Saturday, February 24, 2024

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্দিকে জবরদস্তি দৃষ্টির রঙবদল চলছে। কালের পরিবর্তনে সমান্তরাল যুক্তি ও তত্ত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা আদর্শের পক্ষে অমিতাচারী স্বপ্নকথনকে প্রশ্রয় দেওয়া এখন সম্ভব। সময়, স্বদেশ, মনুষত্ব– কবি, কবিতা, কবিতার পাঠক — 'কে মুখোশ, কে মুখ এখন স্পষ্ট কিছু দেখা যায় না, কঠিন অসুখ সেরে গেলে যেরকম হয়'। তরুণ বয়স মানব জীবনের বিস্ময়কর সময়। তরুণরা আমাদের সব নির্ভরতার স্থল। তরুণরা পুরো পৃথিবীর মেরুদণ্ড। রবিঠাকুর বলেছিলেন, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।’ কিন্তু এই সন্ধিক্ষণে তরুণসমাজের ভাগ্যলিখন — বণিকতান্ত্রিক, সামন্ততান্ত্রিক, সাম্রাজ্যলােভীদের নিয়ন্ত্রণে। সম্প্রতি যুবসমাজের প্রতি তাকালে যথারীতি অবাক হতে হয়। দেশ ও জাতির কর্ণধার তরুণ সমাজ নৈতিক অবক্ষয়ের সাগরে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। তাদের নৈতিক কিংবা সামাজিক মূল্যবোধ নেই — ‘রাজা আমাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন,' এখনো ধনপ্রাণের যেটুকু বাকি সেটুকু রক্ষা করবার জন্যে আইন এবং চৌকিদারের ব্যবস্থাভার রইল আমার হাতে।' এদিকে আমাদের অন্নবস্ত্র, বিদ্যাবুদ্ধি বন্ধক রেখে কন্টাগত প্রাণে আমরা চৌকিদারের উর্দির খরচ জোগাচ্ছি। অন্ন নেই, বিদ্যা নেই, বৈদ্য নেই, পানের জল পাওয়া যায় পাঁক ছেঁকে, কিন্তু চৌকিদারের অভাব নই—।' (রবীন্দ্রনাথ - রাশিয়ার চিঠি, উপসংহার,২)

ধর্মীয় উন্মাদনা, ‘sacred madness’, সোজা ভাষায় প্রকাশ করতে গেলে — 'ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে, অন্ধ সে-জন মারে আর শুধু মরে' (রবীন্দ্রনাথ - ধর্মমোহ)।ধর্মসংস্কার লিওনার্দো বা গ্যালিলিওর মতাে বিজ্ঞানসাধকদের তপস্যা থেকে বিরত করাতে পারলাে না। সত্য নিষ্ঠায় অবিচ্ছিন্ন থেকে বিজ্ঞান মানুষকে সভ্যতার মুক্ত প্রবাহে, সংস্কারমুক্ত আলােকপ্রান্তরে এগিয়ে নিয়ে গেলাে। ধর্মের অন্ধত্ব মহাজাগতিক সারসত্যকে আবদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়ে বারবার বিজ্ঞানসাধকদের সাময়িক অত্যাচার, এমনকি প্রাণহানিতেও বিজ্ঞানের সারস্বত জয়ধারাকে রুদ্ধ করতে পারলাে না। ধর্ম যতদিন দুঃখী মানুষদের আশ্রয়দাতা, জীবনপথের পাশাপাশি চলা বন্ধ ততদিন ধর্ম সংক্রান্ত সংঘাত বা সংস্কার সভ্যতাকে আচ্ছন্ন করে না। কিন্তু বেঁচে থাকার সাহস যােগানাের বদলে ধর্ম যখন বেঁচে থাকার পথ রুদ্ধ করে মানুষকে অচলায়তনে আবদ্ধ করে তখনই সর্বনাশ সূচিত হয়। ধর্মতাত্ত্বিকদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় বারবার যেহেতু তারা ভুলে যায় রাস্তা কারাে একার নয়।

নাগরিকত্বের শর্তাবলী থেকে শুরু করে প্রজাতন্ত্রের ধরন পাল্টে গেছে। একতরফা শাসন প্রণালী, অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে তুলকালাম, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে বেলাগাম নির্লজ্জতার প্রতিমূর্তি। ক্রোনি পুঁজিবাদ, দুর্নীতি, আর্থিক বিপর্যয়ের দরুণ বিকাশের গালভরা বুলির আড়ালে ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে তার ভিটে মাটি থেকে উৎখাত ও স্থানান্তরিত । গভীরতর কৃষিসংকট, মাত্রাছাড়া কর্মহীনতা এবং ক্রমবর্ধমান বৈষম্য আর্থিক বৃদ্ধি মন্থর হয়েছে আর নিদারুণভাবে তার প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে। সংখ্যালঘু, দলিত ও সমস্ত ধরনের বিরোধী কণ্ঠস্বরের বিরুদ্ধে হামলা — অস্বস্তিকর প্রশ্নের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে জাতীয়তাবাদ বিরোধী তকমা এঁটে, তাকে দাঁড় করানো হচ্ছে দেশের সীমান্তে প্রহরারত সৈনিকদের আত্মত্যাগের বিরুদ্ধে। ধর্মীয় ও রাজনীতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতে সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সংঘাত ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মৌলিক সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়।

সাম্প্রতিক সময়গুলোতে প্রায় সর্বত্রই মূল্যবোধের চরম পতন ঘটছে। মানুষ স্বার্থের মোহে এমন কোনো মানবিক বিপর্যয় নেই যে ঘটাচ্ছে না। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের মাঝে অবিশ্বাস দানা বেধেছে। সামান্য কারণে একে ওপরকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। সর্বত্রই চলছে অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা। গুম, খুন, নির্যাতন, ধর্ষণ নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ তার পরিবারের কাছেও নিরাপদ থাকতে পারছে না। শুধু স্বার্থ আর সম্পদের প্রেমে পড়ে নয় - যে রাষ্ট্র তার জনগণকে নিরাপত্তা দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সেই রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় রাষ্ট্রীয় বাহিনী দ্বারাই শুধু রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে গুম, খুন ও অত্যাচারের মহড়া দেয়া হচ্ছে । আমাদের সমাজ,রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে সর্বগ্রাসী অবক্ষয় ও অনৈতিক পৈশাচিকতার বিস্তার যে ক্রমে অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ছে। এ থেকে উত্তরণের পথ পন্থা খুঁজে বের করার মূল দায়-দায়িত্ব সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর হলেও সমাজের কোনো সচেতন ও দায়িত্ববান মানুষই এ দায় এড়াতে পারেন না। দুর্নীতি ও সামাজিক-রাজনৈতিক অবক্ষয় মাত্রাহীন বিস্তৃতি লাভের পেছনে গত এক দশকের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা কতটা প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। সে বিতর্কে গিয়ে এই নিবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি না করাই শ্রেয় বলে মনে করি। শুধু এটুকুই বলতে পারি আইনস্টাইনের ভাষায় - 'বর্তমান যুগ বিশ্লেষণের যুগ। আগামী পৃথিবীকে তারাই চালাবে, যারা ভাবা প্র্যাকটিস করবে'।

আজকের দিনে মৌলবাদ ও চরমপন্থার যে দ্রুত উত্থান ঘটে চলেছে, পৃথিবীর এমন পরিবর্তন একদিনে ঘটেনি। বিশ্বাসের ভাইরাস ঘুণপোকার মতো ক্ষয় ধরিয়ে চলেছে আমাদের শুভবুদ্ধির ভিত্তিতে। তাইতো রাষ্ট্র তাঁর জনমানুষের সাথে কল্যানকামী গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ধর্মান্ধতাকে জাগ্রত করে দেশের মানুষদের ক্ষতি করছে। জ্ঞানের বিকাশ বা পরিবর্তনকে অস্বীকার করে মৌলবাদ।উদাহরণস্বরূপ-টলেমির সৌরধারণা (সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে) পরিবর্তন হয়ে এল গ্যালিলিও, কোপার্নিকাসের সৌরধারণা। এটাই জ্ঞানের অগ্রগতির ধারা বা গতিশীলতা। এই গতিশীলতাকে অস্বীকার ক’রে মৌলবাদীরা গ্যালিলিও, কোপার্নিকাসের ওপর আক্রমণ সংঘটিত করে। মৌলবাদ জ্ঞান-বিজ্ঞান, ঐতিহাসিক সত্যতাকেই অস্বীকার করে। 'ভাইরাসের থেকে মুক্তির পথ কিন্তু জমজমের পানি, খৃষ্টধর্মে দীক্ষার পবিত্র জল কিম্বা গঙ্গাজলে ধোওয়া নয়। যুক্তি ও শ্রেয়বোধের ইঁটে গাঁথা সে পথ ক্ষুরধার ও বন্ধুর। তাই সভ্যতা তার ব্যাপক প্রকৌশল ও পরিকাঠামোগত উন্নয়ন সত্ত্বেও বারবার চরমপন্থার ফাঁদে পড়ে। আজকের পৃথিবীতে একরূপে যেমন পাকিস্তান, সৌদি আরব, সিরিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় এর বিস্তার ঘটছে তেমনি আরেক রূপের চরমপন্থা উগান্ডা, ব্রাজিল, ভারত, রুশ ও মার্কিন দেশে গড়ে উঠছে। অন্ধ ধর্মীয় বা বর্ণ জাতীয়তাবাদ যেন ধর্মে বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের অধিকার থেকে শুরু করে জেন্ডার, প্রজনন বা সমকামিতার অধিকারের মত শত শত বছরের কষ্টার্জিত মানবাধিকারগুলোকে যেন নস্যাৎ করে দিতে চাইছে।'মৌলবাদী শক্তি একদিকে পুরাণ কাহিনী ও অন্যদিকে শরিয়তি বিধানকে অমোঘ ও চূড়ান্ত বলে মনে করে। যে ধর্মান্ধতার খেসারত মায়ানমার, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ দিচ্ছে আমরাও (ভারতবাসী) বিস্ময়করভাবে সেদিকেই যাচ্ছি। ধর্মান্ধতার পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছি। এর বড় উদহরণই বাবরি মসজিদ।

বেভেরিজ তুর্কি ভাষা থেকে ইংরেজিতে ‘বাবরনামা’র তর্জমা করেছেন ১৯২১ সালে। তাঁর তর্জমায়
মসজিদের বাইরের দেওয়ালে উৎকীর্ণ একটি লেখার উল্লেখ করা হয়েছে তা থেকে জানা যায়, মুঘল সম্রাট বাবরের আদেশে সেনাপতি মীর বাকী ১৫২৮–২৯ (৯৩৫ হিজরি বর্ষে) এ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এর সাড়ে তিনশ বছর পর ১৮৮৫ সালে মহন্ত রঘুবীর দাস যান ফৈজবাদ আদালতে। তিনিই প্রথম দাবি করেন, যে স্থানে বাবরি মসজিদ তৈরি করা হয়েছে, সেটি আদতে রাম জন্মভূমি। তবে আদালত সে মামলা খারিজ করে দেয়। এর কিছু বছর পর সে স্থানে রামের একটি মূর্তিও প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই জমি নিয়ে নানা পক্ষ একাধিকবার গিয়েছেন আদালতে। তবে, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদের কাঠামো ভেঙে ফেলে কয়েক হাজার মানুষ। আর তা ভাঙার জন্য উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল বিজেপির লালকৃষ্ণ আদভানি ও মুরলি মনোহর যোশীদের বিরুদ্ধে। আবারো আদাতল রায় দেয় যে, ওই স্থানে কোন মন্দির থাকার প্রমাণ না মিললেও প্রাচীন স্থাপনা ছিল৷ অন্যত্র মসজিদ নির্মাণের ব্যবস্থা করার নির্দেশনা দেয়া হয়৷ শুরু হয় রাম মন্দির নির্মাণযজ্ঞ৷ রাম মন্দির ভারতের সবচেয়ে দামী মন্দিরগুলির তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে নিয়েছে। এই মন্দির নির্মাণের জন্য মোট বরাদ্দ করা হয়েছে ১৮০০ কোটি টাকা। উদ্বোধনী ব্যয় শত কোটি টাকা৷ দান হিসেবেও এসেছে কয়েকশ কোটি টাকা৷ এর কাছাকাছি রয়েছে কেবলমাত্র গুজরাটের বিষ্ণু উমিয় ধামের মন্দির। যা তৈরিতে খরচ হয়েছে ১ হাজার কোটি টাকা। রাম ভক্তরা দাবী করছেন, প্রায় ৫০০ বছর পর রামলালা ঘরে ফিরলেন।

সমস্ত ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যকে অস্বীকার ক’রে
রাম চরিত্রের ঐতিহাসিক নিদর্শন বা ভিত্তি নিয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ থাকলেও, রামায়ণ একটি মহাকাব্য যা ধীরে ধীরে পল্লবিত হয়েছে অর্থাৎ যুগে যুগে অবয়বে বিস্তৃত হয়েছে৷ বিশেষজ্ঞদের মতে রামায়ণেও রয়েছে ভিন্নতা৷ তাই যুগে যুগে রামের দেবত্বগুণ নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন ৷ তবুও মানুষের অধিকার রয়েছে রামের পূজা-আরাধনা করার৷ ঐতিহাসিক তথ্যাদি আর প্রচলিত ধারণার মধ্যে মতোবিরোধ থাকাটা স্বাভাবিক। তাই সর্বপল্লী গোপাল, রোমিলা থাপার, বিপান চন্দ্র, হরবন্স মুখিয়া, সব্যসাচী ভট্টাচার্য প্রমুখ ঐতিহাসিকদের অভিমত,অযোধ্যা কি রামের জন্মভূমি? এই প্রশ্নের পাশাপাশি আর একটি প্রশ্ন-আজকের অযোধ্যা কি রামায়ণের অযোধ্যা? রামের কথা ও কাহিনির আদিগ্রন্থ ‘রামকথা’। যা আর এখন পাওয়া যায় না। বাল্মীকি এই রামকথাকেই দীর্ঘ মহাকাব্যিক কবিতার ছাঁচে পুনর্লিখিত করেন রামায়ণে। যেহেতু এটি একটি কবিতা এবং বর্ণিত ঘটনাগুলি হয়তো বা কবির কল্পনা, তাই যতক্ষণ না কোনও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রমাণাদি মেলে, ততক্ষণ কোনও ঐতিহাসিকের পক্ষে রামায়ণের চরিত্রগুলিকে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব রূপে বা ঘটনাস্থলগুলিকে ঐতিহাসিক স্থান রূপে গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। তাহলে কি সেখানে রাম মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ করারও কোন প্রমাণ নেই — কেবল হিন্দুত্ববাদ কায়েমের জন্য এক বয়ানের নাম রাম-মন্দির ইস্যু ?

আজ ভারতকে দেখে মনে হচ্ছে নিজের নাক কেটে মুসলিমদের যাত্রা ভঙ্গ করছে৷ ধর্মে আচ্ছন্ন থেকে ভারতের জাগরণ সম্ভব নয় — 'হেথায় আর্য, হেথা অনার্য,হেথায় দ্রাবিড়,চীন,শক-হুন-দল পাঠান মোগল এক দেহে হল লীন'।
নিজ দেশের ভিতরে ভারত ঘৃণার যে আবাদ করেছে তা আর নিজ দেশে সীমাবদ্ধ নেই৷ ভারতের ধর্মাচ্ছন্নতার ঢেউ আছড়ে পড়ছে প্রতিবেশি দেশেও৷ ধর্মান্ধতার মারাত্মক চাষী রাজনীতিবিদরাই৷ বোকা জনগণকে ধর্মের আফিম খাইয়ে দস্তুরমত চলছে উন্নয়ন বঞ্চনা ৷ ধর্ম নিয়ে মানুষের মধ্যে এক উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। আমার রিলিজিয়ন বেস্ট রিলিজিয়ন ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড। কিছু কিছু তো মারতে কাটতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। মুদ্দা কথা হলো ইগো কে একটু সাইডে রেখে যদি রাম নামের চরিত্রের গুণগুলো, যেসব তিনি প্রমোট করতেন। যদি ফলো করি আমাদের জীবন ট্রান্সফোর্ম অর্থাৎ পরিবর্তন হবে ঠিকই। গান্ধীজিও খুব বেশি রামভক্ত ছিলেন। কিন্তু আজকের দিনে রামের নাম 'খাতরে মে হ্যায়' — মুহ মে রাম...বগল মে নাতুরাম। এই কথা যেন সত্যিকারের হয়ে উঠছে। আমরা যদি রিপোর্টস দেখি তবে সমাজের কিছু চাপাবাজ লোক 'জয় শ্রীরাম' উচ্চারণ নিয়ে জোরজবরদস্তির খবর পাই — মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, কানপুর, উন্নআও, গাজিয়াবাদ, আসাম, দিল্লি সহ এইধরণের খবর দেশের কোনায় কোনায় পাওয়া যায়। এটা সত্য ভারতে হিন্দুত্ববাদ জাগরণে মুসলিম জঙ্গিবাদের ভূমিকা বিপুল৷ বিশ্বজুড়ে মুসলিম জঙ্গিদের তাণ্ডব হিন্দুত্ববাদকে শক্তি যুগিয়েছে৷ এমনকি আজ ইউরোপে উত্থিত ডানপন্থী চেতনার নেপথ্যেও মুসলিম জঙ্গিবাদের ভূমিকা পাওয়া যাবে৷ কিন্তু এটা কোনভাবেই মানা যায় না মৌলবাদ ও চরমপন্থা কল্যানকামী রাষ্ট্রের উদাহরণ হতে পারে। এর বিপরীতেই সূচনা করতে হবে নবজাগরণের৷

যুদ্ধ পরিস্থিতি : আন্তর্জাতিক সমীকরণ ও প্রজন্মের দায়ভার


বিশ্বে প্রতিদিন এমন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে যাদের জন্ম যুদ্ধের ময়দানে। সেই পাথরযুগের সূচনাকাল থেকেই মানুষকে পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। শুধু বেঁচে থাকা নয় যোগ্যতম হয়ে বাঁচার জন্য আদিমকাল থেকেই মানুষকে যুদ্ধ করতে হয়েছে। টিকে থাকার লড়াইয়ে গুহা থেকে শুরু করে সভ্যতার যুগে এসে যুদ্ধের ইতিহাস  মানব ইতিহাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় রয়েছে যুদ্ধের অনেক বিবরণ। এমনকি যুগে যুগে বিশ্বাসী মানুষের পথ প্ৰদৰ্শক হয়ে আসা; যারা মনে করেন পথ হারিয়েছে তাদের অন্ধকার পথে আলোকিত করা একটি মোমবাতি ; এই ধর্মগ্রন্থগুলোর কাহিনীর অন্যতম প্রধান উপজীব্য হলো যুদ্ধ ৷ সব মিলিয়ে আদিমকাল থেকে মানুষ যুদ্ধ করে আসছে।  কখনও কখনও এই যুদ্ধের কারণ হল বিজিত ভূমিতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, আবার কখনও তা ঘটে সাম্রাজ্য বিস্তারের কারণে। আজকের চেনাশোনা পৃথিবীটি অনেক অর্থেই ওই যুদ্ধের নির্মাণ। সেই সময় থেকে এই যুদ্ধ না ঘটলে ইতিহাসের ধারা অনেকটাই ভিন্ন খাতে বইত। বার্ট্রান্ড রাসেল ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, অস্ত্রের বদলে অস্ত্র দিয়ে সমস্যা সমাধান না করে মানুষ সমস্যা সৃষ্টিতেই পারদর্শী হয়ে উঠবে। সেই একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, জাতীয়তাবাদ নামক বন্দিত আদর্শটির মধ্যেই যে গভীর অসুখ, সেটাকে উপড়ে না ফেললে দুনিয়া অ-বাসযোগ্য হয়ে যাবে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বা এরিক মারিয়া রেমার্ক-এর মতো মার্কিন বা জার্মান ঔপন্যাসিক, বা তরুণ ব্রিটিশ কবি আইজ্যাক রোজেনবার্গ (যিনি যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা যান) সাহিত্যে দিয়ে গেলেন যুদ্ধদুনিয়ার ভয়ানক সব ছবি। তাঁরা নিশ্চয় জানতেন, ‘আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ কিংবা ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’-এর মতো বাক্যবন্ধ পরের শতাব্দীর সবচেয়ে সেরা প্রহসন হয়ে উঠবে?

সাম্রাজ্য বিস্তারের তাড়নাই কখনও মানুষকে এইভাবে অন্ধ করে তোলে যে ভুলে যায় সকল মানবীয় অনুভূতি। সাম্ৰাজ্য বিস্তারের মতো এমন শেষ না হওয়া  বাসনা যে কেবল অগণিত মানুষের মৃত্যু এবং দুঃখ-যন্ত্ৰণার কারণ হয়ে পড়ে তেমন নয়, ইহা কখনও বা এক আগ্রাসী সাম্রাজ্যের পতনের মুখ্য কারণও হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, মোগল সাম্ৰাজ্যের কথাই ধরুন ৷ ঔরংগজেবের আগ্রাসনী নীতিমালা মোগল সাম্ৰাজ্যকে এইভাবে আয়তনে বিশালকায় করে তুলেছিল যে তাঁর পরবৰ্তী কালের বাদশাহদের জন্য ইহা মাথার ব্যথাস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। ঔরংগজেবকে বেশিরভাগ সময় ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল দাক্ষিণাত্যের অধিকৃত ভূমির সুরক্ষা সুনিশ্চিতকরণে। মোগল সাম্ৰাজ্যের পতনের যুগ ঔরংগজেবের এই আগ্রাসনী মনোভাবই ধেয়ে এনেছিল বলে বহু ইতিহাসবিদ মত পোষণ করেন ।সংক্ষেপে, হিন্দু বিদ্বেষ এবং ঔরংগজেবের আক্রমণাত্মক ও যুদ্ধবাজ নীতি মুঘল সাম্রাজ্যকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়।

যদি ইতিহাসে যুদ্ধবাজ মানুষের একটা তালিকা প্রস্তুত করা হয় তবে অবশ্যই শীৰ্ষ পাঁচে নাম থাকবে এডলফ হিটলারের। নাৎসিদের গুণগত এবং শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী হিটলার নিজ জাতিকে যতটা ভালো পেয়েছিলেন তার ঠিক বিপরীতে সমানভাবে ঘৃণা ছিল অন্যদের প্রতি। এমনকি ইহুদি বিদ্বেষ ও সমাজতন্ত্র বিরোধিতায় নাৎসিরা নিজ জাতির বিরোধী পক্ষকেও নিস্তার দেয় নাই। প্রায় ষাট লাখ ইহুদিদের হিটলার হত্যা করলো হাসোয়া বা হলোকষ্টের নামে। এ হত্যাকান্ডও করা হয়েছে কেবল ধর্মের নামে। তৃতীয় রাইখের সময় বিনা অপরাধে লাখ লাখ জিউসকে বন্দীশিবিরে কৃতদাস বানায় হিটলার বাহিনি। একপর্যায়ে মালবাহি ট্রেনের বগিতে তুলে বধ্যভূমিতে নেয়া হতো জিউসদের। নেয়ার পথেই কষ্টে মারা যেতো অর্ধেক, বাকি অর্ধেককে হত্যা করা হতো সেখানে নিয়ে। একইভাবে ইতিহাসের পাতায় পাতায় হিটলার, মুসোলিনি, ঔরংগজেবের মতো অনেক মানুষ পাওয়া যায়। এর মধ্যে অবশ্য হারিয়ে যাননি সম্রাট অশোকও, পরাক্রমশালী অশোক, যিনি ২৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কলিঙ্গ যুদ্ধে বিজয়ের পর মৃতদেহের স্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আত্ম-উপলব্ধির নতুন আলোর পথ খুঁজে পান। অশোককে যুদ্ধের জন্য ক্ষুধার্ত একজন সাধারণ সম্রাট থেকে মানব ইতিহাসের অন্যতম সেরা সম্রাটে পরিণত করেছিল কিন্তু অশোক ছাড়া আর কতজন সম্রাট বা আজকের যুদ্ধ-উন্মাদ শাসক আত্ম-উপলব্ধির আলোর সাথে পরিচিত হয়েছেন তা নিয়ে অবশ্যই সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।

মানব ইতিহাসে যুদ্ধ নিয়ে লিখতে গেলে ইসরাইল-প্যালেস্টাইন তুমুল যুদ্ধের উল্লেখ করতেই হয়। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামাসের নির্বিচারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ১৫ জন নিরীহ ইসরায়েলি নাগরিক নিহত হওয়ার পর ইসরায়েল গাজা ষ্ট্ৰিপস্থিত হামাসের ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এরই মধ্যে হাজার হাজার প্যালেস্টাইনি সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছে। বর্তমান গাজা ষ্ট্ৰিপে গভীর মানবিক সংকট চলছে।  মানব ইতিহাসের আগের যেকোনো যুদ্ধের মতোই নিষ্পাপ শিশু ও নারীরা সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে এবং বর্তমানে করছে। গাজার হাসপাতালে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ৫০০ জন রোগী, আত্মীয়স্বজন ও চিকিৎসা কর্মী নিহত হয়েছেন। এই প্রসঙ্গে ইতিহাস কে মিথ্যা বলা যাবে না কিছু কথা যোগ করা খুবই জরুরি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের প্রয়োজনে দুর্লভ বোমা তৈরির কৃত্রিম ফসফরাস তৈরি করতে সক্ষম হন জিউস বিজ্ঞানী ড. হেইস বাইজম্যান। ফলশ্রতিতে আনন্দিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন - কি ধরনের পুরস্কার চান তিনি! জিউসপ্রেমিক বিজ্ঞানীর উত্তর ছিল - "অর্থ নয় - নারী নয় - বাড়ি নয়! আমার স্বজাতির হারানো ভূমি ফিরে পেতে চাই আমি"! বৃটেন প্রতিশ্রুতি দেয়, যিহোভা প্রদত্ত জিউস জাতির হারানো ভূমি ফিরিয়ে দেবেন তাদেরকে একদিন! ঐ প্রতিশ্রুতির ধরাবাহিকতায় ১৯৪৮ সনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৮১ নম্বর প্রস্তাব অনুসারে, ইসরাইল রাষ্ট্র গঠিত হয়। জাতিসংঘ তখন ৪৫% ভূমি ফিলিস্তিনিদের এবং ৫৫% ভূমি জিউসদের দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ পর্যন্ত পৃথিবীর ১৬১-টি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও, ৩১-টি মুসলিম রাষ্ট্র এখনো ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বে মেনে নেয়নি। ১৯৪৮ সনে তৌরাত বর্ণিত ‘যিহোবা’ প্রতিশ্রুত ইসরাইল নামক ইহুদী রাষ্ট্র পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলে, আরবদের সম্মিলিত মুসলিম বাহিনির সাথে জিউসদের যথাক্রমে ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সনে যুদ্ধ বাধে। তারা যুদ্ধ করে জিউস জাতি তথা ইসরাইল দেশকে পৃথিবী থেকে বিলোপ করে দিতে চাইছে।

ইতিমধ্যে আন্তরাষ্ট্ৰীয় মঞ্চে পেলেষ্টাইনের পক্ষে এবং ইজরাইলের পক্ষে কারা কথা বলছে তা এখন প্রায় স্পষ্ট। যুদ্ধের পেছনে পেছনে চলছে কূটনৈতিক ছায়াযুদ্ধও। বলাবাহুল্য, যেকোন একটা যুদ্ধের  সঙ্গে আরও বহু কথা জড়িত হয়ে থাকে। অস্ত্ৰ বেপারীদের স্বাৰ্থ, দেশের ঘরোয়া রাজনীতির স্বাৰ্থ ইত্যাদি ইত্যাদি। কখনও বা শাসক তার জনপ্রিয়তা উদ্ধারের আকাংক্ষায় এবং তার জন্য যুদ্ধসৃষ্ট তাৎক্ষণিক দেশপ্ৰেমের ইন্ধনকে সম্বল হিসেবে নেয়ার খবরও বিশেষভাবে চৰ্চিত হয়ে পড়ে। সেইজন্য বহু সময়ে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মাধ্যমে প্রচুর অৰ্থ, অস্ত্ৰ এবং মানব সম্পদের ব্যবহার হওয়া অনুশীলন যা আমাদের স্বচোক্ষে দেখানো হয় তা চূড়ান্ত সত্য না ও হতে পারে। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইসরায়েলের ওপর সাম্প্রতিক বিধ্বংসী হামাসের হামলা এবং ইসরায়েলের পাল্টা আক্রমণ এধরণের এমন অনেক সম্ভাবনাময় ঘটনা উদাহরণ স্বরূপ রয়েছে।  কিন্তু এই ধরনের আলোচনা ও সমীকরণের শেষে একটা সত্য আছে- এই সবের জন্য সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে নিষ্পাপ শিশু ও নারীরা।  হত্যাকারী জানে না কার ঘর ধ্বংস হয়েছে এবং কার জীবন কেড়ে নিয়েছে, মিসাইল কোনদিকে ছোড়ছে, বিনা কারণে যে প্রাণ হারাচ্ছে সে জানে না তার হত্যাকারী কে। আমরা যখন যুদ্ধ এবং মানুষের কথা বলি, তখন এটাই আমাদের হৃদয়ে আঘাত করে  অবশ্য, যদিও যুদ্ধ সংবেদনশীল মানুষের হৃদয়কে অশ্রুপাত করে, তবুও বিশ্ব যুদ্ধের কবল থেকে মুক্ত হবে এমন কোনো আশা নেই।  যুদ্ধ প্রতিরোধে আধুনিক মানুষের সমস্ত প্রচেষ্টা ইতিমধ্যেই বৃথা প্রমাণিত ।

লিগ অফ নেশ্যনস এর ব্যর্থতা যুদ্ধের ভারে ভারাক্রান্ত বিশ্বের বৃহৎ শক্তিদের দ্বারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের জন্ম হয়।  কিন্তু জাতিসংঘ কি যুদ্ধ বন্ধে সফল হয়েছে? জাতিসংঘ কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিধর দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদী চাওয়া-পাওয়া মোকাবেলা করতে পেরেছে? পারে নাই। অস্ত্রশিল্পের বিশ্বায়ন খুলে দিল সামরিক প্রযুক্তির বিপ্লবের রাস্তা। পক্ষ-বিপক্ষ নির্বিশেষে মহামানবতীরের সর্বত্র যুদ্ধকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অনায়াসে। ইজরায়েল থেকে ইউক্রেন, আল্পস থেকে সাহারা, লিবিয়া থেকে ফিজি,
নিশ্চিন্ত প্রাত্যহিকতার মধ্যেই বিছিয়ে দেয়া হচ্ছে যুদ্ধের মারণ। মানুষের নিষ্ঠুরতা কত আন্তর্জাতিক, বিশ্বায়নের নতুন প্রজন্ম জিভ টেনে ধরবে না তো....!

Thursday, December 14, 2023

খাদ্য তালিকায় মেইন মেনু 'বিষ সেবন'


ভারতবর্ষ মূলত বহুফসলী কৃষি ব্যবস্থা। ভারতীয় অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি- শিক্ষা - গবেষণার ক্ষেত্রে বিকাশের সাথে সাথে কৃষি আধুনিকীকরণের ধরণেও এসেছে দ্রুত পরিবর্তন। অধিক শস্য উৎপাদন প্রক্রিয়াতে আধুনিক যন্ত্র-পাতি, বীজ এবং রসায়নিক সারের ব্যবহার এক অপ্রতিরোধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।  কৃষি আধুনিকায়ন বিশ্বে খাদ্য ঘাটতি অনেকাংশে কমিয়েছে।  তবে একই সঙ্গে অধিক ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার মানবজীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। বিশ্বে বহু দেশে রাসায়নিক সারের ভয়াবহতা লক্ষ্য করে প্ৰাকৃতিক কৃষির ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে যদিও আমাদের দেশে অধিক শস্য উৎপাদনের নামে ব্যাপক হারে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। রোজকার খাদ্যের নামে দৈনিক বিষাক্ত রাসায়নিক বিষ কিছু হলেও আমরা ভক্ষণ করে চলছি। দেশের সঙ্গে তালমিলিয়ে আমাদের রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষকেরা উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অধিক শস্য উৎপাদনের, উপাৰ্জনের আকাংক্ষায় সার ও কীটনাশকের ব্যাপক প্রয়োগের সাথে বাণিজ্যিক কৃষিতে মনোনিবেশ করেছেন। বাজারে এখন প্রধান খাদ্য শস্যের পাশাপাশি বাজারে উঠা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক শাকসবজি এবং ফল ফসালিও।

বেশি ফলনের আশায় অনেক কৃষক মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার করায় উৎপাদিত সবজি ও ফল খাওয়ার  অনুপোযোগী এবং অযোগ্য হয়ে পড়েছে।  বাজার থেকে কেনা সবজি ও ফল বাড়িতে আনার পর রাতারাতি পচে যাওয়া এখন একটি সাধারণ ঘটনা।  প্রকৃতপক্ষে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার কৃষি খাদ্যকে সংরক্ষণের অনুপযোগী করে তুলছে।  আসামে উৎপাদিত শাকসবজিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে প্রতিবেশী দেশ ভুটান ইতিমধ্যে আসাম থেকে এ ধরনের খাদ্য সামগ্রী আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে।  আসামে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ভুটানের বয়কট সত্ত্বেও, আমাদের বাজার থেকে চড়া দামে এই ধরনের সবজি কিনে খেতে হয়।  কীটনাশক বা অন্যান্য রাসায়নিক প্রয়োগ-পরবর্তী পর্যায়ে উদ্ভিদের দেহ, মাটি, জল বা খাদ্য শৃঙ্খলে থেকে যাওয়া অবশিষ্টাংশ মৃত্যুদূত হয়ে উঠেছে।  এই পদার্থগুলি মাটিতে সংঘটিত বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে মাটির উর্বরতা এবং উৎপাদনশীলতাকে পরিবর্তন ঘটাতে সাহায্য করছে।

ষাটের দশকে দেশের কৃষিখণ্ডে সবুজ বিপ্লব আরম্ভ হয়। সবুজ বিপ্লবের ফলে পাঞ্জাব কৃষিক্ষেত্ৰে দেশের মোট কীটনাশক এবং ভারতীয় কৃষিখণ্ডে নতুন জলসিঞ্চন পদ্ধতি, আধুনিক যন্ত্রপাতি, হাইব্রিড বীজ, রাসায়নিক সার এবং বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার সহজলভ্য হয়ে যায়। ইহার সাথে সাথে দেশে বৃদ্ধি পায় মধুমেহ, কৰ্কট রোগ, টিউমার, কিডনী বিকল আদি রোগীর সংখ্যা। দেশের ভূভাগের ১.৫ শতাংশ প্রথমসারিতে থাকা রাজ্যে রাসায়নিক সারের ১৫-১৮ শতাংশ ব্যবহার করা হয়। যার ফলস্বরূপ পঞ্জাব প্রদেশে বিশেষ করে কৰ্কট রোগীর সংখ্যা অভাবনীয়ভাবে বাড়তে থাকে। একইভাবে কিডনী বিকল, মৃত সন্তান জন্ম, জন্মতে শারীরিক বিসংগতি আদি সমস্যাই পঞ্জাবের জনসাধারণকে যথেষ্ট আক্রান্ত করেছে। ১৯৮১ সনে ‘কালরা এবং চাওলা' পঞ্জাবে কিছু পরিমাণে মাতৃদুগ্ধের নমুনা পরীক্ষা করেছিলেন। সেই সময়ে মাতৃ দুগ্ধের নমুনায় গড় হিসেবে ১.৪ পি পি এম, ১০২.২ ডি ডি টি এবং ১.২৫ পি পি এম, ২৭.৫২ পি পি এম বি এইচ সির অবশিষ্ট ধরা পড়ে।গুরুত্বপূৰ্ণ কথাটি হলো এই পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্থির করে দেয়া নিরাপদ সীমা থেকে দশগুণ বেশি। World Congress of Cardiology-র তথ্যমতে ২০২০ সনে ভারতবৰ্ষে মৃত্যু হওয়া লোকের ভিতরে ৪০ শতাংশ পালমোনারি এবং হৃদযন্ত্র সম্বন্ধীয় রোগী। ভারতবৰ্ষে বর্তমান আঠ কোটি থেকে অধিক লোক মধুমেহ রোগের কবলে। তদুপরি ভারতবৰ্ষে প্ৰতি দশজনের ভিতরে একজন কিডনী রোগী। Indian Diabetic Association-র তথ্য অনুসারে ইহার প্ৰধান কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত হারে কৃষিতে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের ব্যবহার। আমাদের রাজ্যেও অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে কৰ্কট রোগীর সংখ্যা, প্রায় প্রতিজন মানুষের গেসের সমস্যা, মধুমেহ রোগের প্রাদুর্ভাব, কিডনী, পাকস্থলীতে পাথর, কিডনী বিকল, শ্বাসকষ্ট এবং স্কিন ইনফেকশনের মতো রোগ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

