Saturday, August 10, 2019

এক অগ্নি স্ফুলিঙ্গ:শহীদ ক্ষুদিরাম

ক্ষুদিরামের সহজ প্রবৃত্তি ছিলো প্রাণনাশের সম্ভাবনাকে তুচ্ছ করে দুঃসাধ্য কাজ করবার। তাঁর স্বভাবে নেশার মতো অত্যন্ত প্রবল ছিলো সৎসাহস। আর তাঁর ছিলো অন্যায় অত্যাচারের তীব্র অনুভূতি। সেই অনুভূতির পরিণতি বক্তৃতায় ছিলো না, বৃথা আস্ফালনেও ছিলো না; অসহ্য দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, এমনকি মৃত্যুকে বরণ করে, প্রতিকার অসম্ভব জেনেও শুধু সেই অনুভূতির জ্বালা নিবারণের জন্য, নিজ হাতে অন্যায়ের প্রতিবিধানের উদ্দেশ্যে প্রতিবিধানের চেষ্টা করবার ঐকান্তিক প্রবৃত্তি ও সৎসাহস ক্ষুদিরাম চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
--- হেমচন্দ্র কানুনগো
১৯০৮ সালের আজকের দিনটিতে ১১ আগষ্ট ব্রিটিশ ঘাতকেরা ফাঁসির মাধ্যমে খুন করেছিলো কিশোর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুকে। ‘একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি.....’ ফাঁসির মঞ্চে এই বীরের হাসিমুখে হেটে উঠে যাওয়া। সেই চেতনার উদ্বুদ্ধ বিশ্বাসে অনিবার্য স্লোগান– ‘ইয়ে আজাদী জুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়।’  ইতিহাসের নিরন্তর লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় জনকের উত্তোলিত তর্জনী বেয়ে নেমে আসা স্বাধীনতা। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আগ্নিযুগের কিশোর শহীদ- ক্ষুদিরাম বসু।

ক্ষুদিরাম বসু , ৩রা ডিসেম্বর ১৮৮৯ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত মেদিনীপুর জেলা শহরে্র কাছাকাছি হাবিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ত্রৈলকানাথ বসু ছিলেন নাদাজল প্রদেশের শহরে আয় এজেন্ট। তার মা লক্ষীপ্রিয় দেবী। তিন কন্যার পর তিনি তার মায়ের চতুর্থ সন্তান। তার দুই পুত্র আগেই মৃত্যুবরণ করেন। অপর পূত্রের মৃত্যুর আশংকায় তিনি তখনকার সমাজের নিয়ম অনুযায়ী তার পুত্রকে তার বড় বোনের কাছে তিন মুঠি খুদের (শস্যের) খুদ বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। খুদের বিনিময়ে ক্রয়কৃত শিশুটির নাম পরবর্তীতে ক্ষুদিরাম রাখা হয়। ক্ষুদিরাম বসু পরবর্তিতে তার বড় বোনের কাছেই বড় হন।

ক্ষুদিরামের বয়স যখন সাত বছর তখন তাঁর বাবা মারা যান। বাবা মারা যাওয়ার ছমাস পরে তাঁর মা মারা যান। এরপর তাঁর আশ্রয় হয় দুর সম্পর্কের এক দাদা ও বৌদির কাছে। কিন্তু সেখানে তাঁকে অমানবিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়। অশান্তিতে তাঁর মন ভরে উঠে। সঙ্গী হয় দুঃখ আর একাকীত্ব। তবু পেটের দায়ে ৮ বছরের এই ছেলেটিকে সবই সহ্য করতে হতো। এ সকল কারণে পড়াশোনায় তাঁর মন বসত না। তবে সুযোগ পেলেই খেলাধুলা আর ব্যায়াম করতেন। এ্যাডভেঞ্চার জাতীয় কাজের প্রতি তাঁর প্রচুর আকর্ষণ ছিল।

দিনের পর দিন দাদা-বৌদির নিষ্ঠুর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়লেন একদিন। বোনের বাড়ি যাবেন কিনা ভাবতে ভাবতে মেদিনীপুরে এসে পৌছলেন। সেখানে একজনের সাথে তাঁর পরিচয় হয় যিনি ক্ষুদিরামের বোনের বাড়ি চিনতেন, তিনি তাঁকে সেই বাড়িতে পৌছে দিলেন। বোনের বাড়িতে যাওয়ার পর তিনি মেদিনীপুর হ্যামিলটন স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হলেন। এরপর ভর্তি হন কলেজিয়েট স্কুলে। এই স্কুলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন।

ক্লাস ফাঁকি দেয়া ও পড়াশোনা না করার জন্য স্কুলের শিক্ষকরা তাঁকে বিভিন্ন শাস্তি দিতেন। ক্ষুদিরাম তাঁর মতো বাউণ্ডুলে স্বভাবের ছেলেদের নিয়ে ভূত ধরা এবং তাড়ানোর দল গড়লেন। তখনকার দিনের কুসংস্কার তাঁকে মোটেও স্পর্শ করতে পারেনি। বরং সমাজের মানুষের মধ্য থেকে কুসংস্কার দূর করার জন্য চেষ্টা চালান তিনি। এজন্য তাঁকে অনেকের বকাবকি খেতে হয়েছে। এক পর্যায়ে স্কুল ছেড়ে দিলেন। মেধাবী, দুরন্ত এবং কিছুটা বাণ্ডুলে স্বভাবের কিশোর ক্ষুদিরাম ১৯০৩ সালে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে পড়াশুনা বন্ধ করে দেন। এ সময় তিনি ঝুঁকে পড়েন দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডে। অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সংকল্প গ্রহণ করেন তিনি।

ক্ষুদিরাম বসু তার প্রাপ্তবয়সে পৌঁছানোর অনেক আগেই একজন ডানপিটে, বাউণ্ন্ডুলে, রোমাঞ্চপ্রিয় হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। ১৯০২-০০৩ খ্রিস্টাব্দ কালে যখন বিপ্লবী নেতা শ্রী অরবিন্দ এবং সিস্টার-নিবেদিতা মেদিনীপুর ভ্রমণ করে জনসম্মুখে বক্তব্য রাখেন এবং বিপ্লবী দলগুলোর সাথে গোপন পরিকল্পনা করেন, তখন তরুণ ছাত্র ক্ষুদিরাম বিপ্লবে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত হন। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ক্ষুদিরাম তার বোন অপরূপার স্বামী অম্রিতার সাথে তামলুক শহর থেকে মেদিনীপুরে চলে আসেন। সেখানে তিনি মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। এখানেই তার বিপ্লবী জীবনের অভিষেক। তিনি বিপ্লবীদের একটি নবগঠিত আখড়ায় যোগ দেন। এটি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্রিটিশ বিরোধীদের দ্বারা পরিচালিত হতো। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ক্ষুদিরাম তার গুণাবলীর জন্য সবার চোখে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন।

