Tuesday, June 27, 2023

জলবায়ু মোকাবিলার লড়াই ও ভোগবাদী আগ্রাসন


দুনিয়ায় শুধু মানুষই যে উদ্বাস্তু হয়ে যাচ্ছে তা কিন্তু নয়। গাছপালা কেটে, নদীনালা বুজিয়ে তথাকথিত সভ্যতার উন্নয়নের ধ্বজা ওড়ানো চলছে বীরবিক্রমে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ অনেকাংশেই একটি বাৎসরিক অনুষ্ঠান মাত্রে পরিণত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী মদদপুষ্টরা ফাইব ষ্টার হোটেলের এসি রুমে বসে কিছু সেমিনারের আয়োজন করে কুমির কান্নায় সাসটেইনেবল ডেভলাপমেন্টের পরিকল্পনা, ব্যাস!! ১৯৭২ সালে স্টকহোম বিশ্ব সম্মেলনে পরিবেশ রক্ষার যে সংকল্প নেওয়া হয়েছিল, তাকে এখনো সর্বত্রগামী করা যায়নি। রিও ডি জানেইরোর অতি সাম্প্রতিক বসুন্ধরা সম্মেলন এবং জি-৭ বৈঠকে দূষণ রোধে মতানৈক্য সেকথাই প্রমাণ করে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, সব দেশেই পরিবেশরক্ষার জন্য বহু আইন তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো প্রয়োগ নিয়ে কোনো আলোচনাই শোনা যায় না। অন্যান্য আইনে দণ্ডিত আসামিদের সমাজ যে চোখে দেখে, পরিবেশ আইন ভঙ্গকারীদের সে চোখে এখনো দেখতে শেখেনি। কারণ আমরা প্রত্যেকেই কমবেশি পরিবেশ আইন ভেঙে চলেছি রোজ।

গত শতাব্দীর শেষ দিকে বিজ্ঞানীরা দেখলেন যে পৃথিবীর বৈশ্বিক উষ্ণতা বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি বিভিন্নভাবে পৃথিবীর জলবায়ু  ও জীববৈচিত্র্যের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণকারী সংস্থা ইন্টার গভার্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি মানবসৃষ্ট বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ কবলে পড়েছে ভারত। ভারত ও তার প্রতিবেশী দেশগুলির জলবায়ু এমন জায়গায় পৌঁছতে শুরু করেছে যখন তা মানুষের স্বাস্থ্যকে বিপন্ন করছে। ২০১৮সালের একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের কাছে থাকার পরিস্থিতি প্রায় নেই। অথচ পাঁচ বছর পরেই এই গ্রীষ্মের শুরুতেই ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল সেই তাপমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। পারস্য উপসাগর থেকে পাকিস্তান হয়ে ভারতের উত্তর প্রান্তে তাপপ্রবাহ নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশ্বের জলবায়ু এখন লা নিনা চক্রের মধ্যে রয়েছে। অপেক্ষাকৃত শীতলতর গ্রীষ্ম হয় এই চক্রে। কিন্তু এর পরের পর্যায়েই এল নিনো চক্র শুরু হবে যা পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

সাম্রাজ্যবাদের যুগে ক্রমবর্ধমান দূষণ ও শোষণের কবলে পড়ে পরিবেশ সংকট যতই বাড়ছে, ততই ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কিছু ভ্রান্ত ধারণাগুলো। এরমধ্যে সরাসরি সম্প্রচার করা হয় তাহলো — পরিবেশের এই দুরাবস্থার জন্য সাধারণ জনগণকে দায়ী করা। পুঁজিবাদী উৎপাদনের নিয়ম হলো বর্ধিত হারে পুনরুৎপাদন। যারফলস্বরূপ একদিকে যেমন উৎপাদন এগিয়ে চলে আর অতিউৎপাদনের সংকটে, অন্য দিকে দেখা যায় প্রাকৃতিক সম্পদের অবাধ শোষণ। বর্ধিত হারে পুনরুৎপাদন ছাড়া পুঁজিবাদী ব্যবস্থা টিকতে পারে না। তাই এই ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক সম্পদের শোষনের কোনো সীমা নেই। একটি প্রবন্ধে পড়েছিলাম ‘Scientists linking fossil fuels with climate change and The climate change began in 1960।’ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব জিওগ্রাফির একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, প্রবল গরম ও খরার মুখোমুখি হতে চলেছে বিশ্বের ৯০ শতাংশ মানুষ। নেচার সাসটেইনেবিলিটি পত্রিকায় প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রবল উষ্ণায়ন ও স্থলভাগে জলের সংকট- এ দুই কারণে পৃথিবীজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দশ গুণ বাড়বে। কার্বন নিঃসরণও সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে। এসব কারণে অর্থনীতিও প্রবাভিত হবে। ধনীরা আরো ধনী হবেন এবং গরিব আরো গরিব হবেন। খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে এ পরিস্থিতি।

ভারত পরিবেশগত দিক থেকে বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম দেশগুলোর মধ্যে ভারত একটি। 'গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-২০২৩' অনুযায়ী চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সবচেয়ে বিপন্ন বা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতের অবস্থান অষ্টম। বর্তমানে বৈশ্বিক তাপমাত্রা যে অবস্থানে রয়েছে সেটা বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বের শিল্পায়নের ফলাফল হওয়ায়  চীন, ভারত ও আরো কিছু উন্নয়নশীল দেশ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সব ধরণের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে পশ্চিমা বিশ্বকে এবং তাদেরকে কার্বন নিঃসরণও কমাতে হবে।  

উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর এই রেষারেষির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সূচক অনুসারে প্রথম দশটি ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রের ৮টিই স্বল্পোন্নত এবং ১টি মধ্যম আয়ের দেশ। রাষ্ট্রের মত বায়ুমন্ডল দূষণের কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই। এক দেশের উৎপন্ন কার্বন পুরো বায়ুমন্ডলকেই উত্তপ্ত করতে পারে, যার প্রভাব পুরো বিশ্বেই পড়বে। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর সেই প্রভাব মোকাবেলার সক্ষমতা থাকলেও দরিদ্র দেশগুলোর তা নেই। ফলে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা।

পরিবেশবান্ধব কৌশলগত অংশীদারিত্ব হ'ল রাজনৈতিক সহযোগিতাকে  এগিয়ে নেওয়া, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং পরিবেশ বান্ধব ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং  আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ এবং নানান সুযোগ মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদার করার জন্য পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে  প্যারিস চুক্তি এবং রাষ্ট্রসংঘের স্থিতিশীল উন্নয়নের  লক্ষ্যসমূহ  বাস্তবায়নের উপর গুরত্ব দেওয়া। প্লাস্টিক দূষণরোধসহ পরিবেশ রক্ষায় জলবায়ু পরিবর্তন, আমাদের দেশের ভূপ্রকৃতি ও এর অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যসহ নানা বিষয়ে প্রয়োজন সচেতনতা। পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণে তাই বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন ও সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অবিকল্প। জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change 2022) জেরে ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে কৃষি ও খাদ্য সংকট দেখা দিচ্ছে! Intergovernmental Panel on Climate Change (IPCC)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চরম জলবায়ু পরিস্থিতিতে সংকটের মুখে দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা (food Security)। জাতিসংঘের (UN) সংস্থার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change 2022) কারণে বাড়তে থাকা বন্যা ও খরায় সবচেয়ে জেরবার ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো।

জলবায়ু পরিবর্তন মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুটো কারণেই ঘটে। প্রাকৃতিক কারণগুলো হলো সমুদ্রতটের তাপমাত্রা ও হাওয়ার প্রবাহ। মানবসৃষ্ট কারণগুলো হলো অসততা, পরিবেশ বদল এবং জল ব্যবহারের প্রভাব। ভোগবাদ প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে প্রকৃতির দখল নিতে চায়, মানুষ বা জীবজন্তুর প্রাণের তোয়াক্কা করে না।এভাবেই আজ প্রকৃতি বিপর্যস্ত। এই লালসা এক প্রজন্মে শেষ হওয়ার নয়। বরং পৃথিবীর আয়ুক্ষয় ঘটানো লোভকেই স্বাভাবিক নীতি বানাতে চাইছে। ফলে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন চরম আকার ধারণ করেছে। এটি বিশেষভাবে পরিলক্ষিত যে ১৯৫১ সাল থেকে ৫০ ভাগেরও বেশি উষ্ণতা বৃদ্ধির পেছনে একত্রভাবে দায়ী মানবসৃষ্ট কারণ। রাষ্ট্রসংঘ জানিয়েছে ২০২৩ – ২০২৭ এই পাঁচটি বছর উষ্ণতার পাঁচটি বছর রেকর্ড করবে। তাইতো চিকো মেন্ডিসের মন্তব্য ছিল — “Environmentalism without class struggle is gardening”। ভোগবাদীদের বিরুদ্ধে কি কিছু করণীয় আছে না বিশ্ব সম্প্রদায়ের একটি সাধারণ বৈশ্বিক দায় — তা ভাববার বিষয় ?

