Monday, July 13, 2020

এমনকি কারাগারের দেয়ালও ভারভারা রাওকে লেখা থেকে বিরত রাখতে পারেনি

কথা হলো আমরা করোনা মহামারীতে জর্জরিত। না, এতে বিচলিত হওয়ার মতো কিচ্ছু হয়নি! আমরা কি আর হারিয়ে যাচ্ছি ! কারণ ঢঙ্গিদের গণতন্ত্রগ্রাসী আচরণ বানিজ্যটা বেশ রমরমা চলছে। আর আমরা কী আর করতে পারি বলুন ঢাক ঢোল বাজিয়ে মোমবাতি জ্বালানো ছাড়া।

অমিতাভ বচ্চনের মতো ভারভারা রাও তার যৌবনে যদি সিনেমা জগতে পা রাখতেন, তাহলে তিনিও একটি চকচকে হাসপাতাল পাওয়ার যোগ্য ছিলেন।, এখন তিনি কারাবন্দি এবং অসুস্থ।  দু'জনই একই বয়সের ... জাতি একজনের জন্য প্রার্থনা করছে, অপরের জীবন সম্পর্কে উল্লেখ এবং চিন্তা কজনের কতটুকু আছে তা আঙুলে গোনা যাবে। তারপরও আঙ্গুলের উপর কিছু জায়গা এখনও থাকতে পারে।  ভারভরা রাও একজন কবি, সাহিত্য সমালোচক এবং বিখ্যাত সমাজসেবক।  ১৯৫৭ সাল থেকে কবিতা লেখা।  সাধারণ জনতার পক্ষে কাজ করা,খেটে খাওয়া মানুষদের কথা বলা, এমন রাজনৈতিক চেতনা রয়েছে যা স্পষ্টতই ক্ষমতাসীনদের খোঁচা দিতো।

 অমিতাভ যখন পর্দায় নাচছিলেন, দোলা দিচ্ছিলেন, অর্থোপার্জন করছিলেন, তেলুগু সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত আলোচক ভারভরা রাও রাস্তায় পাবলিক গান গেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিতেছিলেন। জনান্দোলন গড়ে তুলেছিলেন ছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে। না , ভাবতে পারেন অমিতাভ বচ্চন নিয়ে এতো গাজ্বালা কেন ? অমিতাভের প্রতি একটুও ভ্রুকুটি নয়। কিন্তু পার্থক্য কেন ? ভীম কোরেগাঁও মামলায় সরকার রাওকে নকশালপন্থী বলে দাবি করেছিল এবং তা সরকারের বিরুদ্ধে রয়েছে, যেহেতু আজকাল সমস্ত রাজনৈতিক-সামাজিক কর্মীদের সাথে যা করা হয়  ।  আজও বিচার শুরু হয়নি!  আমরা বিনোদনের জন্য সিনেমাটিক নায়ক চাই, তবে আমরা কি সত্যিকারের নায়কদের চাই না সুস্থ সমাজের জন্য? না, ভারভারা রাও আপনার কাছে ভোট ভিক্ষে করতে আসবেন না কখনও; কিন্তু একমুহূর্তের জন্যেও যদি আপনি এই অসহ্য সমাজব্যবস্থার বদল চান, তা'লে ভারভারা রাও আপনার সেই দ্রোহচেতনার কবি।

 রাজার যা পছন্দ করেন এই বাজনা বাজানোর রীতিটা তো আর নতুন নয়!  আচ্ছা, এখন যখন অমিতাভ বচ্চন অসুস্থতার পরে আরোগ্যের বন্যা চলছে সারা দেশে, তখন ভারভারা রাওকেও মনে রাখবেন .. সর্বোপরি, একজন প্রবীণ সিনেমা জগতের এবং অন্যজন সত্যিকারের জীবনের সংগ্রামকে বাঁচিয়ে রেখেছেন!  সরকারের কী কাজ নয় যে যারা রাজনৈতিক কারণে বন্দী তাদের সাথে সঠিকভাবে আচরণ করার ? মানুষ যদি বেঁচেই না থাকে তাহলে আদর্শের লড়াই আরও পরে করা যায় ভাই!  ভারভারা রাও তো সম্পত্তির যোগ করেননি বা পানামা পেপার দিয়ে কর ফাঁকিরও অভিযোগ উঠলো না, শুধু বিজ্ঞান মনস্ক চিন্তার কথা বলেছিল .. ড্রাম প্লেট নিয়ে করোনাকে তাড়িয়ে দেওয়ার ভান তিনি খুব কমই করতে পারতেন ! 

আপনি যদি শিরদাঁড়া সোজা রেখে একমুহূর্তের জন্যেও শাসককে, রাষ্ট্রকে 'না' বলার সৎসাহস রাখেন, তবে ভারভারা রাও আপনার কবি। সব মিলিয়ে তার যুদ্ধটি ছিল আধুনিক মতাদর্শের মাধ্যমে উন্নত মানব সমাজের গঠন, তাহলে অন্যায় ভাবে কারও অধিকার খর্ব করে কারাবন্দির অধিকার থাকতে পারে কীভাবে?  না, ভারভারা রাও ফিল্মি নায়ক নন, ভোটবাজ নেতা নন, জুমলা ক'রে সংবাদ-শিরোনামে আসা ব্যক্তি নন, শাসকের পা-ছোঁয়া হেঁহেঁ-কবি নন। ভারভারা রাও আপনার কবি, ভারভারা রাও আপনার মতো শোষিত ও অবদমিত প্রত্যেক মানুষের জেগে ওঠার রেগে ওঠার ক্ষেপে ওঠার আপসহীন লড়াইয়ের মুখ। নিপীড়িত শ্রেণি-বর্ণ-ধর্ম-লিঙ্গের প্রতিরোধের কবি ভারভারা রাও। যিনি লিখেছেন স্বাধীনতার কথা তার কবিতায়। নীচের দুটি কবিতা রইল, তার চেতনার কথা ---- 
১ ) This is jail for the voice and the feet
But the hand hasn’t stopped writing
The heart hasn’t stopped throbbing
Dream still reaches to the horizon of light
Travelling from this solitary darkness
Of course, in this jail moon is not allowed
To share his light,
But who can stop me from
Marching into the dawn of the eastern sun.
২ ) From amidst the people who speak
Came into the trees that do not.
From the rocking movements
And the air filled with slogans
Came into the swinging dumb trees
And the high walls trying to arrest wind।