ক্ষুদিরাম বসু তার শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বোস এর নিকট হতে এবং শ্রীমদ্ভগবদগীতা পড়ে ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে বিপ্লব করতে অনুপ্রাণিত হন। তিনি বিপ্লবী রাজনৈতিক দল ‘যুগান্তরে’ যোগ দেন।
বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন ক্ষুদিরাম বসু। এ সময় ক্ষুদিরাম সত্যেন বসুর নেতৃত্বে গুপ্ত সংগঠনে যোগ দেন। এখানে তিনি শারীরিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও রাজনৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। এখানে পিস্তল চালনার শিক্ষাও হয়। এই গুপ্ত সংগঠনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে ক্ষুদিরাম ইংল্যান্ডে উৎপাদিত কাপড় জ্বালিয়ে দেন এবং ইংল্যান্ড থেকে আমদানীকৃত লবণবোঝাই নৌকা ডুবিয়ে দেন। এসব কর্মকান্ডে তাঁর সততা, নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া যায়। ফলে ধীরে ধীরে গুপ্ত সংগঠনের ভেতরে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

১৯০৭ সালে বিপ্লবী দলের অর্থের প্রয়োজনে ক্ষুদিরাম এক ডাকহরকরার কাছ থেকে মেইলব্যাগ ছিনিয়ে নেন। সে সময় বিপ্লবীদের রাজদ্রোহ মামলায় কঠোর শাস্তি দেওয়ার জন্য কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড মরিয়া হয়ে ওঠেন। ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিমূলে কাঁপন ধরাতে বিপ্লবীরা প্রথমেই সিদ্ধান্ত নেন কিংসফোর্ডকে হত্যা করার।

যথাসময় এ দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্ষুদিরাম বসুর ওপর। আর তাঁর সহযোগী করা হয় রংপুরের আরেক যুবক বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীকে। বিপ্লবীদের সম্ভাব্য আক্রমণ এড়াতে কিংসফোর্ডকে বদলি করা হয় মজফফরপুরে। দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ দুই তরুণ বিপ্লবী জীবনের কঠিন ব্রত পালন করতে রওনা দিলেন মজফফরপুর। দুজনে আশ্রয় নিলেন কিংসফোর্ডের বাসভবনের পাশের একটি হোটেলে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁরা কিংসফোর্ডের গতিবিধি লক্ষ করতে থাকেন। কিংসফোর্ডের বাসভবনের পাশেই ইউরোপিয়ান ক্লাব। অফিস আর ক্লাব ছাড়া কিংসফোর্ড বাইরে যেতেন না। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল। সেদিন কিংসফোর্ডের খেলার সঙ্গী ছিলেন অ্যাডভোকেট কেনেডির স্ত্রী ও তাঁর মেয়ে। রাত আটটার দিকে খেলা শেষ করে মিস ও মিসেস কেনেডি কিংসফোর্ডের গাড়ির মতো হুবহু দেখতে আরেকটি গাড়ি নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। বাইরে আগে থেকেই দুই বিপ্লবী প্রস্তুত ছিলেন। গাড়িটি ফটক পার হতে না হতেই প্রচণ্ড শব্দে পুরো শহর কাঁপিয়ে একটি বোমা বিস্ফোরিত হলো। কেনেডির স্ত্রী ও তাঁর মেয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান। বিধ্বস্ত গাড়িটি এক পাশে উল্টে পড়ে। যাঁকে হত্যার জন্য বোমার বিস্ফোরণ, সেই কিংসফোর্ডের অক্ষত গাড়িটি মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে।

বোমা নিক্ষেপ করেই দুই বিপ্লবী ছুটলেন দুই দিকে। পরদিন সকালে ওয়াইসি রেলস্টেশনে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন ক্ষুদিরাম। ওদিকে প্রফুল্ল চাকীও পুলিশের হাতে ধরা পড়তেই তড়িঘড়ি করে নিজের পিস্তলের গুলিতে আত্মহত্যা করলেন। ক্ষুদিরাম গ্রেপ্তার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গোটা শহর যেন মুহূর্তে ভেঙে পড়ল। পুলিশবেষ্টিত ক্ষুদিরামকে একনজর দেখতে হাজারো লোক ভিড় জমাল ওয়াইসি রেলস্টেশনে। উৎসুক জনতার উদ্দেশে ক্ষুদিরামের কণ্ঠে তখন ধ্বনিত হলো বজ্রনিনাদ বন্দেমা। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই তরুণ বিপ্লবীকে নিয়ে ব্রিটিশ সরকার অনেকটা বিপাকেই পড়ে যায়। যত দিন যাচ্ছিল, সারা ভারতে ক্ষুদিরামকে নিয়ে এক ধরনের উন্মাদনা তৈরি হচ্ছিল। ব্রিটিশের মাথা থেকে সেই বোঝা নেমে যায় সেদিন, যেদিন মামলায় ভারতীয় দণ্ডবিধি আইনের ৩০২ ধারা মোতাবেক ক্ষুদিরামের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। যে বোমা হামলার জন্য তাকে মৃত্যদণ্ড দেয়া হয় তাতে ৩ জন ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছিলেন।

ক্ষুদিরামের লেখা গান:

একবার বিদায় দে-মা ঘুরে আসি।
হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে জগৎবাসী।
কলের বোমা তৈরি করে
দাঁড়িয়ে ছিলেম রাস্তার ধারে মাগো,
বড়লাটকে মারতে গিয়ে
মারলাম আরেক ইংল্যান্ডবাসী।
শনিবার বেলা দশটার পরে
জজকোর্টেতে লোক না ধরে মাগো
হল অভিরামের দ্বীপ চালান মা ক্ষুদিরামের ফাঁসি
দশ মাস দশদিন পরে
জন্ম নেব মাসির ঘরে মাগো
তখন যদি না চিনতে পারিস দেখবি গলায় ফাঁসি'
 
এই গানের মধ্যে দেশমাতাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য যাঁর আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে এবং যাঁর কথা উঠে এসেছে তিনি এ উপমহাদেশেরই সূর্যসন্তান, ক্ষুদিরাম। এই গানটি আজও বিভিন্ন গণ আন্দোলনে অনুপ্রেরণা যোগায়, উৎসাহিত করে দেশপ্রেমের অগ্নিমন্ত্রে শপথ নিতে। এই গানের কিংবদন্তি অগ্নিযুগের অগ্নিজিতা বিপ্লবী ক্ষুদিরাম।

  ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ভোর পাঁচটায় ব্রিটিশ সরকার ১৮ বছরের এক তরতাজা যুবককে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করাল। কারাফটকের বাইরে তখন হাজারো জনতার কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে ‘বন্দেমাতরম’ স্লোগান।

ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে কারা কর্তৃপক্ষ যুবকটির কাছে জানতে চাইল, মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ ইচ্ছা কী? যুবকটি এক সেকেন্ড অপেক্ষা না করেই নিঃশঙ্কচিত্তে বলে উঠলেন, ‘আমি ভালো বোমা বানাতে পারি, মৃত্যুর আগে সারা ভারতবাসীকে সেটা শিখিয়ে দিয়ে যেতে চাই।’ উপস্থিত কারা কর্তৃপক্ষ সেদিন বিস্মিত হলো যুবকটির মানসিক দৃঢ়তা আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতি তীব্র ঘৃণাবোধ উপলব্ধি করে।

ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা ক্ষুদিরাম বসুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট । হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন ক্ষুদিরাম এবং নিজ হাতে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়েন।  ফাঁসি মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ১৮ বছর, ৭ মাস ১১ দিন।

(তথ্য সংগৃহীত)

Tuesday, August 6, 2019

প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য

প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য


ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,


চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য


কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।--- সুভাষ মুখোপাধ্যায়

আসলে কোন কোন আপ্তবাক‍্য খুব স্বল্প সময়ে তার জনপ্রিয়তা অর্জন করে ফেলে। যেমন এখন একটা কথা মানুষের মুখে মুখে, 'মোদী হ‍্যা তো মুমকিন হ‍্যা'! যদি এর মূল্যায়ন করা হয় তাহলে অক্ষরে অক্ষরে সঠিক। যেমন নোটবন্দী,জিএসটি বিল, তাৎক্ষণিক তালাক, আর ঐতিহাসিক কাশ্মীরে ধারা ৩৭০ ও ৩৫-ক ধারা বিলোপ। তাহলে কাশ্মীর কি স্বাধীন হয়ে গেল? 


