গতকাল বৈশাখের প্রথম দিন ছিল। তাই ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু চারদিকে নির্বাচনী প্রচার আর এন করেংগে তেন করেংগে ভাষণ। তাই নববর্ষটা নির্বাচনের লহরে মাতোয়ারা। যাক, এসব তো চলছে চলবে। রাস্তায় রাস্তায় ভাষণ শুনে কানটা ঝালাপালা তারসাথে বিকেলে যখন টিভির পর্দায় নিউজ দেখছিলাম তো হঠাৎ বানিজ্যিক বিরতিতে দেখি বোধহয় 'নন কমার্শিয়াল' হবে 'আকৌ একবার' (অসমিয়া ভাষায়) অর্থাৎ 'আরও একবার'। প্রচারটা দেখেই নীচের কিছু লেখা ক্রমবিকাশ---
যে বেশি বকে, সে বেশি মিথ্যা কথাও বলে। সেই জানাচেনা সত্যি কথাটা নরেন্দ্র মোদির কারবার দেখে আবার সত্যি বলে প্রমাণিত হচ্ছে। ডজন ডজন প্রতিশ্রুতি দেওয়া, না রাখতে পারা, ব্যর্থতা ঢাকতে আবার প্রতিশ্রুতি আপাতভাবে মনে হবে মোদিভাই এমন সহজ-সোজা রাস্তাতেই চলছেন। সংবাদ প্রচারেও সেই চালু লাইন--- '#অন_দ্য_রেকর্ড' মন্তব্যের সঙ্গে '#অব_দ্য_রেকর্ড মন্তব্য' 'বন্ধু' সংবাদ মাধ্যমকে 'খাওয়ান'। বস্তুত, ওইসব সংবাদ মাধ্যমের দায়িত্ব মোদিরাজার ইঙ্গিত অনুযায়ী ক্যানেস্তারা পেটান। সেই জানাচেনা রাস্তা। নোট বন্দি থেকে বালাকোট, নীতি-আয়োগ থেকে রিজার্ভ ব্যাংক, যেদিকে তাকানো যায়, দেখা যাবে, সেই চিরচেনা পথ প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে নিজের স্বার্থ এবং কৃতিত্ব স্থাপনা। যারা প্রতিবন্ধক তাদের মানসিক এবং শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা। যারা ষাট দশকের ভারতবর্ষে বেড়ে উঠাছে, তাদের কাছে এ রাস্তা হাতের তালুর মতো চেনা।
একটু খাতিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে এমন ন্যালাখ্যাপামির সঙ্গে জুড়ে গেছে নানান ঐতিহাসিক চিন্তাধারা। এবং ওই আপাত কাছাখোলা ভাব ঠিক তত সরল নয়। এ বেশ সুচারু শিল্পকলা! রাজপাট চালনার এই কারুকৌশল মোদি শিখেছেন ইতিহাস পড়ে। তার তিন শিক্ষক--- #বেনিটো_মুসোলিনি, #অ্যাডলফ_হিটলার আর #পল_জোসেফ_গোয়েবলস।
মুসোলিনি বলেছিলেন ফ্যাসিজম আর কর্পোরেটিজম একই কথা। রাষ্ট্র আর কর্পোরেট ক্ষমতার একাত্মকরণ। মুসোলিনির পথে চলেই মোদি চেয়েছেন ভারত নামক রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে আম্বানি, আদানি, মেহুল চোকসি প্রমুখের ক্ষমতার মেলবন্ধন ঘটাতে। তা হলেই, মোদিভাইয়ের ধারণা, তার দাপট নিরঙ্কুশ হবে, দীর্ঘায়িত হবে রাজত্বকাল। দেশে দেশে, ঘরে ঘরে তার বাণী পৌঁছে যাবে। হয়তো বল্লবভাই প্যাটেলের থেকেও উচ্চতর মোদি মূর্তি স্থাপন করা হবে তার জীবদ্দশাতেই। সরকারি পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হবে 'চৌকিদার' মোদির জীবনকথা। চলচ্চিত্র পরিচালকরা নির্মাণ করবেন 'মোদি মনীষীর জীবনচিত্র'! এইসব করতে কর্পোরেট সমর্থন লাগে। সেইজন্যেই হয়তো তাদের কিছু দাক্ষিণ্য বিতরণ!