Tuesday, June 13, 2023

অস্তিত্ব সংকটে : প্রসঙ্গ উত্তরপূর্বের বাঙালি


অস্তিত্ব সংকটে : প্রসঙ্গ উত্তরপূর্বের বাঙালি

‘রাজামশাইর কাপড় কোথায়' ? অদৃশ্য পোশাকে রাজার পথযাত্রার গল্পের সেই শিশুটির বিস্ময়োক্তি ঠিক একই ছিল। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা কেন অনেক ক্ষেত্রে, ধারাবাহিকভাবে মিথ্যার আশ্রয় নেন, তার কারণ বোঝা দুষ্কর। আসামে বাঙালি বিদ্বেষের ইতিহাস নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পরপরই সেই বিদ্বেষ নানান সময়ে নানান পর্বেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। সেকথা সকলেরই জানা। আর বিতর্কেরও শেষ নেই এই বহুভাষিক আসাম তথা উত্তরপূর্বের বাঙালিদের যথার্থ অবস্থান নিয়ে। অনেকেই বলতে শুরু করেছেন, সেসব এখন ইতিহাস। আসাম এখন শান্ত। সেখানে সকলে মিলেমিশে এক হয়ে বসবাস করছেন সম্প্রীতির বাতাবরণে। কিন্তু কথায় বলে চোখ বন্ধ রাখলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না।

১৯৪৭ সালে সৃষ্ট হয় ভারত ও পাকিস্তান। লাখ লাখ মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও রক্তনদী পেরিয়ে রাজনীতিবিদেরা ভেবেছিলেন ‘সমস্যার সমাধান হলো’। কিন্তু মানুষের লোভ-লালসা ও স্বার্থ-সুবিধার সঙ্ঘাত চিরন্তন। ১৯৪৭ সালের সীমানাপ্রাচীর সঙ্ঘাতের অবসান করেনি, বরং যোগ করেছে নতুন মাত্রা। কে প্রকৃত নাগরিক আর কে প্রকৃত নাগরিক নয়, তার সঙ্ঘাত চলে আসছিল সাত দশক ধরে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩১ আগস্ট ২০১৯ প্রকাশ হয়েছে আসামের প্রকৃত তথাকথিত নাগরিক তালিকা। মোট আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল তিন কোটি ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৬৬১। চূড়ান্ত তালিকায় নাম আছে ৩ কোটি ১১ লাখ মানুষের। বাদ পড়েছে ১৯ লাখ ছয় হাজার। আসামের এই দীর্ঘায়িত সঙ্কট অসমিয়া বনাম বাঙালি। 

আসামের বাঙালি জীবনের ভূমিতল সত্যের ভিতটা গণভোট ও দেশভাগের হঠাৎ ঘায়ে যখন ছিন্নভিন্ন অবস্থা থেকে একটু থিতু হচ্ছে তখনই বলা হয় বাঙালি বিদেশি, বলা হয় বাংলায় পড়াশুনা করা যাবে না স্বাধীন দেশে, তাড়াতে হবে স্বভূমি থেকে বাঙালিকে, তাঁবু গোটাতে হবে। কিন্তু বাঙালি যাবে কোথায়, কেন যাবে বংশ পরম্পরায় আসামবাসী বাঙালি। স্থায়ী বসতি থেকে উৎখাতের রাষ্ট্রীয় চক্রান্তের বিরুদ্ধে বাঙালি প্রথম প্রতিবাদ করে ১৯৬১র উনিশে মে আর সেদিনই এগারোজন শহিদ হন, স্বাধীন দেশে প্রথম ভাষাশহিদ। এর পরেও দফায় দফায় শহিদ হয়েছেন দক্ষিণ আসামে, এমনকি উত্তর আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায়ও চোরাগাপ্তা বাঙালি হত্যা হয়েছে। গোরেশ্বর হত্যাকাণ্ড হয়েছে নেলির চরমানুষদের হত্যা হয়েছে। এমন যখন অবস্থা তখন আসামের বাঙালি সর্বাত্মক প্রতিরোধে নেমেছে যার যেমন ক্ষমতা সেই অস্ত্র হাতে। আসামের বাঙালির কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারী কবিতায় জানিয়েছেন তাঁর ক্ষোভ, ‘যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সে-ই কেড়েছে ভয়, আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়।'

Wednesday, April 12, 2023

ভগত সিং ও নতুন ভারত গড়ার লক্ষ্য


( ১ )
"কেন আমি নাস্তিক" প্রবন্ধে ভগৎ সিং লিখেছেন, "যে মানুষ প্রগতির পক্ষে তাকে পুরোনো বিশ্বাসের প্রত্যেকটি বিষয়কেই চ্যালেঞ্জ করতে হবে। যথেষ্ট যুক্তিতর্ক ও বিচার-বিবেচনার পর যদি কেউ কোনো তত্ত্ব বা দর্শনে বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে তার বিশ্বাসকে স্বাগত জানাতে হয়। তার চিন্তাভাবনা ভুল বা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। কিন্তু তা শোধরানোর সুযোগ আছে, কারণ সে পরিচালিত হয় বিচারবুদ্ধির দ্বারা, অন্ধবিশ্বাসের দ্বারা নয়। বিশ্বাস ও অন্ধবিশ্বাস বিপজ্জনক, তা মস্তিষ্ককে অকোজো করে দেয়, মানুষকে প্রতিক্রিয়াশীল বানিয়ে তোলে।" উক্ত বইতে লেখা আছে- "যে দেশের যুবসমাজ দেব-দেবী, ধর্মের পিছনে দৌড়াতে থাকে, তাদের জন্য আমি কাপুরুষ শব্দ ব্যবহার করা উচিৎ বলে মনে করি। এই রকম যুবসমাজের হাতে দেশের ভার গেলে সেখানে কিছুই ভালো হওয়া সম্ভব নয়।"

ভগৎ সিং যে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন সেখানে ছিল না কোন শোষণ। এক শ্রেণীহীন সমাজ। সেটা শুধুমাত্র ব্রিটিশদের অধীনতা থেকে মুক্তি নয়। ভগৎ সিং এর উক্তি - "আমি একজন বাস্তববাদী, শাণিত যুক্তি-বিজ্ঞানই আমার হাতিয়ার, তাই দিয়েই আমি আমার ভিতরের প্রবৃত্তিকে জয় করতে চাই। এই ব্যাপারে যে আমি সবসময়ই সফল হয়েছি তা নয়, কিন্তু আমাদের উচিত বারে বারে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, কেননা সাফল্য নির্ভর করে ঘটনাচক্র আর বাস্তব পরিস্থিতির উপরে।"

( ২ )

ইনকিলাব জিন্দাবাদ একটি অসম্পূর্ণ স্লোগান। ভগৎ সিং সম্পূর্ণভাবে যে স্লোগান ধরেছিলেন, বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক, সাম্রাজ্যবাদের পতন হোক। সাম্রাজ্যবাদ মানে সেই এলাকা দখল করে অন্যের পরিশ্রম ও সম্পদ দখল করে নিজের সাম্রাজ্য বানানো। পূর্বে এই কাজ করত এক দেশ অন্য দেশের উপর। আজ অভ্যন্তরীণ সাম্রাজ্যবাদ অবিরাম অব্যাহত রয়েছে। তাঁর বুলডজারিয় উচ্ছেদ অভিযান আগ্রাসন চালাচ্ছে জোর কদমে। আদানির কালো ব্যবসা নিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বেশ চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেছে। মরিশাস-ভিত্তিক শেল কোম্পানি ইলোরা ক্যাপিটাল আদানি প্রতিরক্ষা সংস্থার সহ-মালিক। ইলোরা একই কোম্পানি যার নাম হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ রিপোর্টে বিশিষ্টভাবে স্থান পায়। ইলোরা আদানি প্রতিরক্ষা সংস্থা আলফা ডিজাইন টেকনোলজি প্রাইভেট লিমিটেড (ADTPL) এর সহ-মালিক এবং ৯000 কোটির বিনিয়োগ রয়েছে৷

 হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ প্রকাশ করেছে যে ইলোরা নামে একটি কোম্পানি আদানি গ্রুপে 24,766 কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে যা তার মোট মূলধনের 99%। এটা স্পষ্ট যে এটি একটি জাল কোম্পানি যার মাধ্যমে আদানি গ্রুপে কালো টাকা লেনদেন করা হয়।  আদানি ডিফেন্স ISRO এবং DRDO-এর সাথে কাজ করে।  মানে ভারতের নিরাপত্তা খাত কালো টাকা মাফিয়ার হাতে চলে গেছে। গ্রামগুলো শহরের সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে; শহর কিছুই বাড়ায় না কিন্তু সবচেয়ে বেশি খায়। জল, বিদ্যুৎ, কয়লা, সোনা, রূপা, লোহা, টিন, কয়লা, শস্য, দুধ, মাছ,মাংস, ফলমূল, শাকসবজি, ডিম গ্রামে রয়েছে। সে শহরে নিজের জন্য কাগজের নোট ছাপিয়েছে, এটাই তার সম্পদ। ক্রয় করছে মানুষ থেকে শুরু করে জমি।

কিন্তু প্রকৃত সম্পদ তো রয়েছে গ্রামেই। যখন গ্রাম শহর থেকে জাল সম্পদের জন্য আসল সম্পদ বিনিময় করতে অস্বীকার করে ঠিক তখনই শহর তার বুলডজার কে গ্রামে পাঠায়। গ্রাম গুড়িয়ে, জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, গ্রামবাসীদের মারধর করা হয়, জেলে ঢোকানো হয়। পুলিশ পোস্ট বসানো হয়, শহরের শর্তে তাদের মালামাল শহুরে প্রাণীদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়। আজ দুর্বল অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন করা হচ্ছে এবং তাদের পাঠানো হয় জনগণের সম্পদ ও শ্রম দখলের জন্য। এটা অভ্যন্তরীণ সাম্রাজ্যবাদ যেখানে ভগৎ সিং বলেছিলেন, এটা একটা যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধ ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার পরেও থামবে না। এই যুদ্ধে আমাদের নারীরা ধর্ষিত হচ্ছে, শিশুদের হাত কেটে দেয়া হয়, জীবন্ত পুড়িয়ে দেয়, পুরুষরা জোরপূর্বক ঘর থেকে টেনে হেঁচড়ে গুলিবিদ্ধ হয়। আমার মত একজন স্বার্থপর ব্যক্তি জীবিত ভগত সিং এর সমর্থক হতে পারি না, শুধুমাত্র মৃত ভগৎ সিংকে পূজা করার ভান করতে পারি। আর যেটুকু ভগৎ সিংয়ের প্রশংসা করি না কেন কিন্তু এর মধ্যে যদি আদানি মার্কা গন্ধ থাকে তবে নেহাৎ ভন্ডামী ছাড়া আর কি বলা যায়!