এবং এই বলেই শেষ করছি, রাওয়ের ওপর আক্রমণ আমাদের সবার ওপর আক্রমণ। আর হ‍্যাঁ এটা বলা বেশ সাহসীকতার কাজ নয় হিম্মতের প্রয়োজন। তাই দাবি একটাই রাওয়ের অবিলম্বে মুক্তি চাই।

Thursday, July 9, 2020

সমকামিতাঃ একটি সহজাত বা প্রাকৃতিক বিষয়

সমকামিতার মতো একটা স্পর্ষকাতর বিষয় নিয়ে  লিখতে বসে ভাবছিলাম কোথা থেকে শুরু করবো। আজ পর্যন্ত সমকামিতা নিয়ে অনেক লেখালেখিবা বিশ্লেষণ হয়েছে। তবুও নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে এই লেখা। উদ্দেশ্য হল পক্ষে আওয়াজ তোলা। যাইহোক,আজকের পৃথিবীতে সমকামিতার ব্যাপারটা আর লুকোচুরির পর্যায়ে নেই।  Gay Pride Day এখন আর শুধু সমকামিদের অধিকার আর গৌরব বহন করে না অনেকের জন্যই এটার অর্থ আরও  ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে।  এটাকে সামগ্রিক মানবাধিকারের একটা অংশ হিসেবেও দেখা হয়।

সমকামিতা কি?

সমকামিতা বা সমপ্রেম বলতে সমলিঙ্গের ব্যাক্তির প্রতি রোমান্টিক আকর্ষন, যৌন আকর্ষন বা যৌন আচরণকে বুঝায়। সংস্কৃত ‘সম’ শব্দটির অর্থ সমান বা অনুরূপ এবং ‘কাম’ শব্দের অর্থ হচ্ছে যৌন চাহিদা। বিশ্বের প্রায় ৫% মানুষ সমকামী। 

সমকামিতার কারণঃ 
সমকামিতা কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণে নির্ধারিত হয় না। এটি জিনগত, হরমোনগত ও পরিবেশগত একাধিক কারণের সমষ্টিগত প্রভাবের ফল।

১)জিনগতঃ

১৯৯৩ সালে ডিন হ্যামারের করা একটি গবেষনায় বলা হয় সমকামিতার জন্য জিন দায়ী। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে একটি গবেষনায় এই ফলাফল সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করা হয়। ২০১৭ সালে নেচার জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে সমকামিতার জন্য কোন জিনদ্বয় দায়ী। তাই দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় যে সমকামিতার জন্য জিন দায়ী।

২)মস্তিষ্কগতঃ

 সমকামিতা নামক এই যৌন অভিমুখিতার সাথে মস্তিষ্কের সংযোগ রয়েছে। মস্তিষ্কের INAH3 নামক অংশটি পুরুষের ক্ষেত্রে নারীর তুলনায় বড় হয়। কিন্তু সাইমন লিভ্যে নামক একজন স্নায়ুবিজ্ঞানী দেখেছেন সমকামী পুরুষের INAH3 আর বিষমকামী নারীর INAH3 প্রায় সমান। অর্থাৎ সমকামী পুরুষের INAH3 বিষমকামীর পুরুষের চেয়ে আকারে সংকুচিত। তবে এ সংকোচন কতটা? এটা হচ্ছে মহিলাদের INAH3 এর আকারের ন্যায়। এই গবেষণাটি পুনঃপ্রতিলিপিত করা হয়েছে, যা আগের গবেষণাটিকে নিশ্চিত করে। আরো দেখা গিয়েছে বিষমকামীদের সাথে সমকামীদের INAH3 এলাকার প্রস্থচ্ছেদ ও নিউরনের সংখ্যায় কোনো পার্থক্য নেই।

এই জায়গা থেকে অনেকের ধারণা হয়েছিল, সমকামী পুরুষদের হয়তো, বিষমকামী নারীর ন্যায় হাইপোথ্যালামাস থাকে। কিন্তু আরেকটি গবেষণা থেকে দেখা গিয়েছে, পুরুষ সমকামীদের সুপ্রাকায়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াস; বিষমকামী পুরুষ ও নারীর তুলনায় দ্বিগুণ। গবেষণায় আরো দেখা গিয়েছে পুরুষ ও নারী সমকামীর বাম এমিগডালা বিস্তৃত এবং পক্ষান্তরে নারী পুরুষ বিষমকামীর ডান এমিগডালা বিস্তৃত। দেখা গিয়েছে, দুইটি মস্তিষ্কগোলার্ধকে সংযোগকারী শ্বেত তন্তু সমৃদ্ধ এন্টিরিওর কমিশার, নারী ও পুরুষ সমকামীতে; বিষমকামী পুরুষের তুলয়ানায় বড়।

অনেকে বলতে পারেন, হয়তো জন্মের পরে, সমকামিতার দরুণ মস্তিষ্কের নানা অংশের এই পরিবর্তন ঘটেছে, হয়েছে সংকোচন-প্রসারণ। কিন্তু ২০১০ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষনা থেকে বলা হচ্ছে, মস্তিষ্কের এই ধরনের বিকাশ মার্তৃগর্ভেই বিকশিত হয়, যা সামাজিক কারণে কোনো ধরনের প্রভাবে প্রভাবিত হয় না।

৩)পরিবেশগতঃ

এছাড়া যুক্তরাস্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব মেডিসিন এর এক গবেষনায় দেখা গিয়েছে সমকামী  পুরুষ বা নারীদের নারী আত্মীয়রা অধিক সংখ্যক সন্তান উৎপাদন করে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে সমকামী পুরুষদের এক বা একাধিক বড় ভাই থাকে। পরিশেষে বলা যায় যে সমকামীতাএকটি সহজাত বা প্রাকৃতিক বিষয়। 