স্বাস্থ্যের পক্ষে প্রচণ্ড হুমকিস্বরূপ হওয়ার জন্য মোট ২৮ ধরণের রাসায়নিক কীটনাশক উৎপাদন, আমদানি এবং ব্যবহার কেন্দ্ৰীয় সরকার বন্ধ করেছিল। কিন্তু নিষিদ্ধঘোষিত  এইধরণের কীটনাশকের বেশ কিছু ধরণসম্প্ৰতি অসমে ব্যবহার এখনও পর্যন্ত চলছে। গেমেক্সিড, অক্সিটাস্কিন, এণ্ড্ৰোসালফেন, ডিডিটি, এলড্রিন, নাইট্ৰোফেন, কার্বোফুরান মিথাইল ১২.৫ শতাংশ, এল মিথাইল ২৪ শতাংশ, ফর্মুলেশ এবং ফসফামিডন ৮৫ শতাংশ, এস এল-র মতো কীটনাশক নিষিদ্ধ স্বত্বেয় অসম তথা দেশের কৃষিখণ্ডে  নির্বিবাদে ব্যবহার হয়ে আসছে। ডি ডি টির বিষক্রিয়া মানব শরীরে বহু বছর ধরে থাকে। সেই আমেরিকাই ১৯৭২ সন থেকে ডি ডি টির বিরূদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ডি ডি টির বিষক্ৰিয়ার ফলে জনসাধারণের কৰ্কট রোগ, টিউমার, স্নায়ুবিক সমস্যার  সাথে সাথে গর্ভস্থ শিশু স্নায়ুবিক, মানসিক তথা শারীরিক বিসংগতি নিয়ে জন্ম হতে পারে। সেইভাবে অক্সিটাস্কিন ব্যবহার করার ফলে কম সময়ের মধ্যে সবজির আকার বেড়ে যায়, এইধরণের সবজি  খাওয়ার ফলে মানব শরীরে কৰ্কট রোগ হওয়ার সাথে সাথে অন্যান্য শারীরিক বিসংগতি দেখা দেয় বলে তথ্যে প্ৰকাশ। একইভাবে রাষ্ট্ৰসংঘের দ্বারা পরিচালিত গ্লোবেলি হারমোনাইজড সিষ্টেম অব্ ক্লাসিফিকেশ্যন এণ্ড লেবেলিং অব্ কেমিকেলস (জি এইচ এস) নামের আন্তরাষ্ট্রীয় সংস্থা ফর্মেল ডি-হাইড বা ফর্মেলিনকে ‘ডেঞ্জার’ বা ‘বিপদসংকুল’ শ্ৰেণীতে রেখেছে। মৃত জীব গলেপঁচে যাতে না যায় সেইজন্য ফর্মেলিন ব্যবহার করা হয়। জীবিত প্ৰাণী এই ফর্মেলিনকে গ্ৰহণ করলে বিস্তর ক্ষতির সন্মুখীন হবে।

প্রাকৃতিকভাবে আমাদের রক্তে ০.১ মিলিমোলার ফৰ্মেলিন থাকে। রক্তে এই মাত্ৰা থেকে অধিক ফর্মেলিনের উপস্থিতি অ্যাসিডোসিস নামের একধরনের রোগের সৃষ্টি করে রোগীর মৃত্যুপর্যন্ত ঘটাতে পারে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে মাত্র ৩৩৩ পি পি এম ফৰ্মেলিন দেয়া ইঁদুর মাত্র দুঘণ্টা জীবিত অবস্থায় থাকতে পারে। ফৰ্মেলিন মানুষের কিডনী বিকল করার ক্ষমতা থাকার সঙ্গে জীবের কোষে থাকা ডি এন এনের সঙ্গে সংযোজিত হয়ে মানুষের রোগ প্ৰতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই বিলুপ্ত করে ফেলে। মানুষের দেহে ক্যানসার সৃষ্টিতে ইহার অবদান অপরিসীম। ১৯৯৫ সনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীনে ইণ্টারনেশ্যনাল এজেন্সি ফোর রিসাৰ্চ অন ক্যানসার (আই এ আর সি) ফৰ্মেলডিহাইডকে মানব শরীরে ক্যানসার সৃষ্টি করার যৌগ হিসেবে শ্রেণী বিভাজন করে। ফরমাল ডাইহাইড্রোজেন নাক সহ বিভিন্ন অঙ্গে তথা রক্তের ক্যান্সারের জন্যও দায়ী বলে জানা যায়। ২০১১ সনে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্ৰের নেশ্যনেল টক্সিকোলজী প্ৰগ্রামও ফর্মেলিনকে মানব ক্যান্সারের সৃষ্টিকারী যৌগ হিসেবে চিহ্নিত করে।

এখন ভয়ংকর কথাটি হলো, খাদ্য সংরক্ষণের নামে বহু ব্যবসায়ী এই ফৰ্মেলিনের ব্যাপক হারে ব্যবহার করে থাকেন। আমদানীকৃত অর্থাৎ চালানী মাছ, ফল-মূল, পেকেট খাদ্য ইত্যাদিতে ইহার ব্যবহার যথেষ্ট। অন্ধ্র প্রদেশ, কানপুর, ঝাড়খণ্ড এসব থেকে আমদানিকৃত ফর্মেলিন দেয়া মাছ আমরা নিত্যদিনে খেয়ে আসছি। স্থানীয় মাছের বাজারেও ফৰ্মেলিন, ইউরিয়া গ্ৰাস করে নিয়েছে।পরিতাপের কথাটি হলো ,আমরা এর বিষাক্ত মাত্রা সম্পর্কে সচেতন নই। আমরা হয়তো বুঝতে পারছি না যে ফরমালিন নামক এই বিষ আমাদের ধাপে ধাপে মৃত্যুর গহ্বরে নিয়ে যাচ্ছে। লক্ষণীয়ভাবে এতোসব বোঝার পরেও আমরা সচেতনতা অবলম্বন করতে বিমুখ। শুধু ফর্মেলিনই নয়, ফলমূল পাকাবর জন্য ব্যবহৃত কার্বাইড, বিভিন্ন খাদ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত নাইট্রাইট, সালফাইড, বিউটাইলস, বিউটাইল হাইড্রক্সি, এনাইসোল আদি রাসায়নিক যৌগও শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকারক। খাদ্য সামগ্রীতে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্ৰকারের ফুড কালার শরীরের জন্য তেমনি মারাত্মক। আমাদের সংখ্যাগরিষ্ট কৃষক উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অধিক উপাৰ্জনের আকাংক্ষায় সার-কীটনাশকের ব্যাপক প্রয়োগে বাণিজ্যিক কৃষিকার্যে গুরুত্ব আরোপ করার ফলে এখন বাজার স্বাস্থ্যের জন্য অতি ক্ষতিকারক খাদ্য, শাকসবজি, ফল-মূলে ভরে রয়েছে। এইধরণের পরিস্থিতিতে আমাদের কৃষকদের প্রাকৃতিক কৃষির প্ৰতি সচেতন করানো যথেষ্ট জরুরী।

কৃষিকাৰ্যে লাভবান হতে হলে কৃষককে বাণিজ্যিক কৃষিতে গুরুত্ব দিতেই হবে। কিন্তু কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ মানে যে শুধু ব্যাপক হারে সার এবং কীটনাশক প্রয়োগ নয়, সেই কথা প্রতিজন কৃষককে জানানো উচিত। কৃষিক্ষেত্রে অধিক উৎপাদনের জন্য কৃষককে বিজ্ঞানসন্মত আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করাতে হবে ঠিকই, কিন্তু এর সাথে এটাই লক্ষ্য রাখতে হবে যে এইভাবে কৃষি সম্প্রসারণ করতে খাদ্যের পরিবৰ্তে বিষ উৎপাদন যাতে নাহয়। কেন্দ্রীয় সরকারের নিষিদ্ধ থাকা ২৮ ধরণের কীটনাশক আমাদের রাজ্যে কিভাবে অবাধ প্ৰচলন হয়ে আছে তা রাজ্য সরকার তথা সংশ্লিষ্ট বিভাগ অনুসন্ধান করে সম্পূর্ণ বন্ধ করার আহ্বান জানাই৷ ফর্মেলিনযুক্ত মাছের ক্ষেত্ৰে সরকারের স্থিতি এখনও স্পষ্ট নয়। আমাদের কৃষকদের মধ্যে এইক্ষেত্ৰে সজাগতা সৃষ্টি করার জন্য কৃষি বিভাগকে অগ্রণী ভূমিকা নেয়া উচিত। কেবল গুয়াহাটীতে একদিনের জন্য প্ৰাকৃতিক কৃষি সন্মিলন অনুষ্ঠিত করলেই হবে না, প্রকৃতপক্ষে, এই ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচী কৃষি এলাকায় পরিচালনা করা প্রয়োজন। প্রাকৃতিক কৃষি তথা জৈবিক কৃষি পদ্ধতিতেও যে কৃষকগণ লাভবান হতে পারবেন, সেই কথা কৃষক সমাজে অবগত করে এমন ধরণের মানব স্বাস্থ্যসন্মত বিকল্প কৃষি ব্যবস্থাকে জনপ্ৰিয় করতে পারলেই রাসায়নিক সার ও কীটনাশক সৃষ্ট এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। কৃষি বিভাগ রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের পরিবৰ্তে কৃষককে জৈবিক সার এবং প্ৰাকৃতিকভাবে প্ৰস্তুত করা কীটনাশক পর্যাপ্ত পরিমাণে যোগানের ব্যবস্থা করলে রাজ্যের কৃষকগণ প্রাকৃতিক তথা জৈবিক কৃষি পদ্ধতির প্ৰতি আকৰ্ষিত না হওয়ার কোন কারণই থাকবে না।
 দৈনিক নববার্তা ১৪-১২-২০২৩

Tuesday, November 7, 2023

মলয় রায়চৌধুরী : বাংলা সাহিত্যের 'হাংরি' লেখক


'হাংরি' বলতে 'ক্ষুধার্ত' বোঝায় না। হাংরি শব্দটা IN THE SOWRE HUNGRY TYME থেকে নেয়া; অর্থাৎ পচনরত কালখণ্ডকে হাংরি বলা হয়। - মলয় রায়চৌধুরী

হাংরিয়ালিস্ট মলয় রায় চৌধুরী আর নেই। ২৬ অক্টোবর ২০২৩-এ প্রয়াত হলেন হাংরি আন্দোলনের আর এক প্রবক্তা ও পুরোধা কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক মলয় রায়চৌধুরী। মলয় রায় চৌধুরী ফেসবুকেও ছিলেন, বয়স হয়েছিল বেশ কিন্তু ছিলেন সক্রিয়। তাঁর জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৯ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের ছাতনায়। তবে আশৈশব তাঁর বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা সবই বিহারের পাটনা শহরে। ১৯৬১ সালে তাঁর দাদা কবি সমীর রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও দেবী রায়ের সঙ্গে তিনি হাংরি আন্দোলনের ম্যানিফেস্টো তৈরি করেন এবং ওই আন্দোলনের সূচনা করেন। কিছুদিনের মধ্যেই এই আন্দোলনে যোগ দেন বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, ফাল্গুনী রায়, সুবিমল বসাক, বাসুদেব দাশগুপ্ত প্রমুখ কবি-লেখকরা। বছর চারেক পরে এই আন্দোলন ভেঙে যায়। তার আগেই অবশ্য বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, দেবী রায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু এই আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছিলেন।

১৯৬৪ সালে হাংরি বুলেটিনে মলয় রায়চৌধুরীর 'প্রচণ্ড বৈদুতিক ছুতার' কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার পরই অশ্লীলতার অভিযোগে তিনি গ্রেফতার হন। প্রায় তিন বছর ধরে চলেছিল সেই মামলা। নিম্ন আদালতে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা ঘোষণা করা হলেও, ১৯৬৭ সালে উচ্চ আদালতে তিনি অভিযোগ থেকে মুক্তি পান। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তরুণ সান্যাল, জ্যোতির্ময় দত্ত প্রমুখ তাঁর পক্ষে সাক্ষী দিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, মলয় রায়চৌধুরীর পক্ষে সাক্ষী দিলেও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হাংরি আন্দোলনকে সমর্থন করেননি। 'মলয় রায়চৌধুরীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'শয়তানের মুখ' প্রকাশিত হয়েছিল কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে ১৯৬৩ সালে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকেই মলয় তাঁর নিজস্ব বাচনভঙ্গি তৈরি করে নিয়েছিলেন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে বাংলা কবিতার প্রথাগত ধারা থেকে তিনি বেরোতে চেয়েছিলেন। তাঁর লেখায় তিনি যৌনতার সঙ্গে মিশিয়েছিলেন ব্যঙ্গ, আত্মপরিহাস ও মানুষের অসহায়তাকে'।

প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার কারণে তিনি ষাটের দশক থেকেই বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। তবে বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি। পরবর্তী সময়ে সাহিত্যে উত্তর-আধুনিকতাবাদ -এর চর্চাও করেন। অধুনান্তিক সাহিত্যচর্চা নিয়ে তাঁর দাদা সমীর রায়চৌধুরীও লেখালেখি করেছেন। মলয় রায়চৌধুরীর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে 'শয়তানের মুখ', 'জখম', 'আমার অমীমাংসিত শুভা', 'মেধার বাতানুকূল ঘুঙুর', 'চিৎকারসমগ্র', 'মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো' ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। নব্বইয়ের দশকে প্রকাশিত হয় তাঁর উপন্যাস 'ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস' এবং এবছরই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সাম্প্রতিক উপন্যাস 'গহ্বরযান'। তিনি অনুবাদ করেছেন উইলিয়াম ব্লেক, জাঁ ককতো, অ্যালেন গিন্সবার্গ, পাবলো নেরুদা, লোরকা প্রমুখের রচনা।

একটা সলজ্জ স্বীকারোক্তি দিই। গ্রেজুয়েশন করার সময়ে  কে যেন পড়তে দিয়েছিল 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'। প্রথমে ক্যাজুয়ালি এমনিই পড়েছি- যে বৈদ্যুতিক ঝটকা লেগেছে। আবার পড়েছি, আবার পড়েছি। পরে তো হাংরিদের সম্পর্কে পড়েছি, বই কিনেছি, পড়েছি। কিন্তু প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার- আহ, সত্যিই এইরকম একটা কবিতা যদি লিখে যেতে পারতাম, মরে গেলেও বলতে পারতাম একটা কিছু লিখে মরেছি। কবিতাটার জন্যে মলয় রায় চৌধুরীর সাজা হয়েছিল কোলকাতার একটা আদালতে। হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত হয়েছিল কবিতাটি, বুলেটিনের সাথে জড়িত অনেকেরই সাজা হয়েছিল। কি ওদের অপরাধ? ওদের অপরাধ নাকি ছিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, অশ্লীলতা, তরুণ সমাজকে বিপথগামী করা ইত্যাদি। এইটা ছিল কবিতা লেখার জন্যে মলয় রায় চৌধুরীর প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় পুরস্কার। 

ফেসবুকে উনার ফ্রেন্ড লিস্টে থাকার সুবাদে কথোপকথন হতো। আমাদের 'মননভূমি' লিটলম্যাগ-এ কবিতাও দিয়েছেন। কথোপকথনে হঠাৎ একদিন ইমেলে পাঠিয়ে দিলেন 'অ্যালেন গিন্সবার্গ-এর কবিতা ‘বাস্তব সিংহ’: অনুবাদ মলয় রায়চৌধুরী'। এছাড়াও আরও পাঠিয়ে ছিলেন আমাকে পড়ার জন্য - জন্ম ও যোনীর ইতিহাস, গহ্বরযান, প্যারিস স্প্লিন: শার্ল বদল্যার অনুবাদ মলয় রায়চৌধুরী সহ অন্যান্য। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত ‘Modern And Postmodern Poetry Of The Millenium’ সংকলনে দক্ষিণ এশিয়া থেকে অন্তর্ভুক্ত এইটিই একমাত্র কবিতা বলে ভূমিকায় জানিয়েছেন সম্পাদক জেরোম রোদেনবার্গ। হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে The Hungryalists নামে ২০১৮ সালে একটি বই লিখেছেন মৈত্রেয়ী ভট্টাচার্য চৌধুরী । মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটিকে অধ্যাপক শীতল চৌধুরী বলেছেন এটি বাংলা সাহিত্যে একটি সার্থক ও গুরুত্বপূর্ণ কবিতা।

কবিতার সমস্ত রেখাচিত্র ভেঙে দিয়ে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন তিনি। এই  ক্ষুধার্ত প্রজন্মের কবিতা বাংলা কবিতার দিকচিহ্ন শুধু নয় এক  উজ্জ্বল স্তম্ভ। 'মা, তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ?/তাহলে আমি দুকোটি আলোকবর্ষ ঈশ্বরের পোঁদে চুমু খেতুম'—প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার আওয়াজ তুলে  মলয় রায়চৌধুরীই প্রথম বাংলা সংস্কৃতিতে বিকল্প এক রাস্তার সন্ধান দিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠান বিরোধী  বিশ্বাস হল এটাই  যা  সমাজের প্রচলিত সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নীতির বিরোধিতা করে এবং সামষ্টিক  মানুষের শুভবোধের কথা বলে । এই  আওয়াজ  বহু পরে অন্যান্য দেশে প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন চোখে পড়ে । যেমন প্যারিসের ছাত্র আন্দোলন । কী হয় কবিতা লিখে ? এই প্রশ্ন মাঝেমাঝে  আমাদের বিভ্রান্ত করে। কিন্তু এ কথা সত্য যে কবিতার চেয়ে ধারালো অস্ত্র পৃথিবীতে আর কিছু নেই। হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে তা যেমন প্রমাণিত হয়েছে।  সারা পৃথিবীর বিভিন্ন শাসকবিরোধী অবস্থানে কবিদের নেমে আসা আক্রমণ এই সত্যকেই প্রমাণ করে। শুধু কবিতার জন্য যদি এত অত্যাচার নেমে আসে তাহলে বোঝা যায় কবিতার শক্তিমত্ততা।

 'পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মারামারি, হানাহানি ও আধিপত্যবাদের কালোছায়ার পাশাপাশি জঙ্গিবাদের ভয়াল থাবার আতঙ্কে আতঙ্কিত বিশ্ববাসী। পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষ চায় স্বাধীনতা ও মুক্তবিশ্ব। স্বভাবতই পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষী কবিদের হাতে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের কবিতা হয়ে উঠছে আরও শানিত। কবিতা প্রেমের, কবিতা দ্রোহের, কবিতা ভালোবাসার। কবিতা প্রতিবাদের। আমরা নিশ্চিত যে কবিতার সবর্গ্রাহ্য কোনো সংজ্ঞা নেই, অথবা কবিতাকে কোনো সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়।' বাংলা কবিতার  চির বিতর্কিত কিংবদন্তি আপনি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অনস্বীকার্য নাম হিসেবেই উচ্চারিত হবেন মলয় রায়চৌধুরী। তবু, ‘ওঃ মলয়’, আপনার মৃত্যু - ‘কল্কাতাকে আর্দ্র ও পিচ্ছিল বরাঙ্গের মিছিল মনে হচ্ছে আজ...’। মনে হচ্ছে- বাংলা সাহিত্যের একটা কালপর্বের শেষ হলো- এন্ড অব দ্যা ইরা।

Tuesday, October 31, 2023

আলোচনা 'হাইফেন' গল্প - শঙ্কু চক্রবর্তী


যৌনতা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি৷ সমলিঙ্গে হোক বা বিপরীত লিঙ্গ, যৌনতার প্রতি আকর্ষণ মানুষ মাত্রই থাকবে৷ এই ধারণাই বেশিরভাগ মানুষ পোষণ করেন৷ কিন্তু এর বাইরেও রয়েছে আরও একটি শব্দ৷ অযৌনতা বা এসেক্সুয়ালিটি। কোনও রোগ বা প্রবৃত্তি নয়, LGBT+-র একটি প্রকারভেদ।

