Sunday, September 4, 2022

'ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়...'


ক্ষুধা, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং সব ধরনের অপুষ্টি দূর করার চ্যালেঞ্জ দিন দিন বেড়েই চলেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, কোভিড-১৯ মহামারী আমাদের কৃষি ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সমাজে অসমতাকে আরও উন্মোচিত করেছে, যার ফলে বিশ্বে ক্ষুধা এবং মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। বৈশ্বিক অগ্রগতি সত্ত্বেও, শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির প্রবণতা - যেমন স্টান্টিং এবং অপচয়, প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি এবং শিশুদের অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলতা - একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। তদুপরি, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মাতৃ রক্তাল্পতা এবং স্থূলতা একটি উদ্বেগের বিষয়।

স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পান না প্রায় ৯৭ কোটি ভারতীয়। মানে, ১৩০ কোটির ‘গর্বিত’ ভারতবাসীর মধ্যে ৯৭ কোটি মানুষেরই দু’বেলা জীবনধারণের উপযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার জোটে না। অর্থাৎ, মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭১ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার জোগাড় করতে পারেন না। শুধু তাই নয়, ভারত অনাহার-অপুষ্টির এই তালিকায় আফ্রিকার খুব কাছাকাছিই আছে। যা রীতিমত উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্যকর বা সুষম খাদ্য কেনার ক্ষমতার উপর আন্তঃদেশীয় একটি তুলনামূলক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ভারতের ৭১ শতাংশ মানুষের পুষ্টিকর খাদ্য কেনার ক্ষমতা নেই। সংখ্যায় যার পরিমাণ প্রায় ৯৭ কোটি। আরও লজ্জার বিষয় এই যে, ভারতেরই পিছনে রয়েছে আফ্রিকা। যেখানে ৮০ শতাংশ মানুষের পুষ্টিকর খাবার জোটে না। গোটা এশিয়ায় ৪৩.৫ শতাংশ মানুষ এই আওতায় পড়েন। সুতরাং, বোঝাই যাচ্ছে, একা ভারতই কীভাবে অপুষ্টি, অনাহার, অর্ধাহার ও সুষম খাদ্যাভাবের দৌড়ে এশিয়ার মুখ উজ্জ্বল করে রয়েছে !

দি স্টেট অফ ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২২’ নামে রিপোর্টটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যই বলছে, ২০২০ সালে বিশ্বের প্রায় ৩০৭ কোটি মানুষ ভালোভাবে খেতে পাননি। সেখানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ ভারতেই তিন ভাগের একভাগ মানুষের বাস। ফাওয়ের তথ্যে বলা হয়েছে, একজন মানুষের সারাদিনে সুষম খাবার খেতে যা খরচ হওয়ার কথা, তাতে ভারতে ৪ জনের পরিবারে মাসে ৭৬০০ টাকা লাগে। অর্থাৎ ভারতের ৯৭ কোটি মানুষই এই পরিমাণ ক্রয়ক্ষমতার নীচে বসবাস করেন।

এই তালিকায় দেখা যাচ্ছে, চীনের ১২ শতাংশ, ব্রাজিলে ১৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৪৯ শতাংশ, নেপালের ৮৪ শতাংশ, বাংলাদেশে ৭৩.৫ এবং পাকিস্তানের ৮৩.৫ শতাংশ মানুষ সুষম আহার পান না। ভারতের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষই ভরতুকির খাবার বা সরকারি রেশনের উপরে নির্ভরশীল। অর্থাৎ, সরকার পোষিত খাবার না পেলে, তাঁদের দুর্দশা কী হবে, তা নিয়েও যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে।

প্রায় ৮০ কোটি, বা ৬০% ভারতীয়, সরকার-প্রদত্ত ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য রেশনের উপর নির্ভর করে, যেখানে সুবিধাভোগীরা বিশেষ মহামারী ছাড়াও প্রতি মাসে প্রতি কিলোগ্রামে মাত্র 2-3 টাকা হারে পাঁচ কেজি রেশন পান। যা প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনার আওতায় পাঁচ কেজি রেশন। যাইহোক, পরিকল্পনাটি প্রায়শই সমালোচিত হয় যে যদিও ক্যালোরি সরবরাহ হচ্ছে কিন্তু পর্যাপ্ত পুষ্টি হচ্ছে না।

জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য জরিপ ( National Family Health Servey), 22টি রাজ্যে ভারত সরকার পরিচালিত এই সমীক্ষার ফলাফল দেখায় যে দেশে অপুষ্টির ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। মহিলাদের মধ্যে সাধারণত অ্যানিমিয়ায় শিশুরা অপুষ্টিতে জন্ম নেয়। এই কারণে,১৩ টি রাজ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে কম। ১২টি রাজ্যে, একই বয়সের শিশুদের ওজন উচ্চতা অনুযায়ী নয়।

 এই সমীক্ষাটি আসাম, বিহার, মণিপুর, মেঘালয়, সিকিম, ত্রিপুরা, অন্ধ্রপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট, কর্ণাটক, মিজোরাম, কেরালা, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, হিমাচল প্রদেশ, লাক্ষাদ্বীপ, দাদরা ও নগর হাভেলি এবং মহারাষ্ট্রে করা হয়েছে। সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুসারে, মেঘালয়ের পরে বিহার দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ৪৩ শতাংশ শিশু যারা তাদের বয়সের অনুপাতে ছোট। গুজরাটে এই সংখ্যা ৩৯ শতাংশ।অর্থাৎ গুজরাট ও বিহারের মতো রাজ্যে শিশুদের সঠিক বিকাশ হচ্ছে না। তারা অপুষ্টিতে ভুগছে। এ কারণে তাদের মধ্যে দৈর্ঘ্য কম হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিহারে সবচেয়ে কম ওজনের শিশুর সংখ্যা ২২.৯%।

 তবে দেশের বেশিরভাগ রাজ্যেই শিশুমৃত্যুর হার কমেছে। এর কারণ হিসেবে ভ্যাকসিনেশন হলেও ক্ষুধা ও অপুষ্টির পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। এখন আমাদের দেখার পালা আদৌ কি ভারত এই সংকট নিরসনে সাফল্য অর্জন করবে?

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...