তথ্যসূত্রঃ

1)http://science.sciencemag.org/content/261/5119/321.long
2)https://www.newscientist.com/article/dn26572-largest-study-of-gay-brothers-homes-in-on-gay-genes/
3)https://www.nature.com/articles/s41598-017-15736-4
4)http://science.sciencemag.org/content/253/5023/1034
5)https://linkinghub.elsevier.com/retrieve/pii/S0018506X01916800
6)https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/000689939090350K?via%3Dihub
7)https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/18559854
8)https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/7571001
9)https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/19955753
10)https://link.springer.com/article/10.1007%2Fs00439-005-0119-4
11)http://www.pnas.org/content/115/2/302
12)https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/15539346
13)https://bn.m.wikipedia.org/wiki/Handedness_and_sexual_orientation
14)https://osf.io/zn79k
15)https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/10410197
16)http://nymag.com/news/features/33520/
17) https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/14570558

Tuesday, June 30, 2020

কেইসড্রাট

স্ট্রিট লাইট
নেই তেল, চারদিক ঘিরে আছে অন্ধকার
হামাগুড়ি দেয়া ইঁদুর ছানা 
রেখাহীন গর্ভে সুড়ঙ্গ খোদে ওরা, এখন বাহুবলী।
আমি জড়পদার্ধ 
বিউগল বাজাতে জানি, বড় বিউগল!
আমার কী দোষ - না স্বেচ্ছায় এসেছি এখানে
এই দুর্দশা গ্রস্থে ভরপুর মাঠে।

আমাদের এ জীবন যেহেতু কমার্শিয়াল চিন্তার,
ব‍্যাপার চলছে 
এক চিলতে রুদ্দুর ও,
জলন্ত অঙ্গারে পরাজিত জীবন্ত আত্মারা 
গলায় দড়ি দিয়ে সময়ের দাবি রাখে
কেইসড্রাটের ডালে।

Tuesday, October 22, 2019

ডিটেনশন ক‍্যাম্প : এটাই আমার রাষ্ট্র ?

(১)
মাত্র দেড়’শ বছরের কিছু আগে-পরে জানা গেছিলো, সমস্ত ইতিহাসই আসলে শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস। যুগে যুগে সভ্যতার অগ্রগমনের সাথে সাথে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়ে তৈরী হয়ে এসেছে ইতিহাস, কিন্তু যা সত্যিই শাসকের শ্যেন দৃষ্টি থেকে মুক্তি পায়নি, ফলে আজকেও যখন মুষ্টিমেয় শাসকের হাতেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, তখন ইতিহাস যে তাদের মর্জিমাফিকই হতে হবে, তাতে চমকে যাওয়ার কিছু নেই। এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজকের ভারতবর্ষ। আরও স্পষ্ট করে বললে, একটা জাতি আজ চরম আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে তার নিজস্বতা, পরিচিতি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। জাতিটার নাম বাঙালি! প্রায় সাত দশক আগে, সংবিধান সভায় নাগরিকত্বের প্রশ্নে ব্যাপক আলোচনার পরে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা ঐতিহাসিক বলেই চিহ্নিত হওয়া উচিৎ।  গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল ধারাকে স্বীকৃতি দিয়েই স্বাধীন ভারত গড়ে উঠেছিলো তার নিজ সভ্যতায়, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের প্রতিক্রিয়াশীল ধারাকে উপেক্ষা করে, ভোটাররাই নাগরিক সেটাই ছিল মূল দীক্ষা। সংবিধান সভায় নাগরিকত্ব চিহ্নিতকরণের ব্যাপারে ‘jus soli’ প্রক্রিয়াকেই গ্রহণযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত নেন, যা নির্দেশ করে, “রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের মধ্যে জন্মের অধিকারে নাগরিকত্ব’ এবং সেই সময়ে সংবিধান সভা’র সদস্যরা এটিকেই নাগরিকত্বের সবচেয়ে আধুনিক প্রক্রিয়া হিসাবে গ্রহণ করেন। একইসাথে, নাগরিকত্বের প্রাচীন ধারণা, ‘jus sanguin’, যা নির্দেশ করে, “জাতি, গোত্র, ধর্ম বা সম্প্রদায় ভিত্তিতে নাগরিকত্ব”-তাকে অচল বলে বর্জন করা হয়। এই নাগরিকত্বের গৃহীত ধারণা প্রসঙ্গে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল বলেছিলেন, ‘আলোকিত, আধুনিক, সভ্য’; যাকে আজকের শাসক ভুলিয়ে দিয়ে আবার সেই প্রাচীন বংশতালিকা ও সম্প্রদায়গত অমূলক, অবৈজ্ঞানিক ধারণাটিকেই ফিরিয়ে আনতে চাইছে, শুধুমাত্র নিজেদের নির্বাচনী মুনাফার আশায়।

আজ যেভাবে ‘নাগরিক সংশোধনী বিল’ (ক্যাব) এনে শুধু নাগরিকত্বের গৃহীত সিদ্ধান্তকেই পালটে দিতে চাইছে নাগপুর-দিল্লির গেরুয়ারা এমনটা নয়, তারা এমনকি সংবিধানে বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতার মূল ধারাণাটিকেও বদলে দিতে চাইছে। এই পালটে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই শিবিরের  সামনে কোন যুক্তি নেই, যা আছে তা হলো, বাঙালির মধ্যে ধর্মীয় ফাটল ধরিয়ে পুরো বাঙালির সমূলে নিপাত। এখন নাগরিকদেরই শাসকের এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোটা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, কারণ সেটা তার অধিকার রক্ষার একমাত্র পথ। প্রখ্যাত আমেরিকান সমর-সাংবাদিক ডেভিড হ্যাকওয়ার্থ-র করা একটি উদ্ধৃতি এক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, “If a policy is wrongheaded feckless and corrupt I take it personally and consider it a moral obligation to sound off and not shut up until it's fixed.” গলা তুলে চিৎকার করাই শুধু নয়, যতক্ষণ না এই এনআরসি, ক্যাব ইত্যাদি নিয়ে সরকারের ধ্যাষ্টামো খতম হচ্ছে, ততক্ষণ প্রতিবাদ, প্রতিরোধ জারী রাখাটাই একমাত্র কর্তব্য।

