এখন আর এসব কথা নিয়ে কারোর এতো মাথা ব্যাথা নেই। আর এসব নিয়ে চিন্তা করে চুল পাকিয়ে বা কী হবে। কারণ আমাদের কী আর সময় আছে ! আমরা তো ব্যস্ত মিমির ব্লাউজ, নুসরত কতটা মুসলিম, ধর্ম 'খাতরে মে', কতটা ডেসিবেলে চিৎকার দিলে ভক্ত হওয়া যায়, দিদিমণির হাওয়াই, পাকিস্তান আব্বু ডাকছে কিনা না ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে। আমরা ক্রংক্রিটের পাহাড় তৈরি করছি ঠিকই। কিন্তু হামাগুড়ি দিয়ে ওঠা,যাকে আমরা জীবন বলি সেই জলের কী কোন খবর নিয়েছি। উত্তর হবে 'না'। ওটা দিয়ে কি হবে বাপু পকেটে কড়ি থাকলে তো বাঘের দুধও মিলে। আর এটা তো জল! বেটারা মিনারেল বিক্রি করছে কি সাধে ! ব্যবস্থা তো আছেই।
‘এ লড়াই জলের লড়াই, এ লড়াই লড়তে হবে’ - এ কথা নতুন করে বলার দরকার নেই, বিশ্ব উষ্ণায়ন তথা জলবায়ুর ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হওয়ার ফলে এই মুহূর্তে মানব সভ্যতা চূড়ান্ত সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে উপনীত এ কথা অনস্বীকার্য। এই বিষয়ে সবথেকে যেটা আশঙ্কার; আমরা ছোট থেকে জেনে এসেছি 'জলের আরেক নাম জীবন' কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই জল, যা 'জীবন' নামে অভিহিত, তা ক্রমশ সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাইরে চলে যেতে বসেছে। জলের সমস্যা এবং অভাব এই দুটিই যে সত্য সেটা রাষ্ট্রসংঘ স্বীকার করে নিয়েছে। জলের সমস্যার কিছুটা কারণ এবং সংরক্ষণের বিষয়ে যে জিনিসটা আমাদের বোঝা দরকার যে জলের অভাবের আসল কারণ জলের সমস্যা নয়, অন্তত এই মুহূর্তে সেরকম অবস্থানে পৌঁছায়নি। কিন্তু বর্তমানে যেটা চলছে সেটা চলতে থাকলে অচিরেই সেই ব্যবস্থা ত্বরান্বিত হতে চলেছে এটা বলে দেওয়া যায়। জলের অভাবের আসল কারণ হলো জলের অসম বন্টন এবং যে হারে জল অপচয়, দূষণ ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত হয়ে চলেছে তাতে জলের সমস্যা অদূর ভবিষ্যতে চূড়ান্ত ভবিতব্য।
২০০৭ সালে প্ল্যানিং কমিশন ভারতবর্ষের জলের চাহিদা ও যোগান সংক্রান্ত যে রিপোর্ট প্রকাশ করে তাতে স্পষ্টই বলা হয়েছিল, ভারতবর্ষে জলের যোগান অপ্রতুল নয়। তাদের হিসাব অনুযায়ী সেসময় এদেশে জলের যোগান ১১২৩ বিলিয়ন কিউবিক মিটার (বিসিএম) ( ১ বিলিয়ন = ১০০০০ লক্ষ, ১ কিউবিক মিটার = ১০০০ লিটার) আর জলের চাহিদা ৬৩৪ বিলিয়ন কিউবিক মিটার, ফলত ১২ বছর আগে তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতবর্ষে জল-সঙ্কট প্রায় নেই। তার ঠিক এক বছর পরেই ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক টি এন নরসিমহ্যান তাঁর গবেষণা প্রবন্ধে দেখান এই ১১২৩ বিসিএম যোগানের গল্পটি খুব ঠিকঠাক নয়, তাঁর হিসাব অনুযায়ী আসলে তা ৬৫৪ বিসিএম। অর্থাৎ জল-সংকট সেসময়েই শুরু হতে যাচ্ছে। নরসিমহ্যান তাঁর গবেষণা প্রবন্ধের শেষে প্ল্যানিং কমিশনের হিসাবকে “ওভার এস্টিমেশন” বলেই উল্লেখ করেন। তাঁর সেই গবেষণা প্রবন্ধটির নাম “A note on India’s water budget and evapotranspiration”। ইন্টারনেটে পাওয়া যায়।
২০০৯ সালে ওয়াটার কমিশন অফ ইন্ডিয়ার আরেকটি রিপোর্টে নরসিমহ্যানের এই গবেষণাকে প্রায় নস্যাত করে জানানো হয় এনিয়ে দুর্ভাবনার কিছু নেই (টাইমস অফ ইন্ডিয়া ২১/০১/২০১০)। নীতি আয়োগের যে রিপোর্ট নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে বিরাট হইচই হচ্ছে, তার মুখবন্ধতে পরিষ্কার লেখা...