“WE, THE PEOPLE OF INDIA, having solemnly resolved to constitute India into a 1 [SOVEREIGN SOCIALIST SECULAR DEMOCRATIC REPUBLIC] and to secure to all its citizens: JUSTICE, social, economic and political; LIBERTY of thought, expression, belief, faith and worship; EQUALITY of status and of opportunity; and to promote among them all FRATERNITY assuring the dignity of the individual and the 2 [unity and integrity of the Nation];”


ভারতের তথাকথিত ‘মহান’ সংবিধানের প্রস্তাবনাতে এই কথাগুলো বেশ ধাপের সাথে উল্লেখ করা আছে। যার সবটুকু যৌক্তিকতা গতকালের সংসদে মনে হয় চিরকালের মতো হারিয়ে গেলো। এই রাষ্ট্রে আজ ‘ন্যায়’, ‘স্বাধীনতা’, ‘সমতা’ ও ‘সমধর্মিতা’ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো হারিয়ে গিয়ে কেমন এক উপহাসের দলিল তৈরী হয়ে গেলো, যেখানে রাষ্ট্র শুধুই বাহুবলের ঘৃণ্য ইতিহাস তৈরী করে। সামরিক শক্তির বুটের তলায় একটা গোটা রাজ্য ও তার জনগণের আশা-আকাঙ্খাকে পিষে ফেলার আজন্মলালিত পরিকল্পনার যে বাস্তবায়ন আজ বিজেপি ও তার সহযোগীরা করলো, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে চলেছে, শুধু কাশ্মীরেই নয়, সারা দেশে এবং অবশ্যই এই উপমহাদেশে। 


৩৭০ ধারা বা ৩৫-এ বাতিল মানে শুধুমাত্র কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ছিনিয়ে নেওয়া নয়, সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপরেই কুঠারাঘাত। অদ্ভুৎ সব পরস্পরবিরোধী যুক্তি হাজির করা হচ্ছে; ৩৭০ ধারা যদি ‘অগণতান্ত্রিক’ হয়, তাহলে কোন যুক্তিতে ৩৭১-এ বলে নাগাল্যাণ্ড, ৩৭১-বি বলে আসাম, ৩৭১-সি বলে মণিপুর প্রভৃতি রাজ্যগুলির বিশেষ মর্যাদা বহাল রাখা হয়? সাধারণ যুক্তি অনুসারে প্রতিভাত হয়, কাশ্মীরে বিজেপি-র এই আক্রমণের কারণ হলো, রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। ভারতের ইতিহাস দেখেছে, বিভিন্ন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর একটা পর্যায়ের পরে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা পাওয়া; যেমন হয়েছে পণ্ডিচেরি বা গোয়ার ক্ষেত্রে। এই প্রথম একটা ‘রাজ্য’কে ভেঙ্গে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে দেওয়া হলো! একদিকে লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত ঘোষণা করার বেলায়, সেখানকার মানুষের ‘দীর্ঘদিনের দাবী’ ও ‘আকাঙ্খা’র কথা গদগদ কণ্ঠে উল্লেখ করা হলো, আর অন্যদিকে, কাশ্মীরিদের দীর্ঘদিনের দাবী ও আকাঙ্খাকে অস্বীকার করাই শুধু নয়, বুটের তলায় পিষে ফেলাটাই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। 


কি অদ্ভুৎ বৈপরীত্য! একই রাষ্ট্রের, একই সরকারের এমন দ্বিচারিতা পৃথিবীর ইতিহাসেই বিরল। বিজেপি নেতা-কর্মী তাদের মন্ত্রী-সান্ত্রীরাও একসাথে হুক্কারবে বলে চলেছে, ৩৭০ ধারা আসলে এক ‘অস্থায়ী’ বা ‘সাময়িক’ ধারা, যাকে বাদ দেওয়াটা নাকি সময়ের দাবী! এই মর্কট-তনয়রা জানেনা; সুপ্রীম কোর্টে পাঁচজন বিচারকের বেঞ্চ ১০ই অক্টবর ১৯৬৮ সালে, ‘সম্পত প্রকাশ বনাম জম্মু ও কাশ্মীর সরকার’ কেসে এক ঐতিহাসিক রায়ে ৩৭০ ধারা বহাল থাকার পক্ষে রায় দেন, ২০১৭ সালে সুপ্রীম কোর্ট ‘এসবিআই বনাম সন্তোষ গুপ্তা’ কেসেও ঐ ‘অস্থায়ী’ বা ‘সাময়িক’ নয়, ৩৭০ ধারাকে ‘স্থায়ী’ বলে অভিহিত করে। এমনকি, ২০১৮ সালেও জনৈকা বিজয়লক্ষ্মী ঝা-র আবেদনের ভিত্তিতে, বিচারক আর. এফ. নরিম্যান ও এ. কে. গোয়েল-র বেঞ্চ ৩৭০ ধারাকে ‘স্থায়ী’ চরিত্রের বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু ‘চোর না শোনে ধর্মের কাহিনী’, বিজেপিই বা কবে আর গণতন্ত্র বা মানবিকতার তোয়াক্কা করেছে?! 


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে বলছেন, এই ৩৭০ ধারা বাতিল নাকি সেখানে শান্তি ও স্বাভাবিক অবস্থা ফেরানোর লক্ষ্যে! তাই যদি হবে তাহলে ৭ লক্ষ সামরিক বা আধা-সামরিক বাহিনী দিয়ে সারা কাশ্মীর উপত্যকাকে এক মৃত্যু উপত্যকা বানানোর পরিকল্পনা কেন? মেহবুবা মুফতি, ওমর আবদুল্লারা কী অপরাধ করেছিলেন যে তাঁদের প্রথমে গৃহবন্দি তারপর গ্রেফতার করা হল?  ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা বিলোপ করতে জম্মু কাশ্মীর বিধানসভার অনুমোদনের সংস্থান ছিল সংবিধানে। এই মুহূর্তে সেখানে রাষ্ট্রপতি শাসন। তো বিধানসভা নির্বাচনের পর কেন ওই দুটি ধারা বিলোপের কথা ভাবল না সরকার? মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে গলা টিপে মারার কিসের এতো তোড়জোড়?


