যৌনতা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি৷ সমলিঙ্গে হোক বা বিপরীত লিঙ্গ, যৌনতার প্রতি আকর্ষণ মানুষ মাত্রই থাকবে৷ এই ধারণাই বেশিরভাগ মানুষ পোষণ করেন৷ কিন্তু এর বাইরেও রয়েছে আরও একটি শব্দ৷ অযৌনতা বা এসেক্সুয়ালিটি। কোনও রোগ বা প্রবৃত্তি নয়, LGBT+-র একটি প্রকারভেদ।
'হাইফেন' আমরা সাধারণত বুঝি - 'একটি বিরাম চিহ্ন যা শব্দগুলিকে যুক্ত করতে এবং একটি একক শব্দের সিলেবল আলাদা করতে ব্যবহৃত হয়'। তো এই শব্দকে নামকরণ করেছেন লেখক শঙ্কু চক্রবর্তী তাঁর গল্পের (হাইফেন)। গল্পের প্রতিটা অংশ অসাধারণ শব্দ বুননে তৈরি।শুরুর দিকে প্রচন্ড রিচুয়াল ফেমিলি যে নিজের মেয়ের বিয়ে নিয়ে মেট্রিমনি থেকে শুরু করে হাঁসের সঙ্গে বিয়ে। মাঙ্গলিক দোষ কাটিয়ে পেয়েছেন - 'জামাই আমার সোনার ছেলে'। সামাজিক কায়দার বহির্ভূত তো নয়, বিয়ে মানে শুধুই নাতির মুখ দেখা। উৎসুক, পরিবার থেকে নিকটাত্মীয়ের ক্যাটাগরি। তাই পারমিতা কবে মা হচ্ছে ওর পেট খুদতে অস্থির ঠাম্মা থেকে দিদারা।
গল্পটা যতবারই পড়েছি 'তুমি সুখ যদি নাহি পাও,যাও, সুখের সন্ধানে যাও' এই লাইন বারবার মনে আসতে থাকে। পারমিতা আর অর্ণব ইঞ্জিনিয়ার হলেও রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস সাংঘাতিক টুইস্ট। ইন্ট্রোভার্ট একটা মানুষের সাথে পারমিতা, যে সারাক্ষণ বকবক করতে পারে। বুঝাতে চেয়েছে অর্ণবকে কাপোলরা শুধু একছাদের তলায় থাকা নয়, সেক্স ও জরুরি, উই আর লিগেলি হাজবেন্ড এন্ড ওয়াইফ। কিন্তু অর্ণবের কথা কি ফেলা যায়, বিয়েতে সেক্স নির্ভর 'লিগেলাইজড প্রস্টিটিউশনস'। সেই জায়গায় গল্প বলছে অর্ণব অন্য কিছু বলতে চাইছে যা পারমিতা বুঝতে পারছে না।
'সেক্স' মানুষের দৈনিক চাহিদা। শরীরের অন্যান্য চাহিদার মতো এটাই একটা। মূলত আমরাই এটাকে কনজারভেটিভ করে ফেলেছি। সেজন্য পর্যাপ্ত যৌন শিক্ষারও প্রয়োজন। সেক্সুয়েল ওরিয়েন্টেশনের বাইরেও তো থাকা যায়। যেটা অর্ণব চাইছিল। পরিবারের ভয়ে ডিভোর্স দিতে পারছে না। আর অন্যদিকে পারমিতার জন্যও তার মন খারাপ। কিন্তু এই মন খারাপের মাঝে অর্ণব পরিচয় করিয়ে দেয় টার্কিস ছেলে সেলিমের সঙ্গে পারমিতাকে। সম্পর্কের ডানা মেলে ঠোঁটে ঠোঁট ঘনত্ব বেড়ে যায় বেডরুম পর্যন্ত -
'Down the way
Where the nights are gay
And the sun shines daily on the mountaintop'। এখানেই একটা কিন্তু থেকে যায়, অর্ণব কোন প্রেক্ষিতে পারমিতার জীবন নিয়ে খেললো। তাঁর মেইল ইগোর জন্য ?
নারী ও পুরুষের যৌন চেতনায় বিরাট একটা পার্থক্য আছে তাঁদের এসেক্সুয়ালিটি নিয়ে। এদের বৈশিষ্ট হলো, এঁরা কোনো জেন্ডারের প্রতিই সেক্সুয়ালি এট্রাকটেড ফীল করে না। এঁরা ইম্পটেন্ট নয়, শারীরিক ভাবে যৌন মিলনে খুবই সক্ষম। কিন্তু এঁরা তাঁদের কারো সাথে যৌনতা ইনক্লুসিভ কোনো রোমান্টিক সম্পর্কে জড়ান না বা জড়াতে পারেনই না। একজন পুরুষ জন্মসূত্রে এসেক্সুয়াল না হলে তাঁদের জন্য আর কখনোই এসেক্সুয়াল হওয়া সম্ভব না। অথচ জন্মসুত্রে এসেক্সুয়াল নন, এমন একজন নারীর জন্য জীবনের একটি পর্যায়ে সেক্সুয়ালি একটিভ জীবন যাপন করার পরেও অন্য একটি পর্যায়ে এসেক্সুয়াল হয়ে যাওয়া মোটেও অসম্ভব না। স্থায়ীভাবে একা থাকা কোন মহিলা যৌন বিবর্জিত হওয়ার জন্য প্রথম দিকে কিছু অসুবিধা ফিল হলেও কিন্তু কিছুদিন এভাবে চলবার পর তাঁরা নিজে থেকেই এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠেন এবং এই এসেক্সুয়ালিটিতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েন যে বাকিটা জীবন তাঁদের জন্য এই এসেক্সুয়াল জীবনযাপনে আর কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু এখানেই গল্পের 'হাইফেন'। পারমিতা 'লিউট'-র শব্দে আর সামলাতে পারলনা নিজেকে প্রশান্তি দিলো সেলিমের নগ্ন মসৃণ বুকের লোমে তার মাথা রেখে। যেখানে গল্পটা বলছে পারমিতা একটা পার্টিকুলার রীতিমতো এরেঞ্জড মেরেজ করেছে। কিন্তু অর্ণবের সাথে শীতল সম্পর্ক পারমিতা সেই জায়গায় 'হাইফেন' বসায় - 'লক্ষণরেখাকে মনে হয়, 'মাই ফুট, ফাকিং রেখা'।
শঙ্কু দা'-র 'হাইফেন'-এ মেলোডিয়াস এবং চাহিদা আর উত্তেজনার ককটেল আমার কাছে উত্তরপূর্বের গল্প সমগ্রে এনেছেন এক অভিনবত্ব। পারমিতা-অর্ণব-সেলিম এই ত্রিশঙ্কু পরিচয়কে এক বৃত্তে কেন্দ্রভূত করা চারটে খানে বিষয় নয়। এসেক্সুয়ালিটি একটি স্বাভাবিক বিষয় খুব সাবলীল ভাবে বলে গেলেন। এসেক্সুয়ালিটি এতটাই কমন ব্যাপার জীবন যাপনে অসুবিধে তো দূরের কথা অভ্যস্ত হওয়া স্বাভাবিক। তাই 'হাইফেন' সবদিক থেকেই এক স্বার্থক উদ্ধার।
No comments:
Post a Comment