বর্তমান বিশ্বের বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ভূখণ্ড হচ্ছে গোলান হাইটস। যাকে নিয়ে ১৯৬৭ সাল থেকে ইজরায়েল এবং সিরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ, সংঘাত এবং বিবাধ চলে আসছে। আরব এবং ইজরায়েলের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ১৯৪৮-৪৯ সালে। এবং এর পরবর্তীতে প্রধানত ১৯৫৬ সালে দ্বিতীয় যুদ্ধ, ১৯৬৭ সালে তৃতীয় যুদ্ধ,১৯৭৩ সালে চতুর্থ যুদ্ধ, এবং ১৯৮২ সালে পঞ্চমতম যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটেছিল।পেলেস্টাইন কে কেন্দ্র করে ১৯৬৭ সালে ইজরায়েলের সাথে ইজিপ্ট, সিরিয়া এবং জর্ডানের মধ্যে তৃতীয় বৃহৎ যুদ্ধের সূচনা হয়। ইতিহাসে 'সিক্স ডে ওয়ার' হিসেবে চিহ্নিত এই যুদ্ধে ইজরায়েল গাজা স্ট্রীপ এবং সিনাই উপদ্বীপ ইজিপ্টের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছিল। জর্ডানের কাছ থেকে ইজরায়েল পূর্ব জেরুজালেম এবং ওয়েষ্ট বেংক অধিকার করে। এবং এর সঙ্গে সিরিয়ার 'গোলান হাইটস' অবৈধভাবে দখল করে নেয় ইজরায়েল।
ইজরায়েল এবং আরও তিনটি রাষ্ট্র ক্রমে ইজিপ্ট, সিরিয়া এবং জর্ডানের মাঝে চলা ছয়দিনের যুদ্ধ ১৯৬৯ সনের ৫জুন থেকে ১০ জুন পর্যন্ত চলছিল। এই যুদ্ধে আরবের এই কয়টি রাষ্ট্র ইজরায়েলের হাতে পরাস্ত হয়। ইজরায়েল এই যুদ্ধে সিরিয়ার অতি মূল্যবান ভূখণ্ড 'গোলান হাইটস' দখল করে ইহাতে আজও কব্জা করে রেখেছে। ইজরায়েল সিরিয়ার কাছ থেকে 'গোলান হাইটস' বলপূর্বক ভাবে কেড়ে নেয়ার ঘটনাটা ইতিমধ্যে (১৯৬৭-২০২২) পঁচপান্ন বছর সম্পূর্ণ হল। ১৯৭৩ সনে পুণ: 'গোলান হাইটস' কে কেন্দ্র করে ইজরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে চতুর্থতম যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ঠিকই। তবে এই যুদ্ধে আবারও ইজরায়েলের হাতে সিরিয়া পরাজয় বরণ করে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বিগত ৭৫ বছরে পেলেস্টাইন এবং 'গোলান হাইটস' - র বিষয় দুটি সর্বাধিক চর্চিত।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে অস্থিরতার প্রধান কারণ হচ্ছে ইজরায়েলের কর্তৃত্বশীল সম্প্রসারণ। 'গোলান হাইটস' কে কেন্দ্র করে সুদীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে ইজরায়েল এবং সিরিয়ার মধ্যে চলে থাকা হিংসাত্মক ঘটনা প্রবাহের বিষয়ে জানার জন্য আমাদের কুড়ি শতকের ভূ-রাজনৈতিকের ইতিহাস অধ্যয়ণের প্রয়োজন। গ্রেটব্রিটেনের ভূতপূর্ব বৈদেশিক সচিব আর্থোর জেমস্ বালফে- র ১৯১৭ সনের ৭ নভেম্বর জারি করা 'Balffur Declaration ' অনুসারে আরব পেলেস্টাইনের ভূখণ্ডে ইহুদীদের জন্য একটি পৃথক দেশ গঠনের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৮) প্রবল প্রতাপশালী অটোমান তুর্কী,অষ্ট্রিয়া,হাংগেরী, জার্মানি, এবং বুলগেরিয়া বিধ্বস্ত হওয়ার পর সমগ্র পৃথিবীর সমীকরণ পাল্টে যেতে থাকে। বিশ্বে প্রথমবারের মতো ১৯২০ সনে গঠন হয় 'জাতিসংঘ' নামক এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা। আধুনিক যুগের পেলেষ্টাইন এবং সিরিয়া এই সময়ে অটোমান তুর্কীর অধীনে ছিল। অটোমান তুর্কীরা ১৫১৬ সন থেকে ১৯১৭ সন পর্যন্ত সেলেস্টাইন এবং সিরিয়া সম্পূর্ণ ৪০১ বছর রাজত্ব করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের অনুমোদন অনুসারে পূর্বের অটোমান সাম্রাজ্যের অংশস্বরূপ সেলেস্টাইন বিট্রিশের অধীনে আসে এবং ফ্রান্স দখল করে সিরিয়া। কিন্তু ১৯৩৯ সন থেকে ১৯৪৫ সন পর্যন্ত আবার পৃথিবীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হওয়ায় জাতিসংঘের প্রাসংগিকতা শেষ হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিরা জার্মানির সঙ্গে জাপান ও ইতালিতে পতন হওয়ার পর বিশ্ব শান্তি এবং নিরাপত্তার জন্য ১৯৪৫ সনে রাষ্ট্রসঙ্ঘ (UN) এর জন্ম হয়। রাষ্ট্রসঙ্ঘ গঠনের সাথে সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসি জার্মানিতে ইহুদীদের ওপরে করা অমানুষিক নির্যাতন ও নৃশংস গণহত্যার কথাগুলো অধিক রাজনৈতিক চর্চা লাভ করে।
সেই অনুসারে রাষ্ট্রসঙ্ঘ ১৯৪৭ সনের ২৭ নভেম্বরে গৃহীত ১৮১ নং প্রস্তাব মর্মে ব্রিটেনের অধীনে থাকা পেলেস্টাইন ভূখণ্ডকে ইহুদী এবং আরবদের মধ্যে বিভক্ত করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। উক্ত প্রস্তাব অনুসারে ঐতিহাসিক জেরুজালেম কে 'বিশেষ আন্তঃরাষ্ট্রীয় অঞ্চল' হিসেবে স্বয়ং রাষ্ট্রসঙ্ঘই নিরীক্ষণ করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রসংগক্রমে অধুনালুপ্ত জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুসারে ১৯২২ সন থেকে ১৯৪৮ সন পর্যন্ত ব্রিটেনের অধীনে ছিল। রাষ্ট্রসঙ্ঘই আরব রাষ্ট্রগুলোর আপত্তি এবং আশংকাসমূহকে নিষ্পত্তি না করে পেলেস্টাইনে গৃহহীন ইহুদীদের জন্য ইজরায়েল নামের একটি রাষ্ট্র গঠন করে নেওয়া পদক্ষেপের জন্যই আজও মধ্যপ্রাচ্যে দৈনিক কাঁচা রক্ত এবং বারুদের ধোঁয়া নির্গত হয়ে আসছে। গ্রেটব্রিটেন ১৯৪৮ সনের ১৪ মে পেলেস্টাইন থেকে সেনা প্রত্যাহার করার পরদিনই ইজরায়েল নামক একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয় মধ্যপ্রাচ্যে। আর তদানীন্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি হেরী এস ক্রুমেন ইজরায়েল কে একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। ইহার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া স্বরূপ ১৯৪৮ সনের ১৫ মে ইজিপ্ট, সিরিয়া,জর্ডান, লেবানন এবং ইরাক নবগঠিত ইজরায়েলের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধ ১৯৪৯ সনের মার্চ মাস পর্যন্ত চলতে থাকে। আরব-ইজরায়েলের এই প্রথম যুদ্ধে আরব রাষ্ট্রগুলো পরাজিত হয় যদিও ইজিপ্ট ইজরায়েলের গাজা দখল করতে সক্ষম হয়। কিন্তু আরব এই পরাজয় কে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে নাই। আরব ইজরায়েলের পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকার সময়েও ১৯৫৬ সনে 'সুয়েজ সংকট ' আরম্ভ হয়। ইজিপ্টের মধ্যে অবস্থিত সুয়েজ খাল মানবনির্মিত এক কৃত্রিম জলপথ। বলাবাহুল্য সুয়েজ খাল এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে সংযোগ করার সঙ্গে লোহিত সাগর এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যে সমন্বয় স্থাপন করেছে।