এতদিন অন্য কোনো রাজ্যের বাসিন্দা জম্মু কাশ্মীরে ইচ্ছেমতো জমি কিনতে পারত না। কিনতে হলে ওখানে টানা ১০ বছর থাকতে হত। সরকারের বক্তব্য, এই নিয়মের ফলে সেখানে বেসরকারি শিল্পপতিরা ব্যাবসা করতে পারেননি। জম্মু কাশ্মীরের উন্নয়ন তাই থমকে গেছে। সরকারের যুক্তি অকাট্য। কিন্তু কথা হল, উত্তর-পূর্বের সব রাজ্যেই কোনো-না-কোনো অংশ আছে, যেখানে ওই সম্প্রদায়ের বাইরের কেউ জমি কিনতে পারে না। মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশে বিশেষ পাস ছাড়া প্রবেশই করা যায় না। সত্যি কথা বলতে কী, শুধু জম্মু কাশ্মীর নয়, ভারতের ১১টি রাজ্যে ওই নিয়ম চালু আছে যে অন্য রাজ্যের বাসিন্দারা জমি কিনতে পারবেন না। তো কথা হল, কেন্দ্রীয় সরকার সেসব রাজ্য নিয়ে কী ভাবছে? জম্মু কাশ্মীরের ছিল নিজস্ব পতাকা। আজ নিষিদ্ধ হল। অসমের রয়েছে নিজস্ব ‘জাতীয় সংগীত’। হ্যাঁ, ‘ও মোর আপোনার দেশ’ গানটিকে অসমে ‘জাতীয় সংগীত’ বলেই উল্লেখ করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকার এব্যাপারে কী ভাবছে? এভাবে যদি কোনো রাজ্যকে একদিনে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা যায় তাহলে তো কোথাও সরকার-বিরোধী আন্দোলনই হবে না। ইন্দিরা গান্ধী একসময় বেশ কয়েকটি রাজ্য সরকারকে বরখাস্ত করে রাষ্ট্রপতি শাসন লাগু করেছিলেন। একলপ্তে প্রায় দুবছর জরুরি অবস্থারও সাক্ষী আমরা। কিন্তু সেই চরম ফ্যাসিস্ট ইন্দিরাও কোনো রাজ্যের মর্যাদা ছেঁটে ফেলেননি। এবার যদি পশ্চিমবঙ্গ থেকে দার্জিলিং, অসম থেকে বরাক উপত্যকা কিংবা বড়োল্যান্ড, মহারাষ্ট্রের বিদর্ভকে কেন্দ্রীয় সরকার কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করে, নিঃশ্চয় আমরা খুব বেশি আনন্দিত হবো!


অতএব মানুষের ফোকাস কাশ্মীরে নিয়ে চলো, ভুয়ো জাতীয়তবাদের হিড়িক তোল, হিন্দু-মুসলিম বৈরিতা উসকে দাও। মানুষ মূল সমস্যা থেকে সরে যাবে, এটাই কি বর্তমান পরিবর্তনকামী সরকারের মূল মন্ত্র তা বোধহয় কারো বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। কয়েকটি পরিবর্তনের নমুনা রইল---


১) আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় মুদ্রার দাম কমছে তো কমছেই। আজ ১ ডলার = ৭০.২০ টাকা। 


২)ভারতবর্ষের ৪১টি রাষ্ট্রীয় অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি ১৬টি সহযোগী সংস্থা বেসরকারী হাতে যাচ্ছে।


৩) বিশ্ব অর্থনীতিতে সপ্তম স্থনে নেমে গেলো ভারত।


৪) মাত্র ক’দিন আগেই রেলমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, রেলে ৩ লক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই হবে। পরে সংসদে এই নিয়ে ঝড় ওঠায় তা স্থগিত হয়, কিন্তু কর্মীদের অবসরের বয়স ৬০ থেকে কমে ৫৫ করার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়। পরোক্ষে আগামী ৫ বছরে রেলে প্রায় তিন থেকে চার লক্ষ পদ শূন্য হয়ে যাবে। 


৫) কিছুদিন আগে আসামের দুটি লাভজনক পেপার-মিল বন্ধ করে দেওয়া হলো। 


৬)ভারতবর্ষের ১৪টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মধ্যে ৫টি বিমানবন্দর, নরেন্দ্র মোদীর স্নেহধন্য গৌতম আদানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, বাকিগুলোও সব বেসরকারী হাতে চলে যাবে।

 এক সংবিধান, এক আইন বা একই সরকারের দ্বারা দেশের অন্য রাজ্য এবং কাশ্মীরের মধ্যে এমত দ্বিচারিতা কেন? কাশ্মীরের মানুষের ইচ্ছে বা দাবীকে আমল না দেওয়া, গণভোটের প্রশ্নটিকে এড়িয়ে গিয়ে শুধুই পীড়নের কামানের চাকায় ধর্ষিতা কেন কাশ্মীর? বহু রক্তস্নাত কাশ্মীর, বহু সন্তান-হারা কাশ্মীর, কুনান পোষপোড়ার আতঙ্কের কাশ্মীর; সেখানে এখন আরও মারণ-খেলায় মাতবে ভারত সরকার। উল্লসিত সংঘ পরিবার, কিছু না জেনেই বা অজ্ঞতাহেতু এক বিশাল অংশের মানুষ আজ উন্মত্ত, উল্লাসমুখর হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মোদী-শাহকে ভগবান বানাতে উদ্যত! লোকসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতে আসার পর প্রথম অধিবেশনে যেভাবে বিভিন্ন বিল পাস করানো হল, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে সরকারের নির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা, কেউ এজেন্ডা বলতে পারেন, আছে।

কিন্তু আজ শুভবোধের পরীক্ষা, গণতান্ত্রিক চেতনার সাহস দেখানোর দিন; এই উল্লাসের মাঝে ‘সত্য’কে তুলে ধরার, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর হিম্মতই পারে, এই গণহিস্টিরিয়া ও তার নির্মাণকারীদের সামনে বাধার পাঁচিল তুলতে, ভাঙ্গতে পারে শাসকের উত্তুঙ্গ দম্ভকে। বাংলায় আজ সংঘিরা লাড্ডু বিলিয়েছে, মানুষ পক্ষ নিচ্ছে। এরপরেও যদি কেউ ফ্যাসিজমের পদধ্বনি শুনতে ব্যর্থ হন, তাহলে বধিরতার চিকিৎসা করান। বিরুদ্ধ-স্বরের বিচ্ছিন্নতা বিপদকে আটকাতে অক্ষম – এ কথা হৃদয়ঙ্গম না হলে, আগামীদিনে নিজের ওপর আক্রমণ সামলানো অসম্ভব হবে। আক্রমণের সামনে প্রতিরোধ গড়তে হলে, এ কথার সপক্ষে সাক্ষী দেয় আমাদের গৌরবের ইতিহাস। আজ কাশ্মীরের জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো মানে, কাল নিজের স্বাধীনতার যুদ্ধকেই শক্তিশালী করা।সংখ্যা সরকার পক্ষের দিকে, আইনের ফাঁকফোঁকর সরকার পক্ষের দিকে, মিডিয়া সরকার পক্ষের দিকে, কিন্তু এরপরও তো একটা বিষয় থাকে – ঔচিত্য। প্রপ্রাইটি। সেটা সরকার পক্ষের দিকে আছে কি?

