Thursday, December 14, 2023

খাদ্য তালিকায় মেইন মেনু 'বিষ সেবন'


ভারতবর্ষ মূলত বহুফসলী কৃষি ব্যবস্থা। ভারতীয় অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি- শিক্ষা - গবেষণার ক্ষেত্রে বিকাশের সাথে সাথে কৃষি আধুনিকীকরণের ধরণেও এসেছে দ্রুত পরিবর্তন। অধিক শস্য উৎপাদন প্রক্রিয়াতে আধুনিক যন্ত্র-পাতি, বীজ এবং রসায়নিক সারের ব্যবহার এক অপ্রতিরোধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।  কৃষি আধুনিকায়ন বিশ্বে খাদ্য ঘাটতি অনেকাংশে কমিয়েছে।  তবে একই সঙ্গে অধিক ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার মানবজীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। বিশ্বে বহু দেশে রাসায়নিক সারের ভয়াবহতা লক্ষ্য করে প্ৰাকৃতিক কৃষির ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে যদিও আমাদের দেশে অধিক শস্য উৎপাদনের নামে ব্যাপক হারে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। রোজকার খাদ্যের নামে দৈনিক বিষাক্ত রাসায়নিক বিষ কিছু হলেও আমরা ভক্ষণ করে চলছি। দেশের সঙ্গে তালমিলিয়ে আমাদের রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষকেরা উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অধিক শস্য উৎপাদনের, উপাৰ্জনের আকাংক্ষায় সার ও কীটনাশকের ব্যাপক প্রয়োগের সাথে বাণিজ্যিক কৃষিতে মনোনিবেশ করেছেন। বাজারে এখন প্রধান খাদ্য শস্যের পাশাপাশি বাজারে উঠা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক শাকসবজি এবং ফল ফসালিও।

বেশি ফলনের আশায় অনেক কৃষক মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার করায় উৎপাদিত সবজি ও ফল খাওয়ার  অনুপোযোগী এবং অযোগ্য হয়ে পড়েছে।  বাজার থেকে কেনা সবজি ও ফল বাড়িতে আনার পর রাতারাতি পচে যাওয়া এখন একটি সাধারণ ঘটনা।  প্রকৃতপক্ষে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার কৃষি খাদ্যকে সংরক্ষণের অনুপযোগী করে তুলছে।  আসামে উৎপাদিত শাকসবজিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে প্রতিবেশী দেশ ভুটান ইতিমধ্যে আসাম থেকে এ ধরনের খাদ্য সামগ্রী আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে।  আসামে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ভুটানের বয়কট সত্ত্বেও, আমাদের বাজার থেকে চড়া দামে এই ধরনের সবজি কিনে খেতে হয়।  কীটনাশক বা অন্যান্য রাসায়নিক প্রয়োগ-পরবর্তী পর্যায়ে উদ্ভিদের দেহ, মাটি, জল বা খাদ্য শৃঙ্খলে থেকে যাওয়া অবশিষ্টাংশ মৃত্যুদূত হয়ে উঠেছে।  এই পদার্থগুলি মাটিতে সংঘটিত বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে মাটির উর্বরতা এবং উৎপাদনশীলতাকে পরিবর্তন ঘটাতে সাহায্য করছে।