'হাইফেন' আমরা সাধারণত বুঝি - 'একটি বিরাম চিহ্ন যা শব্দগুলিকে যুক্ত করতে এবং একটি একক শব্দের সিলেবল আলাদা করতে ব্যবহৃত হয়'। তো এই শব্দকে নামকরণ করেছেন লেখক শঙ্কু চক্রবর্তী  তাঁর গল্পের (হাইফেন)। গল্পের প্রতিটা অংশ অসাধারণ শব্দ বুননে তৈরি।শুরুর দিকে প্রচন্ড রিচুয়াল ফেমিলি যে নিজের মেয়ের বিয়ে নিয়ে মেট্রিমনি থেকে শুরু করে হাঁসের সঙ্গে বিয়ে। মাঙ্গলিক দোষ কাটিয়ে পেয়েছেন - 'জামাই আমার সোনার ছেলে'। সামাজিক কায়দার বহির্ভূত তো নয়, বিয়ে মানে শুধুই নাতির মুখ দেখা।  উৎসুক, পরিবার থেকে নিকটাত্মীয়ের ক্যাটাগরি। তাই পারমিতা কবে মা হচ্ছে ওর পেট খুদতে অস্থির ঠাম্মা থেকে দিদারা।

গল্পটা যতবারই পড়েছি 'তুমি সুখ যদি নাহি পাও,যাও, সুখের সন্ধানে যাও' এই লাইন বারবার মনে আসতে থাকে। পারমিতা আর অর্ণব ইঞ্জিনিয়ার হলেও রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস সাংঘাতিক টুইস্ট। ইন্ট্রোভার্ট একটা মানুষের সাথে পারমিতা, যে সারাক্ষণ বকবক করতে পারে। বুঝাতে চেয়েছে অর্ণবকে কাপোলরা শুধু একছাদের তলায় থাকা নয়, সেক্স ও জরুরি, উই আর লিগেলি হাজবেন্ড এন্ড ওয়াইফ। কিন্তু অর্ণবের কথা কি ফেলা যায়, বিয়েতে সেক্স নির্ভর 'লিগেলাইজড প্রস্টিটিউশনস'। সেই জায়গায় গল্প বলছে অর্ণব অন্য কিছু বলতে চাইছে যা পারমিতা বুঝতে পারছে না।

'সেক্স' মানুষের দৈনিক চাহিদা। শরীরের অন্যান্য চাহিদার মতো এটাই একটা। মূলত আমরাই এটাকে কনজারভেটিভ করে ফেলেছি। সেজন্য পর্যাপ্ত যৌন শিক্ষারও প্রয়োজন। সেক্সুয়েল ওরিয়েন্টেশনের বাইরেও তো থাকা যায়। যেটা অর্ণব চাইছিল। পরিবারের ভয়ে ডিভোর্স দিতে পারছে না। আর অন্যদিকে পারমিতার জন্যও তার মন খারাপ। কিন্তু এই মন খারাপের মাঝে অর্ণব পরিচয় করিয়ে দেয় টার্কিস ছেলে সেলিমের সঙ্গে পারমিতাকে। সম্পর্কের ডানা মেলে ঠোঁটে ঠোঁট ঘনত্ব বেড়ে যায় বেডরুম পর্যন্ত -
'Down the way
Where the nights are gay
And the sun shines daily on the mountaintop'। এখানেই একটা কিন্তু থেকে যায়, অর্ণব কোন প্রেক্ষিতে পারমিতার জীবন নিয়ে খেললো। তাঁর মেইল ইগোর জন্য ?

নারী ও পুরুষের যৌন চেতনায় বিরাট একটা পার্থক্য আছে তাঁদের এসেক্সুয়ালিটি নিয়ে। এদের বৈশিষ্ট হলো, এঁরা কোনো জেন্ডারের প্রতিই সেক্সুয়ালি এট্রাকটেড ফীল করে না। এঁরা ইম্পটেন্ট নয়, শারীরিক ভাবে যৌন মিলনে খুবই সক্ষম। কিন্তু এঁরা তাঁদের কারো সাথে যৌনতা ইনক্লুসিভ কোনো রোমান্টিক সম্পর্কে জড়ান না বা জড়াতে পারেনই না। একজন পুরুষ জন্মসূত্রে এসেক্সুয়াল না হলে তাঁদের জন্য আর কখনোই এসেক্সুয়াল হওয়া সম্ভব না। অথচ জন্মসুত্রে এসেক্সুয়াল নন, এমন একজন নারীর জন্য জীবনের একটি পর্যায়ে সেক্সুয়ালি একটিভ জীবন যাপন করার পরেও অন্য একটি পর্যায়ে এসেক্সুয়াল হয়ে যাওয়া মোটেও অসম্ভব না। স্থায়ীভাবে একা থাকা কোন মহিলা যৌন বিবর্জিত হওয়ার জন্য প্রথম দিকে কিছু অসুবিধা ফিল হলেও কিন্তু কিছুদিন এভাবে চলবার পর তাঁরা নিজে থেকেই এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠেন এবং এই এসেক্সুয়ালিটিতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েন যে বাকিটা জীবন তাঁদের জন্য এই এসেক্সুয়াল জীবনযাপনে আর কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু এখানেই গল্পের 'হাইফেন'। পারমিতা  'লিউট'-র শব্দে আর সামলাতে পারলনা নিজেকে প্রশান্তি দিলো সেলিমের নগ্ন মসৃণ বুকের লোমে তার মাথা রেখে। যেখানে গল্পটা বলছে পারমিতা একটা পার্টিকুলার রীতিমতো এরেঞ্জড মেরেজ করেছে। কিন্তু অর্ণবের সাথে শীতল সম্পর্ক পারমিতা সেই জায়গায় 'হাইফেন' বসায় - 'লক্ষণরেখাকে মনে হয়, 'মাই ফুট, ফাকিং রেখা'। 

শঙ্কু দা'-র 'হাইফেন'-এ মেলোডিয়াস এবং চাহিদা আর উত্তেজনার ককটেল আমার কাছে উত্তরপূর্বের গল্প সমগ্রে এনেছেন এক অভিনবত্ব। পারমিতা-অর্ণব-সেলিম এই ত্রিশঙ্কু পরিচয়কে এক বৃত্তে কেন্দ্রভূত করা চারটে খানে বিষয় নয়। এসেক্সুয়ালিটি একটি স্বাভাবিক বিষয় খুব সাবলীল ভাবে বলে গেলেন। এসেক্সুয়ালিটি এতটাই কমন ব্যাপার জীবন যাপনে অসুবিধে তো দূরের কথা অভ্যস্ত হওয়া স্বাভাবিক। তাই 'হাইফেন' সবদিক থেকেই এক স্বার্থক উদ্ধার।

Wednesday, October 11, 2023

বাল্যবিবাহ রোধ: শুধু চমকে নয়, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানেই এর সমাধান


বাল্যবিবাহ একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি। ইউনিসেফ এর তথ্যানুযায়ী প্রতিবছর প্রায় দেড় লক্ষ বাল্যবিবাহ হয়ে থাকে ভারতে। বাল্যবিবাহ মেয়েদের উপর স্বাস্থ্য সমস্যা সহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাল্য বিবাহের কারণে তাদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়া, গার্হস্থ্য সহিংসতা বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। ভারতবর্ষে বাল্যবিবাহের বেশ কিছু জটিল ও আন্তঃসম্পর্কিত কারণ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য, লিঙ্গ বৈষম্য, শিক্ষার অভাব, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি, সীমিত আইনি সুরক্ষা, সংঘাত ও স্থানচ্যুতি ইত্যাদি।

ভারতবর্ষে অনেক পরিবার অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তাদের মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেয়। বাল্যবিবাহকে প্রায়ই আর্থিক বোঝা কমানোর এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা উন্নত করার উপায় হিসেবে দেখা হয়। প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং লিঙ্গ বৈষম্য কন্যা সন্তান ও নারীদের অবমূল্যায়নের দিকে নিয়ে যায়। বাল্যবিবাহকে প্রায়ই মেয়েদের সতীত্ব ও সম্মান রক্ষার উপায় হিসেবে দেখা হয় এবং তাদের স্বাধীনতা ও চলাফেরা সীমিত করা হয়। শিক্ষার অভাব এবং বাল্যবিবাহের নেতিবাচক পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এর প্রসারে ভূমিকা রাখে। গ্রামাঞ্চলের অনেক পরিবার তাদের মেয়েদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক সুস্থতার উপর বাল্যবিবাহের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে অবগত নয়।

সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি বাল্যবিবাহের ধারণাকে প্রচার করে, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে। এই নিয়মগুলি প্রায়শই ধর্মীয় নেতা, মোল্লা, পুরোহিত, সমাজের প্রবীণ এবং পরিবারের সদস্যদের দ্বারা জোরালোভাবে সমর্থন করা হয়। যদিও বাল্যবিবাহ বেআইনি, তবুও মেয়েদের বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা করা খুবই সংগ্রামের। সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির সময়ে, বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পেতে পারে কারণ পরিবারগুলো তাদের মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতা থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। বাল্যবিবাহ মেয়েদের এবং তাদের পরিবারের জীবনে বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যে সব মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে হয় তাদেরসহ শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে, সেইসাথে গর্ভাবস্থা এবং প্রসবের সাথে সম্পর্কিত জটিলতার ঝুঁকি থাকে। তারা তাদের স্বামীর কাছ থেকে শারীরিক ও যৌন সহিংসতার শিকার হতে থাকে।

যে সকল মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে হয়- তারা প্রায়ই স্কুল ছেড়ে দেয়, যা তাদের শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত বিকাশের সুযোগ সীমিত করে। এটি দারিদ্র্য এবং বৈষম্যের চক্রকে স্থায়ী করতে অবদান রাখে। বাল্যবিবাহ মেয়েদের অর্থনৈতিক সুযোগে প্রবেশ সীমিত করে এবং আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষমতা হ্রাস করে। এটি দারিদ্র্য এবং লিঙ্গ বৈষম্যের চক্রকে স্থায়ী করে তোলে। যেসব মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে হয় তাদের প্রায়ই সীমিত সামাজিক সমর্থন থাকে এবং তারা তাদের পরিবার এবং সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। বাল্যবিবাহের শিকারে একটি মেয়ে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা পড়ে, যেমন হতাশা, উদ্বেগ এবং চাপ, বিশেষ করে যদি মেয়েটিকে বিয়েতে বাধ্য করা হয়।বাল্যবিবাহ মেয়েদের পছন্দ এবং তাদের জীবনের পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ সীমিত করে। তারা শারীরিক এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার আগে প্রাপ্তবয়স্কদের ভূমিকা এবং দায়িত্ব নিতে বাধ্য হয়, যা তাদের শারীরিক এবং মানসিক সুস্থতার উপর প্রভাব ফেলে।

আসাম তথা ভারতের অনেক জায়গায় বাল্যবিবাহ একটি বড় সমস্যা।  প্রথা রোধ করার লক্ষ্যে আইন ও নীতি তৈরি করা সত্ত্বেও, বাল্যবিবাহ এই অঞ্চলে একটি বিস্তৃত সমস্যা রয়ে গেছে।  বাল্যবিবাহ বলতে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিয়েকে বোঝায়, কখনও কখনও ছয় বা সাত বছরের কম বয়সী। আসামে বাল্যবিবাহের প্রধান কারণ হল দারিদ্র্য, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি, ধর্ম বিশ্বাস এবং শিক্ষার অভাব।  রাজ্যের অনেক গ্রামীণ এলাকায়, পরিবার বাল্যবিবাহকে তাদের মেয়েদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার উপায় হিসেবে দেখে।  তারা বিশ্বাস করে যে অল্প বয়সে বিয়ে করলে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং সামাজিক কলঙ্ক এড়ানো যাবে।  কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যে, বাল্যবিবাহকে পরিবারের মধ্যে সামাজিক মিত্রতা স্থাপনের একটি উপায় হিসেবেও দেখা হয়। আসামের পুলিশ বাল্যবিবাহ ঠেকাতে এখনও পর্যন্ত দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। বাল্য বিবাহ করেছে, এমন কম বয়সী ছেলেরা যেমন এর মধ্যে আছে, তেমনই ধরা হয়েছে তাদের পরিবার আর কাজী – পুরোহিত যারা ওইসব বিয়ে দিয়েছেন, তাদেরও।

অসমে বাল্যবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর রাজ্য সরকার। কোভিড অতিমারির বিস্তার রোধে ২০২০ সালে কঠোর লকডাউনের সময় দেশে অন্যান্য অপরাধের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে  কিন্তু বাল্যবিবাহ বাড়ছিল বেশ উর্ধ গতিতে। কেন্দ্রীয় মহিলা ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রকের মতে, ২০২০ সালে অন্য বছরের তুলনায় দেশে বাল্যবিবাহ ৩৩ শতাংশ বেড়েছে।  শুধুমাত্র আগস্টেই এই সংখ্যা ৮৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায়। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো অনুসারে, এই সময়ের মধ্যে দেশে অন্যান্য অপরাধের সংখ্যা ১৩.২৬ শতাংশ কমেছে।  তবে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের অধীনে নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা ১৬৭.৯২ শতাংশ বেড়েছে।  রাজ্যে বাল্যবিবাহ নিয়ে চলমান সরকারি প্রচারণা এবং বিতর্কের আলোচনায় এই পরিসংখ্যানগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অসমে বাল্যবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ করতে গত সোমবারে বাল্যবিবাহ করা এবং এর সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে ১ হাজার জনকে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই রাজ্যে বাল্যবিবাহ বন্ধ করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। চলতি বছরেই শুরু হয়েছে বাল্যবিবাহ বিরোধী অভিযান। ফেব্রুয়ারি মাসেই শুরু হয় বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে রাজ্যব্যাপী এই অভিযান । প্রথম দফার অভিযানে সেখানে গ্রেফতার করা হয় ৩ হাজার ১৪১ জনকে। কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে করা এবং ওই বিবাহর ব্যবস্থা করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় তাঁদের।

রাষ্ট্ৰসংঘের সংস্থা ইউনিসেফের মতে, দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং পুরুষতন্ত্রের মতো সামাজিক স্টিরিওটাইপ বাল্যবিবাহের প্রধান কারণ। ৷ বিশ্বে ভারতের বাল্যবিবাহের প্রকোপ  অনেক বেশি এবং ইউনিসেফ এর পিছনে গভীর আর্থ-সামাজিক কারণগুলিকে মোকাবেলা করার জন্য বেশ কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে ৷ কন্যাশিশুর  মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, পুষ্টির যত্নের প্রচার এবং তাদের স্বাস্থ্যকর, উৎপাদনশীল এবং শক্তিশালী প্রাপ্তবয়স্ক করার জন্য তাদের প্রতিভা অনুসারে তাদের বৃত্তিমূলক দক্ষতা বৃদ্ধি করার জন্য জেলা পর্যায়ে কাজ করার দিকে মনোনিবেশ করেছে। ৷ একইভাবে, ভারত সরকার বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন ২০০৬ প্রণয়নের মতো আইনি প্রতিকার গ্রহণ করেছে এবং বিভিন্ন শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ৷ কর্মসূচির তীব্রতাও বাড়ছে  এর ফল আমরা দেখছি পরিসংখ্যান মতে দেশে বাল্যবিবাহের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে ৷ ২০০৫ সালে, বাল্যবিবাহের হার ছিল ৪৭.৪ শতাংশ এবং ২০২১ সালের মধ্যে তা ২৩.৩ শতাংশে নেমে আসে ৷ বিপরীতে, আসামের পরিসংখ্যান কিন্তু সন্তোষজনক নয় ৷ সর্বশেষ জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা (২০১৯-২১) অনুসারে, গ্রামীণ আসামের ২০-২৪ বছর বয়সী এক তৃতীয়াংশ নারীর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায় ৷ এ ক্ষেত্রে আসামের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে শুধু বিহার ও ঝাড়খণ্ড ৷ জরিপে আরও জানা গেছে যে ১১.৭ শতাংশ কিশোরী ১৫ থেকে ৯ বছর বয়সে হয়ে যায় মা অথবা গর্ভবতী৷ এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে বাল্যবিবাহ রোধে সক্রিয় পদক্ষেপ প্রয়োজন  কিন্তু বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন এবং পোকসোর (protection of children from of sexual offences) মতো কঠোর আইনের অধীনে হাজার হাজার পুরুষকে গ্রেপ্তার করা এবং পরিবারগুলিকে হঠাৎ করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত করা কি এই সক্রিয়তার অংশ হতে পারে?

Friday, September 29, 2023

নীতি আয়োগের দারিদ্র‍্য সূচকে বরাকের স্থান কোথায়!


'যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সে-ই কেড়েছে ভয়, আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়।'

আমরা সাধারণত দেশ বলতে বুঝি এমন একটা জায়গা যেখানে শান্তিতে নিশ্বাস নেওয়া যায়। যেখানে একে অপরের প্ৰতি সহানুভূতিশীল ও সহমৰ্মী এবং একে অন্যের ভালমন্দের ভাগীদার। দেশ মানে এমন একখণ্ড মৃত্তিকা যা মানুষকে লালন করে, পালন করে পরম মমতায়। আর যখন সেই ভৌগলিক পরিসীমার প্ৰতি মানুষের মনে মাতৃভাবের উন্বেষ ঘটে, তখন সেটা দেশ থেকে রূপান্তরিত হয় স্বদেশে।ভাষিক সংহতি ছাড়া জাতি বা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অত্যন্ত ভঙ্গুর। রাষ্ট্রের শক্ত ভিত্তির প্রধান উপাদান ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধ। তবে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার বিকাশ ও সংস্কৃতির রূপরেখা একটি জাতির ইতিহাসে দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সমৃদ্ধি লাভ করে। রাজনীতি ও সংস্কৃতির নানা চড়াই উতরাই, ইতিহাসের বহুপথ কেটে একটি জাতির রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথ অন্বেষণ করতে হয়। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সক্ষমতা একটি জাতির টিকে থাকার প্রধান যোগ্যতা। 

মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে লক্ষণীয়, চতুর্দশ শতক থেকে বিশ শতক পর্যন্ত পৃথিবীতে নানা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসন ঘটেছে। এই সব আগ্রাসনে পৃথিবীর যে সব জাতি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক যোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে কেবল তাদের মাতৃভাষাই টিকে আছে। বিজিতের ভাষাগুলো বিজয়ীর ভাষার আগ্রাসনে বিলুপ্ত হয়েছে কিংবা বিলুপ্তির পথে রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ অস্ট্রিয়া, হ্যাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, চেকস্লোভাকিয়া সহ ইতালির উত্তর টাইরোল ও স্ক্যান্ডেনেভিয় দেশ সমূহের স্থানীয় ভাষা এবং আফ্রিকার আদিম জনগোষ্ঠির বহু ভাষা আজ বিলুপ্ত।

আমরাও শান্তির বাসভূমি আসামকে এখানের মাটি ও মানুষের ভালোবাসায় লালিত পালিত হয়ে এই রাজ্যকে মনে প্রাণে ভালোবেসেছি স্বদেশ বা মাতৃভূমি রূপে। সুদীৰ্ঘ জীবন পরিক্ৰমায় এখানে আমরা অনেক কিছুই দেখেছি। দেখেছি জাতি দাঙ্গা, গোষ্ঠী সংঘৰ্ষ, রক্তক্ষয়ী আসাম আন্দোলন, ১৯৬১-র ভাষা আন্দোলন.... আরো কত কিছু। তবু পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়িয়েছি বারবার। এতো উত্থান পতনের মধ্যদিয়ে এগিয়ে গিয়েও এই দেশটার প্ৰতি একাত্ম বোধের শিকড় যখন প্ৰথিত হয়েছে গভীর থেকে গভীরে, ঠিক এমন একটা সময়ে আবারও আমাদের জীবনে যেন নেমে আসে এক ভয়ঙ্কর অমানিশা। আজ উত্তর-পূর্বে প্রায় দেড় কোটি বাঙালির অস্তিত্বের সঙ্কট। সঠিক ভাবে বলতে গেলে এটা নিশ্চয়ই বলতে হবে আজও আমরা ভাষাগত পরিচয়কে পুঁজি করে একটা ঐক্যের বলয় তৈরি করতে পারি নি। 'ঘুসপেটিয়া’ পরিচয়ে, ডি-র তকমায়, ডিলিমিটেশনে আমাদের শিকড় নড়বড়ে।

আমাদের প্রাথমিক দায় হচ্ছে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই অঞ্চলের বিপন্নতার প্রকৃতি নির্ণয় করা। 'বহিরঙ্গ দিয়ে বিচার করলে সে নিরূপণের কাজটা তেমন জটিলতায় আবৃত নয়। মোদ্দা কথাটা এভাবে বলা যায় যে বরাক উপত্যকার মানুষ নিত্যদিন যে বিপদ সম্ভাবনায় আতঙ্কিত, মূলত পরিচয়ে তা ভাষিক এবং সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিপীড়নগুলো সেই মৌলিক উৎস থেকেই উৎসারিত। আমাদের দেশের বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামোতে এমনতরো সঙ্কট থেকে যদি উত্তীর্ণ হতে হয়, তবে সে প্রয়াসও একটা স্তরে রাজনৈতিক।' আসামের দক্ষিণাঞ্চল বরাক উপত্যকায় যথাক্রমে তিনটি জেলা কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি। আয়তনের দিক থেকে প্রায় ৬৯২২ বর্গ কিলোমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বরাক উপত্যকার জনসংখ্যা ছিল ৩৬,২৫,৩৯৯, তা বর্তমানে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষের অধিক। বরাক, কুশিয়ারা, ধলেশ্বরীর মিলনায়তন এই উপত্যকা বহু আগে থেকেই পিছিয়ে পড়া। জনসংখ্যার দিক থেকে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষের বেশি হলেও সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থতৈনিক দিক দিয়ে জীবনধারণের মানদন্ডে ভারতের বিশেষ করে আসামের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক দূরে। নির্বাচনী ইশতেহার অনেক ঘোষণা থাকলেও রাজনৈতিক নেতা দুই একজন ব্যাতিক্রমী ছাড়া কন্ঠস্বর খুবই ক্ষীণ। দেখতে গেলে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কাগজ কল পাঁচগ্রাম কাগজ কল এখন বন্ধ, অপমৃত্যু ঘটে আনিপুর চিনি কল, বন্যার প্রকোপ, দুর্বল কর্মসংস্থান, অবিকশিত কৃষি ক্ষেত্র। তাছাড়া কি আর বলার আমাদের ছেলেমেয়েরা পেটের তাগিদে বর্হিরাজ্যে গিয়ে কর্মসংস্থানে জুড়ছে। এককথায় তিমির অবগুণ্ঠনে বরাকের জনজীবন।

সম্প্রতি নীতি আয়োগের একটি রিপোর্ট সামনে এসেছে।
নীতি আয়োগের বহুমাত্রিক দারিদ্র সূচক (Multidimensional Poverty Index) তিনটির নিরিখে বিচার করা হয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার মান দিয়ে।গত পাঁচ বছরে দেশে কমেছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। এমনটাই দাবি নীতি আয়োগের। সেই অনুসারে, ২০১৯-২১ সালে ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ দরিদ্র, যা ২০১৫-১৬ সালে ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। সাড়ে তেরো কোটি মানুষের দারিদ্রমুক্তি ঘটেছে, এমন সুখবরে নিশ্চয়ই আহ্লাদিত হওয়ারই কথা। কিন্তু সমস্যা হল উন্নয়নের বিচিত্র পরিসংখ্যান অনবরত ছুটে এসে তৈরি হয় বিভ্রান্তি। যে বারোটি মাপকাঠিতে দারিদ্রের যে থার্মোমিটারে বিচার করছে নীতি আয়োগের ‘বহুমাত্রিক দারিদ্র সূচক', তার প্রথমেই রয়েছে অপুষ্টি। শিশু-অপুষ্টি কমেছে, এমনটাই দাবি নীতি আয়োগের। কিন্তু যে সমীক্ষার ভিত্তিতে এই সূচক, 'সেই পঞ্চম জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (২০১৯-২১) দেখিয়েছিল, ভারতে শিশু-অপুষ্টির চিত্র যথেষ্ট উদ্বেগজনক। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে পঁয়ত্রিশ শতাংশেরই অপুষ্টির কারণে উচ্চতায় ঘাটতি রয়েছে। হতে পারে তা পূর্বের থেকে (২০১৫-১৬) সামান্য কম (তিন শতাংশ), কিন্তু তাতে কি আশ্বস্ত হওয়া চলে? আন্তর্জাতিক ক্ষুধা সূচকও (২০২২) দাবি করেছিল যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে অপুষ্টির নিরিখে ভারতের পিছনে রয়েছে কেবল আফগানিস্তান। যদিও এই তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছিলেন যে, সেই তথ্যের সঙ্গে সরকারি তথ্যের খুব বেশি গরমিল নেই। আরও মনে রাখতে হবে, পঞ্চম জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার বেশ কিছু তথ্য সংগৃহীত হয়েছিল কোভিড অতিমারির আগে। ভারতের নিম্নবিত্তের উপরে অতিমারির ভয়াবহ প্রভাব দেখে আশা করা কঠিন যে, ২০২২ সালে ক্ষুধা ও অপুষ্টির চিত্রে উন্নতি হয়েছে।'

নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান সুমন বেরির প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৫-১৬ এবং ২০১৯-২১ সালের মধ্যে আসামে ৪৬ লক্ষ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। নানা তথ্যের উপর ভিত্তি করে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতে ২০৩০ সময়সীমার অনেক আগেই দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা ১.২ অর্জন করবে। নীতি আয়োগের তরফে বলা হয়েছে পুষ্টি, রান্নার গ্যাস, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, পানীয় জল ও বিদ্যুতের অ্যাক্সেসের দিকে সরকার মনোযোগী হওয়ায় উপরে উল্লিখিত রাজ্যগুলোতে প্রভূত উন্নতি হয়েছে। সরকারি এই রিপোর্ট, 'Multidimensional Poverty Index -এর ১২ টি প্যারামিটারে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। এছাড়াও স্যানিটেশন এবং রান্নার গ্যাসের উন্নতি দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে'। সম্প্রতি নীতি আয়োগের প্রকাশিত একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা ও রাজস্থানে গত পাঁচ বছরের মধ্যে দরিদ্র ব্যক্তির সংখ্যা কমেছে। সেইসাথে আসামেও ৫ বছরে ৪৬.৮৭ লক্ষ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছে। অর্থাৎ আসামের বহুমাত্রিক দারিদ্র্য ২১.৪১% (Rate of Poverty) যেখানে ভারতের ১৪.৯৬%।

মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (Gross Domestic Product) এবং মানব উন্নয়ন সূচকের (Human Development Index) দিক থেকে বরাক উপত্যকা আসামের সবচেয়ে দরিদ্রতম অংশ। এই অঞ্চলের অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা চরম দারিদ্রতার মধ্যে বাস করছে। একটি জরিপ অনুসারে, হাইলাকান্দি জেলার জনসংখ্যার ৫১%, কাছাড় জেলার জনসংখ্যার ৪২.৪% এবং করিমগঞ্জ জেলার জনসংখ্যার ৪৬% বহুমাত্রিকভাবে দারিদ্র এবং নিরাপদ পানীয় জল, খাবারের উপযুক্ত মজুত তথা বিদ্যুৎ, বাসস্থান, কর্মসংস্থান আশ্রয় ইত্যাদির অভাব এখনে পরিলক্ষিত হয়। বহুমাত্রিক দারিদ্র সূচকে (Multidimensional Poverty Index) আসামের বিভিন্ন জেলার দারিদ্রতা হ্রাস শতাংশের হিসেবে তথ্য প্রকাশ হয় যেখানে — বরাক উপত্যকার কাছাড় (৩০.৫৮%), করিমগঞ্জ (৩২.৯৩%), ও হাইলাকান্দি (৩৬.২২%) ছাড়া আসামের বাকি জেলার বহুমাত্রিক দারিদ্রতার সূচক অনেকটা উন্নত। ( NATIONAL MULTIDIMENSIONAL POVERTY INDEX - NITI Aayog https://niti.gov.in/sites/default/files/2023-08/India-National-Multidimentional-Poverty-Index-2023.pdf )

সংবাদমাধ্যম তথা বিভিন্ন প্রিন্ট তথা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দেখা যায় খাদ্য-সহ নানা অত্যাবশ্যক সামগ্রীতে ব্যয়ের হার কমেছে, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন ব্যয়ক্ষমতার পতনে দারিদ্র বাড়ার একমাত্র লক্ষণ, এমনটাই মনে করছেন। একই সময়ে জাতীয় নমুনা সমীক্ষার নিয়োগ ও বেকারত্ব সংক্রান্ত সমীক্ষাটি দেখিয়েছিল গ্রামাঞ্চলে কর্মহীনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু উন্নয়নের নজির বলে মানব উন্নয়নের যে সব পরিসংখ্যান পেশ করা হয়, সেই সংখ্যাগুলির পিছনের চিত্রটিও দেখা প্রয়োজন। বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার বরাক উপত্যকা তা অস্বীকার করা যায় না। তবুও বিবিধ আগ্রাসনে বিধ্বস্ত হলেও  অপশক্তির সঙ্গে কখনও হাত মেলানো সুবিধাবাদী ছাড়া আর কেউই করতে পারে না। বরাক উপত্যকার উন্নয়নের পেছনে এতো ধীর গতি কেন, তা ভাববার বিষয়!

Tuesday, September 19, 2023

ইন্ডিয়া’- নাম কি তাহলে বদলে যাবে ‘ভারত’-এ?


'রোমিও জুলিয়েট' নাটকের একটা বিখ্যাত লাইন যেখানে শেক্সপীয়ার বলেছিলেন, নামে কিবা আসে যায়?(What's in a name!) তাহলে বিতর্ক থেকেই যায়। 'ইন্ডিয়া' না  'ভারত' কোন নামটি দেশের হওয়া উচিত। সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদে যেখানে লেখা আছে "India, that is Bharat, shall be a Union of States”। দেশের নাম বদলে যাবে! এই গত কয়েকদিন ধরে এমনই জল্পনা শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। কেন্দ্রের তরফ থেকে বিশেষ যে অধিবেশন রাখা হয়েছে সেই অধিবেশনেই নাকি এমন নাম বদলের বিল পেশ করা হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। অনুমান করার পাশাপাশি এই নিয়ে বিস্ফোরক সব দাবি তুলতেও দেখা যাচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা নেত্রীদের। এমন জল্পনা শুরু হয় মূলত G20 সম্মেলন ঘিরে রাষ্ট্রপতি যে আমন্ত্রণপত্র পাঠান তা থেকেই।

আমাদের দেশের ভূখণ্ডকে সেই প্রাচীনকাল থেকে নানা নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জম্মুদ্বীপ, ভারতখণ্ড, হিমবর্ষ, অজনাভবর্ষ, আর্যাবর্ত, হিন্দ, হিন্দুস্তান আর ইন্ডিয়া নামগুলি। সম্রাট অশোকের শিলালিপিতে জম্মুদ্বীপের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ভাষাবিদ অজিত ওয়াডনের্করের মতে, “হিন্দ, হিন্দুস্তান বা ইন্ডিয়া – এই নামগুলির সঙ্গে সিন্ধু নদের যোগ আছে। কিন্তু সিন্ধু শুধু একটি নদ নয়, এর অর্থ যেমন নদ বা নদী হয়, তেমনই সাগরও এর আরেকটি অর্থ। সেদিক থেকে বিচার করলে দেশের উত্তর-পশ্চিম অংশটি কোনও এক সময়ে সপ্তসিন্ধু বা পাঞ্জাব বলা হত। ওই অঞ্চলটি খুবই উর্বর ছিল তাই সেখান দিয়ে বহমান সাত অথবা পাঁচটি নদীই ছিল এলাকার পরিচয়।“ তিনি আরও বলেন, “প্রাচীন ফার্সি ভাষায় সপ্তসিন্ধুকে ‘হফ্তহিন্দু’ বলা হত।“ আবার ইন্ডিয়া এবং ইন্ডাস নাম পাওয়া যায় গ্রীক ইতিহাসবিদ মেগাস্থিনিসের বর্ণনায়। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সংস্কৃতের দিকপাল অধ্যাপক মনিয়র উইলিয়ামস, যিনি সংস্কৃত-ইংরেজি অভিধান লিখেছিলেন, তার মতে বেদে ভরত বা ভরথ শব্দটির অর্থ অগ্নি, লোকপাল বা বিশ্ব-রক্ষক, এক অর্থে রাজা। ওয়াডনের্কর বলছেন, “বৈদিক যুগের এক প্রসিদ্ধ জনগোষ্ঠী ভরতের উল্লেখ অনেক প্রাচীন পুঁথিতে রয়েছে। এই গোষ্ঠী সরস্বতী নদী তট, যেটি বর্তমানের ঘগ্গর, ওই অঞ্চলে বসবাস করত। এদের নাম অনুসারেই ওই ভূখণ্ডের নাম হয় ভারতবর্ষ।“

আসল-নকলের উত্তর খোঁজা সহজ নয়। ‘ইন্ডিয়া’- নামটিও মিলছে যথেষ্ট প্রাচীন ব্যবহারেও— ‘Indos’ শব্দটি পাওয়া যাচ্ছে গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস-এর বিবরণে। প্রাচীন ভারতে বিদেশাগত পর্যটক মেগাস্থিনিস (‘ইন্ডিকা’), আল বেরুনি প্রমুখের (‘কিতাব উল হিন্দ’) বইয়ের নামের মধ্যেই ‘ইন্ডিয়া’ শব্দটি লুকিয়ে আছে। তাহলে কেন ‘ভারত’ এভাবে উঠে এল সরকারি নথিতে? ভাষাবিদ পবিত্র সরকার বলছেন, শকুন্তলা ও দুষ্মন্তের পুত্র ভরতের নাম থেকেই তার রাজ্যের নাম হয় ভারত, এটাই প্রচলিত ধারণা। ‘ভারত’ শব্দের উৎসে লুকিয়ে আছে এক হিন্দু পুরাণকাহিনী। মহাভারতে যে কুরু-পাণ্ডবের গল্প আমরা পড়ি, ভরত ছিলেন তাঁদেরই পূর্বজ, চন্দ্রবংশের একজন নৃপতি। ‘ভরতের রাজ্য’ অর্থেই ‘ভারত’ ভূখন্ডটি তাৎপর্যময়, এবং সেই উদ্দেশ্যেই ‘ভারত’ নামটিকে গুরুত্ব দেওয়া— কিছু বিরোধী সমালোচনা অনুযায়ী উঠে এসেছে এমনই মতামত। বিজ্ঞজনেরা ধরে নিচ্ছেন আগামী দিনে রাষ্ট্রে’র নির্মাণপ্রকল্পে পুরাণকাহিনিকে ইতিহাসে রূপান্তরিত করার একটা প্রয়াস হিসেবেই এটাকে দেখছেন তাঁরা।

মুঘল আমলের দিকে তাকানো যায় তবে দেখা যায় তাদের শাসনাধীন অঞ্চলকে হিন্দুস্তান বলা হত। তবে ঐতিহাসিক ইয়ান জে ব্যারো লিখেছেন, অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে ব্রিটিশ মানচিত্রগুলিতে ইন্ডিয়া নামটির প্রচলন হতে থাকে। তার আগে, মুঘল আমলে তাদের শাসনাধীন এলাকাটিকে হিন্দুস্তান বলে চিহ্নিত করা হত। ব্যারো 'জার্নাল অফ সাউথ এশিয়ান স্টাডিসে' প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ ‘ফ্রম হিন্দুস্তান টু ইন্ডিয়া’-তে লিখেছেন “ইন্ডিয়া শব্দটির প্রতি আকর্ষণের কারণ সম্ভবত ছিল তাদের গ্রীক-রোমানদের সঙ্গে নৈকট্য, ইউরোপে এটির দীর্ঘ ব্যবহার এবং সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার মতো বৈজ্ঞানিক ও সরকারি সংস্থাগুলির কাছে এই নামটির গ্রহণযোগ্যতা।“

২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রের নিরঞ্জন ভটওয়াল, 'ভারত' নামটিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে জনস্বার্থ মামলা করেছিল। ‘ইন্ডিয়া’ নাম বাতিল করে শুধু ‘ভারত’ করা যাবে না, সেবছরই দেশের শীর্ষ আদালতে হলফনামা দিয়েছিল কেন্দ্র সরকার। যাইহোক নাম পাল্টে দেশ ও দশের কিছু লাভ হবে কি? তর্কের খাতিরে মেনেই নিলাম এই নাম পরিবর্তন করেই ভারতবর্ষ করা হলো তাহলে যে সব সরকারি প্রতিষ্ঠান গুলো আছে তাদের নামের আগে বা পরে ইন্ডিয়া শব্দটি ব্যবহার হয় উদাহরন স্বরূপ I.I.T (Indian Institute of Technology), I.I.M.s (Indian institute of management), I.S.R.O ( Indian space Research Organisation), R.B.I (Reserve Bank of India), S.B.I (State Bank of India), AIIMS (All India Institute of Medical Sciences) ইত্যাদি, এমনকি পাসপোর্টেও লিখা থাকে রিপাবলিক ওফ ইন্ডিয়া, পেন কার্ড, আধার কার্ড এবং প্রত্যেক টাকা তে উল্লেখ থাকে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া(RBI), এই সব সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান গুলির নাম,  কাগজ, টাকা ও দস্তাবেজ পরিবর্তন করতে কোন অযথা খরচা হবে না তো? উপরে মাত্র কয়েকটা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে ইন্ডিয়া নামে এমন হাজারো সরকারি, আধা সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ধরুণ এটা যদি তুঘলকি সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে আমাদের দেশ কতটা দুর্দশায় আক্রান্ত — মানুষ  মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নাগরিকত্ব,  দুর্নীতি, গৃহ ও জাতি দাঙ্গা, ক্ষুদা সূচকে অবনতি, নির্দিষ্ট কর্পোরেট দের হাতে রাষ্ট্রের সম্পত্তি জলের দামে বিক্রি, ঋণ চুরি, নির্দিষ্ট শিল্পপতিদের ঋণ মাফ, সীমা বিবাদ, মহিলা, দলিত, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু অত্যাচার, বনভূমি ও খনি সমূহ কে কিছু নির্দিষ্ট কর্পোরেট দের হাতে তুলে দেওয়া প্রভৃতি সরকারের একের পর এক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন না করতে পারে সেইজন্য জনসাধারণ নাম বিতর্কের পিছনে অযথা তর্কে বহুদূর সরিয়ে দেয়ার কোন মনোবাঞ্ছনা নয় তো!