শতাব্দীলাঞ্ছিত আর্তের কান্না


প্রতি নিঃশ্বাসে আনে লজ্জা;


মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা, আর না –


পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা। --- সুভাষ মুখোপাধ্যায়


প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য

প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য


ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,


চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য


কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।--- সুভাষ মুখোপাধ্যায়

আসলে কোন কোন আপ্তবাক‍্য খুব স্বল্প সময়ে তার জনপ্রিয়তা অর্জন করে ফেলে। যেমন এখন একটা কথা মানুষের মুখে মুখে, 'মোদী হ‍্যা তো মুমকিন হ‍্যা'! যদি এর মূল্যায়ন করা হয় তাহলে অক্ষরে অক্ষরে সঠিক। যেমন নোটবন্দী,জিএসটি বিল, তাৎক্ষণিক তালাক, আর ঐতিহাসিক কাশ্মীরে ধারা ৩৭০ ও ৩৫-ক ধারা বিলোপ। তাহলে কাশ্মীর কি স্বাধীন হয়ে গেল? 


“WE, THE PEOPLE OF INDIA, having solemnly resolved to constitute India into a 1 [SOVEREIGN SOCIALIST SECULAR DEMOCRATIC REPUBLIC] and to secure to all its citizens: JUSTICE, social, economic and political; LIBERTY of thought, expression, belief, faith and worship; EQUALITY of status and of opportunity; and to promote among them all FRATERNITY assuring the dignity of the individual and the 2 [unity and integrity of the Nation];”


ভারতের তথাকথিত ‘মহান’ সংবিধানের প্রস্তাবনাতে এই কথাগুলো বেশ ধাপের সাথে উল্লেখ করা আছে। যার সবটুকু যৌক্তিকতা গতকালের সংসদে মনে হয় চিরকালের মতো হারিয়ে গেলো। এই রাষ্ট্রে আজ ‘ন্যায়’, ‘স্বাধীনতা’, ‘সমতা’ ও ‘সমধর্মিতা’ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো হারিয়ে গিয়ে কেমন এক উপহাসের দলিল তৈরী হয়ে গেলো, যেখানে রাষ্ট্র শুধুই বাহুবলের ঘৃণ্য ইতিহাস তৈরী করে। সামরিক শক্তির বুটের তলায় একটা গোটা রাজ্য ও তার জনগণের আশা-আকাঙ্খাকে পিষে ফেলার আজন্মলালিত পরিকল্পনার যে বাস্তবায়ন আজ বিজেপি ও তার সহযোগীরা করলো, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে চলেছে, শুধু কাশ্মীরেই নয়, সারা দেশে এবং অবশ্যই এই উপমহাদেশে। 


৩৭০ ধারা বা ৩৫-এ বাতিল মানে শুধুমাত্র কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ছিনিয়ে নেওয়া নয়, সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপরেই কুঠারাঘাত। অদ্ভুৎ সব পরস্পরবিরোধী যুক্তি হাজির করা হচ্ছে; ৩৭০ ধারা যদি ‘অগণতান্ত্রিক’ হয়, তাহলে কোন যুক্তিতে ৩৭১-এ বলে নাগাল্যাণ্ড, ৩৭১-বি বলে আসাম, ৩৭১-সি বলে মণিপুর প্রভৃতি রাজ্যগুলির বিশেষ মর্যাদা বহাল রাখা হয়? সাধারণ যুক্তি অনুসারে প্রতিভাত হয়, কাশ্মীরে বিজেপি-র এই আক্রমণের কারণ হলো, রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। ভারতের ইতিহাস দেখেছে, বিভিন্ন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর একটা পর্যায়ের পরে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা পাওয়া; যেমন হয়েছে পণ্ডিচেরি বা গোয়ার ক্ষেত্রে। এই প্রথম একটা ‘রাজ্য’কে ভেঙ্গে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে দেওয়া হলো! একদিকে লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত ঘোষণা করার বেলায়, সেখানকার মানুষের ‘দীর্ঘদিনের দাবী’ ও ‘আকাঙ্খা’র কথা গদগদ কণ্ঠে উল্লেখ করা হলো, আর অন্যদিকে, কাশ্মীরিদের দীর্ঘদিনের দাবী ও আকাঙ্খাকে অস্বীকার করাই শুধু নয়, বুটের তলায় পিষে ফেলাটাই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। 


কি অদ্ভুৎ বৈপরীত্য! একই রাষ্ট্রের, একই সরকারের এমন দ্বিচারিতা পৃথিবীর ইতিহাসেই বিরল। বিজেপি নেতা-কর্মী তাদের মন্ত্রী-সান্ত্রীরাও একসাথে হুক্কারবে বলে চলেছে, ৩৭০ ধারা আসলে এক ‘অস্থায়ী’ বা ‘সাময়িক’ ধারা, যাকে বাদ দেওয়াটা নাকি সময়ের দাবী! এই মর্কট-তনয়রা জানেনা; সুপ্রীম কোর্টে পাঁচজন বিচারকের বেঞ্চ ১০ই অক্টবর ১৯৬৮ সালে, ‘সম্পত প্রকাশ বনাম জম্মু ও কাশ্মীর সরকার’ কেসে এক ঐতিহাসিক রায়ে ৩৭০ ধারা বহাল থাকার পক্ষে রায় দেন, ২০১৭ সালে সুপ্রীম কোর্ট ‘এসবিআই বনাম সন্তোষ গুপ্তা’ কেসেও ঐ ‘অস্থায়ী’ বা ‘সাময়িক’ নয়, ৩৭০ ধারাকে ‘স্থায়ী’ বলে অভিহিত করে। এমনকি, ২০১৮ সালেও জনৈকা বিজয়লক্ষ্মী ঝা-র আবেদনের ভিত্তিতে, বিচারক আর. এফ. নরিম্যান ও এ. কে. গোয়েল-র বেঞ্চ ৩৭০ ধারাকে ‘স্থায়ী’ চরিত্রের বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু ‘চোর না শোনে ধর্মের কাহিনী’, বিজেপিই বা কবে আর গণতন্ত্র বা মানবিকতার তোয়াক্কা করেছে?! 


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে বলছেন, এই ৩৭০ ধারা বাতিল নাকি সেখানে শান্তি ও স্বাভাবিক অবস্থা ফেরানোর লক্ষ্যে! তাই যদি হবে তাহলে ৭ লক্ষ সামরিক বা আধা-সামরিক বাহিনী দিয়ে সারা কাশ্মীর উপত্যকাকে এক মৃত্যু উপত্যকা বানানোর পরিকল্পনা কেন? মেহবুবা মুফতি, ওমর আবদুল্লারা কী অপরাধ করেছিলেন যে তাঁদের প্রথমে গৃহবন্দি তারপর গ্রেফতার করা হল?  ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা বিলোপ করতে জম্মু কাশ্মীর বিধানসভার অনুমোদনের সংস্থান ছিল সংবিধানে। এই মুহূর্তে সেখানে রাষ্ট্রপতি শাসন। তো বিধানসভা নির্বাচনের পর কেন ওই দুটি ধারা বিলোপের কথা ভাবল না সরকার? মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে গলা টিপে মারার কিসের এতো তোড়জোড়?