আমরা এক নতুন শব্দবন্ধে তৈরী হচ্ছি, ‘বিদেশী', জবরদস্তী বিদেশী হিসাবে চিহ্নিতকরণের যে প্রক্রিয়া এখানে চলেছে, তার থেকেই এমন অসহায় শব্দবন্ধ সৃষ্টি হয়, যা এখানে আমাদের অসহায়ত্বকেই প্রমাণ করে। ভাললাগলো পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী নেতাদের হুংকার শুনে। বাহ্,  কথাগুলো বললেই যেন তেলে জল ছেটা দিলে যা হয় তেমন লাগে "বাংলায় ডিটেনশন ক‍্যাম্প হলে গুড়িয়ে দেব, বাংলায় এন আর সি করতে হলে আমাদের লাশের ওপর দিয়ে করতে হবে"। কিন্তু কথা হলো কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার অসম শাখায় এতো চুপচাপ কেন? ঠিক বুঝে ওঠতে পারলাম না। সবার মত তো এক হওয়ার কথা ছিল, তবে দ্বিমত কেন কমরেডগন। অসম কি ভারতের বাইরে? না কি,ভারতীয় কমিউনিস্ট চিন্তা ও অসমের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে? ঠিক বুঝতে পারছি না।

            (২)

ডিটেনশন ক্যাম্প! সভ্য মানুষের মাথা বিগড়ে দেওয়া দুটি শব্দ! যেখানে নরক যন্ত্রণা পেয়ে মৃত্যুকে আপন করে নেয় সাধারণ নিরপরাধী মানুষেরা!  নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মতো ভারতের সর্বত্র গড়ে উঠছে ডিটেনশন ক্যাম্প। ভাবছেন কারা থাকবে? ঐ তো দুলাল চন্দ্র পাল, প্রভা রায়, হুশেন আলী, সুন্দর  মোহন রায়, নগেন দাস,বাসুদেব বিশ্বাস,জব্বার আলি,সুরজ আলি,সন্তোষ বিশ্বাস, নজরুল ইসলাম,ইসমাইল তালুকদার,প্রভা রায়, সু্ব্রত দে,পুনা মুণ্ডার মতো যে শ্রমজীবী মানুষরা যারা ডিটেনশন ক্যাম্পে প্রাণ হারালেন, তাদের মতো শ্রমজীবী মানুষরা। তারা কী করবেন? তারা আমেরিকার জেল ব্যবসার কয়েদী কালো আদমির মতো বহুজাতিক নাইক কোম্পানীর জোতা বানানোর কাজে বেগার খাটবেন ও বেঘোরে তিলে তিলে প্রাণ হারাবেন।

অসমিয়া গণতান্ত্রিক সমাজ ডিটেনশন ক্যাম্পের বিরোধী, তাঁরা অসমকে মানবতার বধ্যভূমি বানাতে চান না। ১৯ লাখ এনআরসি-ছুটদের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের মতো একটা বিপদজনক জায়গায় পাঠানোর তাঁরা বিরোধী কিনা এখনও জানা যায়নি। এফটি একটি ন্যায়িক ব্যবস্থা নয়, সেখানে এই গরিব মেহনতি মানুষের কী পরিণতি হবে তা অনিশ্চিত। কিন্তু দুলাল পরিবারের লড়াইয়ের মোক্ষম সময় তারা ডিটেনশন ক্যাম্পের বিরুদ্ধে সময়ের দাবির চাইতে কম সোচ্চার হওয়াটা সত্যিই পীড়াদায়ক।

তেজপুর ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি অবস্থায়  বছর ৬৫'র দুলাল পালের বিনা চিকিৎসায় অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তাতে আমাদের কি? উনি কি আমার পরিবারের কেউ? তবে আমি কেন দুঃখিত হব। ঠিক আছে, মর্মাহত হয়েছি। আজ অফিস থেকে ফেরার পথে বন্ধু বলল "আমার পরিবারের নাম এন আর সি তালিকায় এসেছে পুরো শুদ্ধ বানানে। আমি উইপোকা নই, ঘুসপেটিয়া নই । কাজেই আমার চিন্তার কারণ নেই, নো টেনশন । আমার আবার কিসের চিন্তা। ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি যারা রয়েছে এ নিয়ে তাদের পরিবার ভাবুক না।" তো এতেই আমরা আনন্দিত!  শোণিতপুরের ঢেকিয়াজুলির আলিশিঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা ৬২ বছরের বৃদ্ধ দুলাল চন্দ্র পালকে তেজপুরের ডিটেনশন  ক্যাম্পে বন্ধি করা হয়। দুইটা বছর এই হিটলারী কনসেনট্রেশ ক্যাম্পে তাকে ঠেলে দেয়া হয়েছে মৃত্যু পথে।
       
            (৩)

দুলাল পালকে বিদেশী ঘোষণা করে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের যে অর্ডার বেরিয়েছিল সেটা এবং পরে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের অর্ডারকে বহাল রেখে  গৌহাটি হাইকোর্টের ১৮/০১/২০১৯ তারিখের যে রায়, সেখানে লিখা ---
১৯৬৫ সনের জমির নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও মুল যে কারণে দুলাল পালকে বিদেশী ঘোষণা করা হয় তা হলো উনি যে ১৯৬৫ থেকে ১৯৯৩ অবধি ভারতে স্বাভাবিক ভাবে থাকার কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেন নি। "Considering entire materials on record and also discussion made above it is appeared that OP unable to produced any documents in this case to prove that either father of OP or OP ordinarily resided in Assam since 1965 till to 1993"। আশ্চর্যজনকভাবে ১৯৬৫  সনের জমির কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের অর্ডারে বলা হয় যে উনি ২৫/৩/১৯৭১ এর পরে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে এসে আসামে বসবাস করছেন এবং এই কারনেই উনি বিদেশি।  "Further it appears that OP ....... entered into Assam//India without authority subsequent to 25/3/1971and hence he is termed to be a foreigner/ illegal migrant of post 25/3/1971 stream. The case is decided accordingly." উল্লেখযোগ্য যে গ্রাম পঞ্চায়েত এবং গাওবুড়ার কিছু নথিপত্র অগ্রাহ্য করা হয় এই কারন দেখিয়ে যে যারা এইসব সার্টিফিকেট ইসু করেছিলেন উনারা কোর্টে এসে সাক্ষী দিয়ে এই  নথিপত্রের সত্যতা প্রমাণ করেন নি। হাইকোর্টের রায়ে একই কারণ দেখানো হয়েছে।

একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এনারসি এবং ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়াতে বেশ কিছু পার্থক্য আছে। আসামের ক্ষেত্রে এনারসি তে নাম সন্নিবিষ্ট করতে শুধু দুটো কাগজ দেখাতে হয় -১) ২৫/৩/১৯৭১ সনের আগে আসামে থাকার প্রমাণ (নিজের অথবা নিজের পূর্বপুরুষের) এবং ২) ১৯৭১ এর আগে নিজের কোনো নথিপত্র না থাকলে পূর্বপুরুষের নথিপত্র দেখাতে হবে এবং একই সাথে পূর্বপুরুষের সাথে সংযোগকারী নথিপত্র দেখাতে হবে। এর বিপরীতে, নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের  প্রক্রিয়া আরও বিশদ। এটাও প্রমাণ করতে হবে যে একজন সাধারণ ভাবে আসামে অথবা ভারতবর্ষে বসবাস করছেন কি না। আসামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাগরিকত্ব আইনের ধারা 6A (2) অনুযায়ী - " Subject to the provisions of sub-sections (6) and (7), all persons of Indian origin who came before the 1st day of January, 1966 to Assam from the specified territory (including such of those whose names were included in the electoral rolls used for the purposes of the General Election to the House of the People held in 1967) and who have been ordinarily resident in Assam since the dates of their entry into Assam shall be deemed to be citizens of India as from the 1st day of January, 1966." এখন প্রশ্ন হলো একজন সাধারণ গরীব শ্রেণীর মানুষের পক্ষে নথিপত্র দেখিয়ে কিভাবে প্রমান করা সম্ভব যে he or she has been ordinarily resident in Assam since the date of entry? যারা স্কুল বা কলেজে পড়াশোনা করেছেন অথবা যারা চাকরি করেন তাদের জন্য এই প্রমাণ যোগাড় করা হয়তো সম্ভব।  কিন্তু অশিক্ষিত, ভূমিহীন, গরীব শ্রেণীর মানুষদের পক্ষে সম্ভব কি? নথিপত্র দেখিয়ে ভারতবর্ষের কতজন গরীব শ্রেণীর মানুষ প্রমাণ করতে সক্ষম হবেন যে they have ordinarily resided in India since birth? এই অবস্থায় গ্রাম পঞ্চায়েত সার্টিফিকেটও যদি গ্রহনযোগ্যতা না পায় তার মানেই কি ওরা বিদেশি? বাস্তবকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে এইভাবে মুলত প্রান্তিক মানুষদের বিদেশি ঘোষণা করা কতটুকু  মানবিক?




----- শুধু কাগজ দেখিয়ে এনআরসি, ডি, ডিটেনশন ক‍্যাম্পের আক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়া যাবেনা, প্রয়োজন এক সঙ্ঘবদ্ধ গণ আন্দোলন, যা শাসকের রাতের ঘুম উড়িয়ে দেবে। অনেক সহ্য করা হয়েছে, আর নয়; এবার চোখের জলকে বারুদে পরিণত করার সময়, সব হিসাব এবার আমাদেরও বুঝে নিতে হবে।
তথ‍্যঋণ : লিখেছেন অরূপ বৈশ‍্য ( https://www.tarangabarta.com/assam-and-d/)
                শেষাংশ ও ছবি Debasish দা'র ওয়াল থেকে।

