লিটল ম্যাগাজিন ভাবুন, কিনুন, পড়ুন – সন্দীপ দত্ত ছাড়া এভাবে আর কেউ কি বলতে পারেন! সন্দীপ দত্তের দেহাবসান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আসলে গতানুগতিকতার বাইরে দৈনিকে রবিবারের ফিচারপাতা নয় লিটল ম্যাগাজিন। বাঙালির একক চেষ্টায় যে সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে এবং দীর্ঘ জীবন পেয়েছে তার মধ্যে সন্দীপ দত্তের লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি অন্যতম, সাম্প্রতিকতমও বটে। লিটিল ম্যাগাজিনের একাল-সেকাল বিষয়ে কী ভাবেন? এই বিষয়ে সন্দীপ দত্তকে জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন, “বাংলা সাময়িক পত্রের শুরুটা যদি আমি ১৮১৮ সাল ধরি, তাহলে বলব পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লিটল ম্যাগাজিন বাংলা ভাষাতেই বেরোয়। এই ১৮১৮ থেকে আজ পর্যন্ত এত বছরের ইতিহাসটা একটা লং জার্নি। ১৯ শতক ছিল নির্মানের যুগ। সেখানে ‘সবুজপত্র’ ছিল, ‘বঙ্গদর্শন’ ছিল, ‘তত্ত্ববোধিনী’ ছিল, সাহিত্যের একটা নতুন ধারার উপস্থিতি দেখা গেছিল। ৪০’এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সারা বিশ্ব তথা বাংলায়ও বামপন্থি প্রভাব পড়েছিল, সেখান থেকে সে সময়ে ‘দ্বন্দ্ব’, ‘কাক’, ‘স্ফুলিঙ্গ’, ‘অগ্রনী’ ইত্যাদি বেরোল। ৬০’এ কমিউনিষ্ট পার্টিকে কেন্দ্র করে বহু কাগজ বেরিয়েছিল। তার মধ্যেই হাংরি জেনারেশন চলে আসে, সেটাই ছিল প্রতিষ্ঠান বিরোধী প্রথম আন্দোলন। ঐ আন্দোলন কে কেন্দ্র করে কতকগুলো পত্রিকা বেরোল। ৮০’এ আমরা দেখলাম বিশেষ সংখ্যা বেড়ে গেল অর্থাৎ আগে এত বহুমুখীনতা ছিল না, যেমন- উত্তর আধুনিকতা, মানুষের দ্বিচারিতা-হিংসা, শ্মশান, হাট-জনপদ, ঘুড়ি, মানুষের চুল, নানান বিষয় বৈচিত্র দেখা গেল। সেকাল-একাল এইভাবেই। সেকালের লিটল ম্যাগাজিনকে আমরা এককথায় বলতে পারি সাহিত্যকেন্দ্রিকতা, এখনও সাহিত্যকেন্দ্রিকতা, তবে আগের থেকে বিষয়-বৈচিত্র্য অনেক বেড়েছে।”
বাংলা সাহিত্য নিয়ে যাঁরা নীরবে কাজ করেন, তাঁদের কাছে সন্দীপ দত্ত এক পরিচিত নাম। পাঁচ দশক ধরে প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যের পুনঃপ্রকাশনার কাজও। বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিনের প্যাভেলিয়নে দেখা যেত তাঁকে। তাঁর গ্রন্থাগারে সেকালের ‘সবুজ পত্র’ থেকে ‘কৃত্তিবাস’ বা আজকের প্রায় সব রকমের লিটল ম্যাগাজিনই স্থান পেয়েছিল। এমন অনেক দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহ তাঁর কাছে ছিল, যা একেবারে অকল্পনীয়। সন্দীপ নিজেও একাধিক গল্প, প্রবন্ধ এবং কবিতা সংকলনের স্রষ্টা। করে গিয়েছেন সাহিত্যের পুনঃপ্রকাশনার কাজ।
লিটল ম্যাগাজিন এক আন্দোলনের নাম অর্থাৎ 'ইনকিলাব'। ‘স্বপ্ন নয়– শান্তি নয়– ভালোবাসা নয়, হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়’। এই বোধ'ই জন্ম দিয়েছিল সম্পাদনার কাজ। 'মননভূমি' সাহিত্য পত্রিকা। সময়টা ছিল ২০১৭ সাল। বাংলাদেশ সফর থেকে ফিরেই এপ্রিল ২০১৭ সালে 'মননভূমি' প্রথম প্রকাশ প্রায় প্রয়াত বিশ্বজিৎ চৌধুরী ও কম০ নিশীথ রঞ্জন দাসের হাত ধরে। ইচ্ছে ও উদ্দীপনা নিয়ে চলছে আজও। ২০১৮ সালে ডিসেম্বরে ৭ম উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনের আমন্ত্রণ পাই আমরা। সেই সুবাদে আমাদের ৩য় সংখ্যা উন্মোচিত হয় সন্দিপ দত্তের হাত ধরে। দীর্ঘদিনের এক অনন্ত পিপাসা মেটে এই সম্মেলনে। বেশ কিছুসময় তাঁর সাথে আলাপ হয়। লিটল ম্যাগাজিন সম্বন্ধে খুঁটিনাটি বিষয় জানতে পারি। দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে বেশ কিছু সময় আমাদের স্টলেও বসেছিলেন। 'মননভূমি' ১ম ও ৩য় সংখ্যা তাঁর হাতে দিয়েছিলাম। আজও স্মৃতি বিজড়িত সেইসময়। লকডাউন এর পর যখন সন্দিপ দা কে দেখতে যাই, আমি অবাক! পুরো মনে আছে আমাদের কথা লিটল ম্যাগাজিন সহ। তোমাকে ভোলা যায় না সন্দীপ দা। তুমিই শিখিয়েছো আন্দোলনের আরেক নাম লিটল ম্যাগাজিন।