( ৩ )

যদি প্রার্থনা, উপবাস, আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মকর্ম থেকে কোনো উপকার পাওয়া যেতো তবে পুঁজিপতিরা তাও দখল করে নিত। এবং সাধারণ জনগণকে তা করার কোন পারমিশন ও দিতো না। কিন্তু বড়ই করুন সত্য যে উপরওয়ালার প্রার্থনা কোন সাহায্যে আসে না। সেজন্য পুঁজিপতিরা গরীব মানুষের জন্য এটা ছেড়ে দিয়েছে এবং তাঁরা এটাও জানে যে নিম্নবিত্ত এতে আটকে থাকবে। অথচ দেখুন একটা মজার বিষয় হলো পুঁজিপতিরা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করে নিচ্ছে, ব্যাংকে রাখা টাকা লুট করছে, আমরা বেরোজগার হচ্ছি। আমাদের ব্যবসা দখল করে সম্পত্তি হাতিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারে ক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখতে পুঁজিপতিরা শাসকশ্রেণীর সঙ্গে মিলে আমাদের পরস্পরের লড়াইয়ে লিপ্ত করছে। ধর্মের ভিত্তিতে একে অপরকে ঘৃণা করার ফাঁদে ফেলছে।অন্য ধর্মের বা অন্য বর্ণের ছেলেমেয়েরা একে অপরকে জীবন সঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়াতে তাদের হত্যা করা হচ্ছে। আমাদের কি চিন্তা করার সময় আছে, আমাদের অজ্ঞতা আমাদের সন্তানদের জন্য কি ধরনের জগৎ তৈরি করেছে!

রাজনীতি সাধারণত দুই ধরনের হতে পারে,প্রথম বাস্তব রাজনীতি মানে এমন রাজনীতি যা জনগণের সমস্যার সমাধান করে। যেমন কর্মসংস্থান, শিক্ষা, শোষণ থেকে শ্রমিকের মুক্তি, কৃষকের উন্নতি, নারীর সমতা, জাতপাত, সাম্প্রদায়িকতা থেকে সমাজকে মুক্ত করার রাজনীতি ইত্যাদি। আরেকটা রাজনীতি হচ্ছে বোকা বানানোর রাজনীতি, সেই রাজনীতিতে এক ধর্মের সম্মানের নামে রাজনীতি।কিছু বর্ণের আধিপত্যকে ভিত্তি করে, ভুয়া জাতীয়তাবাদের স্লোগান তোলা হয়, কাল্পনিক শত্রু উদ্ভাবন করা হয়, অহেতুক বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, সেনাবাহিনীর নামে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়, কিছু সম্প্রদায়কে শত্রু ঘোষণা করা হয়। প্রথম রাজনীতি সমাজের উন্নতির দিকে নিয়ে যায়, জীবন সুখী হয়, কিন্তু দ্বিতীয় ধরনের রাজনীতির ফলে সমাজে ভয়, বিদ্বেষ ও সহিংসতা বাড়তে থাকে। দ্বিতীয় প্রকারের রাজনীতিতে জনগণের জীবনসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ হয় না, শুধু শব্দগুচ্ছ থাকে। দ্বিতীয় প্রকারের রাজনীতির একটি লক্ষণ হলো, ধীরে ধীরে মৌলবাদ বাড়তে থাকে, নতুন গুন্ডারা পুরনো গুন্ডাদের উদারপন্থী বলে নিজেদের হাতে ক্ষমতা দখল করে এবং ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ নির্বোধ ও নিষ্ঠুর নেতা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড়,এর পর এই রাজনীতির সুনিশ্চিত অবসান।কারণ হিংসা ধ্বংসাত্মক, এই আগুন সবাইকে পুড়িয়ে দেয়,ধরুন, ভারতে যদি সংঘের স্বেচ্ছাচারিতা চলতে দেওয়া হয়, তাহলে তারা সর্বোচ্চ কী করবে? তারা কি একসাথে মুসলমান, খ্রিস্টান, কমিউনিস্ট, ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবে? সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় তারা ভারতে আট থেকে দশ কোটি মানুষকে হত্যা করবে,কিন্তু তাতে না মুসলিম, না খ্রিস্টান, না কমিউনিস্ট মতাদর্শ পৃথিবী থেকে শেষ হবে না, নতুন বুদ্ধিজীবীদের জন্মও বন্ধ হবে না। কিন্তু এর পর হিন্দুত্বের রাজনীতি নিশ্চিতভাবেই চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। তারপরে ভারত অবশ্যই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সঠিকভাবে তার কাজ চালিয়ে যাবে।

আসলে হিটলারও সেটাই করেছিলেন,তিনি নিজেকে পুরাতন ও তাঁর জাতিকে বিশ্বের সেরা জাতি হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। ইহুদিদেরকে তাঁর দেশের সমস্যা বলে ঘোষণা করেন। এক কোটি বিশ লক্ষ নারী, শিশু, যুবক ও বৃদ্ধকে তাদের বাড়িঘর থেকে বের করে বিষাক্ত গ্যাস ছেড়ে মেরেছিলেন। তিনি শুধু ইহুদিদের হত্যা করেননি, কমিউনিস্ট, বুদ্ধিজীবী, উদারপন্থী, ভিন্নমতাবলম্বী, সমকামী, মুক্তিকামী মানুষের হত্যা করেছিলেন। কিন্তু হিটলার শেষ পর্যন্ত নিজেকে গুলি করেছিলেন।জার্মানি দুই খন্ডে বিভক্ত হয়। আজও দেশের মানুষ হিটলারের নাম নিতে দ্বিধা করে।এবং যদি নাম নেওয়া হয়, তারা লজ্জা এবং ঘৃণার সাথে নিয়ে থাকে। ভারতেও যদি এভাবে সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদের ভুয়ো রাজনীতি গড়ে ওঠে, তবে এটা তার শেষের দিকে যাচ্ছে এটা নিশ্চিত, এই ধরনের রাজনীতি কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। চিতায় জ্বলে উঠবে নতুন ভারত। এটা নিশ্চিত যে রাজনৈতিকভাবে একটা জাতি থেকে যাবে নাকি টুকরো টুকরো হয়ে যাবে, এটা বলা খুব কঠিন।

ভগত সিং তার ফাঁসির আগে পাঞ্জাবের গভর্নরকে একটি চিঠি লিখেছিলেন যুদ্ধ চলছে এবং এই যুদ্ধ চলবে। এই যুদ্ধ ভারতের জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের সম্পদ ও পরিশ্রম কেড়ে নেওয়ার জন্য। ব্রিটিশ চলে গেলেও এই যুদ্ধ চলবে ,দরিদ্র ও মেহনতি জনগণ এতে নির্ধারক বিজয় না পাওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলবে। তাহলে এটা নিঃসন্দেহে বলতে পারি ভগৎ সিং-এর এই বক্তব্যটাও সত্য প্রমাণিত হচ্ছে !!

১২-০৪-২৩

Sunday, April 2, 2023

ডার্ক মুভিজ : মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিক এখন কোন পথে !


বিগত কিছুদিন থেকে মানুষের রুচিবোধের বিরাট পরিবর্তন ঘটছে। যে কোন ওটিটি প্লাটফর্মের ট্রেন্ডিং এ থাকা কোন ওয়েব সিরিজ দেখলেই তা অনুমান করা অতি সহজেই যায়। বর্তমান সময়ে সিনেমা সিরিয়ালের পাশাপাশি গ্ল্যামার ইন্ডাস্ট্রিতে এক নতুন সংযোজন হয়েছে ওয়েব সিরিজের। আসলে প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে চলতে গিয়ে এখন প্রত্যেকেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়েব সিরিজ দেখতে পছন্দ করেন। বাংলা, হিন্দি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার বেশ কিছু ওয়েব সিরিজ টেক্কা দেয় বড় বাজেটের সিনেমাকেও। আসলে করোনা পরবর্তী সময় থেকে ডিজিটাল মিডিয়া কদর বুঝে গিয়েছে সাধারণ মানুষ। আর সেই সাথে পাল্লা দিয়ে চলার জন্য জন্ম নিয়েছে একাধিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মের। এই ওয়েব সিরিজ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে - হয়ত রয়েছে রগরগে যৌনতা, নতুবা রয়েছে ডার্ক অ্যাকশন সিকুয়েন্স।

কথা হল এখন যেকোনো ওটিটি প্লেটফরমে অপরাধমূলক কাহিনীতে আধারিত সিনেমা বা ডার্ক মুভিজ এর বিরাট কদর। সেই সঙ্গে সমান তালে আছে ওয়েব সিরিজও। এটা খুবই দুশ্চিন্তার বিষয় যে ওয়েব সিরিজ সমূহে যৌনতা, জঘন্য হত্যা, ধর্ষণ, হিংসাত্মক কাহিনীর মূলে সিনেমা প্রদর্শিত হয়। এই জঘন্যতম অপরাধ প্রচলিত সমাজে বর্তমান তা থেকে দর্শকরা কি শিক্ষা পাবে, এটাই এখন প্রশ্ন ? এই ধরনের বহু সিরিজ বা সিনেমা আমরা অনলাইনের মাধ্যমে দেখতে পাই যেখানে আসলেই শিল্পের নামে বিক্রি হচ্ছে সম্ভাব্য অপরাধী বা অপরাধপ্রবণ মানুষের অপরাধ সংঘটিত করার টিপস্। আজ আমাদের চারপাশে সংঘটিত হয় এমন জঘন্য থেকে জঘন্যতম অপরাধসমূহের তথা সভ্য মানব সমাজের গৌরব ভূলুণ্ঠিত করা অপরাধজনিত ঘটনাসমূহের কাহিনী বানিয়ে হুবহু উপস্থাপন করে এবং তাকেই সিনেমা, ওয়েব সিরিজের নামে বিক্ৰী করে ইতিমধ্যেই একাংশ চলচ্চিত্র নির্মাতাই বেশ ধন অর্জনে সফলতা পেয়েছেন। এক কথায় আজকের অপরাধীরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত করার জন্য সেইসব ছবি বা ওয়েব সিরিজকেই হাতিয়ার বানিয়ে ফিরছে।