Thursday, October 17, 2019

সয়য় সংকট : ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা

Everybody's talking about
Minister, Sinister, Banisters and Canisters
Bishops, Fishops, Rabbis, and Pop Eyes, Bye bye, Bye byes
All we are saying is give peace a chance
All we are saying is give peace a chance
আজ অনেক দিন পর লেননের গান শুনলাম।  বাবার বড় প্রিয় গায়ক ছিলেন। আজ আর বাবা নাথাকায় এই গানগুলো শোনা হয় না। বিটলস-র প্রখ্যাত গায়ক জন লেনন। ১৯৭০ সালে ৩০শে এপ্রিল; আমেরিকা কম্বোডিয়া আক্রমণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। এর চারদিন পরেই কেন্ট প্রদেশে প্রতিবাদীদের ওপরে গুলিচালনার ঘটনায় ৪ জন ছাত্রের মৃত্যু হলে আন্দোলনের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। আমেরিকা জুড়ে বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক প্রতিবাদ সভা হতে থাকে এবং সেই সভাগুলোতে, লেনন-র ১৯৬৯-এ গাওয়া উপরোল্লিখিত বিখ্যাত গান ‘give peace a chance’, যেটি তৎকালীন সময়ে প্রায় ‘অ্যানথেম’-এ পরিণত হয়েছিল, লক্ষ মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে, যা প্রশাসনের রাতের ঘুম তাড়ানোর কারণ হয়ে ওঠে। যদিও তার বিরুদ্ধে তৎকালীন সরকারের ষড়যন্ত্র চলে। সরকার প্ররোচিত চার বছরের মামলা থেকে মুক্তি পান। নিউইয়র্কের সুপ্রিম কোর্ট তাকে আমেরিকা থেকে বিতাড়িত করার সরকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রায় দেয় এবং তাকে সেখানেই আইনত তাঁর নিজের বাড়িতে থাকার অনুমতি দেয়। লিওন ওয়াইল্ডস, যিনি এই চার বছর ধরে লেনন-র মামলাটি তদারক করছিলেন, রায়দানের পরে বলেন, “He understood that what was being done to him was wrong. It was an abuse of the law, and he was willing to stand up and try to show it—to shine the big light on it." এই জয় তাই লেনন-র একার নয়, এই জয় সেই অগণিত মানুষের, যারা সাম্রাজ্যবাদের পাখসাট থেকে মানবাধিকারের আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়।
আমার স্বপ্নের ভারতে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারি ইত্যাদির স্বল্পতা কোনদিনই ছিলোনা, দুর্দশা নিয়েই তাদের নিত্যি বেঁচে থাকা, তার সাথে গত ২৭ বছর ধরে ‘অযোধ্যা মামলা’ গন্ধমাদন যোগ হয়ে জীবন আজ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন রাজীব গান্ধী সেই যে অযোধ্যায়  কল্পিত ‘রামমন্দির’র তালা খুলে দিলেন, যার ফলস্বরূপ ভারতীয় জনতার জীবনে এক অশুভ, অনাকাঙ্ক্ষিত অধ্যায় শুরু হয়ে গেলো। সাম্প্রদায়িকতা, যা শাসকের অস্ত্র হিসাবে আগেও ব্যবহৃত হতো, তা এক প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হিসাবে ভারতীয় উপমহাদেশে একেবারে গেড়ে বসলো। ইতিহাস সাক্ষী আছে, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরে, শুধু এই দেশেই নয়, সমগ্র উপমহাদেশেই এক চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা গেছিলো।
‘অযোধ্যা মামলা’-যা আজ প্রায় ২৭ বছর ধরে চলে আসছে, তার ভবিষ্যতও রাজনীতির অন্ধগলিতে আটকে আছে, কারণ এই তুরুপের তাসটি ভারতীয় রাজনীতির ‘শক্তিশেল’ হিসাবেই দেখা হয়। সুপ্রীম কোর্টে আটকে থাকা অযোধ্যা মামলার শুনানি অবশেষে শেষ হলো। তবে শেষ দিন পরতে পরতে নাটকীয় ঘটনা ঘটল এজলাসে। সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-এর নেতৃত্বে ৫ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ এই মামলার শুনানি করছিলেন প্রাত্যহিক ভিত্তিতে।
শুনানি শুরু হয়েছিল গত ৬ অগাস্ট। ঠিক ছিল প্রতিদিন শুনানি হবে। অযোধ্যা মামলায় সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসে বিষয়টির সমাধানসূত্র খুঁজে বার করতে বলেছিল শীর্ষ আদালত। কিন্তু সেই বৈঠক নিষ্ফলা হয়। তারপরই সুপ্রীম কোর্ট প্রাত্যহিক শুনানি করে মামলা নিষ্পত্তির কথা জানায়। গত ৬ অগাস্ট মামলার প্রাত্যহিক শুনানি শুরুর পর মাঝে দশেরা ইত্যাদির জন্য ছুটি ছিল আদালত। তারপর তা খোলার পরে ফের শুরু হয় শুনানি। বুধবার শুনানি চলাকালীন সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড-এর তরফে এই মামলায় আইনজীবী হিসাবে দাঁড়ানো রাজীব ধবন রাম জন্মস্থানের ছবি দেওয়া একটি ম্যাপ আদালতের মধ্যেই ছিঁড়ে দেন। এরপরই প্রথম ওয়াক আউট করার কথা জানান প্রধান বিচারপতি। তারপর জানান অনেক হয়েছে, এদিনই শেষ হবে অযোধ্যা মামলার শুনানি। সেইমত বিকেল ৫টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন তিনি।
যদিও তার আগেই শেষ হয় অযোধ্যা মামলার শুনানি। গত ১৫ তারিখ শুনানি শেষ হলেও আরও ৩ দিন সবপক্ষকে সময় দিয়েছে আদালত। তাদের জানানো হয়েছে তাদের যদি এখনও মনে হয় যে তাদের আরও কিছু বলার ছিল বা তথ্য তুলে ধরার দরকার ছিল তাহলে তারা তা লিখিত আকারে আদালতে জমা দিতে পারে। আদালত আরও জানিয়েছে এই মামলার রায় আগামী ১৭ নভেম্বরের মধ্যে দেওয়া হবে। এদিকে খবরের সূত্র অনুযায়ী জানা গেছে, সুপ্রীম কোর্টে শুনানি শেষ হওয়ার আগেই ফের বিতর্ক উস্কে দিয়ে বর্তমান সরকারের এক সাংসদ জানিয়েছে, অযোধ্যায় রাম মন্দির তৈরি শুরু হবে আগামী ৬ ডিসেম্বর থেকে। এটাই আসল উদ্দেশ্য; দেশ যখন এক চরম আর্থিক দুরবস্থার সম্মুখীন, তখন সেখান থেকে দৃষ্টি সরানোর জন্য কখনো কাশ্মীর, কখনো এনআরসি ইত্যাদিকে সামনে আনা হচ্ছে, এবার সেই তালিকায় ‘রাম মন্দির’ গঠনের ইস্যুটি কেন্দ্রীয় স্থান দখল করতে চলেছে। ওরা শুধু সারা দেশজুড়ে এক অরাজক পরিস্থিতি তৈরী করার চেষ্টায়।
চলতি বছরের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ১০২তম স্থানে নেমে গিয়েছে ভারত। ক্ষুধার মেটানোর তালিকায় ভারতের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা,  নেপালের  পরে স্থান হয়েছে ভারতের।অপুষ্টি, শিশুমৃত্যু, পাঁচ বছরের চেয়ে কমবয়সি শিশুর উচ্চতার তুলনায় কম ওজনের মতো কয়েকটি মাপকাঠিতে বিভিন্ন দেশকে বিচার করে বিশ্ব ক্ষুধা সূচক। ২০১৯ সালের সেই সূচক অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কমবয়সি শিশুর উচ্চতার তুলনায় কম ওজনের বিষয়টি (চাইল্ড ওয়েস্টিং) সবচেয়ে বেশি প্রকট ভারত, ইয়েমেন ও জিবুতিতে। ভারতে এই ধরনের ঘটনার হার ২০.৮ শতাংশ। ক্ষুধা সূচক অনুযায়ী, চাইল্ড ওয়েস্টিং-এর এমন হার তালিকায় থাকা অন্য কোনও দেশে নেই। ভারতের জাতীয় সমীক্ষার রিপোর্টও বলছে, ভারতে চাইল্ড ওয়েস্টিং-এর হার ২১ শতাংশ। ২০১৫-১৬ সালের জাতীয় জনস্বাস্থ্য সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, যে সব রাজ্যে চাইল্ড ওয়েস্টিং-এর হার বেশি সেগুলির মধ্যে রয়েছে গুজরাট। এ ছাড়া ওই তালিকায় রয়েছে ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্নাটকের নাম।
ক্ষুধা সূচক অনুযায়ী, বিপুল জনসংখ্যার কারণে বিভিন্ন মাপকাঠিতে ভারতের পরিস্থিতির বড় প্রভাব পড়ে গোটা অঞ্চলের উপরে। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সি শিশুদের মধ্যে মাত্র ৯.৬ শতাংশ সুষম খাদ্য পায়। ক্ষুধা সূচকে ভারতের থেকে পিছিয়ে রয়েছে মাত্র ১৫টি দেশ। এরপরেও বর্তমান সরকার 'দেশ এগিয়ে চলছে', 'দেশের আর্থিক উন্নতি হচ্ছে', 'সিনেমার টিকিট ধুমধাম বিক্রি হচ্ছে' এসব বলে বলে ছক্কা হাঁকছে নির্বাচনীয় জনসভায়; তা চরম বর্বরতা হিসেবে চিহ্নিত হওয়া উচিত।
উপরে উল্লেখিত লেননের যে গান বা তার চিন্তাধারার সঠিক মূল‍্যায়ন করা হয়েছিল। আজ এই 'সময় সংকটে' ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা। বোধহয় এখনই এইধরণের মননশীল চর্চার প্রয়োজন। চক্রান্তকে পরাস্ত করতে, মানুষের ঐক্য গড়ে তোলাটাই হোক আজকের সার্বজনীন নৈতিক দায়িত্ব।