আসন্ন ২০২৪ লোকসভা ভোটে পায়ের নীচে জমি শক্ত করছে বিরোধী শিবিরে। বিজেপির প্রতিপক্ষ হিসেবে জোট শিবিরে রয়েছেন মমতা, কেজরিওয়াল, নীতিশ কুমার, উদ্ধব ঠাকরে, ফারুখ আবদুল্লাহ, এম. কে. স্তালিন প্রমুখ বিরোধী ঐক্যের নেতা-নেত্রীরা। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারতের ছাব্বিশটি রাজনৈতিক দলের এক ‘বিগ টেন্ট’ হিসেবে ১৮ জুলাই ২০২৩ তারিখে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে INDIA ওরফে Indian National Developmental Inclusive Alliance । বিশেষজ্ঞদের মতে স্পষ্টতই ‘ইন্ডিয়া’- নামটিকে বিজেপি বিরোধী অস্ত্র হিসেবে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে চাইছিল বিরোধী শিবির। কিন্তু, ‘ভারত’ নামটি ব্যবহার করে যেন সেই পরিকল্পনারই পাল্টা দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী — এমনটাই তাঁদের ধারণা। আবার, অনেকে এ-ও ভাবছেন— এতে অযথা রাজনীতি খোঁজা অর্থহীন। ‘ভারত’- নামেই বা সমস্যা কোথায়? ‘ইন্ডিয়া’ বিদেশী ইংরেজদের দেওয়া নাম, তাই দেশের ‘ভারত’ নামই দেখতে চান বলে গুঞ্জন বিশেষজ্ঞ মহলে।

কিন্তু, সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা— ‘ইন্ডিয়া’- সরকারি নামটিই কি তাহলে বদলে যাবে ‘ভারত’-এ? তাঁদের অনেকেই মনে করছেন এবার আবারও কি ফিরবে নোটবন্দি’র স্মৃতি। ব্যাঙ্ক নোট থেকে আরম্ভ করে আধার, ভোটারের মত সরকারি নথিতে ‘ইন্ডিয়া’ বদলে ‘ভারত’ করানোর লাইনে দাঁড়ানোর পালা আসতে চলেছে ফের। সব মিলিয়ে নাম-বিতর্ক এখন তুঙ্গে। অবশেষে একটিই কথা বলতে চাই নামে কোন আপত্তি নেই। এটা ভারতবর্ষ হোক আর ইন্ডিয়া বা হিন্দুস্থান। কথা হলো এবার বিচার করার পালা পরিবর্তনের নামে যাতে নোংরা রাজনীতি না হয় দেশে। জনগণের টাকাকে দেশের ও দশের উন্নয়নে যেনো লাগানো হয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও তুঘলকি স্বার্থের বিপরীতে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ চরিত্র আমরা দেখতে চাই।

Thursday, August 24, 2023

অন্ধকারে জাগ্রত বিবেক : নরেন্দ্র দাভোলকর


“নরেন্দ্র দাভোলকারের কাজ কখনও মুছে ফেলা যাবে না। তাঁর পায়ের ছাপ রয়ে যাবে” — নাসিরুদ্দিন শাহ

শুধু কেউ বিজ্ঞান জানলে কিংবা বিজ্ঞানী হলে সমাজ বিকশিত হবে না, যদি না তিনি বিজ্ঞানমনস্ক হন। কারণ মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণীদের প্রধান তফাত হল, মানুষের কৌতূহল আছে, সে প্রশ্ন করে, অন্য প্রাণীরা করে না। প্রকৃতি সম্বন্ধে কৌতূহল থেকেই মানুষ জন্ম দিয়েছে বিজ্ঞানের। পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তর্ক, অনুমান, অভিজ্ঞতার  মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে বিজ্ঞান। মূলত ‘বিজ্ঞানমনস্কতা’ হল, বিজ্ঞানস্বীকৃত সত্যকেই বিশ্বাস করার মানসিকতা। ২০ অগাস্ট ২০১৩ সাল। আততায়ীদের হাতে গুপ্তহত্যার শিকার হন নরেন্দ্র দাভোলকর। কাজের দিক থেকে তিনি বিজ্ঞান আন্দোলন কর্মী, ডাক্তার, সমাজকর্মী ও প্রভাবশালী যুক্তিবাদী লেখক ছিলেন। মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতির সভাপতি ছিলেন। তাঁরা দীর্ঘ লড়াইয়ের পর কুসংস্কার ও কালাযাদু বিরোধী একটি আইন আনার চেষ্টা করছিলেন মহারাষ্ট্রে। যা অনেক ক্ষমতাশালীদের ভীমরুলের স্বার্থে আঘাত করেছিল। তাই আলো হাতে নিয়ে যারা আঁধারের যাত্রী তাদের লুকিয়ে লুকিয়ে গুপ্তহত্যা। শুধু দাভোলকর নন, গোবিন্দ পানসারে, এমএম কালবুর্গি, গৌরী লঙ্কেশ সহ অগুন্তি যুক্তিবাদী প্রগতিশীলরা আমাদের গর্ব। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যখন এঁদের মতো প্রগতিশীলরা আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন।

নরেন্দ্র দাভোলকর নিজে ছিলেন একান্ত নিরীশ্বরবাদী, কিন্তু কোনও মানুষের ধর্মাচরণে কখনও বাধা দেননি। ধর্মাসক্ত অসহায় মানুষকে তিনি বরং ভরসা দিতেন, বলতেন সাফল্যের জন্য সতত পরিশ্রম করার কথা। তাঁর মৃত্যুর পর 'ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান র‌্যাশনালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন'-এর সভাপতি নরেন্দ্র নায়ক বলেন, “প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি যদি মনে করে থাকে আমাদের এক জনকে গুলি চালিয়ে খুন করে আন্দোলনকে স্তব্ধ করবে, তবে তারা ভুল করছে।” বিজ্ঞানে স্বীকৃত সত্যই একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য। অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই কখনওই থামে না, বরং হাতবদল হয় শুধু।

সমাজকে আলোর পথে হাঁটানোর ভাবনা দাভোলকরের মধ্যে যুবক বয়স থেকেই ছিল প্রায় সক্রিয়। ডাক্তারি পড়তে পড়তেই তিনি যোগ দিয়েছিলেন ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান ড্রিঙ্কিং ওয়াটার’ আন্দোলনে। পানীয় জলের অপব্যবহার নিয়ে তিনি তৎকালীন ধর্মগুরু আসারাম বাপুর সরাসরি বিরোধিতা করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। দাভোলকর ১৯৮৩ সালে নিজে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি’ বা ‘এমএএনএস’। শুধু মহারাষ্ট্রেই এর ২৩০টি শাখা। আজ সমগ্র ভারতে এই সমিতির শাখা ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে যেমন সরব হলেন, তেমনি মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন দাভোলকর। ২০০২ সালে একটি চ্যালেঞ্জে বলেন, কোনও অলৌকিক বাবা যদি ‘এমএএনএস’-এর ঠিক করে দেওয়া ১২টি কাজের মধ্যে কোনও একটি করে দেখাতে পারেন তবে ১১ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। এই কাজগুলির মধ্যে ছিল শূন্যে ভেসে থাকা, গভীর জলের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া, আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা, শূন্য থেকে একটা সোনার হার তৈরি করা ইত্যাদি। কাউকে ব্যক্তিগত আঘাত করার উদ্দেশ্যে এই চ্যালেঞ্জ নয়, উদ্দেশ্য ছিল তথাকথিত বাবাজি-মাতাজির হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা, একটা সুস্থ সমাজ গঠন করা। ‘মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি’র লক্ষ্য ছিল— কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের চর্চা বন্ধ করা, যুক্তিবাদ, নৈতিক মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ব চর্চা, বিজ্ঞান-অনুসন্ধিৎসা ও অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষকে সঠিক পথ দেখানো।

যুক্তিবাদী নিগ্রহ ও নিধনের এই পর্বটি হয়তো এখনও শেষ হয়নি। হয়তো যুক্তিবাদী সৈনিকদের আরও মূল্য চোকাতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, যুক্তিবাদ, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সমর্থনে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই স্বনামধন্য ব্যক্তি ছিলেন। প্রত্যেকটি মৃত্যুর জোরালো প্রতিবাদ হয়েছে ভারতের কোণায় কোণায়। দেশের বাইরেও আলোড়ন কম হয়নি। এঁদের প্রাণ কেড়ে যুক্তিবাদী কর্মীদের মনোবল গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে মৌলবাদীরা। কিন্তু অন্য দিক থেকে দেখলে, মৌলবাদকে রুখতে যুক্তিবাদের এক দুর্দান্ত ভূমিকায় এভাবে উঠে আসতে হবে। উঠে আসে যুক্তিবাদী আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলার এখন সময়ের দাবি। আধুনিকতার অভিঘাতে বিপন্ন ধর্মের মরণকামড় হয়তো বা আরও কিছুকাল সমাজের উপর পড়বে, কিন্তু তা কখনই চিরস্থায়ী হতে পারে না। মানবসভ্যতার অগ্রগতির রৈখিক পথরেখায় এ এক সাময়িক ‘ফ্ল্যাকচ্যুয়েশন’ বা বিচলন মাত্র, আধুনিকতার চাকাকে কখনও পেছনে ফেরানো যায় না। তবে ঊর্ধ্বমুখী লেখচিত্রের এই উঁচুনিচু বাঁকগুলোকে আমরাই পারি দ্রুত সরলরেখায় এনে ফেলতে। সুবিচারের দাবিতে বিচারব্যবস্থাকে অবশ্যই প্রভাবিত করতে হবে। একই সঙ্গে, আমাদের ইতিকর্তব্য থেকেও আমরা যেন বিচ্যুত না হই।

ব্যক্তিজীবন বা সামাজিক জীবন সার্বিকভাবে সুস্থ ও সুন্দর করে গড়ে তোলার প্রয়াস জারি রাখতে প্রকৃতি ও সমাজের প্রতিটি ঘটনার পেছনে কার্যকারণ সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা খুব জরুরী। আর এইজন্য চাই প্রশ্ন করার আর প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার বৈজ্ঞানিক মেজাজ। ততটুকুই গ্রহণীয় যতটুকুর সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে, এই বৈজ্ঞানিক মেজাজ তৈরী করার কাজটা সুচারুভাবে করেছিলেন তিনি। মানুষের সাথে বন্ধুর মত মিশে, মানুষের জীবনসংগ্রামের সাথী হয়ে, মানুষকে বিজ্ঞান সচেতন করে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে সামিল করার প্রয়াস প্রতিটি বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের কাজ। আর এই কাজে ঔদ্ধত্য নয়, সাহসী এবং বিনয়ী হতে হবে। সর্বোপরি তৈরী করেছিলেন কুসংস্কার ও জাদুবিদ্যা বিরোধী আইনের সেই ঐতিহাসিক খসড়া যা সারা ভারতে যুক্তিবাদী মানুষের সংগ্রামের পাথেয়। যুগে যুগে কোনো যুক্তিশীল চিন্তাধারার মানুষদের কাজ কখনও সহজ হয়নি। ওনার কাছেও এই কাজ সহজ ছিল না। বহু বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বক্তৃতা বন্ধের চক্রান্ত, ম্যাগাজিন বিক্রি না করার ফতোয়া এমনকি প্রাণনাশের হুমকি নিয়েই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

সাম্প্রতিক কালে গোবিন্দ পানসার, নরেন্দ্র দাভোলকর, এম এম কালবুর্গি,  গৌরী লঙ্কেশের মত ব্যাক্তিত্বদের খুন করার উদ্দেশ্য এক। সবটাই হয়েছে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদীদের নিখুঁত পরিকল্পনায়। ওরা যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাধারাকে ভয় পায়। সেই একই কারণে অরুণ ফেরেইরা, সূধা ভরদ্বাজ, ভারভারা রাও, গৌতম নাভালখা ও ভেরনন গনজাল্ভেজরা আটক হন। পাশের রাষ্ট্রে, ঠিক একই উদ্দেশ্যে ধর্ম সন্ত্রাসীরা অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, আরেফিন দীপন, অনন্তবিজয় দাস, হুমায়ুন আজাদ, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়কে খুন করে। ধর্মান্ধে কিছু ধান্দাবাজ গডম্যানরা নিজ স্বার্থে তাদের ধর্ম বিপদে এমন গল্প বারংবার শুনিয়ে ভক্তদের মগজধোলাই করে উগ্র, হিংস্র বানায়। এরা কারোর যুক্তির ধার ধারেন না। এরা যা জানে সেটাই অভ্রান্ত, এমনটাই মনে করেন। এদের হাতে কখনো খুন হয়, অপদস্থ হয় এমনকি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় ব্লগার, ফেমিনিস্ট, এলজিবিটি এক্টিভিস্ট, মুক্তচিন্তকরা।


আমরা কখনই এরকম দেশ চাই না যেখানে অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, বিজ্ঞানমনস্ক পরিপন্থী মৌলবাদী কট্টরপন্থীদের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই ওরা গলা টিপে ধরবে।  যেরকম পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে মৌলবাদীরা মুক্তচিন্তকদের জড় সমেত উপড়ে ফেলার সংকল্প নিয়েছে। ভারতও কি সেই পথে হাঁটছে! মৌলবাদের উৎসগুলিকে ধ্বংস করতেই হবে। বিজ্ঞানমনস্কতা প্রচারের জন্য দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মৌলবাদী শক্তির হাতে খুন হওয়ার প্রতিবাদ হোক.... সেই সাথে মাঠে ঘাটে ছড়িয়ে থাকা বিজ্ঞান কর্মীদের যারা প্রতিনিয়ত  যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতাকে ছড়িয়ে দিতে গিয়ে প্রাণ দিচ্ছেন। [Scientific thinking is purely logical: the adjective ‘rational’ cannot be applied to it. Scientific temperament is a process of thinking, method of action, search of truth, way of life, spirit of a freeman. — Dr Narendra Dabholkar, The Case for Reason, Volume One] ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কলম ধরলেই পাশবিক হয়ে উঠেন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি । বেছে নেয় খুন করার পথ। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমালোচনা করা নাগরিকদের বৈধ অধিকার। মত প্রকাশের অধিকার যদি কোন ক্ষমতার দ্বারা বিপন্ন হয় তবে নিশ্চয় ভাববার বিষয়।

Thursday, August 10, 2023

নিষ্কর্ষ বার্তাবাহক '১৯-এর কবিতা ও গান'


ভাষাগত ও জাতিগত দিক দিয়ে যত রকমের ল্যাব ও ডিএনএ টেস্ট রয়েছে পৃথিবীর আর কোন জাতিকে হয়তো এতোটা প্রমাণপত্র দিতে লাগে না। যতটা বাংলা ভাষা ও বাঙালিকে বিশেষ করে উত্তর পূর্বাঞ্চল ও বরাক উপত্যকার বাঙালিকে দিতে হয়। আর এটার প্রচলন যে আজ শুরু হয়েছে এমন নয়। এর প্রমাণ স্বরূপ রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে অর্থাৎ ১৯৬১ সালের ১৯শে মে ১১ টি তরতাজা প্রাণ শহীদ হন শিলচরে, ১৯৭২ এর ১৭ই আগস্ট করিমগঞ্জে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু চক্রবর্তী),১৯৮৬র ২১ জুলাই করিমগঞ্জে শহীদ হন জগন্ময় ও যীশু, ১৯৯৬ এ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার রক্ষায় করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে শহীদ হন সুদেষ্ণা সিংহ ও সলিল সিংহ। সেই তখন থেকেই এখন অব্দি চলছে। হ্যাঁ হয়তো এখন শহীদ হচ্ছেন না ঠিক কিন্তু আগ্রাসনবাদী শক্তির করমর্দনে দেয়ালে পিঠ ঘষা খেতে খেতে কতটা ঘা হয়েছে এ বলার ইয়ত্তা রাখেনা।

ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় জীবনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আর এই আন্দোলনই অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনার ভিত্তি সুদৃঢ় করে। যার ফলস্বরূপ বাঙালি নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা ও স্বতন্ত্র অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে। বাঙালি জনগণ উপলব্ধি করতে পারে সংগ্রামের মাধ্যমেই তাদেরকে দাবি-দাওয়া আদায় করতে হবে এবং ভালোভাবে বাঁচার পথ খুঁজতে হবে। মায়ের ভাষা রক্ষার জন্য মেয়েরাই তো পেরেছিল রক্ষণশীলতার ব্যারিকেড ভেঙ্গে রাস্তায় নামতে। ভাষা আন্দোলনই তো পেরেছিল সাহিত্য-সংস্কৃতি-সমাজ গঠনে এক মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে। এটি একটি জাতির রাজনৈতিক ও সামাজিক ল্যান্ডস্কেপ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও, ১৯৯৯ সালের ২৬ শে নভেম্বর ইউনেস্কোর অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। বিশ্ববাসীর দরবারে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির যেভাবে আত্মমর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি ভাবমূর্তিও হয়েছে উজ্জ্বল।

