১৯২০ সনের ২রা সেপ্টেম্বর ভারতের অধুনা বাংলাদেশের ঢাকার বিক্রমপুরে তাঁর জন্ম। আজীবন সুন্দর সমাজ গঠনের স্বপ্নকে অবলম্বন করেই তাঁর সৃজন। বাল্যকাল থেকেই তিনি একরােখা ধরনের মানুষ। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আমৃত্যু। তাঁর কবিতায় ভাষিত হয়েছে সমগ্র দুনিয়ার প্রতারিত মানুষের বেদনা, মানবতা-বিরোধী ঘটনার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ তীব্র-প্রতিবাদ। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'গ্ৰহচ্যুত’ তাঁকে কবি পরিচিতি না দিলেও ‘রানুর জন্য' গ্রন্থে পেয়েছেন পাঠকদের স্বীকৃতি। ‘উলুখড়ের কবিতা', ‘সভা ভেঙে গেলে’, ‘মানুষখেকো বাঘেরা বড় লাফায়’, ‘এই জন্ম জন্মভূমি','লখিন্দর', ভিয়েতনাম ভারতবর্ষ, ও অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে 'বেঁচে থাকার কবিতা’ তাঁর অন্যতম। আজীবন আধুনিক বাংলা কবিতার জন্য তাঁর চিন্তা যে কত প্রাসঙ্গিক আজও তা তাঁর কবিতা পড়লেই জানা যায়।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর কবিতায় শিশুর রক্ত, গুলি, মন্ত্রী, সাংবাদিক, খুনি, গুন্ডা, লাশ, খিদে, ফ্যান, কান্না এসব কিছুই আছে। থাকবেই তো। দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তুর আগমন, খাদ্যাভাব, কালোবাজারি এইসব কিছুই তার চারপাশে ঘটে চলেছে। কেননা তাঁর নিজের জীবনকেও নিয়ন্ত্রিত করেছে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী মনন। এই বিশ্বাসেই রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন, কারাবাস করেছেন। তাঁর 'রাজা আসে যায়' কবিতা বাংলায় এক প্রবাদ-বাক্যের স্থান করে নিয়েছে। একজন সংবেদী কবি সেসব ভুলে থাকতে পারেন না। আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ৩০-৩১ ডিসেম্বর, ১৯৬৭-তে তিনি লিখছেন জেলখানার কবিতা/২। তাঁর কবিতায় বিষয়ের বৈচিত্র্য লক্ষ করার মতো। সুকান্ত, নজরুল, মাও সেতুংয়ের লং মার্চ, ম্যাক্সিম গোর্কির মতো মানুষের গন্ধ পাওয়া যায়। তিনি পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে রক্ত ঝরা সময়কে তুলে ধরেছেন।
আমার ভারতবর্ষ কবিতায় কবি শােষিত মানুষের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নে শােষকদের বাদ দিয়ে নতুন ভারতবর্ষ গড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন—“আমার ভারতবর্ষ পঞ্চাশ কোটি নগ্ন মানুষের/যারা সারাদিন রৌদ্রে খাটে, সারারাত ঘুমুতে পারে না/ক্ষুধার জ্বালায়, শীতে। আধুনিক সভ্যতার করালরূপ কবিকে ব্যথিত করে। তাই যুদ্ধের বিরুদ্ধে’ কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘চলাে আমরা চাঁদের দেশে যাই/চলাে আমরা সময় থাকতে যে যার দেশের জাতীয় পতাকা/চাঁদের দেশের সবার চাইতে উঁচু পাহাড়টার/চুড়ায় দিই উড়িয়ে, তার মাটিকে করি সােনার চেয়ে দামী।কবি সাধারণ শােষিত মানুষের বেঁচে থাকার জন্য চেয়েছেন, ‘একটা পৃথিবী চাই/শুকনাে কাঠের মত মায়েদের/শরীরে কান্না নিয়ে নয়/তাদের বুক ভর্তি অফুরন্ত ভালােবাসার/ শস্য নিয়ে। অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় তাঁর কবিতায় মিলে প্রকৃতির প্রতি টান। প্রকৃতি যে মানুষের সঙ্গী তা নিয়ে লিখেছেন, চাঁদের আলােয় গাছেদের সভা, বসন্তের উদ্দাম হাওয়ায়/মন কোথা চলে যায় বলে/মনকে আগলায় সভা করে।