ইতিমধ্যে এই ধরনের বহু সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ ভালো ব্যবসা করছে যেখানে দেখানো হয়েছে নৃশংস হত্যায় কিভাবে একজন অপরাধী তার কার্যসম্পাদন করতে পারে। এই ধরনের অপরাধ বা অপরাধীকে মহিমান্বিত করার জন্য ব্যবসার স্বার্থে একজন অভিনেতা এই কাজটিও খুব সুনিপুণভাবে করছেন। আজ থেকেও প্রায় একটা দশক আগে মানুষের বিনোদনের উপাদান খুব সরল ছিল। ত্রিকোন প্রেম, শোষণকারী জমিদার বনাম নিপীড়িত মানুষের মাঝখান থেকে উঠে আসা অ্যাংরি ইয়াং ম্যান অথবা ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ, মধ্যবিত্তীয় পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের ঘর-সংসারের কাহিনী। এর মধ্যেই বিচরণ ছিল বলিউড সিনেমা। তারপর হঠাৎ একদিন শুরু হল এই ডাটা যুগের। হাতে হাতে ফোরজি নেটওয়ার্ক সমৃদ্ধ মোবাইল ফোন। সম্ভবতঃ ২০১৬ সনে আমরা বিশেষ করে আসামে ফোরজি সেবা চালু হয়। সেটা যে নেটওয়ার্কই হোক, ফোরজি সেবা বিস্তার হওয়ার সাথেসাথেই আমাদের সমাজ রুচিশীল সংস্কৃতি থেকে অনেকটা সরে যেতে থাকে। মানুষের সমস্ত ধ্যান ধারণা চোখের সম্মুখে মোবাইলের স্ক্রিনের উপর আবদ্ধ হয়ে আটকে থাকে। 

২০২১-২২ সালে প্রকাশিত Nielsen Report অনুসারে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক গড় হিসাবে স্ক্রিন টাইম অর্থাৎ মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করার সময় হলো প্রায় ১৫ ঘন্টা। ২০১৯ এ এর সময় ছিল ১০ ঘন্টা। নিশ্চয়ই আমাদের ক্ষেত্রে বিচার করা হয় তবে এই সময় আরও অধিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যেখানে প্রতিদিন ফেসবুকের মত যে কোন একটা অর্থহীন বিষয়ে 'ভাইরাল' হয়ে থাকে অথবা ঘরের শৌচাগারের ভিডিও আপলোড করে ইউটিউবে মিলিয়নের হিসাবে ভিউয়ার্স থাকে সেখানে তো নিশ্চয়ই অন্যান্য রাজ্য দেশ স্থানের তুলনায় স্ক্রিন টাইমিং বেশি হবে। যাইহোক ফোরজি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ডাটা যুগেই আমাদের প্রত্যাবর্তন তা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পাওয়াটা স্বাভাবিক। মানুষের হাতে হাতে প্রত্যহ দেড় জিবি ডাটা কোথায় খরচ হবে ঠিক সেই সময় ইউটিউবাররা বেশ পরিকল্পিতভাবে এর মুনাফা লাভ করছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, যদিও রুচিবোধের অবক্ষয় হচ্ছে তারপরও কিছু সংখ্যক পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থাকে পুঁজি করে  মেহনতি মানুষের টাকা ডাটায় কনভার্ট করে শোষণ করছে।

আসলে এটা একটা মাইন্ড গেম। বেশ ভালো করে বুঝতে পেরেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতারা যে কিভাবে কম পুঁজিতে মোটা অংকের টাকা নিজের কাছে চলে আসে সেই জন্য হাতিয়ার হিসেবে ওয়েব সিরিজ যে ডার্ক মুভিজ এর বিপুলতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অবশ্য তথাকথিত ডাটা যুগের পূর্বেও অপরাধ জগত, রাজনীতির রুক্ষ বাস্তব যতদূর সম্ভব মৌলিক রূপে উপস্থাপনের চেষ্টা কিছু সিনেমায় দেখা গিয়েছিল। যেগুলো দেশের বিশেষ করে হিন্দি প্রধান সমাজে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করা হয়।  এক্ষেত্র অগ্রগণ্য ছিল  'গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর' শীর্ষক চলচ্চিত্র সিরিজটি। যেখানে অপরাধ ও রাজনীতির নেক্সাসটা বেশ সাহসিকতার সাথে প্রদর্শিত করা হয়। অপরাধজনিত সিনেমা হিসেবে ভারতীয় দর্শক এক নতুন স্বাদে তা গ্রহণ করে, সমাদৃত যেভাবে হয়েছিল সমালোচিত হয়েছিল বেশ। তবে হ্যাঁ এই সিনেমার মাধ্যমে নওয়াজ উদ্দিন সিদ্দিকী, পঙ্কজ ত্রিপাঠী, রাজকুমার রাও এর মত প্রতিভাবান অভিনেতাদের মাধ্যমে বলিউডের নেপটিজমগ্রস্থ ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন ঘটে। ভারতীয় সিনেমা জগতে এক নতুনত্ব প্রদান করার যোগ্য দাবিদার হিসেবে কৃতিত্ব মেনে নিলেও সমালোচকরা বলেন যে এই সিনেমার পূর্বে ভারতীয় চলচ্চিত্রে অপরাধ জনিত দৃশ্য এত খোলাখুলি ভাবে প্রকাশিত হয়নি আর যদিও একটু আধটু হয়েও থাকে তবে দর্শকদের এত আকৃষ্ট করতে পারে নাই। তবে যাই হোক এটা ছিল ডাটা যুগের পূর্ব ধারণা। কিন্তু এর পরবর্তী দু-তিন বছরের মধ্যেই ফোরজি নেটওয়ার্কে মাধ্যমে চলে আসে আমুল পরিবর্তন। সঙ্গে সঙ্গে উন্মুক্ত হয় বলিউড, হলিউড, ওয়েব সিরিজ, আর ডার্ক মুভিজের মুক্ত মঞ্চ। এই যুগে অপরাধের নির্মোহ অথচ কলাত্মক দিক উপস্থাপন না করে, সমাজ-রাজনৈতিক দিকে প্রভাবিত না করে এই ওয়েব সিরিজ সমূহে কেবল নৃশংস-বীভৎস্য-হত্যা-হিংসা উপস্থাপন করে ক্ষান্ত হয়নি সেখানে দেখানো হয় কীভাবে একটা মৃতদেহকে কতটা ক্ষতবিক্ষত করলে ঘাতকের তৃপ্তি আসে, দেখানো হচ্ছে আইনের চোখে কিভাবে ফাঁকি দিয়ে অবাধে বিভৎস অপরাধমূলক ঘটনা সংঘটিত করা যায়। মূল কথা ডার্ক মুভিজগুলো অপরাধের কৌশল শিখাবার পাশাপাশি একথা শেখাবার বারংবার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যে অপরাধ কোন বড় কথা নয়, জাস্টিফিকেশন দিতে পারলেই অপরাধ ন্যায্য!

সংবেদনশীল মানুষ মাত্রই এটা অনুভব করতে পারবেন যে আমাদের চারপাশ কতটা বিষাক্ত হচ্ছে ধীরে ধীরে। কিভাবে মানুষের জন্য ভালো খবরের অভাব ঘটছে। পৃথিবী জটিল থেকে জটিলতার হয়ে পড়ছে। এই সময় মানুষের সুস্থ চিন্তা করতে সৃষ্টিশীল কাজের খুব প্রয়োজন। একজন শিল্পী আমাদের অনুভব করাতে পারেন চার পাশের সত্যাসত্য ঘটনার সাথে, আগ্রাসিত বিশ্বায়নের সাথে, বলতে পারেন রুটি কাপড় ও ঘরের সমস্যা কথা, তরুণ তরুণীর জীবন সংগ্রামের কথা — এগুলিই তো একজন শিল্পী ও শিল্পের অমূল্য সম্ভার। অন্যথায় সমাজ হয়ে পড়বে অসুস্থ। নিয়ন্ত্রণহীন সমাজ জীবন - ভিডিও বা মোবাইল গেমস, শর্টস, রিলস্, এমনকি এই ধরনের ওটিটি প্লেটফর্ম র ডার্ক মুভিজ ইত্যাদি মানুষকে করে তোলে অপরাধী। এই গেমস ভিডিও বা ওয়েব সিরিজ মনস্তাত্ত্বিক দিকের কূপ প্রভাব ফেলে। সেই জন্য অপরাধ এবং বিনোদন দুটিকে দুই জায়গায় রেখে সরকার তথা সেন্সর বোর্ডকে যাচাই করতে হবে সমাজের কোনটি ফলপ্রসূ।

Tuesday, March 28, 2023

আরজ আলী মাতুব্বর : সত্যের অভিযাত্রী


“বিদ্যাশিক্ষার ডিগ্রী আছে জ্ঞানের কোনো ডিগ্রী নেই; জ্ঞান ডিগ্রীবিহীন ও সীমাহীন”।

'প্রায় ৫০-৬০ হাজার বছর আগের নিয়ান্ডারথাল মানুষেরাই প্রথম প্রশ্ন তোলে জীবন-মৃত্যু নিয়ে? মানুষ কোত্থেকে আসে? বেঁচে থাকে কেন? মারা যায় কেন? শুধু মানুষ নয়। প্রকৃতিকে নিয়েও তারা প্রশ্ন করা শুরু করেছিল। নদী প্রবহমান কেন? বাতাস কি? পাহাড় এলো কোত্থেকে? সূর্য আলোকিত কেন? সহস্র বছর আগের অবিকশিত ও আদিম বুদ্ধি দিয়ে আদিম মানুষেরা ভেবে নিয়েছিল তাদের প্রতিটি সমস্যার সমাধান। প্রাণীজগতের সব প্রাণীই নিজেদের যেকোন সমস্যায় নিজ নিজ বুদ্ধি, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই আধুনিক যুগেও প্রাণীদের চোখে মটরগাড়ীগুলো শব্দকারক ও দূর্গন্ধযুক্ত একটি বিদঘুটে প্রাণী ছাড়া কিছুই নয়। একটি যন্ত্র সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণের জন্য আমরা প্রাণীদেরকে দোষ দিতে পারি না। কারণ যন্ত্রকে যন্ত্র মনে করার জন্য যে জ্ঞান, মেধা, মণীষা, অভিজ্ঞতা থাকা দরকার তা তাদের নেই। জীব জগতের কোটি বছরের ইতিহাসে মনুষ্যেতর প্রাণীগুলো কখনো যন্ত্র নিয়ে গবেষণা করেনি, বা করতে চায়নি। বানর, কয়েক প্রজাতির পাখি এবং অন্যান্য কয়েকটি মাত্র প্রাণী অবশ্য যন্ত্রের ব্যবহার করে। উঁচু ডাল থেকে ফল পাড়তে লাঠি, শত্রু তাড়াতে ঢিল, খাদ্য ভাঙতে পাথর ইত্যাদির ব্যবহার তারা করে থাকে। কিন্তু তাদের যন্ত্র সম্পর্কে এই অভিজ্ঞতা অতটুকু প্রাথমিক অবস্থাতেই থেকে গেছে। আর কোন অগ্রগতি হয়নি এবং তা সহজাত প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। কারণ যন্ত্রের ঐ সীমিত ব্যবহারটুকুর বেশি তাদের প্রয়োজন হয়নি। তাই যন্ত্রের আবিষ্কার বা উৎকর্ষের জন্যও কোন রকম অভ্যন্তরস্থ আগ্রহ তারা বোধ করেনি। কিন্তু মানুষ মানবেতর নয়। ক্রমাগত নিজেকে পেরিয়ে যাওয়ার এক অদম্য আগ্রহ মানুষকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায়। ফলে মানুষ নিরন্তর তার পূর্বতন অনভিজ্ঞতা, অনগ্রসরতা, পশ্চাৎপদতা, সীমিত যান্ত্রিক শক্তি প্রভৃতিকে পরিত্যাগ করেছে এবং সাগ্রহে বরণ করেছে ভবিষ্যতের নতুনত্ব, জ্ঞান, আবিষ্কার, মনন। তাই অন্যান্য পশুদের জীবন যাত্রা এখনও আদিম যুগের ন্যায় থাকলেও মানুষের ক্ষেত্রে তা পাল্টে গেছে। মানুষ এগিয়ে এসেছে বর্তমানের কুসংস্কারহীন প্রযুক্তিময় পৃথিবীতে।'

