“নরেন্দ্র দাভোলকারের কাজ কখনও মুছে ফেলা যাবে না। তাঁর পায়ের ছাপ রয়ে যাবে” — নাসিরুদ্দিন শাহ
শুধু কেউ বিজ্ঞান জানলে কিংবা বিজ্ঞানী হলে সমাজ বিকশিত হবে না, যদি না তিনি বিজ্ঞানমনস্ক হন। কারণ মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণীদের প্রধান তফাত হল, মানুষের কৌতূহল আছে, সে প্রশ্ন করে, অন্য প্রাণীরা করে না। প্রকৃতি সম্বন্ধে কৌতূহল থেকেই মানুষ জন্ম দিয়েছে বিজ্ঞানের। পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তর্ক, অনুমান, অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে বিজ্ঞান। মূলত ‘বিজ্ঞানমনস্কতা’ হল, বিজ্ঞানস্বীকৃত সত্যকেই বিশ্বাস করার মানসিকতা। ২০ অগাস্ট ২০১৩ সাল। আততায়ীদের হাতে গুপ্তহত্যার শিকার হন নরেন্দ্র দাভোলকর। কাজের দিক থেকে তিনি বিজ্ঞান আন্দোলন কর্মী, ডাক্তার, সমাজকর্মী ও প্রভাবশালী যুক্তিবাদী লেখক ছিলেন। মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতির সভাপতি ছিলেন। তাঁরা দীর্ঘ লড়াইয়ের পর কুসংস্কার ও কালাযাদু বিরোধী একটি আইন আনার চেষ্টা করছিলেন মহারাষ্ট্রে। যা অনেক ক্ষমতাশালীদের ভীমরুলের স্বার্থে আঘাত করেছিল। তাই আলো হাতে নিয়ে যারা আঁধারের যাত্রী তাদের লুকিয়ে লুকিয়ে গুপ্তহত্যা। শুধু দাভোলকর নন, গোবিন্দ পানসারে, এমএম কালবুর্গি, গৌরী লঙ্কেশ সহ অগুন্তি যুক্তিবাদী প্রগতিশীলরা আমাদের গর্ব। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যখন এঁদের মতো প্রগতিশীলরা আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন।
নরেন্দ্র দাভোলকর নিজে ছিলেন একান্ত নিরীশ্বরবাদী, কিন্তু কোনও মানুষের ধর্মাচরণে কখনও বাধা দেননি। ধর্মাসক্ত অসহায় মানুষকে তিনি বরং ভরসা দিতেন, বলতেন সাফল্যের জন্য সতত পরিশ্রম করার কথা। তাঁর মৃত্যুর পর 'ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান র্যাশনালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন'-এর সভাপতি নরেন্দ্র নায়ক বলেন, “প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি যদি মনে করে থাকে আমাদের এক জনকে গুলি চালিয়ে খুন করে আন্দোলনকে স্তব্ধ করবে, তবে তারা ভুল করছে।” বিজ্ঞানে স্বীকৃত সত্যই একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য। অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই কখনওই থামে না, বরং হাতবদল হয় শুধু।
সমাজকে আলোর পথে হাঁটানোর ভাবনা দাভোলকরের মধ্যে যুবক বয়স থেকেই ছিল প্রায় সক্রিয়। ডাক্তারি পড়তে পড়তেই তিনি যোগ দিয়েছিলেন ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান ড্রিঙ্কিং ওয়াটার’ আন্দোলনে। পানীয় জলের অপব্যবহার নিয়ে তিনি তৎকালীন ধর্মগুরু আসারাম বাপুর সরাসরি বিরোধিতা করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। দাভোলকর ১৯৮৩ সালে নিজে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি’ বা ‘এমএএনএস’। শুধু মহারাষ্ট্রেই এর ২৩০টি শাখা। আজ সমগ্র ভারতে এই সমিতির শাখা ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে যেমন সরব হলেন, তেমনি মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন দাভোলকর। ২০০২ সালে একটি চ্যালেঞ্জে বলেন, কোনও অলৌকিক বাবা যদি ‘এমএএনএস’-এর ঠিক