Tuesday, October 15, 2019

প্রশ্ন একটাই: প্রতিরোধ না পদলেহন

“What can you say to a man who tells you he prefers obeying God rather than men, and that as a result, he's certain he'll go to heaven if he cuts your throat?” ― Voltaire

সেই ১৭৬৪ সালে ভলতেয়ার তার প্রকাশিত গ্রন্থ, Dictionnaire philosophique -এ এই কথাগুলো উল্লেখ করেছিলেন। তারপরে ২৫৫ বছর কেটে গেছে; অবস্থার হেরফের হলো কৈ! এই আড়াই শতাব্দীতে প্রাপ্তি; বিজ্ঞানের কিছু আবিষ্কার, সিনেমা, পুঁজির বিবর্তন, চাঁদে পা দিয়ে মঙ্গল যাত্রার তোড়জোড় ইত্যাদি ইত্যাদি, কিন্তু আমাদের চারপাশের সমাজ এখনো সেই মধ্যযুগীয় ধর্মীয় ধ্যানধারণার মধ্যেই আটকে। চারিদিকে দূর্গাপূজো, ঈদ, বড়দিন নিয়ে ধুন্ধুমার দেখে কেমন ধন্দ লাগে; আসলেই সময় এগোচ্ছে কি?!

ধর্ম, ধর্মীয় আচার ইত্যাদি চিরকালই রাজনীতির সাথে সংপৃক্ত থেকে শাসকের ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে, আজও তার কোন ব্যতিক্রম নেই। এই ২০১৯-এ এসেও দেখি; এতো কিছুর না থাকা, অনিয়ম, দুর্নীতি, অনাহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, মাত্রাছাড়া রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ইত্যাদিই শুধু নয়, এমনকি বাঙালি জাতিসত্তার ওপরে এনআরসি-র আক্রমণও ‘থীম’র আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।
“আহা কি আনন্দ; আকাশে বাতাসে” - ক'দিনের ব্যস্ততা ছেড়ে এবার সব ‘ধর্মের রক্ষক’রা তাদের পাশা সাজিয়ে ফেলবে। এখন বাংলার বুকে আরও বিষ ঢালার জন্য তৈরী বাঙালির চরম শত্রু আরএসএস ও তার রাজনৈতিক মুখোশ। কিন্তু এই গুটিকয়েক অমানুষই শুধু বিপদ নয়, আরও বড় বিপদ হচ্ছে, ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সব জেনেবুঝেও মুখ বুজে থাকা।

সুতরাং ঐ অন্যের গলা কেটে স্বর্গ-বেহেস্তে যাওয়ার অমানবিক, বর্বরতাটা এইসব মনুষ্যতের সামাজিক কীটগুলো চালিয়েই যাবে। কিন্তু বিপদের এখানেই শেষ নয়; সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে দেখতে পাওয়া যায়, বহু ‘বাম’ নেতা, কর্মী, সমর্থকরা আসন্ন বিপদের দিকে না তাকিয়ে, অকাতরে বিজয়া-মহরম ইত্যাদির শুভেচ্ছা বিলি করে চলেছেন। এই বামপন্থাকে বুঝতে অসুবিধা হয়; ঐ ‘সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা’ বা “সব ধর্মকে সমান চোখে দেখা”র মতো যুক্তিগুলো সব খুব জোলো, কেমন যেন বালিতে মুখ গুঁজে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা বলে প্রতীত হয়। ধার্মিকরা তাঁদের ধর্মাচরণ করুন, আপত্তি নেই; কিন্তু তাই বলে বামপন্থীদের এই ধর্ম নিয়ে উৎসাহী প্রদর্শন?!
মতাদর্শগত অবস্থান থেকে আমরা মনে করি; সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অবসান ঘটিয়ে, শুধু মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হোক। একদিকে এই পাইকারি হারে ‘শুভেচ্ছা’র ঢল, আর অন্যদিকে আরএসএস, তাদের কর্মীদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, যা প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করতেই কাজে লাগাবে। ওরা সেই ১৯২৫ থেকেই তাদের ঘোষিত (বদ)নীতি অনুযায়ী এই কাজটা করে আসছে এবং ইতিমধ্যেই সারা ভারতব্যাপী এক খুনে বাহিনী গড়ে তুলেছে, যা আগামীদিনের অশনি সংকেত। সত্যিই যদি এই দুরাচারীদের মোকাবিলা করতেই হয় তাহলে ‘ওরা’ অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বলে নাকিকান্না কেঁদে কোন লাভ নেই, এই আপদগুলোর মোকাবিলার জন্য নিজেদের তৈরী হতে বাধা কোথায়? কে মাথার দিব্যি দিয়েছে, নিজেদের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা না করার?