ষাটের দশকে দেশের কৃষিখণ্ডে সবুজ বিপ্লব আরম্ভ হয়। সবুজ বিপ্লবের ফলে পাঞ্জাব কৃষিক্ষেত্ৰে দেশের মোট কীটনাশক এবং ভারতীয় কৃষিখণ্ডে নতুন জলসিঞ্চন পদ্ধতি, আধুনিক যন্ত্রপাতি, হাইব্রিড বীজ, রাসায়নিক সার এবং বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার সহজলভ্য হয়ে যায়। ইহার সাথে সাথে দেশে বৃদ্ধি পায় মধুমেহ, কৰ্কট রোগ, টিউমার, কিডনী বিকল আদি রোগীর সংখ্যা। দেশের ভূভাগের ১.৫ শতাংশ প্রথমসারিতে থাকা রাজ্যে রাসায়নিক সারের ১৫-১৮ শতাংশ ব্যবহার করা হয়। যার ফলস্বরূপ পঞ্জাব প্রদেশে বিশেষ করে কৰ্কট রোগীর সংখ্যা অভাবনীয়ভাবে বাড়তে থাকে। একইভাবে কিডনী বিকল, মৃত সন্তান জন্ম, জন্মতে শারীরিক বিসংগতি আদি সমস্যাই পঞ্জাবের জনসাধারণকে যথেষ্ট আক্রান্ত করেছে। ১৯৮১ সনে ‘কালরা এবং চাওলা' পঞ্জাবে কিছু পরিমাণে মাতৃদুগ্ধের নমুনা পরীক্ষা করেছিলেন। সেই সময়ে মাতৃ দুগ্ধের নমুনায় গড় হিসেবে ১.৪ পি পি এম, ১০২.২ ডি ডি টি এবং ১.২৫ পি পি এম, ২৭.৫২ পি পি এম বি এইচ সির অবশিষ্ট ধরা পড়ে।গুরুত্বপূৰ্ণ কথাটি হলো এই পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্থির করে দেয়া নিরাপদ সীমা থেকে দশগুণ বেশি। World Congress of Cardiology-র তথ্যমতে ২০২০ সনে ভারতবৰ্ষে মৃত্যু হওয়া লোকের ভিতরে ৪০ শতাংশ পালমোনারি এবং হৃদযন্ত্র সম্বন্ধীয় রোগী। ভারতবৰ্ষে বর্তমান আঠ কোটি থেকে অধিক লোক মধুমেহ রোগের কবলে। তদুপরি ভারতবৰ্ষে প্ৰতি দশজনের ভিতরে একজন কিডনী রোগী। Indian Diabetic Association-র তথ্য অনুসারে ইহার প্ৰধান কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত হারে কৃষিতে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের ব্যবহার। আমাদের রাজ্যেও অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে কৰ্কট রোগীর সংখ্যা, প্রায় প্রতিজন মানুষের গেসের সমস্যা, মধুমেহ রোগের প্রাদুর্ভাব, কিডনী, পাকস্থলীতে পাথর, কিডনী বিকল, শ্বাসকষ্ট এবং স্কিন ইনফেকশনের মতো রোগ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

স্বাস্থ্যের পক্ষে প্রচণ্ড হুমকিস্বরূপ হওয়ার জন্য মোট ২৮ ধরণের রাসায়নিক কীটনাশক উৎপাদন, আমদানি এবং ব্যবহার কেন্দ্ৰীয় সরকার বন্ধ করেছিল। কিন্তু নিষিদ্ধঘোষিত  এইধরণের কীটনাশকের বেশ কিছু ধরণসম্প্ৰতি অসমে ব্যবহার এখনও পর্যন্ত চলছে। গেমেক্সিড, অক্সিটাস্কিন, এণ্ড্ৰোসালফেন, ডিডিটি, এলড্রিন, নাইট্ৰোফেন, কার্বোফুরান মিথাইল ১২.৫ শতাংশ, এল মিথাইল ২৪ শতাংশ, ফর্মুলেশ এবং ফসফামিডন ৮৫ শতাংশ, এস এল-র মতো কীটনাশক নিষিদ্ধ স্বত্বেয় অসম তথা দেশের কৃষিখণ্ডে  নির্বিবাদে ব্যবহার হয়ে আসছে। ডি ডি টির বিষক্রিয়া মানব শরীরে বহু বছর ধরে থাকে। সেই আমেরিকাই ১৯৭২ সন থেকে ডি ডি টির বিরূদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ডি ডি টির বিষক্ৰিয়ার ফলে জনসাধারণের কৰ্কট রোগ, টিউমার, স্নায়ুবিক সমস্যার  সাথে সাথে গর্ভস্থ শিশু স্নায়ুবিক, মানসিক তথা শারীরিক বিসংগতি নিয়ে জন্ম হতে পারে। সেইভাবে অক্সিটাস্কিন ব্যবহার করার ফলে কম সময়ের মধ্যে সবজির আকার বেড়ে যায়, এইধরণের সবজি  খাওয়ার ফলে মানব শরীরে কৰ্কট রোগ হওয়ার সাথে সাথে অন্যান্য শারীরিক বিসংগতি দেখা দেয় বলে তথ্যে প্ৰকাশ। একইভাবে রাষ্ট্ৰসংঘের দ্বারা পরিচালিত গ্লোবেলি হারমোনাইজড সিষ্টেম অব্ ক্লাসিফিকেশ্যন এণ্ড লেবেলিং অব্ কেমিকেলস (জি এইচ এস) নামের আন্তরাষ্ট্রীয় সংস্থা ফর্মেল ডি-হাইড বা ফর্মেলিনকে ‘ডেঞ্জার’ বা ‘বিপদসংকুল’ শ্ৰেণীতে রেখেছে। মৃত জীব গলেপঁচে যাতে না যায় সেইজন্য ফর্মেলিন ব্যবহার করা হয়। জীবিত প্ৰাণী এই ফর্মেলিনকে গ্ৰহণ করলে বিস্তর ক্ষতির সন্মুখীন হবে।