মুসোলিনি আর একটি কথা বলেছিলেন 'এক অসামরিক নাগরিক এবং একজন সৈনিক, দু'জনেই অবিচ্ছেদ্য। অসামরিক বলে কিছু হয় না। সবাই সৈনিক অতএব প্রতিটি অসামরিক মানুষকে সৈনিক করে তুলতে চেয়েছেন মোদিভাই। এক নামি টিভি চ্যানেলের সমীক্ষা অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে মোদি জামানায় নেতাদেরে ঘৃণা ছড়ানোর ঘটনা বেড়েছে কয়েক ১০০ শতাংশ। ফলশ্রুতিতে আমাদের চোখের সামনে ঘটে গেছে #গৌরী_লঙ্কেশ, #কালবুর্গি, #দাভোলকার, #পানসারে, #আখলাক, #প্রদীপ_রাঠোর প্রমুখের হত্যা। মোদিরাজার বিরুদ্ধাচরণ করে কিছু বললে বা লিখলে শুরু হয়ে যাচ্ছে সোস্যাল মিডিয়ায় আক্রমণ। এইতো কদিন আগের নাসিরউদ্দিন শাহ থেকে চিত্রদ্বীপ সোমের ঘটনা। সেক্ষেত্রে নামি বেনামির কোনও ভেদ নেই। সবাইকে সমান মানসিক অত্যাচার। বিজেপি-র প্রভাবে সাধারণ মানুষ এখন সৈনিক! বিরুদ্ধে মত হলেই সে দেশদ্রোহী। অতএব তাকে পীড়ন, খতম করার দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়া যায়।
১৯৩৩ সালের প্রারম্ভে ন্যাশনাল সোশালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি, ডাক নামে যাদের নাৎসি বলা হতো, তাদের দুশ্চিন্তা ছিল, হাতে টাকা নেই ভোট লড়া হবে কেমন করে??? ২৭ জানুয়ারি হিটলার শিল্পপতিদের সামনে আড়াই ঘন্টা ধরে নাটুকে ভঙ্গিতে বক্তৃতা দেন। বিরতিহীন। ব্যস নাৎসি পার্টির কোষাগার ভরে উঠল। কারণ, শিল্পপতিরা বুঝে গেলেন এতদিনে এমন লোক পাওয়া গেছে, যে কমিউনিজমের বিপদ থেকে, ট্রেড ইউনিয়নের দাবি দেওয়ার হাত থেকে তাদের বাঁচাবে। কারণ, বক্তৃতায় হিটলার দুটি খুব দরকারি কথা শিল্পপতিদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন--- মশায়রা, আপনাদের মধ্যে যারা মনে করেন ন্যাশনাল সোশ্যালিস্টদের কোনও কিছু করার মুরোদ নেই, তারা নিজেদের ঠকাচ্ছেন। আমরা আজ না থাকলে জার্মানিতে বুর্জোয়া শ্রেণির কোনও অস্তিত্ব থাকত না। বলশেভিজম সব গ্রাস করে নিত। আমরাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি জার্মানির মাটি থেকে মার্কসিজমকে মূলসুদ্ধ উপড়ে ফেলবার। দ্বিতীয় যা বলেছিলেন--- আগামীদিনে জার্মানির প্রতিটি রাস্তা আমরা উদ্ধার করব জার্মানদের জন্য, আর কেউ থাকবে না। এই পাঠ নেওয়া মোদির কাছেও তাই যে কোনও রঙের কমিউনিজম, যে কোন অন্য দলের পতাকার সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শ সবচেয়ে বড় বিপদ। অন্যান্য দলগুলিকে খতম করতেই বিদেশ থেকে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র আসে। 'দেশপ্রেম' জাগাবার আস্ফালন করতে করতে বিজেপি-আর এস এস হিন্দুত্বের হুংকার ছোঁড়ে। মুসলমান,দলিত,তথা নীচু জাতিদের খতম করবার আহ্বান ছুঁড়ে দেয়। কখনও ঠারেঠোরে, কখনও খুল্লাম-খুল্লা বোঝাবার চেষ্টা করে ভারতবর্ষের প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি বাড়ি, প্রতি ইঞ্চি জমি হিন্দুদের, মোদিপন্থী হিন্দুদের বাকিরা কেটে পড়।