প্রত্যেকটা আক্রমণ, আঘাত, দাঙ্গার চক্রান্ত - সবকিছু সুদ-সমেত ফিরিয়ে দিতে না পারলে, এদের রোখা যাবেনা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়; যেখানে যেখানে মানুষের শ্রেণী তথা গণ সংগ্রাম তীব্রতর হয়েছে, সেখানেই এক ধাক্কায় সমাজের নানান কুসংস্কার, ধর্মীয় রীতিনীতি, ভণ্ডামো, অত্যাচারকে অনেকাংশেই দূর করা গেছে। ধর্মের অলীক পর্দা সরিয়ে, আজ মানুষকে মানুষ হিসাবে না দেখলে, প্রতিবেশীর ফুটফুটে শিশুসন্তানকেও শত্রু মনে হতে বাধ্য। রাস্তা দুটো; প্রতিরোধ অথবা পদলেহন; এবার একটাই প্রশ্ন, কোনদিক, সাথী কোনদিক বল, কোনদিক বেছে নিবি তুই......

Monday, October 14, 2019

অধঃগামী ভারতীয় রেল

বন্ধুরা এটা প্রথম মালিকানা ট্রেন "তেজস"। এতে অনেক সুবিধা উপভোগ করতে পারবে যাত্রীরা। অনেকটা হাওয়াই জাহাজের মত। দেখেই বুঝতে আর বাকি নেই । কারো আবার বিশ্বাস না হলে টিকিট কেটে সফর করে আসতে পারেন যোগীর লাখনৌ। তাতে রাম রাজ্য ঘোরাও হয়ে যাবে আর তেজসেও ভ্রমণ হয়ে যাবে। এক ঢিলে দুই শিকার। তবে একটু সাবধানতা অবলম্বন করবেন বন্ধুরা। কেননা উত্তর প্রদেশ তো। হঠাৎ কি হয়ে যায়। কারণ এখান বাঙালিদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।

শুনেছি ১ ঘন্টা ট্রেন লেট হলে নাকি ১২৫ টাকা দেওয়া হবে। ২ ঘন্টা লেট হলে নাকি ২৫০ টাকা দেওয়া হবে আপনাকে। আচ্ছা হে-- বাম্পার অফার। সব আচ্ছে দিনের কৃপা। আর তেজস কোনদিন লেট হবেনা বলে আমার ধারণা। কেননা সরকারি ট্রেনের লাইন অফ করে তেজসকে লাইন দেওয়া হবে। এখন মোদ্দা কথা হলো এখানে চাকরি পাবে কারা? কি দরকার আপনার খোঁজ নিয়ে? রাম মন্দির নিয়ে আছেন থাকেনা, পাকিস্তান নিয়ে আছেন থাকেনা, ৩৭০ নিয়ে আছেন থাকেনা, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে আসছেন থাকেনা, কি দরকার শুধু শুধু মাথা ঘামানোর? নিজের মাথা ঘামিয়ে শুধু শুধু মাইগ্রেনের জন্য ট্যাবলেট খেয়ে লাভ কি? তার চেয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন।

আমি ভালো আছি বস........
আমরা অত শত চিন্তা করে কি করবো। পুজোর সময়। দেশ যাক গোল্লায়।
তবে শুনে রাখুন মশাই---- আপনার ওই দেশ প্রেম এখন গলিত অবস্থায়। কেননা দেশ এখন পুঁজিপতিদের হাতে চলে যাচ্ছে। তাই চাকরি কে পাবে না পাবে তা ঠিক করবে উঁচু জাতেরা। বাবাসাহেব আম্বেদকর শিক্ষা স্বাস্থ্য বড় শিল্প বীমা এসব রাষ্ট্রের(সরকারী)-নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য লড়াই করেছিলেন, তাতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ভাগিদারীর সুযোগ থাকে। ফলে সমাজের সকল মানুষ সরকারী চাকুরীতে ভাগ পেতো। কারণ সেখানে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ ছিলো, প্রতিনিধত্বের ব্যবস্থা ছিলো। আজ ধীরে ধীরে সমস্ত সরকারী(রাষ্ট্রীয়)-প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ হয়ে যাচ্ছে। এবং এসব করার একটাই কারণ আর ওরা তাতে সফল হয়েছে। এক দেশ এক আইনে।

বিগত কয়েক বছরে SSC/Primary/PSC/CSC/LIC/BSNL/ONGC/RAIL/Coal-এসব বিভিন্ন সংস্থা গুলো সরকারী থাকার ফলে,  কিছু বেকার লোকজন সরকারী চাকুরীর সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু আজ ধীরে ধীরে প্রায় সব কিছুই সমাপ্ত হয়ে বেসরকারীকরণ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উন্নত করার প্রয়োজন অনুভব করেছিলাম, শিক্ষার গুরুত্বও শুধু অনুভব করেছিলাম। কিন্তু আমরা কখনোই এইসব অধিকার গুলো রক্ষা করার কথা ভাবি নি। নিজেদের সমাজের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের কথা ভাবি নি। ফলে আজ সব শেষ হয়ে গেছে। অধিকার শুধু ভোগ করলে হয় না-অধিকারকে রক্ষা করতে হয়, তার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়।

আজ আমরা যারা ভোগ করতে শিখেছি কিন্তু অধিকার রক্ষা করার কথা কখনো ভাবিনি। আমরাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছি। মনুসংহিতা ঘুরপথে বেসরকারীকরণের মাধ্যমে বেসরকারী প্রতিষ্ঠান হল ব্যক্তি মালিকানা-সেখানে কে চাকরি পাবে,  কে পাবেনা, কিভাবে নিয়োগ হবে তা মালিকই ঠিক করবে- রাজনৈতিক নেতা পুঁজিপতিরা আর ঠিক করবে উচ্চবর্ণীয় ভক্তরা। ফলে সবকিছু শেষ।

https://eisamay.indiatimes.com/business/business-news/group-of-secretaries-approved-sale-of-governments-entire-shareholding-in-4-psus-including-bharat-petroleum-corp-ltd-bpcl/articleshow/71380002.cms?utm_source=faceboo
k.com&utm_medium=referral&utm_campaign=shareholding300919
ছবি  সংগৃহিত।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...