’ভুক্ত মিত্রদের জন্য বাজার সম্প্রসারণ করা। আপনি যতই ওদের মডার্নিটি নামের ফাঁদে পা দেবেন, ততই পরনির্ভরশীল হবেন। কখনো কি আমরা ভেবে দেখেছি, বিশ্বব্যাঙ্ক আর আইএমএফ কেন আমাদের দেশের অর্থনৈতিক তথা রাজনৈতিক পলিসি তৈরিতে ওকালতি করে? কেন দুরন্ত চাপ সৃষ্টি করে? কেন তারা উৎপাদনমুখী প্রকল্প না দিয়ে, পুঁজিবাদী কেরানী হওয়ার প্রকল্প গেলায়? কেন কৃষির উপর ওরা গুরুত্ব দেয়না? কেন কৃষিতে রাসায়নিক বীজ-সার-কীটনাশক ব্যবহার করতে প্রোপাগান্ডা চালায়? এসবের মূল উদ্দেশ্যই হলো বাজার দখল করা। কেন আমরাও নিজের দেশকে পশ্চিমের ভোগবাদী, ক্যাপিট্যালিস্টদের সংজ্ঞানুযায়ী ‘’তৃতীয় বিশ্ব‘ (Third World) -র দেশ বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি? বুঝতে হবে, আমাদের মাথায় ‘তৃতীয় বিশ্ব’ নামক ভাবনাটাকে প্রবেশ করাতে পারলেই আমরা হীনমন্যতায় ভুগতে থাকবো। তখন আমেরিকা হবে প্রভু, আর পশ্চিমী সূচক হবে আমাদের মানদন্ড। এমন অবস্থাতেও কি আমেরিকান বিস্তারের চটকদার তত্ত্ব, গ্লোবালাইজেশন-র পক্ষে নির্লজ্জ ওকালতি করে যাওয়া যাবে! ভাবাটা জরুরী, কেন একটা দেশকে বিশ্বের একশোরও বেশি দেশে সামরিক ঘাঁটি তৈরী করতে হয়? এর অন্য কোন কারণ নেই। আমেরিকা আসলে কোন দেশ না, এটা এক নয়া সাম্রাজ্য। এটি আধুনিকায়ন ও গ্লোবালাইজেশনের নামে মার্কিন সাম্রাজ্যকে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আধুনিকায়ন কোন মানব কল্যাণমুখী তত্ত্ব নয়। বুর্জোয়া গণতন্ত্রও কোনদিন পৃথিবীর নিরঙ্কুশ উত্তম শাসনব্যবস্থা বলে স্বীকৃতি পায়নি। পশ্চিমা মিডিয়া সহ আমাদের দেশের বাজারি মিডিয়া আমাকে আপনাকে ‘ডেমোক্রেসি’ গেলায় তাদের নিজস্ব স্বার্থে ও অপরাধ ঢাকতে।
বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী সম্প্রসারণের সঙ্গে সামরিকীকরণ-সাম্রাজ্যবাদের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মহামন্দার মুখে পতিত পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার জন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সমরাস্ত্র উৎপাদন এক বিরাট মুনাফা অর্জনের সুযোগ এনে দেয়। ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে’র নামে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের দামামাও বেশ জোরেই শোনা যাচ্ছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সামরিকীকরণের আগ্রাসন। সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্বকে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দিক থেকে, একসময় বিশ্বে সমরাস্ত্র প্রস্তুতি, সংঘাত, উত্তেজনার মূল কারণ হিসেবে বর্ণনা করা হতো। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর বিশ্বে সামরিক তৎপরতা, সমরাস্ত্র উৎপাদন ইত্যাদি কমেনি। সোভিয়েত ইউনিয়ন থাকাকালে শত্রু দেখানো হত তাকে, এখন ইসলামী সন্ত্রাসবাদের জুজু দেখিয়ে জাতিসংঘ বা ন্যাটোর আড়ালে ’শান্তি’, ’নিরাপত্তা’, ’গণতন্ত্র’, ’স্বাধীনতা’ রক্ষার নামে সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও আধিপত্য নিশ্চিত করার অছিলায় যে সামরিক অভিযানগুলো চালানো হয়, তাতে একটি আন্তর্জাতিক চেহারা দেখানো হলেও, এগুলো প্রকৃতপক্ষে মার্কিন অভিযানের সম্প্রসারণ হিসেবেই কাজ করে। আন্তর্জাতিক চেহারা দেবার জন্য এসব অভিযানের সামনে রাখা হয় অনুন্নত দেশগুলোকে, যারা মূলত অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকার কারণে এদের কাছে বশীভূত। বিশ্বে এখন মোট সামরিক খাতে যে ব্যয় হয় তা পুরো বিশ্বের ৫০ শতাংশ মানুষের মোট আয়ের সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুঁজিবাদের মূল সংকট হল বাজার সংকট। সমাজে সবার শ্রমে উৎপাদিত সম্পদ যখন অল্প কিছু মালিকগোষ্ঠীর হাতে জমা হয়, তখন উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে তাল রেখে বাজার প্রসারিত হতে পারে না, কারণ অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত থাকে। এই বাজারে আবার অনেক প্রতিযোগী। ফলে, উৎপাদনযন্ত্রের ব্যক্তিগত মালিকানা ও মুনাফার উদ্দেশ্যে উৎপাদনের পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে সৃষ্টি হওয়া সঙ্কটকে ঢাকতে একেকবার একেক বিষয়কে সামনে আনা হয়। সঙ্কট কাটানোর জন্য তাৎক্ষণিক যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়, পরবর্তীতে সেটাই আবার নতুন সঙ্কটময় পরিস্থিতির জন্ম দেয়।
গণতন্ত্র কথাটা কথায় আছে — ‘বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল, অফ দ্য পিপল’ গণতন্ত্রের বিঘোষিত কথা। কিন্তু পিপল কোথায়? সমস্ত জায়গায় বাই দ্য ক্যাপিটালিস্ট, ফর দ্য ক্যাপিটালিস্ট, অফ দ্য ক্যাপিটালিস্ট। পিপল বলে কিছু নাই। মানি পাওয়ার সবকিছু কন্ট্রোল করে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাউসেসই ইলেকশানকে ম্যানিপুলেট করে, তাদের মানি পাওয়ার, মাসল পাওয়ার, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ পাওয়ার, মিডিয়া পাওয়ার দিয়ে। ইলেকশানের নামেই এই জিনিস হচ্ছে। ফলে গণতন্ত্র বলে কোথাও কিছু নাই। বরঞ্চ ফ্যাসিবাদ নানানরূপে নানানভাবে বিশ্বের সমস্ত জায়গায় আক্রমণ করছে। অনেকে ভেবেই ছিল ফ্যাসিস্ট জার্মানি-ইটালির পরাজয়ের পর ফ্যাসিবাদ নাই। কনসেনট্রেশন অব ক্যাপিটাল, মনোপলি ক্যাপিটাল হচ্ছে ফ্যাসিবাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি। অন্যদিকে সেন্ট্রালাইজেশন অব অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ পাওয়ার, ইন্ডাস্ট্রিয়াল-মিলিটারি-ব্যুরোক্রেটিক কমপ্লেক্স, তার হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। অন্যদিকে চিন্তার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ধ্বংস করা, যুক্তিবাদী মননকে ধ্বংস করা, অন্ধতা-অন্ধবিশ্বাস-কূপমণ্ডুকতা-প্রাচীন ঐতিহ্যবাদ-উগ্র জাতীয়তাবাদ এগুলোকে উৎসাহিত করা। এই আক্রমণ বিশ্বের সমস্ত জায়গায়। ফলে গণতন্ত্র বলে কোনও কিছু নাই।
পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির পার্লামেন্ট আছে, ডেমোক্রেসি বলে কোথাও কিছু নাই। এই পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির ঝাণ্ডা তুলেই তো ইউরোপ এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকা লুণ্ঠন করেছিল উপনিবেশ স্থাপন করে। এই পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির ঝাণ্ডা তুলেই তো প্রথম মহাযুদ্ধের আগুন জ্বালিয়েছিল, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগুন জ্বালিয়েছিল। এই পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির ঝাণ্ডা তুলেই তো জার্মানিতে, ইটালিতে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল। এই পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির ঝাণ্ডা তুলে আমেরিকা জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আণবিক বোমা বর্ষণ করে ধ্বংসস্তুপ করেছিল। এই পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির ঝাণ্ডা তুলেই তো এই সেদিন মিথ্যা অজুহাত তুলে একটা বর্বর আক্রমণ করেছে ইরাকের উপরে। ইরাক নাকি ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র তৈরি করেছে। কিচ্ছু খুঁজে পায় নাই। একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রকে ধ্বংস করল, আফগানিস্তানকে ধ্বংস করল, লিবিয়াকে ধ্বংস করল, সিরিয়াকে ধ্বংস করছে। ভ্রাতৃঘাতি দাঙ্গা বাঁধিয়েছে ইরাকে, শিয়া-সুন্নি লড়াই — এর পেছনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। সমস্ত জায়গায় তো পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির ঝাণ্ডা তুলেই, এই হচ্ছে পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির কদর্য পরিণতি। ফলে পুঁজিবাদ যে গণতন্ত্রকেও একদিন ঘোষণা করেছিল, সেই ঝাণ্ডাকে পদদলিত করেছে, কোথাও গণতন্ত্র বলে কিছু নেই। এই হচ্ছে লুণ্ঠনের গণতন্ত্র, পুঁজিবাদের শোষণের গণতন্ত্র। জনগণের প্রতিবাদের গণতন্ত্র নেই, আন্দোলন-লড়াইয়ের গণতন্ত্র নেই। এই হচ্ছে গণতন্ত্রের চেহারা।
এইভাবেই ক্রমাগত অস্থিরতা ও নৈরাজ্যের মধ্যেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা চলছে। যেমন; ট্রাম্পের অভিবাসী-বিরোধী পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে গুগল, মাইক্রোসফট, ফেসবুকসহ বড় বড় সংস্থার মালিকরা। কারণ, অভিবাসীদের মেধা ও শ্রমের ওপর তারা নির্ভরশীল। এই ঘটনা মার্কিন বুর্জোয়াশ্রেণীর অভ্যন্তরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের প্রতিফলন। ট্রাম্পের বক্তব্য ও ভূমিকায় পরিস্কার; সুপরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক, জাতিবিদ্বেষী, অভিবাসীদের প্রতি বিদ্বেষ ও তাঁর কর্তৃত্ববাদী মনোভাব, জাতিদম্ভ, নারীর প্রতি অবমাননাকর বক্তব্য, বাগাড়ম্বর ও অহমিকাপূর্ণ আচরণ ইত্যাদি গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন মার্কিন নাগরিকদের প্রতিনিয়ত আহত করছে। প্রচারমাধ্যম ও বিচারবিভাগকে আক্রমণ এবং আইনবিভাগকে পাশ কাটিয়ে নির্বাহীবিভাগের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা ট্রাম্প প্রশাসনের কাজকর্মে দেখা যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে বুর্জোয়া শাসন আজ কতটা নগ্ন, প্রতিক্রিয়াশীল, গণতান্ত্রিক চেতনাবিরোধী হয়ে উঠছে — ট্রাম্প, মোদি বা বিভিন্ন দেশের কর্তৃত্ববাদী শাসকরা তার নিদর্শন। সুতরাং বুঝতে অসুবিধা হয়না, সামরিকীকরণ কি কারণে? যে মানুষ তার নিজের পেট চালানোর স্বার্থে ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে কাজ করে, সে সাধারণের মধ্যে থেকেই আসে এবং নিজের অজান্তেই তার শ্রেণীগত অবস্থানের বিরোধী ভূমিকা পালন করে। এবার আসুন, সবাই মিলে যুদ্ধটাকেই চিতায় তোলা যাক।

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...