করে দেওয়া ১২টি কাজের মধ্যে কোনও একটি করে দেখাতে পারেন তবে ১১ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। এই কাজগুলির মধ্যে ছিল শূন্যে ভেসে থাকা, গভীর জলের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া, আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা, শূন্য থেকে একটা সোনার হার তৈরি করা ইত্যাদি। কাউকে ব্যক্তিগত আঘাত করার উদ্দেশ্যে এই চ্যালেঞ্জ নয়, উদ্দেশ্য ছিল তথাকথিত বাবাজি-মাতাজির হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা, একটা সুস্থ সমাজ গঠন করা। ‘মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি’র লক্ষ্য ছিল— কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের চর্চা বন্ধ করা, যুক্তিবাদ, নৈতিক মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ব চর্চা, বিজ্ঞান-অনুসন্ধিৎসা ও অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষকে সঠিক পথ দেখানো।
যুক্তিবাদী নিগ্রহ ও নিধনের এই পর্বটি হয়তো এখনও শেষ হয়নি। হয়তো যুক্তিবাদী সৈনিকদের আরও মূল্য চোকাতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, যুক্তিবাদ, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সমর্থনে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই স্বনামধন্য ব্যক্তি ছিলেন। প্রত্যেকটি মৃত্যুর জোরালো প্রতিবাদ হয়েছে ভারতের কোণায় কোণায়। দেশের বাইরেও আলোড়ন কম হয়নি। এঁদের প্রাণ কেড়ে যুক্তিবাদী কর্মীদের মনোবল গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে মৌলবাদীরা। কিন্তু অন্য দিক থেকে দেখলে, মৌলবাদকে রুখতে যুক্তিবাদের এক দুর্দান্ত ভূমিকায় এভাবে উঠে আসতে হবে। উঠে আসে যুক্তিবাদী আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলার এখন সময়ের দাবি। আধুনিকতার অভিঘাতে বিপন্ন ধর্মের মরণকামড় হয়তো বা আরও কিছুকাল সমাজের উপর পড়বে, কিন্তু তা কখনই চিরস্থায়ী হতে পারে না। মানবসভ্যতার অগ্রগতির রৈখিক পথরেখায় এ এক সাময়িক ‘ফ্ল্যাকচ্যুয়েশন’ বা বিচলন মাত্র, আধুনিকতার চাকাকে কখনও পেছনে ফেরানো যায় না। তবে ঊর্ধ্বমুখী লেখচিত্রের এই উঁচুনিচু বাঁকগুলোকে আমরাই পারি দ্রুত সরলরেখায় এনে ফেলতে। সুবিচারের দাবিতে বিচারব্যবস্থাকে অবশ্যই প্রভাবিত করতে হবে। একই সঙ্গে, আমাদের ইতিকর্তব্য থেকেও আমরা যেন বিচ্যুত না হই।
ব্যক্তিজীবন বা সামাজিক জীবন সার্বিকভাবে সুস্থ ও সুন্দর করে গড়ে তোলার প্রয়াস জারি রাখতে প্রকৃতি ও সমাজের প্রতিটি ঘটনার পেছনে কার্যকারণ সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা খুব জরুরী। আর এইজন্য চাই প্রশ্ন করার আর প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার বৈজ্ঞানিক মেজাজ। ততটুকুই গ্রহণীয় যতটুকুর সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে, এই বৈজ্ঞানিক মেজাজ তৈরী করার কাজটা সুচারুভাবে করেছিলেন তিনি। মানুষের সাথে বন্ধুর মত মিশে, মানুষের জীবনসংগ্রামের সাথী হয়ে, মানুষকে বিজ্ঞান সচেতন করে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে সামিল করার প্রয়াস প্রতিটি বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের কাজ। আর এই কাজে ঔদ্ধত্য নয়, সাহসী এবং বিনয়ী