কবি ও কবিতা সম্পর্কে এক অদ্ভুত ভাবনা ছিল বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর। তিনি বলতেন, “কবিতা লেখেন মানুষ, কবিতা যাঁরা পড়েন তারাও মানুষ। এই মনুষ্য জাতীয় প্রাণীরা আমাদের স্বদেশ মহাভারতে বর্তমানে যে জীবন যাপন করেন, তা কিন্তু মনুষ্য জীবন নয়। এই জীবনের আমূল পরিবর্তন যদি অনির্দিষ্টকালের মধ্যে সম্ভব না হয়, তাহলে একদিন আমাদের কবিতাও হবে পশু সমাজের কবিতা ।”(লা পোয়েজি,নবম বর্ষ, ১ম সংখ্যা)
দেশভাগ, খাদ্য আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, জরুরি অবস্থা, নকশাল আন্দোলন— তাঁর জীবনের নানা সময়ে যে সমস্ত সামাজিক ঝঞ্ঝা এসেছে, প্রতিটিতে কবি তাঁর চেতনা ও কলম নিয়ে সক্রিয়ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কখনও কোনও আপস করেননি। প্রাপ্তির লোভে কেঁপে যায়নি তাঁর লক্ষ্যভেদী কণ্ঠস্বর। একের পর এক অমর কবিতায় লিখেছেন ----
“তোমার কাজ আগুনকে ভালোবেসে উন্মাদ হওয়া নয়,
আগুনকে ব্যবহার করতে শেখা।
অস্থির হয়োনা
শুধু প্রস্তুত হও।” (পৃথিবী ঘুরছে)।
তরুণদের প্রতি এই আহ্বান আর কোনো কবি এভাবে জানিয়েছেন কিনা, আমার জানা নেই । অসুস্থ হওয়ার কয়েক মাস আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘরোয়া এক সভায় তিনি বলেন, “আর কোনো কাজ পারিনা বলেই কবিতা লিখি। অন্য কিছু পারলে কি আর লিখতাম?” কবিতার ভাষায়,
“ছত্রিশ হাজার লাইন কবিতা না লিখে
যদি আমার সমস্ত জীবন ধরে
একটি বীজ মাটিতে পুঁততাম
একটি গাছ জন্মাতে পারতাম! (মহাদেবের দুয়ার)
এই উপলব্ধিতে কেউ একদিনে পৌঁছাতে পারে না, অতিক্রম করতে হয় দীর্ঘ পথ, দীর্ঘ সময় ধরে। এই পথচলায় তাঁর অভিজ্ঞান কম নয়। পথের বিস্তর বাধা পেরিয়ে কবি হেঁটে চলেন। চলার পথে এ দেখা এক আশ্চর্য দেখা। মানুষের আত্মতৃপ্তির সমস্ত মেকি আস্তরণ ভেদ করে তিনি গড়ে তোলেন এক অনন্য কবিতা দর্পণ। 'স্বদেশ ও স্বদেশচেতনার আগুনে পুড়ে নাড়িছেঁড়া স্বাধীনতা, রক্তের বিনিময়ে দাউদাউ অগ্নিলেহন জন্মভিটে কেড়ে নিল, দেশের শাষণের বদল হলো শুধু মানচিত্রে। দেশকে এক কাল্পনিক দেবীর আসনে বসিয়ে অবশেষে এই ডানাভাঙা সমর্পণ !' প্রতারিত এই মানুষদের উদ্দেশ্যে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লেখেন
“মানুষ রে, তুই সমস্ত রাত জেগে
নতুন করে পড়,
জন্মভূমির বর্ণপরিচয়!”
প্রতিবাদী চেতনার অভাব আজকের দিনে সর্বত্র। দেশ-কাল-রাষ্ট্র বড্ড বেশি সংকটে এবং এর কারণ এক কৃত্রিম বস্তুবাদী জীবনের প্রতি আকর্ষণ। সেক্ষেত্রে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কলম ধরেছিলেন সাধারণ নিরন্ন মানুষের জন্য, রাষ্ট্রশক্তির শােষণের বিরুদ্ধে, দেশ তার কাছে ছিল পবিত্র এক আশ্রয়। সব মিলে তার কবিতার ভাব ও শিল্পীসত্তা আজকের দিনেও যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত হন। ক্যানসারে আক্রান্ত কবি ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের ১১ শে জুলাই ৬৫ বৎসর বয়সে কলকাতায় প্রয়াত হন। কবির অনেক প্রত্যাশা ছিল সমাজের কাছ থেকে ; হয়তাে বা ক্ষোভে যন্ত্রণায় তিনি সমাজ থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন বার্ধক্যের সূচনাপর্বেই। ২রা সেপ্টেম্বর, আজ শতবর্ষ পরে এসেও আমাদের সেই কথাটাই নতুন করে জানিয়ে দিয়ে যায়। কবি বীরেন্দ্র সরাসরি প্রতিবাদের রাস্তায় যেতে পছন্দ করতেন। প্রতিদিনই একজন প্রকৃত কবির জন্মদিন, প্রতিবছরই তাঁর জন্মশত বছর। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে জানাই শ্রদ্ধা। কবির জন্মশতবর্ষে আমরা কি সময়ের দাবি নিয়ে কবির মতো দায়বদ্ধ হতে পারি !
No comments:
Post a Comment