'তবু উনিশে মে-র কাছে ফিরে যেতে হয়। নিষ্কর্ষ খুঁজতে হয় পুনর্নির্মাণের। ভাষা আন্দোলন চলমান এক প্রক্রিয়ার নাম: কোনো একটা বিশেষ তারিখ অন্য দিনগুলির তুলনায় উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে, এইমাত্র। ভাষা-সংগ্রামের বহুমুখী মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়ন করে বুঝি, বৃহত্তর গণসংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গ হল ভাষা আন্দোলন।' আজ উনিশে মে ভাষা আন্দোলন শুধু বরাক উপত্যকার মধ্যে সীমাবদ্ধ এমনটা কিন্তু নয়। এর পরিধি পুরো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই চিরসত্য আপ্তবাক্য সারা বিশ্বের বাঙালির স্পর্শ করেছে শ্রদ্ধেয় কবি দিলীপকান্তি লস্কর সম্পাদিত '১৯ এর কবিতা ও গান' (দ্বিতীয় সংস্করণ,বিশ্ব-সংকলন) স্বমহিমায়। সিকুয়েন্স এর প্রথম বইটি হলো '১৯-এর ভাষা শহিদেরা'। প্রকাশকাল ২০০২ সালের ১৯ মে। আর আবার দীর্ঘ একুশ বছর পর ২০২৩-র ১৯ মে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় সুবিশাল কলেবরে। সম্পাদক কবি দিলীপকান্তি লস্কর তাঁর এই বইয়ের প্রথম সংস্করণে ভূমিকায় লিখেছিলেন, যে কোন সংগ্রামের পেছনে থাকে এক একটি সাহিত্য-সংস্কৃতিক ভূমিকা। কখনো তা সংগ্রামকে পেছন থেকে ইন্ধন যোগায়, কখনো তা সংগ্রামীকে দেয় প্রেরণা। আবার কখনও কখনও সংগ্রামের সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রভাবে জন্ম দেয় কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-গীতিকারদের মনোজগতে এক অনন্য সৃজন কর্মশালা। তদুপরি সংগ্রামটি যেখানে ১৯শে মে, আপামার জনসাধারণের মধ্যে পরিব্যাপ্ত এক মহান গণজাগরণ, মাতৃস্তন্যস্বরূপ মাতৃভাষার অধিকার অর্জনের সংগ্রাম, মাতৃভাষার কারিগর কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-গীতিকারদের চেতনায়-অবচেতনায় ফেলবেই তার স্বাভাবিক অনুরণন। ফেলছেও। ১৯-কে নিয়ে সাহিত্য 'সৃষ্টি হয়নি' কথাটি প্রায়শই উচ্চারিত হতে শুনেছি, লালনমঞ্চ তা মিথ্যে প্রমাণ করেছে। সে গোটা বাংলা ভূবনের সাহিত্যকৃতি ঘেঁটে দেখতে চেয়েছে। কোথায় কোথায় উনিশ। প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি বলে বঙ্গ ও বাংলাদেশের কবির সংখ্যা তুলনায় কম, তবে অদ্যাবধি যে মাধুকরিটুকু হলো, তাও কি খুব কম !' দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা সম্পাদক কবি প্রথমেই সৌহার্দ্য সিরাজের কবিতা দিয়ে শুরু করেছেন যেখানে একটি লাইন লিখা — 'বৃষ্টির মেঘ/বরাকের অশ্রুত চিহ্নগুলো নিয়ে যাও দেখুক পৃথিবী'। কবি দিলীপকান্তি লস্কর ভূমিকায় লিখেছেন,'ভাষা শব্দটি মাতৃভাষার আবেগ ও মমতায় কখনও যেন উনিশের ভাবধারার কাছাকাছি এসে যায়। আবার ‘ভাষা’ থেকে মাতৃভাষা, ‘মাতৃভাষা’ থেকে ‘মাতৃভাষাসংগ্রাম'—এই আনুভূতিক পারম্পর্য আমাদের কাব্য-ভাবনায় সৃষ্টি করে একটি সরল রৈখিক যোগাযোগ। এক থেকে আরেককে পৃথক করা দুষ্কর। আর এই ভাবধারা একুশ-উনিশ ভেদে প্রায়ই এক বা অনন্য। ফলে আমাদের প্রাপ্তির ঘরও বহু সদৃশ কবিতার ফুলের মতো, নানা বর্ণের লাবণ্যে পূর্ণ হয়ে ওঠে। নদীর মতো বিভিন্ন অববাহিকা, উঁচুনিচু পাহাড়-টিলা তথা আঁকাবাঁকা বহু রৈখিক পথে ভালো-মন্দ বহু বিচিত্র বিষয়বস্তু নিয়ে এগোতে থাকে তার পথযাত্রা, কিন্তু গতি তার সুনির্দিষ্ট সাগরের দিকে। এক্ষেত্রে উনিশ, উনিশ-একুশ এক বা উভয়ের ভাষা-কাব্য-গান, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ভাব-বিশ্ব-সায়রে এক অনন্য সৃষ্টিময়তার সংযোজন। তাই অধিকাংশ কবি সজ্ঞানে উনিশের ধৃতি নিয়ে কবিতা লিখে থাকলেও তাঁরা কিন্তু শেষ অব্দি এই সাগর-সঙ্গমে এসে যুক্ত হয়ে যান বহু থেকে এক এবং এক থেকে বছর বিন্যাসে। এখন তাই বাংলাভাষার কবিদের কাছে নেই কোনো আগল, যা রাজনৈতিক প্রভুরা কাঁটাতার বা নদীর সীমানা দিয়ে বিভাগ করে দিয়েছেন কারো রান্না ঘরের কারো উঠোনের বা খেলার মাঠের ভিতর দিয়ে বা উনুনের মাঝ বরাবর। বর্তমান সংকলনে আমরা উনিশের বহু কবিতা বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন কবির কাছে পেয়েছি। বিভিন্ন ভাবনা-চিন্তার কবিতা, উনিশকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে তার স্বরূপ তথা মূল্যায়নের কবিতা, মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধার মূল্যবোধ থেকে উনিশের কবিতা এবং আরো অনেক বিষয়-বৈচিত্র্যে ভরপুর। ভাষা-সংগ্রামের ফলে কিছু শব্দ পেয়েছে তার নিজস্ব পৃথক এক তাৎপর্য ও অর্থময়তা। আত্মত্যাগের রক্ত কৃষ্ণচূড়াতেই যেন পেয়েছে তার প্রকৃতির প্রতিরূপ। এমন আরো কত কী।'

আমার মনে হয় বর্ধিত কলেবরে সংকলনটি সাজানোর একমাত্র কারণ সবাইকে এক সুতোয় বাঁধা। সংকলনটি মূলত  কয়েকটি পর্যায়ের বিন্যাস। উনিশে মে'র কবিতা (স্বদেশে), উনিশে মে'র কবিতা (বাংলাদেশে), উনিশে মে’র কবিতা (দূর-বিদেশে), উনিশে মে'র কবিতা (বাংলা ভাষায় / ভাষান্তরে)। শেষের পর্যায়ে রয়েছে উনিশে মে'র গান বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যাগ্রহী 'জজ্ সাহেবা', শ্যামাপদ ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে আলাউদ্দিন খাঁ, গণেশ দে, মঞ্জুশ্রী দাস,কালিকা প্রসাদ, খালেক চৌধুরী সহ এই সময়ের অনেক কবির রচনা সংকলিত হয়েছে। আর উল্লেখযোগ্য হলো এই সংস্করণে  বেশ কয়েকজন কবির লেখা গান ভিডিও লিংক সহ দেয়া রয়েছে। রয়েছে বেশ কয়েকটি গানের স্বরলিপিও। এরমধ্যে আমার খুব প্রিয় যা উল্লেখ না করে আর পারলাম না শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর ‘বঙ্গভূমি মা’ গানটি। এর ভিডিও লিংক — http:// youtube.be/DRFs17ecj71।

সম্পাদক কবি দিলীপকান্তি লস্কর তার অসাধারণ বুনন শৈলীতে নির্মাণ করেছেন '১৯-এর কবিতা ও গান'র সূচিপত্র। ১৯ মে-র কবিতায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ থেকে শুরু করে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, ব্রজেন্দ্র কুমার সিংহ, মলয় রায়চৌধুরী, কামালউদ্দিন আহমেদ, তপোধীর ভট্টাচার্য, সুবোধ সরকার, জয় গোস্বামী, বিশ্বজিৎ চৌধুরী প্রমুখের কবিতা রয়েছে। বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, হুমায়ূন আজাদ, রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন, জিললুর রহমান, বেলাল চৌধুরি, হেনরি স্বপন প্রমুখ ছাড়াও বহু কবির কবিতা রয়েছে।  দূর বিদেশের (কানাডা,জার্মানি, নিউইয়র্ক, ফ্রান্স সহ আরও) কবিদের মধ্যে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, অরুণিমা নাসরিন, দীপঙ্কর দাশগুপ্ত প্রমুখ। তৎসঙ্গে যে সমস্ত ভিন্নভাষী কবির কবিতা বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে শুরুতেই রয়েছেন অসমের খ্যাতনানা কবি জ্যোতিপ্ৰসাদ আগরওয়ালর কবিতা। বড়ো কবি অঞ্জলি বসুমাতারি, উর্খাও গৌড়া ব্রহ্মের কবিতা। এরপর রয়েছে বাগানি ভাষার অভিজিৎ চক্রবর্তী, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষী কবিতা লিখেছেন ধনঞ্জয় রাজকুমার সহ প্রমুখ কবির কবিতা।

'১৯-এর কবিতা ও গান ' তাঁর সম্ভাব্য সকল দোষত্রুটি পেছনে ফেলে সুস্থ জনমত গঠনে আরও একধাপ এগিয়ে চলছে। সংস্করণের শুরুর দিক থেকে যদি দেখা হয়, সংকলনটির সূচনা হয় মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'বঙ্গভাষা' কবিতাটি দিয়ে। এরপর ধাপে ধাপে দেখা যায় শুধু নিদৃষ্ঠ 'উনিশ মে' নিয়ে কবিতার পাশাপাশি বিভিন্ন কবির কবিতায় তাঁর অনুভূতিতে প্রকাশ পায় ভাষা আন্দোলন, বাঙালি আগ্রাসন তথা কোণঠাসার গল্প। যেখানে মাইকেল তাঁর বঙ্গভাষা কবিতায় লিখেছেন — হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন; —তা সবে, (অবোধ আমি) অবহেলা করি।‌ জয় গোস্বামী লিখেছেন — 'আমি আসছি, ভাত বেড়ে রাখো'—/মাকে বলে ছুটে গিয়েছিল/সপ্তদশী কমলা।ফেরেনি।/গুলি সোজা লেগেছিল চোখে। শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর  'উদ্বাস্তুর ডায়েরি'তে লিখেছেন — যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সে-ই কেড়েছে ভয়,/ আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়।
কামাল উদ্দিন আহমেদ লিখেছেন — বাড়ন্ত সে সবুজের মেলায়/ আমার যৌবন দোল খায়/ কমলা শচীন সুকমল বীরেন্দ্র/কানাই হিতেশ সুনীল কুমুদ চন্ডী/তরণী সত্যেন এগারোটি তাজাপ্রাণ মরণজয়ী গান গায়।

গুণের বিচারে কবিতার মান নিয়ে কথা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। উনিশ কিবা একুশ - ভাষা আন্দোলন আমাদের আবেগকে নাড়া দেয়। তাই প্রতিটি কবিতার মানও গুণগত সম্পন্ন। এতোবড় কলেবরে বিশ্ব-সংকলন ঈষৎ ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। কিন্তু এদিকে না গিয়ে সম্পাদকের অসাধারণ কাজ তথা '১৯-এর কবিতা ও গান' দ্বিতীয় সংস্করণে সম্পাদকের প্রচ্ছদ রুচিও অতুলনীয়। যেখানে কেন্দ্রে স্বপন পালের ভাষা-শহিদ স্মারক ও নকশা বিন্যাসে রয়েছেন মাসুদ করিম। এককথায় প্রসারিত দুহাত বাড়িয়ে একত্রিত করেছে এই বিশ্ব-সংকলন। নিশ্চয়ই এই সংকলন বিশ্বকবিতার উইকিপিডিয়ায় স্থানলাভ করবে। চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বে উনিশের বার্তাবাহক হিসেবে।

'১৯-এর কবিতা ও গান' — সম্পাদক দিলীপকান্তি লস্কর
প্রগতি সরণি, বনমালী রোড, করিমগঞ্জ, আসাম। মূল্য - ৪৫০/-

Sunday, July 30, 2023

উনিশে মে'র ভাবনা ও আমাদের দায়ভার


‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় উনিশ’ - ১৯ শে মে। ১৯৬১ সাল। আজ প্রায় ৬২ বছর অতিক্রান্ত। আসামের বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা রক্ষার্থে এক অস্তিত্বের লড়াই। আচ্ছা সত্যিই কি আমরা ‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় উনিশ’ নিয়ে ঘুরছি। এখন চারদিকে যে আগ্রাসনের পালা – কীর্তন চলছে এতে মুটেই আশ্চার্যান্বিত হওয়ার কথা নেই। দেশজুড়ে আজব কার্নিভাল – জোর করে বিহু উৎসব গিলানো হচ্ছে, আর সঙ্গে তো আছেই চরম মিথ্যাচার, প্রতারণা আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকা। বড় দুঃখ হয় আর ক্রোধে গা জ্বলে ওঠে যখন দেখি, আমরা কোন অনুষ্ঠানে অসমিয়া আধিপত্যবাদের প্রতীক গামছা গলায় ঝুলিয়ে খুব লম্ফঝম্ফ করতে। তাইতো আমাদের অতি প্রিয় কবি দিলীপকান্তি লস্কর তাঁর কবিতায় অতি সুনিপুণভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন – 
আমি কোত্থেকে এসেছি,/তার জবাবে যখন বললামঃ/করিমগঞ্জ, আসাম। / তিনি খুশিতে ডগমগ হয়ে বললেনঃ / বাঃ। বেশ সুন্দর বাংলা বলেছেন তো !/একজন শিক্ষিত তথা সাহিত্যিকের যখন/এই ধারণা,/তখন/আমি আর কি বলতে পারিঃ / ওকে ঠিক জায়গাটা ধরিয়ে দিতে গিয়ে বললাম- / বাংলাভাষার তের শহিদের/ভূমিতে আমার বাস; / তখন তিনি এক্কেবারে আক্ষরিক অর্থে-ই / আমাকে ভির্মি খাইয়ে দিয়ে বললেনঃ /ও ! বাংলাদেশ? তাই বলুন।

আজকাল প্রায় হাতেগোনা কয়েকটি ভাষা ছাড়া বাকি সব ভাষাই বিপন্নের দিকে। জার্মান ল্যাঙ্গুয়েজ সোসাইটি বিশ্ব সমীক্ষা করে যে তথ্য উল্লেখ করেছে তাতে পৃথিবীতে বর্তমানে ছয় থেকে সাত হাজার ভাষার অস্তিত্ব সংকটে। একদিকে আগ্রাসন আর অন্যদিকে বিলুপ্তির শঙ্কা। এই বিলুপ্তি আর আগ্রাসনের পেছনে নানাবিধ আর্থসামাজিক কারণ রয়েছে। (কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস বলেছেন, "Language, like consciousness, only arises from the need, the necessity of intercourse with other man." (Marx, 1964, The German Ideology Moscow, quoted by Berezin, op.cit, Footnote 1, Page-161) তাঁরা এ-ও বলেছেন যে, ভাষা হল “... the immediate reality of thought... Practical...actual consciousness.” (তদেব) মার্ক্স আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, "Ideas do not exist divorced from language." (Sondel Ben, 1958, The Humanity of Words, New York, The world Publishing Company, Page 180)" ভাষাবিজ্ঞানের এই সূত্রগুলোকে ভিত্তি করে এ-কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ভাষা-আগ্রাসন মানে মানুষের চিন্তা-চেতনা-অনুভবকে আগ্রাসন, ভাষা-বিলুপ্তি মানে এগুলোর বিলুপ্তি।

'ভাষা-সংগ্রামের বহুমুখী মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়ন করে বুঝি, বৃহত্তর গণসংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গ হল ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বরকত-সালাম-জব্বারেরা শহিদ হয়েছিলেন বলেই ধাপে ধাপে তৈরি হয়েছিল ১৯৭১ সালে বাংলা নামে দেশের জন্ম-লগ্ন। ইতিহাস ও ভূগোলের যৌথ আক্রমণে বরাক উপত্যকা (আসামের দক্ষিণ অংশে সাবেক কাছাড় জেলা) যেহেতু প্রান্তিকায়িত হয়ে পড়েছিল, তার গভীর সর্বাত্মক সংকট কখনো তেমন মনোযোগের বিষয় হয়ে ওঠেনি। বহুদিন আগে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। ঐতিহ্যগত ভাবে শ্রীহট্ট বা সিলেট বৃহত্তর বঙ্গভূমির অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া সত্ত্বেও ধূর্ত ব্রিটিশ ১৮৭৪ সালে তাকে আসামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল। এতে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা-নির্ভর রাষ্ট্রযন্ত্র রাজস্বখাতে অনেকটা লাভবান হল যদিও, ‘বাঙালির আধিপত্য’ নামক জুজুর ভয় দেখতে শুরু করল কেউ কেউ। ক্রমান্বয়ে বিদ্বেষ-বুদ্ধির বিষবৃক্ষে শুধু জল সেচনই করা হল। দেশ বিভাজনের সময় গণভোটে সিলেট আসাম থেকে সরে গিয়ে যুক্ত হল পূর্ব পাকিস্তানে। শুধু সাবেক সিলেটের পূর্ব প্রান্তের কিছু অংশ যুক্ত হল দেশভাগ পরবর্তী কাছাড় জেলার সঙ্গে। এই নতুন কাছাড় ভৌগোলিক-সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিকভাবে কিন্তু বৃহত্তর বঙ্গভূমিরই অংশ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এই ভূমিও মমতা-বিহীন কালস্রোতে বাংলার রাষ্ট্রসীমা হতে নির্বাসিত। বহু শতাব্দী থেকে বাঙালিদের নিরন্তর প্রব্রজন চলেছে এখানে, বাংলাই এখানকার ভাষা—কী সাহিত্যে কী গণসংযোগের মাধ্যম হিসেবে। ইতিহাসের বিচিত্র জটিলতায় তা আসামের অঙ্গ হলেও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সঙ্গে এর কোনো আত্মিক সংযোগ কখনও ছিল না।' (তপোধীর ভট্টাচার্য, সময় অসময় নিঃসময় ২০১০ (পৃ. ৫০–৫৯) https://bn.m.wikisource.org)

জাতীয় স্তরে হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থানের ধ্বজাধারীরা হিন্দি ভাষাকে যেভাবে শুশ্রূষা করছে তাতে পরিষ্কারভাবে এটা বলাই যায়, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুকান্ত-জীবনানন্দ-সুভাষচন্দ্রের মাতৃভাষাকে “নানা ভাবে শেষ করে দেবার ফেসিষ্ট সুলভ আগ্রাসন” চালানো হচ্ছে। (বাঙালির দাবিপত্র, নীতিশ বিশ্বাস, ২৯ মার্চ ২০১৯) “তার প্রমাণ কেন্দ্রীয় বাজেটে ভারতের ২য় প্রধান ভাষিক জনসংখ্যার ভাষা হওয়া সত্ত্বেও গত ৭০ বছরে তার জন্য একটি টাকাও বরাদ্দ করা হয়নি।” (তদেব) বরং 'বাংলাভাষী মানে বাংলাদেশি’ এরকম প্রচার চালানো হচ্ছে আসাম সহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। আশ্চর্যের বিষয়, “NCERT-র বইয়ে রাজ ভাষার ছদ্মবেশে
ছাত্র-ছাত্রীদের শেখানো হচ্ছে হিন্দি রাষ্ট্র ভাষা"। (তদেব) গুজরাট হাইকোর্ট ১৩ অক্টোবর ২০১০ তারিখের রায়ে জানিয়েছে," There is nothing on the record to suggest that any provision has been made or order issued declaring Hindi as a national language of the country." ( সংবিধান ও বাংলা ভাষা, তৃতীয় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৯, – তদেব)

আমাদের বাসস্থান আসামে হলেও অসমিয়া আগ্রাসনের শিকার বহু আগে থেকেই। ১৯৬১ সালের ১৯শে মে ১১ টি তরতাজা প্রাণ শহীদ হন শিলচরে। ১৯৭২ এর ১৭ই আগস্ট করিমগঞ্জে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু চক্রবর্তী)। ১৯৮৬র ২১ জুলাই করিমগঞ্জে শহীদ হন জগন্ময় ও যীশু। ১৯৯৬ এ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার রক্ষায় করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে শহীদ হন সুদেষ্ণা সিনহা। আসামে ভাষিক সংখ্যালঘুরা এভাবে বারবার ক্লান্ত হচ্ছে অসমিয়া আগ্রাসন দ্বারা। নিপীড়িত হচ্ছেন ডি–ভোটারের তকমায় ডিটেনশন ক্যাম্পে আবার কখনো বা  উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির সুকৌশল ভাষিক আগ্রাসন নীতির মাধ্যমে। জাতীয়তাবোধ জাগরনের পেছনে যে উপাদানটি সার্বিক প্রয়োজন সেটি হলো এক সম্মিলিত ঐতিহ্যবোধ। বর্তমান সময়ে নব প্রজন্ম উনিশে মে শহীদের ধর্মের মাধ্যমে বিচার করে এরা হিন্দু না মুসলমান। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে এতটাই গুলিয়ে ফেলেছি, ভুলে গেছি কোন উৎসব কার। এনআরসি তে কার জয় হলো – মুসলিম খেদা না হিন্দু সুরক্ষিত। কিন্তু আমরা এসব কি করছি? মাতৃভাষা, জাতিসত্তা, সংস্কৃতি, প্রজন্ম‌ অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে যাচ্ছি না তো! 'উইপোকা', 'ঘুসপেটিয়া' তির্যক বিশেষণে যারা ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যু শিবিরে এদের কাছে নতজানু হচ্ছি না তো! এসব বিভাজনের রাজনীতি করে যারা হিন্দু – মুসলমান বাঙালীরা একবারও কি মনে প্রশ্ন জাগে আগামীদিনে ১৯শে মে কোন অনুষ্ঠানও কি করতে পারবো?