দার্শনিকরা কখনও ফুরিযে যায় না; বরং সময় ও সমাজ তাঁদেরকে ধারণ করে। সময়ের সমান্তরালে তাঁরাও বহমান। একটা সমাজকে প্রগতিশীল হতে হলে দার্শনিক দরকার। দর্শন আসে জীবনবোধ থেকে, দর্শন আসে প্রশ্ন ও চিন্তার স্বাধীনতা থেকে। অথচ আমাদের সন্তানরা প্রশ্ন করতে জানে না, চিন্তা করতে জানে না। বাঙালির জীবন খুব সংকীর্ণ। কোনোভাবে পঞ্চাশটা বছর কাটাতে পারলে মৃত্যুর প্রহর গুনে তাঁর দিন কাটে। জীবনের বিকাশ ও জীবনবোধ তাঁর কাছে অনর্থক। লালনের মতো দার্শনিককে আমরা এখনও পাগল বানিয়ে রেখেছি। একটা সমাজকে কেবল লালনের গান দিয়ে সুচিন্তক বানানো সম্ভব। লালন বাংলার মাটিতে বেড়ে ওঠা মানুষ, এখানকার পরিবেশ ও জীবনের সাথে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। আরবদের জীবনীর বদলে বাংলা বইয়ে লালনের জীবন পাঠ অনেক বেশি জরুরী ও প্রাসঙ্গিক। লালনের জীবন কোনো পয়গম্বরের থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু সেই লালন আমাদের কাছে উপেক্ষিত। আমরা লালন দর্শনে চর্চা করি না।

আরজ আলী নামের একজন মানুষ এই পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছেন তা প্রথম জানতে পারি ডিগ্রি ফার্স্ট ইয়ারে। সত্যের সন্ধানে বইটা পড়ি পিডিএফ আকারে ঠিক তারিখ মনে নেই তবে সালটা ২০১৫-১৬ হবে। যেহেতু নামটা আগে শুনেছি তবে তাঁর বই পড়ার সুযোগ হয় নি। যদিও কলেজে পড়ার সময় হেগেল, কনফুসিয়াস, দেকার্ত, মার্কস, এঙ্গেলস, মাও, বার্ট্রান্ড রাসেল পড়েছি। সময় সুযোগে তাঁদের জীবন ও দর্শন সম্পর্কে জেনেছি এবং অভিভূত হয়েছি কিন্তু আরজ আলী মাতুব্বর পড়া হয়নি। সক্রেটিস বা প্লেটো বাঙালির খুব পরিচিত নাম। সক্রেটিস পড়ছিলাম ক্লাস টেনে ইংরেজি সাবজেক্টে একটা পাঠ ছিল, তখন।

বাট্রান্ড রাসেল খ্রিস্টধর্মের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন, জাঁ-পল সার্ত্র ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন না। কিন্তু তাঁরা নিজ দেশে অনেক সম্মান পেয়েছেন। দার্শনিক নিটশে বলেছেন, ‘ঈশ্বর মৃত’। কিন্তু নিটশে পড়ানো হয় পৃথিবীর সব দেশে। আরজ আলী মাতুব্বরকে একজন বিজ্ঞানী ও লৌকিক দার্শনিক অভিধায় ভূষিত করা হয়, তাঁর লেখা হেগেলের দ্বান্দ্বিকতাবাদের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। একদিকে বলা যায় তিনি যুক্তিবাদী দর্শনের একনিষ্ঠ অনুসারী, আবার অন্যদিকে বলা যায় তিনি আধুনিক চার্বাকবাদী।

আরজ আলী মাতুব্বর প্রশ্ন করতে ভালোবাসতেন। শুধু প্রশ্ন করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, সেগুলোর উত্তর সন্ধানের চেষ্টা করেছেন। মানুষের জীবন ও প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর মনে কৌতুহল বা কোনোরকম প্রশ্নের উদয় হলে তিনি ‘বস্তুবাদ’ বিষয়টা নিয়ে নড়াচড়া করতেন। বই থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান এবং নিজের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তিনি নিজস্ব চিন্তার জগৎ তৈরি করতেন। একটি প্রবাদ আছে "স্বশিক্ষিত লোক মাত্রেই সুশিক্ষিত।" সে হিসেবে 'স্বশিক্ষিত' আরজ আলী মাতুব্বর অবশ্যই একজন সুশিক্ষিত ব্যক্তি। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। আরজ আলী মাতুব্বর বিশ শতকের একজন অনন্য ও অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। বিজ্ঞানে আস্থাবান যুক্তিবাদী আরজ আলী বাঙালির মানসমুক্তির সহায়।

আমাদের সমাজ আরজ আলীকে ধারণ করে না। আরজ আলীকে নিয়ে চর্চা হয় না। দেশে হাতেগোনা কিছু মানুষই হয়ত আরজ আলী নামের সাথে পরিচিত। অথচ আরজ আলী সবার পাঠ্য হওয়া উচিত। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের মতো মুখস্ত থাকা উচিত আরজ আলীর জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী। প্রসঙ্গক্রমে কেউ যদি আরজ আলীর জন্ম বা মৃত্যু নিয়ে দু একটা লাইন লিখে ফেসবুকে পোস্ট করে তবে তাকে নানা উপাধিতে ভূষিত করা হয়। নাস্তিক-আস্তিকের প্রশ্নে ভেসে যায় কমেন্টবক্স। এখানে চিন্তার স্বাধীনতা নেই, প্রশ্নের স্বাধীনতা নেই। ধর্ম নামক জাতাকলে পিষ্ঠ সবাই। সেসবের বিপরীতে আরজ আলী চিন্তা করার সাহস যেগায়, প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা দেয়।

আরজ আলী মূলত বস্তুবাদী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি অনেক অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লেখালেখি করেন। আরজ আলীর রচনায় মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদী দার্শনিক প্রজ্ঞার ছাপ রয়েছে। মানবকল্যাণ ও বিশ্বধর্ম আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রদের জন্য বৃত্তি প্রদান, পাঠাগার স্থাপন ও রচনা প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করেন। এছাড়া তিনি নিজ দেহ ও চক্ষু মানবতার সেবায় উৎসর্গ করেন। মাতুব্বর বরিশালের অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির, অধ্যাপক মুহাম্মদ সামসুল হকসহ অসংখ্য সাম্যবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজমান ছিলো।

তার বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতার কথা তিনি একাধিক গ্রন্থে প্রকাশ করেন। তার লিখিত বইয়ের মধ্যে ‘সত্যের সন্ধান’, ‘সৃষ্টি রহস্য’, ‘সীজের ফুল’, ‘শয়তানের জবানবন্দী’ অন্যতম। আরজ আলীর রচিত পাণ্ডুলিপির সংখ্যা মোট ১৫টি। এর মধ্যে তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছিল ৪টি। এই বইগুলো হলো- ‘সত্যের সন্ধান’ (১৯৭৩), ‘সৃষ্টি রহস্য’ (১৯৭৭), ‘অনুমান’ (১৯৮৩), ও ‘স্মরণিকা’ (১৯৮৮)। আরজ আলী মাতুব্বর তার প্রথম বইয়ের প্রচ্ছদও আঁকেন। বইটি লিখেছিলেন ১৯৫২ সালে। প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে ‘সত্যের সন্ধানে’ শিরোনামে। বইটি তাকে এলাকায় ‘শিক্ষিত ব্যক্তি’ হিসেবে সুনাম এনে দিয়েছিল।

তাঁর সত্যের সন্ধান গ্রন্থে আরজ আলী মাতুব্বর যে মৌলিক প্রশ্নগুলি উল্লেখ করে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন তার মধ্যে রয়েছে : ‘১. আমি কে? ২. প্রাণ কি অরূপ না স্বরূপ? ৩. মন ও প্রাণ কি এক? ৪. প্রাণের সহিত দেহের সম্পর্ক কি? ৫. প্রাণ চেনা যায় কি? ৬. আমি কি স্বাধীন? ৭. অশরীরী আত্মার কি জ্ঞান থাকিবে? ৮. প্রাণ কিভাবে দেহে আসা যাওয়া করে?’..... ঈশ্বর সম্পর্কিত প্রশ্নে আরজ আলী মাতুব্বর জিজ্ঞেস করেছেন ‘স্রষ্টা কি সৃষ্টি হইতে ভিন্ন?’ ঈশ্বর কি স্বেচ্ছাচারী না নিয়মতান্ত্রিক?’ ….......