It’s a matter of concern that 600 million people in India face high to extreme water stress in the country. About three-fourth of the households in the country do not have drinking water at their premise. With nearly 70% of water being contaminated, India is placed at 120th amongst 122 countries in the water quality index.
অর্থাৎ ভারতবর্ষের ৬০ কোটি মানুষ তীব্র জল-সংকটের সামনে দাঁড়িয়ে এবং প্রায় ৭০ শতাংশ জলই কলুষিত। যার প্রায় কোনও আন্দাজ আমাদের রাষ্ট্রের কাছে ছিল না এই বছর দশেক আগে অবধি (অথবা ছিল ইচ্ছে করে তা চেপে রাখা হয়েছিল),
আজকে নীতি আয়োগ অবশ্য ঘুরিয়ে ভুল ‘স্বীকার’ করে নরসিমহ্যানের হিসাবকেই ধরে এগিয়েছে। যাইহোক, যেকথা এই ছ্যাবলামো দেখে আপনার মনে হওয়া স্বাভাবিক তাহলে এত তড়িঘড়ি করে যে ইমারজেন্সি পরিস্থিতির কথা আমাদের বলা হচ্ছে সেটাও কতটা সত্যি? পরিস্থিতি কি আরও অনেকটা খারাপ? সত্যি কথা বলতে কি ভারতবর্ষে জলের চাহিদা ও যোগান সম্পর্কে তেমন বেশি কিছু তথ্য পাব্লিক ডোমেনে হাজির নেই, আমার ধারণা সরকারিভাবে এনিয়ে সমীক্ষা ইত্যাদি চালানোই হয়নি এমনকি প্ল্যানিং কমিশনের আগে বলা হিসাবটি ‘গুপ্ত ও দেশপান্ডে’-র একটি গবেষণা প্রবন্ধ থেকে নেওয়া। নীতি আয়োগের উচ্চপদস্থ কর্তারাও তথ্য না থাকার অভাবে যে বেশ ভালো পরিমাণ ভুগেছেন সেটা তাদের ১৮১ পাতার রিপোর্টে স্পষ্ট। ২০১৩ সালেই ইউনিসেফের একটি রিপোর্ট খুব স্পষ্ট করে জানিয়েছিল ২০০১ সালে ভারতে মাথাপিছু গড় বার্ষিক জল পাওয়া যেত ১৮১৬ বিসিএম, যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়াবে ১৩৪০ বিসিএম। ১৭০০ বিসিএম-এর কম হওয়াকেই সারাবিশ্বে তীব্র জলসংকট বলে ধরা হয়।
ভারতে জলের অভাব সাব সাহারান আফ্রিকার পরপরই আছে। অর্থনৈতিক এবং প্রাকৃতিক দুটো ফর্মেই এই জলের অভাব বিদ্যমান, অন্তত ৬ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ পরিস্রুত জল পায় না, পৃথিবীতে যে দেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ পরিষ্কার জল থেকে বঞ্চিত সেই দেশ হলো ভারতবর্ষ। বলার অপেক্ষা রাখে না যে সংখ্যাটা আরো বাড়বে, কার্যত বেড়েই চলেছে। নর্মদার বাঁধের কথা সকলেরই জানা আছে, ৪০ হাজার পরিবারকে বাঁধের কারণে উচ্ছেদ করা হয়েছে তাও জানা, কিন্তু ভুলে যাই, সংখ্যাটা আর কতো বাড়লে ভুলবোনা সেটা জানা নেই। তবে পানীয় জলের কারণে গৃহহারা হওয়া ভারতে নতুন কিছু নয়, সংখ্যাটা বাড়ছে শুধু।