ভাষিক গোষ্ঠীর সংখ্যার বিচারে বাংলায় কথা বলতে পারেন পৃথিবীতে এর স্থান চতুর্থ। খুবই দুঃখজনক যে বাংলা সাহিত্য চর্চায় ভবিষ্যতে কতজন পাঠক পাওয়া যাবে কি না তা সন্দেহ। বরাক উপত্যকায় বাংলা মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীরা সরকার পরিচালিত বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে থাকে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন 'মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ সম'। মাতৃভাষা ছাড়া একজন মানুষের আত্মপরিচয় হয় না। সেইজন্য বাংলা ভাষা বিষয়ে পড়াশোনার প্রয়োজন। কিন্তু বাংলা ভাষাটা পড়াবার জন্য বরাকে সরকার পরিচালিত বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদগুলো প্রায় ৮০শতাংশ শূন্য। আধিপত্যের ষড়যন্ত্রে অগ্রগতির পথে অস্তিত্ব সংকটে।

যেকোনো ভাষা আয়ত্ব করা খুবই ভালো। তবে সেটা কোন ভাবেই নিজের মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে নয়। আজ ভাষার অস্তিত্ব যে আগ্রাসিত হচ্ছে এর পেছনে কিন্তু আমরাই দায়ী। আমরা যখন নিজেদের উনিশের উত্তরাধিকার বলে দাবি করি কিন্তু আমাদের সন্তানেরাই বাংলা জানে না। সুস্থ পরিকাঠামোর মাধ্যমে মাতৃভাষা চর্চার জন্য প্রয়োজন নতুন কর্মপদ্ধতি। তাই জরুরি ফ্যাসিবাদী ভাইরাসকে উপড়ে ফেলা। নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে ১৯৬১,৭২,৮৬,৯৬র রক্তাক্ত ইতিহাস। পরিচয় করাতে হবে এনআরসি,ডিটেনশন ক্যাম্প, ডি-ভোটার দিয়ে কিভাবে আমাদের টুকরো টুকরো করার কথা। ১৯শে মে মানে প্রতিরোধ এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম। বাঙালি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়তে হবে আধিপত্যবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে। নইলে সমবেত আত্মহনন ছাড়া উপায় নেই। ভাষা আন্দোলনের চলমান সংগ্রামী চেতনায় আমাদের বিবেক জাগ্রত হোক – কাঙ্ক্ষিত আশা এখন। যেভাবে প্রখ্যাত কবি শ্রী সুরেশ চন্দ্র চক্রবর্তী তাঁর 'শহীদ তর্পন' কবিতায় বলেছেন —
আমরা নওজোয়ান আমরা নওজোয়ান/আজি গাহিব শহীদ তর্পন গান/আমরা নওজোয়ান।/ ভাষা বেদি মূলে দিল যাঁরা প্রাণ/অপূর্ব আত্ম-বলি-দান/গাহিব তাঁদের তর্পন-গান/আমরা নওজোয়ান।/ ওই দেখো কমলা, শচীন্দ্র, কানাই,/হিতেশ, সুকোমল আর চন্ডী ভাই/কুমুদ, সুনীল, বীরেন, সত্যেন,/শহীদ তরণী – করে আনচান।/দুঃখ আজি নয় নয় রে শোক/ পাষাণেতে বাঁধ বাঁধেরে বুক/ শহীদ - তর্পণ- শপথ আজি—/ 'ভাষার লাগি দিব রে জান।'/ আমরা নওজোয়ান। (ভাষা আন্দোলনের শহীদ সত্যাগ্রহী)

বার্তালিপি ১৬-০৫-২০২৩ ইং 

Sunday, July 16, 2023

আধুনিক দাসত্ব : 'স্বাধীনতাহীনতায়' সভ্য সমাজ


স্বাধীনতা এবং দাসত্ব জীবনের দু’টি অঙ্গ। কবি এক জায়গায় লিখেছেন, ‘দাসত্ব শৃঙ্খল বলো কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়?’ কবি রঙ্গলাল তাঁর কবিতায় মানব জীবনের একটি গভীর আকাঙ্ক্ষার কথা ব্যক্ত করেন। সম্ভবত স্বাধীনতার এ আকাঙ্ক্ষা মানুষের সহজাত। প্রভাবশালী দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট তাঁর বিখ্যাত 'থিওরি অব হিউম্যান নেইচার'-এ বলেন, কর্ম সম্পাদনের জন্য দরকার বাইরের সবকিছু থেকে মুক্ত হওয়া। গত কয়েক বছরে গোটা বিশ্বে 'আধুনিক দাসত্ব' ব্যবস্থা বেড়ে গিয়েছে। প্রায় প্রতিদিন বিশ্বের বহু শিশু, নারী, পুরুষ, প্রবীণ এই সভ্যযুগীয় দাসপ্রথার বলি হচ্ছেন। কখনও গোচরে, কখনও অগোচরে। গ্লোবাল স্লেভারি ইনডেক্স ২০২৩-এ আধুনিক দাসদের বসবাসকারী দেশগুলির একটি তালিকা তৈরি করা হয়। এরা এমন মানুষ, যাদের কাজের কোনও কর্মঘণ্টা নেই, নেই কোনও নির্দিষ্ট বেতনও। সূচকে বলা হয়েছে, বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ দাসের মতো জীবনযাপন করছে। আধুনিক দাসত্বের ব্যাখ্যা হলো — জোরপূর্বক শ্রম, ঋণ, জোরপূর্বক বিয়ে-দাসত্ব, মানব পাচারের মতো কয়েকটি প্রথা। দাসত্বের সংজ্ঞা এবং প্রকৃত চিত্রের সাথে এর সামঞ্জস্য নেই। কারণ, দাসত্বের শৃঙ্খল এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লুক্কায়িত। যে মানুষ নিজেকে ‘স্বাধীন’ বলে দাবি করছে, সে দিনের শেষে দেখতে পাচ্ছে এক অদৃশ্য শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রিত করছে তাকে।

বিশ্বজুড়ে আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকা পড়া মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী ও শিশুরা। সভ্যসমাজের আধুনিক দাসত্বের নেপথ্যে রয়েছে, দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে শ্রমিক হতে বাধ্য করা, ঋণখেলাপিকে ক্রীতদাসে পরিণত করা, জোর করে বিয়ে, সাধারণ দাসত্ব এবং দাসত্বের অনুরূপ কাজকারবার। রিপোর্টে বলা হয়েছে, আধুনিক দাসত্বের মধ্যে ২ কোটি ৭৬ লক্ষ মানুষ বাধ্যতামূলক শ্রমে যুক্ত। আর, জোরপূর্বক বিবাহের শিকার হয়েছেন ২ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ। আধুনিক যুগীয় দাসত্ব চোখে দেখা যায় না। খালি চোখে বোঝাও যায় না। এই ব্যবস্থা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও সমাজের গভীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু খণ্ডাংশে নয়, গোটা পৃথিবীতেই সূক্ষ্মভাবে গোপনে আমাদের দাসত্বে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রতিদিন মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে, বাধ্য করা হচ্ছে অথবা জোর করে শোষিত হওয়ার পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে মানুষকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, যেখান থেকে তার নিষ্কৃতি বা পরিত্রাণের কোনও উপায় নেই।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, 'আধুনিক দাসত্ব সরল দৃষ্টিতে লুকিয়ে আছে। এটি বিশ্বের প্রতিটি কোণে জীবনের সাথে গভীরভাবে জড়িত। প্রতিদিন, মানুষ প্রতারিত, জোরপূর্বক বা শোষণমূলক পরিস্থিতিতে পড়তে বাধ্য হচ্ছে।' ‘গ্লোবাল স্লেভারি ইনডেক্স’ (Global Slavery Index) প্রকাশ করে ওয়াক ফ্রি জানিয়েছে - ‘২০২১ সালে ‘আধুনিক দাসত্বের’ শিকার হয়েছেন প্রায় প্রায় ৫ কোটি মানুষ। অর্থাৎ, সারা বিশ্বে প্রতি ১৫০ জন পিছু ‘আধুনিক দাসত্বের’ শিকার হয়েছেন ১ জন মানুষ।' যার মধ্যে ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষই বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের নাগরিক। সমীক্ষা বলছে, প্রতিদিন আমরা যেসব সামগ্রী কিনি কিংবা যেসব পরিষেবা ব্যবহার করি সেগুলি আমাদের ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয় অথবা আমাদের ব্যবহারের বুদ্ধি অর্থাৎ প্রস্তাব দেওয়া হয়। আমরা টেরই পাই না, এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে গোপন মানব শ্রমের মূল্য। সমীক্ষা বলছে, সভ্যযুগীয় দাসত্বে ২ কোটি ৭৬ লক্ষ মানুষকে জোর করে শ্রমিকের কাজ করানো হয়। ২ কোটি ২০ লক্ষ বিয়ে দেওয়া হয় পাত্র বা পাত্রীর অমতে। অন্যভাবে বলা যায়, প্রতি দেড়শো জনের মধ্যে একজনের বিয়ে দেওয়া হয় জোর করে।

স্বাধীনতার ৭৫ বছরে অমৃতকাল উপস্থিত হয়েছে বলে হাঁক শোনা যায় প্রায়শই। কিন্তু আধুনিকতার যাবতীয় উপকরণ কোলে সাজিয়ে বসে থাকলেও, দাসত্বের শিকল থেকে আজও মুক্ত হতে পারল না ১৪০ কোটির দেশ (Modern Slavery)। বিশ্ব দাসত্ব সূচক অন্তত তেমনই জানান দিচ্ছে। ভারতে আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়েছে বলে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে তাতে (Global Slavery Index 2023)। প্রতিবেদন বলছে, ২০ টি ধনী দেশের মধ্যে ছটি দেশের আধুনিক দাসত্বের হার সব থেকে বেশি। এক কোটি দশ লক্ষ নিয়ে এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভারত। তারপরেই রয়েছে চিন। সেখানে আধুনিক দাসত্বের মধ্যে থাকা মানুষের সংখ্যা ৫৮ লক্ষ। রাশিয়ায় ১৯ লক্ষ, ইন্দোনেশিয়ায় ১৮ লক্ষ, তুরস্কে ১৩ লক্ষ এবং আমেরিকায় সংখ্যাটা ১১ লক্ষের মতো। এইসব দেশগুলিতে হয় জোর করে শ্রমে নিয়োগ করা হচ্ছে কিংবা জোর করে বিবাহে বাধ্য করা হচ্ছে।

আধুনিক দাসত্বের নিরিখে কোন দেশ, কোন জায়গায় রয়েছে, তার তিনটি পর্যায় তৈরি করা হয়। এর একেবারে উপরের দিকে রয়েছে উত্তর কোরিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, তাজিকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, রাশিয়া, আফগানিস্তান, কুয়েত, মৌরিতানিয়া, ইরিত্রিয়া। দাসত্ব যেখানে নেই বললেই চলে, সেই দেশগুলি হল, সুইৎজারল্যান্ড, নরওয়ে, জার্মানি, হল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, আয়ারল্যান্ড, জাপান এবং ফিনল্যান্ড। যে সমস্ত দেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ আধুনিক ক্রীতদাস হয়ে রয়েছেন, তাদের নিয়ে তৃতীয় পর্যায় তৈরি করা হয়েছে। সেই দেশগুলি হল, ভারত, চিন, উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নাইজিরিয়া, তুরস্ক, বাংলাদেশ এবং আমেরিকা। রিপোর্টে বলা হয়েছে, সামগ্রিক ভাবে ধরলে, এই সমস্ত দেশে প্রতি তিন জন নাগরিকের মধ্যে দু'জন আধুনিক ক্রীতদাস, সামগ্রিক হিসেবে যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।

১৯৭৬ সালে ভারতে অঙ্গীকারবদ্ধ শ্রম বিলোপ আইন পাস হয়। তার আওতায় জোরপূর্বক শ্রমদান এবং অঙ্গীকারবদ্ধ শ্রম নিষিদ্ধ হয়। এ নিয়ে প্রত্যেক রাজ্যের সরকারের উপর ভিজিল্য়ান্স কমিটি গড়ার দায়িত্বও বর্তায়। ১৯৮৫ সালে সংশোধন ঘটিয়ে ঠিকাশ্রমিক এবং পরিযায়ী শ্রমিকদেরও সেই আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সুপ্রিম কোর্টও জানিয়ে দেয়, ন্যূনতম মজুরি না মেটানোও জোরপূর্বক শ্রমের মধ্যে পড়ে। কিন্তু দাসত্ব বিলোপের পক্ষে এই আইন আদৌ কার্যকর করা সম্ভব কিনা, প্রশ্ন উঠতে শুরু করে গোড়া থেকেই।  আইনি ফাঁকফোকর, সরকারি উদাসীনতা, দুর্নীতি, রাজনীতিকদের মধ্যে সদিচ্ছার অভাবে এই আইন সার্বিক ভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি বলে মত সমাজকর্মীদের। অপরাধ বলে গন্য করা হলেও, জোরপূর্ব শ্রমে কোপ বসাতে গেলে দরিদ্র-নিম্নবিত্ত তথা মধ্যবিত্ত ঘরের পেটে টান পড়বে। তার সমাধান না খুঁজে, এই আইন কখনও কার্যকর করা সম্ভব নয় বলে ২০১৭ সালে কেন্দ্রের কাছে চিঠিও পাঠান সমাজ সচেতন মানুষেরা। শুধু তাই নয়, কেন্দ্র যে নয়া শ্রম আইন চালু করার দিকে এগোচ্ছে, তাতে সংগঠিত এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রে মালিক পক্ষের হাত আরও শক্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সমাজকর্মীরা। ভারতে একাধিক শ্রম আইন প্রণয়ন করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু 'আধুনিক দাসত্ব'-র বলয় ভাঙা এখনও সম্ভব হচ্ছে না।

দাসত্ব নিরোধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘোষণা এবং আইনের কোনো অভাব নেই। শুধু অভাব এর বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়ন করার ইচ্ছা। এর পেছনে সব সময় কাজ করছে সংঘাত, সংঘর্ষ, দুর্নীতি, দারিদ্র্য এবং নানা সামাজিক পার্থক্য। ক্ষমতা, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশ স্থাপন এবং স্বার্থ উদ্ধারও এর সাথে সম্পৃক্ত। এর ফলে দাসত্ব প্রথা নানা ঢঙে চালু রয়েছে এবং সারা বিশ্বে বিস্তার লাভ করেছে।
এর অবস্থান এখন এমন দৃঢ় যে, শিকার ও শিকারি উভয়েই এর আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে; কিন্তু বেরিয়ে আসতে পারছে না। অথচ দাসত্ব নির্মূল হওয়া প্রয়োজন। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে দু’টি বিষয়ের দিকে প্রথমেই মনোযোগ দিতে হবে, তা হলো পক্ষপাত ও অসমান। সামাজিক জীবনে অর্থনৈতিক শোষণকে বন্ধ করে সমতা রক্ষা করা হলে দাসপ্রথা চালু রাখা সম্ভব হবে না। সমাজ এবং সরকার যদি দুর্নীতি দমনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে এবং সেই মোতাবেক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে, তবে দাসত্ব তার সব অবয়ব নিয়ে হারিয়ে যেতে বাধ্য হবে। নতুবা এই অভিশাপ সমাজে প্রবলভাবে বৃদ্ধি বা স্থান নিয়ে থাকবে এবং পরিশেষে চলমান সামাজিক অশান্তির কারণ হবে।

একটা সময় মনে করা হয়েছিল, সেটা উনিশ শতকের শেষ দিক; যে পৃথিবী থেকে দাসপ্রথা বিদায় নিয়েছে। কিন্তু সেই ধারণা সত্য নয়। এই আধুনিক যুগও সেই অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়নি। পুঁজিবাদী ও নয়া উদারবাদ বিশ্বব্যবস্থার কালেও দাসত্বের শেকলে বন্দি বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষ। প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে রাষ্ট্রসংঘ সম্মেলনে বিশ্বের মহান নেতারা আগামীকালের জন্য যে লক্ষ্যগুলি রেখেছিলেন, তার মধ্যে ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে আধুনিক দাসপ্রথা, ফোর্সড লেবার এবং মানব পাচারের মতো কলঙ্কজনক ঘটনাগুলিকে মুছে দেওয়া, কিন্তু দুঃখের বিষয় তারপরেও আধুনিক দাসদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলছে। আধুনিক দাসত্ব এখনো খুব সহজ ভাবেই মানুষের সভ্যতার মধ্যে লুকিয়ে আছে। এবং সেটা মানুষের জীবনের সঙ্গে বিশ্বের প্রতিটি কোণে গভীরভাবেই রয়েছে। সেই কারণেই প্রতিদিন, মানুষ প্রতারিত হচ্ছে, জোর করে মানুষকে দাসত্ব করতে বাধ্য করা হচ্ছে।বেঁচে থাকার জন্য কাজ করে মজুর, কিন্তু কাজই জীবনীশক্তি কেড়ে নিচ্ছে। এমনকি জীবনও। আর আমাদের প্রয়োজনে সুতা থেকে বাড়ি তৈরিতে এক একটা বালু কণা সহ সব পণ্যে লেগে থাকছে সেই পীড়নের দাগ।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...