তবে অব দ্য রেকর্ডে মিথ্যা গুঁজে দেবার শিক্ষাটা গোয়েবলস এর থেকে নেওয়া--- 'যদি একটা বড়ো নির্জলা মিথ্যে বারবার বলতে থাক, বারবার, মানুষ ক্রমশ তা বিশ্বাস করবেই ততক্ষণ অবধিই এই মিথ্যে ধরে রাখা যাবে, যতক্ষণ রাষ্ট্র তার জনগণকে এই মিথ্যের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিণামের ধাক্কা বুঝতে দেবে না। এই জন্যই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে সর্বশক্তি দিয়ে দমন করা রাষ্ট্রের পক্ষে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সত্যের সঙ্গে মিথ্যার কাটাকাটির সম্পর্ক এবং সত্যই হল রাষ্টের সবথেকে বড়ো শত্রু।' অতএব আর কোনও উপায় নেই। এইজন্যই মোদিরাজাকে অর্থনীতি সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য--- পরিসংখ্যানের কাজে যুক্ত যেসব প্রতিষ্ঠান, তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করতে হয়। যে পরিসংখ্যান সরকারের অনুকুল নয়, তাকে চেপে দিতে হয়। সারা বিশ্বে সুনাম আছে যে সংস্থাগুলির তাদেরকে নিজেদের ভৃত্য বানাবার চেষ্টা করতে হয়! পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে বলার অপরাধে গ্যালিলিওর মুখ বন্ধ করতে চেয়েছিল স্বৈরাচারী 'সমাজপালক', এ ঘটনা তারই সমতুল্য। এ ঘটনা অভূতপূর্ব, অবৈজ্ঞানিক হলেও সেই মধ্যযুগীয় ব্যবস্থাতেই আস্থা রাখতে হয় 'চৌকিদার' নরেন্দ্র মোদিকে! বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে শতাধিক নামি অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সচেতন হবার ডাক দিলেও তা বধির রাজার কানে ঢোকে না। ক্ষমতা বজায় রাখতে এমনভাবেই গোয়েবলসীয় কায়দায়, সত্যের টুঁটি চেপে ধরে মিথ্যার প্রচার-প্রসার, দমন পীড়ন করে যেতেই হবে তাকে। কেউ কেউ বলেছেন, ভোটের আগেই আবার কিছু একটা সাজানো নাটক করতেই হবে মোদিজিকে। সে 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক' হতে পারে কিংবা আবার একটা 'সন্ত্রাসবাদীহানা' হতে পারে। মিথ্যা বজায় রেখে ভোট জিততে হবে যে!
তবে মোদি সাহেব একটা পাঠ নিতে ভুলে গেছেন সম্ভবত। সেই যে দাড়িওয়ালা জার্মান সাহেব, কার্ল মার্কস, কবেই বলেছেন, #ইতিহাসের_পুনরাভিনয়_হয়_ঠিকই, #কিন্তু_তা_হয়_প্রহসন_হিসাবে। দেশবাসী সেই প্রহসন দেখার অপেক্ষায়।