এতদিন অন্য কোনো রাজ্যের বাসিন্দা জম্মু কাশ্মীরে ইচ্ছেমতো জমি কিনতে পারত না। কিনতে হলে ওখানে টানা ১০ বছর থাকতে হত। সরকারের বক্তব্য, এই নিয়মের ফলে সেখানে বেসরকারি শিল্পপতিরা ব্যাবসা করতে পারেননি। জম্মু কাশ্মীরের উন্নয়ন তাই থমকে গেছে। সরকারের যুক্তি অকাট্য। কিন্তু কথা হল, উত্তর-পূর্বের সব রাজ্যেই কোনো-না-কোনো অংশ আছে, যেখানে ওই সম্প্রদায়ের বাইরের কেউ জমি কিনতে পারে না। মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশে বিশেষ পাস ছাড়া প্রবেশই করা যায় না। সত্যি কথা বলতে কী, শুধু জম্মু কাশ্মীর নয়, ভারতের ১১টি রাজ্যে ওই নিয়ম চালু আছে যে অন্য রাজ্যের বাসিন্দারা জমি কিনতে পারবেন না। তো কথা হল, কেন্দ্রীয় সরকার সেসব রাজ্য নিয়ে কী ভাবছে? জম্মু কাশ্মীরের ছিল নিজস্ব পতাকা। আজ নিষিদ্ধ হল। অসমের রয়েছে নিজস্ব ‘জাতীয় সংগীত’। হ্যাঁ, ‘ও মোর আপোনার দেশ’ গানটিকে অসমে ‘জাতীয় সংগীত’ বলেই উল্লেখ করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকার এব্যাপারে কী ভাবছে? এভাবে যদি কোনো রাজ্যকে একদিনে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা যায় তাহলে তো কোথাও সরকার-বিরোধী আন্দোলনই হবে না। ইন্দিরা গান্ধী একসময় বেশ কয়েকটি রাজ্য সরকারকে বরখাস্ত করে রাষ্ট্রপতি শাসন লাগু করেছিলেন। একলপ্তে প্রায় দুবছর জরুরি অবস্থারও সাক্ষী আমরা। কিন্তু সেই চরম ফ্যাসিস্ট ইন্দিরাও কোনো রাজ্যের মর্যাদা ছেঁটে ফেলেননি। এবার যদি পশ্চিমবঙ্গ থেকে দার্জিলিং, অসম থেকে বরাক উপত্যকা কিংবা বড়োল্যান্ড, মহারাষ্ট্রের বিদর্ভকে কেন্দ্রীয় সরকার কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করে, নিঃশ্চয় আমরা খুব বেশি আনন্দিত হবো!


অতএব মানুষের ফোকাস কাশ্মীরে নিয়ে চলো, ভুয়ো জাতীয়তবাদের হিড়িক তোল, হিন্দু-মুসলিম বৈরিতা উসকে দাও। মানুষ মূল সমস্যা থেকে সরে যাবে, এটাই কি বর্তমান পরিবর্তনকামী সরকারের মূল মন্ত্র তা বোধহয় কারো বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। কয়েকটি পরিবর্তনের নমুনা রইল---


১) আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় মুদ্রার দাম কমছে তো কমছেই। আজ ১ ডলার = ৭০.২০ টাকা। 


২)ভারতবর্ষের ৪১টি রাষ্ট্রীয় অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি ১৬টি সহযোগী সংস্থা বেসরকারী হাতে যাচ্ছে।


৩) বিশ্ব অর্থনীতিতে সপ্তম স্থনে নেমে গেলো ভারত।


৪) মাত্র ক’দিন আগেই রেলমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, রেলে ৩ লক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই হবে। পরে সংসদে এই নিয়ে ঝড় ওঠায় তা স্থগিত হয়, কিন্তু কর্মীদের অবসরের বয়স ৬০ থেকে কমে ৫৫ করার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়। পরোক্ষে আগামী ৫ বছরে রেলে প্রায় তিন থেকে চার লক্ষ পদ শূন্য হয়ে যাবে। 


৫) কিছুদিন আগে আসামের দুটি লাভজনক পেপার-মিল বন্ধ করে দেওয়া হলো। 


৬)ভারতবর্ষের ১৪টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মধ্যে ৫টি বিমানবন্দর, নরেন্দ্র মোদীর স্নেহধন্য গৌতম আদানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, বাকিগুলোও সব বেসরকারী হাতে চলে যাবে।

 এক সংবিধান, এক আইন বা একই সরকারের দ্বারা দেশের অন্য রাজ্য এবং কাশ্মীরের মধ্যে এমত দ্বিচারিতা কেন? কাশ্মীরের মানুষের ইচ্ছে বা দাবীকে আমল না দেওয়া, গণভোটের প্রশ্নটিকে এড়িয়ে গিয়ে শুধুই পীড়নের কামানের চাকায় ধর্ষিতা কেন কাশ্মীর? বহু রক্তস্নাত কাশ্মীর, বহু সন্তান-হারা কাশ্মীর, কুনান পোষপোড়ার আতঙ্কের কাশ্মীর; সেখানে এখন আরও মারণ-খেলায় মাতবে ভারত সরকার। উল্লসিত সংঘ পরিবার, কিছু না জেনেই বা অজ্ঞতাহেতু এক বিশাল অংশের মানুষ আজ উন্মত্ত, উল্লাসমুখর হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মোদী-শাহকে ভগবান বানাতে উদ্যত! লোকসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতে আসার পর প্রথম অধিবেশনে যেভাবে বিভিন্ন বিল পাস করানো হল, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে সরকারের নির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা, কেউ এজেন্ডা বলতে পারেন, আছে।

কিন্তু আজ শুভবোধের পরীক্ষা, গণতান্ত্রিক চেতনার সাহস দেখানোর দিন; এই উল্লাসের মাঝে ‘সত্য’কে তুলে ধরার, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর হিম্মতই পারে, এই গণহিস্টিরিয়া ও তার নির্মাণকারীদের সামনে বাধার পাঁচিল তুলতে, ভাঙ্গতে পারে শাসকের উত্তুঙ্গ দম্ভকে। বাংলায় আজ সংঘিরা লাড্ডু বিলিয়েছে, মানুষ পক্ষ নিচ্ছে। এরপরেও যদি কেউ ফ্যাসিজমের পদধ্বনি শুনতে ব্যর্থ হন, তাহলে বধিরতার চিকিৎসা করান। বিরুদ্ধ-স্বরের বিচ্ছিন্নতা বিপদকে আটকাতে অক্ষম – এ কথা হৃদয়ঙ্গম না হলে, আগামীদিনে নিজের ওপর আক্রমণ সামলানো অসম্ভব হবে। আক্রমণের সামনে প্রতিরোধ গড়তে হলে, এ কথার সপক্ষে সাক্ষী দেয় আমাদের গৌরবের ইতিহাস। আজ কাশ্মীরের জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো মানে, কাল নিজের স্বাধীনতার যুদ্ধকেই শক্তিশালী করা।সংখ্যা সরকার পক্ষের দিকে, আইনের ফাঁকফোঁকর সরকার পক্ষের দিকে, মিডিয়া সরকার পক্ষের দিকে, কিন্তু এরপরও তো একটা বিষয় থাকে – ঔচিত্য। প্রপ্রাইটি। সেটা সরকার পক্ষের দিকে আছে কি?