১৫ মার্চ ২০২৩ (বুধবার) ৭২ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন বাংলায় লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব সন্দীপ দত্ত। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মধুমেহ রোগে ভুগছিলেন। হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। গ্যাংগ্রিন হওয়ায় তাঁর একটি পা বাদ দিতে হয়েছিল। বিগত কয়েক দিন ধরে তাঁর ডায়ালিসিস চলছিল। ২০২৩ সালের শুরুতে তাঁর শারীরিক অবস্থার প্রচণ্ড অবনতি ঘটে। প্রথমে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে সেখান থেকে তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সন্দীপ দত্তের প্রয়াণ লিটল ম্যাগাজিনের সংরক্ষণ, অস্তিত্বের ক্ষেত্রে এক বড় আঘাত হানল। তিনি চলে যাওয়ায় লিটল ম্যাগাজিনের জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হল। সন্দীপ দত্তের সংগ্রহে থাকা বহু দুষ্প্রাপ্য পত্রিকা আজ থেকে অভিভাবকহীন হয়ে গেল।
১৮/এম, টেমার লেন, কলকাতা ৭০০০০৯—এই ঠিকানাটি বাংলা পত্র-পত্রিকার প্রতি আগ্রহী বহু মানুষেরই অতি পছন্দের একটি গন্তব্য। এখানেই রয়েছে ‘কলিকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র’। যার প্রতিষ্ঠাতা হলেন সন্দীপ দত্ত। ১৯৭৮ সালের ২৩ জুন এই প্রতিষ্ঠানটি স্থাপিত হয়েছিল। সন্দীপ দত্তের প্রায় একক প্রচেষ্টাতেই এর জন্ম বলা চলে। সাধারণ গ্রন্থাগারে ক্ষুদ্র পত্র-পত্রিকার প্রতি অবহেলা দেখে সন্দীপ দত্ত নিজেই সেগুলি সংরক্ষণ শুরু করেন। নিজের বাড়িতে দু-কামরার ঘরে গড়ে তোলেন লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি। ক্ষুদ্র পত্র-পত্রিকার প্রতি সন্দীপ দত্তের প্রেম সর্বজনবিদিত। প্রায় অর্ধ শতক ধরে তিনি বাংলা পত্র-পত্রিকার সংগ্রহ ও সংরক্ষণে নিবেদিত প্রাণ।
পশ্চিমবঙ্গে অন্তত লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও সন্দীপ দত্তের নাম প্রায় এক নিঃশ্বাসেই উচ্চারিত হতে শোনা যায়।১৯৫১ সালের ২৪ জুলাই কলকাতায় সন্দীপ দত্তের জন্ম। সেন্ট পলস স্কুল থেকে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূত্রপাত হয়। স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ. করেন। সেখান থেকেই বি.এড. ডিগ্রি অর্জন করেন। কলকাতার মির্জাপুরের সিটি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আজীবন সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলেন। সিনে সেন্ট্রাল কলকাতারও সদস্য ছিলেন তিনি। এরকম আরো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। একাধিক পত্র-পত্রিকার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। বেশ কয়েকটি বই রচনা করেছিলেন। ২০০০ সালে তাঁর ‘লিটল ম্যাগাজিন ভাবনা’ বইটি প্রকাশিত হয়। ২০০২ সালে প্রকাশিত হয় ‘ভুবনেশ্বরী’ এবং ‘বিবাহ মঙ্গল’। ২০০৪ সালে ‘বহতা’। ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সম্পাদিত ‘বাংলা ভাষা বিতর্ক’। ২০০৮ সালে তাঁর সম্পাদিত ‘জন্মদিন’ প্রকাশ পায়। সন্দীপ দত্তের হাত ধরেই আসে একগুচ্ছ লিটল ম্যাগাজিন— ‘পত্রপুট’, ‘উজ্জ্বল উদ্ধার’, ‘অল ইন্ডিয়া লিটল ম্যাগাজিন ভয়েস’। সন্দীপ দত্তের একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হল ‘বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিবৃত্ত (১৯০০-১৯৫০)’।
অবশ্য শুধু পত্রিকাই নয়। একইসঙ্গে লোকশিল্পেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন সৃজনশিল্পী সন্দীপ দত্ত। তাঁর লাইব্রেরিতে গেলেই আন্দাজ পাওয়া যাবে তাঁর শিল্পরুচির। তাছাড়াও কলকাতার বুকে লেখকব্যাঙ্ক তৈরি, একাধিক ছোটো পত্রিকা ও গ্রন্থের সম্পাদনা, শিক্ষকতা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরব উপস্থিতি তাঁর। অসুস্থতা সত্ত্বেও শেষ বয়সে হাজির হতেন বাংলার বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন মেলা, বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নের টেবিলে টেবিলে। কাঁপা হাতেই সংগ্রহ করতেন পত্রিকার নতুন সংখ্যা। ইতিহাস, আঞ্চলিক সাহিত্য ও বাংলা ভাষা সংরক্ষণের প্রতি এ এক অকৃত্রিম ভালোবাসাই বটে। এমন এক ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ অভিভাবকহীন করে তুলল দুই বাংলার সমস্ত লিটল ম্যাগাজিন করিয়েদের। ছাদ হারালেন ছোটো পত্রিকার সম্পাদক, কর্মী, লেখক ও গবেষকরা...
No comments:
Post a Comment