হতে হবে। সর্বোপরি তৈরী করেছিলেন কুসংস্কার ও জাদুবিদ্যা বিরোধী আইনের সেই ঐতিহাসিক খসড়া যা সারা ভারতে যুক্তিবাদী মানুষের সংগ্রামের পাথেয়। যুগে যুগে কোনো যুক্তিশীল চিন্তাধারার মানুষদের কাজ কখনও সহজ হয়নি। ওনার কাছেও এই কাজ সহজ ছিল না। বহু বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বক্তৃতা বন্ধের চক্রান্ত, ম্যাগাজিন বিক্রি না করার ফতোয়া এমনকি প্রাণনাশের হুমকি নিয়েই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
সাম্প্রতিক কালে গোবিন্দ পানসার, নরেন্দ্র দাভোলকর, এম এম কালবুর্গি, গৌরী লঙ্কেশের মত ব্যাক্তিত্বদের খুন করার উদ্দেশ্য এক। সবটাই হয়েছে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদীদের নিখুঁত পরিকল্পনায়। ওরা যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাধারাকে ভয় পায়। সেই একই কারণে অরুণ ফেরেইরা, সূধা ভরদ্বাজ, ভারভারা রাও, গৌতম নাভালখা ও ভেরনন গনজাল্ভেজরা আটক হন। পাশের রাষ্ট্রে, ঠিক একই উদ্দেশ্যে ধর্ম সন্ত্রাসীরা অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, আরেফিন দীপন, অনন্তবিজয় দাস, হুমায়ুন আজাদ, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়কে খুন করে। ধর্মান্ধে কিছু ধান্দাবাজ গডম্যানরা নিজ স্বার্থে তাদের ধর্ম বিপদে এমন গল্প বারংবার শুনিয়ে ভক্তদের মগজধোলাই করে উগ্র, হিংস্র বানায়। এরা কারোর যুক্তির ধার ধারেন না। এরা যা জানে সেটাই অভ্রান্ত, এমনটাই মনে করেন। এদের হাতে কখনো খুন হয়, অপদস্থ হয় এমনকি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় ব্লগার, ফেমিনিস্ট, এলজিবিটি এক্টিভিস্ট, মুক্তচিন্তকরা।
আমরা কখনই এরকম দেশ চাই না যেখানে অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, বিজ্ঞানমনস্ক পরিপন্থী মৌলবাদী কট্টরপন্থীদের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই ওরা গলা টিপে ধরবে। যেরকম পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে মৌলবাদীরা মুক্তচিন্তকদের জড় সমেত উপড়ে ফেলার সংকল্প নিয়েছে। ভারতও কি সেই পথে হাঁটছে! মৌলবাদের উৎসগুলিকে ধ্বংস করতেই হবে। বিজ্ঞানমনস্কতা প্রচারের জন্য দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মৌলবাদী শক্তির হাতে খুন হওয়ার প্রতিবাদ হোক.... সেই সাথে মাঠে ঘাটে ছড়িয়ে থাকা বিজ্ঞান কর্মীদের যারা প্রতিনিয়ত যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতাকে ছড়িয়ে দিতে গিয়ে প্রাণ দিচ্ছেন। [Scientific thinking is purely logical: the adjective ‘rational’ cannot be applied to it. Scientific temperament is a process of thinking, method of action, search of truth, way of life, spirit of a freeman. — Dr Narendra Dabholkar, The Case for Reason, Volume One] ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কলম ধরলেই পাশবিক হয়ে উঠেন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি । বেছে নেয় খুন করার পথ। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমালোচনা করা নাগরিকদের বৈধ অধিকার। মত প্রকাশের অধিকার যদি কোন ক্ষমতার দ্বারা বিপন্ন হয় তবে নিশ্চয় ভাববার বিষয়।
No comments:
Post a Comment