শতাব্দীলাঞ্ছিত আর্তের কান্না


প্রতি নিঃশ্বাসে আনে লজ্জা;


মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা, আর না –


পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা। --- সুভাষ মুখোপাধ্যায়


Monday, August 5, 2019

কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি

তাহলে কাশ্মীর কি স্বাধীন হয়ে গেল? একটা পোস্টে পড়লাম ৩৭০ ধারা বিলোপ মানে  কাশ্মীরের ভারতভুক্তির অন্যতম শর্ত।
৩৭০ ধারা নাকচ করে রাষ্ট্রপতির আদেশনামা এবং জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে লাদাখ ও জম্মুকাশ্মীর এই দুটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে বিভাজিত করা ভারতীয় সংবিধানে অন্তর্ঘাত চালানো ছাড়া আর কিছু নয়। স্বভাবসিদ্ধ লুকোছাপা, ষড়যন্ত্র ও অবৈধ পথে মোদি সরকার কাশ্মীরের সাথে বাকী ভারতের সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক যোগসূত্রকে ধ্বংস করছে। 

এই অন্তর্ঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে মোদি সরকার গত সপ্তাহ জুড়ে কাশ্মীরকে অন্তরীণ করে ফেলে। ৩৫,০০০ অতিরিক্ত সেনা নিয়োগ করেছে কাশ্মীর উপত্যকায়, এই এলাকা এমনিতেই বিশ্বের সর্বোচ্চ সেনা অধ্যুষিত এলাকাগুলির অন্যতম। পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের কাশ্মীর উপত্যকা ত্যাগ করার জন্য সতর্কতা জারি করায় ব্যাপক ভীতির সঞ্চার হয়; অন্যদিকে কাশ্মীরী জনতা কিন্তু যাত্রীদের জন্য নিজেদের বাড়ির দরজা খোলা থাকার ঘোষণা দেয়। এরপর আবার বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের রাতারাতি গৃহবন্দী করা হয়, ইনটারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়, পেট্রল বিক্রী বন্ধ করা হয় এবং সিআরপিএফ বাহিনী পুলিশ থানাগুলির দখল নেয়।

সংবিধান অনুসারে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ৩৭০ ও ৩৫-ক ধারা সংক্রান্ত কোনও পরিবর্তন রাজ্য বিধানসভার সম্মতি ব্যতিরেকে করা সম্ভব নয়। ২০১৮ সালে জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভা বেআইনীভাবে ভেঙে দেওয়া হয় কোনও পক্ষকেই সরকার গড়ার কোনওরকম সুযোগ না দিয়ে। এরপর কেন্দ্রীয় সরকার  জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন ও লোকসভা নির্বাচন সংঘটিত করা এড়িয়ে যায়। সুতরাং একথা স্পষ্ট যে রাষ্ট্রপতির আদেশনামা আসলে এক অন্তর্ঘাত।

বিমুদ্রাকরণ দেশে দূর্ণীতি ও অবৈধ টাকার সমস্যা দূর করেনি - বরং তা দূর্ণীতিকে আরও সুবিধা করে দিয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন দুর্ভোগ এনে হাজির করেছে। একইভাবে জম্মু ও কাশ্মীর সংক্রান্ত এইসব অত্যাচার ও ষড়যন্ত্রমূলক সিদ্ধান্তগুলি নেওয়া হল এমন সময়ে যখন সে রাজ্যে কোনও নির্বাচিত সরকার আর নাই। এ পথে কাশ্মীর সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি হবেনা । বরং পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। আরও তীব্র সেনা আধিপত্য ও বিরোধী দলগুলির ওপর দমন কাশ্মীরের জনতাকে আরও বিচ্ছিন্ন করবে। তাছাড়া, এই অন্তর্ঘাত কেবল কাশ্মীরের পরিস্থিতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, এটা সংবিধানের ওপরেই আক্রমণ এবং তা সমগ্র ভারতকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

জম্মু ও কাশ্মীরে এই উদ্যোগ এবং নাগরিকত্ব আইনে সংশোধনী ও এন আর সি - বিজেপি দেশকে ১৯৪০এর দশকের মত অস্থিরতার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। জম্মু ও কাশ্মীরকে কার্যত জরুরি অবস্থার মধ্যে ফেলে দেওয়া হল - ভারতকে জেগে উঠতে হবে , প্রতিরোধ গড়তে হবে। কারণ এই জরুরি অবস্থা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়বে গোটা দেশে।

Sunday, August 4, 2019

বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও

উন্নাও, যোগীরাজ। দেশের প্রথম সন্ন্যাসী মুখ্যমন্ত্রীর স্বর্গ রাজ্যে একটি চিত্তাকর্ষক ঘটনাপঞ্জি।
হিন্দি সিনেমায় ভিলেনদের যেমন করতে দেখি, তবে এ সব বাস্তব ঘটনা। লিখেছেন সুজন ভট্টাচার্য।

২০ জুন, ২০১৭
জনৈক মহিলা থানায় অভিযোগ করলেন ১১ তারিখে তাঁর নাবালিকা কন্যাকে (১৭ বছর) চাকরি দেবার নাম করে ডেকে পাঠিয়ে বারংবার ধর্ষণ করা হয়েছে। এমনকি তাকে বিক্রিও করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ FIR করে।

২২ জুন, ২০১৭
মেয়েটিকে পুলিশ একটি গ্রাম থেকে উদ্ধার করে। তার মেডিকেল এক্সামিনেশন হয় এবং বয়ানও নথিভুক্ত করা হয়। আরেকটি FIR-ও রুজু করা হয় POSCO আইনে।

১৭ আগস্ট, ২০১৭
মেয়েটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নামে একটি খোলা চিঠি লেখে। সেই চিঠিতে সে বলে, ৪ জুন তারিখে স্থানীয় বিধায়কের বাড়িতেও তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল যাতে স্বয়ং বিধায়কও অংশীদার। সে আরও লেখে, ২২ জুন পুলিশের কাছে সে এই অভিযোগ করেছিল। কিন্তু পুলিশ তাকে বিধায়কের নাম লেখাতে বাধা দেয়।

৫ এপ্রিল, ২০১৮
মেয়েটির বাবাকে আচমকাই গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানেই তাকে চরমভাবে শারীরিক নিগ্রহ করে কিছু দুষ্কৃতী। মেয়েটির বাবা জানান বিধায়কের ভাইয়ের উদ্যোগে এবনফ তার উপস্থিতিতেই আক্রমণ চালানো হয়েছিল।

৮ এপ্রিল, ২০১৮
পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদে মেয়েটি রাজ্যের সচিবালয়ের সামনে গায়ে আগুন দেয়।