ইজিপ্টের রাষ্ট্রপতি গ'মেল আবদেল নাছের ১৯৫৬ সনে সুয়েজ খালকে রাষ্ট্রীয়করণ করে ইহাতে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। ইজিপ্টের এই কার্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। রাষ্ট্রপতি নাছের সিনাই উপদ্বীপে সামরিক বাহিনী মোতায়ন করে ইজরায়েলের এইলেট বন্দর এবং ষ্টেইন অব টাইরান অবরোধ করে ইজরায়েল জাহাজ সমূহের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং এর সঙ্গে সঙ্গে আরম্ভ হয় দ্বিতীয় আরব ইজরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ।এই যুদ্ধে ইজিপ্টের বিরুদ্ধে ইজরায়েলের সঙ্গ দেয় ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। ইজরায়েল এই সুবাদে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সহযোগিতায় ইজিপ্টের সিনাই উপদ্বীপ তার দখলে আনে। কিন্তু রাষ্ট্রসঙ্ঘের হস্তক্ষেপে যদিও ১৯৫৬ সনের ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ থামে। তবে ইজিপ্টের ষ্টেইট অব টাইরান এবং এইলেট বন্দর মুক্ত করে দেয় এবং ইজরায়েল সিনাই উপদ্বীপ থেকে নিজের সেনা প্রত্যাহার করে। রাষ্ট্রসঙ্ঘও সিনাই উপদ্বীপে শান্তিরক্ষা বাহিনী নিয়োগ করে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের হস্তক্ষেপের ফলে দীর্ঘ দশ বছর আরব দেশ এবং ইজরায়েলের মধ্যে বিশেষ উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় নাই। কিন্তু ১৯৬৬ সনের নভেম্বর মাসে ইজরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনী জর্ডানের ওয়েষ্ট বেংকে ১৮ জন মানুষকে গুলি করে নিহত করে এবং ১৯৬৭ সনের এপ্রিল মাসে সিরিয়ায় ৬টি মিগ বিমান দ্বারা বিদ্ধস্ত করার ফলে আবার মধ্যপ্রাচ্য উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যার ফলে তৃতীয় আরব-ইজরায়েলের মধ্যে যুদ্ধের পথ প্রশস্ত হয়ে যায়। ইজিপ্ট এই প্রতিবাদে আবার ২২মে ইজরায়েলের এইলেট বন্দর অবরোধ করে এবং জর্ডান একত্রে ইজরায়েলের উপর আক্রমণ শুরু করে। ১৯৬৭ সনের ৫জুন ইজিপ্ট, সিরিয়া ও জর্ডান মিলে ইজরায়েলের উপর আক্রমণ চালায়। ১০ জুন পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলতে থাকে। তৃতীয় বারের এই যুদ্ধে ইজরায়েলের ৭৭৯ এবং আরব রাষ্ট্রসমূহের ২১০০০ সৈন্য নিহত হয়।
১৯৬৭ সনের ছয় দিনের আরব - ইজরায়েলের এই তৃতীয় যুদ্ধে ইজরায়েল সিরিয়ার ভূখণ্ডের 'গোলান হাইটস' অবৈধভাবে দখল করে নেয়। রাষ্ট্রসঙ্ঘ ১৯৬৭ সনের গ্রহণ করা ২৪২ নং প্রস্তাব অনুসারে ইজরায়েল কে সিরিয়ার 'গোলান হাইটস ' ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু আমেরিকা,ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মদদপুষ্ট ইজরায়েল রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই আদেশ প্রত্যাখান করে। যার ফলে সিরিয়া নিজের 'গোলান হাইটস' উদ্ধার করার জন্য ইজিপ্টের সাথে সংযুক্ত হয়ে চতুর্থবারের জন্য ১৯৭৩ সনের ৬ অক্টোবরে ইজরায়েল আক্রমণ করে যদিও ইজরায়েল এই যুদ্ধে আরব জয়ী হয়।এই যুদ্ধে ইজরায়েলের ২৮০০ জন সৈন্য এবং সিরিয়ার ৩০০০ এর অধিক সেনা শহিদ হয়।