কেবল দার্শনিক চিন্তায় নয়, জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ বোধের আর এক প্রকাশ ঘটেছে তার এরূপ কর্মে যে, তিনি জীবিত অবস্থাতেই জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মানুষের হিতার্থে তাঁর দেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে উইলের মাধ্যমে বরিশাল মেডিক্যাল কলেজকে দান করে গেছেন। প্রতি বছরই ১৫ই মার্চ আরজ আলী মাতুব্বরের জন্মদিন পালন করা হয়। এত বছর পরে আরজ আলীকে নিয়ে কেউ উৎসাহ দেখাবে তা হয়ত তিনিও ভাবতেন না। ঠিক এভাবেই আরজ আলী সময়ের সমান্তরালে বহমান। শত বা সহস্র বছর পরেও আরজ আলী আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হবেন।

লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন ও সন্দীপ দত্ত


লিটল ম্যাগাজিন ভাবুন, কিনুন, পড়ুন – সন্দীপ দত্ত ছাড়া এভাবে আর কেউ কি বলতে পারেন! সন্দীপ দত্তের দেহাবসান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আসলে গতানুগতিকতার বাইরে দৈনিকে রবিবারের ফিচারপাতা নয় লিটল ম্যাগাজিন। বাঙালির একক চেষ্টায় যে সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে এবং দীর্ঘ জীবন পেয়েছে তার মধ্যে সন্দীপ দত্তের লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি অন্যতম, সাম্প্রতিকতমও বটে। লিটিল ম্যাগাজিনের একাল-সেকাল বিষয়ে কী ভাবেন? এই বিষয়ে সন্দীপ দত্তকে জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন, “বাংলা সাময়িক পত্রের শুরুটা যদি আমি ১৮১৮ সাল ধরি, তাহলে বলব পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লিটল ম্যাগাজিন বাংলা ভাষাতেই বেরোয়। এই ১৮১৮ থেকে আজ পর্যন্ত এত বছরের ইতিহাসটা একটা লং জার্নি। ১৯ শতক ছিল নির্মানের যুগ। সেখানে ‘সবুজপত্র’ ছিল, ‘বঙ্গদর্শন’ ছিল, ‘তত্ত্ববোধিনী’ ছিল, সাহিত্যের একটা নতুন ধারার উপস্থিতি দেখা গেছিল। ৪০’এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সারা বিশ্ব তথা বাংলায়ও বামপন্থি প্রভাব পড়েছিল, সেখান থেকে সে সময়ে ‘দ্বন্দ্ব’, ‘কাক’, ‘স্ফুলিঙ্গ’, ‘অগ্রনী’ ইত্যাদি বেরোল। ৬০’এ কমিউনিষ্ট পার্টিকে কেন্দ্র করে বহু কাগজ বেরিয়েছিল। তার মধ্যেই হাংরি জেনারেশন চলে আসে, সেটাই ছিল প্রতিষ্ঠান বিরোধী প্রথম আন্দোলন। ঐ আন্দোলন কে কেন্দ্র করে কতকগুলো পত্রিকা বেরোল। ৮০’এ আমরা দেখলাম বিশেষ সংখ্যা বেড়ে গেল অর্থাৎ আগে এত বহুমুখীনতা ছিল না, যেমন- উত্তর আধুনিকতা, মানুষের দ্বিচারিতা-হিংসা, শ্মশান, হাট-জনপদ, ঘুড়ি, মানুষের চুল, নানান বিষয় বৈচিত্র দেখা গেল। সেকাল-একাল এইভাবেই। সেকালের লিটল ম্যাগাজিনকে আমরা এককথায় বলতে পারি সাহিত্যকেন্দ্রিকতা, এখনও সাহিত্যকেন্দ্রিকতা, তবে আগের থেকে বিষয়-বৈচিত্র্য অনেক বেড়েছে।”

বাংলা সাহিত্য নিয়ে যাঁরা নীরবে কাজ করেন, তাঁদের কাছে সন্দীপ দত্ত এক পরিচিত নাম। পাঁচ দশক ধরে প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যের পুনঃপ্রকাশনার কাজও। বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিনের প্যাভেলিয়নে দেখা যেত তাঁকে। তাঁর গ্রন্থাগারে সেকালের ‘সবুজ পত্র’ থেকে ‘কৃত্তিবাস’ বা আজকের প্রায় সব রকমের লিটল ম্যাগাজিনই স্থান পেয়েছিল। এমন অনেক দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহ তাঁর কাছে ছিল, যা একেবারে অকল্পনীয়। সন্দীপ নিজেও একাধিক গল্প, প্রবন্ধ এবং কবিতা সংকলনের স্রষ্টা। করে গিয়েছেন সাহিত্যের পুনঃপ্রকাশনার কাজ। 

লিটল ম্যাগাজিন এক আন্দোলনের নাম অর্থাৎ 'ইনকিলাব'।  ‘স্বপ্ন নয়– শান্তি নয়– ভালোবাসা নয়, হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়’। এই বোধ'ই জন্ম দিয়েছিল সম্পাদনার কাজ। 'মননভূমি' সাহিত্য পত্রিকা। সময়টা ছিল ২০১৭ সাল। বাংলাদেশ সফর থেকে ফিরেই এপ্রিল ২০১৭ সালে 'মননভূমি' প্রথম প্রকাশ প্রায় প্রয়াত বিশ্বজিৎ চৌধুরী ও কম০ নিশীথ রঞ্জন দাসের হাত ধরে। ইচ্ছে ও উদ্দীপনা নিয়ে চলছে আজও। ২০১৮ সালে ডিসেম্বরে ৭ম উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনের আমন্ত্রণ পাই আমরা। সেই সুবাদে আমাদের ৩য় সংখ্যা উন্মোচিত হয় সন্দিপ দত্তের হাত ধরে। দীর্ঘদিনের এক অনন্ত পিপাসা মেটে এই সম্মেলনে। বেশ কিছুসময় তাঁর সাথে আলাপ হয়। লিটল ম্যাগাজিন সম্বন্ধে খুঁটিনাটি বিষয় জানতে পারি। দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে বেশ কিছু সময় আমাদের স্টলেও বসেছিলেন। 'মননভূমি' ১ম ও ৩য় সংখ্যা তাঁর হাতে দিয়েছিলাম। আজও স্মৃতি বিজড়িত সেইসময়। লকডাউন এর পর যখন সন্দিপ দা কে দেখতে যাই, আমি অবাক! পুরো মনে আছে আমাদের কথা লিটল ম্যাগাজিন সহ। তোমাকে ভোলা যায় না সন্দীপ দা। তুমিই শিখিয়েছো আন্দোলনের আরেক নাম লিটল ম্যাগাজিন।

১৫ মার্চ ২০২৩ (বুধবার) ৭২ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন বাংলায় লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব সন্দীপ দত্ত। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মধুমেহ রোগে ভুগছিলেন। হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। গ্যাংগ্রিন হওয়ায় তাঁর একটি পা বাদ দিতে হয়েছিল। বিগত কয়েক দিন ধরে তাঁর ডায়ালিসিস চলছিল। ২০২৩ সালের শুরুতে তাঁর শারীরিক অবস্থার প্রচণ্ড অবনতি ঘটে। প্রথমে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে সেখান থেকে তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সন্দীপ দত্তের প্রয়াণ লিটল ম্যাগাজিনের সংরক্ষণ, অস্তিত্বের ক্ষেত্রে এক বড় আঘাত হানল। তিনি চলে যাওয়ায় লিটল ম্যাগাজিনের জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হল। সন্দীপ দত্তের সংগ্রহে থাকা বহু দুষ্প্রাপ্য পত্রিকা আজ থেকে অভিভাবকহীন হয়ে গেল।

১৮/এম, টেমার লেন, কলকাতা ৭০০০০৯—এই ঠিকানাটি বাংলা পত্র-পত্রিকার প্রতি আগ্রহী বহু মানুষেরই অতি পছন্দের একটি গন্তব্য। এখানেই রয়েছে ‘কলিকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র’। যার প্রতিষ্ঠাতা হলেন সন্দীপ দত্ত। ১৯৭৮ সালের ২৩ জুন এই প্রতিষ্ঠানটি স্থাপিত হয়েছিল। সন্দীপ দত্তের প্রায় একক প্রচেষ্টাতেই এর জন্ম বলা চলে। সাধারণ গ্রন্থাগারে ক্ষুদ্র পত্র-পত্রিকার প্রতি অবহেলা দেখে সন্দীপ দত্ত নিজেই সেগুলি সংরক্ষণ শুরু করেন। নিজের বাড়িতে দু-কামরার ঘরে গড়ে তোলেন লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি। ক্ষুদ্র পত্র-পত্রিকার প্রতি সন্দীপ দত্তের প্রেম সর্বজনবিদিত। প্রায় অর্ধ শতক ধরে তিনি বাংলা পত্র-পত্রিকার সংগ্রহ ও সংরক্ষণে নিবেদিত প্রাণ।

পশ্চিমবঙ্গে অন্তত লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও সন্দীপ দত্তের নাম প্রায় এক নিঃশ্বাসেই উচ্চারিত হতে শোনা যায়।১৯৫১ সালের ২৪ জুলাই কলকাতায় সন্দীপ দত্তের জন্ম। সেন্ট পলস স্কুল থেকে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূত্রপাত হয়। স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ. করেন। সেখান থেকেই বি.এড. ডিগ্রি অর্জন করেন। কলকাতার মির্জাপুরের সিটি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আজীবন সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলেন। সিনে সেন্ট্রাল কলকাতারও সদস্য ছিলেন তিনি। এরকম আরো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। একাধিক পত্র-পত্রিকার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। বেশ কয়েকটি বই রচনা করেছিলেন। ২০০০ সালে তাঁর ‘লিটল ম্যাগাজিন ভাবনা’ বইটি প্রকাশিত হয়। ২০০২ সালে প্রকাশিত হয় ‘ভুবনেশ্বরী’ এবং ‘বিবাহ মঙ্গল’। ২০০৪ সালে ‘বহতা’। ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সম্পাদিত ‘বাংলা ভাষা বিতর্ক’। ২০০৮ সালে তাঁর সম্পাদিত ‘জন্মদিন’ প্রকাশ পায়। সন্দীপ দত্তের হাত ধরেই আসে একগুচ্ছ লিটল ম্যাগাজিন— ‘পত্রপুট’, ‘উজ্জ্বল উদ্ধার’, ‘অল ইন্ডিয়া লিটল ম্যাগাজিন ভয়েস’। সন্দীপ দত্তের একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হল ‘বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিবৃত্ত (১৯০০-১৯৫০)’।