৯ এপ্রিল, ২০১৮
হাসপাতালেই মেয়েটির বাবার মৃত্যু হয়।

১০ এপ্রিল, ২০১৮
এই ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে হইচই শুরু হল।

১২ এপ্রিল, ২০১৮
রাজ্য সরকার তদন্তের দায়িত্ব তুলে দিলেন সি বি আইয়ের হাতে। মামলা জেলা কোর্ট থেকে হাই কোর্টে স্থানান্তরিত হল।

১৩ এপ্রিল, ২০১৮
সি বি আই FIR করল এবং অভিযুক্ত বিধায়ককে তদন্তের জন্য ডেকে পাঠাল। সেদিনই হাই কোর্টের নির্দেশে বিধায়ককে গ্রেপ্তার করা হল।

২১ নভেম্বর, ২০১৮
বিধায়কের বিরুদ্ধে মেয়েটির ধর্ষণ ও তার বাবাকে খুন করার অভিযোগে লাগাতার প্রচার চালিয়ে আসছিল মেয়েটির কাকা। ১৮ বছরের পুরনো একটি গুলি চালনার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হল।

২৮ জুলাই, ২০১৯
মামলা সংক্রান্ত কাজে মেয়েটি তার দুই মাসী ও তার উকিলের সঙ্গে গাড়িতে করে যাচ্ছিল। একটি ট্রাক সেই গাড়িতে ধাক্কা মারে। মেয়েটির দুই মাসীর মৃত্যু হয়। মেয়েটি এবং তার উকিল এখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। প্রসঙ্গত হাই কোর্টের নির্দেশে মেয়েটির সর্বক্ষণ পুলিশি নিরাপত্তা পাবার কথা। কিন্তু ঘটনার সময় কোনো পুলিশ পাহারা তার সঙ্গে ছিল না। যে ট্রাকটি ধাক্কা মেরেছিল, তার নাম্বার কালো রঙ দিয়ে মুছে দেওয়া ছিল।

আজ্ঞে হ্যাঁ, মেয়েটি হিন্দু। কিন্তু এখনো পর্যন্ত একটি হিন্দু মাউথ পিসও এই লাগাতার অন্যায়ের প্রকাশ্য বিরোধিতা করেননি। কেন? কারণ কি এটাই যে সেই অভিযুক্ত বিধায়কও শুধু হিন্দু নন, ‘গরব সে কহো’ হিন্দু? তার মানে কি তাহলে এটাই দাঁড়াল, ‘গরব সে কহো’ হিন্দুদের হাতে হিন্দু নাবালিকারও নিরাপত্তা নেই?

কী বলছেন টিম ৬২?

http://www.newindianexpress.com/nation/2019/jul/30/samajwadi-party-leaders-truck-involved-in-unnao-rape-survivor-accident-2011513.html

খাদ্যের কোন ধর্ম হয়না, খাদ‍্যই ধর্ম

"ধর্মে মহান হবে কর্মে মহান হবে, নব দিনমণি উদিবে আবার পুরাতন এ পুরবে"-- অতুলপ্রসাদ সেন তাঁর বল বল বল সবে কবিতায় যেভাবে আমাদের এই স্বপ্নের ভারত নিয়ে যা লিখেছেন তার একটিও ভুল বললেন নি। এই ভারত কমবেশি এভাবেই ছিল। ছিল কি এভাবেই আছে। উনি তার কবিতায় যে নব দিনমণির কথা উল্লেখ করেছিলেন তা হয়ত পুরাতন পূর্ব দিকে উঠার আর বাকি ছিল না কিছু দিন আগ পর্যন্ত।

কিন্তু বর্তমান সময়ে বিকাশের ঊর্ধ্বমুখী নবজাগরণ। যার ফলস্বরূপ আমরা আজ বিভিন্ন প্রশ্নবোধক চিহ্নের সম্মুখীন। আমরা আজ বাকস্বাধীনতাহীন, হয়তো পরাধীন, হয়তোবা আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি মধ‍্যযুগীয় বর্বরতায়। ভয় হয় দেশদ্রোহী তকমা না লেগে যায়, ভয় হয় কোনো ভক্তের টার্গেট না হয়ে যাই, ভয় হয় শ্লোগানের উচ্চচাপে অক্সিজেনের অভাব হয়। এই কনস্পেটে কি সঠিক ভারত নির্মাণ হচ্ছে না সবকিছু এক করার যে মন্ত্র বইছে বাতাসে তার লক্ষ্য পূরণ, বোঝাতে পারছি না। কিন্তু এটা বোঝতে কঠিন নয় যে অতুলপ্রসাদ সেন তাঁর কবিতায় যে ভারত নির্মাণের কথা বলেছিলেন তা যদিও মন্থর গতিতে হচ্ছে। তবু বলবো হচ্ছে। যেভাবে 'জোমেটো' দেখিয়ে দিল।

মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুর বাসিন্দা অমিত শুক্লা জোমাটো তে খাবারের অর্ডার দেন। যে ব্যাক্তি খাবার নিয়ে এসেছিলেন তিনি ধর্মে মুসলমান। অমিত শুক্লা তার থেকে খাবার নিতে অস্বীকার করেন এবং জোমাটোর কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে অন্য হিন্দু কাউকে দিয়ে খাবার পাঠাতে বলেন । জোমাটো থেকে জানানো হয় সেটা সম্ভব নয়, খাদ্যের কোনো ধর্ম হয় না, খাদ্যই স্বয়ং ধর্ম।

অমিত শুক্লা তার অর্ডার বাতিল করে জোমাটোর প্রতিনিধির সঙ্গে কথোপকথনের স্ক্রিন শট দিয়ে একের পর এক টুইট করতে থাকেন । যার মূল অর্থ তিনি  হিন্দু বলে গর্বিত, তিনি কোনো মুসলমানের হাত থেকে খাবার নেবেন না। জোমাটো তার প্রস্তাবে রাজি হয় নি বলে তিনি অর্ডার ক্যানসেল করে দিয়ে বলেছেন তার রিফান্ড দরকার নেই। জোমাটোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবেন বলে তিনি হুমকিও দিয়েছেন। তার টুইটের হাবভাবে মনে হচ্ছিলো যে তিনি প্রায় ব্রিটিশদের সঙ্গে লড়াই করার মতোই একটা গর্বের কাজ করে ফেলেছেন, এবার স্বাধীনতা সংগ্রামীর পেনশনটা চালু হলেই হয়।

জোমাটো তার কর্মীর পাশেই দাঁড়িয়েছে।'হালাল ফুড' বা তার সম্পর্কে কতটা অবগত তাও জোমেটো দিয়েছে বিস্তারিত বর্ণনা। কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা দীপিন্দার গোয়েল টুইট করে জানিয়েছেন "আমরা ভারতবর্ষের ধ্যান ধারণা, আমাদের বৈচিত্র্যময় শ্রদ্ধেয় ক্রেতা ও অংশীদারদের জন্যে গর্বিত। আমাদের মূল্যবোধ রক্ষার পথে যে ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে তার জন্যে আমরা একটুও দুঃখিত নই।" এই গর্বের বহুত্ববাদ রক্ষার লড়াইতে জোমাটোর ভূমিকার প্রতি রইলো একরাশ শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...