২০০৪ সালে The Center for Science and Environment (CSE)-র একটি রিপোর্ট থেকে পরিষ্কার যে, ভারতে সবথেকে বেশি জল ব্যবহার করে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। তারমধ্যে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিই সিংহভাগ জল ব্যবহার করে। ভারতে প্রতি বছর শুধুমাত্র তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকেই ২৭০১ কোটি কিউবিক মিটার দূষিত জল নির্গত হয় এবং ৩৫১৫ কোটি ৭৪ লক্ষ কিউবিক মিটার জল ব্যবহৃত হয়। শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত জলের মধ্যে সাতাশি শতাংশ জল শুধু তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিই ব্যবহার করে। বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে বড় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন, আদানি পাওয়ার, জিন্দাল পাওয়ার প্রজেক্ট-র কথা কমবেশি সবারই জানা। ভারতের সিংহভাগ জল অপচয় এবং দূষণ এদের সৃষ্টি। এদের ওপর সরকার এবং জনগণের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, আসলে কোনো কর্পোরেট-র ওপরেই কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। লাভের হার বাড়ানোর জন্যেও জলের অভাব এই শিল্পপতিদের কোনোদিন হয়না, হয় শুধু ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের অথবা ওই বড় কারখানাগুলোর পাশে নদীর ধারে থাকা মানুষগুলোর, যারা সেই জল ব্যবহার করতে পারেন না, কারখানা থেকে বর্জ্য ও দূষিত জল নদীতে মেশার কারণে।
নদী তো যেন শিল্পপতিদের জন্যেই সৃষ্টি হয়েছে, জলও! সরকার নামক সংসদীয় গণতন্ত্রের তথাকথিত রক্ষকরা পরিকাঠামোগতভাবে তার কর্পোরেট প্রভুদের একচ্ছত্র লুঠ করার বৈধতা দেয়। যাদের আইনের রক্ষক বলে জনগণকে বোঝানো হয়, তারা সেই চুরির স্বাচ্ছ্যন্দ পাহারার জন্যেই বহাল। যতদিন না তথাকথিত শিল্পের নামে যথেচ্ছভাবে কর্পোরেটদের এই হারে জল ব্যবহার করতে দেওয়া বন্ধ হবে, ততদিন পর্যন্ত জলের (এবং আরো অনেক কিছুর) সমস্যা ও অভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। জলের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটা সেই মালিকানার।
ভারতবর্ষ প্রতিবছর যে পরিমাণ ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন করে, তা চীন ও আমেরিকার সম্মিলিতভাবে উত্তোলিত জলের থেকেও বেশি। তারপরেও কৃষিতে এত জলের সমস্যা কেন? কৃষকদের শয়ে শয়ে মৃত্যু কেন?? নীতি আয়োগের ডেটা অনুযায়ী এতো ভয়ানক ক্রাইসিস আগে কখনো হয়নি। হটাৎ এখন? কিভাবে? কেন? প্রধান জলের উৎসগুলোও এখন কার্যত কর্পোরেটদের সম্পত্তি। যতদিন সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে ব্যক্তিগত মালিকানা না তুলে দেওয়া যাবে, ততদিন একদিকে অপচয় আর অন্যদিকে হাহাকার জারি থাকবে এবং সেটা বাড়বে, যেমনটা বাড়ছে। ক্ষমতাশালীদের ক্ষমতা যত বেশি করে পুঞ্জিভূত হবে, যত ক্ষমতা বাড়বে, তত এই অসাম্য বাড়তে থাকবে। তাদের অপচয় কমানো বা বাড়ানোর ওপর নির্ভর করছে কোটি মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ। সবশেষে একটাই কথা এখানে প্রযোজ্য, হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়, হতাশার বন্ধনে থেকে ভবিতব্যকে মেনে নেওয়ার থেকে যুদ্ধে নামাটাই সমীচীন।
No comments:
Post a Comment