অবশ্য শুধু পত্রিকাই নয়। একইসঙ্গে লোকশিল্পেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন সৃজনশিল্পী সন্দীপ দত্ত। তাঁর লাইব্রেরিতে গেলেই আন্দাজ পাওয়া যাবে তাঁর শিল্পরুচির। তাছাড়াও কলকাতার বুকে লেখকব্যাঙ্ক তৈরি, একাধিক ছোটো পত্রিকা ও গ্রন্থের সম্পাদনা, শিক্ষকতা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরব উপস্থিতি তাঁর। অসুস্থতা সত্ত্বেও শেষ বয়সে হাজির হতেন বাংলার বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন মেলা, বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নের টেবিলে টেবিলে। কাঁপা হাতেই সংগ্রহ করতেন পত্রিকার নতুন সংখ্যা। ইতিহাস, আঞ্চলিক সাহিত্য ও বাংলা ভাষা সংরক্ষণের প্রতি এ এক অকৃত্রিম ভালোবাসাই বটে। এমন এক ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ অভিভাবকহীন করে তুলল দুই বাংলার সমস্ত লিটল ম্যাগাজিন করিয়েদের। ছাদ হারালেন ছোটো পত্রিকার সম্পাদক, কর্মী, লেখক ও গবেষকরা...

প্রসঙ্গ যখন 'বিজ্ঞান শিক্ষা' ও 'বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা'


"বিজ্ঞানশিক্ষা ও বিজ্ঞানমনষ্কতার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। উইকিপিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্য হতে জানা যায়, বিজ্ঞান হচ্ছে বিশ্বের যাবতীয় ভৌত বিষয়াবলী পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ, যাচাই, নিয়মসিদ্ধ, বিধিবদ্ধ ও গবেষণালদ্ধ পদ্ধতি যা জ্ঞানকে তৈরিপূর্বক সুসংগঠিত করার কেন্দ্রস্থল। ল্যাটিন শব্দ সায়েনটিয়া থেকে ইংরেজি সায়েন্স শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে জ্ঞান। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান শব্দটির অর্থ বিশেষ জ্ঞান।" আবার, আধুনিক বিজ্ঞানের উৎস আলোচনা করতে গিয়ে বলা যায়, দর্শন হতেই বিজ্ঞানের উন্মেষ। যদিও আমরা বর্তমানে দেখতে পাই দর্শন ও বিজ্ঞান দুটি পৃথক পদ্ধতিগত শিক্ষা। তথাপি দার্শনিক পদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অভিন্ন নয়। হয়ত নীতিগতভাবে এদের মধ্যে কোনো বৈসাদৃশ্য থাকার কথা ছিল না। 'কারণ প্রাচীনকালে সভ্যতার ঊষালগ্নে আমরা বিজ্ঞানকে দার্শনিক বিষয়বস্তু হিসেবেই আলোচিত হতে দেখি। তখন বলা হতো, Natural Philosophy বা ভৌত দর্শন। নিউটনের ‘ন্যাচারালিস ফিলোসফিয়া প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা’ এর প্রমাণ। পদার্থবিজ্ঞানে যুক্তির প্রয়োগ, আরোহী-অবরোহী পদ্ধতির প্রয়োগ – এসবই দার্শনিক ভাবপ্রসূত। কিন্তু ক্রমশ গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান শাস্ত্রীয় দর্শন থেকে আলাদা হয়ে বর্তমান বিজ্ঞানের ভিত্তিভূমি রচনা করেছে।'

'সুতরাং, বিজ্ঞান শব্দটির সবচেয়ে সরলীকৃত অর্থ হলো- বিজ্ঞান হচ্ছে একটি দর্শন, যে দর্শনের মূল ভিত্তিই হলো প্রশ্ন করা ও কার্যকরণ অনুসন্ধান করা।' এবং, এককথায় বিজ্ঞানমনষ্কতা বলতে সেই দুটি বৈশিষ্ট্যকে বুঝায় যা বিজ্ঞানকে ধারণ করতে অপরিহার্য। এই দুটি বৈশিষ্ট্য হলো – প্রশ্ন করার প্রবণতা এবং কার্যকরণ অনুসন্ধানের
প্রবণতা। সুতরাং, যে ব্যক্তি অন্তরে উপরোক্ত দুটি বৈশিষ্ট্য ধারণ করবেন তিনিই বিজ্ঞানমনষ্ক হিসেবে বিবেচিত হবেন। এজন্য বিজ্ঞানের ছাত্র হবার প্রয়োজন নাই। যেমন: পেরিয়ার, আহমদ শরীফ বা হুমায়ুন আজাদ, কেউই বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন না। দর্শন ও সাহিত্যের ছাত্র হয়েও তাঁরা বিজ্ঞানমনস্কতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তেমনি স্বশিক্ষিত বিজ্ঞানমনষ্ক ছিলেন আরজ আলী মাতুব্বর। তিনিও স্বেচ্ছায় প্রশ্ন ও কার্যকরণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিজ্ঞানমনষ্কতার প্রমাণ রেখেছেন। একই কথা প্রযোজ্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বেলায়ও। তিনিও বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। কিন্তু, তিনি গ্রামে গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন শিশুদের। শিখিয়েছেন আহ্নিক গতি বার্ষিক গতির কার্যকরণ।

অপরদিকে, “বিজ্ঞানশিক্ষা” শব্দটি শুধুমাত্র পদ্ধতিগত এবং সীমাবদ্ধ বিজ্ঞান শিক্ষাকেই বুঝায়। এটি সাবজেক্ট ও সিলেবাসনির্ভর নিতান্তই সীমিত পরিসরে বিজ্ঞানের কিছু কার্যকরণকে আয়ত্ব করার শিক্ষা। রাষ্ট্রপ্রণীত “শিক্ষা” সর্বদাই নির্দিষ্ট। এর গতিপথ নির্দিষ্ট এবং নিয়ন্ত্রিত। যেকেউ এই নির্দিষ্ট গতিপথে চলে, নির্দিষ্ট সিলেবাস মুখস্থ করে “বিজ্ঞানশিক্ষা” সম্পন্ন করে দক্ষ কর্মী হতে পারে। এই সম্পূর্ণ ব্যবস্থাটি বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী একেকজন কর্মী উৎপাদন নিশ্চিত করে। এতে সেই কর্মীটি অন্তরে আদৌ প্রশ্ন করার এবং অনুসন্ধানের ক্ষমতা রাখেন কিনা – সে ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। বস্তুত, এই বিজ্ঞানমনষ্কতার বিকাশকে শিক্ষাব্যবস্থা তেমন গুরুত্ব দেয় না। একজন ব্যক্তির মনের মধ্যে প্রশ্ন করার ক্ষমতা এবং অনুসন্ধানের স্পৃহা জাগবে কি জাগবে না তা নির্ভর করে তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক অবস্থা, পারিবারিক শিক্ষা এবং শিক্ষাব্যবস্থার পরিবেশের উপরে।

এবারে আরও একটি ঘটনার কথা বলি যা আমাদের পরিষ্কারভাবে বুঝতে সাহায্য করবে, পদ্ধতিগত “বিজ্ঞানশিক্ষা” কিভাবে একজন ব্যক্তিকে বিজ্ঞানমনষ্ক করতে ব্যর্থ হয়। ক্লাস টেনের যখন আমি ছাত্র ছিলাম। তো, আমাকে বাসায় সাইন্স ও মেথস পড়াতেন পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রিধারী একজন স্কুল শিক্ষক। তিনি আমাকে খনিজ পদার্থের সৃষ্টিপ্রক্রিয়া বুঝাতে গিয়ে বলেছিলেন, হাজার বছর ধরে গাছপালা মাটির তলায় পড়ে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে এইসব খনিজ মজুদ
হয়েছে – এসব শুধু পড়ার জন্য পড়ো, কিন্তু বিশ্বাস কোরো না। কারণ, ধর্মগ্রন্থে স্পষ্ট আছে, এইসব স্রষ্টার দান।
অর্থ্যাৎ, তিনি নিজে বিজ্ঞানচর্চা করেছেন ঠিকই, কিন্তু, বিজ্ঞানমনষ্ক হতে পারেন নাই। এবারে তিনি আমাকে বিজ্ঞানচর্চা করতে বলছেন ঠিকই কিন্তু বিজ্ঞানমনষ্ক হতে রীতিমত বাধা দিচ্ছেন! এইভাবে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা বাধাগ্রস্থ হয় পদে পদে। ( যদিও আমি পরবর্তীতে আর্টস নিয়ে পড়াশোনা করি) 'বিজ্ঞানমনষ্কতা ও বিজ্ঞানশিক্ষার মধ্যকার এই যে দ্বৈরথ তা মানুষকে বিজ্ঞানমনষ্ক হতে বাধা দেয়। বিজ্ঞানশিক্ষা হলো প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার একটি অংশবিশেষ। তাই, বিজ্ঞানমনষ্কতা এবং বিজ্ঞানশিক্ষা পুরোপুরি দুইধরণের কথা বলে। বিজ্ঞানমনষ্কতা মানুষকে বলে সম্ভাবনার কথা। আর বিজ্ঞানশিক্ষা বলে সীমাবদ্ধতা ও শর্টকাটের কথা। অর্থাৎ, কোন পথে, কতটুকু বিজ্ঞান শিখলে দক্ষ টেকনোলজিস্ট হওয়া যাবে এবং কোন কোন পথে যাওয়া বারণ। 