প্রাকৃতিকভাবে আমাদের রক্তে ০.১ মিলিমোলার ফৰ্মেলিন থাকে। রক্তে এই মাত্ৰা থেকে অধিক ফর্মেলিনের উপস্থিতি অ্যাসিডোসিস নামের একধরনের রোগের সৃষ্টি করে রোগীর মৃত্যুপর্যন্ত ঘটাতে পারে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে মাত্র ৩৩৩ পি পি এম ফৰ্মেলিন দেয়া ইঁদুর মাত্র দুঘণ্টা জীবিত অবস্থায় থাকতে পারে। ফৰ্মেলিন মানুষের কিডনী বিকল করার ক্ষমতা থাকার সঙ্গে জীবের কোষে থাকা ডি এন এনের সঙ্গে সংযোজিত হয়ে মানুষের রোগ প্ৰতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই বিলুপ্ত করে ফেলে। মানুষের দেহে ক্যানসার সৃষ্টিতে ইহার অবদান অপরিসীম। ১৯৯৫ সনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীনে ইণ্টারনেশ্যনাল এজেন্সি ফোর রিসাৰ্চ অন ক্যানসার (আই এ আর সি) ফৰ্মেলডিহাইডকে মানব শরীরে ক্যানসার সৃষ্টি করার যৌগ হিসেবে শ্রেণী বিভাজন করে। ফরমাল ডাইহাইড্রোজেন নাক সহ বিভিন্ন অঙ্গে তথা রক্তের ক্যান্সারের জন্যও দায়ী বলে জানা যায়। ২০১১ সনে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্ৰের নেশ্যনেল টক্সিকোলজী প্ৰগ্রামও ফর্মেলিনকে মানব ক্যান্সারের সৃষ্টিকারী যৌগ হিসেবে চিহ্নিত করে।