১৯৭৪ সনের ৩১ মে রাষ্ট্রসঙ্ঘ 'গোলান হাইটস'কে বাফার জোন (Buffer Zone) হিসেবে ঘোষণা করে তাতে রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে। ইজরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে আমেরিকার মধ্যস্থতায় ১৯৯১ সনে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে শান্তি আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু ইজরায়েলের আগ্রাসন মানসিকতায় ২০০০ সালে এই আলোচনা ইতি টানে। ইহার পরবর্তী সময়ে তুর্কির মধ্যস্থতায় আবার ২০০৮ সনে ইজরায়েল এবং সিরিয়ার মধ্যে 'গোলান হাইটস'নিয়ে আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু ২০০৯ সনে ইজরায়েলের কট্টর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত বেঞ্জামিন নেটান্যাহু নির্বাচিত হওয়ার পর সিরিয়ার সাথে আলোচনার দুয়ার বন্ধ হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক ভাবেই 'গোলান হাইটস'হচ্ছে সিরিয়ার নিজস্ব ভূখণ্ড। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুসারে সিরিয়া ফ্রান্সের অধীনে যায় এবং সেইসময় হতে 'গোলান হাইটস' সিরিয়ার অংশ হয়ে ছিল। সিরিয়াই ১৯৪৬ সালে ফ্রান্সের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদস্যপদ গ্রহণ করে। কিন্তু ইজরায়েল ১৯৬৭ সনের যুদ্ধতে সিরিয়া আক্রমণ করে 'গোলান হাইটস'-র উপর অবৈধ দখল করে। কেবল এখানেই শেষ নয়, ইজরায়েল রাষ্ট্রসঙ্ঘ কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১৯৮১ সনে 'গোলান হাইটস'কে ইজরায়েলের ভৌগলিক মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করে।
'গোলান হাইটস' হচ্ছে সিরিয়ার একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ মালভূমি। সিরিয়ার 'গোলান হাইটস'-র ১৮৬০ বর্গ কিলোমিটার ভূখণ্ডের ভিতরে বর্তমান ১১৫০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল ইজরায়েলের অবৈধ দখলে ১৯৬৭ সন থেকে। জর্ডান, লেবানন, ইজরায়েল এবং সিরিয়ার মধ্যে 'গোলান হাইটস'অবস্থিত। রাজনৈতিক এবং তাৎপর্যের সঙ্গে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ, উর্বর কৃষিভূমি এবং জলসম্পদের জন্য 'গোলান হাইটস'-র গুরুত্ব অপরিসীম। বরাফাবৃত গোলান মালভূমি ওখ পাহাড়িয়া অঞ্চলসমূহ পানীয় জলের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস। 'গোলান হাইটস' থেকেই জর্ডান নদী বয়ে এসে গেলিলি সাগরে মিলিত হয়েছে। ইজরায়েলের এক তৃতীয়াংশ জল 'গোলান হাইটস'যোগান দেয়। সিরিয়ার থেকে বলপূর্বক ভাবে 'গোলান হাইটস' দখল করে বর্তমানে ইজরায়েল তাতে লক্ষাধিক ইহুদীদের বাসস্থান ও কর্মসংস্থান দেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ইজরায়েলের দুষ্কার্যে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে আমেরিকাই। রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৮১ সনের ১৭ ডিসেম্বর গৃহীত করা ৪৯৭ নং প্রস্তাব অনুসারে ইজরায়েল 'গোলান হাইটস' কে নিজের ভূখণ্ডে মিলিয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে অবৈধ ও বেআইনি বলে অভিহিত করেছে। কিন্তু রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই ঐতিহাসিক প্রস্তাব নাকোচ করে প্রাক্তন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৯ সনের ২৫ মার্চ রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই প্রস্তাব কে ঘোর আপত্তি জানিয়ে 'গোলান হাইটস'কে ইজরায়েলের ভূখণ্ড বলে স্বীকৃতি প্রদান করা ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সমগ্র বিশ্বতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। আমেরিকা ছাড়া পৃথিবীর আর কোন দেশই গোলান হাইটস কে ইজরায়েলের ভূখণ্ড বলে স্বীকৃতি দেওয়ার ধৃষ্টতা বা ভণ্ডামি করে নাই। আমেরিকার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে ইজরায়েলের মধ্য দিয়ে ইরান, সিরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যতে অশান্তি এবং অস্থিরতা বৃদ্ধি করে আরবের রাষ্ট্রগুলোর থেকে কাঁচা তেল আহরণ করে সেই দেশসমূহে বিক্রি করা।
ইজরায়েলের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নাফতালী বেনেটে গত ২০২১ সনের ২৬ ডিসেম্বর এই কথা ঘোষণা করেন যে ইজরায়েল আগামী পাঁচ বছরের ভিতরে 'গোলান হাইটসে' ইহুদী লোকের জন্য ৭৩০০ টি নতুন আবাস নির্মাণ করবে। উল্লেখযোগ্য যে ইজরায়েল ইতিমধ্যে আমেরিকার আশির্বাদে 'গোলান হাইটস'এ নিজস্ব আইন, প্রশাসন এবং বিচার প্রক্রিয়া বিধিবদ্ধ করেছে। 'গোলান হাইটস'এ ইজরায়েল আগামী পাঁচ বছরে সর্বমোট ৩১৭ নিযুত মার্কিন ডলার খরচ করবে যাতে সেখানে পর্যটন, উদ্যোগ, চিকিৎসা, বাণিজ্য, পরিবহন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়। ১৯৬৭ সালের পূর্ব পর্যন্ত সিরিয়ার 'গোলান হাইটস এ আরবীয়দের বসবাস ছিল। ইজরায়েল সেখানে দখল করে ২০০ এর অধিক আরবীয় গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় এবং পর্যায়ক্রমে একলক্ষের ও অধিক বাসিন্দাদের বিতাড়িত করে। বর্তমানে 'গোলান হাইটস'এ প্রায় ৫৩০০০ হাজার মানুষ বসবাস করছে। এরমধ্যে ২৭০০০ ইহুদী, ২৪০০০ দ্রুজ আরবী এবং প্রায় ২০০০ আলাবিট মুসলিম আছে। দ্বিতীয়ত, ইজরায়েল ২০১৫ সন থেকে সিরিয়ার 'গোলান হাইটস' এ অবৈধভাবে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানে আছে। আমেরিকার AFEK oil and Gas নামের কোম্পানী ইতিমধ্যে কম্পন জরীপ সম্পন্ন করে প্রায় এক বিলিয়ন বেরেল পরিমাণ খনিজ তেলের সন্ধান পেয়েছে। একমাত্র ইজরায়েলের পরিবেশ কর্মী এবং প্রতিবাদী সংগঠনগুলোর বাঁধা দেওয়ায় ইজরায়েল সরকার 'গোলান হাইটস'এ তেল উৎপাদন করতে অগ্রসর হতে পারছে না। ইজরায়েল তার দেশের ইন্ধন চাহিদা পূরণ করার জন্য আংগোলা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ইজিপ্ট, নরওয়ে, রাশিয়া, আজারবাইজান এবং কাজাখস্তান থেকে পেট্রোলিয়ামজাত সামগ্রী আমদানি করে আসছে।
রাশিয়া তার নিজস্ব ভৌগলিক নিরাপত্তা অক্ষুন্ন রাখার জন্য ইউক্রেনের বিরুদ্ধে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে আরম্ভ করা বিশেষ সামরিক অভিযান কে অবৈধ আগ্রাসন বলে আমেরিকা এবং ইজরায়েল অভিহিত করেছে এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রস্তাবকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ২৪২ এবং ৪৯৭ নং দুইটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নাকচ করে 'গোলান হাইটস' র উপর বলপূর্বক আগ্রাসন আমেরিকার কূট কৌশল অনুসারী ইজরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার কাজ এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ। আমেরিকার কাছে ইজরায়েলের এই প্রভুত্ববাদ সমগ্র বিশ্বের জন্যই এক চিন্তার বিষয়।