“শিক্ষা” সামগ্রিকভাবে একটি প্যাকেজ, যেখানে জ্ঞানের বহু শাখার অল্প অল্প তথ্য সীমাবদ্ধ করে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ হলো রাষ্ট্রপ্রণীত একটি কৃত্রিম ব্যবস্থা যেখানে শিক্ষার্থী মূলত রাষ্ট্রের কাছ থেকে শিখছে, প্রকৃতির কাছ থেকে নয়। বিজ্ঞানশিক্ষাও এইরকম একটা প্যাকেজ। এখানেও রয়েছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রণীত বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে স্রেফ দক্ষতা অর্জনের জন্য বিশেষ সিলেবাস এবং লিমিটেড পাঠদান। অপরপক্ষে, বিজ্ঞানমনষ্কতা রাষ্ট্রনির্ভর কোনো বিষয় নয়, প্রকৃতিনির্ভর বিষয়। এর কোনো সীমা-পরিসীমা নাই, এতে রয়েছে চিন্তার স্বাধীনতা এবং নিজস্ব সিদ্ধান্ত যাচাই করার সুযোগ।
অপরদিকে শিক্ষাব্যবস্থা তথা বিজ্ঞানশিক্ষার কেবলমাত্র দুটি উদ্দেশ্য – পরীক্ষার নম্বর ও অর্থসংস্থান। এই অর্থসংস্থান হলো বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে করে খাওয়ার নিছক শিক্ষা, কোনো দর্শনের উন্মেষ ঘটানো এর উদ্দেশ্য নয়। কারণ, বৈজ্ঞানিক দর্শনের উন্মেষ বস্তুত সকল বিষয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করে, এমনকি তা শাসককেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে ছাড়ে না। আর শাসক প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া মানে শিক্ষাব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া। মুক্তচিন্তার উন্মেষ মানেই সকল পদ্ধতিগত, সীমিত জ্ঞানচর্চার বিলোপ। সুতরাং, বিজ্ঞানমনষ্কতার বিকাশ বিজ্ঞানশিক্ষা, শিক্ষাব্যবস্থা এমনকি খোদ রাষ্ট্রের জন্যেও একটি বিপদজনক বিষয়ই হয়ে দাঁড়ায়।'

কিন্তু, বিজ্ঞানশিক্ষা কেবলমাত্র বিজ্ঞানের নির্দিষ্ট কিছু তত্ত্ব শেখায়। সেগুলো মানুষকে প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করে না, ফলে শাসক থাকেন নিরাপদ। শিক্ষাব্যবস্থা এবং বিজ্ঞানশিক্ষা বলতে আমি শুধু দেশের পরিপ্রেক্ষিতকে বুঝাচ্ছি না। “শিক্ষাব্যবস্থা” বা “বিজ্ঞানশিক্ষা” – এসবের প্রকৃতি সমগ্র পৃথিবীতেই কমবেশী একইরকম। খোদ ইংল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করতে গিয়ে জর্জ বার্নাডশ বলেছিলেন, “একজন ছাত্রকে গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রী দেওয়া হয় কখন? যখন সেই ছাত্র একটা তথাকথিত শিক্ষাপ্রদানের পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে শেষ পর্যন্ত সে নিজের সম্বন্ধে ভাববার সকল ক্ষমতা হারিয়ে ফেল তখন।”

শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহারিক শিক্ষাকেও সীমাবদ্ধ করে বিজ্ঞানমনষ্কতাকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টাও স্পষ্ট। দেশের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় দীর্ঘদিন বিশেষ কোনো ব্যবহারিক বিজ্ঞানশিক্ষার ব্যবস্থাই ছিলোনা। "এজন্য খোদ বিজ্ঞানশিক্ষাও বেশ প্রকাশ্যেই সমাজে চলে আসা হাজার বছরের ধর্মশ্রায়ী কুসংস্কারগুলোকে ধারণ করে, এদের রদ করার চেষ্টা করে না। স্রেফ টেকনোলজিতে দক্ষ কর্মী উৎপাদনের জন্য কুসংস্কারকে দূরীকরণের প্রয়োজনও নাই। তাই, খোদ বিজ্ঞানের শিক্ষকেরাই বিজ্ঞানমনষ্ক নয়। তাঁরাই বয়ে বেড়ান ধর্মাশ্রয়ী কুসংস্কার। তাঁরা শিক্ষার্থীদের মনে সেইসব কুসংস্কারের বীজ বপন করে দেন। পরিবার থেকেও শিক্ষার্থীরা পায় নানান ধরণের ধর্মাশ্রয়ী কুসংস্কারের শিক্ষা। ফলে, উচ্চতর শিক্ষায় দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার সুযোগ পেলেও ছোটবেলা থেকে মনের মধ্যে জেঁকে বসা কুসংস্কারগুলো বিজ্ঞানকে মনের মধ্যে আলোড়িত করতে বাধা দেয়।"

আবার, আরেকটু ভিন্নচিত্রও দেখা দেয়। যদি আমরা ধরে নেই এইসব শিক্ষার্থীর জীবনে ধর্ম একটা বিরাট প্রভাব ফেলে, তারা ধর্মীয় অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলে – তাহলেও ভুল হবে। এটা শুধু ধর্মপ্রেম নয়। এ হলো নিখাঁদ কুসংস্কার, নিখাঁদ গোড়ামী। ব্যক্তিগত জীবনে এদের বেশীরভাগও ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি নির্ভরশীল নয়, শুধুমাত্র বিজ্ঞানশিক্ষার বেলায় ঘটে সংঘাত, তাও কিছু কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্নে – যেমনঃ কসমোলজি বা সৃষ্টিতত্ত্ব, বিবর্তনতত্ত্ব, ভূগোল ইত্যাদি।

"এতো গেল ধর্মাশ্রয়ী কুসংস্কারগ্রস্থদের কথা। আবার, এমনও বিজ্ঞানশিক্ষার্থী দেখা যায় যারা হয়তো বিজ্ঞানচর্চায় পারদর্শী কিন্তু নিজেরা বিজ্ঞানমনষ্ক নয়। অর্থ্যাৎ, উদ্ভাবনীর দিকে এদের আগ্রহ নেই বললেই চলে। এরা দক্ষ বিজ্ঞানকর্মী হতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই বিজ্ঞানী নয়। এরকম উদাহরণ ভরী ভরী যেখানে শিক্ষার্থীর একাডেমিক রেজাল্ট দুর্দান্ত, কিন্তু, তারা মোটেও বিজ্ঞানমনষ্ক নয়। তারা বিজ্ঞানকে আয়ত্ত্ব করতে পারে, তত্ত্বের মারপ্যাঁচ, জটিল-কঠিন সমীকরণ বুঝতে পারে, তা দিয়ে বিভিন্ন প্রজেক্টও করতে পারে কিন্তু, সৃজনশীলতার বেলায় অত্যন্ত কাঁচা। অর্থ্যাৎ, জানাশোনা সমীকরণ, জানাশোনা সমস্যা এরা সমাধান করতে পারে, কিন্তু উদ্ভাবনী শক্তি গড়পড়তা নেই বললেই চলে। বিজ্ঞানশিক্ষার পরেই এদের লক্ষ্য থাকে কোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করা অথবা বিদেশে পাড়ি জমানো। আমাদের দেশের সর্বোপরি বিজ্ঞানশিক্ষার যে চল, যে কাঠামো রয়েছে সেটাই এই সৃষ্টিশীলতাকে নষ্ট করার জন্য দায়ী বলে মনে হয়। তাছাড়া, আমাদের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা, ওয়ার্কিং সেক্টরের অভাব এসবও গভীরভাবে জড়িত। এসব ছাড়াও আরও একটি ব্যাপারকে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় তা হলো, আমাদের সমাজে বিজ্ঞানশিক্ষা একটি এলিট স্থান অধিকার করেছে। এখানে ছেলেমেয়েদের চাপ দিয়ে বিজ্ঞান পড়তে দেওয়া হয়। অনেকের হয়তো থাকে না যথেষ্ট আগ্রহ। তাছাড়া সেই পুরাতন কুসংস্কারগুলোকেও আরও সযত্নে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অর্থনৈতিক অবস্থা তাকে বাধ্য করে এই ভাবতে যে – কোনোমতে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শেষ করতে পারলেই হলো, তাহলেই মিলে যাবে একটা চাকুরী। এইরকম মানসিকতা থেকে বিজ্ঞানকে শুধু চর্চা করাই হয়, নিজেকে শুধু কর্পোরেট জগতের জন্য প্রস্তুত করাই হয় কিন্তু, প্রকৃত বিজ্ঞান শিক্ষার ফলে মস্তিষ্কে যে যুক্তিবোধ ও বিজ্ঞানমনষ্কতার অনুরণন ঘটার কথা, তা আর ঘটার সুযোগ পায় না। কুসংস্কার, অপশিক্ষা আর রাষ্ট্রীয় দৈন্যের ফলে অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে যায় এইদেশের বেশীরভাগ শিক্ষার্থীর বিজ্ঞানমনষ্কতা; বিজ্ঞান আটকে যায় সীমিত পরিসরের মধ্যে। বিজ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞানমনষ্কতা এক জিনিস নয়। বিজ্ঞানমনষ্ক একজন ব্যক্তি সর্বদাই স্বশিক্ষিত এবং শুভব্রতচারী। তাঁরা যদিও জনহিতকর কাজে নিয়োজিত থাকেন। বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষের মধ্যে স্বাধীনতাবোধ জাগ্রত হতে বাধ্য। আর, স্বাধীনতাবোধ কর্তৃত্বতন্ত্রের পতন ঘটানোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী চেতনা। এতে রাষ্ট্র নামক কর্তৃপক্ষের অস্তিত্ব ধ্বংসের মুখোমুখি হয়। একজন বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষ সমাজের সংস্কার সাধন করেন ঠিকই তথাপি খোদ রাষ্ট্রই তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। আবার, উল্টোদিকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানশিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে টেকনোলজির প্রতি অন্ধমোহ সৃষ্টি করে। আর, টেকনোলজির প্রতি অন্ধমোহ পারমাণবিক বোমার জন্যও ভালোবাসার জন্ম দিতে পারে। বিজ্ঞানকে তাই ক্ষুদ্র পরিসরে আটক করে ফেললে তা জন্ম দেবে স্রেফ চমকপ্রদ কর্পোরেট খেলনার। এসব খেলনা দিয়ে মানুষ খেলবে ঠিকই, পয়সাও আসবে বহুত, কিন্তু, সংস্কার ভাঙবে না।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...