এখন ভয়ংকর কথাটি হলো, খাদ্য সংরক্ষণের নামে বহু ব্যবসায়ী এই ফৰ্মেলিনের ব্যাপক হারে ব্যবহার করে থাকেন। আমদানীকৃত অর্থাৎ চালানী মাছ, ফল-মূল, পেকেট খাদ্য ইত্যাদিতে ইহার ব্যবহার যথেষ্ট। অন্ধ্র প্রদেশ, কানপুর, ঝাড়খণ্ড এসব থেকে আমদানিকৃত ফর্মেলিন দেয়া মাছ আমরা নিত্যদিনে খেয়ে আসছি। স্থানীয় মাছের বাজারেও ফৰ্মেলিন, ইউরিয়া গ্ৰাস করে নিয়েছে।পরিতাপের কথাটি হলো ,আমরা এর বিষাক্ত মাত্রা সম্পর্কে সচেতন নই। আমরা হয়তো বুঝতে পারছি না যে ফরমালিন নামক এই বিষ আমাদের ধাপে ধাপে মৃত্যুর গহ্বরে নিয়ে যাচ্ছে। লক্ষণীয়ভাবে এতোসব বোঝার পরেও আমরা সচেতনতা অবলম্বন করতে বিমুখ। শুধু ফর্মেলিনই নয়, ফলমূল পাকাবর জন্য ব্যবহৃত কার্বাইড, বিভিন্ন খাদ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত নাইট্রাইট, সালফাইড, বিউটাইলস, বিউটাইল হাইড্রক্সি, এনাইসোল আদি রাসায়নিক যৌগও শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকারক। খাদ্য সামগ্রীতে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্ৰকারের ফুড কালার শরীরের জন্য তেমনি মারাত্মক। আমাদের সংখ্যাগরিষ্ট কৃষক উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অধিক উপাৰ্জনের আকাংক্ষায় সার-কীটনাশকের ব্যাপক প্রয়োগে বাণিজ্যিক কৃষিকার্যে গুরুত্ব আরোপ করার ফলে এখন বাজার স্বাস্থ্যের জন্য অতি ক্ষতিকারক খাদ্য, শাকসবজি, ফল-মূলে ভরে রয়েছে। এইধরণের পরিস্থিতিতে আমাদের কৃষকদের প্রাকৃতিক কৃষির প্ৰতি সচেতন করানো যথেষ্ট জরুরী।

কৃষিকাৰ্যে লাভবান হতে হলে কৃষককে বাণিজ্যিক কৃষিতে গুরুত্ব দিতেই হবে। কিন্তু কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ মানে যে শুধু ব্যাপক হারে সার এবং কীটনাশক প্রয়োগ নয়, সেই কথা প্রতিজন কৃষককে জানানো উচিত। কৃষিক্ষেত্রে অধিক উৎপাদনের জন্য কৃষককে বিজ্ঞানসন্মত আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করাতে হবে ঠিকই, কিন্তু এর সাথে এটাই লক্ষ্য রাখতে হবে যে এইভাবে কৃষি সম্প্রসারণ করতে খাদ্যের পরিবৰ্তে বিষ উৎপাদন যাতে নাহয়। কেন্দ্রীয় সরকারের নিষিদ্ধ থাকা ২৮ ধরণের কীটনাশক আমাদের রাজ্যে কিভাবে অবাধ প্ৰচলন হয়ে আছে তা রাজ্য সরকার তথা সংশ্লিষ্ট বিভাগ অনুসন্ধান করে সম্পূর্ণ বন্ধ করার আহ্বান জানাই৷ ফর্মেলিনযুক্ত মাছের ক্ষেত্ৰে সরকারের স্থিতি এখনও স্পষ্ট নয়। আমাদের কৃষকদের মধ্যে এইক্ষেত্ৰে সজাগতা সৃষ্টি করার জন্য কৃষি বিভাগকে অগ্রণী ভূমিকা নেয়া উচিত। কেবল গুয়াহাটীতে একদিনের জন্য প্ৰাকৃতিক কৃষি সন্মিলন অনুষ্ঠিত করলেই হবে না, প্রকৃতপক্ষে, এই ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচী কৃষি এলাকায় পরিচালনা করা প্রয়োজন। প্রাকৃতিক কৃষি তথা জৈবিক কৃষি পদ্ধতিতেও যে কৃষকগণ লাভবান হতে পারবেন, সেই কথা কৃষক সমাজে অবগত করে এমন ধরণের মানব স্বাস্থ্যসন্মত বিকল্প কৃষি ব্যবস্থাকে জনপ্ৰিয় করতে পারলেই রাসায়নিক সার ও কীটনাশক সৃষ্ট এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। কৃষি বিভাগ রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের পরিবৰ্তে কৃষককে জৈবিক সার এবং প্ৰাকৃতিকভাবে প্ৰস্তুত করা কীটনাশক পর্যাপ্ত পরিমাণে যোগানের ব্যবস্থা করলে রাজ্যের কৃষকগণ প্রাকৃতিক তথা জৈবিক কৃষি পদ্ধতির প্ৰতি আকৰ্ষিত না হওয়ার কোন কারণই থাকবে না।
 দৈনিক নববার্তা ১৪-১২-২০২৩

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...